প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪৯
সাইয়্যারা খান
তৌসিফ পৌষকে নিয়ে বেরিয়ে আসছিলো হঠাৎ কদম থামলো পর। তৌসিফ ক্লান্ত বদনে বললো,
“আজ আর প্রশ্ন নয় পৌষরাত।”
“আমাকে একটু শক্ত করে ধরুন।”
তৌসিফ দেখলো, বুঝলো তার স্ত্রী অসুস্থ হচ্ছে। প্রশংসার যোগ্য তার পৌষরাত, নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এত বড় এক অতীতের পৃষ্ঠা পড়েছে সে। সচক্ষে দেখেছে কতকিছু। কিছুটা মানসিক ধাক্কা খাবে এটাই স্বাভাবিক। ওরা যখন বাগান বাড়ী থেকে বের হলো তখন সন্ধ্যা শেষ পথে। আকাশ জুড়ে চাঁদের চিকন রেখা দৃশ্যমান যার প্রতিফলন স্পষ্ট কালো কুচকুচে ঘাটের পানিতে। বাইরে এসেই টেনে টেনে শ্বাস নিলো পৌষ। কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম শুকিয়ে এলো। ঠান্ডায় হাড় কাঁপবে এমন অবস্থা দেখা দিলো। তৌসিফ নিজের সাথে চেপে আগলে ধরে পৌষকে। আচমকা এতটা নীরব পৌষ হবে তা অন্তত তৌসিফ ভাবে নি। ঘাট পাড় দিয়ে অতিক্রম করার সময় পৌষ আচমকাই মিনমিন করলো,
“এই ঘাটে ল্যাদা ভাইয়ের লা’শ এসেছিলো কিভাবে? সম্রাট চেয়ারম্যান নেই খুনখারাপি কে করে এখানে?”
তৌসিফ হাঁটার গতি থামায় না৷ হাঁটতে হাঁটতেই উত্তর করে,
“শাকি খালার আরেকটা ছেলে ছিলো তুমি জানতে?”
“হ্যাঁ, উনি মারা যাওয়ার পর থেকেই তো খালা কিছুটা পাগল পাগল হয়ে থাকতো।”
“বাগান বাড়ীর ওখানে যেই বাঁশঝাড় সেখানেই মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিলো তার বড় ছেলেকে। সম্রাট ভাইজানের আপন খালাতো ভাই তিনি।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“আপন ভাইকে মেরে ফেললো?”
পৌষ ক্লান্ত হয়েই যেন নিজেকে প্রশ্নটা করলো তবে উত্তর দিলো তৌসিফ। বললো,
“ওটা ভুল ছিলো। ভাইজানের দরবারে কোন এক সভা ছিলো। ভাইজান সেদিন খুব খুশি ছিলো কারণ জানা নেই আমার। নেশার পরিমাণ বেশি থাকায় হয়তো কিছুটা মাতাল ছিলেন। হাতে পিস্তল ছিলো, নেশার ঘোরে ভুলে শ্যুট করে দেন। খেয়াল হতেই বাঁশঝাড়ে মাটি চাপা দেন তাকে। সাথে সবাই ছিলো। ভাইজান যেদিন মারা গেলো তার পরদিন কেউ একজন শাকিখালাকে জানিয়েছিলো তার ছেলের মৃত্যুর কথা। ততবছর খালা আশায় ছিলেন তার ছেলে ফিরবে, হয়তো কোথায় গিয়েছে কিন্তু সত্যি জানার পর থেকেই অভিশাপ ঝড়া শুরু হয় তার মুখে। অনেকে বলে, তার অভিশাপে আজও সম্রাট ভাইজানদের এই অবস্থা।”
পৌষ স্তব্ধ হয়ে শুনলো। ওদের পেছনে কিছু পদচারণ শুনতে পেলো পৌষ। বুঝলো তৌসিফ একা আসে নি। যথাসম্ভব সুরক্ষা নিশ্চিত করেই এসেছে৷
বাড়ীতে ফেরার পর পৌষ সত্যিই বমি করলো। মাথা ব্যথায় অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো। সকালের পর খাওয়া হয় নি ওদের। এতোদিনের প্রশ্ন গুলোর এত এত উত্তর শুনে পৌষের মতো সাধারণ মেয়ে সামলে উঠতে পারে নি। তৌসিফ ওকে একেবারে গোসল সেরে আসতে বললো। পৌষ কোনমতে দূর্বল হাতে গোসল সারে। বেরিয়ে আসতেই ওর হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে কিছু বলার আগেই লক্ষ্য করে ভীষণ কাঁপছে পৌষ। হিটারটা ওর সামনে রেখে কপালে ছোট্ট করে ওষ্ঠ ছোঁয়ালো তৌসিফ। অপেক্ষা করতে বলে নিজেও গোসল সেরে আসলো।
রোজকার নিয়মে আজ ভাটা পড়লো। পৌষ নিজ হাতে বেড়ে খাওয়াতে পারলো না। ওকে এতটা অসুস্থ হতে বিচলিত হয় তৌসিফ। পাশে বসে নিজ হাতে লোকমা বানিয়ে মুখে তুলে দিলো। পৌষ খাওয়ার মাঝেই বললো,
“কাল হেমু ভাইকে আসতে বলবেন সবাইকে নিয়ে। ওদের দেখি না কতদিন।”
“বললে এখনই আসবে। পাঁচ মিনিটের দূরত্ব।”
“না, বাইরে কত ঠান্ডা।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে।”
“আর খাব না।”
“আর এক লোকমা। মাথা ব্যথার ঔষধ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
“উহুম। একটু ঘুমাব। আপনি কি বাইরে যাবেন?”
“একটু অফিসে বসব নিচে। কেন বেশি খারাপ লাগছে? ডাক্তার ডাকব হানি? আর ইউ ওকে?”
তৌসিফকে এই দফায় ভীষণ উদ্বীগ্ন দেখালো। পৌষ হাসার চেষ্টা করে তাতে বিশেষ লাভ হয় না। শুধু জড়িয়ে আসা গলায় বলে,
“আমার না অস্থির লাগছে। একটু ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে এরপর যাবেন।”
তৌসিফ এতটুকুতে ক্ষ্যান্ত রইলো না৷ খায়িয়ে কপালে মলম দিয়ে মালিশ করে বুকে নিলো পৌষকে। চুলের ভাজে হাত ঢুকিয়ে এলোমেলো টেনে দিতে লাগলো নরম হাতে। পৌষ আরাম পায়। মাঝে জানায়,
“পিঠে ব্যথা করছে।”
তৌসিফের হাত চুল ছেড়ে পিঠে গেলো। পৌষের আগে কখনো এহেন সেবার প্রয়োজন পরে নি৷ নিজেকে খুব সামলাতে জানে সে। অসুস্থ শরীর একা রাত জাগতে জানে সে। আজ যখন এত কাছের কেউ এভাবে আগলে নিতে শুরু করলো তখন ধীরে ধীরে পৌষও খোলস ছেড়ে মুক্ত হতে লাগলো। নিজের প্রয়োজন অকপটে স্বীকার করতে লাগলো। জড়তা ওর মাঝে কখনোই ছিলো না। সামনের মানুষটা যখন তৌসিফ তখন জড়তা তার শূন্যের কোটায়।
এরমাঝে প্রায় আট দিন কেটেছে। স্বাভাবিক ভাবেই সবটা মেনে নিয়েছে পৌষ তবে মনের কোন এক কোনায় ভীষণ অপরাধবোধ কাজ করে আজ-কাল। হীনমন্যতা কাজ করে নিজের মাঝে। নিজের অজান্তেই মানুষ মানুষকে কতটা মন দিয়ে থাকে। শুধু কি পৌষ? কতকত ছেলেমেয়ে, প্রবীন থেকে জোয়ান সবাই তো সম্রাট চেয়ারম্যান বলতেই মাথা নুয়ে নেয়। কত সম্মান, কত মর্যাদা, কত আদর্শ, কতই না অবদান অথচ তার মাঝে থাকা দ্বৈত্ব সত্তা কেউ জানতো না। একই ব্যক্তির রাজনৈতিক আর ব্যাক্তিগত জীবন কতই বৈচিত্র্য ছিলো। তার জীবনেও কিছু কিছু ধাক্কা ছিলো অথচ এক অপরাধ রাজ্য গড়ে তুলেছিলো সে। কি অদ্ভুত মিল ভাইদের চোখে, মুখে অথচ আচার-আচরণ আকাশ-পাতাল তফাত! সেই ভাইয়ের পাপে পরিপূর্ণ সেই সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে বোনের কতই না অবদান। তাহমিনার সাথে পৌষ দেখা করেছে ইতিমধ্যে। তৌসিফ থেকে অনুমতি নিয়েই গিয়েছিলো অবশ্য। এক বিকেল সেখানে ছিলো পৌষ। তাহমিনা ততক্ষণে জানে পৌষকে নিয়ে তৌসিফ সেখানে গিয়েছিলো। পৌষ যখন স্বাভাবিক ভাবে কথা বলছিলো তখনই তাহমিনা হঠাৎ জিজ্ঞেস করে,
“শাহরিয়ারকে দেখেছিলে?”
পৌষ হকচকায় না। উত্তর করে,
“বাইরে থেকে দেখেছিলাম।”
“ও খুব শান্তশিষ্ঠ ছিলে বুঝলে। কোন মারপ্যাঁচ ছিলো না ওর মাঝে। আমার এই ভাইটাকে রক্ষে দিলো না কেউ। খাবারের মধ্যে কি দিয়ে মাথাটা নষ্ট করে বদ্ধ উন্মাদ করে দিলো। আমি ওকে সুস্থ করতে কি না করেছি পৌষ। সব করেছি। দেশ, বিদেশ, এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি সব! কিছুই বাদ রাখি নি৷ আমার ভাই সুস্থ হয় নি। ও যদি শুধু একটু স্বাভাবিক হতো তাহলেই হতো। ওর একটা সংসার হলে আমি মরেও শান্তি পেতাম।”
“বদ্ধ উন্মাদের কাছে মেয়ে পাঠানো আপনার ব্যাক্তিত্বের সাথে যায় না আপা।”
তাহমিনা হঠাৎই কেমন জানি গুমোট হয়ে এলো। তাকালো কাঠের জানালা দিয়ে বাইরের আকাশে। আকাশে তখন নতুন মাসের চাঁদ। তাহমিনা বেখেয়ালি হয়ে বলতে লাগলো,
“তুমি জানো পৌষ, আমি শাহরিয়ারের জন্য সর্বশেষ কোনপথে নেমেছি?”
প্রশ্নটা করেও তার মাঝে পৌষের উত্তর শোনার কোন তাগাদা দেখা গেলো না৷ ধীর শব্দে তাহমিনা একাই বলতে থাকলো,
“আমি তান্ত্রিক ধরেছিলাম আজ থেকে দুই বছর আগে। সেই অনুযায়ী চার রাস্তার মোড়ে রোজ বৃহস্পতিবার ছাগল জবাই করা হয়। বাঁশঝাড়ের ওখানে যখন ভরা চাঁদ থাকে তখন মানত করে নামাজ পড়তে হয়। রোজ বৃহস্পতিবার কলাপাতায় করে ক্ষীর, নতুন গামছা দিয়ে এক টাকার কয়েন সেই ঘাটে ভাসিয়ে দিতে হয় অতঃপর একটা করে মেয়ে পাঠানো হয়। এতকিছু শুধু মাত্র একটা কারণে, যাতে শাহরিয়ার অন্তত একটাবার বাবা হতে পারে। ওর সন্তান এলেই তো আমাদের বংশ আগাবে। আমাদের বংশ এভাবে হারিয়ে যেতে পারে না৷”
পৌষ অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। এমন শিক্ষিত মানুষ এগুলোর সাথে জড়িয়ে গেলো কিভাবে? হতভম্ব কণ্ঠে পৌষ বললো,
“আপনি শিরকে লিপ্ত আপা! এর শাস্তি জানেন? বংশের ছেলে আদি আছে না?”
“নাহ্। চাচাতো ভাইয়ের বংশ আমাদের বংশ না!”
“তাই বলে সরাসরি শিরক করবেন?”
তাহমিনা একথার উত্তর দিলো না৷ তৌসিফ ঢুকেছে তখন। এসে বসতেই তাহমিনা হালকা হেসে বললো,
“ভাত বাড়ি। দু’জন খেয়ে যাবি।”
তৌসিফ কিছু বলার আগেই পৌষ সরাসরি না করে দিলো। একজন ইমানহারা মানুষের ঘরের ভাত তো দূর পানিও পৌষ পান করবে না।
“কি করছো হানি?”
তৌসিফের ডাকে পৌষ বাস্তবে ফিরলো। ভেজা চুল মুছতে মুছতে তৌসিফ বিছানার কাছে এসে দুষ্ট হেসে বললো,
“কি ভাবছিলে? আমাকে?”
বলেই চোখ টিপলো। পৌষ গাল ফুলিয়ে হাসলো। তৌসিফ ওর নাক টেনে বললো,
“উঠো পরো। ক্লাস আছে না আজ?”
“হুঁ।”
পৌষ নামে। ঘাড়ে হাত দিয়ে রাখতেই তৌসিফ হাত ধরলো। কপাল কুঁচকে তাকাতেই পৌষ বললো,
“মনে হচ্ছে ভুলভাবে ঘুমিয়েছিলাম।”
তৌসিফ চোখে হাসলো। কানে ফিসফিস করে কিছু বললো। পৌষ নিজেও মৃদু হাসে। চপল পায়ে এগিয়ে যেতে যেতে বলে,
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪৮
“তারাতাড়ি ব্যায়াম-ট্যায়াম করে আসুন। আজ ঘি দিয়ে পরাটা ভেজে দিব।”
তৌসিফ হাসতে হাসতে জিম স্যুট পড়ে। যেতে যেতে বলে,
“সাথে একটা গরম চুমু মন্দ হবে না।”
“সখের তো শেষ নেই।”
“কেন থাকবে? একটা মাত্র বউ আমার।”
পৌষ কথা বাড়ালো না। আয়নায় দেখলো নিজের ভেঙে আসা চেহারা।
