প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৯
নীতি জাহিদ
কোনো কথা হয়নি দু বান্ধবীর মাঝে আজ। দুজনই বেশ জেদ ধরে আছে। একই বেঞ্চে বসেছে, টিফিনের সময় খাবার ও শেয়ার করে খেয়েছে কেবল মুখ দিয়ে বাক্য নিঃসৃত হয়নি কারো। এর কারণ হিসেবে আবিষ্কার হলো গত রাতে মোনা চয়নকে ফোনে বলেছে, এহসান স্যার মানুষ হিসেবে যতটা ভালো মানসী দেখায় ততটা নয়। মোনা বাবার সাথে কাল বিকেলে খেতে গিয়ে একটা মেয়ের সাথে এহসান স্যারকে দেখেছে রেস্টুরেন্টে। কখনোই সন্দেহ করতোনা। কিন্তু তাদের কথা বলার ধরন আর মেয়েটার সাজগোজের ধরন এবং শেষে যাওয়ার সময় একই রিকশায় বসাটা বেশ চক্ষু কটু লেগেছে।
থাকতেই পারে এহসান এর প্রিয় মানুষ তাই বলে উনি কেনো গত বছর সেকেন্ড ইয়ারের ফারিন আপুর সাথে এত মিশেছেন? এমনভাবে ফারিন আপুকে বার্গার কিনে এনে দিতেন সবাই সন্দেহ করেছিলো। এতদিন তো জানতো হয়তো ফারিন আপুর সাথে ভাব। আর আজ দেখলো অন্য মেয়ে। চয়নকে জানাতেই ও প্রতিবাদ করে বললো হয়তো মোনার দেখার ভুল। এই নিয়েই দুই বান্ধবীর তর্ক শুরু। শেষ ঘন্টা শুরু। মাত্রই এহসান স্যার ঢুকলেন রুমে। আজ থেকে মোনা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ চয়নের সাথে স্যারকে নিয়ে কোনো কথাই বলবেনা।
স্যার ক্যালকুলাস করতে দিয়েছেন শ্রেণির কাজ হিসেবে। এই এক জিনিস দেখলেই মোনার মেজাজ চ*টে যায়। কান্না পায়। কেনো ইন্টিগ্রেশন দিতে হবে? এখন না পারলে স্যার পুনরায় সেদিনের মতো অপমান করবে। বাবাকেও অভিযোগ করতে পারে। পারতপক্ষে মোনা নিজেকে স্যারের চক্ষুশূল মনে করে। দম ফেলে ফিসফিস করে চয়নকে বলে,
– ও পাখি, আমাকে দেখাবি? ভুলে গিয়েছি।
চয়ন ও ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে,
– সূত্র কতটুকু মনে আছে?
– একটা তো ∫ uv dx = u ∫ v dx – ∫ (du/dx ∫ v dx) dx.
অন্যটা কোনটা? ∫ sec x (tan x) dx = sec x + C এটা?
চয়ন খাতাটা সামান্য এগিয়ে দিলো। মোনা তাকিয়ে দেখে ইশ রে উলটা সূত্র করতে গিয়েছিলো।
– ∫ csc x ( cot x) dx = – csc x + C
পুরোটা তাও একবার মিলিয়ে বিড়বিড় করে পড়তে লাগলো।
সামনে থেকে রুপা হালকা কেশে বললো,
– অ/প/রা/ধী গুলো সামনে তাকা, স্যার তাকিয়ে আছে।
চয়ন ও মোনা বিদ্যুৎ গতিতে তাকিয়ে দেখে সত্যি ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। দুজনই আতঙ্কিত হলো। অবাক করে দিয়ে আজ স্যার বকা দেয় নি। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে ফিরে গেলো। পুরো ক্লাসে খাতা চেকের সময় টুকটাক দু একটি কথা ব্যতীত টু শব্দটি ও করেনি।
ছুটির সময় মোনা স্যরি বলাতে চয়ন আর রে/গে থাকতে পারলোনা। দুজনই ছুটির পর রফিক মামার ফুচকা স্টলে চলে গেলো। ভিড় দেখে এক পাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ করছে পড়া নিয়ে। মোনা বাসার কথা বলছে। এর মাঝে বললো,
– জানিস চয়ন আমার একটা নতুন শত্রু হয়েছে। একদিন বন্ধু ছিলো। পরের দিন না না ওয়েট… স্যরি সকালে বন্ধু ছিলো বিকেলে শত্রু হয়ে গিয়েছে। পরে আবার বন্ধু হয়েছে।
চয়ন বিরক্ত নিয়ে বলে,
– নাটক বন্ধ কর। এই নাটকীপনা কে শেখায় তোকে। এমন আহ্লাদ করিস কেনো?
মোনা মুখ ভেঙচি দিয়ে বলে,
– আমি জানি আমাকে নাটকীপনাতে বেশ লাগবে। আহ্লাদ তো শুধু তোর সাথে করি। কে আছে আমার?
– রহস্য বল।
– বাবার বিজনেস পার্টনার আর মামার বন্ধু ইমরান সাহেব। ইতালী থেকে এসেছে।
চয়ন হাত দিয়ে থামিয়ে বলে,
– ইমরান সাহেব?
– হ্যাঁ লোকটাকে ক্ষেপাতে ইমরান সাহেব বলেছিলাম এখন তাকে আংকেল ডাকতে ইচ্ছে হয়না। জানিস আমি ইমরান সাহেব বললেই বাবাসহ বাড়িসুদ্ধ সবাই রাগ করে। ওই লোক তো ফুলে এটম বোম হয়।
মোনা ফিক করে হেসে দিলো। চয়ন অবাক হয়ে বলে,
– মামার বন্ধু মানে মামার বয়সী। তুই ওই মানুষটাকে কিভাবে সাহেব ডাকিস?
– তুই যেভাবে এহসান স্যারকে মাস্টার মশাই ডাকিস।
চয়ন মোনার দু কাঁধ ঝাঁকি দিয়ে বলে,
– মোনা কি বলছিস এসব। আমি স্যারকে পছন্দ করি কিন্তু তুই?
আচমকা মোনার সৎবিৎ ফিরে এলো। অবিরত ঢোক গিলছে। কি বলছে এসব? বুক ধুকপুক করছে। বিস্মিত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে চয়নের দিকে। মস্তিষ্ক অচল। অকস্মাৎ মোনা ঘামছে। চয়ন কিছু একটা বুঝতে পেরে বলে,
– মোনা উনি এসেছে কয়দিন হলো?
– বেশ কিছুদিন।
– তুই কত বড় ভুল পথে হাঁটছিস? আংকেল ডাকবি। কলেজে পড়ি আমরা। কয়দিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিব। অবুঝ নাকি তুই? মাইন্ড অন্যদিকে কনভার্ট হয়ে যাচ্ছে তোর।
মোনা চেয়ে আছে চয়নের দিকে। সত্যি আংকেল ডাকবে? কিভাবে ডাকবে? ডাকতে পারবে? ভেতর থেকে হাহাকার জন্ম নিলো। আংকেল মুখে আসছেনা। শুকনো ঢোক গিলছে। হঠাৎ মনে হলো মানুষ টার হাসি মুখ ভেসে উঠছে। সাথে সাথে মুখে হাত দিলো। মনে মনে বলছে, আল্লাহ কি হচ্ছে এসব!
চয়ন মোনাকে আলতো ধাক্কা দিয়ে বললো,
– কি ভাবছিস?
কথার মাঝে এহসান স্যার ওদের সামনে এসে দাঁড়ায়। দুজন কথা থামিয়ে নিরব হয়ে গেলো। স্যারকে সালাম দিলো। আশপাশে কেউ নেই লক্ষ্য করলো। ভারী গলায় স্যার বললো,
– বাসায় যাও নি দুজন? ছুটি তো ঘন্টা খানেক আগে হয়েছে।
চয়নের মাঝে অসংকোচ দেখে মোনাই বললো,
– স্যার রফিক মামার ফুচকা খেতে দাঁড়িয়েছি,কিন্তু অনেক ভিড় তাই যেতে পারিনি।
স্যার মাথা নেড়ে বললো,
– আচ্ছা।
ঘাড় ঘুরিয়ে ওদের চমকে দিয়ে বললো,
– ছোটু এখানে দু প্লেট ফুচকা দে তো। তোমরা দুজন বসো এখানে।
দুজন মনে হলো আকাশ থেকে পড়লো। মোনা মুখ চেপে হাসছে। এহসান মোনার দিকে ভ্রু কুচকে বললো,
– মোনাশা কোনো সমস্যা?
হাসি থামিয়ে বললো,
– বললে বকা খাব।
– না, রাস্তায় কেনো বকা দিবো? বলো সংকোচ না করে।
– একটা কবিতা মনে পড়েছে।
আচমকা এহসান ও হেসে দিলো হালকা। মাথা নাড়িয়ে বললো,
– আমি জানি তুমি কোন কবিতা বলছো।
এরপর নিজেই হেসে আবৃত্তি করলেন,
– রামগরুড়ের ছানা
হাসতে তাদের মানা,
হাসির কথা শুনলে বলে,
“হাসব না–না, না–না !”
সেই সাথে মোনা ঠোঁট মিলাচ্ছে। পাশে রফিক মামার সহকারী ছোটু ও ফুচকা হাতে দাঁড়িয়ে ঠোঁট মিলাচ্ছে। তিনজনের ঠোঁট মেলানো কবিতা শুনে চয়ন বিমুগ্ধ নয়নে দেখছে আর মিষ্টি মিষ্টি হাসছে। এহসান ছড়া থামিয়ে দিলে ও মোনা আর ছোটু তখনো বলেই যাচ্ছে। চয়নের মিষ্টি হাসিতে এহসানের চোখ পড়ে। দুজনের শুভদৃষ্টি হয়ে গেলে চয়ন হাসি থামিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নেয়। এহসান ও দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো,
– বসে আছো কেনো খাও, নেতিয়ে গেলে মজা পাবেনা।
মোনা প্লেট বাড়িয়ে বললো,
– আপনি খাবেন না স্যার? নিন আমার থেকে একটা।
এহসান হাত দিয়ে বারণ করার ভঙ্গিতে বললো,
– আমি এসব খেতে পারিনা। ভালো লাগেনা।
মোনাও ঠেশ মে*রে বলে,
– এজন্যই আপনি গণিত ভালো পারেন আর আমাদের গণিতের স্যার। তাই তো এই কঠিন রসকষহীন অংক আমার মত মিষ্টি কারো মাথায় ঢুকবেই না। তবে এই কাকাতুয়া পাখি চয়নের মাথায় আবার সব ঢুকে।
আনমনে বকতে বকতে দেখে চয়ন প্লেটের দিকে তাকিয়ে আঁকিবুঁকি করছে না খেয়ে। এহসান স্যার চয়নের প্লেটের দিকে তাকিয়ে আছে। মোনা প্লেট হাতে নিয়ে বললো,
– টকের মাঝে আরেকটু ঝাল দিলে কি রফিক মামার ঝালে টান পড়তো? আমি একটু ঝাল নিয়ে আসি।
ব্যাগটা টুলে রেখে মোনা ওদের একা রেখে উঠে গেলো। মোনা চলে যাওয়ার জন্য পা ফেলতেই চয়ন চমকে মোনার দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙিয়ে দিলো। মোনা ইশারায় হাত দিয়ে বুঝালো কথা বল। চোখ তুলে চয়ন স্যারের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো বিমর্ষ মলিন চেহারা। কিছুক্ষন আগেই তো মোনার সাথে মজা করছিলো। মুহুর্তেই এমন কি হলো। চয়নকে চমকে দিয়ে এহসান বলে উঠলো,
– চয়ন, যা ভাবছো তা তোমার আবেগ। আবেগকে ভুলে গিয়ে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নাও। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ এইচ এস সি। ভালো হওয়া জরুরি।
চয়নের বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেলো। স্যারের কথার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে নিজের অজান্তে চোখের পানি পড়ছে ফুচকার টকের কাপে। এহসানের দৃষ্টিসীমার মাঝেই সব ঘটছে। গলা ঝেড়ে এহসান বললো,
– ফারিন আমার ভাইঝি। ওকে নিয়ে সন্দেহ রেখোনা।আগামী সপ্তাহে আমার বিয়ে। তোমার আর মোনার দাওয়াত রইলো। দুজনকেই অনেক বকা দিয়েছি ক্লাসে। হয়তো ভাবছো কেনো এসব বলছি? বিয়ের পর ছুটিতে চলে যাবো। তোমাদের সাথে আর দেখা হবেনা। আমার সরকারি চাকরি হয়েছে। পোস্টিং রাজশাহী।
চয়ন মাথা তুলে এহসানের চোখে সরাসরি চোখ রাখলো। মেয়েরা আবেগী। এতটা আবেগী এহসান ভাবতেও পারেনি। চয়নের চোখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। একটি কথাও এহসান বাড়ায় নি। টকের কাপ থেকে টক ঢেলে একটা ফুচকা নিজের মুখে দিলো। উঠে দাঁড়িয়ে চয়নের মাথায় হাত রেখে যাওয়ার সময় বললো,
– আরেকটু বড় হলেও পারতে চয়ন।
ফুচকা দোকানের সামনে হেঁটে চলে গেলো ৷ মোনা দূর্দান্ত আড্ডা জমিয়ে দিয়েছে রফিক মামা এবং ছোটুর সাথে। এহসান হেসে বিল মিটিয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। মোনা এসে দেখে চয়ন কাঁদছে। প্লেটের আটটা ফুচকার জায়গায় সাতটা ফুচকা পড়ে আছে। মোনা চয়নের কাঁধে হাত রেখে বললো,
– স্যার বকা দিয়েছে?
চয়ন মাথা নাড়লো। মোনা ব্যাগ থেকে টিস্যু নিয়ে চয়নের নাকে ধরলো। চোখ মুছে দিয়ে বললো,
– কাঁদিস না।
চয়ন তখন ভেজা গলায় বললো,
– স্যারের বিয়ে আগামী সপ্তাহে। দাওয়াত দিয়েছে আমাকে এবং তোকে।
খুশিতে মোনার চোখ চকচক করে নেচে উঠে বললো,
– ইয়েস, আমি শাড়ি পরবো।
পরক্ষনেই বুঝতে পারলো, এটা তো খুশির নয় মা*রাত্মক দুঃখের খবর। নিজের মাথায় নিজেই গাট্টা মে*রে বলল, মোনা তুই আর শোধরালি না।’
বাবাকে ফোন দিয়ে জানাতেই বুঝতে পেরেছে বাবা মিটিংয়ে। অথচ আজ বাবার উচিত ছিলো মোনাকে নিয়ে বের হওয়া। কিছুক্ষন পার হতেই মনে হলো মোনার জন্মদিন কখনোই পালিত হয়না এই বাড়িতে। রাত পেরোলেই জন্মদিন। বয়স যখন চার বছর সেদিন জন্মদিনের দিনই মাকে হারিয়েছে মোনা। গর্ভবতী অবস্থায় ছাদ থেকে গড়িয়ে পড়া চাট্টিখানি কথা নয়। চোখ ভরে আসলো মোনার। ঠিক তখনই বাবার ফোন।
– আসসালামু আলাইকুম বাবা।
– আম্মা, বাবা তো একটা মিটিংয়ে। বের হতে পারছিনা। জানি আম্মার মন খারাপ, তুমি কি মামার সাথে বের হবে?
মোনা নিশ্চুপ। মিনহাজ মেয়েকে আশ্বস্ত করে বললো,
– আম্মু, শুনো তোমার মায়ের দূর্ঘটনাটি ভুলতে পারবোনা তাই না। আমরা তো সেই হিসেবে পালন করছিনা জন্মদিন। কিন্তু আমার মাকে আমি শপিং করে দিতে চাই। আজ তুমি না গেলে যে আমি ব্যর্থ বাবা হয়ে যাব। তুমি মামার সাথে যাও। বাবা রাতে সারপ্রাইজ নিয়ে আসবো। হ্যাপি?
মোনা দু হাতে চোখ মুছে বলে,
– অনেক বাবা। আই লাভ ইউ।
মিনহাজ হেসে ফোন রেখে দিলো। নয়নকে পাঠিয়ে দিচ্ছে জানিয়ে দিলো।
শপিংমলে এসে মোনা নীচ তলাতে অপেক্ষা করছিলো। নয়নকে দেখে দূর থেকে হাত নাড়ালো। ভাগ্নীর কাছে এসেই জড়িয়ে ধরলো। দুজন ঘুরে ঘুরে অনেক শপিং করলো। এক পর্যায়ে নয়ন ওদের শোরুমে ঢুকলো৷ ভেতরে স্টাফরা ভয়ে তটস্থ। এই শোরুমে গত কয়েকমাস বেশ ঝামেলা হচ্ছে একাউন্টস নিয়ে৷ ধারণানুযায়ী শোরুম প্রোফিটে ছিলো। কিন্তু মাস শেষে হিসেব দেখাচ্ছে লস। গম্ভীর মুখা ইমরান স্বচক্ষে খতিয়ে দেখতে আসবে জানতো নয়ন। তাই এদিকে এলো। নয়নকে দেখে ইমরান চোখ দিয়ে ভেতরে আসার জন্য আহবান জানালো। মোনা ইমরানকে দেখে প্রথমে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। ইমরান লক্ষ্য করেও উপেক্ষা করলো। নয়ন কথা বলছে স্টাফদের সাথে। পরে মোনার মনে হলো, বাবাতো এই শিক্ষা দেয় নি। ইমরানের সামনে গিয়ে সালাম দিলো। ইমরান সালামের উত্তর নিলো। ম্যানেজারের সাথে কথা বলতে বলতেই মোনার মাথায় হাত রেখে বাচ্চাদের মত চুল এলোমেলো করে দিয়ে বললো,
– কেমন আছো সুইট মোনালিসা?
– ভালো আছি ফ্রাংকেস্টাইন।
ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো ইমরান। এতদিন বলতো ইমরান সাহেব আজ বললো ফ্রাংকেস্টাইন! ভারী অদ্ভুত মেয়ে তো। ম্যানেজার তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। ম্যানেজারকে মৃদু ধমক দিয়ে বললো,
– আমার দিকে তাকান। ত্রিশ মিনিট সময় দিলাম। এর মাঝে প্রোফিট এবং লসের পাক্কা হিসেব চাই।
মোনার দিকে ফিরে বললো,
– মোনালিনা ঘুরে দেখো কিছু পছন্দ হয় কিনা।
সামনে থেকে সরে গেলো মোনা। ঘুরে ঘুরে দেখছে। একটা ড্রেস এনে ক্যাশে দিলো। ওরা প্যাকেজিং করতেই মোনা জানালো টাকা দিবে। নয়ন এবং ইমরান দুজনই পেছনে দাঁড়িয়ে দেখছে। মোনা নয়নের দিকে তাকিয়ে বললো,
– মামা আমি টাকা ছাড়া নিবোনা।
নয়ন মেয়েটিকে বিল করতে বললো। বিল হলো দুই হাজার ছয়শ পঞ্চাশ। মোনা ব্যাগ থেকে দু হাজার ছয়শ টাকা বের করলো, বাকি পঞ্চাশ ডিসকাউন্ট করতে চাইলে ব্যাগ খুঁজে পাঁচ এবং দশ টাকার নোট বের করে পঞ্চাশ টাকা দিলো৷ পুরো বিল মিটিয়ে খুশি মনে নয়ন এবং ইমরানের দিকে ফিরে জানালো,
– এটা ফুফির জন্য কিনেছি। এখন শুধু বাবার টা বাকি।
নয়ন প্রশ্ন করলো,
– আপনার তো টাকা শেষ আম্মা।
– না না বাবার টা আছে। তুমি একটু সাহায্য করোনা পছন্দ করতে।
নয়ন হেসে বললো,
– ঠিক আছে করবো।
এর মাঝে ইমরান ম্যানেজারকে কিছু কড়া ডোজ দিচ্ছে বলে ধারণা নয়নের, লেডিস স্টাফকে বকার জন্য। ম্যানেজার হিসেবের খুব বড় একটা গোলমাল করেছে ব্যাপারটা স্পষ্ট। নয়নের পাশ থেকে কখন গেলো টেরই পেলোনা। নয়ন এগিয়ে গিয়ে বললো,
– আমি দেখছি এগুলো। তুই কি একটু মোনাকে নিয়ে ইনফিনিটিতে যেতে পারবি?
সকাল থেকে আজ মেজাজ ভীষণ খারাপ। ইশানের চোখের পানি, পরিচিত গলার আওয়াজ অপরিচিত নাম্বার থেকে সব মিলিয়ে শান্ত মেজাজের ইমরান ও আজ ক্রোধে আক্রান্ত। মোনার কাছে এসে বললো,
– চলো।
নয়নের চোখের পলক ঝাপটে ইঙ্গিত দিতেই মোনা পিছু নিলো ইমরানের। হাতের ব্যাগ গুলো শোরুমে রেখেই রওয়ানা হলো ইমরানের পিছু পিছু। হঠাৎ মোনা লক্ষ্য করলো ওর নাকে স্মুথ একটা সুগন্ধ ভেসে আসছে। বুঝতে অসুবিধা হলোনা। ভালোভাবে ইমরানের দিকে তাকিয়ে দেখলো মেরুন রঙা শার্টে বেশ মানিয়েছে তবে কালো মানুষের একটু লাইট পরা উচিত ছিলো৷ তবুও মোনা আজ বেহায়া দৃষ্টিতে দেখতে থাকলো। মাথায় চয়নের সাথে বলা কথা গুলো ঘুরছে। আংকেল ডাকতে চেয়েও পারলোনা।
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৮
মনে হচ্ছিলো খুব কষ্ট হবে আংকেল ডাকতে। ফোনে কাজ করছে ইমরান। মেইল চেক করছে। অনাকাঙ্ক্ষিত মেসেজ পেয়ে ফোন পকেটে পুরে নিলো। ঘাড় ঘুরিয়ে মোনাকে দেখলো আকাশ রঙা হাঁটু সমান ফতুয়া, মম জিনস, গলায় ওড়না, কাঁধে ব্যাগ প্যাক এবং চুলে উঁচু করে রাবার ব্যান্ডে বাঁধা। ঝুটি করা চুলের দু পাশে ছোট বাচ্চাদের মত দুটো কার্টুনের ক্লিপ ও লাগিয়েছে। এলিভেটরের সামনে এসে দুজনই ভেতরে প্রবেশ করলো।
