প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২৯
নীতি জাহিদ
মিটিং শেষ করে নয়নের কেবিনে ইশান এবং নয়ন দুষ্টুমি করছিলো। এর মাঝে মোনা বললো,
– অফিসে এখনো আমাদের সম্পর্ক বুঝতে পারছেনা। কিছু বলবেনা। এরা ডিলেমাতে থাকুক। আমি কিছু একটা সন্দেহ করছি ব্যাপারটা ক্লেরিফাই করি এরপর নিজেই বলব।
– কি হয়েছে?
– পরে জানাচ্ছি।
নয়ন আর কথা বাড়ায়নি। বেশ কিছুক্ষন বাবার কেবিনে বসলো মোনা। বাবাকে বড্ড মনে পড়ছে। মোনা ইমরানের কেবিনে প্রবেশ করলো ফাইল হাতে। ইমরান কাজ করছিলো, ফোনে কথা বলছিলো। মোনাকে দেখে ঘাড় উঠিয়ে ফাইল গুলো নিলো। মোনার চোখ মুখ দেখে বলে উঠলো,
– কিছু হয়েছে?
– বাবার কথা মনে পড়ছে। কবে আসবে?
– রাতে ফোন দিব। আমাকে জানায় নি এখনো।
– আচ্ছা, আমি কি এখন যেতে পারবো বাসায়? ইশানের টিচার আসবে৷ ও যদি একটু রেস্ট না নেয় শরীর খারাপ করবে৷
ইমরান নিষ্পলক তাকিয়ে আছে মোনার দিকে। এমনিতেই স্বাভাবিক থাকে যখনই মনে পড়ে মিনহাজের কথা তখন আর কিছুই স্বাভাবিক থাকেনা এই মেয়ের। ভাবনা থেকে বের হয়ে বললো,
– নাস্তা দিতে বলবো?
– না আমি বাসায় যেয়ে করবো।
– তাহলে দেরি করা ঠিক হবেনা।
– হ্যাঁ বের হবো। একটা অনুরোধ ছিলো।
– কি?
– সন্ধ্যার মধ্যে বাড়ি ফিরবেন আমার ফ্রেন্ড চয়ন আসবে ওর ফিয়ন্সে নিয়ে দাওয়াত দিতে।
– কোন চয়ন ? ওই যে স্যারকে পছন্দ করত?
– জ্বি।
– ওহ, বিয়ে কার সাথে হচ্ছে?
– স্যারের সাথেই।
– ইনশাআল্লাহ তাড়াতাড়ি আসবো।
মোনা খুশি হলো। ইমরান স্বল্প বাক্যে কথা শেষ করলো। ইশানকে নিয়ে বেরিয়ে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিলো। রিমি পুনরায় একই প্রশ্ন করলো,
– ইশান আসলে তোমার কে হয়?
মোনার আগের মতোই উত্তর দিলো তবে এবার স্বরটা গাঢ় করলো,
– আমার ছেলে। আসছি।
ইশান লিফটে ওঠে বললো,
– মা বেশি কথা বলে এই মহিলা।
– আমিও তাই দেখছি। ব্যবস্থা করতে হবে এর।
চারদিকটা ঘুরে দেখছে চয়ন এবং এহসান স্যার। মোনা দেখাচ্ছে বাড়ি ঘুরে ঘুরে। এহসান স্যার সব শুনে বেশ অবাক হলেন। চয়নের মাঝে অন্যরকম উত্তেজনা কাজ করছে। মোনাকে হঠাৎ বললো ফিসফিসিয়ে,
– তোর ভয় করেনা ভাইয়াকে?
মোনা একপেশে হাসি দিয়ে বললো,
– সত্যি বলতে অনেক ভয় পাই।
ড্রইং রুমে ফিরে এসে টুকটাক গল্প করছে আইরিন,চয়ন,এহসান এবং মোনা। এর মাঝে ইমরান উপস্থিত হলো। ইমরানকে দেখেই সালাম দিয়ে উঠে দাঁড়ায় এহসান। দুজনের মাঝে কুশল বিনিময় হয়। চয়ন ও মৃদু হাসলো। এহসান বলে উঠলো,
– স্যরি ভাইয়া, চলে এলাম হঠাৎ করে।
– কোনো সমস্যা নেই। খুব খুশি হয়েছি। এত ব্যস্ততায় কেটেছে কটা দিন কাউকে এখনো জানানোই হয়নি আমাদের বিয়ের কথা৷
এহসান বিয়ের কার্ড এগিয়ে দিলো। ইমরান কার্ড খুলে দেখলো মনোযোগ দিয়ে। মৃদু হেসে বললো,
– আপনাদের কথা আমি চার বছর আগে থেকে জানতাম।
চয়ন মোনার দিকে তাকাতেই মোনা লজ্জা পেলো। ইমরান সেই লজ্জা থেকে উদ্ধার করতে বললো,
– আমি চেষ্টা করবো তবে কথা দিতে পারছিনা। মোনালিসা যাবে ইনশাআল্লাহ।
এহসান প্রশ্ন করলো,
– আর ইশান?
ইমরান অবাক হয়ে বললো,
– ইশান ও যাবে।
এহসান হেসে বললো,
– ইশানকে আমি তিন বছর আগে থেকে চিনি।
ইমরান অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো,
– কিভাবে?
এহসান বিস্তারিত বলতেই ইমরান বেশ অবাক হলো। ইমরানের অজানা ছিলো কি করে এই ব্যাপার। মোনার দিকে তাকাতেই বুঝলো এই মেয়ে আরো অনেক কিছুই লুকিয়েছে। আলাপ সেরে নিজেদের মধ্যে মত বিনিময় করে বেরিয়ে গেলো দুজন।
ইমরান বোনের সাথে নিচে কথা বলছে। আলোচনা সেরে রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে পেপার নিয়ে বসলো। গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছে। রাতে খাবেনা জানালো ইমরান। মোনা হালকা খাবার ইমরানকে বানিয়ে দিয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে খেয়ে নিলো। উপরে এসে সালাত আদায় করে এসাইনমেন্ট করতে বসলো। ইমরান ল্যাপটপ বন্ধ করে রুম থেকে বেরিয়ে যাবে মোনা পেছন থেকে বলে উঠলো,
– কোথাও যাওয়া লাগবে না৷ এখানেই ঘুমান। আলো নিভিয়ে দিচ্ছি। আমার পড়া শেষ।
নির্লিপ্ত প্রশ্ন ইমরানের,
– অসুবিধা হবে নাতো?
– নাহ।
আজ মোনা শাড়ি পরেছে৷ সুতি শাড়ি। কখন যে শাড়ি পরে আর কখন যে জামা এই মেয়ের মতিগতি বুঝা মুশকিল। খাটে হেলান দিয়ে ফোনে মনোযোগ দিয়েছিলো খান সাহেব। অকস্মাৎ চোখ গেলো আয়নায় দাঁড়িয়ে চুলে বিনুনি করা স্বীয় নারীর দিকে৷ শাড়ির আঁচল খানিকটা কাঁধে উঠিয়ে চুল বাঁধছে। চোখ বুজলো ইমরান। শারীরিক অবয়ব স্পষ্ট দৃশ্যমান। ইমরানের মনে হলো দম আটকে আসছে। আঁচল সরে গিয়েছে পেট থেকে। কাটা দাগ কিছুটা ভেসে উঠেছে নাভীর কাছটাতে। স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে৷ নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ায়। মোনা তাকিয়ে বললো,
– ঘুমাবেন না?
– তুমি কাজ শেষ করে বাতি নেভাও এরপর।
বারান্দায় চলে এলো সরাসরি । ফ্রিজ হয়ে আছে অনুভূতি। বুকের ভেতর উথাল পাথাল ঝড়। না ইমরান প্রশ্রয় দিচ্ছেনা অনুভূতিকে। এত বছর যা হয়নি আজ আদিম অনুভূতি তাড়না করছে মনকে। প্রচন্ড রাগ হচ্ছে ইমরানের৷ পরনে সবুজ টি শার্ট এবং ট্রাউজার। শীত শীত করছে৷ দৃষ্টি স্থির অন্তরীক্ষে। মোনা পেছনে এসে বললো,
– বাইরে ঠান্ডা, ভেতরে আসুন। আমার কাজ শেষ।
চুপচাপ ভেতরে এসে শুয়ে পড়লো। কথা বাড়ায় নি। মোনাও একপাশে শুয়ে পড়লো। বেবি লোশন ছাড়া আজ অবধি কোনো পারফিউম লাগাতে দেখেনি এই মেয়েকে। স্মুথ স্মেল নাকে আসছে৷ ইমরানে জানে এই লোশন মোনা লাগিয়েছে। ইমরান উঠে গিয়ে আরেকটা কম্ফর্টার নামিয়ে গায়ে দিলো। মোনা প্রশ্ন করলো,
– একটাতে কি সমস্যা?
– একটাতে রাতে হয়না।
মোনা রাগ করে ঘুরে গেলো। কিছুক্ষন পর মোনা ঘাড় ঘুরিয়ে মনের অজান্তেই কাছে আসলো, এই তীব্র সুবাস আরো তীব্র প্রগাঢ়তা ধারণ করলো। ধীরে ধীরে ছোট্ট সুন্দর আঙুল গুলো চালনা করলো ঝরঝরে চুলগুলোতে৷ মোনা ইমরানের একদম কাছে। ততটাই কাছে যতটা কাছে হলে ইমরান মুখ ঘোরালেই মোনার বুকে ঠেকবে মাথা। অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে আছে ইমরান। অনুভূতি আজ পরাজিত ছোট্ট মোনার কাছে। সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে কাবু করার চেষ্টা। বেশ কিছুক্ষন পর মোনার মনে হলো ইমরান ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখলো এক ঘন্টা অতিবাহিত হয়েছে৷ ইমরানের এতটা কাছে আসার সৌভাগ্য মোনার হয়নি৷ ঘুমের মাঝে মানুষটাকে কতটা স্নিগ্ধ লাগছে। কি মনে করে মোনা ইমরানের কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো। বেশ কিছুক্ষন গাল লাগিয়ে রাখলো ইমরানের কপালে। বাহ রে! রাখবে না কেনো? মানুষটা যে তার। কতটা আবেগপ্রবণ অনুভূতি তার, কখনো মূল্যায়ন করেছে মানুষটা? কতটা ভালোবাসে বুঝাতে চেয়েছে মানুষটাকে। অথচ বুঝলোই না। মোনার চিৎকার দিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কেনো পারছেনা? রাগ, অভিমান? আরো একবার ঠোঁট ছোঁয়ালো ইমরানের কপালে। চোখ দুটো মুছে নিজের জায়গায় শুয়ে পড়তেই ভারী স্বর ভেসে এলো,
– অধিকার যখন দিবেই না, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে আমার ভেতর ঝড় না তুললেই পারতে।
চমকে উঠলো মোনা! ঘুমায় নি ইমরান! মোনার দিকে পিঠ দিয়ে ঘুরে গেলো ইমরান৷ ধুকপুক করছে মোনার ভেতরটা। তাকিয়ে আছে ইমরানের পিঠের দিকে। কষ্ট পাচ্ছে মানুষটা! সে যে কষ্ট পেলো এত বছর! প্রশ্ন করলো,
– কি অধিকার চান আপনি?
ইমরান তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো,
– কিছু না। ঘুমাও।
মোনার জেদ চেপে গেলো৷ একটানে ইমরানের কম্ফর্টার সরিয়ে ইমরানকে জোর করে নিজের দিকে ফেরালো। দু গাল ধরে বললো,
– আপনি অধিকার চাইছেন? অধিকার দিতে হবে কেনো? আদায় করে নেন নি কেনো?
ইমরান নিশ্চুপ। মোনা একটু জোরেই বললো,
– কি হলো উত্তর দিন।
– আস্তে মোনালিসা।
– কিসের আস্তে। আমি নাহয় ভুল জানতাম, ভাঙিয়েছেন সেই ভুল? আপনার বিয়ে, সন্তান,স্ত্রী এসব নিয়ে। এত দিন হলো বিয়ের এখন অবধি সহজ হতে পারছিনা দোষ কার! সব দোষ মোনালিসার তাই না? নিজ থেকেই তো দূরত্ব বজায় রেখেছেন, রাখেন নি? আমাকে দিনের পর দিন আঘাত করেন নি?
– হুম।
– তাহলে আমার দোষ খুঁজে বের করছেন কেনো?
– কারো কোনো দোষ নেই। সব আমার দোষ। ঘুমাও এখন।
– কিসের ঘুম৷ আপনি ঘুমান। এই ইগোই সবসময় আমার আপনার মাঝে দূরত্ব টেনে এনেছে।
– পাগলামি করোনা। ঘুমাও শরীর খারাপ করবে।
– লাগবেনা এসব ঢংয়ের কেয়ার।
– কথা ঠিক ভাবে বলবে। ভাষা এমন কেনো?
– আপনার মত মেপে মেপে দু ইঞ্চি ভদ্র কথা বলতে পারিনা আমি।
প্রচন্ড রাগ নিয়ে ইমরান চুপচাপ নিজের মতো ঘুমানোর চেষ্টা করলো। প্রায় এক ঘন্টা পার হবার পর যখন ঘুমোতে পারলো না সিগারেটের প্যাকেট টা হাতে নিয়ে বারান্দায় চলে গেলো। এসব রাত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হয়।
বারান্দা ভর্তি ধোঁয়া। একজন সুস্থ মানুষ এই ধোঁয়াতে অসুস্থ বোধ করবে। অথচ দিব্যি এই অন্ধকারে পর পর ছ টা সিগারেট শেষ করলো। বারান্দার গ্লাসটা ঠেলে মোনা প্রবেশ করতেই কেশে উঠলো। দু হাতে নাক মুখ চেপে ধরলো। হাতের সিগারেট ফেলে ছুটে এলো। মোনাকে ধমকে বললো,
– এখানে আসতে কে বলেছে?
কাশির জন্য মেয়েটার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছেনা। মোনাকে নিয়ে রুমে প্রবেশ করে বারান্দার গ্লাস টা আটকে দিলো। মোনাকে খাটে বসিয়ে সরাসরি ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে চেয়ার টেনে সামনে বসলো। কাট কাট সওয়াল,
– কি সমস্যা? কি চাচ্ছো তুমি?
হাতের গ্লাসের পানি টুকু গিলে ক্ষীণ স্বরে জবাব দিলো,
– কি চাওয়া উচিৎ আমার? এই ছাঁইপাশ নেক্সট টাইম খেতে দেখলে আগুন লাগিয়ে দিবো রুমে।
কত বড় স্পর্ধা মেয়ের! বলে কিনা আগুন লাগিয়ে দিবে। বড় বড় করে চোখ পাকিয়ে তাকালো। তেজ দেখছে মোনার। অকস্মাৎ ইমরান মোনার পাশ ঘেঁষে বসে বললো,
– চমৎকার কথা, তবে সেই ঘটনা কি তোমার আমার উপস্থিতিতে ঘটবে না অনুপস্থিতিতে?
মোনা চমকে ইমরানের দিকে তাকালো। ভ্রু কুচকে বললো,
– মশকরা করছেন আমার সাথে?
– আমি পারিনা মশকরা করতে।
– তাহলে অবান্তর কথা বলছেন কেনো?
– আগুন তো খেলা করার জিনিস না, লাগাবে বললে। আমাকে প্রতিকার বা প্রতিরোধের ব্যবস্থা তো নিতে হবে। তাই প্রশ্ন করলাম। যদি আমার উপস্থিতিতে লাগাও তাহলে তোমার পরিকল্পনা বানচাল। কারণ আমি তা দেবোনা আর…
মোনার ইমরানের টি শার্টের কলার ধরে চেঁচিয়ে বললো,
– চুপ করবেন আপনি, আমাকে রাগিয়ে কি শান্তি পান? কেনো এগুলো করছেন? কষ্ট পাচ্ছি বুঝেন না?
বাঁধ ভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়লো ইমরান প্রেয়সী। কিঞ্চিৎ হেসে মোনার কোমড় ধরে কোলে বসিয়ে বললো,
– রাগলে তোমাকে খুব মিষ্টি লাগে। কাঁদলে আরো বেশি মিষ্টি লাগে। এই যে এখন, নাকের আগা লাল হয়ে আছে; চোখ গুলো কেমন অশ্রুসিক্ত। কত্ত আদুরে লাগছে আমার মোনালিসা টাকে জানো? আমি কিন্তু ‘টি আমো’ র প্রতি উত্তর পাইনি মোনালিসা?
দু হাতে চোখের পানি মুছে কোল থেকে উঠে যেতে চাইলেও ইমরান ছাড়লো না। আরো আষ্টেপৃষ্ঠে ধরলো। বুকে মোনার মাথা চেপে ধরে বললো,
– স্বাভাবিক হও। আমি তোমার সেই আগের ইমরান সাহেবই আছি। পার্থক্য এতটুকুই আগে প্রকাশ করিনি কারণ প্রকাশ করা অনুচিত ছিলো, এখন তুমি আমার। তাই সাবলীলভাবেই প্রকাশ্যে এনেছি ভালোবাসার কথা। আমার প্রথম প্রেম ছিলো অযৌক্তিক, আকাঙ্ক্ষিত তবে শেষ প্রেম অনাকাঙ্ক্ষিত, অনন্তকালের৷ মাঝে মাঝে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ও চিরস্থায়ী চিরসুখ নিয়ে আসে অপ্রত্যাশিত জীবনে।
– পুরুষ মানুষের জীবনে বার বার প্রেম আসে।
– হতেই পারে। আমার আর আসার অপশন নেই।
– কেনো?
ইমরান হেসে বলে উঠলো,
– বার বার ম*রতে বসবো নাকি? আরেকবার হলে উপরওয়ালার পেয়ারা হয়ে যাব।
– মানে?
– কিছুনা, বলবো কোনো একদিন।
শীতের আমেজ পেরিয়েছে বেশ কিছুদিন। প্রকৃতি খরখরে থেকে তরতাজা হবার মৌসুম উপস্থিত। চারদিকে উৎসব উৎসব রব। ক্যালেন্ডারের পাতা এত দ্রুত উলটে যায় সময়ের পরিমাপ করাই এখন কঠিন। এই তো সেদিন বিয়ে হলো, দুজনের মনের আনবান হলো। পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে এসেছে। আলমারি থেকে নীল জামদানী বের করে নিজেকে এতে সাজিয়ে পরিপাটি হয়ে নিলো। ইমরান বেশ কিছুদিন ঢাকা ছিলোনা। ব্যবসার কাজে বাইরে ছিলো। গতকাল রাতে কখন এসেছে, সকালে কোন বেলা উঠেছে মোনা বুঝতে পারেনি। টেবিলের উপর ল্যাপটপের ব্যাগটা দেখে বুঝতে পেরেছে মানুষটা এসেছে। কিছুটা অভিমান হলো আসার পরও জানায় নি কেনো এই ভেবে। রাবিয়া এসে জানালো,
– আম্মা, স্যার নিচে অপেক্ষা করতাছে আপনার লাইগা।
– ঠিক আছে, চলো। আমার শেষ।
ডাইনিং এরিয়াতে আজ খাবারের পসরা। কিছুদিন যাবৎ সকালে মোনাই নাস্তা বানিয়েছে। গতকাল মাইগ্রেনের ব্যাথাটা বেড়েছে বলে হয়তো আজ কেউ জাগায় নি। ইশান মোনাকে দেখে মুচকি হাসি দিয়ে বললো,
– গুড মর্নিং মা।
– গুড মর্নিং প্রিন্স। আজ ডাকলে না কেনো। নিজে নিজেই তৈরি হলে?
– ডাকতে গিয়েছি তো। সকালে তোমাকে আর পাপাকে দেখা তো আমার রুটিন। কিন্তু যেয়ে দেখি তুমি একটা বেবির মতো ঘুমাচ্ছো। পাপা বললো, ঘুমাক। তাই আমি আর পাপা একসাথে তৈরি হয়ে নিলাম। তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। আজ কোনো প্রোগ্রাম আছে নাকি ক্যাম্পাসে?
ইমরান এতক্ষন ফোনে কথা বলছিলো। দূর থেকে মোনাকে আসতে দেখেছে কথা শেষ করে তাকিয়ে অধর কোণে হাসি ফুটিয়ে বললো,
– শুভ সকাল মোনালিসা।
– শুভ সকাল।
আইরিন নাস্তা দিতে দিতে বললো,
– তোর মাথা ব্যাথা কমেছে মোনা?
– আপা অনেকটাই। রাতের ঘুমটা খুব প্রয়োজন ছিলো। বেঘোরে ঘুমিয়েছি। হুঁশই ছিলোনা। এসাইনমেন্ট আর প্রেজেন্টেশন এর প্যারাই জীবনটা ছারখার। কবে যে নিস্তার পাব এসব থেকে।
তুশি ইতুকে খাওয়াতে খাওয়াতে প্রশ্ন করলো,
– ভাবী আজকেও কি তোমার প্রেজেন্টেশন?
– হ্যাঁ আজকে শেষ এই সেমিস্টারের। সেই খুশিতে বন্ধুরা মিলে শাড়ি পড়ছি। শাড়ি টা সুন্দর না?
– খুউউব
রাবিয়া টেবিলে খাবারের বাটি টা রেখে একটা কথা বলে ফেললো মুখ ফসকে,
– আম্মা, শাড়ি সোন্দর তয়, আপনি এমন ভাবে পিনছেন শাড়ির তুন আপনেরে বেশি সোন্দর লাগতাছে। স্যার তো চোখ ফিরাইতে পাইরবেনা। আপনেরে সব নাম্বার দিয়া ফালাইবে দেইখেন। পোলাপানডি সব পাগোল হইয়া যাইবে। কয় জন বিষ খাইয়া মইরাও যাইতে পারে।
নিজের খাবারের প্লেট থেকে চোখ তুলে ইমরান রাবিয়ার দিকে তাকাইলো। এদিকে কথা খানা বের করে এই মেয়ে নিজেই হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে। আইরিন, তুশি তাজ্জব বনে গেলো। সোহান ইমরানের মুখের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিললো। ইশান দিলো এক ধমক,
– হেই পাগল, কি বলো এসব। মাথা নষ্ট মহিলা। কাকে কি বলছো? এটা আমার মা। স্যার কেনো তাকাবে? বিষ কেনো খাবে?
ইশানের ধমকে হাসি থামিয়ে তাকিয়ে দেখে টেবিলের সবাই ওর দিকে ভস্ম করা চোখে তাকিয়ে আছে। ভয়ে মুখে হাত দিয়ে পালিয়ে গেলো। আইরিন জোরে ধমকে,
– বেয়াদব। তোর মুখটা আমি সামলাবো দাঁড়া।
আচমকা মোনা অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। এই প্রথম বাড়ির মানুষ মোনাকে এভাবে হাসতে দেখে অবাক। ইমরান মোনার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকে আছে। হাসতে হাসতে চোখে পানি এসে পড়েছে। মোনা হাতের টিস্যু দিয়ে চোখের কোণে চিকচিক করা পানি মুছে বললো,
– আপা রাবিয়া কিন্তু মিথ্যা বলে নাই। আমাদের ফিল্ম এন্ড মিডিয়ার যে লেকচারার উনি সত্যি স্টুডেন্টদের গেট আপ দেখে নাম্বার দেয়। তাই সবাই সেজে গুজে যাবে। প্রেজেন্টেশন ভালো না হলে তো আসলেই কষ্ট তাই বাধ্য হয়ে সাজা।
ইমরানের খাওয়া শেষ। ইতিমধ্যে ইশান আর সোহান বেরিয়ে গেলো। সোহান অফিসের দিকে যাবে ইশানকে স্কুলে ড্রপ করে। খাবার টেবিলে আছে ইমরান, মোনা, আইরিন এবং তুশি। ইমরান মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– এসো নামিয়ে দিচ্ছি।
মোনা চমকে গিয়ে বললো,
– ক্যাম্পাসে?
– অন্য কোথাও যাবে?
– না ক্যাম্পাসেই যাবো কিন্তু আপনি তো কখনো নামাবেন বলেন নি তাই।
– কখনো নামাই নি তাতে কি, আজ ও নামাতে পারবোনা।
তুশি মাথা নামিয়ে অনেক কষ্টে হাসি চাপিয়ে রেখেছে। আইরিন হাসি খিঁচে মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– যা যা দেরি হয়ে যাচ্ছে।
কাছে এসে দোয়া কলমা পড়ে ফুঁ দিলো। গাড়িতে বসতেই গাড়ি ছুটছে ক্যাম্পাসে পথে। আচানক ইমরান বলে উঠলো,
– প্রেজেন্টেশন এর জন্য এত সাজ, কই আমার জন্য তো সাজতে দেখিনা?
মোনা হম্বিতম্বি খেয়ে গেলো এমন কথায়। থতমত খেয়ে উত্তর দিলো,
– আপনি তো কখনো আমার দিকে সেভাবে তাকান ই নাই। আর বলেন ও নাই সাজতে।
– স্যার বলেছে সাজতে?
– স্যারের জন্য সাজিনি। সেজেছি নিজের জন্য। স্যার পরিপাটি থাকলে নাম্বার দেয় কারণ স্যারের ভাষ্যমতে ফিল্ম মিডিয়া সাহিত্যের মত সাজানো গুছানো। যে নিজেই পরিপাটি নয় সে কি করে সাহিত্যের রস বুঝবে।
– ভালো।
– আপনি রাগ করছেন কেনো?
– রাগ করবো কেনো?
– তাহলে এভাবে কথা বলছেন কেনো?
– বউ আমার নীল পরী সেজে ক্যাম্পাসে যাচ্ছে, স্যার পোলাপান সব পাগল হবে আর আমি অফিসের চার দেয়ালে বসে অপেক্ষার প্রহর গুনবো কবে আমার সময় আসবে।
মোনা মুখের হাত দিয়ে বলে,
– ইয়া আল্লাহ ইমরান সাহেব, আপনি জেলাস?
খুবই বিচ্ছিরি একটা ভাব করে নাক মুখ কুঁচকে বললো,
– প্রেজেন্টেশনে মার্ক কত?
– আট
– আটের জন্য এই সাজ। এদিকে আমার দিন রাত বিশে বিষ, সাড়ে সর্বনাশ হয়ে যায় রাগ ভাঙাতে ভাঙাতে সেদিকে খেয়াল নেই। কতক্ষন লাগবে?
– শুরু কখন হবে তাই জানিনা।
পকেট থেকে ফোন বের করে নয়নকে ফোন দিয়ে জানিয়ে দিলো আজ অফিস যাবেনা। মোনার সাথে ক্যাম্পাসে যাবে। মোনার কপালে হাত। হঠাৎ মানুষটা এমন বিহেইভ কেনো করছে! গাড়ি ক্যাম্পাস গেইটে। ইমরান সত্যি গেইটে নেমে মোনার হাত ধরে হাঁটা ধরলো। মোনার ঠোঁটের কোণে হাসি। চয়ন এগিয়ে এলো ওদের দেখে। ইমরানকে দেখে সালাম দিলো। চয়ন ইশারা দিলো কি ব্যাপার! মোনা আস্তে করে মাথা নামিয়ে বললো,
– শাড়ি পড়েছি তাই জেলাস হয়ে এখন আমার পিছু পিছু ঘুরবে?
চয়ন অবাক হয়ে বললো,
– তুই কি জীবনে প্রথম শাড়ি পরেছিস নাকি?
– চুপ, পরে বলব।
ক্যাম্পাস ইমরানের পরিচিত। ক্যান্টিনে বসতেই আশে পাশের মানুষজন ওদের দেখছে। যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়। মোনাদের কয়েকজন ক্লাসমেট, সিনিয়র এগিয়ে এসে বললো,
– তোমরা মাঝে মাঝে তো সেজে গুজে আসতে পারো। আমাদের ও দেখতে ভালো লাগে।
একই টেবিলে বসলেও ইমরান খানিকটা দূরত্বে ছিলো। বুঝতে পারেনি ছেলেগুলো। মোনা ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আমার সিনিয়র, তামিম ভাইয়া।
তামিম তাকিয়ে বললো,
– উনি কে?
চয়ন উত্তর কেড়ে নিয়ে বলে,
– মোনার মি. ডার্সি।
মোনা খুব মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে মাথা ঝাঁকালো। তামিম ভ্যাবাচেকা খেয়ে বললো,
– ভাইয়া! আসসালামু আলাইকুম।
ইমরান হ্যান্ড শেক করে হেসে বলে,
– নাইস টু মিট ইউ।
চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। মোনার দিকে তাকিয়ে বলে,
– মোনালিসা আমার যেতে হবে। থাকো তুমি।
মোনা উঠে একটু সামনে এগিয়ে এলো ইমরানের সাথে হাঁটতে হাঁটতে। মোনা কৌতুহল বশত প্রশ্ন করলো,
– এলেন কেনো? আর এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছেন ই বা কেনো? ক্লাস তো আরো পরে আমার। থাকুন কিছুক্ষন।
ইমরান মৃদু হেসে বললো,
– এসেছি তোমাকে ছেড়ে যেতে, পরিস্থিতি আন্দাজ করতে। কিন্তু বুঝতে পারিনি যাওয়ার সময় তুমি আটকাবে। আমার সঙ্গ তোমার পছন্দ এটা তো জানতামই না। এটাই চেয়েছিলাম। থাকো।
– আপনি না অফিস যাবেন না।
– যাবোনা তো। কাজ আছে ওখানে যাবো। তুমি চাইলে কাজ শেষে আজ সারাদিন তোমার নামে করে দিতে পারি। ভালোই লাগবে নীল পরীর সাথে ঘুরতে।
– আপনি সরাসরি কখনোই কেনো বলেন না ইমরান সাহেব আমাকে কেমন লাগছে?
ইমরান মাথা নামিয়ে হাসছে। কিছুটা এগিয়ে এসে বললো,
– এখন বললাম, প্রেজেন্টেশন শেষ করে কল দিও। আমি আশেপাশেই থাকবো।
– হয়নি। কেমন লাগছে সেটা বলুন?
– একদম আমার বউ লাগছে। আর…
– আর কি?
ইমরান একটু মাথা ঝুঁকে একদম স্বাভাবিক হয়ে বললো,
– শাড়িতে বরাবরই তুমি অনন্য। তবে কেনো জানিনা আজ আমাকে অন্য কিছু প্রবল ভাবে টানছে। কিছু না করেই অসভ্য উপাধি দিয়েছো। এখন যদি সে কথা উচ্চারণ করি তবে চিরস্থায়ী নির্লজ্জ হয়ে যাবো।
– কি কথা? এমন হেয়ালী করছেন কেনো?
– নেক্সট টাইম আর যাই করো ঠোঁটে লিপস্টিক দেয়ার পর এই চিকচিক করা জিনিস এপ্লাই করবেনা।
লজ্জা পেয়ে গেলো মোনা। ইমরানের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে হাত পেতে বললো,
– টিস্যু প্লিজ?
ইমরান খানিকটা হেসে পকেট থেকে টিস্যু বের করে দিতেই ঠোঁটে আলতো চাপ দিতে গ্লস টুকু মুছে নিলো মোনা। ইমরান হাসছে। মোনা প্রশ্ন করলো,
– কোথায় নিয়ে যাবেন?
ইমরান ঠোঁট কামড়ে বলে,
– আদর করতে।
মোনা দু অধর আলগা করে বিস্মিত হয়ে আছে। ইমরান হেসে মোনার চোয়াল চেপে মুখ বন্ধ করিয়ে বললো,
– আল্লাহ হাফেজ। ফোন দিও। অপেক্ষায় থাকব।
বিস্ময় কাটিয়ে মোনা ইমরানকে ভড়কে দিয়ে বললো,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২৮
– তবে আমি নতুন করে লিপস্টিক পরে চিকচিক করা গ্লস লাগাবো। যাতে আপনাকে আমার সেই স্পেশাল জিনিস আরো প্রবলভাবে টানে।
ইমরান সামনে কদম পেলে বলে,
– একদম পাক্কা ইমরান ম্যাটেরিয়াল। শেয়ানে শেয়ানে। এক বিন্দু সুযোগ হাতছাড়া করতে নারাজ।
– আপনারই তো।
মোনার কথা শুনে আজ মিনহাজের কথা মনে পড়লো,
‘আমার মোনা তোকে তোর জেনারেশনে নিয়ে আসবে।’
ইমরানের প্রস্থানের পর ও মোনা পূর্বের জায়গায় দাঁড়িয়ে মিটমিটিয়ে হাসছে। মানুষটার মাঝে পুরোপুরি অন্য রকম একটা সত্তা লুকিয়ে ছিলো। মোনার অজানাই ছিলো সেই সত্ত্বা। ভাগ্যিস আজ শাড়ি পড়েছিলো।
