Home প্রেমসুধা সিজন ২ প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৯

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৯

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৯
সাইয়্যারা খান

মুখচোখ শক্ত করে রেখেছে পৌষ। তুহিন এসেই ধপ করে বসেছে মুখ বরাবর কাউচে। ওখানে থাকা কুশনটা টেনে নিজের কোলে নিয়েছে। পৌষের তা দেখেই রাগ উঠেছে। ওই কুশনটা তাকে তৌসিফ দিয়েছে। চার মাস আগে পৌষকে ভার্সিটি থেকে নিতে গিয়েছিলো তৌসিফ। পৌষের তখন হাতে টাকা ছিলো। তায়েফা দিয়েছিলো তাকে। তৌসিফকে বলে পৌষ নিউমার্কেট যেতে চাইতেই তৌসিফ তাকে অন্য কোথাও যাওয়ার অফার করেছিলো। পৌষ মানে নি। হাতেগোনা বাজেট ছিলো ওর। তৌসিফ এতকিছু তো জানতো না। গাড়ি ঘুরিয়ে বউ নিয়ে নিউমার্কেটেই এসেছিলো। দুই নাম্বার গেটে নামতেই তৌসিফের মনে হয়েছিলো জানটা বেরিয়ে যাচ্ছে। মানুষের এত ভীর যা বলার বাইরে।

পৌষ শক্ত করে তৌসিফের ডান হাতটা ধরেছিলো। মহিলাদের মাঝখান দিয়ে কিভাবে যেন খুব সতর্কতার সাথে তৌসিফকে বের করে ভেতরে ঢুকেছিলো। সেদিন তৌসিফ দেখেছিলো পৌষের কাহিনি। তৌসিফ যেমন নতুন জায়গায় পৌষকে আগলে আগলে রাখে, হাতটা পর্যন্ত ছাড়ে না ঠিক তেমনই পৌষ সেদিন তৌসিফকে আগলে রেখেছিলো। এসব জায়গায় গিয়ে তৌসিফ আনকম্ফোরটেবল ফিল করবে এটাই তো স্বাভাবিক। সে তো অভ্যস্ত না এসবে। তৌসিফ দেখেছিলো সেদিন তার বউকে। দরদাম কাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি তার সবটা পৌষ তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে দিচ্ছিলো। দোকানদারদের সাথে পাক্কা একজন ক্রেতার মতো তর্কবিতর্ক করছিলো। বেশি কিছু অবশ্য সে কিনে নি। হাতে গোনা দুই চারটা জিনিস কিনেছে তাও আবার তৌসিফকে বাইরে রেখে লেডিস কর্নারে গিয়ে কিনেছে। তৌসিফের অবশ্য সেদিন একটু মাথা নাড়া দিয়েছিলো। সেও তো তার বউয়ের এসব কিনে রাখে তাহলে কি মাপেঝুপে সমস্যা ছিলো? অবশ্য দেখা গেলো এমন কিছু না। পৌষ গরমের জন্য কিনেছে। বেরিয়ে আসার সময়ে আবারও ভীরের মাঝে পড়েছে দু’জন। পৌষের মেজাজ চরমে। রেগে একবার হিসহিসিয়ে বলে উঠে,

“মাথার মানুষ সব আজই এসেছে এখানে।”
তৌসিফ শুধু মাঝখানে বলেছিলো,
“আমরাও তাহলে মাথার মানুষ?”
দুই আনার দাম দিলো না পৌষ তাকে। টেনে ভীর থেকে বের করছিলো। ফুটপাতে তখন ভ্যানে করে ছোট বড় কুশন বিক্রি হচ্ছিলো। তারমধ্যেই ছিলো তারার মতো একটা ছোট্ট কুশন। দেখলে মনে হয় আকাশি রঙের তারাটা হাসছে। হাতে তুলে দাম জিজ্ঞেস করতেই হ্যাংলা দেখতে ছেলেটা কড়া স্বরে জানালো,
“একদাম দুইশ।”
পৌষের রাগটা ধপ করে মাথায় উঠে গিয়েছিলো। তুই দুইশ বল বা চারশ বল কিন্তু সুন্দর করে বল। তুই কেন এভাবে কড়া স্বরে কথা বলবি? তারমধ্যে আবার একশোর জিনিসকে বলছিলো দুইশ। রাগ কমিয়ে পৌষ কুশনটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেছিলো একশো দিবে। ছেলেটা মানে না। একটাকা কম দিবে না। শুধুমাত্র মনে ধরেছিলো বিধায় নাহয় এসব ফলতু জিনিস কিনে পৌষ টাকা অপচয় করতো না। এই দামে কেনাটাও সম্ভব হচ্ছিলো না। ব্যাগে শুধু খুচরা একশ ছিলো তার তবুও ব্যাগটা সাইড হয়ে খুলে এইদিক ওইদিক হাতালো। নাহ্, নেই। তৌসিফ ততক্ষণে মুখ খুলেছিলো,
“তুমি ড্রয়ার থেকে টাকা নাও নি?”
“কেন নিব?”

রাস্তায় তর্কে জড়ায় নি তৌসিফ। বউকে হাড়ে হাড়ে চিনে সে। গাড়িতে পৌষকে রেখে সে এসে কুশনটা কিনে নিয়েছিলো। সেদিন রাতে পৌষ তাকে ভীষণ ভালোবেসেছিলো। একটা দুইশ টাকা মূল্যের কুশনের বিনিময়ে পৌষরাত হক থেকে তৌসিফ তালুকদার বেশ সমাদর পেয়েছিলো। ভীষণ প্রিয় কুশন এটা তার।
সেই সখের জিনিসটা তুহিন চেপে ধরে বসেছে। ইনি, মিনি ঘুমাচ্ছে। তুহিনের গলা বেশ উঁচু। বোঝা গেলো সে এভাবেই কথা বলে অথচ পৌষ দেখেছিলো সেদিন পলকের সাথে কি সুন্দর পিরিতের আলাপ করছিলো।
“কি ফুপাতো বোন, হালচাল ভালো? মশার কামড় তো খেলে এবার মাছির কামড় খাবে নাকি?”
“মশকরা করবেন না!”
“মশকরা? আমি মশকরা করি? সেই সম্পর্ক আমাদের? বেয়ান হও তুমি? তুমি হলে ফুপাতো বোন। আমার কিন্তু তোমাকে মনে ধরেছে। একদম তুরতুরা ইদুর তুমি।”
“ফালতু কথা বলবেন না৷”
“ফালতু কথা? আমি ফালতু কথা তোমার সাথে কেন বলব? ফালতু কথা বলব আমি বেয়াইনদের সাথে। কি বেয়ান? এই যে এখানে বসো আমার পাশে।”

পিহা হাসিমুখে এগিয়ে এলো। হাতে শরবতের গ্লাস। মিনুর সাহায্যে বানিয়ে এনেছে তুহিনকে দেখেই। তুহিন গ্লাস নিলো। এক চুমুক দিয়েই তাকালো পৌষের দিকে। পৌষের কপালে ভাঁজ। তুহিন গলার স্বর বেশ উঁচু করলো,
“বাহ্! বাহ্! বেশ চমৎকার। এত মজার হাত আমার বেয়ানের? আমি তো আপ্লূত হয়ে গেলাম। এই ফুপাতো বোন, আমি তো বিবাহিত নাহয় এই বেয়ানকে নিজের ঘরওয়ালী করে নিতাম৷”
পিহা ফটাক করে তাকালো। দুই হাত দূরে সরে দাঁড়ালো। বেয়াই তো বদমাশ। কই তার দুলাভাই তো এমন না৷ পৌষ কটমট করে বললো,
“গলাটা নামান৷ বাচ্চা দুটো ঘুমাচ্ছে।”
“তালুকদারেরা গলা নামায় না ফুপাতো বোন। সে তো আমার মেঝ ভাইয়া কিভাবে জানি তোমার প্রেমে পিছলা খেলো তাই এমন ঠান্ডা হয়ে গেলো। বাই দ্যা ওয়ে তোমার প্রেমিক স্যরি তোমার আশিক, না না ঐ আরকি তোমার কে জানি মেঝ ভাইয়াকে শুটফুট করে দিলো….”

বিছানায় থাকা একটা বালিশ ছুঁড়ে ফেললো পৌষ। সরাসরি গিয়ে লাগলো তুহিনের মুখে। একটুর জন্য শরবতের গ্লাসটা পড়ে নি। তুহিন তারাতাড়ি এক টানে আগে শরবত শেষ করলো। পরপরই চিরায়ত গলায় ধেই ধেই করে বলতে লাগলো,
“ফুপাতো বোনগুলাই হয় হাড়ে বজ্জাত! একদম বজ্জাত হয়েছে এটাও। শয়তানের শয়তান।”
পৌষ থমকে গেলো একদম। পরপরই সটান হয়ে দাঁড়িয়ে কোমড়ে এক হাত রেখে আরেক হাত উঁচিয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলতে লাগলো,
“আপনি শয়তান। বিতারিত শয়তান আপনি৷ বড় ভাবীর সাথে বেয়াদবি করেন৷ তুমি কি হ্যাঁ? তুমি কি? আপনি ডাকবেন। মেঝ ভাবী ডাকবেন।”
“এ্যাহ আসছে আমার বড় ভাবী হতে। বেশি বাড়াবাড়ি করলে তুই ডাকব। ফুপাতো বোনকে তুই ডাকতেই পারি নাকি?”
“একদম চাপা ভেঙে দিব। ফাজিল। বেয়াদব। বেলাজ।”
“আশ্চর্য! বেলাজ তো আমি হবই? পুরুষের আবার লাজ কি?”
“বের হন! বের হন আমার বেডরুম থেকে।”

“তোমার একার নাকি? বেয়ান এখানে এসো। আমার কাছাকাছি দাঁড়াও। তোমার বোন একটা নিমনিমা শয়তান।”
পিহা ঝামেলায় পড়ে গেলো। তুহিন তাড়া দিলো আবারও। পিহা নড়তে পারলো না। পৌষ চেঁচিয়ে উঠলো,
“আপনি শয়তান।”
তুহিন জোরে ধমক দিলো। ঘুমের তালে কেঁপে উঠলো ইনি, মিনি। পৌষ কড়া নজরে তাকালো তুহিনের দিকে। তুহিন পুণরায় চেঁচালো,
“কি? এভাবে দেখো কেন? চোখ দিয়ে গিলবে? এত বড় মুখ তোমার?”
“আমি সত্যি আপনার চাপা ভেঙে দিব৷ ওরা উঠে যাবে। আস্তে কথা বলুন।”
তুহিন ক্ষেপে গেলো। ঘুমন্ত ইনি, মিনির সাথে সাথে টেনেটুনে কোলে তুলে নিলো। ঘুমের মধ্যেই সামান্য কেঁদে উঠলো দুটো। পৌষ হতভম্ব হয়ে গেলো। চেঁচিয়ে উঠলো,
“আপনি মহিলাদের মতো ঝাগড়া, ঝামেলা করছেন কেন? নামান ওদের! দিন।”
“তুলে আছাড় দিব কিন্তু ফুপাতো বোন। বেয়াদবি করবে না।”

তৌসিফ একটু নিচে গিয়েছিলো। রনি ডেকেছে তাকে। হসপিটাল থেকে খবর এসেছে। সোহার অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে। ওর বিষয়ে কথা বলেই তৌসিফ উঠে এসেছে। দরজা থেকে কিছুটা দৌড়েই ঢুকেছে। বুয়াসহ মিনু দাঁড়িয়ে আছে পৌষের দরজার সামনে। তৌসিফ উঁচু স্বরে তুহিনের ধমকা ধমকি শুনেছে। পৌষের চেঁচামেচি শুনেছে। রুমে ঢুকেই হতবাক তৌসিফ যেন কথা বলতে ভুলে গেলো। রাগে কানটা লাল হয়ে গেলো সহসা৷ ইনি, মিনি ঘুম ভেঙে উঠেছে। তৌসিফকে দেখেই কান্না বাড়লো তাদের।
“দুতাবাই, টাটই মেলেছে।”
“চুপ! মিথ্যুক কোথাকার! কোথায় মেরেছি? একদম তক্তা বানিয়ে দিব।”
“আপনার হাত ভেঙে দিব না আমি? এভাবেই ছেড়ে দিব ভেবেছেন?”
তৌসিফ চোয়াল শক্ত করে এগিয়ে এলো। তুহিন থেকে ইনি, মিনিকে নিতে চাইলো। আশ্চর্য! তুহিন দিবে না। তৌসিফ চাপা স্বরে ধমকালো,
“ছাড় ওদের। দে।”
“না। দিব না। আমার কাছে থাকবে। নিয়ে বাইরে যাচ্ছি এখন৷”
বলতে বলতে এক হাতে তুলে পৌষের কুশনটা কুচলে দিলো৷ সাথে সাথেই পৌষ কাছে থাকা পানির মগ তুলে তুহিনের মুখে ছুঁড়ে দিলো,
“আমার কুশন মুচড়ালেন কেন?”

রাগে কাঁপছে পৌষ। তৌসিফ তারাতাড়ি বউ ধরলো। তুহিন হনহনিয়ে বেরিয়ে এলো সেখান থেকে। ইনি, মিনিকে বুকের সাথে চেপে ধরে ফ্ল্যাট ত্যাগ করলো। দুটো মিলে তুহিনের গলা জড়িয়ে কাঁদছে। কাঁচা ঘুম ভেঙেছে। তুহিন এদিক ওদিক হাঁটলো ওদের নিয়ে। খুব তারাতাড়ি দু’জন চোখ বুজেছে। তুহিন ওদের নিয়ে নিজের ফ্লাটে গেলো। কলি দরজা খুলে অপলক তাকিয়ে। বুঝে আসে নি হঠাৎ মামা কোথা থেকে দুটো বাচ্চা ধরে আনলো?
তুহিন ঢুকেই ধীর শব্দে পলককে ডাকছে। পলক আসছি বলে যখন তাকালো তখনই চমকে গেলো। তুহিন দুটো মেয়ে বাচ্চা তুলে এনেছে। তুলে আনা তার পুরাতন অভ্যাসের একটি। পলক ভয় পেলো ভীষণ। সেদিন বাচ্চা চাইলো, পলক তো সরাসরি না করলো। তাই বলে তুহিন বাচ্চা তুলে আনলো?
তুহিনের মুখটা হাসি হাসি। বিছানায় সুন্দর মতো রাখলো দুটো ঘুমন্ত বাচ্চাকে। ব্ল্যাংকেট দিয়ে ঢেকে কপালে, গালে চুমু খেলো। নিশ্চিত ওদের দেখে দেখে পলকের মনেও উদারতা আসবে। নিশ্চিত পলকও বাচ্চা চাইবে। এদিকে আতঙ্কিত পলক। ও জানে তুহিন বদলায় নি। এসব তুলে আনাআনি তার পুরাতন কারবার।
এদিকে পৌষ তৌসিফের বুকের দিকে টিশার্ট খামচে ধরে মুখ গুঁজে আছে। রাগে কান্না পাচ্ছে কিন্তু পৌষ সচরাচর কাঁদতে পারে না। চোখে পানি আসে না। নাক টানতে টানতে পৌষ মাথা দিয়ে গুতাগুতি করে তৌসিফের বুকে। তৌসিফ খুব ধীরে ধীরে বউকে ঠান্ডা করতে চায়। পৌষ নাক টেনে অভিযোগ করে,

“আমার কুশন নষ্ট করে ফেলেছে।”
“আরেকটা এনে দিব।”
“আমাকে শয়তান বলেছে।”
“মিথ্যা বলেছে।”
“ইদুর বলেছে তাও তুরতুরা ইদুর।”
“মিথ্যা বলেছে।”
“বেয়াদব বলেছে।”
“সত্যি বলেছে।”
“কিহ?”
“তুহিনকে আমি শাস্তি দিব হানি।”
“ওনার হাত ভেঙে দিবেন।”
“একদম।”
“চাপাটা ভেঙে দিবেন।”

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৮

“ঠিক আছে।”
“আমার বোনদের তুলে নিয়ে গিয়েছে।”
“আমি ফিরিয়ে আনব।”
“বলবেন আমাকে ভাবী ডাকতে।”
“আচ্ছা।”
ঠান্ডা মাথায় কতগুলো কথা হলো। তৌসিফ ভাবলো বউ ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে কিন্তু বেচারা বেমালুম ভুলে গেলো এটা তার বিয়ে করা বউ৷ নাম তার পৌষরাত হক।

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭০