Home প্রেয়সীর অনুরাগ প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১২

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১২

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১২
Sadiya Jahan Simi

রাফসা ছাদ থেকে নেমে রুমে আসে। রাগে শরীর থরথর করে কাঁপছে। রাগে দুঃখে মুখ লাল হয়ে গেছে। দরজা আটকে বেডে বসে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ এক ধ্যানে ফ্লোরে তাকিয়ে রইল। একটা হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। রাত সাড়ে এগারোটার কোটায়। দুইদিন ধরে পড়াশোনা হচ্ছে না ঠিকমত। আজ শুধু সন্ধ্যায় জিনিয়া এসে পড়িয়ে গেছে ঘন্টাখানেক। রাফসা ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো। হাত উঁচিয়ে লম্বা ছাড়ানো চুলগুলো পেঁচিয়ে খোঁপা করে নিল। এখন ঘুম আসবে না তাই পড়তে বসে যায়। পড়ায় মন বসাতে পারছে না কোনো রকম ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও।

বিরক্তিতে চিবুক শক্ত হয়ে গেল। মাথা ধরে আছে বিধায় আর বসে থাকতে পারেনি। উঠে গেল টেবিল থেকে। রাফসার মাথা ব্যথা ইদানিং বেড়েছে অনেকটা। কফি খাওয়া ছাড়া ওর মাথা ব্যথা কমে না সহজে। মুভ দিলেও ওর কফি খেতে হয়। এখন কফি খেলে দেরিতে ঘুমাতে হবে। আর না খেলে আজ সারারাত ঘুম হবে না। তাই অগ্যতা বিরক্ত হয়েই কফির জন্য রুম থেকে বেরিয়ে যায়। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। ড্রইং রুমে কয়েকটা জিরো লাইটের আলো জ্বলছে। তাতেই পুরো ড্রইং কিছুটা আলোকিত হয়ে আছে। রাফসা রান্নাঘরে গিয়ে কম পাওয়ারের লাইট অন করে দিল। কফির জন্য গরম পানি চুলোয় বসিয়ে দেয়। পাঁচ মিনিট এর মধ্যে কফি বানিয়ে নিল। তারপর ঘরেরে দিকে যেতে নিলেই উদ্যান সামনে পড়ল। উদ্যান সবে ছাদ থেকে নেমে এসেছে। রাফসা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এতোক্ষণ ছাদে ছিল। তবে তার থেকেও বেশি অবাক হয় উদ্যানের চোখ লাল দেখে। যদিও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না লোকটাকে। উদ্যান কিছুটা ওর সামনে এসে দাঁড়ায়।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

এক হাত দিয়ে ঘাড় ম্যাসাজ করে ঠান্ডা গলায় বলে, “এখনো ঘুমাসনি কেন? সেই কখনই তো চলে এসেছিস ছাদ থেকে। তাহলে, এখনো জেগে কেন? আর, এতো রাতে নিচে গিয়েছিস কেন?”
রাফসা হাতে ধরে রাখা কফির মগটা কিছুটা চাপ প্রয়োগ করে ধরল। উদ্যানের কথায় চিবুক শক্ত করে বলল, “আমার ইচ্ছে হয়েছে, তাই ঘুমায়নি। সরুন সামনে থেকে।”
“তুই এতো বেয়াদব হয়েছিস কবে থেকে? মুখে মুখে তর্ক করবি না একদম। সহজ কথার, সহজ উওর দিতে পারিস না?”

রাফসা এবার তেতে উঠল। এই লোকের সমস্যা কি, যখন তখন কথা শোনায়। নিজের রাগকে দমন করে উদ্যানকে পাশ কাটাতে গেলেই উদ্যান সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। হাতগুলো ট্রাউজারে ঢুকিয়ে কাটকাট গলায় বলে, “আমাকে একদম রাগাবি না। আমি ধরলে অবস্থা খারাপ করে ছাড়ব। আই রিপিট অবস্থা খারাপ করেই ছাড়ব। সময় থাকতে নিজেকে গুছিয়ে নে। বেয়াদবি একদম টলারেট করব না।”
রাফসা অবাক হয়ে তাকালো উদ্যানের পানে। উদ্যান ওর চোখে চোখ রেখে যেন ঠান্ডা হুমকি দিচ্ছে। উদ্যান আর দাঁড়ায়নি। শিষ বাজাতে বাজাতে রাফসাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। আয় রাফসা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল ওর পানে।
রুমে এসে দরজা কিছুটা আওয়াজ করে লাগালো। রাগে ফোঁস ফোঁস করছে। রেগেই কফি এক চুমুক দিলে রাগের পারদ যেন আকাশ ছোঁয়া। কফিটা ঠান্ডা হয়ে গেছে ততক্ষনে। কফির কাপটা টেবিলে রেখে ঘরের লাইট অফ করে দেয়। রেড জিরো লাইট জ্বালিয়ে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল ধপ করে। এপাশ ওপাশ করতে করতে একটা সময় ঘুমিয়ে পড়ে।

উদ্যান এতো রাতেও শাওয়ার নিয়েছে। ঠান্ডা পানি শরীরের উপর পড়তেই গা ছমছম করে উঠেছিল। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো দীর্ঘ বিশ মিনিট পর। ভেজা চুলগুলো কপালের অগ্রভাগে এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে। সাদা তাওয়াল দিয়ে এক হাত দিয়ে চুলগুলো মুছতে মুছতে বারান্দায় এগিয়ে যায়। তারপর তোয়ালে ছড়িয়ে দিয়ে রুমে পুনরায় ফিরে এলো। সাদা গেঞ্জিটা গায়ে জড়িয়ে নিল। লাইট অফ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। তখনই ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠল।
Love you o my darling
Love do something something
Love you o my darling
Love do something something

এই গানটা উদ্যানের ফোনের রিংটোন। কাউকে ডেডিকেটেড করে দিয়েছে। এই লাইনটা ওর পছন্দের খুব। উদ্যান হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে নিল। রিসিভ করে কানে দিতেই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির ভয়েস ভেসে আসে ওপর প্রান্ত থেকে। উদ্যানের অধরখানায় হাসি ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন কেটে দিল। লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কাত হয়ে শুতে গিয়ে একটা মায়াবী মুখ ভেসে উঠে। ওর একান্ত নারীর মুখ মন্ডল।‌ উদ্যান মুখ বাঁকিয়ে খানিক হাসে, “রুহি জান আমার, আর বেশি দিন নেই। এই বাড়িতে নতুন পরিচয় প্রবেশ হবে তোমার।”
তার ব্যক্তিগত নারীর কথা ভাবতে পাড়ি জমায় ঘুমের দেশে। ঘরে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। পর্দাগুলো বাতাসে উড়ছে।

রাফসা সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়ল। নামাজ আদায় করে নিল। কিছু সময় পড়ল । তারপর নিচে গিয়ে কফি বানিয়ে ছাদে চলে যায়। মোবাইল নিয়ে গ্ৰুপে কল দিল। দুমিনিট এর মধ্যেই সায়মা এলো।
ঘুমঘুম কন্ঠে বলে, “হ্যাঁ বল। এতো সকালে ফোন দিয়েছিস যে।”
রাফসা অবাক হয়ে বলে, “তুই এখনো ঘুমাচ্ছিস? কিছুদিন পর যে মেডিকেল পরীক্ষা তা কি ভুলে গেছিস? তাড়াতাড়ি উঠ বেয়াদব। দশটার দিকে কোচিং আছে আজ।”
সায়মা বোধহয় বিরক্ত হয় খানিক। কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, “বোন, আমার ভালো লাগছে না। এতো সকালে উঠতে ইচ্ছে করে না। কি করব আমি বল। মেডিকেলে চান্স না পেলে ঘর থেকে লাথি মেরে বের করে দিবে। কিতা যে করতাম।”

রাফসা ঠোঁট কামড়ে হেসে উঠলো। ওর বন্ধুগুলো এমন অলস। পড়াশোনায় ভালো হলেও ওদের মাঝে অলসতার কমতি নেই।
“আচ্ছা, তাহলে কি করার? আমরা বোধহয় আলাদা হয়ে যাবো। ভালো করে পড়ায় ইফেক্ট দে বোন। উঠে পড়। তারপর পড়তে বোস।”
সায়মা আড়মোড়া হয়ে উঠে বসলো।
“উঠেছি। আমি রাখলাম তাহলে।”
“আচ্ছা, দশটার আগেই কোচিং এর গেইটে থাকবি। ওকে।”
সায়মার সাথে কথা শেষ করে নিচে নেমে যায় রাফসা।

সকলে ডাইনিং এ উপস্থিত। আজ আব্বাস ফরাজী বাড়িতে আছে। রাজীব ফরাজী সকালেই চলে গেছে। সামনে ইলেকশন, তাই ওনি বাড়িতে বেশি একটা থাকতে পারেনা। উদ্যানের বাবা উমায়ের ফরাজী আজ ছেলের সাথে নাস্তা করবে বলে যায়নি । রাফসা কোচিং এ যাবে, তাই একেবারে রেডি হয়েই এসেছে। চেয়ার টেনে বসে পড়ে ভাইয়ের পাশে। জারা জায়িন নেই এখানে। বোধহয় এখনো ঘুমাচ্ছে। ঊষা আছে তার পাশেই মাইশা। উমায়ের ফরাজী টেবিলে চোখ বুলিয়ে বলে, “উদ্যান কোথায়? ও কি এখনো ঘুমাচ্ছে? আমার ছেলের সাথে নাস্তা করব বলে, কাজে যায়নি।”
রাহেলা ফরাজী স্বামীর জন্য কাপে চা ঢালতে ঢালতে বলে, “আমার ছেলে কখনো এতো সময় ঘুমিয়েছে? বাড়িতে নেই। রুমে গিয়ে ওকে পাইনি। হয়তো কোথাও গিয়েছে।”

উমায়ের ফরাজী স্ত্রীর কথায় ভ্রু কুঁচকে বলে, “তাহলে ওকে কল দাও। বলো, বাড়িতে আসতে।”
রোহান পরোটা খেতে খেতে বলল, চাচ্চু , টেনশন করো না। উদ্যান কে আমি ফোন দিয়ে বলছি।”
রাফসা চুপচাপ খাচ্ছে। ওর এসবে কোনো‌ খেয়াল নেই। আশেপাশের কথা যেন ওর কানে যাচ্ছে না। হুমাইরা ফরাজী রান্নাঘর থেকে ছুটে আসে। মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ওনার হাতে থাকা ডিম দুটো নাস্তার প্লেটে‌ তুলে দেয়। রাফসা আঁতকে উঠে। ওর সবচেয়ে অপছন্দের খাবার সিদ্ধ ডিম। এটা খেলে গলা চুলকায় প্রচন্ড পরিমানে। রাফসা কিছুটা জোরে বলল, “আম্মু, আমি এসব খাবো না। দূরে নিয়ে যাও। দেখলেই গা গুলিয়ে আসে।”
হুমাইরা ফরাজী চোখ পাকিয়ে তাকালো। আব্বাস ফরাজী বলে, “রাফসা খেয়ে নে মা। এসব পুষ্টিকর খাবার এখন তোর প্রয়োজন।”

রাফসা অসহায় হয়ে পড়ে। ডিম ওর‌ সহজে হজম হয় না। অগ্যতা একটা ডিম তুলে নিয়ে ছোট একটা কামড় বসালো। ওমনি পেট থেকে যেন সব উগলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। হুমাইরা ফরাজী মুখ চেপে ধরে তারপর পানি খাইয়ে দিল।
রোহান ফোন করতেই যাবে তখুনি দরজার দিকে নজর পড়ল। উদ্যান বাড়িতে ঢুকছে।
“ওই যে উদ্যান এসেছে।”
রোহানের কথায় সবাই তাকালো সেদিকে। রাফসা নিজেও ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো।
উদ্যানের ঘামে ভেজা শরীরে কালো স্লিভলেস জিম ভেস্ট, ভেস্টের কাপড়টা বুক আর কাঁধের শক্ত পেশিতে আঁটসাঁট হয়ে লেগে আছে। বুকের মাঝখানে হালকা ঘামের ছাপ, শ্বাস-প্রশ্বাসে বুক ওঠানামা করছে স্পষ্ট। দুই হাত খোলা—বাইসেপস আর ফোরআর্মে শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে আছে, জিমের পরিশ্রমের নীরব সাক্ষ্য।

পায়ে ডার্ক গ্রে ট্র্যাক প্যান্ট, হাঁটু থেকে নিচে একটু ঢিলা, কিন্তু ঊরু আর কোমরের গঠনে শক্ত ভাবটা পরিষ্কার। প্যান্টের পাশে চিকন সাদা স্ট্রাইপ। পায়ে সাদা-কালো স্পোর্টস শু, জুতোর ফিতাগুলো একটু ঢিলা, যেন তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফিরেছে।
কপালের ওপর এলোমেলোভাবে পড়ে থাকা চুলগুলো ঘামে ভিজে আরও গাঢ় দেখাচ্ছে, চাপদাড়িতে হালকা ঘামের চিকচিক।
উদ্যান এসে ডাইনিং এ দাঁড়াল। উমায়ের ফরাজী ছেলের পানে তাকিয়ে বলল, “বাবা, কোথায় গিয়েছিলে? তোমার সাথে নাস্তা করব বলে বসে আছি।”
বাবার কথায় উদ্যান হেসে বলে, “জিমে গিয়েছিলাম আব্বু। তুমি পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করো, আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি।”

কথাটা বলেই উদ্যান উপরে চলে গেল নিজের ঘরে। রাফসা এখনো একটা ডিম খেতে পারেনি। খাবে কিভাবে, ওর যে গলা চুলকাচ্ছে।
“রাফসু, আজ জিনিয়া বাড়ি এসে পড়াতে পারবে না। বলেছে, তুই যদি পারিস ওদের বাড়ি গিয়ে পড়ে আসতে।”
রাফসা ভ্রু কুঁচকে বলে, “বাসা কোথায় আপুর? আমি একা যাবো কি করে?”
“একা যেতে হবে কেন, আমি দিয়ে আসবো। ছয়টায় যেতে বলেছে। রেডি থাকিস।”
রোহানের কথায় রাফসা মাথা নাড়ল। পাঁচ মিনিট এর মধ্যেই উদ্যান ফ্রেশ হয়ে এসেছে। চেয়ার টেনে রাফসার মুখোমুখি বসে। রাহেলা ফরাজী ছেলে সামনে নাস্তার প্লেট এগিয়ে দিলে। উমায়ের ফরাজী নিজেও খেতে শুরু করে। আব্বাস ফরাজী খেতে খেতে উদ্যান কে বলে, “কোথায় জয়েন দিবে?”

“চট্টগ্রাম মেডিকেলে। কিছুদিন টাইম লাগবে।”
রাফসা নাস্তা শেষ করে উঠে দাড়ালো কোচিং এ যাওয়ার জন্য। ঊষা এতোক্ষণে খেয়াল করে রাফসা নতুন বোরকা পড়েছে। ওর সম্পূর্ণ আউটফিট কালো। রাফসার পছন্দের তালিকায় এটা সবার আগে।
“রাফসা, তোর বোরকাটা তো অনেক সুন্দর। ইউনিক ডিজাইন।”
ঊষার কথায় উদ্যান মাথা তুলে তাকায়। খেতে খেতে রাফসাকে একটু পর্যবেক্ষণ করে। এই মেয়েটা কাল রাতেও ওর সাথে তর্ক করেছে। ভাবলেই চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। রাফসা সোফা থেকে ব্যাগটা নিয়ে কাঁধে চড়িয়ে বলে, আলমারিতে রাখা আছে সব। তোমার যে কয়টা পছন্দ হয়, নিয়ে নিবে। ”
তারপর মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

বেলা প্রায় সাড়ে এগারোটার কোটায়। ওরা পাঁচ জন ধীরে ধীরে কোচিং সেন্টার থেকে বেরিয়ে এলো। আজকে কেমিস্ট্রি কয়েকটা চ্যাপ্টার থেকে পরীক্ষা নিয়েছে। আগামীকাল ফিজিক্স থেকে পরীক্ষা নিবে বলেছে। সবাই যেন ভালো করে প্রিপারেশন নিয়ে আসে । আশরাফুল ছুটে যায় দোকানে । পাঁচটা আইসক্রিম নিয়ে এসে সবাইকে একটা করে দিল।
“বোন, যদি চান্স না পাই তাহলে? বাড়িতে জায়গা নেই আর।”
আশরাফুল এর কথায় রাফসা চোখ পাকিয়ে বলে, “শালা , এই পড়া দিয়ে তুই চান্স পাবি কি, তোর চৌদ্দ গুষ্টি ও ধারে কাছে যেতে পারবে না। পড়াশোনায় মন দে‌ ভাই। আমাদের একসাথে থাকতে হলে যতই কষ্ট হোওক না, মেডিকেলে চান্স পেতেই হবে।”

“আচ্ছা, এক কাজ করি। একটা রুটিন বানায়। আমরা পাঁচজনে সেটা মেইনটেইন করে চলবো। টার্গেট নিয়ে পড়া উচিত আমাদের। নয়তো পিছিয়ে যাবো। আর বেশি দিন নেই পরীক্ষার।”
সায়মার কথায় সবাই সাঁই জানালো। ছেলেরা চলে গেল। ওদের খেলা আছে। মেয়েরা হেঁটে অন্য রাস্তা ধরে। ওদের হাতে এখনো আইসক্রিম। ওরা কথা বলতে বলতেই যাচ্ছিল। হঠাৎ কোথা একটা পাথর এসে লাগে রাফসার আইসক্রিমে। নিমিষেই তা গিয়ে ঠাঁই পেল মাটিতে। রাফসা হতভম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। আইসক্রিম এর দিকে তাকিয়ে রইল। খেতে পারলো না। ঘাড় বাঁকিয়ে সামনে তাকালো। এক ব্যক্তিকে দেখেই কপাল কুঁচকে যায়। কোথায় যেন দেখেছে। রাফসা তড়িঘড়ি করে লোকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরোখ করে বলে, “এই আপনি সেই না? যে দুই বছর আগে আমার ফ্রেন্ড কে গাড়ি দিয়ে উড়িয়ে দিচ্ছিল!”

আভিয়ানের ড্রাইভার শুকনো ঢোক গিলে। ওই দিন থাপ্পড় খেয়েছিল আভিয়ানের কাছে এই মেয়ের জন্য।
“পাথরটা আপনি মেরেছেন তাই তো? সত্যি করে বলেন, নয়তো মাথার টাক ফাটিয়ে দিব।”
ড্রাইভার ভয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল, “সরি , ভুলে হয়ে গেছে। আমি তো কুকুরকে মারতে চেয়েছিলাম। ভুলবশত আপনার আইসক্রিমে লেগেছে।”
হঠাৎ ই সেখানে আভিয়ানের আবির্ভাব ঘটে। রাফসাকে নিজের সামনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। নিজের মনের ভুল ভেবে চোখ বন্ধ করে একটা শ্বাস ফেলে। চোখ খুলতেই আবারো রাফসাকে দেখে। ওর ড্রাইভারের সাথে তর্ক করছে।
“আবালের মতো কাজ করে, আবার ক্ষমা চাইছেন। আমার আইসক্রিম এর ক্ষতিপূরণ কে দিবে? এই মিয়া চুপ করে আছেন কেন?”

ড্রাইভারের এবার কেঁদে দেওয়ার উপক্রম। এই মেয়ের ধমক হজম করছে একমাত্র বসের কারনে। নয়তো এখুনি দিতো একটা কানের নিচে।
“কি হয়েছে এখানে? ”
আভিয়ানের কথায় রাফসা ওর পানে তাকালো। সহজেই চিনতে পেরেছে। ভ্রু কুঁচকে বলে, “এই যে আঙ্কেল, আপনাকে বলেছি না? আমার সামনে আর পড়লে ঠ্যাং ভেঙ্গে রেখে দিব।”
স্তম্ভিত হয়ে গেল আভিয়ান। আবার আঙ্কেল! কি এমন পাপ করেছে ও , নিজের মায়াবীর মুখ থেকে এমন ডাক শুনতে হচ্ছে। চোখ মুখ কুঁচকে মৃদু ধমকে বলে, “তুমি আমাকে আঙ্কেল ডাকছো কেন? কোন এঙ্গেল থেকে আমাকে আঙ্কেল মনে হয় তোমার? আমি একটা ছেলে। চোখ মুখ খুলে ভালো করে দেখো।’
রাফসা এহেন কথায় ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আমি কি আপনাকে হিজড়া মনে করেছি নাকি? আঙ্কেল আর ছেলে তফাৎ কি? পুরুষদেরি তো আঙ্কেল ডাকে।”

রাফসার কথা শুনে আভিয়ানের জ্ঞান হারানোর উপক্রম। কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছে। একবার আঙ্কেল ডাকছে তো আরেকবার হিজড়া বানিয়ে দিচ্ছে।
“আপনার ড্রাইভার আমার আইসক্রিম ফেলে দিয়েছে। আমি পুরো ষাট টাকা দিয়ে কিনেছি।”
আভিয়ান ভ্রু কুঁচকালো। ঠোঁট কামড়ে খানিক হাসেও। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে হাজার নোট কয়েকটা আরিহার দিকে বাড়িয়ে দিল। “এই টাকা দিয়ে আইসক্রিম কিনে নিও।”
রাফসা কোমরে হাত দিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে সাবিকুন সায়মা কে বলে, “দেখ এই আঙ্কেল আমাকে টাকা অফার করছে। মনে হয় আমার টাকার অভাব।”

আভিয়ানের চোয়াল ঝুলে যায়। বার বার আঙ্কেল ডাক শুনে।
“আমি টাকা নিব না। আইসক্রিম নষ্ট হয়েছে। ওটা আপনার ড্রাইভার কে রাস্তা থেকে তুলে খেতে বলেন। খাবার অপচয় আমার পছন্দ না।”
ড্রাইভারের চোখজোড়া মুহূর্তেই বড় বড় হয়ে গেল। যেন এক্ষুনি বেরিয়ে আসবে। আভিয়ান নিজেও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“সাদু, ছেড়ে দে। বাড়িতে চল।”
সায়মার কথায় রাফসা সামান্য বিরক্ত হয়। আভিয়ান কিছু একটা ভেবে বলে, “আমার ড্রাইভার খেতে হবে না। চলো , আমিই খাচ্ছি।”
রাফসা সুযোগ হাত ছাড়া করেনি। ইশারা করে দেখিয়ে দিল। অগ্যতা আভিয়ান সেই পানে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে এক আঙ্গুল দিয়ে আইসক্রিম লাগিয়ে তা মুখে পুড়ল। আবেশেই চোখ বন্ধ করে ফেলল আভিয়ান। এটা রাফসা খেয়েছে। ওর মায়াবীর ঠোঁটের ছোঁয়া এখানে আছে। তাই আভিয়ান ড্রাইভার কে না দিয়ে নিজেই খেলো। রাফসা রা হাসছে। ড্রাইভারের অবস্থা খারাপ এই কান্ড দেখে। আভিয়ান একটা মেয়ের জন্য রাস্তা থেকে আইসক্রিম তুলে খাচ্ছে।
“ধন্যবাদ আঙ্কেল,
ওরা হাসতে হাসতে চলে যায়। আভিয়ান বসে থেকেই মায়াবীর যাএা পানে তাকিয়ে রইল। ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে, “ওহে আমার মায়াবী, তোমার জন্য এই আভিয়ান শিকদার জান দিতেও রাজি। রাস্তা থেকে আইসক্রিম তুলে খাওয়া কোনো ব্যপারই না।”

রাফসা গোসল সেরে বেরিয়েছে। বাড়িতে অতিথি ভরপুর। উদ্যানের ফুফু এসেছে। মামা এবং খালা রাও এসেছে। দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য রাফসা নিচে নেমে আসে। ওর কোলে রিশানের দেওয়া সেই বিড়াল টা। রাফসা ওর নাম রেখেছে অ্যাশ। ইতোমধ্যেই কিছু অতিথি খেতে বসে গেছে। ছোটরা সোফায় বসে আড্ডা দিচ্ছে। রাফসা গিয়ে দাঁড়ায় সেখানে। রাফসাকে দেখে মাহিন নিজের পাশে জায়গা দেখিয়ে বলে, “এখানে এসে বোস।”
রাফসা নির্দ্বিধায় বসে পড়ে। রাফসার কোল থেকে মাহিন বিড়ালটা নিয়ে বলে, “কি সুন্দর বিড়াল। দেখলেই আদর লাগে।”

“মাহিন ভাইয়া, ওকে বিড়াল বলবে না। ওর নাম অ্যাশ। আর সবচেয়ে বড় কথা ও হচ্ছে আমার মেয়ে।”
রাফসার কথায় সবাই হেসে উঠল। রোহান উদ্যানকে ডেকে বলে, “উদ্যান, দেখ আমাদের রাফসার মেয়ে । সুন্দর না? তোর সাথে অ্যাশের অনেক মিল। অ্যাশ সাদা, তুইও সাদা। কোনোরকম এই অ্যাশ তোর মেয়ে না তো?”
উদ্যান রোহানের কোথায় তাকালো রাফসার পানে। ভ্রু কুঁচকে রোহানকে বলে, “বাচ্চা জন্ম দিলে অবশ্যই মানুষের দিব। কোনো বিড়াল এর না।”

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১১

উদ্যানের কথায় সবাই হেসে উঠল। ওদের তখুনি ডাক পড়ল খাওয়ার জন্য। সবাই পা চালিয়ে যাই সেদিকে। সবার পেছনে রাফসা, ওর পেছনে উদ্যান। রাফসাকে পাশ কাটিয়ে যেতে বলে, “আমার মানসম্মান লুটে নেওয়ার ধান্দা বন্ধ কর।”
কথাটা বলেই তড়িৎ গতিতে চলে যায়। রাফসা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল।

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১৩