Home প্রেয়সীর অনুরাগ প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৪

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৪

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৪
Sadiya Jahan Simi

রাফসা ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে ঝটপট করে বোরকা পরে নিল। হিজাব করে নিকাব বাঁধতে গিয়েও বাঁধলো না। দশ মিনিট এর মধ্যেই নিচে নেমে গেল। তখনো উদ্যান আসেনি। রাফসা দাঁড়িয়ে থেকে দোতলায় তাকালো। কিছু একটা ভেবে সিঁড়ির শেষ প্রান্ত থেকেই উল্টো ঘুরে দোতলায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। রোহানের ঘর ক্রস করে আর দুটো ঘরের পর কাঙ্খিত রুমটি। রোহানের ঘরের সামনে আসতেই কোথা থেকে যেন অ্যাশ হাজির হয় সামনে। রাফসা থেমে যায় অ্যাশকে দেখে। সামনে তাকিয়ে দেখল লোকটা বের হচ্ছে কিনা । লোকটাকে দেখতে না পেয়ে নিশ্চিন্তে মনে তড়িঘড়ি করে অ্যাশকে কোলে তুলে নেয়। অ্যাশের মাথায় চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল ,

“তোর না হওয়া আব্বার রুমে গিয়ে মেও মেও করবি না। নয়তো মাম্মা ফেঁসে যাবো। একদম শান্ত হয়ে থাকবে, ওকে বেবি ?”
অ্যাশ কি বুঝলো জানা নেই ।রাফসার কথায় মেও মেও করে উঠলো। রাফসার মুখে মৃদু হাসি ।সামনের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল, “এইতো এই না হলে আমার বাচ্চা!”
কাঙ্ক্ষিত রুমটির সামনে এসে দাঁড়িয়ে যায় রাফসা ।বুক ধরফর করছে ।দরজাটা লাগানো । ওভাবে দাঁড়িয়ে থেকে হালকা ধাক্কা দিল তৎক্ষণাৎ চিচিং ফাক হয়ে গেল দরজাটা।রাফসা অবাক হয়ে কপাল চাপরে বিড়বিড় করে বলল, “শুধু শুধু টাইম ওয়েস্ট করলাম! এতক্ষন ধুর ছাতার মাথা।”
আর কিছু না ভেবেই রুমে ঢুকে সতর্কতার সহিত চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে। ওয়াশরুম থেকে পানি পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। রাফসা নিশ্চিত হয় উদ্যানের এখনো ফ্রেশ হওয়া হয়নি। ওই লোক এখনো শাওয়ার নিচ্ছে। চোখ মুখ কুঁচকে যায় সহসা। রাফসা কোচিংয়ে যাওয়ার আগে দেখে গিয়েছে এই লোককে গোসল করে কাপড় নিয়ে খালি গায়ে ছাদে উঠতে।ছেলে মানুষের এতো রংঢং দেখলে গা জ্বলে ওঠে। রাফসা আর কিছু না ভেবেই অ্যাশকে কোল নামিয়ে দিল বিছানায়। আবারো চোখ রাঙানি দিয়ে বলল, “একদম আওয়াজ করবি না। নয়তো তোকে আর আমাকে ওই লোক গিলে খাবে।”

নিচু হয়ে হুমকি দিল অ্যাশকে। বাচ্চাটা কি সুন্দর করে চুপচাপ বসে রইল। রাফসা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আলমারির পানে এগিয়ে গেল। ওয়াশরুম থেকে এখনো পানির শব্দ আসছে। আলমারির নব ঘুরাতেই তা খুলে যায়। রাফসা চমকে উঠে এতে। প্রত্যাশা ছিল না এটা। আলমারি লক ছাড়া এ যেন অসম্ভব ব্যাপার। সবকিছু লক করেই রাখে।সেই ছোট থেকেই দেখে আসছে। অবশ্য চাবি কোথায় সে ব্যাপারে জানা আছে রাফসার। এ ঘরের প্রত্যেকটা জিনিস সম্পর্কে অবগত রাফসা। ও আর দেরী করেনি। আলমারিতে দ্রুত হাতে কিছু খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিছু মিনিট পাড় হয়ে গেলেও কাঙ্খিত জিনিসটি না পেয়ে দিশেহারা হয়ে গেল। ততক্ষনে ওয়াশরুম থেকে পানি পড়ার শব্দ বন্ধ হয়ে গেছে। উদ্যান বোধহয় খুব দ্রুত বেরিয়ে এলো। উদ্যানের ভয়ে এবং আতঙ্কে হাত কাঁপছে ওর। কোনোরকম হাত চলছেই না। শেষ চেষ্টা চালিয়ে মিনি ড্রয়ারে একটা কালো ফাইল চোখে পড়ে।এতে যেন রাফসার আশার আলো জ্বলে উঠলো। ব্যস্ততার সহীত ফাইলটা বের করে একে একে প্রত্যেকটা পেপার বের করে। এতো এতো পেপারের মাঝে আসল পেপারটা চোখে পড়ছে না। হঠাৎ একটা পেপার রাখতে গিয়ে সহসা হাত থেমে যায় ওর। চোখ পড়তেই তা স্থির দৃষ্টিতে পরিণত হয়।হাত কাঁপছে ওর। চোখ ছলছল করছে।নিজেকে সামলিয়ে কোনোরকম সাইড ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে পেপারগুলোর ছবি তুলে নেয়। তাড়াতাড়ি করে আলমারি বন্ধ করতেই হঠাৎ ওয়াশরুম থেকে সাউন্ড হলো। এক্ষুনি বেরিয়ে আসবে বোধহয়। রাফসা চমকে উঠে। দ্রুত পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে পড়লো। আতঙ্কে অ্যাশের কথা ভুলেই গেছে।

ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো উদ্যান। কোমরে শুধু সাদা ধবধবে একটা তাওয়াল জড়িয়ে আছে। সিক্স প্যাক গুলো দৃশ্যমান। ভেজা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কপালে। ঘাড়ে বুকে হাতে কিছু পানির কনা চিকচিক করছে। গলায় সাদা তাওয়াল ঝুলে আছে। সেটা দিয়ে ভেজা চুলগুলো মুছতে মুছতে অ্যাশকে নিজের বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে সহসা কপালে কয়েক স্তর ভাঁজ পরলো। দরজা তো বন্ধ ছিল।এই উদয় হলো কোথা থেকে। ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখল দরজা পুরোটা খোলা। এতে ভ্রু কুঁচকে যায় উদ্যানের। ঘরে কি কেউ এসেছিল। এদিকে অ্যাশ উদ্যান কে দেখে তড়িৎ গতিতে শোয়া থেকে উঠে বসে। আশে পাশে তার কুট্টুস চোখজোড়া দিয়ে মাম্মাকে খুঁজছে। তার মাম্মাকে দেখতে না পেয়ে ভয় ঝেকে বসলো যেন। ওর মাম্মা না ওকে নিয়েই পালিয়েছে বুঝতে বাকি রইল না। বেচারা প্রাণীটা কথা বলতে পারলে বোধহয় চেঁচিয়ে বলতো,“আম্মা এই কোন খচ্চরের কাছে ফেলে গেলে আমায়!”

“বেডের উপর কি করছো তুমি?” প্রশ্ন করে উদ্যান।অ্যাশ তাকিয়ে শান্ত হয়ে বসে আছে।বলতে ইচ্ছে করছে,
“ও আমার না হওয়া আব্বা গো আমি নির্দোষ। তোমার না হওয়া বউ আমাকে এখানে এনেছে।”
উদ্যান চোখ মুখ কুঁচকে বলে ,ডিজগাস্টিং,মায়ের মতো বেয়াদব হচ্ছো! বিড়ালটাকে অব্দি ছাড়লো না। ট্রেনিং প্রাপ্ত বেয়াদব বানিয়েছে।”
বিরক্ত হয়ে কাভার্ড থেকে কফি কালার একটা শার্ট বের করে পড়ে নিল। সাথে হোয়াইট প্যান্ট। হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল গুলো শুকিয়ে তা সেট করে নেয়। ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে ওর প্রিয় পারফিউম নিয়ে বডিতে স্পে করে। মানিব্যাগে ক্রেডিট কার্ড ঢুকিয়ে তা পকেটে ভরে বেরিয়ে পড়ে। উদ্যানের পেছনে পেছনে অ্যাশও ছুটে।

নিচে নামতেই রাফসাকে ফোনের মাঝে ডুবে থাকতে দেখে। অ্যাশ দৌড়ে গিয়ে রাফসার কোলে উঠে। হঠাৎ আক্রমনে ভরকে যায় রাফসা। অ্যাশকে দেখে মনে পড়ল উদ্যানের রুম থেকে ও একা বেরিয়ে এসেছে। অ্যাশকে আনেনি। জিভ কাটে ও। বিড়বিড় করে বলল, “এওোগুলো সরি মাম্মা। তোমাকে ওই জল্লাদের রুমে ফেলে এসেছি।”
বলেই আদর করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। উদ্যান রেক থেকে একজোড়া সাদা সু বের করে পড়ে। সোফায় বসে ফিতে বাধা অবস্থায় গম্ভীর কন্ঠে শুধায়, “এখন থেকে সকালে উঠে আমার রুমে আসবি। রাতে পারব না পড়াতে।”
রাফসা চমকে তাকালো। হঠাৎ কথায় অপ্রস্তুত হয়ে গেল যেন। হয়তোবা তখনকার জন্য মনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। উদ্যান ফিতে বাঁধতে বাঁধতে চোখ তুলে তাকায় রাফসার পানে। ওর হিজাবের কারণে মুখটখ গোল দেখাচ্ছে। উদ্যান মুচকি হাসলো। পুনরায় কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এদিকে রাফসা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। উদ্যানের হাসির মানেটা কি? উদ্যান উঠে দাঁড়ালো। গম্ভীর হয়ে বলে, “লেটস গো।”
রাফসা ঘোর থেকে ছিটকে পড়ে। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে অ্যাশকে কোলে তুলে নেয়। এতে ভ্রু কুঁচকে যায় উদ্যানের। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“ওকে কোলে নিচ্ছিস কেন?”
“ও যাবে তাই।”
“ ইম্পসিবল! ওকে নেওয়া যাবে না।” এককথায় বলল উদ্যান। রাফসার কোল থেকে অ্যাশ চোখজোড়া বড়বড় করে মিউ মিউ করছে। যেন বলছে।
“তুই আব্বা নামে কলঙ্ক। ভালোই হয়েছে আমার মাম্মা তোকে পাওা দেয়না।”
রাফসা অবাক হয়ে তাকালো। এই লোকের সমস্যা কি। ওর সবকিছুতে বাঁধা দিবেই। বিরক্ত হয়ে রাফসা বলল,
“কেন যাবেনা! আপনার প্রবলেম কি আমার বাচ্চাকে নিয়ে?”
“বিড়ালকে কেন নিয়ে যাবি!”
“ও বিড়াল না,আমার বাচ্চা।”
উদ্যান অদ্ভুত চোখে তাকায়। এই মেয়ে নিজেই তো বাচ্চা। তারও নাকি বাচ্চা আছে। তাও আবার বিড়ালের বাচ্চা। হাস্যকর ব্যাপার স্যাপার। বিড়ালটা রাফসার কোলে বসে কেমন মিউ মিউ করছে। উদ্যান শক্ত চোখে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “মা বাচ্চা দুটোই বেয়াদব।চারআনার দাম দেয়না।”

আজমল শিকদার আজ ছেলের বাড়িতে এসেছে।বেশ রেগে মেগেই এসেছে। আভিয়ানকে সামনে পেলে এক্ষুনি যেন গিলে খাবে। রাগে গজগজ করতে করতে আভিয়ানের ’মায়াবী বিলাস’ গেইট পেরিয়ে ওনার বিলাসবহুল কালো গাড়িটি প্রবেশ করে। বাগানে সযত্নে গাছ লাগানো। চারদিকে সোডিয়ামের আলো জ্বলছে। কয়েকজন গার্ড মেইন ডোরের সামনে পাহাড়াতো অবস্থায় আছে। ওনি জানে না আভিয়ান এখন ঘরে আছে কিনা। রাগের মাথায় এতো কিছু ভাবার সময় ছিল না অবশ্য।
বাড়িতে ঢুকেই ওনি হুংকার ছাড়লেন না
“আভিয়ান , আভিয়ান, কোথায় তুমি! এক্ষুনি বেরিয়ে এসো। তুমি এতো বড় হয়ে গিয়েছো? আমাকে অমান্য করার সাহস তোমাকে কে দিয়েছে! জলদি বেরিয়ে এসো বলছি!”
আজমল শিকদারের চিৎকারে বোধহয় বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডরাও কেঁপে উঠলো। রনি সবেই পানি মুখে দিতে নিচ্ছিল ওমনি ওনার বাঘের মতো গর্জনে ভয়ে হাত থেকে গ্লাস ছিটকে পড়ে। বুকে হাত রেখে শুকনো ঢোক গিলে। বিড়বিড় করে আফসোসের স্বরে বলল,

“বাবাগো বাবা ওনি কি আমায় মার্ডার করতে চেয়েছিল! আমার কিছু হলে আজ না হওয়া বউটা বিধবা হয়ে যেত।পরে আরেকজনকে বিয়ে করে নিতো? আর আমি উপরে বসে পটল তুলতাম!”
রনি আর কিছু ভাবতে পারল না। ঘর কাঁপিয়ে আজমল শিকদার পুনরায় গর্জে উঠে। রনি নিজ রুম থেকে বেরিয়ে এলো। আজমল শিকদার সোফার পাশেই দাঁড়িয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে। রনি পেছন থেকে বলল,
“স্যার আভিয়ান ভাই খুব টায়াড । সারাদিন ছোটাছুটিতে করে সবে বাড়ি ফিরেছি আমরা।”
আজমল শিকদার পেছনে ফিরে। আর ওমনি লাফিয়ে সোফায় পড়ল। চেঁচিয়ে উঠলো,
“হুঁশ ভূত! এই সয়তান ভাগ এখান থেকে। ধরতে পারলে সালফিউরিক এসিডের নিচে চুবিয়ে মারবো। এতো বড় সাহস তোর! আমার সামনে কেন এসেছিস?”

রনি বেকুবের মতো থ হয়ে গেল। এখানে ভূত এলো কোথা থেকে! অবাক হয়ে একহাত মুখে দিতেই জিভ কাটে। বাড়ি ফিরে রনি সর্বপ্রথম ফেসপ্যাক লাগিয়েছে। আজ সারাদিন রোদে এবং বিশেষ বিশেষ জায়গায় ছুটেছে আভিয়ানের সাথে। পকেটে থাকা রুমালটা মুখে বেঁধে চোখে রোদচশমা পরে ছিল সারাদিন। যেন রোদ তার মুখকে স্পর্শ করতে না পারে। আজ ভেবেই রেখেছিল বাড়ি ফিরে ফেসিয়াল করবে। গত কয়েকদিন আগেই প্রয়োজনীয় সব জিনিস কিনে আনে শপিং মল থেকে।
“এই বেয়াদব ভূত তুই এখনও আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস!”
ওনার চিৎকারে ভাবনার জগৎ থেকে বিদায় নিল রনি।
“রাজনৈতিক নেতার অল্পতেই এই হাল! জনগণকে সামলাবে কি করে? এমপি হওয়ার যোগ্যতাই তো নেই দেখছি।”
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে কথাগুলো বলে আভিয়ান। সারাদিনের ক্লান্তিতে শাওয়ার ছেড়েছে। আজ প্রচন্ড দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে। শরীরে তার বেগি প্যান্ট এবং কালো টিশার্ট জড়ানো। আভিয়ানের কথায় আজমল শিকদার চোখ খুলে তাকালো। কথাগুলো বুঝতে পেরেই চিৎকার করে উঠল, “আভিয়ান মুখ সামলে কথা বলো। বাবা হই আমি তোমার।”
আভিয়ান সোফায় এসে বসে। চুলগুলো কপাল থেকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলে,

“আমি কি বলেছি শালা লাগো!”
ওনি চোখ বড়বড় করে তাকালো। এ কোন আভিয়ানকে দেখছেন। মেপে মেপে কথা বলা লোকটাও রসিকতা করে কথা বলছে বাবার সাথে।
“বেয়াদব ছেলে তুমি আমার কাজে হস্তক্ষেপ করতে গিয়েছো কোন সাহসে! তুমি আমার ঘরে হয়েছো নাকি আমি তোমার ঘরে হয়েছি?”
আভিয়ান অদ্ভুত চোখে তাকায় ওনার দিকে। ঘাড়ে হাত রেখে গম্ভীর কন্ঠে শুধায়,
“আমি কেন আপনার মায়ের সাথে আকাম কুকাম করতে যাবো! নিশ্চিন্তে থাকুন আপনি আমার ঘরে না,আমিই আপনার ঘরে হয়েছি।”
এবার যেন কান ভেদ করে রড ঢুকেছে ওনার। মাথায় দুটো বারি মেরে অজ্ঞান করে ফেললেও ওনি এতো অবাক হতো না। রেগে চেঁচিয়ে বললেন,

“তুমি কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করছো আভিয়ান। ভুলে যাবো তুমি আমার ছেলে।”
“আচ্ছা ভুলে গেলে ওষুধ খাইয়ে ঠিক করে দেবো।”
রাগে গজগজ করছেন ওনি। কুশান তুলে সজোরে ছুঁড়ে মারে তা। চেঁচিয়ে বলল,
“মেয়ের ফাঁদে পড়ে এসব করছো তাই না! ওই মেয়ের কারণে আমার কাজে বাঁধা দিচ্ছ? তোমার অপকর্ম কি করে ঢাকবে! নিজেই তো জড়িয়ে আছো অসৎ কাজে।”
“বাবা আমি এসব নিয়ে কথা বলতে চাইছি না। ওকে তুলবে না কথার মাঝে।”
“ওই মেয়ের জন্য ধ্বংস হবে তুমি। বলে দিলাম আমি।”
আজমল শিকদার কথাগুলো বলে রেগে বেরিয়ে যায়। আভিয়ান চোখ বন্ধ করে সোফায় মাথা এলিয়ে দিল। রাফসার মায়াবী মুখটা ভেসে ওঠে। ঘন পাপড়ি যুক্ত চোখ দুটো, ভ্রু , ঠোঁট। বিশেষ করে ঠোঁটের কোণে কুঁচককুচেঁ কালো তিলটা। আভিয়ানের একটাই আফসোস। রাফসার চুল দেখতে পেলো না আজ অব্দি। সবসময় শুরু থেকেই হিজাব পড়া অবস্থায় দেখে আসছে। আভিয়ান লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ক্লান্ত গলায় বলল,
“তোমাকে পেয়ে গেলেও আমার ধ্বংস মঞ্জুর মায়াবী।”
~ আমি শুধু চেয়েছি তোমায়
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়…

নাসিরাবাদ জিইসি মোড়ে অবস্থিত সানমার ওশান সিটি চট্টগ্রামের তরুণ প্রজন্ম এবং সৌখিন ক্রেতাদের কাছে অন্যতম প্রিয় একটি নাম। এটি চট্টগ্রামের অন্যতম আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন মল। এর গ্লাস দিয়ে ঘেরা স্বচ্ছ দেয়াল এবং ক্যাপসুল লিফট একে একটি অভিজাত চেহারা দেয়। বিশেষ করে সন্ধ্যার আলোয় যখন মলের বাইরের নিয়ন সাইনগুলো জ্বলে ওঠে, তখন এটি বেশ মায়াবী দেখায়।
গাড়ি পার্কিং করে উদ্যান বেরিয়ে রাফসার পাশের দরজা খুলে দিল। রাফসা বেরিয়ে আশেপাশে তাকালো। ভ্রু কুঁচকে বলে,
“এখানে কেন এসেছি!”
উদ্যান কিছু বলল না। রাফসার ডান হাত শক্ত করে চেপে ধরে পা ফেলে সামনে। রাফসা চমকে উঠে। বুঝতে পেরেই হাত ছাড়ানোর জন্য মচড়ামচড়ি শুরু করে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “হাত ধরেছেন কেন? হাত ছাড়ুন এক্ষুনি। নয়তো খবর আছে।”

উদ্যান ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো। কি দিনকাল এলো। এতটুকু মেয়ে ওকে চোখ রাঙাচ্ছে। সামনে তাকিয়ে গমগমে স্বরে বলল, “থাপড়ে গাল ফাটিয়ে দেবো। বেয়াদবি করবি না একদম। আশেপাশে মানুষ দেখছিস না!”
রাফসা তাকালো আশে পাশে। আজ মানুষের সমাগম একটু বেশিই। যা দিনকাল এসেছে। ভিড়ের মাঝেই বেড টাচের শিকার হতে হয়। এদফায় দমে যায় রাফসা। নিজেকে উদ্যানের কাছেই সেফ মনে হলো। তবে ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা কাজ করছে। এরকম করে আজ প্রথম হাত ধরল উদ্যান। ভেতরে ঢুকতেই নিচতলায় ব্র্যান্ডেড ঘড়ি আর কসমেটিকসের দোকানগুলোর কাঁচের ডিসপ্লে।
ডায়মন্ডের দোকানের জন্য যেতে হবে বিশেষায়িত জুয়েলারি কর্নারে। সেখানে পরিবেশটা বাকি মলের চেয়ে একটু আলাদা।অনেক বেশি শান্ত এবং অভিজাত। উদ্যানের সাথে পা মিলিয়ে চলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে রাফসাকে। অ্যাশকে গাড়িতেই রেখে এসেছে। দোকানের সামনে আসতেই দরজায় দাঁড়ানো সুট পরা সিকিউরিটি গার্ড মাথা নিচু করে অভ্যর্থনা জানালো। ভেতরে ঢুকতেই নরম কার্পেট আর উজ্জ্বল ফোকাস লাইটের আলো।রাফসা গোল গোল চোখে তাকিয়ে দেখছে চারদিকে। উদ্যান এখনো ওর হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। ম্যানেজার উদ্যানকে দেখতেই হেসে বলল,

“এই দোস্ত কবে এসেছিস দেশে? একবার জানালি না পর্যন্ত।”
ছেলেটা উদ্যানের কলেজ লাইফের ফ্রেন্ড। বেশ ভালো সম্পর্ক ওদের। উদ্যান ডান হাত থেকে বা হাতে রাফসার হাত নিল। তারপর ডান হাত মিলিয়ে বলল, “চলছে কোনোরকম। তোর কি অবস্থা? ”
“এই তো যাচ্ছে বিন্দাস। তো কি করছিস বর্তমানে?”
“ চট্টগ্রাম মেডিকেলে হার্ট সার্জন হিসেবে জয়েন করেছি।”
দুজন হেসে হেসে কথা বলছে। রাফসা বেকুবের মতো তাকিয়ে রইল। হঠাৎ করেই লোকটা বলল, “ভাবী নাকি? আসসালামু আলাইকুম ভাবী। কেমন আছেন?” তারপর উদ্যানের দিকে তাকিয়ে বলল, “বিয়ে করে ফেললি জানালি না পর্যন্ত।”
রাফসা থতমত খেয়ে যায়। উদ্যান ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো রাফসার দিকে। তারপর ব্যস্ত কন্ঠে বলল, “কিছু নিউ নোসপিন কালেকশন দেখা।”
রাফসা এ দফায় আরো অবাক হলো। নোসপিনের কথা গতকাল রাতেই তো বলেছিল উদ্যান। আর আজ ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে এলো। উদ্যান নিজেই চুস করে নোসপিন কিনল। সাতচল্লিশ হাজার টাকা দাম পড়েছে। রাফসা কিছু বলতেও পারছে না। লোকের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলা খারাপ দেখায়।

“এখানে পার্লারটা কোনদিকে? ”
“দুতোলায় বাম দিকের কর্নারে।”
উদ্যান মাথা নাড়িয়ে বলল, “ওকেহ , আসছি দেখা হবে আরেকদিন।”
বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলো দোকান থেকে। বেরোতেই ওমনি রাফসা ডান হাত দিয়ে উদ্যানের হাত চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “এই আমি আপনাকে বলেছি নোসপিন কেনার জন্য?”
“তুই বলতে হবে কেন? রিশান বলেছে আমায় কিনে দিতে।”
রাফসা অবাক হয়ে বলল, “ভাইয়া কেন বলল!”
“জানিনা।”
রাফসা হাঁটতে হাঁটতে কিছু ভাবলো। আর কথা বাড়াল না।
উদ্যান বাইরে দাঁড়িয়ে ফোনে ডুবে আছে। রাফসা পার্লারের ভেতরে। দশ মিনিট এর মধ্যেই রাফসা বেরিয়ে আসে। চোখজোড়ায় হালকা পানি। উদ্যানের সামনে এসে করে দাঁড়ায়। কাউকে সামনে দাঁড়াতে দেখে ব্যস্ত চোখজোড়া তুলে তাকায় উদ্যান। সর্বপ্রথম চোখ পড়ে রাফসার লালিত নাকে। সেখানে স্থান পেয়েছে একটা ছোট্ট ডায়মন্ডের নাকফুল। পুরো মুখটাকেই যেন পাল্টে দিয়েছে। সৌন্দর্য বেড়ে গিয়েছে মুহূর্তেই। পকেটে ফোন ঢুকাতে ঢুকাতে গম্ভীর কন্ঠে বলল, “চল।”

ততক্ষণাৎ পেছন থেকে কিছু ছেলে দৌড়ে যায়। সামনের ছেলেটা একপ্রকার ধাক্কা দিয়েছে উদ্যান কে। তাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সামনের দিকে। মুহুর্তেই ঘটে যায় অঘটন। দুজনের ওষ্ঠজোড়া মিলিত হয়ে গেল চোখের পলকেই।রাফসা চোখ বড়বড় করে তাকালো। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। উদ্যান নিজেও বুঝতে পারেনি। উদ্যানের দুইহাত রাফসার কোমড় জড়িয়ে আছে। চোর চোর বলে চেঁচানোর শব্দে হুঁশ ফিরে দুজনের। উদ্যান ছিটকে সরে আসে রাফসার থেকে। প্রচন্ড গতিতে বুক ধড়ফড় করছে রাফসার। এই মাএ কি হলো এটা?
উদ্যান অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই গম্ভীর কন্ঠে বলে, “চল। অনাকাঙ্ক্ষিত এক্সিডেন্ট ছিল। সরি বাট নো সরি।”
রাফসা রেগে গেল মুহুর্তেই। রেগে বলল, “আমার ঠোঁট! আহহ সব শেষ। আমার শোয়ামীর কি হবে এখন!”
উদ্যান ভ্রু কুঁচকালো রাফসার কথায়। ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, “নো প্রবলেম। আমি কথা বলে ঠিক করে নেবো।”
গাড়ির ভেতরে নীরবতা বিরাজ করছে। রাফসা অ্যাশকে কোলে নিয়ে স্থির বসে আছে। দৃষ্টি সামনের দিকে নিবদ্ধ। উদ্যান একপলক তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।দক্ষ হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে নীরবতা ভেঙে সুর তুলে।

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৩ (২)

মন হারিয়ে বেঘোরে
ডুবল স্বপ্নে সাগরে
কোন সকালেই ভোরে
আসবি তুই
মেঘলা দিনের আলো
রামধনুটা চেনাল
বলনা আর কত
ভালোবাসবি তুই …
গালে চোঁখে ঠোঁটে তোর আমি
চুমু এঁকেছি সবচেয়ে দামী

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৫