Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৯

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৯

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৯
নওরিন কবির তিশা

‘হ্যেই মিস নাগা মরিচ, আপনি এখানে?’—জনাকীর্ণ হাসপাতালের কোলাহলের মধ্য হতে হঠাৎ ভেসে আসা পৌরুষ কণ্ঠটায় না চাইতেও পিছন ঘুরে তাকালো মেহেসানা।
গলায় স্টেথোস্কোপ ঝোলানো ধবধবে সাদা এপ্রোন পরিহিত সুঠামদেহি পুরুষটাকে দেখে তৎক্ষণাৎ ভ্রু কুঁচকে আসলো তার।—‘আরে মিস্টার খাম্বা আপনি এখানে কি করছেন?
মেহেসানার এমন সম্বোধনে কিঞ্চিৎ ভ্রু গোঁটালো আদ্রিয়ান,,—‘আমাকে দেখে খাম্বা মনে হয়?
মেহেসানা তিরিক্ষি কন্ঠে জবাব দিল,,—‘তো আমাকে দেখে কোন অ্যাঙ্গেল দেখে আপনার নাগা মরিচ মনে হয়?
আদ্রিয়ান মৃদু হেসে বিড়বিড়িয়ে বলল,,—‘সব দিক থেকেই।
মেহেসানা শুনতে পারলো না আদ্রিয়ানের কথাটা। নিশ্চিত হতে সে ফের বলল,,—‘কিছু বললেন?
আদ্রিয়ান বোকা হেসে বলল,,–‘নাথিং।
অতঃপর একবার আশেপাশে চোখ বুলিয়ে বলল,,‌–‘তা ম্যাডাম, এই অসময়ে হাসপাতালে কী মনে করে?
মেহসানা এবার একটু দমে গেল। বিরক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা দুশ্চিন্তাটা এবার প্রগাঢ় হয়ে ফুটে উঠল তার মুখাবয়বে। দুশ্চিন্তায় এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বক্ষ ভেদিয়ে,,

—-‘অ্যাকচয়ালি ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে আমাদের ফ্রেন্ডদের গাড়িটা অ্যা’ক্সি’ডে’ন্ট করেছে। আমরা কয়েকজন একসাথে ফিরছিলাম, হুট করে উল্টো পাশ থেকে একটা গাড়ি এসে সজোরে ধাক্কা দেয়। আমরা যারা পেছনে ছিলাম তাদের তেমন কিছু হয়নি, কিন্তু সামনে থাকা দুজন বন্ধু বেশ চোট পেয়েছে। একজনের মাথা ফেটে র’ক্তা’র’ক্তি অবস্থা।
মেহসানার কথাগুলো কর্ণগোচর হওয়ামাত্র আদ্রিয়ানের চেহারার চপলতা মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। একজন আদর্শ চিকিৎসকের বিচলিত ভাব ফুটে উঠল তার চোখেমুখে। সে বেশ গুরুত্বের সাথে জিজ্ঞেস করল,,
—-‘ইনজুরি কি খুব ডিপ? পেশেন্ট এখন কোথায়? কুইক বলুন, আমি দেখছি।
আদ্রিয়ানের এই হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যাওয়াটা মেহসানার পছন্দ হলো না। সে পূর্বের ন্যায় ঝগড়াটে কণ্ঠে বলল,,
—-‘দরকার নেই। আপনার মতো খাম্বা ডাক্তার দিয়ে আমার ফ্রেন্ডের চিকিৎসা করানোর একদমই ইচ্ছে নেই আমার। দেখা গেল বললেন…!থাক নার্সরাই দেখছে।
আদ্রিয়ান এবার খানিকটা ভাব নিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,,

—‘লুক মিস নাগা মরিচ, ইউ ক্যান ট্রাস্ট মি। আই এম আ সার্জন। ইমার্জেন্সিতে ইগো না দেখিয়ে পেশেন্টকে সাহায্য করতে দিন।
মেহসানা আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। আদ্রিয়ান অনেকটা জোর কদমে ভেতরে প্রবেশ করলো। অতঃপর আনাফকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে চমৎকারভাবে ব্যান্ডেজ করে দিল সে। তার কাজের ক্ষিপ্রতা আর দক্ষতা দেখে মেহসানা ভেতরে ভেতরে একটু অবাক হলো বৈকি।
কিছুক্ষণ পর আদ্রিয়ান বেরিয়ে যাওয়ার পর মেহসানা তার বন্ধু মহলের কাছে গেল। আহত আনাফের কাছে এখন কি অবস্থা জিজ্ঞাসা করতেই সে হেসে বলল,,

—-‘ডোন্ট ওয়ারি দোস্ত, আই অ্যাম অ্যাবসোলিউটলি ফাইন নাও! আর আদ্রিয়ানের ব্যান্ডেজ বলে কথা যেন তেন ব্যাপার। ওনার হাতের ছোঁয়া পেয়েছে কিন্তু সুস্থ হয়নি এমন পেশেন্ট বোধ হয় হাজারেও একটা মিলবে না। আর আমার তো জাস্ট একটা মাইনর ইঞ্জুরি ছিল।
মেহসানার মনের ভেতরের কাঠিন্য যেন একটু একটু করে গলতে শুরু করল। বন্ধুদের মুখে আদ্রিয়ানের গুণগান শুনে তার নিজের অজান্তেই এক অদ্ভুত কৌতূহল দানা বাঁধল।লোকটা কি আসলেই অতটা ভালো? নাকি পুরোটাই লোকদেখানো? কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাটা সৌজন্যের অংশ, সেই বোধ থেকেই সে ধীর পায়ে আদ্রিয়ানের চেম্বারের দিকে পা বাড়াল।
করিডোরের শেষ প্রান্তে আদ্রিয়ানের নেমপ্লেট লাগানো ঘরটা নিস্তব্ধ। মেহসানা দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখল পর্দাটা একটু সরানো। ভেতরে ঢোকার আগেই তার পদচারণা স্থির হলো এক দূর্লভ দৃশ্যে।চেম্বারের ভেতরে আদ্রিয়ানের সামনে বসে আছেন জরাজীর্ণ শাড়ি পরা এক মধ্যবয়সী নারী। তার দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে অনর্গল, কিন্তু সে অশ্রু বেদনার নয় বরং পরম কৃতজ্ঞতার।
মহিলাটি আদ্রিয়ানের হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বারবার বলতে লাগলেন,,

—-‘বাবা, তুমি আমার ছাওয়ালডারে নতুন জীবন দিলা। এই দুনিয়ায় টেকার অভাবে কত মানুষ ম”ইরা যায়, আর তুমি নিজের পকেটের টেকা দিয়া আমার বাজানরে বাঁচাইলা। তোমার এই ঋণ আমি কোন জনমে শোধ করমু?
আদ্রিয়ান অত্যন্ত নম্রভাবে মহিলার হাত দুটো সরিয়ে দিয়ে মৃদু হাসল। সেই হাসিতে কোনো দম্ভ নেই, কেবল একরাশ প্রশান্তি। সে শান্ত কণ্ঠে বলল,,
—-‘খালা, ঋণের কথা কেন তুলছেন? আমি তো শুধু উছিলা মাত্র। আপনার ছেলের সুস্থ হওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওনা। আর টাকা? ওগুলো তো কাগজের টুকরো মাত্র, মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কিছু নয়। আর যদি এটুকুই সাহায্য না করতে পারলাম তাহলে আমার এই সাদা এপ্রোনেটার মূল্য কি রইল? আপনি সাবধানে বাড়ি ফিরুন, আর কোনো দরকার হলে আমাকে জানাবেন।

মহিলাটি আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলেন। মেহসানা দরজার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে উঠল। যে আদ্রিয়ানকে সে শুধু একজন রম্য রসিক ভেবে খাম্বা বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে, সেই মানুষটার হৃদয়ের বিশালতা এত বেশি? নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে একজন অপরিচিত দরিদ্র মায়ের সন্তানের চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া—এ যেন এই স্বার্থপর যুগে এক রূপকথার গল্প।
মেহসানা কিছুক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। বিমূঢ় তার দৃষ্টি হাতে ধরা একগুচ্ছ ‘থ্যাংক ইউ’ বলার প্রস্তুতি, কিন্তু এই মুহূর্তে সেগুলো বড্ড ছোট আর অর্থহীন মনে হলো। আদ্রিয়ানের মহানুভবতার সামনে তার সাধারণ ধন্যবাদটা বড্ড নস্যি।
সে ভেতরে ঢোকার সাহস পেল না। আদ্রিয়ানের সেই শান্ত ও গম্ভীর অবয়বটার প্রতি এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা আর ভালো লাগা তার মনের গহীনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। মেহসানা কোনো কথা না বলে, আদ্রিয়ানের সাথে দেখা না করেই ধীর পায়ে উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করল।

দুটি দিন অতিক্রান্ত।বৈশাখ আসতে না আসতেই শুরু হয়েছে কালবৈশাখীর দাপট। দুল্যক আজ মেঘে ঢাকা, যেন অভিমানী কোনো রূপসী অবগুণ্ঠন টেনে বসে আছে। চন্দ্রের দেখা মিলছে কিঞ্চিৎ কদাচিৎ।তার ক্ষণস্থায়ী আভা মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিয়েই আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।
টুইংকেল আজ বড্ড তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়েছে। সারাদিনের চঞ্চলতা শেষে তার নীলাভ ডাগর চোখে ঘুমের আবেশ। তৃষা সস্নেহে ওকে খাইয়ে দিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। কপালে একটি আলতো চুমু এঁকে ঘর থেকে বেরোলো। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক ধ্বনি রাতের গভীরতা জানান দিচ্ছে।
আর্য আজ দাপ্তরিক কাজে বেশ ব্যস্ত ছিল। নৌবাহিনীর কঠিন নিয়মানুবর্তিতার মাঝেও তাকে আজ অনেকটা সময় বাইরে কাটাতে হয়েছে। তার বাড়িতে ফিরতে ফিরতে টুইংকাল ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছে। বর্তমান সে ড্রয়িং রুমের সোফাটায় ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে। হয়তো অ্যাডমিরালের সাথে কোনো জরুরি মেইল চালাচালি করছে কিংবা আগামী দিনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ রণকৌশল সাজাচ্ছে।

তার তীক্ষ্ণ মুখাবয়বে পেশাদারি গাম্ভীর্য।তৃষা ওপর তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামছে প্রায় শেষ ধাপে আছে সে, ঠিক সেই মুহূর্তে প্রকৃতির রুদ্ররূপ চরম সীমায় পৌঁছাল। এক নিমেষেই চারদিকের আলো নিভে গিয়ে এক ঘন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার গ্রাস করে নিল পুরো অন্দরমহল। আর ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই আকাশ ফেটে পড়ল এক প্রলয়ংকরী গর্জনে। বিদ্যুতের সেই তীব্র নীলচে আলো জানলার কাঁচ ভেদ করে তৃষার চোখে বিঁধল।
তৃষা চিরকালই অন্ধকার আর এই মেঘের গর্জনকে ভীষণ ভয় পায়। আচমকা এই শব্দে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। এক তীব্র আর্তনাদ বেরিয়ে এলো তার কণ্ঠ চিরে। পা দুটো যেন সিঁড়ির ধাপে অবশ হয়ে আটকে গেল। ভয়ে দুই হাতে নিজের কান চেপে ধরে সে অন্ধকারের মাঝেই থরথর করে কাঁপতে লাগল।
আঁধারে অভ্যস্ত আর্যর সজাগ দৃষ্টি মুহূর্তেই তৃষার সেই অসহায় অবস্থাটা ধরে ফেলল। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে ল্যাপটপ সরিয়ে দ্রুত কদমে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। তৃষা তখন ভয়ে দিশেহারা হয়ে টলমল পায়ে নিচের দিকে নামার চেষ্টা করছে। ঠিক তখনই আর্যর বলিষ্ঠ হাত দুটো তাকে আগলে ধরল।

তৃষা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে,কেবল আশ্রয়ের তীব্র তৃষ্ণায় আর্যর প্রশস্ত বক্ষপটে নিজেকে সঁপে দিল। তার দুহাত আর্যর শার্টের কলার শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে, যেন এই শক্ত বাঁধনটুকুই তাকে এই প্রলয় থেকে বাঁচাতে পারে। আর্যর হৃদস্পন্দন তখন দ্রুততর হচ্ছে, সেই স্পন্দন তৃষার কানের কাছে কোনো এক ছন্দের মতো বাজছে। আর্যর শরীরের সেই চেনা সুবাস, সেই উষ্ণতা অন্ধকারকেও যেন ম্লান করে দিল। আর্যও নিভৃতে নিজের অজান্তেই হাত দুটি তৃষার পিঠে রাখল।

সেই নিস্তব্ধ আধাঁরাচ্ছন্ন পরিবেশের এক জোড়া উষ্ণ নিঃশ্বাস বাইরের বৃষ্টির টাপুর-টুপুর আর মাঝে মাঝে বিদ্যুতের চমক যেন তাদের এই মুহূর্তটির সাক্ষী হয়ে রইল। আর্য অনুভব করল তৃষার শরীরের কম্পন ধীরে ধীরে কমে আসছে, কিন্তু তার আঁকড়ে ধরার তীব্রতা কমেনি। এক অদ্ভুত আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে রইল চারপাশ।
হঠাৎ করেই যেন জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় আলো ফিরে এলো। আইপিএস চালু হতে ড্রয়িং রুমের ঝাড়বাতিগুলো জ্বলে জ্বলে উঠলো আর তৃষার চোখের সামনে অন্ধকার পর্দা সরে গেল। আলোর প্রখরতায় সে যখন চোখ মেলে তাকালো, দেখল সে আর্যর বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে আছে। আর্যর সেই শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার মুখের ওপর স্থির।
বাস্তবতা ফিরে আসতেই তৃষার সারা শরীরে লজ্জার এক তীব্র লহর বয়ে গেল। তার ফর্সা মুখখানি মুহূর্তেই সিঁদুরে মেঘের মতো রাঙা হয়ে উঠল। ছিঃ! একি করল সে? লোকটাকে সে এড়িয়ে চলতে চায়, অথচ এই বিপদকালে তাকেই কিনা এভাবে আঁকড়ে ধরল!
তৃষা তড়িৎগতিতে আর্যর বাঁধন আলগা করে দুই পা পিছিয়ে গেল। লজ্জায় তার মাথা নিচু হয়ে এলো। নিজের ওড়নাটা ঠিক করতে করতে সে প্রকম্পিত কন্ঠে অস্ফুট স্বরে বলল,,

—-‘আমি… আসলে…বিদ্যুৎ চমকানো দেখে খুব ভয় পেয়েছিলাম। আমি বুঝতে পারিনি…!
আর্য স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। অতঃপর নিচু স্বরে কেবল বলল
—‘ইটস নরম্যাল।ভয় পাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
আর্যর গম্ভীর স্বরের সেই সহজ স্বীকারোক্তি তৃষার বুকে এক অদ্ভুত তোলপাড় সৃষ্টি করল। সে লজ্জিত মুখে চোখ তুলে চাইতে কুন্ঠিত হলো আর্য সহজভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে ল্যাপটপটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর রাখল। তৃষা তখনও জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে। পরিবেশের জড়তা কাটাতে সে আমতা আমতা করে প্রশ্ন করল,
—-‘আপনি তো মাত্র ফিরলেন, ডিনার করবেন না? আমি কি সার্ভ করি?
আর্য তৃষার দিকে এক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ল,,
—-‘আপনি ডিনার করছেন? নাকি টুইঙ্কেলকে নিয়েই বসেছিলেন?
তৃষা ঈষৎ মাথা নেড়ে না সূচক জবাব দিল। তার এই নীরব স্বীকারোক্তিতে আর্যর ভ্রু জোড়া কিছুটা কুঁচকে আসলো;মৃদু অনুযোগের সুরে সে বলল,,

—-‘বাট হ্যোয়াই? এত রাত পর্যন্ত ডিনার না করার কারণ কি?
কি উত্তর দেবে বুঝতে না পারায় তৃষা কেবল মাথা নিচু করে নিজের ওড়নার খুঁট আঙ্গুলে জড়াতে লাগল। আর্য চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ড্রয়িং রুমের গ্লাস উইন্ডোর দিকে এক পা বাড়াল। বাইরে তখনো বৃষ্টির অবিরাম ধারা চলছে।সে ঘাড় ঘুরিয়ে তৃষার দিকে তাকিয়ে বলল,,
—-‘ কোইশ্চ্যান করছিলাম মেইবি?অ্যান্সারটা…
তৃষা একটু থতমত খেয়ে বলল,,
—-‘না, অ্যাকচুয়ালি টুইংকেলকে খাওয়াতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। তাছাড়া আজ ও ঘুমিয়ে পড়েছিল তাই একা একা ডিনার করতে ঠিক ভালো লাগছিল না।
আর্য এবার সরাসরি তৃষার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে তখন এক প্রচ্ছন্ন আধিপত্যের ছাপ, অথচ সেখানে কোথাও মায়া মিশে আছে। সে মৃদু হেসে বলল,,

—-‘সো, আই গেস উই আর অন দ্য সেম বোট। আমিও আজ কাজের চাপে লাঞ্চটাও ঠিকঠাক করতে পারিনি। এখন বেশ ক্ষুধা লেগেছে। সো, লেটস গেট দিস ডান। আপনি কি আমাকে কোম্পানি দেবেন, নাকি আমি ডাইনিং টেবিলে একাই এক যুদ্ধ শুরু করব?
তৃষা হেসে ফেলল আর্যর বলার ভঙ্গিতে। সে দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলল,,
—-‘ঠিক আছে, আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন। আমি খাবারগুলো গরম করে সার্ভ করছি।
আর্য ওয়াশরুমে যেতেই তৃষা ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজাচ্ছিল, বিদ্যুৎ ফেরেনি এখনও সেই সঙ্গে হঠাৎ আইপিএসটাও বন্ধ হয়েছে কারণটাও অজানা, স্বাভাবিক কারণে কখনোই এমনটা হওয়ার কথা নয়। আর্য ভাবল একটু খুঁটিয়ে দেখবে। পরক্ষণেই কি জানি ভেবে আর গেলো না।দিক বদলে স্টোর রুম থেকে বের করে আনল তিনটি লম্বাটে সাদা মোমবাতি।
পুরো বাড়ি তখন নিস্তব্ধ। ঝোড়ো হাওয়ার শব্দে জানলার পাল্লাগুলো মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে। আর্য ডাইনিং টেবিলের কাছে পৌঁছাল,তৃষা কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত হতেই আর্য তাকে আশ্বস্ত করে বলল,,

—-‘আমি।
আর্য টেবিলের ওপর রাখা শৌখিন মোমদানিটায় মোমবাতি গুলো বসিয়ে পাশ থেকে লাইটারটা নিয়ে সেগুলো জ্বালিয়ে দিল।নিমিষেই চারদিকের ঘন অন্ধকার চিরে মোমবাতির সেই মায়াবী নিয়ন আলো ছড়িয়ে পড়ল। মোমবাতির শিখাগুলো বায়ুর ঝাঁপটায় কম্পিত হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে, আর সেই কম্পমান আলো তৃষার লজ্জিত মুখে এক অদ্ভুত লাবণ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে।
আর্যর চোখের মণি সেই আলোয় অত্যাধিক তীক্ষ্ণ আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। টেবিলের কাঁচের ওপর মোমবাতির প্রতিবিম্বটা যেন এক শান্ত জলাশয়ের মতো স্থির হয়ে আছে।বাইরে তখন প্রকৃতির রুদ্ররোষ স্তিমিত হওয়ার বদলে আরও ঘনীভূত হয়েছে। বর্ষণের সেই উন্মাদনা জানলার শার্শিতে আছড়ে পড়ছে সজোরে। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন এক একটি তীরের মতো কাঁচের গায়ে বিঁধছে, আর সেই অবিরাম ঝমঝম শব্দে এক অদ্ভুত ছন্দময় নিস্তব্ধতা তৈরি হয়েছে।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৮

বিদ্যুতের ক্ষণস্থায়ী চমকে মাঝে মাঝে বাইরের গাছপালার কালচে অবয়বগুলো অশরীরী ছায়ার মতো জানলার কাঁচে ভেসে উঠছে। কিন্তু অন্দরমহলে ক্ষুদ্র আলোর বৃত্তে বসে থাকা দুটি হৃদয়ের মাঝে তখন এক অপার্থিব প্রশান্তি বিরাজ করছে। ঝোড়ো হাওয়ার শব্দ ছাপিয়ে কেবল শোনা যাচ্ছে তাদের মৃদু শ্বাস-প্রশ্বাস আর বৃষ্টির সেই চিরন্তন গীতকাব্য, যা এই রাতের নির্জনতাকে এক গভীর সার্থকতা দান করছে।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১০