Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭০

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭০

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭০
সাইদা মুন

আজ শুক্রবার। কিন্তু ছুটির দিনের সেই আরাম, অলসতা কিংবা দেরি করে ঘুম থেকে ওঠার বিলাস, এসবের কিছুই আজ এই বাড়ির গিন্নিদের ভাগ্যে নেই। সকাল থেকেই রান্নাঘর গমগম করছে। কড়াইয়ে মশলার ফোড়নের শব্দ, ভাজা পেঁয়াজের গন্ধ আর একসাথে অনেকগুলো নারীকণ্ঠের ব্যস্ত কথাবার্তায় পুরো বাড়িটাই যেন উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে বাড়ির মেয়েরাও কম ব্যস্ত না। সবাই মিলে বাগানের একপাশ গোছাতে নেমেছে। আজ পিকনিক হবে। প্রথমে ঠিক হয়েছিল সবাই বাইরে কোথাও যাবে, খোলা প্রকৃতির মাঝে দিন কাটাবে। কিন্তু বাড়ির অলস পুরুষদের দল শেষমেশ এমনসব যুক্তি দাঁড় করাল যে, “সপ্তাহে একটা দিন অন্তত পুরোটা সময় বাড়িতে কাটানো উচিত।” আসলে বাইরে না যাওয়ার জন্য সুন্দর একটা বাহানা ছাড়া কিছুই না।
তবে ছোটদের আবদার বলে কথা। তাদের উৎসাহ, হৈচৈ আর একরোখা জেদের কাছে শেষমেশ হার মানতেই হয়েছে সবাইকে। তাই বাড়িতেই আয়োজন। বাড়ির বিশাল বাগানটাকে যেন ছোট্ট এক উৎসবস্থলে পরিণত করা হয়েছে। নরম সবুজ ঘাসের উপর গোল করে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। চারপাশে ফুল আর ফলের গাছপালা, হালকা বাতাসে দুলছে পাতারা। একটু পাশেই নীলচে পানিতে ঝিলমিল করছে সুইমিংপুল। এই সুন্দর, শান্ত পরিবেশের মাঝেই সবাই একসাথে দুপুরের খাবার খাবে, ভাবতেই আলাদা এক প্রশান্তি লাগে।
দুপুর দুইটা বেজে দশ।

একে একে রান্নাঘর থেকে সব খাবার বাগানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কেউ হাতে ট্রে নিয়েছে, কেউ জগ, কেউবা প্লেটের স্তূপ, কেউ তরকারির বাটি। পুরো কাজটাই চলছে হাতাহাতি করে। মেহরীন সাবধানে দুই হাতে পোলাওয়ের বড় বোলটা ধরে এগোচ্ছিল। তানিয়া বেগম তাকে বারবার বলেছিলেন এটা না নিতে, ভারী হবে, অন্য কিছু নিতে। কিন্তু সবাই যখন যার যার হাতে কিছু না কিছু তুলে নিয়েছে, তখন আর কিছু অবশিষ্ট ছিল না। তাই শেষমেশ মেহরীন নিজেই এটা নিয়ে নিয়েছে।
বড় বোলটা সামলাতে সামলাতে খুব সতর্ক হয়ে হাঁটছে সে। যদি হাত ফসকে পড়ে যায়! তাহলে এত মানুষের দুপুরের আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবে। এই চিন্তায় তার ভ্রু কুঁচকে আছে। ঠিক তখনই দরজা পেরোতেই পেছন থেকে গম্ভীর স্বরে ডাক এল,

—স্টুপিড, দাঁড়াও।
মেহরীন দাঁড়িয়ে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই তার চোখ দুটো থমকে গেল। তালহা দাঁড়িয়ে আছে। মেহরীনের মুখটা অটোমেটিক হা হয়ে গেল প্রায়। লাল পাঞ্জাবি পড়েছে সে। কিন্তু নামাজে যাওয়ার সময় তো সাদা পরেছিল! তাহলে বদলালো কখন? কেন? তাকে পাগল করে দেওয়ার জন্য নাকি? নানান ভাবনা ভাবতে ভাবতেই মেহরীন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল। চুলগুলো সুন্দর করে সেট করেছে। এত পরিপাটি হতে কে বলেছে তাকে। একটু বেশি সুন্দর লাগছে না? মনে মনে প্রশ্নটা আওড়াচ্ছে সে। পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। খুব আস্তে, নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল,
—একটু বেশি সুন্দর লাগছে, একদম আমার লাল কুর্তা ওয়ালা।
তালহাকে একদৃষ্টে দেখছে, যেন চোখ সরাতে ইচ্ছাই করছে না। ঘাড়টা একটু কাত করল অজান্তেই গুনগুন করে উঠল,

“রসিক দিলকা জ্বালা,
ওই লাল কুর্তা ওয়ালা,
দিল এ বড় জ্বালা রে পাঞ্জাবি ওয়ালা..”
তালহা তখন ফোনে কারও সাথে কথা বলছিল। সেভাবেই এগিয়ে এল। তারপর কিছু একটা বলে কান থেকে ফোনটা নামিয়ে কল কেটে মোবাইলটা পকেটে রাখল। একদম সামনে এসেই কোনো কথা না বলে মেহরীনের হাত থেকে বোলটা নিয়ে নিল। তারপর কপাল কুঁচকে, বিরক্ত গলায় বলল,
—এই ভারী জিনিস তোমাকে নিতে কে বলেছে?
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে গালভরা একটা হাসি দিল। সেই হাসিতে ছিল দুষ্টুমি, মায়া, আর একটু নির্লজ্জ আদুরে ভাব। সেভাবেই বলল,

—কেউ বলেনি তো। কিন্তু আপনাকে সুন্দর লাগছে।
তালহার ভ্রু আরও কুঁচকে গেল,
—তাহলে তোমার হাতে এটা কী করছিল?
মেহরীন ঠোঁট কামড়ে ছোট্ট করে হেসে বলল,
—আরে আমি একটু সাহায্য করতে চাচ্ছিলাম।
তালহা চোখ রাঙিয়ে তাকাল,
—পণ্ডিতি কম করো।
বলেই তালহা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। পোলাওয়ের ভারী বোলটা নিজে সামলে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বাগানের দিকে হাঁটা দিল। আর মেহরীন যেন মুহূর্তেই বাস্তবে ফিরে এল। অবাক হয়ে সে দ্রুত পা বাড়িয়ে তালহার পিছু নিল।
—এই! আপনি কী করছেন? দেন আমার কাছে। আমি নিয়ে যেতে পারব।
তালহা হাঁটার গতি একটু কমাল। তারপর আড়চোখে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

—নিজের দুই কেজির শরীর নিয়ে হাঁটতেই পারো না, চৌদ্দবার উল্টে পড়ো। আবার এই চার কেজি সামলাতে পারবে? হোয়াট অ্যা জোক!
কথাটা শুনে মেহরীনের চোখ-মুখ গরম হয়ে উঠল। এতক্ষণ ধরে মনে মনে যে রোমান্টিক দৃশ্যগুলো সাজাচ্ছিল, নিমিষেই সব কেমন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। এই মানুষটার প্রশংসায় সে কিনা একটু আগেই মনে মনে কবিতা লিখে ফেলছিল প্রায়, আর সেই মানুষটাই তাকে নিয়ে এমন অপমানজনক কথা বলছে। রাগে গাল ফুলিয়ে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল,
—এই, আমাকে একদম অপমান করবেন না। নইলে কিন্তু খারাপ হবে।
তালহা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তারপর একদম নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
—আমার বউ, আমি যা খুশি করব।
মেহরীন থমকে গেল এক সেকেন্ড। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই রাগটা আবার মাথা চাড়া দিল। মুখ গম্ভীর করে বলল,

—তাহলে আমিও প্রতিদিন সকালে আর আপনার টাই ঠিক করে দেব না।
তালহার পা এবার সত্যিই থেমে গেল। সে ঘুরে তাকাল মেহরীনের দিকে। কপালে হালকা ভাঁজ পড়েছে। বিস্ময় মেশানো গলায় বলল,
—কেবল একদিনই তো হলো এই ডিউটির। আজই এই নিয়ে ফায়দা লুটতে চাচ্ছো?
মেহরীন মুখ ভেংচে তার পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
—একদিন হোক আর দশদিন হোক, আমি আর আপনার এই ডিউটি করতে রাজি নই। গেট আউট!
এবার তালহাই উল্টো তার পিছু নিল,
—দেখো বউ, আমি তো মজা করছিলাম।
—কোনো মজাটজা বুঝি না।
—এজন্যই তো বলি, বাচ্চা।
মুহূর্তেই মেহরীন দাঁড়িয়ে গেল। কোমড়ে দুই হাত রেখে পেছন ফিরে চোখ বড় বড় করে চিৎকার করে উঠল,
—কিইইই?!

তালহা অবশ্য এমন ভাব করল যেন কিছুই শোনেনি। দ্রুত পাশ কাটিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
—আসো আসো, বসো। সবাই আমাদের জন্য ওয়েট করছে।
বলেই সে আগে আগে চলে গেল। পেছনে মেহরীন নাক ফুলিয়ে, বিরক্ত মুখে হাঁটতে লাগল। তবে সেই রাগের মাঝেও তার চোখে-মুখে অদ্ভুত এক উজ্জ্বলতা বিরাজমান। ভালোবাসার মানুষের সাথে এমন একটু আধটু খুনসুটি করতে কারই না ভালো লাগে।
বাগানে এসে দেখা গেল সবাই গোল হয়ে বসে পড়েছে। মাঝখানে একের পর এক খাবার সাজানো। পোলাও, রোস্ট, সালাদ, কাবাব, গরুর মাংসের তরকারি, মাছ ভুনা নানান লোভনীয় খাবার সব মিলিয়ে পুরো জায়গাটাই জমজমাট হয়ে উঠেছে। তালহা নিজের জায়গায় বসতে বসতেই পোলাওয়ের বোলটা সবার মাঝে নামিয়ে রাখল। তা দেখে আশপাশের সবাই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
ঠিক তখনই তালহার পাশে এসে বসেল মেহরীন। সবার অদ্ভুত দৃষ্টি টের পেয়ে তালহা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

—কী সমস্যা? আমাকে জীবনেও দেখোনি নাকি?
বিল্লাল সাহেব এক আঙুল দিয়ে দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে গভীর ভাব নিয়ে বললেন,
—ভাতিজা, তোকে তো সেই ল্যাংটা কাল থেকেই দেখে আসছি। তবে আজ কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে।
কথাটা শেষ হতেই তাহিয়া পাশ থেকে খোঁচা মেরে বলল,
—আরে বোঝো না? বউয়ের বাতাস! বউয়ের বাতাস!
সঙ্গে সঙ্গে পুরো জায়গাজুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল। বড়রা মাথা নিচু করে হাসছে। সকলের কান্ড দেখে তালহা চোয়াল শক্ত করে বসে আছে। আর মেহরীন বেচারি চোরা চোখে বারবার তালহার দিকে তাকাচ্ছে। তার জন্যই মানুষটা এখন সবার হাসির পাত্র হয়ে গেছে, এই ভেবে কেমন যেন অপরাধবোধও হচ্ছে একটু। আবার হাসিও পাচ্ছে। একেকজন একেকভাবে মজা উড়াভভহে দেখে তানিয়া বেগম বিরক্ত হয়ে তালহার পক্ষ নিয়ে বলে উঠলেন,
—বলি হারি বাপু! নিজে তো বউকে আজ অবধি এক গ্লাস পানিও এগিয়ে দাওনি। উল্টো তোমার হাতের কাছের জিনিসটাক হাতে তুলে দিতে হয় আমার। আবার ছেলের কাজ নিয়ে হাসাহাসি করো! ন্যূনতম লজ্জা থাকা দরকার। কোথায় ওর থেকে শিক্ষা নেবে, তা না নির্লজ্জের মতো হেসেই যাচ্ছ।
বিল্লাল সাহেবের হাসি সঙ্গে সঙ্গে উধাও। তিনি থতমত খেয়ে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তারপর গলা নরম করে মিষ্টি হেসে বললেন,

—ডার্লিং, স্বামীর সেবা করা সওয়াবের কাজ। আর আমি চাই আমার বউ বেশি বেশি সওয়াব অর্জন করুক। তাই কাজ একটু…
প্রকাশ্যে এমন সম্বোধন শুনে তানিয়া বেগম লজ্জায় লাল হয়ে গেলেন প্রায়। দ্রুত স্বামীকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,
—ইসস! রিতুর আব্বু, মুখে লাগাম দাও। ছেলেমেয়েরা সামনে বসে আছে।
বিল্লাল সাহেব অবশ্য নির্বিকার। একটা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন,
—ছেলেমেয়েরা এখন যথেষ্ট বড় হয়ে গেছে। এসব কিছুই না, সিম্পল। এখনকার যুগে সব চলে।
বলেই তিনি সবার দিকে তাকালেন,
—কিরে, ঠিক বললাম তো?
সঙ্গে সঙ্গে তালহা বাদে সবাই একসাথে লম্বা সুর টেনে বলে উঠল,
—ইয়েসসসস, ডার্লিংগগগ…!

পরপরই আবার হাসি-তামাশা শুরু হয়ে গেল। পুরো বাগানজুড়ে প্রাণচাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কাউকে খোঁচা দিচ্ছে, কেউ জোরে হেসে উঠছে, কেই জোকস বলছে আবার কেউ খাবার বাড়তে বাড়তে গল্পে মেতে উঠেছে। বড়রা একে একে সবার প্লেটে খাবার তুলে দিতে লাগলেন। আর বাকিরাও আরাম করে খেতে খেতে গল্পে যোগ দিল।
খোলা আকাশের নিচে, চারপাশে দুলতে থাকা গাছপালা আর নরম বাতাসের মাঝখানে পরিবারটার এই ছোট্ট আয়োজনটুকু যেন এক টুকরো শান্তি হয়ে উঠেছিল। সিকদার বাড়ির বাগান আজ সত্যিই ঝমঝমাট। দূর থেকে দেখলেও বোঝা যায়, এরা শুধু একই ছাদের নিচে থাকা কিছু মানুষ না, এরা একে অপরের আপন। আশেপাশের বাড়ির অনেকেই জানালা কিংবা বারান্দা থেকে অন্তত একবার হলেও উঁকি দিয়েছেন। কারও মুখে ঈর্ষা নেই, বরং একরাশ মুগ্ধতা। তাদের এই মিলেমিশে থাকা, একসাথে হাসা, খুনসুটি করা দেখে প্রায় সবার মুখ থেকেই অজান্তে বেরিয়ে এসেছে, মাশাল্লাহ।
এই সময়ে এসে, যেখানে এক ছাদের নিচে থেকেও মানুষ দূরে সরে যায়, সেখানে তারা এখনও যৌথ পরিবার আঁকড়ে ধরে আছে। একে অপরের সাথের ভালোবাসাপূর্ন বন্ধন টিকিয়ে রেখেছে। এই দৃশ্যটাই যেন আলাদা এক উষ্ণতা ছড়াচ্ছে চারপাশে।
খাওয়াদাওয়া শেষ হতেই সবাই থালাবাসন গুছিয়ে রেখে এসে আবার ঘাসের উপর আরাম করে বসল। আবহাওয়াটাও যেন আজ তাদের পক্ষেই। না খুব ঠান্ডা, না গরম, একদম মন ভালো করা একটা বিকেল। তাহিয়া হঠাৎ লাফিয়ে উঠে বলল,

—আম্মু, মোবাইল দাও! সেলফি তুলব। এই সময়টার একটা মেমোরি রাখতে হবে তো নাকি।
তার উচ্ছ্বসিত গলায় সবাই আবার হেসে উঠল। মোবাইল হাতে নিয়ে তাহিয়া একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল। বাকিরা নিজ নিজ জায়গা থেকেই ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে পোজ দিল। তাহিয়া স্ক্রিনে তাকিয়ে সবার অবস্থান দেখে হঠাৎ বলে উঠল,
—মেহরীন, আরেকটু বামে যা।
মেহরীন কথামতো একটু সরে বসল। কিন্তু তাহিয়া আবারও বলে উঠল,
—আরে ভাই! তোকে দেখা যাচ্ছে না। আরও বামে সর।
মেহরীন এবার একবার পাশে তাকাল, আরেকবার বাকিদের দিকে। বামে তালহা বসে আছে। আরও একটু সরলেই প্রায় গা ঘেঁষে বসতে হবে। তবুও অস্বস্তি নিয়ে একটু নড়ে বসতেই তাহিয়া আবার নাটকীয় গলায় বলে উঠল,
—হয়নি! ভাইয়ার দিকে আরও সরে আয়!
সঙ্গে সঙ্গে মেহরীন চোখ রাঙিয়ে তাকাল। দেখল তাহিয়া, মেহেদি আর রিতু মিটিমিটি হাসছে। এমনকি ফাইজার ঠোঁটেও চাপা হাসি। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখা গেল তালহাও ঠোঁট চেপে হাসছে। মুহূর্তেই বুঝে গেল, সব ভাইবোন মিলে ইচ্ছে করেই তাকে বিব্রত করছে।

সকলের মাঝে শুধু ফারাহই ব্যতিক্রম। সে অনুভূতিহীন মুখে একদৃষ্টে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এই মুহুর্তের কোনো ঘটনাই তার চোখে পৌছায়নি। মেহরীন কিছু বলার আগেই তালহা নড়েচড়ে বসল। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ডান হাত বাড়িয়ে মেহরীনের ডান বাহু ধরে হালকা টানে নিজের কাছে এনে নিল। মুহূর্তেই মেহরীনের বাম বাহু গিয়ে ঠেকল তালহার বুকে। সে চমকাল বেশ। বিভ্রান্তিতে পড়ল সকলের সামনে। তালহা অবশ্য এতে বিন্দুমাত্র বিচলিত না। বরং বাম হাত বাড়িয়ে পাশে বসা তিতলি বেগমকেও জড়িয়ে নিল একইভাবে। দু’হাতে দু’জন প্রিয় মানুষকে আগলে রেখে তাহিয়ার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
—এবার?
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে উৎফুল্ল হয়ে উঠল,
—সুপার পারফেক্ট!
তাদের দেখে রিতুও পাশ থেকে ফাইজাকে জড়িয়ে ধরল। ফাইজা আবার টেনে নিল ফারাহকে। অন্যদিকে বিল্লাল সাহেবও কম যান না। এক হাতে মেয়েদের, অন্য হাতে নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে আগলে নিলেন। আলতাফ সাহেবও ছেলেবউকে কাছে টেনে নিলেন মৃদু হাসিতে। মুহূর্তটার মাঝে কোমল উষ্ণতা এসে হাজির হল। আপাতত যেন পুরো পৃথিবীর ভালোবাসা এসে এই এক টুকরো বাগানেই জড়ো হয়েছে।
তাহিয়া ক্যামেরা তাক করে চিৎকার করে বলল,

—স্মাইল প্লিজ!
বলতেই সবাই হেসে উঠল একসাথে। ক্লিক করল সে। একটা দুইটা পরপর কয়েকটা ছবি তুলে ফেলল সে। তারপর আবার দৌড়ে গিয়ে একটু দূরে স্ট্যান্ডে মোবাইল সেট করল। টাইমার অন করে ছুটে এসে মায়ের পাশে বসে তিতলি বেগমকে জড়িয়ে ধরল। সে কেন এই সুন্দর দৃশ্য থেকে বাদ যাবে?
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ক্যামেরায় ধরা পড়ে গেল পুরো পরিবারটার সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর একটি। একটা ছবি, যেখানে ছিল হাসি, খুনসুটি, ভালোবাসা আর একসাথে থাকার নিশ্চিন্ত উষ্ণতা। সেই মুহূর্তটা হয়তো সময়ের সাথে ফিকে হবে না কখনও। স্মৃতির পাতায় ঠিক এভাবেই থেকে যাবে আজীবন। এর সাথেই আরও একটু দৃঢ় হয়ে উঠল সিকদার পরিবারের বন্ধন।

সন্ধ্যা তখন ঠিক ছয়টা ছুঁইছুঁই।
দিনের আলো পুরোপুরি মুছে যায়নি এখনো, তবে আকাশের গায়ে নরম অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। বাড়ির চারপাশে একে একে জ্বলে উঠেছে আলো। প্রতি শুক্রবারের মতো আজও সিকদার বাড়িতে জমে উঠেছে আড্ডার আসর।
ড্রইংরুমজুড়ে সবাই গোল হয়ে বসে আছে। কেউ সোফায় হেলান দিয়ে, কেউ কার্পেটের উপর আধশোয়া হয়ে। হাতে কারও চায়ের কাপ, কারও ফলের বাটি। রিতুকে দেখতে এসেছিল দুদিন আগেই। কথাবার্তাও অনেকটা পাকা। সব ঠিক থাকলে আর এক মাস পরই এঙ্গেজমেন্ট। আর সেই নিয়েই এখন বাড়িতে আলাদা উত্তেজনা।
দুই মেয়ের অনুষ্ঠান একসাথেই করার ইচ্ছে সবার। তাই কে কী পরবে, কোথা থেকে শপিং হবে, গয়না কেমন হবে, কিভাবে কি হবে, এসব নিয়েই চলছে হইচই আর আলোচনা।
তাহিয়া হাত নেড়ে নেড়ে বলছে,
—আমি কিন্তু আগে থেকেই বলে দিচ্ছি, আমার ড্রেসটা সবার থেকে আলাদা হতে হবে।
সঙ্গে সঙ্গে মেহেদি বলে উঠল,
—তোমাকে আলাদা করার দরকার নাই। তুমি এমনিতেই সার্কাসের জোকারের মতো আলাদা।
—এইইই!

বলেই কুশন ছুড়ে মারল তাহিয়া। আর তাতেই লেগে গেল দুজনের তর্কাতর্কি। বয়সে একে অপরের ছোট হলেও ঝগড়ায় তারা টম এন্ড জেরি। হেসে উঠল সবাই এদের কান্ডে। পাশে ফাইজা মোবাইল হাতে বসে একের পর এক ডিজাইনারের ড্রেস দেখাচ্ছে। তিতলি বেগম আর তানিয়া বেগম এবং সালমা বেগম মিলে সিরিয়াস মুখে আলোচনা করছেন কোন রঙ কার উপর মানাবে।
রিতু লজ্জায় মুখ নিচু করে বসে আছে, কিন্তু মাঝেমধ্যেই ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ফুটে উঠছে। পাশে বসা ফারাহ মাঝে মাঝেই তাকে নানান খোঁচামূলক কথা বলে উস্কানি দিচ্ছে। আরও লজ্জায় ফেলছে। এই হাসি-আনন্দের মাঝেই হঠাৎ বাড়ির কলিংবেলটা বেজে উঠল।
এক মুহূর্তের জন্য কথাবার্তা থেমে গেল। তাহিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
—এসময় আবার কে আসল?
মেহরীন তখনই উঠে দাঁড়াল,
—আমি দেখে আসছি।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৯ (২)

খুশিমনেই দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে। হাঁটার মাঝেও ড্রইংরুমের দিক থেকে ভেসে আসা হাসির শব্দ শুনে নিজের অজান্তেই ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। এক প্রশান্তির হাওয়া বয়ে গেল ভেতর দিয়ে। তার পরিবার এটাই তার হাসিখুশি পরিবার। হাসি ঠোঁটে রেখেই দরজা খুলল। পরক্ষণেই সেই হাসিটা মিলিয়ে গেল। তার মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে এল। চোখদুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠল আতঙ্কে। হাতটা ধীরে ধীরে দরজার হাতল থেকে সরে গেল। সে দু’কদম পিছিয়ে এল প্রায় টলতে টলতে। ঠোঁট কাঁপছে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় অস্ফুট স্বরে বলল,
—ত..তুমি এখানে..?

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭১