প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৭
নীতি জাহিদ
সানগ্লাসের আড়ালে প্রতিটি কাজই পর্যবেক্ষন করছে ইমরান। আইসক্রিম খেতে খেতে নাকে আর গালে লাগিয়েছে। হাত দিয়ে মুছতে গিয়ে হাত ও ভরিয়ে ফেলেছে। এমন অমনোযোগী হয়ে খেলে লাগাটাই তো স্বাভাবিক সাথে আবার ইমরানকে টিজ করতে ছড়া বলছে। খানিকটা হাসি পেলো ইমরানের। এই বয়সে অনেক মেয়েই বাচ্চা সামলায় অথচ এই মেয়েকে সামলাতেও একজন লাগে। হওয়াটাই স্বাভাবিক মোনার গ্রুমিংটা করছে বাবা। একজন মা যা পারে বাবা অবশ্যই ততটুকু করতে পারবেনা। ছেলে সামলানো যতটা সহজ বাবাদের পক্ষে, মেয়ে সামলানো ততটাই কঠিন। ল্যাপটপের পাওয়ার অফ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে সানগ্লাসটা খুলে মোনার দিকে সরাসরি তাকালো। মোনা আইসক্রিম খাওয়া ততক্ষনে শেষ। ইমরান রবিনকে ডেকে বললো টিস্যু বক্স দিতে। দুটো টিস্যু নিয়ে মোনার দিকে বাড়িয়ে বললো,
– মুখ মুছে নাও মোনালিসা।
টিস্যু হাতে নিয়ে মোনা মুখ মুছে নিলো। ইমরান আরেকটা টিস্যু নিয়ে নাকের গোড়া মুছে দিয়ে বললো,
– খাওয়াটাও শিখলে না।
মোনা ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে বললো,
– এত শিখে কি কাজ, বাবা খাইয়ে দেয়। ফুফি খাইয়ে দেয়।
ইমরান কথা বাড়ালো না। আবার কোন বেফাঁস কথা শুনতে হয়। হঠাৎ মোনা ইমরানের দিকে ফিরে বলে,
– ইমরান সাহেব নাও উই আর ফ্রেন্ডস, রাইট!
– আবার?
– আপনি রাগ করেন আর যাই করেন আমি আপনাকে এই নামেই ডাকবো। প্রয়োজনে যুদ্ধ ঘোষণা করবো।
ইমরান মোনার কথা বলার ভঙ্গি দেখে হেসে ফেললো। সংযত করে নিলো নিজেকে। মোনা পুনরাবৃত্তি করলো কথা,
– আমার বেস্ট ফ্রেন্ড তো বাবা আর ফুফি কিন্তু এই কথা কাউকে বলতে পারবোনা। তাই আপনাকে বলি?
মেয়েটা সামান্য একটা কথা বলার আবদার করেছে, মায়া হলো ইমরানের। নিজ থেকে বলতে চাইছে ভেবে ইমরান সায় দিলো মাথা নেড়ে। বলা শুরু করলো তরুনী,
– নাম বলবোনা কিন্তু আমার পরিচিত একজন, আমার অপছন্দের স্যারকে পছন্দ করে। এখন তাদের মধ্যে বিয়ে হলে কি খারাপ হবে?
ইমরান ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো? হঠাৎ গাড়ি ব্রেক কষলো। সামনে ঝুঁকে গেলো তিনজনই। আকস্মিক ব্রেকের জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলোনা। রবিন এই প্রশ্ন শুনে বেক্কল হয়ে ইমরানের দিকে তাকালো। ইমরান মুখের ভাষা হারিয়ে ভাবলো কি প্রশ্ন এটা? আগা-গোড়া, মাথা-লেজ বিহীন প্রশ্ন। রবিনের ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা দেখে মোনা বাচ্চা ধমক দিয়ে বলে,
– এ্যই কালো গাড়ির পাইলট। পারসোনাল কথা বলছি দেখছেন না। থামালেন কেনো? গাড়ি চালান।
ইমরান ইশারা দিলো রবিনকে। মোনা ইমরানকে হাতে আলতো ধাক্কা দিয়ে বললো,
– আহহা! বলুন না ইমরান সাহেব? খারাপ হবে?
ইমরান শূন্য মস্তিষ্কে প্রশ্ন করলো,
– মোনালিসা আমি তোমার প্রশ্নই বুঝিনি।
– ওকে, ক্লিয়ার করছি। আমার বান্ধবী আমার একজন স্যারকে পছন্দ করে, কিন্তু স্যারকে আমি অপছন্দ করি। এখন তাদের বিয়ে হলে কি খারাপ হবে?
– নাতো খারাপ কেনো হবে। বিয়েটা বান্ধবীর সাথে হবে, তোমার পছন্দ বা অপছন্দের প্রশ্ন তো আসছেনা। বাসায় প্রস্তাব দিতে বলো। আর বিয়ের জন্য নিতান্তই ছোট তোমরা।
– আরেহ সেখানেই তো গলদ। স্যারের বয়স ত্রিশ। কত্ত বড়। বাসায় তো মানবেনা।
চোখ বড় বড় হয়ে গেলো ইমরানের। ধমক দিতে যেয়েও নিজেকে সংবরণ করে বললো,
– মোনালিসা লিভ দোজ ফ্রেন্ডস। ওরা পঁচা।
– না ও অনেক ভালো। শুধু মনে মনে পছন্দ করে। স্যার জানেনা।
কাকে কি বুঝাচ্ছে! আবার বলে, শুধু মনে মনে পছন্দ করে। এই মেয়ে যদি বুঝতো যে এই কথা বলে ঘোর বিপদ ডেকে এনেছে সে কি আর এত বড় ভুলটা করতো? ইমরানের মনে হলো মিনহাজের সাথে এই ব্যাপারে কথা বলা প্রয়োজন। তাই মোনাকে এই প্রসঙ্গে থেকে বের করে অন্য কথা বলতে শুরু করলো।
মিনহাজের বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছে। মায়া দরজা খুলেই ইমরান আর মোনাকে একসাথে দেখে হতবাক। দরজা থেকে সরে গিয়ে ঢুকতে দিলো। মোনা লাফিয়ে লাফিয়ে ঘরে ঢুকলো জুতা নিয়ে। এর মাঝে নুরজাহান বেগম বকা শুরু করেছে, তার ঘর নোংরা করে ফেলেছে। বসার ঘরে তার অনেক পছন্দের একজন মানুষকে দেখে চেঁচিয়ে উঠলো খুশিতে,
– ছোট দাদু।
মানুষটা দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো মোনাকে। মামুন সাহেব হাসছেন। মিনহাজ একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। ইমরানকে দেখে চমকে গেলেও চুপ করে আছে। চোখ দিয়ে আশ্বস্ত করলো ইমরান। সামনে দাঁড়ানো ইমরানকে দেখে মিজানুর রহমান হালকা হাসলেন। মোনা একপাশে সরে এলে জড়িয়ে ধরলেন ইমরানকে। অনেকক্ষন জড়িয়ে ধরার পর মিজান একটাই কথা বললো,
– কিছুক্ষন আগে শুনেছি তুই এসেছিস। আমাকে জানাস নি রাগ করিনি তবে এখন তোকে পেয়ে মনে হলো হাতে আকাশের চাঁদ পেলাম।
ইমরান লজ্জা পেয়ে বললো,
– আংকেল স্যরি।
মামুন সাহেবের ছোট ভাই মিজান। এই মানুষটা ইমরানকে বড্ড ভালোবাসে। কেনো বাসে তার কোনো কারণ নেই। যথেষ্ট শ্রদ্ধা করে ইমরান তাকে। সোফায় বসলো ইমরান, মিজান সাহেবের পাশে। মামুন সাহেব ইমরানকে প্রশ্ন করলেন,
– আমার দাদু ভাইকে কোথায় থেকে ধরে আনলে ইমরান? আর হাতের ফুল কার জন্য?
ইমরান স্বাভাবিক স্বরেই বললো,
– একজন বিশেষ কারো জন্য। ফুল কিনতে গিয়েই দেখা মোনালিসার সাথে।
মোনা ততক্ষনে মায়ার হাতে গাজরা পরিয়ে নিজেও পরে সোফার উপর বসে আছে। মায়া খানিকটা হেসে বললো,
– যাক আপনাদের মিটমাট হলো দেখে ভালো লাগছে।
মিনহাজের মুখ এখনো গম্ভীর। সোফা থেকে উঠে বাবার পাশে গিয়ে বাবার কোল ঘেঁষে বসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– প্রিন্সেস কষ্ট পাচ্ছে, কিংয়ের উচিত রাগ ভেঙ্গে প্রিন্সেসকে খাইয়ে দেয়া। কিছু খায়নি প্রিন্সেস আজ টিফিনে।
রাগ ধরে রাখতে পারেনি। মায়াকে চোখ দিয়ে বুঝালো খাবার নিয়ে আসতে। ড্রইং রুমে সবাই গল্প করছে, হাসছে। ইমরান গম্ভীর হয়ে বসে আছে। মোনাকে খাইয়ে দিয়ে রুমে পাঠিয়ে দিলো মিনহাজ। আড়ালে মিনহাজকে ডেকে নিয়ে ইমরান ঘটনা খুলে বললো ফুল দোকানের এবং বান্ধবীর। মিনহাজ বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলো। এই মেয়ের এত দূরন্তপনায় চিন্তারা ঘিরে ধরেছে মিনহাজকে। ইমরান কাঁধে হাত দিয়ে বলে,
– সময় দাও। বড় হচ্ছে তো। বয়সটা কিন্তু ভালোনা। বকা দিও না কৌশলে বুঝিয়ে দিও।
মিনহাজ মলিন স্বরে বললো,
– ভয় তো সেখানেই। কখন কি করে বসে। কোন লোকের পাল্লায় পড়বে আল্লাহ জানে। সেদিন বলে, ‘বাবা আমার জমিদারদের ভালো লাগে। মোগল সাম্রাজ্যের সম্রাটরা কি সুন্দর বিয়ে করে বউদের জন্য নিজের জান কুরবান করতো।’ আমি তো চমকে গেলাম। আল্লাহ জানে কোন সম্রাট জান কুরবান করছে? ওর নাকি মমতাজ হওয়ার ইচ্ছা।
ইমরান আশ্বস্ত করে বলে,
– একেবারে পাক্কা বাচ্চা মানুষ। ভাগ্যিস মমতাজই হতে চেয়েছে ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ হতে চায় নি। এই ইনফ্যাচুয়েশন কেটে যাবে। চিন্তা করোনা।
– আর যদি না কাটে?
– কোনো রাজা/বাদশা দেখে বিয়ে দিয়ে দিবে।
– কোথায় পাবো?
– এখানেই দ্য ইন্ড। যা পাবেনা তা নিয়ে সময় নষ্ট বোকামি। ‘ইমপসিবল, ই-ল্যজিকেল’ থিংকস ক্যান নেভার বি আ ম্যাটার অফ থট। সো লিভ ইট।
বাড়িতে নতুন ইউনিটের কাজ ধরেছে মিনহাজ। ইমরানকে তাই দেখানোর জন্য তিনতলায় উঠেছে। ফোন আসাতে একপাশে গিয়ে কথা বলছে। অন্যদিকে ইমরান নতুন ফ্ল্যাটের প্ল্যান দেখছে ঘুরে ঘুরে। ইট,বালি,সিমেন্ট সব কিছু ছড়ানো ছিটানো। অসাবধানতায় পড়ে ব্যাথা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। পেছন দিয়ে মোনা এসে ভয় লাগালো।
– ভাউ…
ইমরান তো ভয় পেলোনা উলটা মোনা পড়ে যেতে গেলে ইমরান ধরে ফেলে। ধমকে বললো,
– এখন পড়লে হাত পায়ে ব্যাথা পেতে না। এত দুষ্টুমি কেনো করো?
– আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে তাই।
ইমরান কিছু না বলেই ঘুরে ঘুরে সদ্য ইট বসানো রুম দেখছে। এই ইউনিট মিনহাজ মোনার জন্য রেডি করছে। নিচে সবাই মিলেমিশে থাকলেও মিনহাজের ধারনা নুরজাহান বেগম এবং সালমা মোনাকে পছন্দ করেন না। তাই এই ইউনিট করার পরিকল্পনা করেছে। সকলকে বুঝিয়ে মেয়েকে নিয়ে উপরে চলে আসবে কাজ শেষ হলে। নুরজাহান বেগমের ধারণা মোনার জন্যই মিনহাজ দ্বিতীয় বিয়ে করেন নি। সেই ক্রোধ প্রায়শই প্রয়োগ করেন নাতনীর উপর।
– ইমরান সাহেব, আপনাকে আমাদের ছাদ বাগানের অলকানন্দা দেখাবো আসুন।
কথা শেষ করে ইমরানের হাত ধরে হলুদ অলকানন্দা গাছের কাছে এনে একটা ফুল ছিড়ে নিজের কানে গুঁজলো। কথার ঝুড়ি ফুটিয়েছে। ঢিলেঢালা একটা কালো ‘ গুড গার্ল’ লিখা টি-শার্ট, ডেনিম ট্রাউজার পরেছে। গলায় স্কার্ফ ঝুলছে। উঁচু করে ঝুটি বাঁধা চুলে শালীনতা বজায় রাখলে ইমরানের আজ মোনার পোশাক বেশ দৃষ্টি কটু লাগছে৷ বাড়ন্ত বয়স, চোখে লাগাটা স্বাভাবিক। এর মাঝে মোনা বলে উঠলো,
– সুন্দর লাগছেনা আমাকে?
উত্তর দিলোনা। কিন্তু অজানা রোষ চাপলো মনে। এভাবে বাইরে ঘুর ঘুর করছে কেনো? কিছু বলবে ভেবেও বলছেনা, ভাবলো সরাসরি এসব বলা ঠিক হবে না। ইমরান চোখ সংযত করে বললো,
– বাসায় যাও।
মোনা ভ্রু কুচকে বলে,
– এতক্ষন এত গল্প করলাম শুনেন নি?
– হুম।
– বলুন তো কি কি বললাম?
– খেয়াল করিনি।
– একটা কথা?
– হুম। আমার বন্ধু তার স্যারকে ভালোবেসে ভুল করেনি। কারণ ওর কাছে হয়তো স্যার বেস্ট।
চক্ষু শীতল ইমরানের। ভ্রুদ্বয় কুচকানো। মেয়েটা এখনো সেই প্রশ্ন নিয়ে বসে আছে। ইমরানের সেই ব্যাপারে কোন হেলদোল নেই। তবে এখনকার জেনারেশন সো ফাস্ট। ভালোবাসার কথা অকপটেই বলে দেয়। অথচ তার বেলাতে ভালোবাসার কথা জানাতেই যা তুলকালাম পরিবারে ঘটেছিলো, ভাবলেই আজো মস্তিষ্কে আঘাত লাগে। ইমরানের নিরবিতা দেখে মোনা নিরাশ হয়ে বলল,
– অন্যদিকে ফিরেছেন কেনো? আমার দিকে ফিরুন, কথা শুনুন।
ইমরানের থুতনি ধরে মোনা নিজের দিকে ফিরিয়ে নিলো। হতচকিত হয়ে গেলো ইমরান। দাঁতে দাঁত লেগে গেলো ইমরানের। প্রচন্ড ক্রোধ নিয়ে বলল,
– মোনালিসা নিজের রুমে যাও।
চোখ ছোট ছোট করে মোনা বললো,
– না আরেকটু পরে যাবো।
ইমরান কোনো শব্দ উচ্চারণ না করেই সোজা ছাদের সিড়ি বেয়ে বাসায় নেমে আসলো। এমন কান্ডে মোনা বিস্মিত হলো। আজ তো মোনা কিছু করেনি তাহলে রাগ করলো কি কারণে? একান্ত মর্মপীড়া নিয়ে নিচে নেমে আসলো। মিনহাজ কথা শেষ করে আশেপাশে কাউকে না দেখে বুঝলো সবাই নেমে পড়েছে। ইমরান নিচে এসেই যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শার্টের হাতা ঠিক করছে। মিনহাজ উপর থেকে নেমে এসে বললো,
– চলে যাবি?
ইমরান হালকা হেসে সোফায় রাখা ফুলের তোড়া মিনহাজের দিকে বাড়িয়ে দিলো। পকেট থেকে একটি চাবির রিং এগিয়ে দিয়ে বললো,
– শুভ জন্মদিন ভাই।
নিশব্দ মিনহাজ। এর মাঝে ড্রইং রুমে হাজির হলো বাকিরাও। আবেগে আপ্লুত মিনহাজ প্রশ্ন করলো,
– চাবিটা কিসের?
– তোমার ডেনিম এবং লেদার ফিকশনের ব্যাগের যে আইডিয়া ছিলো তার ফ্যাক্টরির। টিউলিপের ফ্যাক্টরির পাশেই ওটা। নাম ও লাগিয়ে দিয়েছি। নাম পছন্দ না হলে পরিবর্তন করতে পারবে। যেয়ে দেখে নিও।
– কি নাম দিয়েছিস?
– MAGNIFICA MONALISA
জড়িয়ে ধরলো মিনহাজ ইমরানকে। এই অনুভূতি অবর্ণনীয় মিনহাজের জন্য। মোনার জন্যই চেয়েছিলো সব গড়ে দিতে। মাঝে মাঝে মনে হয় মেয়েটাকে নিজের কাছ থেকে দূরে যেতে দিবেনা কখনো। অসম্ভব কাজটা সে করতেই পারবেনা। তবুও করতে হবে। মেয়ে হয়েই জন্ম নিয়েছে বিয়ে তো দিতেই হবে। মোনা ছাড়া বাকিরা তার জন্মদিন ভুলে যায়। গত রাতে মোনা চুপি চুপি বাবার আলমিরাতে নিজের দেয়া উপহার ও চিরকুট রেখে এসেছিলো। রাতে যখন টিপ টপ পায়ে মেয়ে রুমে ঢুকে উপহার রাখলো তখন মিনহাজ সজাগ ছিলো। মোনা বুঝতে পারেনি। মেয়ে চলে যাওয়ার পর উপহার খুলে দেখে সেখানে বাবার পছন্দের পারফিউম,পাঞ্জাবি আর ছোট্ট চিরকুট। তাতে লিখা ছিলো,
‘ স্যরি বাবা, আর ভুল হবে না। ছোট মোনাকে মাফ করে দিও’
এতটুকুতেই রাগ গলে পানি। সারাদিন যা ছিলো রেগে থাকার অভিনয়। মেয়েকে মাঝে মাঝে তার ভুলের জন্য শাস্তি দিতে হয় তারই প্রয়োগ ছিলো সারাদিনের মেয়ের উপর রাগ করে থাকার ঘটনা। বিদায় নিয়ে ইমরান বেরিয়ে গেলো। মোনা তখন গেটের পাশের বাগানে মিন্নির সাথে বকবক করছে। ইমরানকে আসতে দেখে উচ্চ আওয়াজে শুনিয়ে শুনিয়ে ঠোঁট বাকিয়ে সুর করে বললো,
– বন্ধু যখন শত্রু হইয়া আমার বাড়ির পাশে দিয়া হাইট্টা যায়,বুকটা ফাইট্টা যায়।
থমকে গেলো ইমরান। সদ্য জন্ম নেয়া রোষ নেত্র পল্লব বুঁজেই সংবরণ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে নিচ্ছে। এই জেনারেশন এত এডভান্স। কি গান করছে এসব! বিড়বিড় করে আওড়ে যাচ্ছে,
– আঊজুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বনির রাজিম। ( অর্থ : আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি)
ক্রোধ সর্বদা ধ্বংসের দিকে মানুষকে পরিচালিত করে। ইমরান কোনো ভাবেই চায়না এই ছোট্ট প্রানটা তার রোষানলে পড়ুক। তবে উপলব্ধি হয়েছে মিনহাজ ভাই সম্ভবত মেয়েকে বকা দিয়েছে বান্ধবী এবং স্যারের কথা জানতে পেরে। হয়তো তাই এই মেয়ে তাকে শত্রু ভাবছে। মেয়েকে নিয়ে মিনহাজের স্বপ্ন আকাশসম। এভাবে চোখের সামনে গুড়িয়ে যেতে দেখতে কার ভালো লাগবে।
গাড়ি পর্যন্ত গিয়ে ইমরান ভাবছে একটু বেশি হয়ে গেলো না। ফিরে এসে দেখে মোনা আগের জায়গা বসে বসে কথা বলছে ওর পাখির সাথে। ইমরান গলা ঝেড়ে জানান দিলো ওর উপস্থিতি। ইমরানকে পেছন থেকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। ইমরান মোনার পাশে বেঞ্চিতে বসে বললো,
– আমাকে শত্রু ভাবার কারণ কি?
– বাবাকে বলেছেন কেনো?
– বা রে তুমি পঁচা কাজ করবে, আর আমি বললেই বুঝি দোষ।
গাল বেকিয়ে মোনা প্রশ্ন করলো,
– কি পঁচা কাজ করেছি?
– এই যে পড়ার বয়সে বান্ধবীর কার সাথে কেমন সম্পর্ক এসব নিয়ে আলোচনা, ভাবা ভালো কি কাজ?
– যেমনই হোক। বন্ধুর কথা রাখতে হয়।
ঠোঁট উলটে ইমরান মাথা নেড়ে বললো,
– ওকে প্রমিজ রাখবো তবে একটা শর্তে।
– কি?
– এসব নিয়ে না ভেবে পড়া সুন্দর করে চালিয়ে যেতে হবে, প্রমিজ মি?
– প্রমিজ।
ইমরান হেসে মোনার মাথার চুল গুলো এলোমেলো করে গাল টেনে দিলো। মোনা হেসে বলে,
– আপনারা গাল টানলে আমার নিজেকে আরো পিচ্চি মনে হয়।
খাদ পড়া গালে ইমরান হেসে বলে,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৬
– ছোটই তো।
হাতের ডেইরি মিল্ক এগিয়ে দিলো মোনা। ইমরান হেসে বললো,
– আমি স্যুগার খাই না।
– আবার না করলেন। একদিন আমি এই চকলেটই আপনাকে খাইয়ে ছাড়বো দেখবেন? তখন শুধু শুধু চকলেট চকলেটই করবেন।
ইমরান একপেশে হাসি দিয়ে বলতে বলতে চলে গেলো,
– আচ্ছা দেখে নিব।
