Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৮

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৮

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৮
সাইদা মুন

—আপনার পুরো বংশই কি কট খেয়ে বিয়ে করেছে নাকি?
তালহা সামনে চোখ রেখেই নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
—হু..
মেহরীন চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বিরবিরিয়ে বলল,
—আপনার আব্বুও?
তালহা আড়চোখে একবার তাকিয়ে আবার বলল,
—আব্বু-আম্মুর লাভ ম্যারেজ-ই। তবে নানুরা অন্য জায়গায় বিয়ে ঠিক করে ফেলেছিল, সিলেট টু ঢাকা এতো লং ডিস্টেন্সে মেয়ের বিয়ে দিবে না বলে। তাই আব্বু আম্মুকে পালিয়ে নিয়ে আসতে গিয়ে গ্রামের লোকদের হাতে ধরা পড়ে। তারপর সেখানেই বিয়ে হয়।
মেহরীন খানিকটা হিসাব কষে বলল,

—এটাও তো কট ম্যারেজই।
তালহা কিছু বলল না, শুধু মৃদু একটা হাসি ঠোঁটে ফুটিয়ে তুলল। মেহরীন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার মিনমিনিয়ে প্রশ্ন করল,
—আপনার চাচ্চুরা এতো সহজে মেনে নিল আমাদের বিয়ে?
তালহা গম্ভীর কণ্ঠে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
—আমাকে দেখে কি এখনো বাচ্চা লাগে?
মেহরীন থতমত খেয়ে বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—না না, তা হতে যাবেন কেন। আপনি তো বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন।
শেষ কথাটা আস্তে বললেও তালহার কানে ঠিকই পৌঁছেছে। সে পায়ের হাঁটার গতি ধীর করে ফেলল। সেটা দেখে মেহরীনের বুকের ভেতর হালকা ধাক্কা লাগল, তার কথাটা শুনে ফেলল নাকি এই ভয়ে একটু হকচকিয়ে গেল।
তালহা মেহরীনের হাত টেনে নিজের পাশাপাশি এনে চারপাশে একবার তাকাল। কেউ নেই দেখে পরপরই মেহরীনের সাদা কলেজ এপ্রোনের ফাঁক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে তার পেট চেপে ধরল। ঠোঁটে হালকা হাসি রেখে বলল,
—এখনো তো যৌবন ছুঁয়েই দেখোনি, আর বুড়ো বানিয়ে দিলে? থাক, কিছু বললাম না। সময় এলে প্রমাণ পাবে, আমি এখনো পুরো-ই তরুণ।

কথাটা বলতে বলতেই মেহরীনের পুরো পেটে তালহার হাতের বিচরণ শুরু হলো। লজ্জায় জমে গেল মেহরীন। একদম নিভে যাওয়া মোমবাতির মতো। চোখ জুতোর দিকেই আটকে রইল, লজ্জায় মাথা তোলার সাহসটুকুও পাচ্ছে না মেয়েটি। মেয়েটার এই বেগতিক অবস্থা দেখে তালহা এক চিলতে হেসে উঠল। মেয়েটা বড্ড নাজুক। হাত সরিয়ে নিল। তারপর মেহরীনের বাম হাতটা নিজের ডান হাতে আগলে নিয়ে প্রসঙ্গ বদলাল।
—আমার চাচ্চুদের তুমি এখনের যুগের তালের সঙ্গে মেলালে তেমন খারাপ হবে না। তাদের চিন্তাধারা সেই আগের দিনের চাচা-খালুদের মতো নয়। তাই বিয়ে নামক পবিত্র বন্ধন নিয়ে এতো হাইপার হয়নি। তাছাড়া আমি ইনাফ ম্যাচিউর, আমি আমার ভালো-খারাপ যথেষ্ট ভালো বুঝি। এটাও তাদের মাথায় আছে।

মেহরীন চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল তালহার প্রতিটি কথা। সে নিজেই তো এতদিন ধরে খুব কাছ থেকে দেখে এসেছে সিকদার পরিবারের মানুষগুলোকে। তাদের কথা বলার ভঙ্গি, ব্যবহার, ধৈর্য, সম্মানবোধ, সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের পরিমিত সৌন্দর্য। রিতু ছাড়া পরিবারের বাকি প্রত্যেকটি মানুষের ব্যবহারে এমন এক আন্তরিকতা আর পরিশীলন সে খুঁজে পেয়েছে, যা যে কারও মন জয় করে নিতে সক্ষম।
এমন পরিবার, এমন মানসিকতার মানুষ এখনকার সময়ে সত্যিই বিরল। যেখানে সম্পর্কের ভিড়ে স্বার্থের কোলাহল বেশি শোনা যায়, সেখানে সিকদার পরিবার ছিল ঠিক উল্টো। তাদের মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল না দেখানোর তাড়না। এইসবেই মেহরীনের মনে মুগ্ধতায় জায়গা করে নিয়েছে সিকদার পরিবার।

নিজের কেবিনে বসে আছে তালহা। সামনে কানে ধরে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচটা বিচ্ছু। একেকটার মুখের ভাব দেখার মতো। কেউ চোখ নামিয়ে রেখেছে, কেউ আবার লজ্জা আর ভয়ের মাঝামাঝি অবস্থায় এদিক সেদিক তাকাচ্ছে। তালহা হাতের কলমটা আঙুলে ঘুরাতে ঘুরাতে শান্ত কিন্তু চাপা রাগে বলল,
—এতো সাহস কোথা থেকে এসেছে কলেজ ফাঁকি দিয়ে বের হওয়ার?
তাহিয়া ভয়ে ভয়ে গলা তুলে বলল,

—ভাইয়া, সত্যি আমি না.. এই তনিমারা..
তনিমাদের দিকে আঙুল তুলতেই তনিমা তরাক করে মাথা তুলে তাকায়। রাফি আর ফারিনের দিকে একে একে তাকিয়ে অবাক ভঙ্গিতে বলল,
—আমরা নাকি বলেছি কলেজ ফাঁকি দিতে? ছিহহহ…
ফারিন সঙ্গে সঙ্গে সায় দিয়ে বলে উঠল,
—ছিহহহ…
রাফি আরও এক ধাপ বাড়িয়ে টান দিয়ে বলল,
—ছিইইইইইহহ!
এদের নাটক দেখে সাজিদ মুখ টিপে হাসছে। তবে তালহা এক ধমকে তিনজনকেই চুপ করিয়ে দেয়। তারপর টেবিলে এক চাপড় মেরে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,

—দশবার করে কানে ধরে ওঠবস করবি সবাই।
তালহার কথা শুনতেই সকলে বিস্ফোরিত চোখে তাকায়। যেন পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য দেখছে। এত বড় ছেলে-মেয়েরা নাকি এখন কানে ধরে ওঠবস করবে। মানে কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাকাই তো কম অপমান না। এরপর আবার এই শাস্তি? লজ্জায় একে অন্যের মুখের দিকে তাকাচ্ছে সবাই। না না এটা তারা করতে পারবে না। তবে তালহার মুখের উপর না বলার সাহস ও নেই। তাই সকলের চোখের ইশারা গিয়ে ঠেকছে মেহরীনের দিকে। কেউ গুতাচ্ছে, কেউ ঠেলা দিচ্ছে। তারা চাইছে মেহরীন কিছু বলুক। বউ কিছু বললে হয়তো জামাইয়ের মন গলবে।
ওদের এই গুতোগুতি দেখে তালহা আবার ঝারি মেরে উঠল,

—স্টপ, ইডিয়েটস! হচ্ছে টা কি? আমি কী বললাম?
ফারিন বিরবিরিয়ে বলল,
—তাই বলে আপনার বউকেও কানে ধরাবেন, দুলাভাই?
তালহা একপলক মেহরীনের দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
—অপরাধ সে-ও করেছে, শাস্তি সে-ও পাবে।
সবাই ঢোক গিলে তাকিয়ে থাকে। বাপরে! কী দজ্জাল জামাই, বউকেও ছাড় দিচ্ছে না! তাদের বিরবিরানি শুনে মেহরীন ঠোঁট উলটে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু বললে সে ঝারি খাবে কনফার্ম তাই জেনেশুনেই চুপ করে আছে।
ওদের নীরবতা দেখে তালহা বলে ওঠে,

—ফাস্ট..
এবার লজ্জায় সবাই একসাথে সাজিদের দিকে তাকায়। সাজিদ বুঝে যায় ব্যাপারটা। সে এক হাত চোখে দিয়ে বলল,
—সমস্যা নেই, আমি কিচ্ছু দেখছি না।
বেচারারা কানে ধরে ওঠবস শুরু করে। দশবার শেষ হতে না হতেই হাঁপাতে হাঁপাতে মেঝেতে বসে পড়ল একেকটা। তালহার ইশারায় সাজিদ পানি এগিয়ে দেয়। পানি খেয়ে একটু জিরিয়ে নেয় সবাই।
এর পরপরই তালহা সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। গাড়ি ড্রাইভ করছে তালহা। তার পাশের সিটে রাফি। আর পেছনের তিন সিটে গাদাগাদি করে বসেছে মেহরীন, তাহিয়া, তনিমা আর ফারিন।
—উফফ! মেহুর বাচ্চা, আরেকটু চিকন হলে কী হতো? আমাকে পিষে ফেলবি নাকি?
জানালার সঙ্গে চেপে বসে থাকা তনিমার কথায় মেহরীন রাগী চোখে তাকায়। রাফি হিকহিকিয়ে হেসে ওঠে। তালহা আড়চোখে সামনের মিররে তাকায়, সেখানে মেহরীনের রাগী চোখ একদম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

—তুই নিজে চিকনা তাই বলে কি আমাকে মোটা বলবি?
মেহরীনের কথার মাঝে ফারিন পাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে ফোঁড়ন কাটে,
—দুটোই মুটি। আমার মতো পাতলা হলে আরামসে বসতে পারতি।
এই কথায় এবার দুজনই ফারিনের দিকে রাগী চোখে তাকায়। ব্যস, শুরু হয়ে যায় তাদের কথা-কাটাকাটি। মাঝে পড়ে যায় তাহিয়া। বেচারি কানে হাত দিয়ে বসে আছে। এদের থামতে না দেখে শেষমেশ তালহা এক ধমক দিতেই চুপ করে যায়।

সবাই বসে আছে রেস্টুরেন্টে। যার যেটা পছন্দ, সে সেটাই অর্ডার করেছে। খাওয়া-দাওয়া প্রায় শেষের দিকে। তালহা শুধু এক কাপ কফিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। দুপুরে অফিসেই লাঞ্চ সেরে নিয়েছিল। বাকিরা যখন শেষ কামড়গুলো নিচ্ছে, ঠিক তখনই তালহা চুপচাপ উঠে কোথায় যেন চলে গেল।
রাফিরও খাওয়া শেষ। মেয়েদের মতো এতো ঢং করে সময় নিয়ে খাওয়ার স্বভাব তার নেই। মেহরীনরা খেতে খেতে গল্পে মেতে আছে। এই নিয়ে, ওই নিয়ে। তাদের বকবকে একটু বিরক্ত হয়ে রাফি উঠে দাঁড়ায়। উদ্দেশ্য একটাই, তালহার কাছে যাবে। দুলাভাইয়ের সঙ্গে দু’কথা আড্ডা দিলে মন্দ কী।

খুঁজতে খুঁজতেই বাইরে গিয়ে তাকে পেয়ে যায়। রেস্টুরেন্টের বাগান সাইডে দাঁড়িয়ে আছে তালহা। নিকোটিনের ধোঁয়া আকাশে উড়িয়ে দিচ্ছে, আর জায়গায় দাঁড়িয়ে দূরের রেস্টুরেন্টের কর্নারের গ্লাসের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে আছে তাদের বসা টেবিলটার দিকে। রাফি ধীরে ধীরে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। তালহা তখনো খেয়াল করেনি। মনোযোগ দিয়ে কাউকে দেখছে। সেই দৃষ্টি অনুসরণ করতেই রাফির চোখ পড়ে মেহরীন আর তাহিয়ার ওপর। তাহিয়াকে নয়, এত মনোযোগ যে মেহরীনের দিকেই, সেটা বুঝতে একদম সময় লাগল না রাফির।
মুচকি হেসে উপস্থিতি জানান দিতে রাফি গলা খাঁকারি দেয়। তালহা চমকে পাশ ফিরে তাকায়। রাফিকে দেখে দ্রুত হাতে ধরা সিগারেটটা ফেলতে গেলে রাফি সঙ্গে সঙ্গে থামিয়ে দেয়,

—আরে আরে দুলাভাই, ইটস ওকে। এসব নরমাল, খান খান, সমস্যা নেই।
তবু তালহা দু’ফুঁক টেনে সি*গারেটটা ফেলে দেয়। পকেট থেকে সেন্টার ফ্রেশ বের করতে করতে জিজ্ঞেস করে,
—খাওয়া শেষ? আর কিছু নেবে না?
রাফি চারপাশে তাকিয়ে বলল,
—না না, পেট একদম ভরে গেছে। আর কিছু ঢোকার জায়গা নেই।
—ওহ। তা পড়াশোনার কী অবস্থা?
—এই তো, ভালোই। মাঝে মাঝে একটু গাড়ি ব্রেকফেল করে, পরে আবার কোনোমতে সামলাই।
রাফির কথায় তালহা হেসে ওঠে। এক হাত দিয়ে ওর পিঠে চাপড় দিয়ে বলল,
—এই বয়সটাই এমন, চারদিকে রঙিন জিনিস চোখে লাগে। পড়ালেখায় বিরক্তি আসবেই। কিন্তু তাই বলে পড়া বাদ দেওয়ার চিন্তা মাথায় আনবে না। তোমরা তো সবাই সাইন্সের?

—জি।
—ভালো করে পড়বে।
টুকটাক কথাবার্তার মাঝেই হঠাৎ তালহা প্রশ্ন করে বসে,
—তুমি তো মেহরীনকে ছোটবেলা থেকেই চেনো, তাই না?
রাফি মাথা ঝাঁকায়,
—হ্যাঁ। একসাথেই বড় হয়েছি। একই স্কুলে পড়তাম।
—ওর পরিবারকে ভালো করে চেনো?
রাফি আবার মাথা নাড়ায়। তালহা একটু থেমে গম্ভীরভাবে প্রশ্ন করে,
—মেহরীনের বাবা কি শহরে চাকরি করত?
রাফি একটু ভেবে বলে,

—যতদূর শুনেছিলাম, হ্যাঁ শহরেই।
—ওর বাবা-মায়ের বিয়ে প্রেমের ছিল?
রাফি এবার খানিকটা অস্বস্তিতে পড়ে। কয়েক সেকেন্ড ভেবে খুঁজে না পেয়ে বলল,
—ভাইয়া, সেটা তো জানি না। মেহরীন কখনো বলেছে কিনা তাও মনে আসছে না।
—ওহ আচ্ছা।
তালহা আবার চোখ ফেরায় মেহরীনের দিকে। কণ্ঠটা হঠাৎ অনেকটা নরম হয়ে আসে,
—আমি যে তোমাকে এসব প্রশ্ন করলাম, মেহরীনকে শুনিও না। আমি চাই না ওর পুরোনো জখম আবার তাজা হোক।
রাফি হেসে নিশ্চিন্ত গলায় বলল,

—নো টেনশন। আমি কিচ্ছু বলছি না।
তাদের এই টুকটাক হাসি–মশকরা কথাবার্তার মাঝেই রেস্টুরেন্টের গেট দুয়ে ঢোকে এক দম্পতি। লোকটার কোলে একটা ছোট বাচ্চা, এক হাতে ধরে আছে আরেকটা বাচ্চা, বয়স তিন বা চার হবে। আর মেয়েটার দু’পাশে দুটো বাচ্চা, একটার বয়স ছয় বা সাত, আরেকটা নয় বা দশের মতো। পুরো দলবল নিয়ে তারা ভেতরে ঢুকতেই রাফির মুখ আপনাআপনি হাঁ হয়ে যায়। মুখ ফসকে বলে বসে,
—উই মা! এ তো দেখি ফুটবল টিম বানাবে ভবিষ্যতে।
তার কথা শুনে তালহা শুধু শুকনো একটা হাসি হাসে। তাতে রাফির কিন্তু কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। অবাক চোখেই আবার প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,

—দুলাভাই, এখনকার দিনে এত বেবি নেওয়া রেয়ার কেস না?
তালহা কোটটা ঠিক করতে করতে বলল,
—কিছুটা। তবে এখন সবাই অনেক সচেতন।
রাফি চিন্তাভাবনা করতে করতে বলল,
—হুম, কিন্তু একটা জিনিস বুঝি না। আগের মানুষরা প্রতি বছরে বছরে বাচ্চা নিত কেন? ওরা কি কোনো কম্পিটিশন করত?
তালহা হাঁটা শুরু করে দেয়। পেছনে পেছনে রাফিও আসছে। যেতে যেতে তালহা শান্ত স্বরে বলল,

—কারণ তারা পরিশ্রম করত বেশি।
এইটুকু বলেই বড় বড় পা ফেলে সামনে এগিয়ে যায়। আর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রাফি প্রথমে কথাটার মানে ধরতে পারে না। দু’সেকেন্ড পর যখন অর্থটা মাথায় ঢোকে, বেচারা ছেলে হয়েও লজ্জায় লাল হয়ে যায়।
খাওয়া শেষ হতেই তালহা আরও একবার সবাইকে কড়া করে সাবধান করে দেয়। এ ধরনের কাজ যেন আর রিপিট না হয়। এরপর একে একে সবাইকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে নিজের বাড়ির দিকে রওনা দেয়। বাড়িতে পৌঁছাতেই মেহরীনরা গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। তালহা গাড়ি পার্ক করতে গ্যারেজের দিকে যায়।

সদর দরজা দিয়ে ঢুকতেই মেহরীন আর তাহিয়ার চোখ আটকায় সামনের মানুষটার ওপর। হাত, পা, মাথা, সবখানেই ব্যান্ডেজে মোড়া তাহসান সোফায় বসে আছে। এক হাতে মোবাইল, অন্য ব্যান্ডেজে মোড়া হাতটা সোফায় রেখেছে। তার দৃষ্টি স্থির দরজার দিকেই। মনে হচ্ছিল অনেকক্ষণ ধরেই যেন কারো অপেক্ষায় বসে আছে।
তাহিয়া জুতো খুলতেই দৌড়ে গিয়ে তাহসানের পাশে বসে পড়ে। পেছন পেছন মেহরীনও আসে।
—ভাইয়া, এখন কেমন লাগছে? কখন এলে?
তাহসান মেহরীনের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর শান্ত স্বরে বলল,

—ভালোই লাগছে। এগারোটার দিকে সিট কেটে এসেছি।
—ওহ! তা এখানে বসে কেন? রুমে গিয়ে রেস্ট নাও না।
তাহসান আড়চোখে মেহরীনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—অপেক্ষায় ছিলাম কারো।
তার কথা শুনে তাহিয়া কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—কার অপেক্ষা, ভাইয়া?
তাহসান কিছু বলতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই তালহা হাজির হয়। হাতে গাড়ির চাবিটা ঘোরাতে ঘোরাতে ভেতরে ঢোকে। তাহসানের উত্তরটা সে নিজেই দিয়ে দেয়,
—আমার অপেক্ষা করছিল, তাই না তাহসান?
তাহসান বিরক্তিতে তালহার দিকে তাকায়। তালহার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি দেখে বিরক্তিতে চোখ সরিয়ে নেয় সঙ্গে সঙ্গে।

—তোদের এত দেরি হলো কেন?
তাহিয়া খুশি মনে বলে ওঠল,
—ভাইয়া, আজ আমাদের ট্রিট দিয়েছিল!
—কিসের ট্রিট?
তাহিয়া কিছু বলতে যাবে, তার আগেই তালহা গলা তুলে বলে ওঠে,
—বাইরে থেকে এসে এখনো এখানে বসে আছিস? ফাস্ট গিয়ে ফ্রেশ হো, খাচ্চরের দল।
ভাইয়ের কথায় তাহিয়া মুখ ভেংচিয়ে মেহরীনের হাত ধরে রুমের দিকে যেতে নেয়। মেহরীন এতক্ষণ চুপচাপ থাকলেও যেতে যেতে তালহার দিকে চেয়্ব একটা ছোট ভেংচি কাটে। দু’জন চলে যেতেই তালহা হালকা হেসে ওঠে।
সে এগিয়ে গিয়ে তাহসানের সামনে দাঁড়ায়।

—কি অবস্থা, ভাঙাচোরা তাহসান ব্রো?
তাহসান রাগে হিসহিসিয়ে বলল,
—ভালো।
তা শুনে তালহা আরও কাছে চলে যায়। ডান হাতের আঙুল দিয়ে হঠাৎ করেই তাহসানের কপালের ব্যান্ডেজে একটা গুতো দিতেই,”আহহ” করে ব্যথায় চিৎকার করে ওঠে তাহসান। সঙ্গে সঙ্গেই ঝাঁঝালো স্বরে বলে ওঠে,
—আর ইউ ম্যাড?
তালহা কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলে,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৭

—নো, আই অ্যাম নট। বাট স্টিল নাও ইউ আর টু মাচ উইক, ব্রো। তাই বলছি অন্যের জিনিসের খেয়াল বাদ দিয়ে আগে নিজের খেয়াল রাখ। আমার জিনিসের খেয়াল আমি নিজেই রাখতে জানি।
এই কথা বলেই গটগট করে হেঁটে চলে যায় তালহা। পেছনে বসে থাকা তাহসান রাগে কয়েকবার গভীর নিশ্বাস টেনে নেয়। দাঁতে দাঁত চেপে বিরবিরিয়ে বলে ওঠে,
—ইউ ব্লাডি বিচ, আই উইল কিল ইউ….

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৯