প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৮
নীতি জাহিদ
গতদিন উদযাপন করা হয়নি। আজ অফিস ঢুকতেই সারা অফিসে বেলুন, ফেইরি লাইটে সজ্জিত। নয়ন ইমরানকে দেখে ছুটে এসে বলে,
– দোস্ত, ভাইয়ের জন্মদিন টা করতে চাই। প্লিজ।
– ওকে কর। তবে এমন কিছু করিস না যাতে অতিরিক্ত মনে হয়। ভাই এগুলো পছন্দ করেন না।
এতটুকু বলেই ইমরান নিজের কেবিনে চলে গেলো। আজ মিনহাজের আসতে দেরী হয়ে গিয়েছে কারণ মোনাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে এসেছে। বাবা মেয়েতে বোঝাপড়া হয়েছে। মোনা গুড গার্ল হয়ে থাকবে, অন্য কোনো দিকে মন দিবেনা। আর বাবা তার জন্য একটা জমিদার এনে দিবে। মেয়েকে কলেজে নামিয়ে দিয়েই মিনহাজ অফিসে ঢুকতেই জোরে পপার্স ফাটালো সবাই মিলে। বিশাল এক কেকের আয়োজন করেছে এমপ্লয়িরা সবাই। কেক কেটে উদযাপন করা শেষে নয়ন বলে এবার নাচ হবে। মিনহাজ বিষয়টা পছন্দ করেনি। তার এক কথা অফিস এনভায়রনমেন্ট নষ্ট হবে। তখনই ইমরান বলে উঠলো,
– এমন অফিস এনভায়রনমেন্টের প্রয়োজন নেই যেখানে এমপ্লয়িরা খুশী হয়ে সেলিব্রেশন করতে পারবেনা।
মিনহাজ মৃদু হাসলো। নয়নকে ইশারা দিতেই জোরে সাউন্ড বক্সে গান ছেড়ে দিয়েছে। মিনহাজ হাসছে। নয়নের নাচ দেখে ইমরান এক পাশে এসে দাঁড়ায়। হাত পা ছুঁড়ে নাচছে। মিনহাজ নিজেই ক্লান্ত। ডাক্তার ছুটোছুটি করতে বারণ করেছে। এদিকে নয়ন নাচিয়ে ছাড়ছে। নয়ন তার প্রিয় নায়ক সালমান খানের গানের সাথে সাদাফ,তিহান,রাসেল, জোবায়ের সহ সবাইকে নিয়ে লাফাচ্ছে। লাফাতে লাফাতে ইমরান এবং মিনহাজের মাঝখানে এসে হঠাৎ সবাইকে থামিয়ে বললো,
– এই গানের সাথে নাচ ডেডিকেট করতে চাই আমাদের প্রিয় মিনহাজ স্যার এবং ইমরান স্যারকে। কারণ উনারা দুজন সত্যি আমার জীবনে আলাদীনের জ্বীনের মত। আশীর্বাদ স্বরূপ। রেডি স্টেডি গো…
– তু ম্যেরা হুকুম কা ইক্কা
তু ম্যেরা কিরকেট কা ছাক্কা
ম্যে আলাদীন
তু মেরা জ্বীন….
নাচ মেরি জান, হোকে মাগান তু
ছোড় কে সারে কিন্তু পরন্তু।
মিনহাজ হাসছে, অফিসের বাকিরা অনেক এঞ্জয় করছে। আজকে পুরো অফিস এতটাই প্রাণবন্ত ছিলো যে বুঝার উপায় নেই এখানে স্ট্রিক্ট একটা রুলস ফলো করা হতো নয়েজের ব্যাপারে। কখনো উচ্চ আওয়াজে শব্দ করা হতনা, গান বাজনা তো অনেক দূর। মাঝে মাঝে সেলিব্রেশন হিসেবে টুকটাক গিটারে গান হত। তবে সেটা স্বল্প পরিসরে।
মেয়েগুলো ভয়ে একপাশে চলে এসেছে এদের নাচ দেখে। এক পর্যায়ে ইমরান এবং মিনহাজ সরে আসে। মিনহাজ ইমরানের পাশে দাঁড়িয়ে বললো,
– ওর তো হার্ট অ্যাটাক হবে রে ইমরান। এমন নাচতেছে কেনো?
নাচতে নাচতে সাদাফ একপাশে এসে দাঁড়ায়। দূর থেকে স্যারদের সাথে সাদাফকে দেখে রিমি, চৈতি এবং তামান্নাও এগিয়ে এসেছে। সেদিনের পর স্যারের সাথে তেমন আলাপ হয়নি। মিনহাজের প্রশ্নের উত্তরে ইমরান প্রতিউত্তর করলো,
– বাসায় যে পরিমান নাচে আর রিক্তাকে নাচায় ওর এতে অভ্যাস আছে। আমার ভয় হচ্ছে হাত পা না খুলে যায়।
সাদাফকে পাশে দেখে মিনহাজ ধন্যবাদ জানালো। ইমরান মুচকি হাসি দিয়ে সাদাফের কাঁধে হাত দিয়ে বললো,
– ওয়েল ডান, আপনার গান টা ভালো ছিলো। মাঝে মাঝে কাজের ফাঁকে আনন্দটাকে খুঁজে নেবেন। কাজটাকে উপভোগ করতে পারবেন।
সাদাফ খুশী হয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে বললো,
– অবশ্যই স্যার। আমার সৌভাগ্য আমি আপনাকে গান শোনাতে পেরেছি। দোয়া করবেন আমার জন্য।
ইমরান মাথা ঝাঁকালো। রিমি আগ বাড়িয়ে এসে হাত সামনে দিয়ে বললো,
– স্যার আমি রিমি।
বাকিরা থতমত খেয়ে গেলো। ইমরান ভ্রু কুচকে খানিকটা হেসে বললো,
– আসসালামু আলাইকুম।
রিমি লজ্জা পেয়ে হাত সরিয়ে বললো,
– স্যরি স্যার আসলে, পরিচিত হইনি তো তাই। আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো এই কালচারে…
– মিস. রিমি রাইট!
– ইয়েস স্যার।
– আমি এই কালচারে অভ্যস্ত না। আমার পরিবারে সেই প্রাচীন যুগ থেকে সালাম প্রচলিত, আর ছেলেদের ক্ষেত্রে কোলাকুলি। এখনো আমার পরিবার তাতেই অভ্যস্ত। আই ক্যান গিভ আ সাজেশন ঠু ইউ ডোন্ট গিভ ইউর হ্যান্ড ঠু ঠাচ এনি মেল বিকজ ইউ আর সামওয়ান’স এসেট। ওকে!
– ওকে স্যার।
তামান্না, চৈতি অবাক হয়ে দেখছে। তামান্নার কানের কাছে ফিসফিস করে চৈতি বললো,
– মানুষটা ভালো রে।
– ভালো ঠিক আছে, ভদ্র। জেন্টেলম্যানও । বাবা, ভাই ম্যাটেরিয়াল। রিমিটার স্বভাব ঠিক হলোনা।
– ও তো এরম ই। আজকে শেখাতে হবে কিছু। ধমক না দিলে শুধরায় না এই মেয়ে।
মেয়েটার হাতে সুঁই। বোতাম লাগাচ্ছে শিপমেন্টের প্রোডাক্টে। বাচ্চা নিয়ে কখনো ফ্যাক্টরিতে আসে নি এর আগে। আজ মা গিয়েছে এক বাসায় কাজ করতে, তাই বাচ্চা নিয়ে ফ্যাক্টরিতে এসেছে ঝুমুর। বাচ্চা কাঁদছে বেশ কিছুক্ষন হলো। সাত মাসের বাচ্চা। এদিকে ঝুমুরের হাতের কাজটা শেষ করা জরুরি। শিপমেন্টের প্যাকেজিং হচ্ছে। ফ্যাক্টরি ভিজিটের জন্য হেড অফিস থেকে স্যার/ম্যাডামেরা এসেছে। উনারা বলেছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ শেষ করতে। কিছুক্ষন আগে হালিমা আপাকে বলে একটু দূরে গিয়ে বাচ্চাকে খাইয়ে দিলো। এরপরো কাঁদছে। হয়তো পেট ভরেনি।
সাদাফদের টিম আজ ফ্যাক্টরি ভিজিটে এসেছে। গতবারের শিফমেন্টে নয়ন স্যার খুব করে অপমান করেছে। ভালো ভাবে রিচেক না করার জন্য। জিপার প্রবলেম ছিলো কয়েকটা প্যান্টে। আজ তাই প্রতিটি পোশাক, এক্সেসরিস ঘুরে ঘুরে চেক করছে। রিমি কাকে যেন ধমক দিচ্ছে দেখে ওরা এগিয়ে গেলো। তামান্না এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,
– কোনো সমস্যা?
রিমি রেগে বললো,
– বাচ্চা নিয়ে এরা কেনো আসে ফ্যাক্টরিতে? দেখ ফ্লোর ভিজিয়ে ফেলেছে বাচ্চাটা। আমি পা দিয়েছি ওখানে।
ঝুমুর ছলছল চোখে এক বালতি পানি এনে ফ্লোর মুছে রিনির জুতা মুছে দিচ্ছে। সাদাফ রিমিকে ধমকে বললো,
– হতেই পারে ভুল। এমন কেনো করছিস? বাচ্চা মানুষই তো।
রিমি তেজী গলায় বললো,
– আমি বাচ্চার দোষ দিচ্ছিনা। দোষ তো মায়ের। ডায়াপার পরাতে পারেনি? আমি আজই নয়ন স্যারকে জানাবো। বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে এরা কেনো আসে ফ্যাক্টরিতে?
ঝুমুর ওড়নায় চোখের পানি মুছে বললো,
– ম্যাডাম গরীব মানুষ এত ডায়াপার তো কিনতে পারিনা। আর বাচ্চা কাইন্দা দেয় পরাইলে। এলার্জি হয়। একটা আছে ব্যাগে ওইটা পরায় দিতাছি। সারাদিন থাকবে বইলা পরাই নাই। এমন ভুল হইবোনা মাফ কইরা দেন। বড় সাবরে বইলেন না ম্যাডাম।
তিহান, চৈতি ক্ষে পে গিয়েছে রিমির ব্যবহারে। সবার সামনে কিছু বলছেনা। রিমি পুনরায় ধমকে বললো,
– এখন যে এত সময় নষ্ট করলে? এগারোটা বেজে যাচ্ছে। এরপর বলবে লাঞ্চ টাইম। শিপমেন্ট তিনটায়। কাজ শেষ করবে কে? কত কাজ বাকি এখনো।
হালিমা এগিয়ে এসে জানালো সে করে দিবে। হালিমাকেও ধমকে দিলো রিমি। বাচ্চা তখন হালিমার কোলে। ভয় পেয়ে বাচ্চা আরো জোরে চিৎকার দিলো।
কেউ একজন বলে উঠলো,
– বাচ্চাকে ডায়াপার পরান।
গুরু গম্ভীর ভারী গলার স্বর শুনে সকলে পেছনে ফিরে দেখে চেয়ারম্যান স্যার। একসাথে সালাম দিলো। ঝুমুর থরথর করে কাঁপা শুরু করলো। হালিমা সহ বাকি শ্রমিকরা আঁৎকে উঠলো। থমকে গেলো সবার কাজ। ঝুমুর হাতের বালতি রেখে হালিমার কোল থেকে বাচ্চাকে নিয়ে যাবে তখন পুনরায় স্যারের গলা,
– ব্যাগে বেবি পাউডার থাকলে আগে সেটা লাগান এরপর ডায়াপার পরান। এতে বাচ্চার এলার্জির প্রবলেম কম হবে।
সৌভাগ্যক্রমে ব্যাগে পাউডার ছিলো। বাচ্চাটা ঘামায় তাই রাখা। তড়িঘড়ি করে ঝুমুর জামা পালটে ডায়াপার পরিয়ে দিলো একটু সাইডে গিয়ে। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই কাজ শেষ। এর মাঝে নয়ন এবং মিনহাজ উপস্থিত হলো। এদের দেখে রিমির সাহস বেড়ে গেলো। জোর গলায় বললো,
– স্যার আমি এতক্ষন এই কারণে বকছিলাম এই মহিলাকে। কেনো বাচ্চাকে নিয়ে কাজে এসেছে। কতখানি সময় হ্যাম্পার হলো আমাদের।
ইমরান ঘাড় ঘুরিয়ে রিমির দিকে তাকালো। অনেকটাই শীতল চোখে। এই চোখ যেন বলছে চুপ করতে, নতুবা এক্ষুনি খারাপ কিছু হবে। নয়ন এবং মিনহাজকে পুরো ঘটনা এখানকার স্টোর এক্সিকিউটিভ জুয়েল জানিয়েছে। দুজনই ভীতসন্ত্রস্ত। ঝুমুর বাচ্চা নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে বলে,
– স্যার আর এমন ভুল হইবোনা। মাফ কইরা দেন। বাসায় কেউ নাই আজকে। আম্মাও কামে গেছে…
আরো কিছু বলতে চেয়েছিলো মেয়েটা, ইমরান হাত দিয়ে থামিয়ে বলে উঠিলো,
– খাইয়েছেন বাচ্চাকে?
ঝুমুর উপর নিচ মাথা নাড়ে। আস্তে করে বলে,
– পেট ভরেনাই মনে হয়, তাই কানতেছে।
– ব্যাগে বাচ্চার খাবার আছে?
ঝুমুর চোখ মুছে ‘হ্যাঁ’ মাথা ঝাঁকায়।
– নিয়ে আসুন।
হালিমা ঝুমুরের ব্যাগ হাতিয়ে একটা দুধের ফিডার পায়। ওটাই এগিয়ে দেয়। ইমরান সবাইকে চমকে দিয়ে ঝুমুরের কোল থেকে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে, হালিমার হাত থেকে ফিডার নিলো। উপস্তিত সকলের চক্ষু ছানাবড়া। এ যেন কোনো এক অভূতপূর্ব ঘটনা যা কেউ কখনো শুনেনি, কখনো দেখেনি এবং ভাবনাতীত। সবাইকে মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে বলে বাচ্চার দিকে ফিরে বললো,
– চলুন আম্মু,আমরা খেয়ে অনেক খেলা করবো। মা কাজ করুক। আজকে আপনি আংকেলের সাথে সময় কা টাবেন।
বাচ্চা মেয়েটার গালে আদুরে চুমু দিয়ে সোজা নিজের কেবিনের দিকে হেঁটে চলে যাচ্ছে। ঝুমুর ওড়নায় মুখ চেপে কেঁদে দিলো। এত ভালোবাসা মেয়েটা আশা করেনি। নয়ন এবং মিনহাজ একে অন্যের দিকে তাকিয়ে সেরা হাসিটাই দিলো। এইতো তাদের ইমরান। ভালোবাসার ইমরান। সারাজীবন সবাইকে আগলে রেখেছে। জাত,দল,গোত্র কোনো কিছুতেই ভেদাভেদ দেখা যায়নি মানুষটার মাঝে। সে ও তো একজন বাবা। সন্তান লালন শিখতে চাইলে তার কাছ থেকে শেখা যাবে। অবাকের কিছু নেই।
সাদাফ,তিহান,চৈতি ও রিমি বিস্মিত। সাদাফ মুখ ফুটে রিমিকে উদ্দেশ্য করে একটাই কথা বললো,
– আর যাই হই না কেনো আমরা মানুষ হতে পারলাম না। ধিক্কার নিজেদের জন্য।
সামনে থেকে কাজ দেখতে চলে গেলো। শ্রমিকদের মুখে মুখে গর্বের হাসি। তাদের মালিক এত ভালো! অথচ সেদিন কত বড় ভুল করতো যদি কাজে না ফিরতো। শেষ মুহুর্তে সবাই কাজে ফিরেছিলো। মালিক সেদিন সবাইকে দুপুরে বিরিয়ানি খাইয়েছে,মিষ্টি খাইয়েছে। ভাগ্য করে এমন মালিক পাওয়া যায়। তাদের তিনটা মালিকই মাটির মানুষ। নয়ন স্যার আর মিনহাজ স্যারের কাছে মাফ চেয়েছিলো আঘাত করার জন্য। আজকের ঘটনাটা দেখার মতো ছিলো।
ইশানের কোচিং থেকে ফোন এসেছে। প্রথমে ইমরান ঘাবড়ে গিয়েছিলো পায়ের ব্যাথাটা বেড়েছে কিনা ভেবে! পরে ধারণা বদলে গেলো কোচিংয়ের বড় ম্যাডামের কথায়। কিছুটা ভাবুক ভঙ্গিতে কথা বলে ইমরান আসছে জানিয়েছে।
নয়ন এবং মিনহাজের কাছে দায়িত্ব সঁপে দিয়ে বেরিয়ে পড়লো। ঝুমুরের কাজ শেষ হয়নি। খাইয়ে ইমরান ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে শিশুটিকে। ইমরানের রুমেই ঘুমাচ্ছে। যাওয়ার সময় ঝুমুর বেরিয়ে আসলো ইমরানের সামনে। হাত জোর করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। পা ছুঁয়ে সালাম করতে যাবে দু কদম পিছিয়ে গেলো ইমরান। ঝুমুরকে কড়া করে বললো,
– পায়ে হাত দেয়া আমার পছন্দ নয়। এই কাজ কখনোই করবেন না।
– স্যার আমি আপনার থেকে অনেক ছোট, আপনার মেয়ের মতো। আপনি কইরা বইলেন না।
ইমরান হালকা হেসে মাথায় হাত রেখে বললো,
– ঠিক আছে, ভালো থাকো। একটু পর পর যেয়ে মেয়েকে দেখে আসবে। আমি গায়ে টাউল জড়িয়ে দিয়েছি। এসির টেম্পারেচার নরমাল আছে।
ঝুমুর মাথা কাত করেই কাজে চলে গেলো। তিহান রিমিকে বললো,
– মাথা ঠান্ডা আছে যা মাফ চেয়ে নে।
সাদাফ রিমির হাত ধরে যাওয়া আটকে বলে,
– আজ নয়, কাল বলিস। মুড টা ঝুমুরের জন্য ভালো তোর জন্য নয়।
বাকিরাও মত দিলো। শুকনো ঢোক গিললো রিমি।
কোচিংয়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে বারোটা। বাচ্চাদের ছুটি একটায়৷ ইশান বাংলাদেশী পরিবেশে এডজাস্ট হতে পারছেনা। তাই ভালো স্কুলে ভর্তির আগে নামকরা কোচিং এ দিয়েছে ইমরান, যাতে করে ঘাটতি গুলো ঠিক করে নিতে পারে। কোচিং এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালিকার সাথে বেশ কিছুক্ষন কথা বলে জানতে পারলো এক ছেলে অভিযোগ করেছে ইশানের নামে। ম্যাডাম ওই ছেলের অভিভাবকদের ডাকলেন। ছেলেরাও এসেছে। ইশান চুপচাপ বাবার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ইমরান ছেলেকে দেখে কিছুটা শঙ্কিত হলো। ছেলের চেহারা খানিকটা মলিন। ইমরান ছেলেকে আগলে ধরে কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
– প্রিন্স মন খারাপ কেনো?
ইশানের চোখ ছলছল। আস্তে করে বলে,
– গালি দিয়েছি আফনানকে?
ইমরান জিহবায় কামড় দিয়ে ছেলেকে বুঝালো ছিঃ। ঠোঁট উলটে প্রশ্ন করলো,
– বেশি পঁচা গালি? কি গালি?
– ইউ ব্লাডি ফুল।
– এটা ঠিক হয়নি প্রিন্স।
– স্যরি, পাপা।
– কিন্তু আমি অন্যকিছু ভেবেছিলাম।
ইমরান মুচকি মুচকি হাসছে। ইশান বাবার দিকে কৌতুহল চোখে তাকিয়ে আছে। ভ্রু কুচকে ভাবছে, বাবা কি ভাবলো! ইমরান ছেলেকে আরেকটু কাছে টেনে বলে,
– আমি ভেবেছি কোনো মেয়েকে আই লাভ ইউ বলেছো।
– পাপা…
ইশান লজ্জ্বায় রঙিন হয়ে গিয়েছে। এদিকে বাবা-ছেলের খুনশুটি দেখছে অন্যরা। বুঝতে পারছেনা কি নিয়ে এদের মাঝে আলাপ চলছে। তবে দেখতে সুন্দর লাগছে। পরিচালিকা ম্যাডাম গলা ঝেড়ে বললেন,
– মি. ইমরান। দেখুন আমরা তো বাচ্চাদের ম্যানার যতটা সম্ভব শেখাই। তবে পরিবার শিক্ষার প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান। বাচ্চারা যদি পড়তে এসে গালি দেয় ব্যাপারটা খুবই দুঃখজনক। জানি ইশানের মায়ের সাথে আপনি সেপারেশনে আছেন, সিংগেল ফাদার। তবুও যদি একটু দেখতেন ব্যাপারগুলো। এভাবে হলে তো ইশানকে আমরা রাখতে পারবোনা। এছাড়া ওকে নিয়ে অনেক হিমশিম খেতে হচ্ছে শিক্ষকদের। ভালো কোনো স্কুলে ভর্তি করাতে পারবেন না।
ইমরান মাথা নিচু করে বসে আছে। ইশানের চোখ ভেঙে কান্না পাচ্ছে। এই প্রথম পাপাকে কেউ তার জন্য এভাবে অপমান করছে। খারাপ মহিলাটার কথাও উঠিয়েছে পাপার সামনে। সে তো কিছু করেনি। ওর টিফিন জোর করে খেয়ে ফেলেছে তাও কিছু বলেনি, চুল টেনে দিয়েছে, মিডেল ফিংগার দেখিয়েছে, বাজে কথাও বলেছে, তারপর ও নিশ্চুপ ছিলো। শুধু হোমওয়ার্ক ছিড়ে ফেলাতে গালি দিয়েছে। সে বাংলা পারেনা। প্রতিদিন অফিস থেকে আসার পর পাপা বাংলা পড়ায়। ওইটুকুন সময় তার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই অন্য হোমওয়ার্ক ছিঁড়লে এত কষ্ট পেতো না বাংলা ছেঁড়াতে যতটা কষ্ট পেয়েছে। ওর এক মুহুর্তের জন্য মনে হয়েছিলো পাপার সব কষ্টে পানি ঢেলে দিয়েছে আফনান। যদি সে বাংলা পারতো কখনো পাপাকে ক্লান্ত শরীর নিয়ে তাকে পড়াতে বসতে হতোনা। বাইরের টিচার ও পাপা পছন্দ করছেনা। নিজের মত করেই ছেলেকে গড়ছে। যার জন্য পাপা এত কষ্ট করছে আজ তার জন্য অপমানিত হতে হচ্ছে। ইশান দু হাতে মুখ ঢেকে শব্দ করে কেঁদে দিলো। কান্নার শব্দ পেয়ে ইমরান ঘাড় ঘুরিয়ে ভয় পেয়ে গেলো। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলে,
– আব্বা, তাকাও আমার দিকে কিছু হয়নি জান। ইশান, ও বাবা।
কেঁদে কেঁদে বলছে,
– পাপা আ’ম স্যরি। আমি ইচ্ছে করে করিনি। আমাকে মাফ করে দাও।
বুকের সাথে ইশানের মাথা চেপে ধরে রেখেছে ইমরান। আফনানের অভিভাবকদের দিকে তাকিয়ে বললো,
– ভাই আমি সত্যি জানিনা কি হয়েছে। আমি দুঃখিত সব কিছুর জন্য। আমার ছেলেটা ম্যানারলেস নয়। ম্যাডাম ছেলেটা না বুঝে গালি দিয়েছে।
ইশান কাঁদতে কাঁদতে বলে,
– পাপা আমি এখানে পড়বোনা। আমাকে অন্য কোচিং এ দাও। যেখানে কেউ আমাকে মা/রবেনা, টিফিন ফেলে দিবেনা,হোমওয়ার্ক ছিড়ে ফেলবেনা এমন জায়গায়। তাহলে আমিও ভুলে তাদের গালি দিবোনা।
– ঠিক আছে প্রিন্স বাসায় গিয়ে কথা বলবো।
ম্যাডাম হঠাৎ করে বললেন,
– ইশান তোমার টিফিন ফেলে দেয়, মা*রে,খাতা ছিড়ে ফেলার মানে কি?
ইশান চুপ। আফনান ও চুপ। ম্যাডাম অন্য একটা ছেলেকে ডেকে পাঠালেন। সে এসে পুরো ঘটনা বলার পর সবাই নিস্তব্ধ। এখন ম্যাডামের মনে হলো ইশান নামক ছোট্ট ছেলেটা চুপ থেকে সকলের সামনে তাকে অপমান করেছে। মি. ইমরানকে স্যরি বলার উপায় জানা নেই তার। ইমরান ছেলেকে বুকে আগলে সবার সামনে বললো,
– ম্যাডাম সবাই তো ছোট। সমস্যা নেই যা হওয়ার হয়েছে। ইশান নিজেও স্যরি বলেছে। এখন আমিও বলছি। আমি চাইনা ইশানের জন্য বাকি বাচ্চাদের সমস্যা হোক। ও কাল থেকে আর আসবেনা।
ইশান পাপার গলা জড়িয়ে গালে চুমু দিলো। সবাই দেখছে এই দৃশ্য। অনুমতি নিলো ম্যাডাম এবং বাবার কাছে বন্ধুদের সাথে দেখা করার। ইশান দরজা দিয়ে বের হওয়ার পর ইমরান কিছুটা গম্ভীর হয়ে বললো,
– ম্যাডাম আপনারা যেই গালির কথা বললেন আমার ছেলে এই গালি জানেই না। আমিও আজ প্রথম জানলাম যে ইউ ব্লাডি ফুল এর বাংলা বোকা***। থাক গালি তো গালিই। সেটা ইংরেজি কিংবা বাংলা। তবে আমি নিশ্চিত, আফনান গালিটা যেখান থেকেই শিখুক না কেনো ভবিষ্যতের জন্য ভয়ানক। ইশান কেঁদেছে কেনো জানেন? ওর পাপা আজ মাথা নিচু করেছে তাই। আমার ছেলে আমার অহংকার, অলংকার। কয়টা সন্তান এই বয়সে পাপার শরীর খারাপ হলে সেবা করে। অফিস করে বাড়ি ফিরতে হয় বেশ রাতে। বাংলা হোমওয়ার্ক করাই। এরপর ঘুমাতে যাওয়ার সময় ও প্রতিরাতে আমার চুলে হাত বুলিয়ে আমাকে ঘুম পাড়ায়। ওর বাংলা হোমওয়ার্ক ছেঁড়াতেই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলেছে। কারণ ওর ধারণা পাপা অনেক কষ্টে অফিস করে এসে বাংলা করায়। বলুন তো আমার সেই ছেলে কাউকে কিভাবে গালি দিতে পারে? স্যরি ম্যাডাম আসি।
ইমরান ইশানের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। ম্যাডাম লজ্জায় মাথা নামিয়ে ফেললেন। ইশান রবিনের সাথে মাঠে দাঁড়িয়ে আছে। এখনো চোখ ফোলা। বাবার দিকে তাকাচ্ছেনা। ছেলের হাত ধরে বললো,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৭
– প্রিন্স ফুচকা খাবে?
ইশান প্রাণ খোলা হাসি দিলো। আজ বাবা আনহাইজেনিক ফুচকা খাবে কিনা নিজ থেকে জিজ্ঞেস করেছে। ঝলমলে সেই হাসি। ইমরান ও সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো এখানে ছেলেকে আর পাঠাবেনা। নিজেই পড়িয়ে ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিবে। যাচাই না করেই এভাবে বাচ্চাকে হেনস্তা করার কোনো মানে হয়না। সারাদিন বাইরে থাকে সে, দেশে আসার পর খুব একটা সময় ছেলেকে দিতে পারছেনা। বন্ধু পেয়েও যদি ছেলেটা খুশি না থাকে তাহলে এমন জায়গায় না পড়ানোই ভালো।
