প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৮
সাদিয়া সাদু
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে ধরণী জুড়ে।
সূর্যের তেজ টা এখন আর নেই । আকাশের বুক থেকে আগুনের আঁচটা সরে গিয়ে এখন নেমেছে একরাশ কোমলতা । আকাশ টা এখন আর ধবধবে নীল না। তাতে মিশে গেছে কমলার আভা , সোনালি রোদের ছটা । তার সাথে তাল মিলিয়ে হালকা শান্ত বাতাস বয়ছে । এই বৈশাখ মাসের সারাদিনের খাঁ খাঁ গরমে এই বাতাসটা মন্দ লাগছে না ।গায়ে লাগতেই প্রাণ জুড়ায়।
কিন্তু বিকেলের এই মনোরম দৃশ্য আর মন মাতানো বাতাসের ছুঁয়া ,ইট পাথরে গড়ে তুলা বড় দালানে বসে পাওয়া সম্ভব নয় ।
এটাকে উপভোগ করতে নিজেকে ঘুরাতে হবে , সময় দিতে হবে । দিগন্ত নিজের পাশাপাশি মেয়ে আর বউ কেও নিয়ে বেরিয়েছে এই শান্ত ,উষ্ণ , আর রঙিন পরিবেশে ।
মেয়েকে নিয়ে প্রথমই চিড়িয়াখানায় বিভিন্ন প্রজাতির পশু দেখিয়ে আনলো ,তার পর মেয়েকে নিয়ে এগোল ঢাকা শিশু পার্কে। মেয়েকে নিয়ে কিছুক্ষণ খেলাধুলা করলো সে । মেয়েও বাবার সঙ্গ পেয়ে আজ মহা খুশি , উপচে পড়া ফোকলা গালের খিলখিল করা হাসি যেনো সরতে নারাজ ।
তার সাথে তাল মিলিয়ে দিগন্তও হাসছে । দোলনায় দুলছে দু’জন আর খিলখিল করে হাসছে । বাবা মেয়ের এই আনন্দ দূর থেকে ছলছল চোখে দেখছে জারুল ।
দুর্দিনের পর সুদিনের মুখ কিছুটা দেখা পেয়েছে মা মেয়ে । আজকের এই দিনটার কথা সে দুঃস্বপ্নের ভাবতো না । দিগন্তের সাথে আবারো এক হাওয়ার কথা সে নিজের কল্পনাতেও আনতো না , মানুষ যা না ভাবে ঠিক তাই হয় ।
জারুল বেঞ্চেতে বসে বাবা মেয়ের উপচে পড়া খুশি দেখছে ।
ঢাকা শিশু পার্ক ঘুরে তাড়া তিনজন এগোল
চন্দ্রিমা উদ্যানে । দিয়া ছোট ছোট পায়ে দৌড়ে চলে যায় দূরে বসে থাকা কয়েকটা বাচ্চার দিকে । তারা একসাথে দৌড়া দৌড়ি খেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে । দিগন্ত জালুলখে নিয়ে ডড় কৃষ্ণচূড়া গাছেরা ছায়ায় বসে দু’জন ।
জারুল দিগন্তের হালচে ফর্সা মুখটার দিকে কিয়ৎক্ষন তাকিয়ে মাথাটা নামিয়ে নিম্ন স্বরে বলল।
_” আচ্ছা ছয় বছর আগে তো আমি তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম আজ ঠিক ছয় বছর পর তুমি সেই আগের ন্যায় আমাকে ভালোবাসো কেনো ?’
দিগন্ত নদীর শান্ত পানির দিকে তাকিয়ে হালকা মুচকি হেসে কুঁচকানো ভ্রু দু’টো শিথিল করে সাধারণ ভাবেই বলে ।
_’ ভালোবাসার সঠিক কোনো বর্ণনা বা ব্যাখ্যা হয় না । ভালোবাসা শব্দটা খুবই অদ্ভুত তার থেকে বড় অদ্ভুত শব্দটা হলো মায়া । এই দু’টো শব্দের উপরে পৃথিবীর সব শব্দ ফিকে । ভালোবাসাতে কোনো কারণ লাগে না ডিয়ার । ‘
_’এই ছয় বছরে কখনো আমাকে ঘৃণা করোনি ? ‘
দিগন্ত ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় জারুল এর লালচে চোখের দিকে । সেও ঠিক আগের ন্যায় গম্ভীর গলায় একি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় ।
_’ তুমি ঘৃণা করে ছেড়েছিলে ? ‘
_’ পাগল আমি ছাড়তে বাধ্য হয়েছি। ঘৃণা করলে তুমার মেয়েকে জন্ম দিতাম না । একা একা সিঙ্গেল মাদার হয়ে সমাজের মানুষের কটুক্তি মূলক কথা শুনতাম না ।’
তার কথায় দিগন্ত খানিকটা হাসে ।
জারুল এর হলদেটে ফর্সা মুখটার দিকে তাকায় । যার চোখেমুখে সরলতার খেলা করছে । কথাগুলোও খুবই সরল ভাবেই বলেছে । দিগন্ত চোখ ঘুরিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে ।
_’ঘৃণা শব্দটা বড়ই অদ্ভুত যারতার উপর আসে না । আপন মানুষজনের অপর আসে না । তোমাকে যদি ঘৃণায় করি তাহলে ভালবাসলাম কোই ? ভালোবাসা শুধু ভালোবাসতে জানে তার কাছে ঘৃণা , ভুলে যাওয়া এইগুলো বা সম্পর্ক ছিন্ন করা এগুলো তুচ্ছ । ঘৃণা থেকে ভালোবাসার রূপ নিলেও ভালোবাসার মানুষকে ঘৃণা করা যায় না প্রিয় জারুলফুল । ‘
দিগন্তের কথায় জারুল খানিকটা অবাক হলো বৈকি। একটা মানুষ এতো উন্মাদের মতো ভালোবাসতে পারে ! আর সেই উন্মাদনা টা শুধু তার বেলায় প্রযোজ্য কথাটা ভাবতেই শরীরে এক ধরনের ভালো লাগার শিহরণ বয়ে যায় । হালকা হেসে দূরে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল।
_’তোমার সাথে প্রতারণা করার পরও তুমি সবকিছু এতো সহজে মেনে নিলে কেনো ?’
_’ভালোবাসি তাই । যেদিন হাসপাতাল জানতে পারি আমার সুন্দর একটা পরিবার আছে , নিজের অংশ আছে সেই দিনেই ছয় বছরের সকল দুঃখ কষ্ট ভুলে যায় ।
একটা কথা কি জানো , এই পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে যারা প্রিয় মানুষ হারিয়ে আজ রাস্তার পাগল । কিন্তু সে যার জন্য পাগল হলো অপর পাশ থেকে ঠিক সেই মানুষটাই আরেক জনের সাথে সুখে শান্তিতে সংসার করছে । কিন্তু আমাদের কে দেখো । তুমি বাধ্য হয়ে ছেড়ে ভালো ছিলে না আর আমি তো বলির পাঁঠা হলাম । তুমি খুবই বোকা জারুলফুল । দুই জন দুই জায়গা থেকে জীনটাকে নরকে ঠেলে দিয়েছি। ‘
বোকা কথাটা শুনে জারুল খুব অবাক হলো ।
চক্ষু দুইটা চড়কগাছ। _’ আমি বোকা ? ‘
_’ আমার অবর্তমানে আমার সন্তান জন্ম দিয়েছো এখনো আমার জন্য লড়ে যাচ্ছো তাহলে সেটাকে বোকামি বলে না ? ‘
জারুল মাথাটা নোয়ে ফেলে ।
তলপেটে সহস্রাধিক প্রজাপ্রতির ডানা ঝাপটে উড়ে বেড়াচ্ছে। পায়ের পাতাও কেনো জানি শিরশির করছে । এইটা লজ্জা। নাকি অতিরিক্ত ভালোবাসার কথা শোনায় সেইটা অন্তাজ করতে পারেনি জারুল । সে চুপচাপ মাথা নোয়ে বসে আছে ।
দিগন্ত আরেকটু চেপে বসে জারুল এর সাথে। জারুল এর কাচুমাচু করা হাত নিজের শক্তপোক্ত খসখসে হাতের ভাজে রাখে । জারুল পেঁচানো লতা পাতার ন্যায় বেঁকে যাচ্ছে যেনো তার শরীর । অবস হয়ে ঠান্ডা পানি ন্যায় শান্ত শরীরটাই শিরশির শিহরণ খেলা করতে শুরু করে দেয়।
দিগন্ত জারুল এর অবস্থা দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে ।
_’ বিসমিল্লাহি । জীবনের প্রথমবার কোনো মেয়ে লোকের গায়ে হাত দিলাম। ‘
জারুল ভ্রু দুইটা আড়াআড়ি করে একি ভাবেই প্রতুত্তর করে ।
_’ এক বাচ্চার বাপ তো না ছুঁয়ে হয়ে পড়েছেন ? ‘
জিভ থেকে খসে পড়া কথাটাতে নিজেই জিভ কেটে ধরে । মনে মনে কয়েক গা লাগিয়ে দেয় জারুল ।
জারুল এর কথায় দিগন্ত একটু জোড়েই বলে । _’ আস্তাগফিরুল্লাহ । ‘
জারুল আর কথা বাড়ায় না ।
দিগন্ত আবারো নদীর শান্ত পানির দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে ।
_’ আমি ঠিক এখনো বুঝতে পারলাম না আমাদেরকে আলাদা করে লাভটা কি হলো ? ক্ষতি করে কত টুকু সুন্নাত অর্জন করল ?’
_’পাইনি কিন্তু পাবে । ‘
দিগন্ত ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জারুল কে বলে ।
_’ কি হয়েছিলো যে তোমার বাবাকে জিসা মেরেছে এবং তুমি আমাকে ডিভোর্স লেটার পর্যন্ত দিয়েছিলে? ‘
জারুল দিগন্তের কাঁধে মাথাটা এলিয়ে মোলায়েম কণ্ঠে বলে ।
_’ভালো মুড টা নষ্ট করতে চাচ্ছো? শুধু একটা কথা জেনে রাখো জিসা মারেনি । অন্য কেউ মেরেছে । ‘
_’ খুবই রহস্যময় সত্য লুকিয়ে আছে । তুমি আজ থেকে আমার বনানীর বাসায় থাকবে।’
জারুল কথাটা শুনে । একটু একটু করে দিগন্ত তাকে, তার সাথে আবারো আগের ন্যায় জড়িয়ে ফেলেছে । জারুল এর খুব করে লোভ হলো দিগন্তের সাথে থাকতে কিন্তু মেয়ের কথা চিন্তা করে নিজের ইচ্ছাটা মাটি চাপা দিয়ে দিলো ।
পাক্কা দুই ঘন্টা সময় কাটাল দিগন্ত আর জারুল । চন্দ্রিমা উদ্যানের বড় গাছের নীচে বসে মনের সকল কথা আদা -প্রদান করে উঠে দাঁড়ালো দিগন্ত । মৃদু পায়ে মেয়ের দিকে হেঁটে গেলো । যে এই মূহূর্তে বসে অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলতে ব্যস্ত। মেয়েটা তার বড় বাচ্চার মতো দায়িত্ব পালন করেছে।
অনেকক্ষণ সময় দিয়েছে মা -বাবাকে কথা বলার ।
দিগন্ত মেয়ের পাশে বসে নিম্ন কণ্ঠে আদর মাখা গলায় বলে ।
_’ বাসায় যাবে না পাপা ? সন্ধ্যা হয়ে এলো তো । ‘
ছোট দিয়া বড় বড় গোলগোল চোখে তাকিয়ে আবদার স্বরুপে বলে ।
_’ তুমি আমাদের সাথে তাকবে? ”
_’ তোমার মা যদি রাখে । ‘
ছোট দিয়া খুব করে খুশি হলো ।
সে বাবা-মার মাঝখানে ঘুমোবে ।
দিয়া হাত তালি দিয়ে উঠে দাড়িয়ে বাবার কোলে উঠে পড়ে ।
সারাদিন ঘুরাঘুরি কে এখন বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো তিনজন।
মাগরিব এর নামাজের পর জহুরা বেগম তজবী গুনতে গুনতে হল রুমে পা রাখে ।
তার সাথে এগিয়ে আসছে জিসা ।
দুইজন নীরব , শান্ত মুখে হলরুমের সাদা সোফায় পায়ের উপর পা তু্লে বসে ।
জিসা কিছু সময় পর হাঁক ছেড়ে ডাকতে শুরু করলো । তার মোটা কর্কশ গলার শব্দে এগিয়ে এল নাসিমা , তার পিছন পিছন এগিয়ে এলো নাসিরউদ্দিন খান , দীনা , এবং বাড়ির সকল ছেলে মেয়ে ।
নাসিরউদ্দিন খান । মায়ের পাশে বসতে বসতে বলেন।
_’ কোনো বিশেষ কারণ আছে ?’
জাহুরা তজবি গুনতে গুনতে মাথা নাড়িয়ে হ্যা বোঝায়।
জিসা মাথা নিচু করে মুচকি হাসছে ।
নাসিমা মেয়ের পাশে বসে চোখেমুখে কৌতুহল খেলা করছে ।
দীনা ও শাশুড়ির পাশে বসে ।
জহুরা হাতের তজবি সামনের টেবিলের উপর রেখে ছেলে মেয়েদের দিকে এক পলক চোখ ঘুরিয়ে নাতি নাতনিদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে ।
_’ জিসা বাদ দিয়ে ছোটরা যাও। ‘
জিভ থেকে বেরোনোর আগেই সবাই স্থান ত্যাগ করে ।
জহুরা এইবার গলা খাঁকারি দিয়ে বলল।
_’ যার জন্য তোমাদের এতো জরুরী তলব করা । কিছু ক্ষণ নীরব থেকে বলল “আগামী শুক্রবার জিসা আর দিগন্তের বিয়ে । সময় হাতে ছদিন (ছয় দিন ) এই ছদিনে সব কিছু অ্যারেঞ্জ করবে । ‘
সবাই তাজ্জব বনে গেল ।
একে অপরের দিখে চাওয়া চাওয়ি করলো ।
দীনা মাথাটা নিচু করলো। তিনি নিতান্তই ভদ্র সভ্য এবং শান্ত মেজাজের মানুষ।
৩১ বছরের সংসারে কখনো শাশুড়ীর দিকে চোখ রেখে কথা বলতে পারেনি । আজও পারলো না । মাথাটা নিচু করে গলার স্বর নামিয়ে বলল ।
_’ দিগন্তকে জানালে ভালো হতো না মা ।’
জিভ থেকে খসে পড়া কথায় তরক করে চোখ খুলল জহুরা । পাশ ফিরে তাকিয়ে চিবিয়ে বলল। _’ আমি যা বলেছি তা করো। কি করতে হবে আমাকে শিখাতে হবে না । ‘
দীনা আর কথা বলে নি। মনের ভিতর এক সুক্ষ্ম ভয় বাসা বাঁধছে। তিনি চুপচাপ রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল ।
তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে সকলকে গম্ভীর মুখে বলল ।
প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৭
_’তোমরা যেতে পারো । ‘
এক এক করে সবাই উঠে গেলেও ।
জিসা নিজের জায়গাই ঠাই বসে রইলো ।
বিয়ের কথা ভাবতেই কেমন লজ্জায় নেতিয়ে পড়ছে বারবার ।
জহুরার দাঁতে খটমট করে চিবিয়ে বলা কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল ।
জহুরা তার দিকে এক পলক তাকিয়ে চিবিয়ে বলল ।
_’ সাপের পাঁচ পা দেখে ফেলেছে । ‘
