ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৫
নওরিন কবির তিশা
অবশেষে উন্মোচিত প্রতীক্ষার যবনিকা। কাঙ্ক্ষিত দিন, একজোড়া তৃষিত হৃদয়ের আরাধ্য লগন।শুক্রবার বেলা পৌনে দুইটা। বিবাহ উপলক্ষে সমগ্র বাড়িটা রীতিমতো জনাকীর্ণ উদ্যানে পরিণত হয়েছে। জুম্মার নামাজান্তে, পবিত্র কালাম সাক্ষী রেখে সম্পন্ন হবে ওদের আকদ। দুটি প্রাণ বাঁধা পড়বে অনুরাগের অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে, চিরতরে।
তপ্ত দ্বিপ্রহরের সূর্যটা যখন মধ্যগগনে থিতু হয়েছে, সারিনার কক্ষে কিঞ্চিত লোকশূন্যতা। বাইরের হট্টগোল আর উৎসবের কলরব ছেঁটে ফেলে সেথায় বিরাজ করছে এক প্রশান্ত শীতলতা। এসির মৃদু গুঞ্জনে তপ্ত তনুমন নিমেষেই জুড়িয়ে যাচ্ছে। আয়নার সামনে আসীন সাবরিনা। পার্লার থেকে আসা রূপটান শিল্পীরা নিপুণ হাতে শেষ তুলির আঁচড় দিচ্ছেন তার অবয়বে। লাল চেলির আড়ালে আজ তাকে স্বপ্নলোকের কোনো পরী বলে ভ্রম হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
কাজী সাহেব জুম্মার নামাজের পর পরই উপস্থিত হবেন। হাতে সময় বড্ড কম, অথচ প্রতিটি মুহূর্ত যেন উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে দিচ্ছে। সাবরিনার বিপরীতে বসে আছে একদল রূপবতী,মৃত্তিকা, মেহেসানা আর তৃষা। প্রত্যেকের পরনেই একই রঙের লেহেঙ্গা। তারা মূলত কোনো গুরুতর ব্যাপারে আলাপচারিতা সারছে।
আচমকা দরজার ওপাশ থেকে ছোট্ট পায়ের দ্রুত শব্দ শোনা গেল। দু’পায়ে এক প্রকার দৌড়ে এসেই তৃষাকে জাপ্টে ধরল মানব রুপী ছোট্ট পরী টুইংকেল। মিষ্টি কণ্ঠে তৃষাকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,,
“বানি, ইউ লুক সো গর্জিয়াস টুডে! তোমাকে পুরো ফেইরি লাগছে!”
তৃষা আলতো হাতে টুইংকেলকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল। অতঃপর ওর চিবুক উঁচিয়ে নিজের বাদামি দৃষ্টি ওর নীলাভ চোখে স্থির করে এক চিলতে মৃদু হাসলো। পরক্ষণেই ওর দৃষ্টি ব্যস্ত হল মানব রূপী ছোট্ট পরীটির সৌন্দর্য বিশ্লেষণে। তুলতুলে তুষার শুভ্রদেহে আলালের দুলালী বলে মনে হচ্ছে ওকে। ফুলেল হাসিতে গালের টোলটা স্পষ্ট হচ্ছে,তৃষা ওর কপালে একটা চুমু খেয়ে আহ্লাদী সুরে বলল,
“মাই আমার লিটল প্রিন্সেস! থ্যাংক ইউ সো মাচ জান! কিন্তু তোমাকেও তো একদম ডিসনি ওয়ার্ল্ডের বার্বি ডলের মতো লাগছে। মাশাআল্লাহ, মাই প্রিন্সেস ইজ্য লুকিং টু কিউট!”
টুইংকেল ওর দু হাত নেড়ে খুশিতে ডগমগ হয়ে উত্তর দিল,
“নো বানি! তুমি সবচেয়ে বেশি প্রিটি!”
“নো প্রিন্সেস তুমি!”
“না তুমি!”
তৃষা আর টুইঙ্কেলের এই খুনসুটি যেন ঘরের গুমোট উত্তেজনা নিমেষেই হাওয়ায় উড়িয়ে দিল। টুইংকেল ওর ছোট ছোট হাত দিয়ে তৃষার গাল টিপে দিয়ে বলল,
“ওকে বাবা, আমরা দুজনেই অনেক প্রিটি!”
তৃষা হেসে আড়চোখে আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখল সাবরিনা লাজুক হাসছে। ও টুইংকেলকে কোলে বসিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তবে আজকে তোমার সাবু পিপিকে একটু বেশিই সুন্দর লাগছে সুইটহার্ট!”
টুইংকেল খুশিতে গাল ফুলিয়ে বলল,
“ইয়েস! শ্যি ইস লুকিং লাইক আ রেড রোজ।”
মৃত্তিকা আর মেহেসানা এতক্ষণ ওদের এই মিষ্টি কাণ্ড দেখছিল। মেহেসানা এগিয়ে এসে টুইংকেলের নাকে আলতো টোকা দিয়ে বলল,
“এই যে স্নো হোয়াইট, শুধু বানিকে প্যাম্পার করলে হবে? আমাদের কেমন লাগছে সেটা তো বললে না!”
টুইংকেল ঘাড় ঘুরিয়ে সবাইকে একবার দেখে নিয়ে বেশ গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
“তোমরাও অনেক সুন্দর, কিন্তু আমার বানির মতো না। বানি ইজ্য স্পেশাল!”
ওর কথা শুনে পুরো ঘরে হাসির রোল পড়ে গেল। তৃষা ওকে আরও একবার জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“থ্যাংকস ফর দ্য কমপ্লিমেন্ট, মাই কিউটি পাই! এবার চলো, সবাই আসার আগে আমরা সবাই মিলে একটা গ্র্যান্ড সেলফি তুলি।”
বলতে দেরি, সবগুলো একযোগে সাবরিনাকে বিদায় জানিয়ে দলবেঁধে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। উদ্দেশ্য বাড়ির সম্মুখভাগের সজ্জিত বাগানটায় ছবি তোলা।
★
ঘড়ির কাঁটা তখন অপরাহ্ণের চারটে ছুঁইছুঁই। আকদ সুসম্পন্ন হয়েছে অল্পক্ষণ আগেই। এবার সেই বহু প্রতীক্ষিত দর্পণ-দর্শন; নবদম্পতি পাশাপাশি বসে আরশিতে একে অপরের মুখচ্ছবি দেখছে। চারদিকের উৎসবমুখরতায় আত্মীয়স্বজন পরিবেষ্টিত হয়ে আছে যুগল।
হঠাৎ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেসানার তীক্ষ্ণ নজর আটকে গেল পাশের জটলায়। রায়াদদের বাড়ি থেকে আসা একদল তরুণী আদ্রিয়ানকে ঘিরে ধরেছে। আদ্রিয়ানও বেশ সহাস্যে তাদের সাথে বাক্যালাপে মগ্ন। কিন্তু মেহেসানার ধৈর্যের বাঁধ তখন ভাঙল, যখন দেখল একটি মেয়ে আদ্রিয়ানের অতি সন্নিকটে এসে দাঁড়িয়েছে এবং অনর্থক ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছে।
বুকের ভেতরটা এক নিমেষে জ্বলে উঠল অভিমানে। হাতের মুঠোয় থাকা পুষ্পমঞ্জরিগুলো সশব্দে মেঝেতে নিক্ষেপ করে সে গটগট করে আদ্রিয়ানের পাশ দিয়ে এগিয়ে গেল। তীব্র এক ঝলক রোষদীপ্ত চাহনি আদ্রিয়ানের ওপর নিক্ষেপ করে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল,,
“অসভ্যতা আর নির্লজ্জতার একটা সীমা থাকা উচিত!”
বলেই সে ঝড়ের বেগে প্রস্থান করল, আদ্রিয়ানের অপ্রস্তুত বিমূঢ় চাউনি নিক্ষেপপূর্বক ঠায়ে দাঁড়িয়ে রইল। পরক্ষনেই কিছু বলতে যেতেই ও দেখল মেহেসানা পুনরায় অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করেই স্থান ত্যাগ করেছে। আদ্রিয়ান মুহূর্তকাল কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, পরক্ষণেই সম্বিত ফিরে পেয়ে সে মেহেসানার পদাঙ্ক অনুসরণ করল।
জনাকীর্ণ অন্দরমহল ছাড়িয়ে মেহেসানা তখন বাড়ির প্রান্তসীমায়,বাগানবিলাসের ঘন ঝোপ আর বকুলতলার নিবিড় ছায়ায় এক নির্জন স্তব্ধতায়। আদ্রিয়ান পেছন থেকে বেশ কয়েকবার অনুচ্চ স্বরে ডাকল, কিন্তু মেহেসানার কর্ণকুহরে সে আহ্বান পৌঁছাল না কিংবা সে পৌঁছাতে দিল না; তার দ্রুতগামী পদযুগল যেন মাটির সাথে এক নিগূঢ় দ্বন্দ্বে মেতেছে। অবশেষে নিরুপায় হয়ে আদ্রিয়ান ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে গিয়ে মেহেসানার কোমল কবজিটি সজোরে আঁকড়ে ধরল।
মেহেসানা চমকে উঠল, পরক্ষণেই চটকা মেরে হাত ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে রুদ্ধকণ্ঠে বলে উঠল,
“হাত ছাড়ুন বলছি! সাহস তো কম নয় আপনার!”
আদ্রিয়ান ধীরস্থিরভাবে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে শুধাল,,
“হঠাৎ এমন ঝড়ের বেগে চলে এলে যে? প্রবলেমটা কী তোমার? অন্তত কিছু তো বলো!”
মেহেসানা এবার আগ্নেয়গিরির ন্যায় ফেটে পড়ল,
“প্রবলেম আমার নয়, প্রবলেম আপনার ক্যারেক্টারে! ওই মেয়েগুলোর সাথে যেভাবে দাঁত কেলিয়ে ফ্লার্ট করছিলেন, ইট ওয়াজ সো ডিসগাস্টিং! মনে হচ্ছিল যেন আপনিই আজকের ব্রাইডগ্রুম!”
আদ্রিয়ান এবার কৌতুকের হাসি সংবরণ করতে পারল না। ওর চোখের মণি দুটো সরু হয়ে এল, অধরে খেলে গেল এক চিলতে দুষ্টুমির রেখা। সে মেহেসানার দিকে কিছুটা ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“ওহ রিয়েলি? তো,আর ইউ জেলাস,মিস মেহেসানা?”
মেহেসানা তাচ্ছিল্যের সুরে উত্তর দিল,,
“জেলাস? মাই ফুট! আপনার মতো অ্যাটেনশন সিকারকে নিয়ে হিংসে করার মতো রুচি আমার নেই। আই জাস্ট হেইট চিপ মেন্টালিটি।”
আদ্রিয়ান ওর হাতটা আরও একটু নিবিড় করে ধরে বলল,
“আরেহ,কাম অন মিস! দে ওয়ার জাস্ট গেস্টস। আমি শুধু ফরমালি কথা বলছিলাম। ইউ নো, আই ডোন্ট কেয়ার অ্যাবাউট দেম।”
মেহেসানা পুনরায় হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে ধরা গলায় বলল, ,
“ডোন্ট ট্রাই টু সুগারকোট এভরিথিং। আপনার ওই ‘ফরমালিটি’ আর আমার সহ্য হচ্ছে না। সো প্লিজ, লিভ মাই হ্যান্ড অ্যান্ড গো ব্যাক টু ইউর ফ্যান ক্লাব!”
আদ্রিয়ান মৃদু হেসে মেহেসানার হাত ছেড়ে দিয়ে বলল,, “ওকে!”
আদ্রিয়ানকে সত্যি সত্যি চলে যেতে দেখে মেহেসানার বুকের ভেতরটা যেন হু হু করে উঠল। অভিমানে গলার কাছটা বুজে আসলেও রাগে ও ফেটে পড়ল। পেছন থেকে তীক্ষ্ণ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল,,,
”বাহ্! খুব তো কথা শোনা হচ্ছে দেখছি! মনে হচ্ছে আমি যা বলি তাই আপনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন!”
আদ্রিয়ান থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরল। চোখেমুখে কৃত্রিম বিস্ময় ফুটিয়ে বলল,
“কেন? তুমিই তো বললে লিভ মাই হ্যান্ড অ্যান্ড গো ব্যাক। আমি তো জাস্ট তোমার হুকুম তামিল করছিলাম, সো হোয়্যাই আর ইউ্য শাউটিং নাউ?”
মেহেসানা দ্রুত পায়ে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“অ্যাক্টিং একদম বন্ধ করুন আদ্রিয়ান! আপনি খুব ভালো করেই জানেন আমি কখন কী মিন করি। এতক্ষণ ধরে চলে যাওয়ার নাম নেই, আর ফ্যান ক্লাবের কথা বলতেই অমনি গদগদ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন?”
আদ্রিয়ান এক কদম এগিয়ে এল। মেহেসানার চোখের খুব কাছে চোখ রেখে নিচু স্বরে বলল,,,
“অদ্ভুত তো! গেলে দোষ, না গেলেও দোষ। আসলে প্রবলেমটা ফ্যান ক্লাবে নয় মেহেসানা, প্রবলেমটা তোমার এই ইনসিকিউরিটি আর একগুঁয়েমিতে। হোয়াই ডোন্ট ইউ্য জাস্ট অ্যাডমিট দ্যাট ইউ কান্ট টলারেট এনিওয়ান নিয়ার ম্যি?”
মেহেসানা এবার স্তব্ধ হলো। আসলেও তো আদ্রিয়ান যেখানে খুশি যাদের সাথে খুশি কথা বলুক ওর এত খারাপ লাগছে কেন? তবে কি? না না নিজের অবচেতন মনের অনুভূতিটা হৃদ গহীনে এই বদ্ধ করে; শুকনো ঢোক গেলে আদ্রিয়ানের দিকে তাকালো ও। সঙ্গে সঙ্গে আদ্রিয়ান বাম ভ্রু টা ঈষৎ নাচিয়ে শুধালো,,
“কি হলো। বলো বলো?”
মেহেসানা প্রত্যুত্তর করল না। মুহূর্তের মাঝে পিছন ঘুরলো কৃত্রিম গাম্ভীর্য টেনে এনে গজগজ করতে করতে প্রস্থান করল সেখান থেকে।
★
এদিকে তৃষা তখন হন্তদন্ত হয়ে টুইঙ্কেলকে খুঁজে ফিরছে। দোতলার ওই দীর্ঘ জনশূন্য করিডর ধরে হাঁটছিলো ও। হঠাৎ এক জোরালো টানে ওর গতিপথ রুদ্ধ হলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক বলিষ্ঠ হাত ওর কবজি টেনে ধরল এবং মুহূর্তের ব্যবধানে তৃষা নিজেকে আবিষ্কার করল একটি রুদ্ধদ্বার কক্ষের দরজার সাথে লেপ্টে থাকা অবস্থায়। ভয়ে আর বিস্ময়ে তৃষার আঁখিপল্লব নিমেষেই বুজে এল, হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি যেন কানের পর্দায় আছড়ে পড়ছে। কাঁপা কাঁপা গলায় আর্তনাদ করতে যাবে, তখনই নাকে এসে লাগল । নীলগিরির পাইন বনের সজীবতার কথা মনে করিয়ে দেওয়া অতি পরিচিত সেই পারফিউমের ঘ্রাণ ।
ধীরে ধীরে চোখ মেলে তৃষা দেখল সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং আর্য। আর্যর ওই তীক্ষ্ণ আর নেশাতুর চাউনি দেখে তৃষা কিছুটা আশ্বস্ত হলেও পরক্ষণেই কপট রাগ ফুটিয়ে তুলল চোখেমুখে। ওষ্ঠাধর কিঞ্চিত ফুলিয়ে অভিমানের সুরে বলে উঠল,
“ও গড! আপনি এমন অসভ্যতা করলেন কেন বলুন তো? জানটা তো প্রায় বেরিয়েই গিয়েছিল আমার!”
আর্য কোনো উত্তর দিল না। পরিবর্তে সে আরও এক কদম এগিয়ে এল, তাদের মধ্যকার ব্যবধানটুকু প্রায় শূন্যে মিলিয়ে গেল। তৃষার রেশমি চুলের গহন অরণ্যে নিজের মুখাবয়ব ডুবিয়ে দিয়ে এক গভীর তৃষ্ণার্ত দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল আর্য। তৃষার গলার কাছে ওর তপ্ত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে। আর্য অতি মৃদু স্বরে বলল,
“এই বিয়ের চক্করে পড়ে কতক্ষণ নিজের জানটাকে কাছে পাইনি বলতো? দম আটকে আসছিল আমার, আই ওয়াজ লিটারালি সাফোকেটিং!”
তৃষা এবার কিছুটা হকচকিয়ে গেল। আর্যর কথা শুনে ওর সরল মনে আশঙ্কার মেঘ জমল। ও খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে আর্যর বুক ঠেলে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে শুধাল,
“সাফোকেশন? কিন্তু আপনার তো আগে কোনো শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল না! হঠাৎ এখন এমন হচ্ছে কেন? আপনি ঠিক আছেন তো?”
আর্য তৃষার এহেন সারল্যে নিঃশব্দে হেসে উঠল। অতঃপর তৃষার কানের লতি ছুঁয়ে থাকা ঝুমকোটা আলতো করে নেড়ে দিয়ে রসিকতার সুরে বলল,
“ স্টুপিড গার্ল! অক্সিজেন যদি সারাক্ষণ আড়ালে থাকে, তবে কি সুস্থ মানুষেরও শ্বাস নিতে কষ্ট হয় না?”
আর্যর কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে তৃষার এক মুহূর্তও দেরি হলো না। লজ্জায় আর আবেশে ওর গাল দুটো নিমেষেই রক্তজবার ন্যায় রাঙা হয়ে উঠল। ও দৃষ্টি নত করে বিড়বিড় করে বলল,
“সব সময় উল্টাপাল্টা ডায়লগ শুনিয়ে আমাকে দুর্বল করার চেষ্টা!”
আর্য এবার ওর চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। ওর গভীর দৃষ্টি তৃষার কম্পিত ওষ্ঠাধরে স্থির করে বলল,
“ইটস নট জাস্ট আ ডায়ালগ, তৃষা। ইটস আ রিয়ালিটি। সারাদিন শুধু টুইঙ্কেল আর বন্ধুদের নিয়ে বিজি থাকা, একবারও কি এই অভাগা লোকটার কথা মনে পড়েনি? ডোন্ট ইউ্য মিস মি অ্যাট অল?”
তৃষা আর্যর বুকের বোতাম নিয়ে অন্যমনস্কভাবে খেলতে খেলতে অস্ফুট স্বরে বলল,
“মনে পড়ার সময় দিলে তো! আপনিই তো সারাক্ষণ ছায়ার মতো পিছু ছাড়ছেন না।”
আর্য হঠাৎ-ই তৃষাকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে বন্ধন নিবিড় করে বলল,,
“বিয়ে করেছি কি পিছু ছাড়তে নাকি?”
তৃষা লাজুক হেসে মুখ লুকালো আর্যর বক্ষদেশে। অতিক্রান্ত হলো খানিকক্ষণ; হঠাৎ নীরবতা ভেঙ্গে আলতো করে আর্যর বুক ঠেলে নিজেকে কিছুটা সরিয়ে নিল তৃষা। আর্যর বিস্ময় মাখানো দৃষ্টির তোয়াক্কা না করে এক কৃত্রিম গাম্ভীর্য ওষ্ঠাধরে মেখে তৃষা বলে উঠল,
“বিয়ে করেছেন কই শুনি? একি আদৌ কোনো বিয়ে হলো?”
আর্য ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে তাকাল। ওর বিস্ময় যেন আকাশ স্পর্শ করছে,,
“হোয়াট? হোয়াই আর ইউ সেয়িং দিস তৃষা? বিয়ে হয়েছিল না মানে?”
তৃষা এবার দুহাত কোমরে রেখে ঝংকার দিয়ে উঠল,
“ ওটা বিয়ে? কত সাধ ছিল বিয়ের সময় লাল বেনারসি পরে রাজকীয় ঢঙে ছবি তুলব, ক্যান্ডিড শট নেব, রিলস বানাব। কিন্তু আপনার কারণে তো তার কিছুই হলো না! ওইটুকু সময়ের জন্য আপনার ওই নির্জন ঘরে বন্দি থাকতে গিয়ে আমি আমার লাইফটাইম মেমোরিজ মিস করলাম। ইট’স সো আনফেয়ার!”
আর্য এবার এক গাল হেসে বলল,
“ওহ্! এই ব্যাপার? তা হলে কি তোমার শখ মেটাতে আবার আরেকবার বিয়ে করা উচিত ম্যাডাম?”
তৃষা এবার হঠাত করেই সত্যি সত্যি রেগে গেল। ও ধরা গলায় বলল,
“জীবন তো আর স্টার জলসা কিংবা জি বাংলার সিরিয়াল নয় যে বছরে ৪-৫ বার বিয়ে হবে আর প্রতিবার গ্র্যান্ড সেলিব্রেশন হবে! আর বিয়ে তো বিয়ে একটা প্রপার হানিমুনেও গেলাম না আমরা। কোনো রোমান্টিক ডিনার নেই, লং ড্রাইভ নেই—সবকিছুই কেমন যেন দায়সারা! আই হেইট দিস ক্যাপ্টেন!”
বলেই তৃষা আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। ওড়নার আঁচল সামলে গটগট করে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আর্য সেখানেই প্রস্তর মূর্তির ন্যায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কোত্থেকে কী হয়ে গেল, ওর পুরুষালি মস্তিষ্ক তা অনুধাবন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো। এক মুহূর্ত আগেও যে মেয়েটা ওর বুকে মুখ লুকিয়ে প্রেমের আবেশে মগ্ন ছিল, পরক্ষণেই সে এমন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে প্রস্থান করল কেন?তা আর্যর বোধগম্য হলো না। সে শুধু অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করল,
“উইমেন আর আনপ্রেডিক্টেবল! রিয়েলি আনপ্রেডিক্টেবল!”
রাত্রির নিবিড় স্তব্ধতা তখন চরাচরে ঘনিয়ে এসেছে। জানালার ওপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার অবিশ্রান্ত গুঞ্জন যেন এক তন্দ্রালু আবহের সৃষ্টি করেছে। বিবাহের সমস্ত কাজের অবসান ঘটিয়ে তৃষা সবেমাত্র টুই্ংকেলকে ঘুম পাড়িয়ে নিজের অবসন্ন শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিয়েছিল। হঠাৎ দরজায় অত্যন্ত মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ হলো। তৃষা ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে গলার স্বর কিছুটা সংযত করে বলল,
“আসুন, দরজা খোলাই আছে।”
কক্ষতলে প্রবেশ করল আর্য। ওকে দেখেই তৃষা মুখটা কিঞ্চিৎ ঘুরিয়ে নিল, কপট গাম্ভীর্য বজায় রেখে জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। আর্য কোনো কথা না বলে ধীরপদে এগিয়ে এল এবং তৃষার একদম গা ঘেঁষে বিছানায় বসল।
তৃষা নড়েচড়ে বসলো,
“আবার এখানে কেন?”
আর্য কোনো উত্তর না দিয়ে পকেট থেকে দুটি নীল রঙের খাম বের করে তৃষার কোলের ওপর রাখল। তৃষা ভ্রু কুঁচকে খাম দুটোর দিকে তাকিয়ে সুধাল,
“এসব কী?”
“ওপেন ইট!”
তৃষা প্রথমে নিতে না চাইলেও কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে খামটা খুলল। ভেতরে তাকাতেই ওর চোখের মণি দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। কক্সবাজারের দুটো রিটার্ন এয়ার টিকিট! ও অবাক হয়ে আর্যর দিকে তাকাতেই আর্য আলতো হেসে বলল,
“হানিমুনের কথা বলছিলে না? সো, দিস ইজ ইট। আগামীকাল বিকেলের ফ্লাইট। শুধু তুমি আর আমি।”
তৃষা টিকিট দুটো হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। মনের ভেতরের অভিমানের বরফটা গলতে শুরু করলেও দুষ্টুমি করার লোভটা সামলাতে পারল না। সে ঠোঁট উল্টে টিপ্পনী কেটে বলল,
“হানিমুনে গিয়ে কী হবে? সব আকাম তো আগেই করা শেষ, এখন টিকিট দেখিয়ে লাভ কী?”
আর্য এবার বেশ শব্দ করে হেসে উঠল। তৃষার কাঁধে হাত রেখে ওকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে লহমায় বলল,
ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৪
“আরেহ্ জান! ওটা তো ছিল ঘরোয়া বাসর, আর এটা হবে অফিশিয়াল হানিমুন! ওটার ফিলিংস আলাদা আর এটার ফিলিংস সম্পূর্ণ আলাদা। ডোন্ট মিক্স দেম আপ!”
তৃষা আর্যর বুকে একটা মৃদু কিল মেরে লজ্জায় লাল হয়ে গেল। আর্য ওর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“আসলে ক্যাপ্টেন কখনও তার লেডি লাভকে হারতে দেয় না। ইউ্য ওয়ান দিস রাউন্ড, মাই কুইন!”
