Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১০

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১০

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১০
নীতি জাহিদ

এলিভেটরে যে দুজন ছিলো উনারা দ্বিতীয় তলায় নেমে গিয়েছেন। এখন ইমরান এবং মোনালিসা রোবটের মতো দু প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। শব্দ না থাকাটাই স্বাভাবিক। আজ মোনা বিচলিত। নিজ থেকে ইমরানের সাথে কথা বলতে চাচ্ছেনা। কথা বললেই ঝামেলা হয়, ভুল করে নতুবা ভুল বলে উনার মন মেজাজ খারাপ করে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার আংকেল ডাকটা মুখ দিয়ে আসছেনা। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও মনে হলো এই ডাক তার জন্য নয়। এদিকে এই লোক ফোনে মনোযোগ দিয়ে এমনভাবে কাজ করছে যেন সে ব্যতীত এলিভেটর শূন্য। ইমরান ফোন পকেটে ঢুকিয়ে মোনার দিকে চাইলো। অকস্মাৎ ঝাঁকি দিয়ে ভেতরে বাতি নিভে গেলো। থেমে গেলো এলিভেটর। ভয় পেয়ে গেলো মোনা। তবুও মনে সাহস এলো জেনারেটর চালু হবে৷ কয়েক মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পর ইমরান অবাক হলো। পকেট থেকে ফোন বের করে মোবাইল টর্চ জ্বালিয়ে সেই আলোতে এমার্জেন্সি বাটন চাপলো। আরো পাঁচমিনিট। মোনা পুরোপুরি ঘাবড়ে গিয়ে ইমরানের হাত চেপে ধরলো। কাঁপা গলায় বললো,

– ইমরান সাহেব চালু হচ্ছে না কেনো?
ইমরান বেশ বিরক্ত হলো শপিং মলের ম্যানেজমেন্ট এর উপর। অস্থির লাগছে গরমে। নিজেকে স্বাভাবিক করে বললো,
– হয়ে যাবে। চিন্তার কিছু নেই। টেকনিক্যাল ডিভাইস, মাঝে মাঝেই এমন হয়।
ইমরানের ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখে বিশ মিনিট। এবার নিজেও সংকিত। পুনরায় এমার্জেন্সি বাটনে ক্লিক করতেই আলো জ্বলে উঠলো। ইমরান নিজের হাতের দিকে তাকাতেই মোনা ইমরানের হাত ছেড়ে দিলো লজ্জা পেয়ে। এলিভেটর চালু হলেও চমকে যাওয়ার মত ভয়া*ব*হ ঘটনা কেবল শুরু হলো। চার তলায় এসেও খুলছেনা। পুনরায় নিচে চলে গেলো। আবার উপরে উঠছে। ভ য় পেয়ে মোনা বললো,
– কি হলো ইমরান সাহেব?
– বুঝতে পারছিনা।
এভাবে তিনবার, চারবার,পাঁচবার উঠানামা করা শুরু করলো। মোনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। কেঁদে দিয়েছে মেয়েটি। ইমরান এমার্জেন্সি বাটনে ক্লিক করছে ক্রমাগত। অকস্মাৎ মুখ দিয়ে বের করলো,
– ইন্না-লিল্লাহ।
ইমরানের গায়েই ঢলে পড়লো মোনা। ইমরান গালে মুখে আলতো থা/প্প/ড় দিতে দিতে বললো,

– মোনালিসা, মোনালিসা, তাকাও কিচ্ছু হয়নি।
এক হাতে মোনাকে আগলে ধরলো ইমরান। মোনা ফিসফিস করে বললো,
– আমরা ম*রে যাবো? এমন করছে কেনো লিফট টা?
ইমরান কথা বলার ভাষা হা রিয়ে ফেলেছে। ঘেমে নেয়ে একাকার। ভয় হানা দিয়েছে অন্তরে। মৃত্যু ভয় কতটা মা/রাত্ম/ক বুঝতে পেরেছে আজ। মোনার শরীর নিস্তেজ হয়ে যায় যায় অবস্থা। নিশ্বাস আটকে আসছে ইমরানের। ইনহেলার পকেট থেকে বের করে দুটো টান নিলো। মনে মনে বললো,
– আমার ছেলেটাকে দেখে রেখো আল্লাহ।

চোখ বন্ধ করে ফেললো। ইমরান অনুভব করছে এলিভেটর এর গতি পূর্বের তুলনায় বেড়ে গিয়েছে। খুব স্পিডে উপর নিচ করছে। বসুন্ধরা লিফট এর বাইরে সবই দেখা যায়। বাইরে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পেলো মানুষের ভিড়। ভেতরটা কাঁপছে। যা বুঝার তা বুঝে গিয়েছে। লিফটের গতি বলে দিচ্ছে এখান থেকে বের হওয়া হয়তো সম্ভব নাও হতে পারে। যেকোনো মুহূর্তে ছি*ড়ে যেতে পারে। খুব জোরে ঝাঁকি দিয়ে থেমে গেলো। মনে হলো যেন দুজন আঁছাড় খেয়েছে। ইমরান হাতে ব্যাথা পেয়েছে। কনুই বরাবর কেটে গিয়েছে হাতলের সাথে লেগে। চোখ বন্ধ দুজনের। থেমে যাওয়ার পর চোখ খুললো ইমরান। মোনাকে আগলে ধরে রেখেছে। মোনার কোথাও আঘাত লেগেছে কিনা বুঝতে পারছে না। যদিও মোনা নিস্তেজ। কোথায় থেমেছে জানেনা। অটোমেটিক দরজা খুলে গেলো। সামনে অনেক মানুষ। ইমরান চোখ খুলে নিজেকে আশ্বস্ত করলো যে বেঁচে আছে। নয়ন ছুটে এলো। ইমরান নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রেখে মোনাকে কোলে তুলে নয়নকে বললো,

– পানি আন। সাং ঘা তিক ভয় পেয়েছে।
শপিং মল অথোরিটি চলে এসেছে। বার বার ভুল স্বীকার করে মাফ চাইছে। ইমরান নিশ্চুপ। নয়ন পানির ঝাপটা দিচ্ছে। আশেপাশের লোকজন অথরিটিকে অকথ্য ভাষায় গা*লি দিচ্ছে। কিছুটা হুঁশ এলো মোনার। শরীর পুরোপুরি ভার ছেড়ে দিয়েছে। নয়নকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিয়েছে। নয়ন বুঝাচ্ছে৷ ইমরান শরীর ঝেড়ে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ায়। কনুই বেয়ে র*ক্ত ঝরছে। শপিংমলের ওয়াশরুমে চলে যায়। পিছু ছুটেছে কতৃপক্ষের কয়েকজন। মেডিকেল টিম হাজির হয়েছে। এমন দূর্ঘটনা যেন কারো জীবনে না আসে সেই প্রার্থনা করছে সৃষ্টিকর্তার নিকট।
ওয়াশরুমে এসে ক্রমাগত মুখে পানির ঝাপটা দিচ্ছে। হৃদপিন্ডের ধুকপুক কমছে। এমন সিচুয়েশনে কখনো পড়তে হয়নি। মনে হচ্ছিলো পুরো জীবন চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। হাতে ব্যান্ডেজ করে দেয়া হয়েছে। বাসায় বোনকে ফোন দিয়ে দুমিনিট ছেলের সাথে কথা বলে নিজেকে শান্ত করলো। মস্তিস্কে একমাত্র ভাবনা জেগেছে,
– আমার ছেলেটার কি হতো?

কতটা ভীত সন্ত্রস্ত হলে গা কাঁপিয়ে জ্বর আসে তা ভেবে পরিমাপ করা যাবেনা। টেকনিক্যাল ডিভাইস এর উপর কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। নয়ন এবং ইমরান এলিভেটরের ব্যাপারটা খতিয়ে দেখে জানতে পারলো এইরূপ কোনো সমস্যা আগে কখনো হয়নি। এলিভেটর ত্রুটিযুক্ত বা সমস্যাও খুঁজে পায়নি টেকনেশিয়ান। পুরো ব্যাপারটা দূর্ঘটনা যার মাঝে কারো কোনো হাত নেই। আরো বড় ধরনের দূ্র্ঘটনাও ঘটে যেতে পারতো। মোনার সেই জ্বর সেরেছে বেশ কিছুদিন পর। মিনহাজ মেয়েকে নিয়ে বড্ড দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলো আজ মেয়েটা খুশি মনে কলেজের কোচিং এ গিয়েছে।যাওয়াতে কিছুটা প্রশান্তি পেলো। কলেজে এসে ক্লাসে বসে ভাবছে,
– মানুষ লিফটে উঠলে হয় রোমান্স আর আমি লিফটে উঠলে হলো টেকনিক্যাল ডিভাইস এরর।
একটা ব্যাপারে মোনার অনুভূতি যথেষ্ট শক্তপোক্ত। আর কোনো দ্বিধা নেই। যা হওয়ার হবে, তবে পেছাবার পাত্রী সে নয়। কিছুক্ষন আগেও চয়ন বলে বসলো,
– ইউ আর গন মোনা, কমপ্লিটলি গন। কন্ট্রোল ইউরসেল্ফ। নতুবা ঝড় তুলবি তুই।

কিছুক্ষন হলো কলেজ থেকে ফিরেছে মোনা আজ।মাথায় চয়নের বলা শেষ কথাটি ঘুরছে। পুরো রাস্তা রিকশায় ভাবতে ভাবতে বাসায় এসেছে। এত দূর্বল চিত্তের মেয়ে তো মোনা নয়? মনের মাঝে উঁকি দেয়া সন্দেহকে অগ্রাহ্য করতে উঠে আলমারির কাছে চলে যায়। কদিন আগেই জন্মদিন পার হয়েছে । কথা ছিলো সাদাফ ভাইয়াদের সবাইকে বাসায় দাওয়াত দিবে। কত প্ল্যান ছিলো। দাদী দিলোনা। এরপর জ্বর, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যাওয়াতে সব বানচাল। জন্মদিনে বাবার দেয়া উপহারের নীল জামদানী শাড়িটি নামিয়ে ফুফির কাছে গেলো পরিয়ে দিতে। মায়া উপলক্ষ কি জানতে চাওয়াতে জবাব দিলো,
– তোমার খেমতি বুড়ি মায়ের জন্য কি সাদাফ ভাইয়াদের ট্রিট দিতে পেরেছি? কত সুন্দর আকর্ষণীয় সব গিফট দিয়েছে আমাকে।
মায়া হেসে শাড়ি পরাতে পরাতে বলে,

– তাহলে আজ টিউলিপের দিকে যাওয়া হচ্ছে তাই তো?
মোনা উপর নিচ মাথা নাড়ে। ফুফির গলা জড়িয়ে বললো,
– ও ফুফি যাবে তুমি?
– যেতে তো মন চাইছে কিন্তু পারবো না। বের হতে হবে তায়্যিবার আজ এনগেজমেন্ট ভুলে গেলি?
– ওহ হ্যাঁ তাই তো। আচ্ছা যাও। আমাকে কিছু টাকা দাও। একটা কেক নিয়ে যাই।
মায়া ব্যাগ থেকে এক হাজারসহ কিছু খুচরা টাকার নোট বের করে বললো,
– জানি যেতে পারবি তবুও সাবধানে যাস। আর ছোট ফোনটা নিয়ে যাস।
মোনার একটি নোকিয়া এগারোশো বিশ ফোন আছে। এছাড়া ল্যাপটপ আছে। পড়াশোনার যাবতীয় কাজ ল্যাপটপে করে। বাসা থেকে বাইরে এই বিশেষ মডেলের ফোন নেয়ার অনুমতি আছে। বাবা বলেছে উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফল ভালো হলে একটি নতুন ফোন কিনে দেবে। অবশ্য মোনার ফোনের প্রতি আকর্ষণ খুব একটা বেশি নেই। বাসায় বাবা আসলে তার ফোন মোনার কাছে থাকে,মায়ার ফোনটাও মোনার কব্জায় পাওয়া যায় বেশির ভাগ সময়। মিনহাজ মেয়েকে স্বাধীনতা দিয়েছে তবে সেই স্বাধীনতায় হস্তান্তর করার অধিকার নিজ হাতে রেখে দিয়েছে। উঠতি বয়সটাকে সাবধানী চোখে পর্যবেক্ষন করার জন্য দক্ষ হাতে পরিচালনা করছে মেয়ের স্বভাব।

বাবার অফিস তেরো তলায়। তেরো তলায় সিড়ি বেয়ে উঠা মা*রাত্নক কষ্ট সাধ্য। এলিভেটর দেখলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে সেই ভয়ানক তেঁতো চিত্র। হাতে কেক, অন্য হাতে খাবার নিয়ে উঠতে চাইলো সিড়ি বেয়ে। কেয়ারটেকার আংকেল এগিয়ে এসে বললো,
– ম্যাডাম লিফট দিয়া যান।
মোনা ভয় পায় তা এই লোককে কিছুতেই জানতে দেয়া যাবেনা। তাই মাথা নাড়িয়ে বললো,
– আপনি বরং এই জিনিস গুলো অফিসে দিয়ে আসুন। আমি এখন সিড়ি ব্যায়াম করবো। সিড়ি ব্যায়াম করলে শরীর ও মন দুটোই ভালো থাকে।
কেয়াটেকার অবাক হলেও চুপ রইলো। মালিকের মেয়ে বলে কথা। এদের মতি গতি ঠিক নেই। মোনার কথা অনুযায়ী চলে গেলো লিফটের সামনে।

একটু একটু করে দশ তলায় এসে হাঁপিয়ে উঠলো মোনা। পায়ের ব্যাথায় পা নাড়াতে পারছেনা। সবে তো জ্বর সারলো দুদিন। সিড়িতেই বসে পড়লো। একটু পানি খাওয়া প্রয়োজন। এই ফ্লোরেও টিউলিপের হেড অফিস আছে মোনা জানে। নতুন হয়েছে। তাই শাড়ির কুচি ধরে পা খুড়িয়ে ভেতরে ঢুকে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। একজনকে যেতে দেখে ডাক দিলো। দেখে মনে হলো এই ফ্লোরের হেলথ ইনচার্জ। মহিলাটি কাছে আসতেই জানালো,
– আন্টি আমাকে এক গ্লাস পানি দেয়া যাবে?
মহিলা বেশ বিরক্ত নিয়ে বললো,
– কে তুমি? এখানে কিভাবে এলে?
– বলছি সব। গলা শুকিয়ে গিয়েছে।
মহিলার দয়া হলো। এক গ্লাস পানি দিতেই মোনা ঢকঢক করে গলদকরণ করে নিলো। ধন্যবাদ দিয়ে বললো,
– আমি হেড অফিস যাব। সিড়ি দিয়ে উঠলাম তাই ক্লান্ত।
কথা শুনে কোনো ভাবগতি দেখালো না সেই মহিলাটি। নিজের পথে চলে গেলো। এর মাঝে মোনা একটু ঘুরে দেখছে অফিসের ইন্টেরিয়র, ডিজাইন গুলো। বেশ সুন্দর। সামনে টেবিল থেকে শীষের আওয়াজ কানে এলো। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পেলো এই ফ্লোরের কোনো অফিসার হবে হয়তো। কিন্তু চরম অসভ্য। এদের মাঝে একজন বললো,
– ম্যাডাম এটা তো এফ ডি সি নয়, ভুল করে এসেছেন?
মোনা পেছন ফিরে দেখে চুল বিহীন মাথার এক পুরুষ এমন বিশ্রী মন্তব্য করলো। তার সাথে তাল মিলিয়ে পাশের জন বললো,

– আপনার শাড়ির কালার টা সুন্দর।
আশপাশটা তাকিয়ে মোনা কিছু একটা ভেবে জবাব দিলো,
– আমার হাতের চ*ড় টা আরো সুন্দর। সেই সাথে মিষ্টি ও। খাবেন নাকি?
অফিসের বাকি ডেস্কের অনেকে শুনে মিটমিট করে হাসছে। দুজন অপমান বোধ করে তেড়ে এগিয়ে এসে বললো,
– কোন সাহসে অফিসে ঢুকেছেন? কে দিয়েছে এই অধিকার?
কিঞ্চিৎ মেজাজ খারাপ হলেও পরোয়া না করে মোনা সামনে এগিয়ে স্ট্রাকচার দেখতে দেখতে ভাবছে এটা বেশি ডিজাইনেবল। চকচক করছে। হয়তো নতুন ইউনিট।
– মোনালিসা তুমি এখানে?
সেই পরিচিত, আকর্ষণীয়, আবেশিত এবং হৃদয়ে দোলা জাগানো স্বর। এক পশলা দারুন বৃষ্টির সুমিষ্ট পরশ। ইমরানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বললো,
– ভুলে এই ফ্লোরে এসে পড়েছি। না আসলে তো জানতামই না কিছু লাফাঙ্গা, আদব কায়দাহীনদের আপনারা চাকরি দিয়ে রেখেছেন।

মোনা ইমরানের সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে। অফিসের প্রত্যেক সদস্য দাঁড়িয়ে আছে বসকে দেখে। ভেতরে মিটিংয়ে ব্যস্ত ছিলো ইমরান। বাইরে গ্লাস ভেদ করে মোনার অবয়ব দেখে মিটিং ছেড়ে উঠে আসে। কথা হলো, মাত্র উচ্চারন করা প্রতিটি বাক্যের অর্থ কি? কে লাফাঙ্গা? কাদের চাকরি দিয়েছে? এতটুকু নিশ্চিত মেয়েটা কোনো না কোনো ভাবে কষ্ট পেয়েছে। নতুবা এত কঠিন কথা বলতো না।
আরো তিন তলা উঠে মোনা শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ধপ করে চৈতির কিউবিকলের সামনে বসলো। মোনাকে দেখে সবাই মুচকি হাসি দিলো। কিছুক্ষন আগেই রহমত ভাই সেই সংবাদ দিয়েছে। মোনা মেয়েটি এমন যে সবাইকে নিয়ে থাকতে ভালোবাসে। নিজেদের মাঝে আড্ডায় মেতে উঠতেই রিমি বলে উঠলো,
– মোনা তুমি তো থাকবে কিছুক্ষন তাই না?
– জ্বি আপু
– তাহলে হাতের কাজটা শেষ করে ক্যান্টিনে যাবো। নয়ন স্যারের কাছ থেকে একটু সময় নিও। ইমরান স্যার সময় দিবেনা।

অফিশিয়াল ডেকোরাম বলে একটা কথা আছে। মোনা উঠে বাবার কেবিনে চলে গেলো। তার পাশের কেবিনের নেম প্লেটে লিখা, ‘ইমরান শরীফ খান’। আজ কেনো এমন মনে হচ্ছে? এই মানুষটা সম্পর্কিত যাই ঘটছে, যাই দেখছে সব কিছুতেই অন্যরকম অনুভূতি।
লাঞ্চ আওয়ারে সাদাফ সবাইকে ডেকে নিয়ে এলো অফিসের প্রোগ্রাম কর্ণারে। মিনহাজ আজ মেয়েকে অফিসে দেখে বেশ খুশি। একা বাসায় মেয়েটা হয়তো ভালো বোধ করছে না। মোনাকে মাঝে রেখে হাতে
ছু/রিটা ধরিয়ে দিলো। মিনহাজ এবং নয়ন একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। ইমরানকে আসতে বলাতে সে নাকোচ করেছে মিটিংয়ের বাহানায়। তবে মোনা সঠিক জানে নাকোচ করার কারণ। ভেতরে যেই কান্ড ঘটিয়েছে তা যদি বাবা বা মামা টের পায় নির্ঘাত মাইনর হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে। কেক কাটা শেষ হলে ইমরান এসে এক পাশে দাঁড়ায়। মোনা, বাবা এবং মামাকে কেক খাইয়ে কেক হাতে ইমরানের দিকে এগিয়ে গেলো। অজানা কারণে ইমরান পিছিয়ে গেলে, মোনা পুনরায় এগিয়ে আসলো। মুখের সামনে কেক ধরলে ইমরান একটা গিফট বক্স এগিয়ে বললো,

– ম্যানি ম্যানি হ্যাপি রিটার্নস অফ দ্যা ডে ।
– থ্যাংকিউ। এখন কেক নিন।
– স্যরি, আমি স্যুগার এভয়েড করি।
মোনার মাথায় দুষ্টুমি খেলে গেলো। নয়নের চোখ মিলল মোনাতে। নয়ন ইশারা দিয়ে বলল, কর। মোনা ঠুশ করে রেড ভেলভেল কেকটা ইমরানের বাম পাশের গালে লাগিয়ে দিলো। বাঁজখাই গলায় ধমক এলো মিনহাজের,
– মোনা…
কেঁপে উঠলো মোনাসহ অফিসের প্রতিটি সদস্য। নয়ন মোনার পাশে এসে দাঁড়ায়। নিজেই চমকে গেলো মেয়েকে এভাবে ধমক দেয়াতে। মেয়ের দিকে আঙুল তুলে বলে,
– এসব অসভ্যতামি শিখিয়েছি আমি?
এভাবে ধমকে বলাতে ইগোতে লাগলো মেয়েটার। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে বিষাদ অশ্রু। ইমরানের নজর পড়লো শ্যামাঙ্গিনীর ফুলো আদুরে গালে অশ্রুর দাগ। মিনহাজের দিকে তাকিয়ে বললো,
– এভাবে মেয়েকে ধমকানো খুবই বাজে কাজ মি. মিনহাজ। আমি যখন রিয়েক্ট করছিনা আপনি কেনো এমন বিহেভ করবেন?
টেবিলের উপর থেকে একটা টিস্যু নিয়ে মোনার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,

– মুছে দাও তো সুইট বার্ড।
বাবার দিকে তাকানোর সাহস নেই কিন্তু মামার দিকে তাকাতেই নয়ন সম্মতি দিলো। মসৃন ,মোলায়েম স্পর্শ ইমরানের পছন্দ হয়নি। এই স্পর্শ সর্বনাশের। মোনার মলিন চোখের অশ্রু সকলের সামনে মুছে দিয়ে বললো,
– কাঁদবেনা। তোমার সুন্দর চোখে জল বড্ড বেমানান প্রিয় মোনালিসা।
মোনার মাথায় হাত চুলগুলো এলোমেলো করে দিলো। এদিকে মোনা হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছে। এতটা আশা করেনি। নিজেকে সামলে ব্যক্তিগত অফিস রুমে চলে এলো ইমরান। তামান্না, চৈতি এসে আগলে ধরলো মোনাকে। মিনহাজ রাগ করে নিজের কেবিনে চলে গেলো। এদিকে নয়ন এসে হেসে বলে,
– বোকা মেয়ে কাদঁছিস কেনো? বাবারা এমন বকা দেয়। আমরা মজা পেয়েছি।
মোনা গাল ফুলিয়ে বলে,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৯

– আমাকে বকা খাইয়ে মজা পেয়েছো। তুমি ইশারা দিলে কেনো? আমি নাহয় দুষ্টু। তুমি না করতে পারলে না মামা?
– তোর মামা না। না করা কি আমার স্বভাবের সাথে যায়। আমি নিজেই তো ওরে কেক লাগাতাম। তোর বাপ যেভাবে ধমক টা দিছে সাহস হয় নাই…
মোনাসহ বাকিরা হেসে দিলো। অফিসের বাকিরা জানে মোনা নয়নের বড্ড ন্যাওটা। ভাগ্নীকে পেলে নয়ন মেতে উঠে। ভাগ্নীর দুষ্টুমি সায় দেয়াটা মানুষটা আগলে রাখে সবসময় মেয়েটাকে।

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১১