প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২৮
নীতি জাহিদ
অনেক দিন পর ইউনিভার্সিটিতে পা পড়লো। চয়ন ছুটে এলো। কিছুটা রাগ নিয়ে বললো,
– ফোন বন্ধ রেখেছিলি কি কারণে? কি উপায়ে যোগাযোগ করি তোর সাথে? এদিকে কত কান্ড ঘটে গেলো সেই খবর রাখিস।
মোনা কিছুটা অবাক। অবশ্য কম নয় পনেরো দিন। অনেক কিছুই ঘটতে পারে। পৃথিবীতে মুহুর্তেই ধ্বংস বা সৃষ্টির মতো ঘটনা ঘটে যায় সেখানে পনেরো দিন অনেক দীর্ঘ ব্যাপার। মোনা ক্লাসরুমের দিকে যেতে যেতে বললো,
– কি হয়েছে বলতে থাক?
– প্রথমে তোকে না পেয়ে আংকেলকে কল দিলাম। ফোন বন্ধ। এরপর মায়া আন্টিকে দিলাম তাও বন্ধ। তোদের বাসায় গিয়ে দেখি তালা। এরপর সালমা আন্টিকে পেলাম। আন্টি তো আমাকে বাসা থেকে রীতিমতো বের করে দিয়ে বললো রেস্টুরেন্টে মিট করতে। আমি পেয়ে গেলাম ভয়। কি ব্যাপার!
– এরপর!
– এরপর আন্টি খুলে বললো, মায়া আন্টি নাকি অসুস্থ তাই বাসায় দেখা করতে বারণ করলো। উনি নাকি পাগলামি করছে? কিন্তু বুঝলাম না পাগলামি কেনো করছে? তুই নাকি খুলে বলবি সব। এরপর বিয়ের দাওয়াত দিলাম। এই নে তোর জন্য, এই কার্ড নিয়ে আমি এত গুলো দিন ঘুরে বেড়াচ্ছি।
– কার বিয়ে তোর?
মোনা উচ্ছ্বাস নিয়ে কার্ড খুলে প্রাপ্তির হাসি দিয়ে বললো,
– বিয়েটা তবে হতে যাচ্ছে শেষ মেষ।
– ইনশাআল্লাহ।
– স্যার কোথায়?
– আসবে দুদিন পর।
– তুই কি রাজশাহী চলে যাবি?
– অনার্স টা শেষ করে যাব।
– আচ্ছা।
– তুই কোথায় ছিলি এতদিন?
মোনা চুপচাপ ক্লাসে বসে বাকিদের সাথে কুশল বিনিময় করছে। চয়নের মনে হলো তাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। এত চটপটে ভাব, আনন্দ নিয়ে বান্ধবীকে খবরটা জানালো এরপরো মোনা কেমন শান্ত। এর মাঝে স্যার এলো, ক্লাস করানো শেষ। প্রথম ক্লাস শেষে ক্যান্টিনের দিকে পা ফেললো। চয়ন কিছুটা রাগ করে চুপসে গিয়েছে। মোনা চা,সিঙারা দিতে বললো সার্ভিস দেয়া ছেলেটাকে ডেকে। মৃদু হেসে বললো,
– এই পনেরো মোনার জীবনে অনেক কিছু ঘটে গিয়েছে চয়ন।
উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তাকালো। মোনা তিরস্কার সূচক হাসি হেসে বললো,
– মোনার বাবা থাইল্যান্ড গিয়েছে, মোনার ফুফির বিয়ে হয়েছে, ফুফির সাথে মোনার সম্পর্কের বিচ্ছেদ হয়েছে এবং সর্বশেষ মোনার বিয়ে হয়েছে।
চয়ন চিৎকার দিয়ে উঠলো,
– ইয়া আল্লাহ!
আশেপাশের লোকজন তাকাতেই স্যরি বলে নিজের মুখ চেপে ধরলো। মোনা চয়নের দিকে তাকিয়ে দু ফোটা চোখের জল ফেলে বললো,
– আমার লাইফটা আগের মত নেই রে চয়ন।
চয়নের কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছেনা এসব। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
– তুই এখন কোথায় থাকিস?
– স্বামীর বাড়ি।
– কি করেন ভাইয়া?
– বিজনেস।
– কিভাবে কি হলো?
– আমার নিয়তি। বর কে শুনবিনা?
– কে?
– ইমরান শরীফ খান।
চয়ন বসা থেকে দাঁড়িয়ে মাথায় হাত দিয়ে দিলো। আশপাশের সব ভুলে গেলো। মোনা তাকিয়ে দেখে অনেকেই চয়নের দিকে তাকিয়ে আছে। চয়নকে ধরে বসিয়ে দিলো। কিঞ্চিৎ ধমক দিয়ে বললো,
– স্বাভাবিক হ। নতুবা আর কিছু বলবোনা।
চয়ন এক ঢোক পানি গিলে বলে উঠলো,
– একটার পর একটা অস্বাভাবিক নিউজ দিচ্ছিস। কিভাবে স্বাভাবিক থাকি।
– থাকতে হবে। পুরোটা শুন।
– বল।
মোনা একে একে খুলে বললো সব। চয়ন বিস্ময় নিয়ে সব শুনে বার বার চোখের পলক ফেললো। শেষে একটি হাসি দিয়ে বললো,
– তুই যাই বলিস মোনা আমি অনেক খুশি হয়েছি। আমাদের দুলাভাইকে দেখতে কি এখনো কালা মানিক লাগে?
মোনা হেসে দিলো। হালকা লজ্জা পেয়ে বললো,
– জানিনা ওভাবে খেয়াল করিনি। কথা কম হয় আমার সাথে। পুরোনো স্মৃতির জেরে উনাকে মাফ করতে পারছিনা।
– সব ভুলে দুজনে এক হয়ে যা। আমি ভাইয়া সম্পর্কে তেমন কিছু জানিনা তবে মানুষটা মন্দ নয়।
– একদিন বাসায় আয়।
– তুই বলা লাগবেনা। আমি প্ল্যান করে নিয়েছি কবে যাবো।
– কবে?
– আজ সন্ধ্যায় থাকবি?
– ইনশাআল্লাহ।
– আমাকে এড্রেস টা দিয়ে রাখ। আজই আসবো। ভাইয়া থাকবেনা?
– হ্যাঁ সচরাচর সন্ধ্যায় চলে আসে।
দুই বান্ধবীর কথোপকথনে ফুটে আসে পরিবার,ক্লাস সব কিছুর কথা। এভাবে আরো একটি দিন পেরোয় ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে। প্রতিনিয়ত মোনা চেষ্টা করছে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার।
ইশানের স্কুল থেকে অফিস যাওয়ার পথে হঠাৎ গাড়ি থামলো। মোনার মনোযোগ ফোনে ছিলো। গাড়ি থামাতে প্রশ্ন করলো,
– কি হলো?
ইশান গাড়ি থেকে নেমে বললো,
– মা পাঁচ মিনিট বসো আসছি।
পাঁচ মিনিটের পরিবর্তে দশ মিনিট হয়ে গেলো ইশান না আসাতে বের হবে তখনই ইশান গাড়িতে উঠে বসলো। হাতে দুই তিন রকমের ফুল। গাঁদার মালা গোলাপ ও রজনীগন্ধার স্টিক। মোনার হাতে স্টিক গুলো দিয়ে, গাঁদার মালা হাতে পেঁচিয়ে বললো,
– তোমাকে ফুলে চমৎকার লাগে মা। চলো যাই।
মোনা খুব অবাক হলো। মিষ্টি হেসে বললো,
– ধন্যবাদ। ফুল আমার খুব পছন্দের জানো তো।
– জানি।
– কিভাবে?
ইশান হেসে বলে,
– তোমার প্রিয় অলকানন্দা, বেলী পাপা ছাদে লাগিয়েছে। তুমি দেখোই নি।
অক্ষিপটে ভেসে উঠলো চারবছর আগের স্মৃতি। মোনাদের ছাদে অলকানন্দা ফুল ফুটেছিলো। সেদিন অলকানন্দা কানে গুঁজেই প্রথম বন্ধুত্ব হয়েছিল ইমরানের সাথে। সেই বাচ্চামো ভালো লাগা আজ স্বামী বেশে জীবনে আগমন করেছে। ভাবতে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
ইশানকে নিয়ে সরাসরি অফিসে এসেছে। খাবার টা রবিন ভাইকে আপা দিয়ে দিয়েছে। মোনাকে সবাই অফিসে ইশানের সাথে দেখে কয়েকবার ঘুরে তাকালো। ইশান প্রথম বারের মত বাবার এই অফিসে এসেছে। ইমরান ছেলেকে এই অফিসে কখনোই নিয়ে আসেনি। কারণ সে নিজেই এটাতে কম বসতো। ইশান এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখছে। সাদাফ তিহান সামনে এসে মোনাকে সালাম দিলো,
– আসসালামু আলাইকুম আউয়ার নিউ এমডি।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম। ভাইয়া আমি আপনাদের মোনা ই আছি। এসব ডেকে লজ্জা দিবেন না প্লিজ।
– মজা করলাম, সাথে কে এই ভদ্রলোক?
মোনা খানিকটা হেসে বললো,
– আমার ছেলে। সুন্দর না। হ্যান্ডসাম কিন্তু।
সাদাফ,তিহানের সাথে তামান্না , চৈতি ও এগিয়ে এলো। তামান্না হেসে বললো,
– খুব সুন্দর। কিন্তু তোমার ছেলে এত বড় ও হয়ে গেলো।
মোনার কথার ছলে সকলেই ধরে নিয়েছে মোনা মজা করছে। রিমি এদের সাথে আলোচনায় যোগ দেয়ার সুযোগ খুঁজে বের করায় চেষ্টায় ছিলো। হঠাৎ ফাইলটা হাতে নিয়ে এগিয়ে এলো। মোনাকে দিয়ে বললো,
– কিছু তথ্য এড করেছি চেক করে দেবে।
রিমির উদ্দেশ্য মোনা স্পষ্ট বুঝতে পেরে, ওর দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে মোনা মাথা ঝেঁকে বললো,
– হ্যাঁ একটু পর চেক করে পাঠাচ্ছি।
সাদাফ হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়াতেই ইশান ও হাত বাড়ালো,
– আমি সাদাফ।
– ইশান
তিহান ও হাত বাড়িয়ে পরিচিত হলো। মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– এই অফিসটা বেশ সুন্দর তাই না। শাহাদাৎ প্রোপার্টিস এত অর্গানাইজড না।
মোনা হেসে বললো,
– আমি কখনো ওখানে যাই নি। বাবা এখানেই বসতো। আমার আনাগোনা টিউলিপেই ছিলো।
সবার দিকে তাকিয়ে বললো,
– আচ্ছা আপনারা বসুন। আমি ওকে খাইয়ে দি। বাচ্চাটা সেই সকালে খেয়ে বের হয়েছে।
সকলে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেও কেমন যেন সবার কাছে ব্যাপারটা এলোমেলো ঠেকলো। মোনা ইশানের হাত ধরে সরাসরি ইমরানের কেবিনে ঢুকলো। দূর থেকে সকলেই দেখলো। ফাইলটা টেবিলে রেখে হাতের ব্যাগটা একপাশে রেখে ইশানকে বললো,
– বাবা ফ্রেশ হয়ে আসো। মা খাবার রেডি করছি।
ইমরান কথা বলছেনা। এদের দিকে তাকায় ও নি। সালাম দেয়া নেয়া শেষ করে নিজের কাজে ব্যস্ত। মোনা ইন্টারকমে রহমত চাচাকে বলে তিনটা প্লেট আনালো। রহমত চাচা প্লেট দিয়ে যেতেই দুই প্লেটে খাবার বেড়ে রুমের ছোট্ট ডাইনিং টেবিলে সাজালো। ইশানকে বসিয়ে দিলো। আচানক ইমরান উঠে দাঁড়ায়। ইশানের দিকে তাকিয়ে হেসে বললো,
– প্রিন্স কিছুক্ষন থাকবে?
– হ্যাঁ মায়ের সাথে যাব।
– আচ্ছা আমি বের হচ্ছি।
মোনার ভীষণ রাগ হলো। ইমরান ইচ্ছে করে কাজটা করছে বুঝতে পেরে একবারো ডাকলো না। ইশান বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,
– খেয়ে যাবে না পাপা?
– খেয়ে যাবার কথা কি ছিলো? মিটিং আছে বলেছিলাম সকালে।
মোনা ইশানের মুখে নলা তুলে দিতে দিতে বললো,
– ইশান হা করো।
ইশান একবার মায়ের দিকে তাকাচ্ছে তো অন্যবার বাবাকে দেখছে। ঢোক গিলে মায়ের কাছ থেকে নলা নিয়ে বাবাকে বললো,
– খেয়ে যাও। মা তোমার জন্য খাবার সাজিয়েছে তো। আসো এখানে।
– তোমার মাকে খেতে বলো।
ইমরান টেবিল থেকে ফোন নিয়ে বেরিয়ে গেলো। ইশান মায়ের দিকে তাকাতেই দেখে চোখ ভরে এলো মোনার। চোখের পলক ঝাপ্টে পানিও ফেললো। গাল বেয়ে পড়ছে সেই জল।
ইমরান স্ব-কামরা বেরিয়ে যেতেই অফিসের আরেকজন এক্সিউটিভ রাসেল একটা ফাইল সাইন করতে দিলো। সাইন করে দিয়ে সাদাফের হাতে দিলো।
– ফাইল চেক করে রি সাবমিট করবেন।
অনেকটা ভারী গলায় কথা বলেই বেরিয়ে গেলো। প্রচন্ড রাগ হলো আজ। একবার কি বলতে পারতোনা খেতে। প্রতিনিয়ত উপেক্ষা করে যাচ্ছে। খাবার এনেছে ভালো কথা সম্মান দিয়ে বললে কি এমন ক্ষতি হতো! নাকি ন্যুনতম সম্মানটুকু ইমরান ডিজার্ভ করেনা। চুপচাপ খাবার ঠেলে দিচ্ছে। এতটা অসম্মানে এই খাবার গলা দিয়ে নামবেনা। লিফট দিয়ে নেমে সোজা গাড়ির কাছে চলে যাচ্ছে। রবিনকে ফোন দিতে পকেট থেকে বের করলো এমন সময় অফিসের নাম্বার থেকে ফোন এলো।
– আসসালামু আলাইকুম
– ওয়ালাইকুমুস সালাম। পাপা আমি ইশান।
– জ্বি পাপা বলো।
– এসো না, খেয়ে যাও। মা কাঁদছে। খুব মজা হয়েছে রান্না। অথচ আমিও খেতে পারছিনা।
– তোমরা খেয়ে নাও।
– আমাকে দুই নলা দিয়ে মা ওয়াশরুমে চলে গেলো। আমার খাবার নামছেনা পাপা। মা ও হয়তো খাবেনা আর।
– তোমার মা কি একবারো আমাকে বলেছে খেতে ?
– পাপা, ইগো নিয়ে থেকোনা। মাঝে মাঝে নিজেদের মাঝে মিউচুয়াল করে নিতে হয়। তুমিই তো শেখাও আমাকে। আমি অপেক্ষা করছি, আসো।
ছেলের কথা গুলো মাথায় আসছে। এখন না গেলে নিজের শিক্ষা মিথ্যা হবে। তবে রাগ কমছেনা। তবুও নিজের উপর আয়ত্ত এনে পুনরায় লিফটে চড়ে অফিসে এলো। এদিকে সাদাফ এবং এক্সিউটিভ অফিসার ভয় পেয়ে গেলো। এত তাড়াতাড়ি কিভাবে ফাইল রিচেক করে দিবে? ভেবেছিলো হয়তো ঘন্টা খানেকের জন্য যাচ্ছে ইমরান। সাদাফ জানিয়েছে এখনো রিচেক হয়নি, ইমরান কিছুক্ষন পর দেখাতে বলে কথা না বাড়িয়ে সরাসরি নিজের রুমে এলো। তখনো মোনা ইশানকে খাওয়াচ্ছে। এসে সরাসরি ডেস্কের চেয়ারে বসে পড়লো। মনে মনে ভাবছে এই মেয়ে যদি এখন না বলে খেতে তবে আজ আর সত্যি খাবেনা। মোনা ইমরানকে দেখে কথা না বলে পুনরায় প্লেটটা এগিয়ে দিলো। পাশে পানি দিলো। ইমরান দূর থেকে দেখছে মোনার কাজ। ইশান বাবাকে বললো,
– পাপা আসো?
ইমরান আজ সত্যি জেদ করে বসে আছে। জায়গায় অনড়। ইশান নিজেও ভয় পেয়ে গিয়েছে। এত বার বলছে তবুও বাবা আসছে না। মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
– মা একবার ডাকো।
মোনা চোখ তুলে ইমরানের দিকে তাকালো। চোখাচোখি হলো। ইমরানের চোখে স্পষ্ট ক্রোধ। পলক ঝাপটে মোনা বললো,
– আসুন।
ইমরান উঠে দাঁড়ায়। কি চলছে তার মনে সেই জানে। হাত ধুয়ে টেবিলের কাছাকাছি আসতেই, তামান্না এবং রিমি একসাথে রুমে ঢুকলো। তামান্না এই অবস্থায় সবাইকে থেকে থতমত খেয়ে বলে উঠলো,
– স্যরি স্যার, উই আর এক্সট্রিমলি স্যরি।
রিমি দরজা নক না করে ঢুকে যাবে তামান্না বুঝতে পারেনি। রিমি নিজেও ভয় পেয়ে গিয়েছে। মোনা স্তব্ধ। ইশানের সামনে শোরগোল করেনি ইমরান। ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করলো,
– কি কাজ?
রিমি বলে উঠলো,
– স্যার মোনাকে ফাইল দিয়েছিলাম ওটা নিতে এসেছি।
মোনার সহসা রাগ উঠলো। কিছুটা বিরক্ত এনে বললো,
– রিমি আপু আমি তো বললাম চেক করে দিয়ে আসবো। লাঞ্চ করিনি এখনো।
– আমি তো আর ওটা জানিনা।
চোয়াল শক্ত হলো মোনার। রিমি ইচ্ছে করে কাজটা করেছে বুঝতে পেরেছে মোনা। তামান্না রিমির হাত ধরে জোর করে টেনে বের করতে করতে বললো,
– স্যরি স্যার। আমরা পরে আসবো। আপনারা খেয়ে নিন।
ইমরান উঠে দাঁড়ায়। ওরা বের হতেই দরজা লক করে দেয়। যা স্পষ্ট তামান্না রিমি বাইরে থেকে শুনতে পায়। দুজনই নিজেদের ডেস্কে চলে যায়। তামান্না মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। রিমি খানিকটা জোরেই বললো,
– এভাবে অপমান করার কি আছে? দুইদিনের মেয়ে গরম দেখাচ্ছে।
সাদাফ,তিহান এবং চৈতি এগিয়ে এলো। তামান্না রেগেই বললো,
– তোর কি অফিস ডেকোরাম মনে নেই? নক না করে ঢুকলি কি করে?
– বেশ করেছি। ভেতরটাকে তো রেস্টুরেন্ট বানিয়ে রেখেছে। এত মাখো মাখো ভাব কিসের মোনার স্যারের সাথে।
তামান্না চোখ পাকিয়ে বললো,
– মুখ সামলে কথা বল। এরা সবাই ফ্যামিলি মেম্বার। এদের মাখো মাখো ভাব থাকবে না তোর থাকবে? যেই দিবা স্বপ্ন দিন রাত দেখে যাচ্ছিস স্যার জানলে ডিরেক্ট ফায়ার করে দিবে। ছিঃ ছিঃ আমার কি লজ্জা লাগলো। স্যার মাত্র খেতে বসেছে। এর মাঝেই এভাবে গিয়ে উঠলাম।
সাদাফ বিরক্ত হয়ে বললো,
– সেই ঝাঁঝ আজ সারাদিন উঠাবে। তুই ও তো বোকার মতো কাজ করলি তামু।
– বুঝতে পারিনাই ভাই।
রিমি হঠাৎ বললো,
– মোনার সাথে ছেলেটা কে রে? স্যারের সাথেও ভালোই ভাব। একই টেবিলে খাচ্ছে?
তামান্না গজগজ করে উঠলো,
– আমি কি করে জানবো। আমি ওখানে বসে আছি?
ইশানের হাতে মিষ্টি দইটা ধরিয়ে দিলো খাবার শেষে। টক দইটা সালাদের সাথে মেশাচ্ছে। ইমরান এখনো বসে আছে। ইশান দই এক চামচ মুখে দিয়ে বাবা মাকে দেখছে। ইমরানের দিকে সালাদের বাটি এগিয়ে দিয়ে বললো,
– এবার খান। রান্নায় তেল কম দিয়েছি। খেতে পারবেন। সমস্যা হবে না আশা করি।
ইমরান মোনার ফুলো গাল গুলোর দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো। প্লেটের দিকে তাকিয়ে দেখলো পোলাও,ডিম এক পিছ রোস্টের টুকরো মতো চিকেন। দেখতে বেশ লোভনীয় লাগছে। সবজি প্রতিদিনের লিস্টে থাকলেও আজ একদিন ভিন্ন কিছু খেতে সমস্যা নেই ভেবে খাবারে হাত দিলো। খাবারের দিকে তাকিয়েই মোনাকে বললো,
– বসো।
মোনা কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বসে পড়ে নিজের প্লেট টা টেনে খাবার বাড়বে এর আগেই ইমরান বলে উঠলো,
– নতুন প্লেট সাজানোর প্রয়োজন নেই। এসো, আমি খাইয়ে দিচ্ছি।
মোনা বিনা বাক্য ব্যয়ে ইমরানের দিকে তাকালো। প্রথম নলা ইমরান মোনার মুখে তুলে দিলো। অবাক হলো মোনা। ইশানের মুখে হাসি। বাবা-মায়ের এই সন্ধিক্ষণে কাবাব মে হাড্ডি হতে চায়না সে। বাবাকে বলে ফোনটা নিয়ে সোফায় চলে গেলো। গেম খেলছে আর দই খাচ্ছে। এদিকে ইমরান নিজে খেতে খেতে মোনাকে খাইয়ে দিচ্ছে। মোনা বাধ্য বালিকার মতো খেয়ে নিচ্ছে। হঠাৎ ইমরান বলে উঠলো,
– তোমার আক্ষেপ আমি অনুভূতি প্রকাশ করিনা কেনো তাই না?
মোনা নির্বাক। খাচ্ছে আর কাঁদছে। ইমরান সামনে ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখলো ছেলে গেম খেলতে ব্যস্ত। অনেক দিন কেউ খাইয়ে দে না মোনাকে। ইমরানের কথা শুনে ডানে বায়ে মাথা নেড়ে বুঝালো, তার আক্ষেপ নেই। ইমরান মৃদু হাসলো। মোনার চোখের পানি বাম হাতের সাহায্যে মুছে একটাই কথা বললো,
– মোনালিসা, সেই বেলিসিমা, টি আমো। ( Monalisa Sei Bellisima, Te amo.)
মোনা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। কিছুই বুঝেনি এর মানে। ইমরান খাবার শেষ করে ইশানের দিকে এক পলক চাইলো। ছেলের মন গেইমে। মাথাটা নামিয়ে মোনার বাম গালে আলতো ঠোঁট ছুঁয়ে বললো,
– ধন্যবাদ খাবার ভালো ছিলো। আই ওয়াজ ফেমিশ্ড।
স্তব্ধ মোনা। ধুকপুক করে উঠলো বুক। চক্ষু ছানাবড়া। মাথায় একই বাক্য ঘুরছে আর সেই সাথে প্রথম চুমু। হুঁশ হারিয়ে টেবিলেই বসে ছিলো মিনিট কতক। ইমরান হাত ধুয়ে এসে মোনার মাথায় হাত রাখলো মুচকি হেসে। ঘাড় ঘুরিয়ে মোনা মুখের অনাবিল হাসি নিয়ে তাকালো আপন মানুষটার দিকেই। ইশানের ডাকে উঠে হাত ধুতে চলে গেলো।
আজকে সাড়ে তিনটায় মিটিং। সকলে আবার কনফারেন্স রুমে একত্রিত হবে। খাবার শেষ করে সব গুছিয়ে মোনা ফাইল চেক করতে ব্যস্ত। ভুল গুলো কারেকশন করে ফাইল পাঠিয়ে দিলো পিয়নকে দিয়ে। চারটায় সবাই উপস্থিত কনফারেন্স রুমে। নয়ন বাইরে ছিলো। পৌঁছাতে দেরি হওয়াতে অপেক্ষা করছিলো বাকিরা। ইশান ও গেলো ওদের সাথে মোনার পাশে বসলো। মোনা এখনো ব্র্যান্ড লোগো দেখেনি। এর মাঝে নয়ন এসে উপস্তিত হলো। ইশান নয়নের সাথে কোলাকুলি করলো। নয়ন নিজের সিটে বসে পড়লো। এই এক সপ্তাহে কে কোথায় কি কি দেখলো সব এক্সপ্লেইন করে প্রেজেন্টেশন দিলো।
লোগো টা সামনে আসলে মোনা সকলের সামনে প্রশ্ন করলো,
– এটার মানে কি?
তিহান উত্তর দিলো,
– মোনালিসা, সেই বেলিসিমা মানে মোনালিসা তুমি অপরূপা।
মোনা স্তব্ধ। ইমরানের চোখ ফোনে নিবদ্ধ। তাকাচ্ছেনা মোনার দিকে। চেহারায় গুরু গম্ভীর ভাব। যেন কিছুই জানেনা। মোনা নয়নের দিকে তাকাতেই নয়ন মিটমিটিয়ে হাসছে। ইশান হা করে তাকিয়ে আছে। মোনা এবার তিহানকে প্রশ্ন করলো,
– এত নাম ফেলে মোনালিসা কেনো? এই নাম কে দিয়েছে?
– চেয়ারম্যান স্যার দিয়েছেন। মোনালিসা তো সুন্দর নাম। মোনালিসার সৌন্দর্য্য তো প্রকৃতপক্ষেই অতুলনীয় তাই না। মিলিয়ে নাও। ট্যাগ লাইনটাও সত্যি। মোনালিসা, তুমি জামদানীতে অপরূপা।
মোনা এবার পুরোপুরি বিস্মিত। ভাষা হারিয়ে নির্বাক। ইশানের মুখে হাত। ছেলে এত বড় হয়েছে। এত টুকু মানে অবশ্যই বুঝে। এডাল্ট হয়েছে। আঠারোতে পা দিয়েছে। মোনা নয়নের দিকে তাকাতেই নয়ন বহু কষ্টে হাসি চাপিয়ে রেখেছে। মোনা দম আটকে পুনরায় প্রশ্ন করলো,
– এটা কোন ভাষা?
সাদাফ বললো,
– ইটালিয়ান।
– আচ্ছা আচ্ছা। আমার আরেকটা ব্যাপার জানার আছে। আপনারা জানেন এই ভাষা।
সাদাফ বললো,
– কিছু কিছু বুঝি।
অফিসের বেশ কিছু অফিসার হাত তুললো, তারা কিছু টার্ম বুঝে। মোনা প্রশ্ন করলো,
– হোয়াট ইজ দ্য মিনিং অফ ‘টি আমো’?
ইশান সহ, একসাথে অফিসের অনেকে উত্তর দিলো,
– আমি তোমাকে ভালোবাসি।
ব্যাপারটা এত সুন্দরভাবে ঘটে গেলো। নয়ন সাথে সাথে উত্তর দিলো,
– ইউ আর জিনিয়াস মোনা। এত সুন্দর ভাবে সবার মুখ থেকে ভালোবাসা আদায় করে নিলি।
সবাই হাসছে। ইমরান কেনো যেনো প্রচন্ড বিরক্ত হলো। সবার সামনে জিগ্যেস করতে হবে কেনো এই কথা! রাগ করে মোনার চোখে তাকাচ্ছেনা। সকলের উদ্দেশ্যে বললো,
– মিটিং শেষ। পরশু আমাকে আপডেট জানাবেন, কাজ কতদূর আগালো। আই হ্যাভ টু গো।
নয়ন সবার সামনে বলে উঠলো,
– মোনা টি আমো।
মোনা হো হো করে হেসে বললো,
– মামা টি আমো ঠু।
ইশান তখন সকলের সামনে বলে উঠলো,
– দিস ওয়ার্ড অলসো নোন এজ লাভ ল্যাঙ্গুয়েজ।
মোনা মাথা নেড়ে হেসে ইশানকে জবাব দিলো,
– ভেরী নাইচ।
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২৭
ইমরান বেরিয়ে গেলো। আস্তে আস্তে কনফারেন্স রুম খালি হলে নয়ন মোনাকে বললো,
– টি আমো বলেছে?
মোনা লজ্জালু ভাব লুকিয়ে বললো,
– আরেহ নাহ এমনি জিজ্ঞেস করলাম। চলো ইশান, বাসায় ফিরতে হবে। বিকেলে স্যার আসবে।
