বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৫
সুমি চৌধুরী
বাঁধন রূপার হাত থেকে ল্যাপটপের বাক্সটা এক ঝটকায় ছিনিয়ে নেয়। সে দ্রুত প্যাকেটের স্কচটেপ ছিঁড়ে ল্যাপটপটা বের করে সেটার চারদিক খুব নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করতে থাকে। অবিকল একই মডেল, একই কনফিগারেশন আর একই র্যামের ল্যাপটপ। সে ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে রূপার দিকে এক জোড়া তীক্ষ্ণ ও সন্দিহান দৃষ্টি মেলে ধরে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সরাসরি প্রশ্ন করে,
—- “এত টাকা কোথায় পেয়েছিস? বাবার কাছ থেকে নিয়েছিস?”
হুট করে বাঁধনের এমন আকস্মিক প্রশ্নে রূপার পুরো শরীরটা কেঁপে ওঠে। সে কী বলবে ভেবে পায় না। পাশ থেকে আকাশ বাঁধনের হাত থেকে ল্যাপটপটা নিজের হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে। রূপার দিকে তাকিয়ে সেও বেশ অবাক হয়ে বলে,
—- “ল্যাপটপ কিনে দিলি মানে? তুই এই ল্যাপটপ কোথায় পেলি রূপা?”
রূপা নিজের কান্না চেপে কাঁপা কাঁপা গলায় আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,
—- “ভাইয়ার ল্যাপটপটা ক্যান্ডি ভেঙে ফেলেছিল, তাই এই ল্যাপটপটা আমি কিনে ফেরত দিয়েছি।”
বাঁধন এবার সোফায় বসে থাকার ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। সে চড়া সুরে ধমক দিয়ে বলে,
—- “বেছি কথা না বাড়িয়ে সোজা সাপ্টা বল, টাকা কোথায় পেয়েছিস?”
রূপা এবার একটু জেদের বশে কাঁপা গলায় বলে,
—- “ভাইয়া, টাকা আমি কোথায় পেলাম সেটা তো বড় কথা নয়। আপনার ল্যাপটপ ভেঙে গিয়েছিল, সেই হিসেবে আমি সেটা নতুন কিনে ফেরত দিয়েছি। টাকা আমি কোথা থেকে জোগাড় করলাম, তা না জানলেও চলবে আপনার”
রূপার এমন মুখে মুখে উত্তর শুনে সহসা সোফা ছেড়ে রূঢ় ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায় বাঁধন। সে ক্ষিপ্ত হয়ে রূপার একটা হাত ধরে সজোরে এক ঝটকায় তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে। পিঠে শক্ত দেয়ালের আঘাত লাগায় ব্যথায় ককিয়ে ওঠে রূপা। বাঁধন এক হাতে রূপার থুতনি আর দুই গাল শক্ত করে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে প্রচণ্ড রাগে হিসহিসিয়ে ওঠে,
—- “আই অ্যাম আস্কিং ইউ ফর দ্য লাস্ট টাইম। আমি তোকে শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করছি, টাকা কোথায় পেয়েছিস? বাবার কাছ থেকে নিয়েছিস?”
গাল দুটো শক্ত করে চেপে ধরায় রূপার যেন দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়। খুব কাছ থেকে বাঁধনের শরীরের তীব্র পুরুষালি সুবাস আর রাগে মেশানো গরম নিশ্বাস রূপার নাকে এসে লাগে। সেই চেনা ঘ্রাণে কেমন জানি তার শরীরটা অবশ হয়ে আসতে থাকে। সে কোনো রকমে নিজের ঠোঁট দুটো ফাঁক করে ক্ষীণ স্বরে বলে,
—- “ছাড়ুন,,প্লিজ ছাড়ুন আমাকে।”
বাঁধন নিজের মুখটা রূপার মুখের আরও কাছে নিয়ে এসে চোখ রাঙিয়ে চরম ধমকের সুরে বলে,
—- “কথা কি তোর কানে যায় না আমি কী বলছি? জাস্ট শাট আপ অ্যান্ড আনসার মি। উত্তর দিবি, নাকি একটা থাপ্পড় দিয়ে গালের চামড়া ছিঁড়ে ফেলব?”
ব্যথায় ডুকরে কেঁদে দেয় রূপা। রূপাকে ওভাবে কাঁদতে দেখে আকাশ বিছানা থেকে চট করে উঠে আসে। সে বাঁধনের কাঁধে হাত দিয়ে টেনে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে শান্ত গলায় বলে,
—- “বাঁধন, ছাড় ওকে। শান্ত হ, আমি দেখছি পুরো ব্যাপারটা।”
আকাশ বাঁধনকে শান্ত করার চেষ্টা করেই দরজার দিকে তাকায়। দরজার কোনায় দাঁড়িয়ে ভয়ে তখন থরথর করে কাঁপছিল বৃষ্টি। আকাশ বৃষ্টির ওই ভয়ার্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর ও আদেশের সুরে বলে,
—- “বৃষ্টি, রুমে আসো।”
কাঁপা কাঁপা পায়ে ঘরের ভেতরে আসে বৃষ্টি। সে কোনোমতে আকাশের সামনে এসে একদম জড়োসড়ো হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়ায়। আকাশ তার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বেশ শান্ত কিন্তু চরম গম্ভীর গলায় বলে,
—- “দেখো, এখন তোমাকে যা যা প্রশ্ন করব, একদম যা সত্যি সেটাই বলবে। কোনো রকম লুকোছাপা বা মিথ্যা কিন্তু একদম বলবে না, ক্লিয়ার?”
বৃষ্টি ভয়ে ভয়ে শুধু একটা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ায়। আকাশ এবার সরাসরি কাজের কথায় এসে জিজ্ঞেস করে,
—- “রূপা এই ল্যাপটপ কেনার এত টাকা কোথায় পেল? চাচার কাছ থেকে নিয়েছে?”
আকাশের এই তীক্ষ্ণ প্রশ্নে বৃষ্টি ভেতর থেকে একদম কেঁপে ওঠে। সে এবার কাঁপতে কাঁপতে মাথা তুলে রূপার দিকে তাকায়। রূপা তখনো দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে চোখ ইশারায় বৃষ্টিকে কিছু বলতে নিষেধ করে। রূপার সেই আকুল চাউনি দেখে বৃষ্টি আবার চট করে মাথা নিচু করে ফেলে। নিজের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে কোনোমতে বানিয়ে বলে,
—- “স্যার সত্যি বলতে আমিও ঠিক জানি না।”
আকালের চোখ এড়ায় না বৃষ্টির এই ইতস্তত ভাব। সে এবার আরেকটু কড়া সুরে ধমক দিয়ে বলে,
—- “বৃষ্টি। আমি কিন্তু আগেই বলেছি মিথ্যা বলবে না। সত্যিটা বলো।”
বৃষ্টি এবার পুরোপুরি নিশ্চুপ হয়ে যায়, সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু মুখ ফুটে আর কিছু বলে না। ওদিকে বাঁধনের ধৈর্যের বাঁধ তখন পুরোপুরি ভেঙে গেছে। সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে রূপার একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরে। তারপর তাকে টানতে টানতে ঘর থেকে বের করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নিয়ে আসতে থাকে। রূপা ব্যথায় আর ভয়ে অনবরত কান্না করলেও বাঁধনের সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। নিচে হলরুমে নিয়ে এসে বাঁধন রূপার হাতটা এক ঝটকায় ছেড়ে দিয়ে মেঝেতে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। শক্ত মেঝেতে পড়ে গিয়ে রূপা ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে। বাঁধন তখন রাগে অন্ধ হয়ে হলরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাজি রহমানের উদ্দেশ্যে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে থাকে,
—- “দাদু। দাদু। দাদু।”
বাঁধনের এমন বজ্রকণ্ঠের চিৎকারে পুরো বাড়ি মুহূর্তে সজাগ হয়ে ওঠে। দোতলা আর নিচতলার ঘরের দরজাগুলো এক এক করে খুলে যায়। হাজি রহমান, আহসান রহমান, আতিক রহমান, রজনী রহমান, শিল্পী রহমান এবং শান্তা সকলেই চরম আতঙ্ক আর বিস্ময় নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে নিজেদের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। হলরুমের মাঝখানে রূপাকে ওভাবে মেঝেতে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখে রজনী রহমানের কলিজা যেন কেঁপে ওঠে। তিনি আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে দৌড়ে গিয়ে রূপার পাশে মেঝেতে বসে পড়েন এবং তাকে জড়িয়ে ধরেন। ওদিকে হাজি রহমান রূপার এই অবস্থা এবং বাঁধনের চোখে-মুখে এমন চণ্ডাল রাগ দেখে বেশ চিন্তিত হন। তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে এগিয়ে এসে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলেন,
—- “কী হয়েছে বাঁধন? এত রাতে বাড়ি মাথায় তুলে এভাবে চিৎকার করে ডাকছিস কেন?”
বাঁধন নিজের ভেতরের রাগটা কোনোমতে চেপে ধরে দাদুর দিকে তাকিয়ে সোজা আহসান রহমানের দিকে আঙুল তাক করে বলে,
—- “দাদু। তুমি আগে তোমার আদরের বড় ছেলেকে জিজ্ঞেস করো সে রূপাকে লাখ টাকার ওপরে কোনো অ্যামাউন্ট দিয়েছে কি না?”
আহসান রহমান ছেলের কথা শুনে চরম অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকান। তিনি পরিস্থিতি আঁচ করতে না পেরে সাথে সাথেই মাথা নেড়ে স্পষ্ট গলায় বলেন,
—- “না তো। আমি রূপাকে ইদানীং এত বড় অঙ্কের কোনো টাকাপয়সাই দিইনি।”
বাবার মুখ থেকে ‘না’ শব্দটা শোনামাত্রই বাঁধনের শরীরের ভেতরের রাগ যেন দাউদাউ করে আরও দপ করে জ্বলে ওঠে। আহসান রহমান টাকা দেননি, তার মানে একটা সাধারণ কলেজপড়ুয়া মেয়ে হয়ে হুট করে এতগুলো টাকা সে কোথায় পেল? কোনো অসৎ উপায়ে জোগাড় করেনি তো? এই চিন্তায় বাঁধন আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না। সে পুরো হলরুম কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল,
—- “তাহলে তোমাদের এই আদরের নাতনি আর সোনার মেয়েকে জিজ্ঞেস করো সে আমার ভেঙে যাওয়া ল্যাপটপের বদলে ঠিক একইমডেলের নতুন ল্যাপটপ কেনার এতগুলো টাকা কোথায় পেল?”
সবাই বাঁধনের এই আকস্মিক কথার কোনো আগামাথা বুঝতে পারে না। পুরো হলরুমের সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে থাকে যে আসলে কী নিয়ে কথা হচ্ছে। হাজি রহমানও ভীষণ বিভ্রান্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে লাঠিটা মেঝেতে একটু ঠুকে বলেন,
—- “কী বলছিস এসব হিজিবিজি? ল্যাপটপ ফেরত দিয়েছে মানে? একটু খোলসা করে বল তো।”
বাঁধন নিজের ভেতরের চরম ক্ষোভ আর অবিশ্বাস উগড়ে দিয়ে দাদুর দিকে তাকিয়ে বলে,
—- “দাদু, কিছুদিন আগে ওর ওই পোষা খরগোশটা আমার ল্যাপটপটা ওপর থেকে ফেলে ভেঙে ফেলেছিল। আর আজ এই মাঝরাতে সে ঠিক একই মডেলের ওই ল্যাপটপটা আমাকে নতুন কিনে এনে ফেরত দিল। ওই ল্যাপটপের অফিশিয়াল প্রাইস ছিল এক লাখ ষাট বা আশি হাজার টাকা। আর ল্যাপটপটা ভেঙেছিল মাত্র ছয় দিন আগে। এখন আমার প্রশ্ন হলো এই মাত্র ছয়টা দিনের মধ্যে সে কোনো রকম চাকরি-বাকরি না করে, কোনো ইনকাম ছাড়া অতগুলো টাকা কোথায় পেল যে আমাকে এত দামী ল্যাপটপ কিনে দিল?”
বাঁধনের কথা শুনে হলরুমে উপস্থিত সবার চোখ যেন কপালে উঠল। এক লাখ ষাট-আশি হাজার টাকার ল্যাপটপ এই ছয় দিনে রূপা একা একা কিনে ফেলেছে, এটা যেন কেউ বিশ্বাসই করতে পারছে না। আহসান রহমান দ্রুত এগিয়ে এসে রূপার সামনে দাঁড়ান। তিনি চরম বিস্ময় নিয়ে রূপার দিকে তাকিয়ে বলেন,
—- “এসব কী শুনছি রূপা? বাঁধন যা বলছে তা কি সত্যি? তুমি কি সত্যিই ওর ল্যাপটপ নতুন কিনে দিয়েছ?”
রূপা তীব্র ভয়ে কোনো উত্তর দিতে পারে না, সে শুধু রজনী রহমানের বুকে মুখ লুকিয়ে মাথা নিচু করে অনবরত কাঁদতে থাকে। ততক্ষণে আকাশ আর বৃষ্টিও সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এসেছে। বৃষ্টি ড্রয়িংরুমের এক কোনায় সিঁটিয়ে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ভয়ে তার পুরো শরীর যেন বরফ হয়ে আসছে। তার মনে হতে লাগল মানুষ ঠিকই বলে, বেশি হাসতে নেই, বেশি হাসলেই কপালে চরম দুঃখ নেমে আসে। রূপার এই অবস্থা দেখে তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে, কিন্তু বড়দের এই গম্ভীর পরিবেশের মাঝে মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস তার বিন্দুমাত্র নেই। ওদিকে আকাশ নিজের হাতে করে সেই ল্যাপটপের বাক্সটা নিচে নিয়ে এসেছে। সে আহসান রহমানের সামনে ল্যাপটপটা ধরে বেশ চিন্তিত গলায় বলে,
—- “হ্যাঁ চাচা, বাঁধন যা বলেছে সব সত্যি। আমার সামনেই রূপা এই ল্যাপটপটা বাঁধনকে দিয়ে আসলো। কিন্তু আমি একটা জিনিস কিছুতেই বুঝতে পারছি না রূপা এতগুলো টাকা হুট করে কোথায় পেল? আমরা এত জিজ্ঞেস করছি, অথচ সে সত্যিটাও বলছে না।”
আহসান রহমান আকাশের হাত থেকে ল্যাপটপের বাক্সটা নিজের হাতে নিলেন। ল্যাপটপের ব্র্যান্ড আর মডেলের সব খুঁটিনাটি দেখে তিনিও চরম অবাক হয়ে গেলেন। এত দামি একটা ল্যাপটপ রূপা কীভাবে কিনল, তা ভেবে তাঁর মাথাও কাজ করছে না। রজনী রহমান এবার মেয়ের ওপর ভীষণ রেগে গেলেন। তিনি রূপাকে নিজের বুক থেকে সরিয়ে তার দুই গাল শক্ত করে ধরে তীব্র শাসনের সুরে বলেন,
—- “রূপা। সত্যি করে বল এই টাকা তুই কোথায় পেয়েছিস? কার কাছ থেকে এনেছিস এত টাকা?”
রূপা পুরোপুরি নির্বাক। সে ফুঁপিয়ে কাঁদছে কিন্তু কোনো কথা বলার সাহস পাচ্ছে না। রূপার এই রহস্যময় নীরবতা দেখে এবার শান্ত স্বভাবের আহসান রহমানও বেশ রেগে গেলেন রূপার ওপর। তিনি একটু চড়া আর রাগী সুরেই রূপার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলেন,
—- “রূপা। তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করছি, উত্তর দাও। এতগুলো টাকা তুমি কোথায় পেলে?”
রূপা আরও জোরে ডুকরে কেঁদে ওঠে, কিন্তু তীব্র ভয়ে সে কিছুতেই মুখ ফুটে উত্তর দিতে পারে না। রূপার এই অনড় নীরবতা দেখে এবার বাঁধন নিজের ভেতরের রাগ আর কোনোভাবেই সামলাতে পারল না। সে ক্ষিপ্ত হয়ে হলরুমে থাকা বড় কাঁচের সেন্টার টেবিলটাতে সজোরে একটা লাথি বসায়। মড়মড় করে এক সেকেন্ডে পুরো টেবিলটা ভেঙে চুরমার হয়ে গুঁড়ো গুঁড়ো কাঁচ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কাঁচের ধারালো টুকরো থেকে নিজেদের বাঁচাতে সবাই এক ঝটকায় যে যার মতো দূরে সরে যান। বাঁধন দুই হাত মুঠো করে পুরো হলরুম কাঁপিয়ে গলা ফাটানো চিৎকার করে বলে,
—- “উত্তর দেবে কীভাবে। নিশ্চয়ই ও কোনো খারাপ কিছু করেছে। কোনো নোংরা উপায়ে টাকা জোগাড় করেছে, নাহলে এভাবে ভীতুর মতো চুপ থাকত না ও।”
‘খারাপ কিছু করেছে’ কথাটা কানে যেতেই রূপার মনে হলো তপ্ত কোনো শলাকা সরাসরি তার চরিত্রে এসে বিঁধল। একটা মেয়ের জন্য এর চেয়ে বড় অপমান আর কী হতে পারে। তীব্র অপমানে আর যন্ত্রণায় সে নিজের দুই কান হাত দিয়ে চেপে ধরে আর্তনাদ করে চিৎকার করে ওঠে। রূপার এই চরম মানসিক অবস্থা দেখে এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা বৃষ্টি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে হু হু করে কেঁদে উঠে একনাগাড়ে বলে দেয়,
—- “আমি আমি দিয়েছি টাকাটা।”
বৃষ্টির এই আকস্মিক স্বীকারোক্তিতে হলরুমের সবাই চরম অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়। রূপাও নিজের কান্না থামিয়ে এক আকাশ বিস্ময় নিয়ে বৃষ্টির চোখের দিকে তাকায়। আকাশ দুই চোখ ছোট করে, তীব্রভাবে ভ্রু কুঁচকে বৃষ্টির দিকে এগিয়ে এসে বলে,
—- “তুমি টাকা দিয়েছ মানে? তুমি না একটু আগে বাঁধনের রুমে দাঁড়িয়ে বললে তুমি কিচ্ছু জানো না। আর এখন বলছ তুমি দিয়েছ? হোয়াট ইজ দিস।”
বৃষ্টি মাথাটা একদম নিচু রেখে কাঁপাকাঁপা গলায় বলে,
—- “ত-তখন মিথ্যা বলেছিলাম, স্যার।”
কথাটা শোনামাত্রই আকাশের মাথার রগ দপ করে জ্বলে ওঠে। নিজের সামনে দাঁড়িয়ে একটা মেয়ে এভাবে মিথ্যা কথা বলে পার পেয়ে গেছে, এটা সে ভাবতেই পারছে না। সে রাগের মাথায় সজোরে একটা থাপ্পড় বসাতে যায় বৃষ্টির ফর্সা গালে, কিন্তু ঠিক শেষ মুহূর্তে পাশ থেকে বাঁধন এক ঝটকায় এসে আকাশের শক্ত হাতটা মাঝপথেই ধরে ফেলে। আকাশের হাতটা বাতাসে আটকে থাকে। চোখের আগুন কমেনি। সে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে প্রচণ্ড রাগী সুরে হিসহিসিয়ে ওঠে,
—- “হাউ ডেয়ার ইউ, বৃষ্টি। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে, আমার সামনে দাঁড়িয়ে এভাবে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলার সাহস কী করে হয় তোমার?”
বৃষ্টি ভয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে কাঁদোকাঁদো গলায় শুধু বলে,
—- “আই অ্যাম রিয়ালি সরি, স্যার।”
আহসান রহমান এবার পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করার জন্য আকাশের সামনে থেকে এগিয়ে আসেন বৃষ্টির দিকে। তিনি বেশ নরম কিন্তু গম্ভীর গলায় বৃষ্টিকে বলেন,
—- “বৃষ্টি, তুমি এখন যা বলছ তা কি সত্যিই সত্যি?”
বৃষ্টি চোখের জল মুছে আহসান রহমানের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলে,
—- “হ্যাঁ আঙ্কেল, একদম সত্যি।”
পাশ থেকে আকাশ বাঁধনের হাত থেকে নিজের হাতটা ছুটিয়ে নিয়ে আবার গর্জে ওঠে,
—- “কিভাবে বিশ্বাস করবো? একটু আগে ঘরে দাঁড়িয়ে অবলীলায় মিথ্যা বললে। এখন যে আবার নতুন কোনো নাটক বা মিথ্যা বলছো না, তার প্রমাণ কী?”
বৃষ্টি এবার সরাসরি আহসান রহমানের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে বলে,
—- “আপনাদের যদি আমার কথা বিশ্বাস না হয় আঙ্কেল, তাহলে আপনি এখনই আমার বাবার নাম্বারে একটা কল দিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারেন। কারণ কালই আমি বাবার কাছ থেকে একটা দামী ডিজাইনার ড্রেস কেনার কথা বলে টাকা নিয়েছি এবং আজ সকালে সেটা রূপার হাতে দিয়েছি।”
আহসান রহমান আর কোনো কথা বাড়ান না। তিনি অত্যন্ত গম্ভীর মুখে নিজের ফোনটা বের করে সরাসরি বৃষ্টির বাবা হায়দার শেখের নাম্বারে কল দেন। অপরপাশ থেকে হায়দার শেখ ফোন রিসিভ করতেই আহসান রহমান পুরো বিষয়টা নিয়ে কথা বলেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর তিনি নিশ্চিত হন এবং জানতে পারেন যে হ্যাঁ, সত্যি সত্যিই বৃষ্টি কাল তার বাবার কাছ থেকে লাখ টাকার ওপরে নিয়েছে। আহসান রহমান কথা শেষ করে ফোনটা পকেটে রাখেন। তারপর রূপার দিকে তাকিয়ে বেশ নরম ও শান্ত সুরে বলেন,
—- “এই সামান্য কথাটা মুখ ফুটে বলতে তোমার এত ভয় পাওয়ার কী ছিল মা? শুধু শুধু এতক্ষণ আমাদের সবার কাছে বকা খেলে, বাড়িটাতে একটা অশান্তি হলো।”
রূপা এই কথার কোনো উত্তর দেয় না, সে আগের মতোই মাথা নিচু করে বসে থাকে। সত্যটা সামনে আসতেই মুহূর্তে পুরো ড্রয়িংরুমে যেন একটা স্বস্তির বাতাস নেমে আসে। বাঁধন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের হাত থেকে ল্যাপটপের বাক্সটা টেনে নেয়। সে আর কোনো কথা না বলে ধীর পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায় নিজের রুমে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সিঁড়ির মাত্র চার ধাপ উঠতেই পেছন থেকে রূপার কণ্ঠস্বরে তার পা দুটো যেন মায়াবলে সেখানেই থমকে যায়। রূপা নিজের চোখের পানিটুকু আলতো করে মুছে একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আহসান রহমানের উদ্দেশ্যে বলে,
—- “বাবা, আমার কিছু কথা বলার ছিল।”
আহসান রহমান রূপার দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হয়ে বলেন,
—- “বলো?”
রূপা নিজের কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব শক্ত রেখে বলে,
—- “আমার বাড়িতে পড়াশোনা ভালো যাচ্ছে না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখন থেকে আমি হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করব। কারণ বাড়িতে থাকলে পড়াশোনায় ভীষণ আলসেমি চলে আসে, হোস্টেলে থাকলে সেই আলসেমিটা আর হবে না। আরও মন দিয়ে পড়তে পারব। আশা করি আমার এই সিদ্ধান্তে তোমার কোনো আপত্তি থাকবে না বাবা।”
কথাটা শোনামাত্রই বুকের বাঁ পাশটা ধক করে কেঁপে ওঠে বাঁধনের। মুহূর্তে তার মাথায় বিদ্যুৎ খেলে যায় একটু আগে নিজের রুমে ল্যাপটপ দেওয়ার সময় রূপা বলেছিল সে সবাইকে মুক্তি দিয়ে কালই চলে যাবে। তার মানে ও চিরতরে হোস্টেলে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। রূপার এমন আকস্মিক কথা শুনে রজনী রহমান চরম আপত্তি জানিয়ে বলেন,
—- “হোস্টেলে থাকবি মানে? তোর কি নিজের বাড়িঘর নেই যে তোকে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করতে হবে? এসব কী অদ্ভুত সিদ্ধান্ত।”
রূপা রজনী রহমানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকায়। বাঁধনের বলা সেই কথাগুলো তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে এই মহিলাটা আসলে তার জন্মদাত্রী মা নয়। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে কত নিখুঁত অভিনয়ই না করে আসছে সে তার সাথে। জানে না রূপা, এই অদ্ভুত আর দীর্ঘ অভিনয়ের আসল কারণটা কী। সে একটা গোপন দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ভেতরের কষ্টটা আড়াল করে যথাসম্ভব স্বাভাবিক গলায় বলে,
—- “হোস্টেলে শুধু তারাই থাকে না যাদের বাড়ি নেই। হোস্টেলে মূলত প্রাইভেসি থেকে দূরে গিয়ে একান্ত মনে পড়াশোনা করতে চাই। আর আমিও এখন একান্তভাবে নিজের ক্যারিয়ার আর পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে চাই।”
রজনী রহমান মুখ খোলেন আবার কিছু একটা বলে বাধা দেওয়ার জন্য, কিন্তু আহসান রহমান হাত তুলে তাকে থামিয়ে দেন। তিনি রূপার চোখের দিকে তাকিয়ে বেশ গভীর সুরে জিজ্ঞেস করেন,
—- “তোমার কি সত্যিই মনে হয় মা, তুমি হোস্টেলে গিয়ে নিজের যত্ন নিয়ে আরও ভালো করে পড়াশোনা করতে পারবে?”
রূপা দৃঢ়তার সাথে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ে। আহসান রহমান মেয়ের চোখের সেই সিদ্ধান্ত দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
—- “ওকে, তবে তাই হোক। তোমার যদি হোস্টেলে গিয়ে পড়াশোনা আরও ভালো চলে, তাহলে এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমি তোমার পাশে আছি।”
রজনী রহমান পাশ থেকে অসন্তোষ নিয়ে বলেন,
—- “কিন্তু”
আহসান রহমান এবার রজনী রহমানকে কড়া গলায় থামিয়ে দিয়ে বলেন,
—- “ও কোনো খারাপ কাজে যাচ্ছে না, পড়ার জন্যই যাচ্ছে। আর সন্তানের পড়াশোনার ভালোমন্দের মাঝে আমি কোনো বাধা সৃষ্টি করতে চাই না।”
আহসানের অনুমতি পেয়ে রূপা সবাইকে জানিয়ে দেয় যে সে কাল সকালেই চলে যাবে হোস্টেলে। তাই আজ রাতেই সে নিজের প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখবে। সব কথা শেষ করে রূপা আর বৃষ্টি ধীর পায়ে নিজেদের রুমের উদ্দেশ্যে চলে যায়। ড্রয়িংরুমের বাকি সবাইও এক এক করে যার যার রুমে ফিরে যায়। পুরো বাড়ির আলো ধীরে ধীরে নিভে আসে এবং চারপাশটা আবার আগের মতোই নিঝুম ও শান্ত হয়ে যায়। রুমে এসে রূপা সরাসরি বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে,
—- “তার মানে টাকাগুলো আমাকে আন্সার শেখ আঙ্কেল দেননি, তুই দিয়েছিস?”
বৃষ্টি মাথা নিচু করে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ায় আর বলে,
—- “ক্ষমা করে দে বেস্টি। আসলে আমি চাইছিলাম তুই তোর কথা রাখ, এক সপ্তাহের মধ্যে তুই যেন ল্যাপটপটা ফেরত দিতে পারিস। তাই বাবার কাছ থেকে ড্রেস কেনার কথা বলে টাকা নিয়ে নাদিরাকে দিয়েছি এবং ওকে সব বুঝিয়ে বলেছি, যাতে ও আঙ্কেলের কাছে টাকাটা দিয়ে আসে আর আঙ্কেল যেন টাকাগুলো তাঁর তরফ থেকে তোকে দেন। তোর যেন কোনো সন্দেহ না হয়, এই জন্যই এই প্ল্যানটা করা। প্লিজ বেস্টি, তুই আমাকে ভুল বুঝিস না। আমি জানি তুই নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে এটা ফেরত দিতে চেয়েছিলি, কিন্তু আমিও তো তোর বেস্টি। তোর মনের ভেতরের অবস্থা আমি যদি না বুঝি, তাহলে কি অন্য কেউ বুঝবে? বেস্টি হয়ে কি তোকে একটু সাহায্য করার অধিকারও আমার নেই?”
বৃষ্টির একনাগাড়ে এতগুলো কথা শুনে রূপা হাসবে নাকি কাঁদবে, তা যেন বুঝতেই পারে না। সে আলতো হেসে বৃষ্টিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,
—- “একটু শ্বাস নে আগে। এভাবে একনাগাড়ে বললে তো দম আটকে মারাই যাবি। আমি কি কিছু বলেছি তোকে, যে এভাবে বলতে হবে। যাই হোক, আমি কিচ্ছু মনে করিনি। তবে আমি তোর এই টাকাটা ফেরত দিয়ে দেব, আর এতে তুই যদি না করিস, তাহলে আমি কিন্তু ভীষণ রাগ করব।”
বৃষ্টিও রূপাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,
—- “তোর ইচ্ছে। যদি দিতে চাস দিবি, আর না দিতে চাইলে দিবি না। এটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।”
রূপা একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
— “সত্যি রে, আজকাল তোর মতো একটা বেস্ট ফ্রেন্ড পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। বেস্টি, কখনো আমাকে ছেড়ে যাস না, সারাজীবন এভাবেই আমার পাশে থাকিস।”
বৃষ্টি রূপার চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বেশ আবেগ জড়ানো সুরে বলে,
—- “যতক্ষণ দেহে নিঃশ্বাস আছে, ঠিক ততক্ষণ এভাবেই তোর পাশে থাকব। আর ছেড়ে যাওয়ার কথা তো ভুলেও ভাববি না। বিয়ের পর তোর শ্বশুরবাড়ি গিয়েও তোর সাথে উঠব, প্রয়োজন পড়লে তোর দেবরকে বিয়ে করে নেব, তবুও তোকে ছাড়ব না, বুঝেছিস?”
রূপা এবার হেসেই ফেলে এবং গভীর ভালোবাসায় বলে,
—- “হুম, আই লাভ ইউ বৃষ্টি।”
বৃষ্টিও রূপার কপালে চুমু খেয়ে চট করে বলে ওঠে,
—- “আই লাভ ইউ সো মাচ বেস্টি।”
১১/৫/২০২৬
বৃহস্পতিবার সকাল ৮:০০ টা।
রূপা নিজের প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে বাড়ির সবার সাথে কথা বলে। ক্যান্ডিকে নিজের কোলের কাছে জড়িয়ে ধরে বাড়ি থেকে পা বাড়ায়। তার সাথে বের হয় বৃষ্টিও। সেও তার বাবা না আসা পর্যন্ত রূপার সাথে হোস্টেলেই থাকবে। বেস্ট ফ্রেন্ড তো এই কঠিন সময়ে বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথেই থাকবে, এটাই স্বাভাবিক তাই বৃষ্টির হোস্টেলে যাওয়ার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বাড়ির আর কেউ কোনো আপত্তি তোলে না। রূপার পরনে আজ একটা মিশমিশে কালো রঙের জর্জেট থ্রি-পিস। খুব সকালে গোসল করে নেওয়ায় তার ভেতরের চুলগুলো পিঠের ওপর খোলাই রাখা, যা কালো পোশাকের ওপর এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা তৈরি করছে। বৃষ্টি আর রূপা দুজনে ধীরপায়ে বাড়ির বাইরে এসে দেখে, বাড়ির সবাই গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ গম্ভীর মুখে ড্রাইভিং সিটে বসে স্টিয়ারিং ধরে আছে, সে দুজনকে হোস্টেলে দিয়ে আসবে। বৃষ্টি সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পেছনের সিটে উঠতে গেলে আকাশ আচমকা স্টিয়ারিংটা শক্ত করে চেপে ধরে বেশ কড়া গলায় বলে ওঠে,
—- “আমি কারো গাড়ির ড্রাইভার না, সামনে বসতে পারলে বসো, নাহলে গাড়িতে ওঠার দরকার নেই।”
আকাশের এই আকস্মিক রুক্ষ কথা শুনে বৃষ্টি থমকে যায়। সে আর গাড়িতে পা না বাড়িয়ে অপরাধীর মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পরিস্থিতি সামলাতে শিল্পী রহমান দ্রুত এগিয়ে এসে বৃষ্টিকে সান্ত্বনার সুরে বলেন,
—- “তুমি সামনে বসো মা।”
শিল্পী রহমানের কথা শুনে বৃষ্টির বুকের ভেতরটা হুট করে ধক করে উঠলেও সে নিজেকে সামলে নেয়। আলতো করে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়িয়ে সে ধীরহাতে সামনের ডোরটা খোলে, বেশ জড়সড় হয়ে আকাশের পাশের সিটে বসে পড়ে। রূপা সবার সাথে শেষবারের মতো কথা বলে গাড়ির পেছনের দরজার সামনে আসতেই, হুট করে তার চোখ চলে যায় দোতলার ব্যালকনিটার দিকে। মুহূর্তে তার বুকের ভেতরটা তীব্রভাবে ধুকপুক করে ওঠে। বাঁধনের রুমের ব্যালকনিতে দুই হাত পকেটে গুঁজে পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাঁধন।
পরনে তার কাল রাতের সাদা টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার, চুলগুলো কিছুটা এলোমেলো হয়ে কপালে লেপ্টে আছে। বাঁধনের তীক্ষ্ণ আর অশান্ত চাউনি নিচে দাঁড়িয়ে থাকা রূপার ওপর এসে থমকে গেছে। রূপা আর এক সেকেন্ডও সেই চাউনি সহ্য করতে পারে না, সে চট করে চোখ নামিয়ে নেয়, চুপচাপ গাড়ির দরজা খুলে পেছনের সিটে উঠে বসে। গেটের দারোয়ান তাড়াতাড়ি এসে লাগেজগুলো গাড়ির পেছনের ডিকিতে তুলে দেয়। আকাশ কোনো কথা না বাড়িয়ে গাড়ি স্টার্ট করে, গাড়িটা বাড়ির মেইন মেটাল গেট দিয়ে ধীর গতিতে বের হয়ে যায়। দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁধনের দৃষ্টি কিন্তু সরেনি। সে একদৃষ্টিতে গাড়ির পেছনের কাঁচটার দিকেই তাকিয়ে থাকে, গাড়িটা তার চোখের সীমানা থেকে পুরোপুরি মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত। দেখতে দেখতে গাড়িটা মূল রাস্তায় উঠে চোখের পলকে দ্রুত দূরে চলে যায়। গাড়িটা দৃষ্টির আড়াল হতেই বাঁধনের বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত শূন্যতায় কেঁপে ওঠে। বাম পাশটায় কেমন যেন একটা হালকা, তীব্র ব্যথার মোচড় অনুভব করে সে। বাঁধন একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে, শূন্য হয়ে যাওয়া রাস্তার দিকে তাকিয়ে ওভাবেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
কেটে যায় পুরো পাঁচটা দিন।
১৬/৫/২০২৬, মঙ্গলবার।
বাঁধনের চেনা জীবনটা সেদিনের পর থেকে যেন পুরোপুরি ওলটপালট হয়ে গেছে। এক অদ্ভুত, দমবন্ধ করা শূন্যতা তাকে চারপাশ থেকে গ্রাস করে ধরেছে। এই দীর্ঘ পাঁচটা দিনে রূপাকে একটা নজর দেখেনি সে। বুকের ভেতরটা প্রতিটা মুহূর্তে পাগলের মতো ছটফট করছে মেয়েটাকে শুধু একটিবার চোখের সামনে দেখার জন্য, তার একটুখানি কণ্ঠস্বর শোনার জন্য। সে কোনো অফিশিয়াল কাজে মন বসাতে পারছে না, চারপাশের সবকিছু ভীষণ বিরক্তিকর লাগে। সে কিছুতেই নিজের মনকে বুঝিয়ে উঠতে পারছি না এরকম অদ্ভুত অনুভূতির আসল মানে কী, কেন ওই সাধারণ মেয়েটা তাকে এতটা তীব্রভাবে নিজের দিকে টানছে। অন্যদিকে রূপার আসল পরিচয়টাই বের করতে পারছে না সে, কোনো একটা ক্লু খুঁজে পাচ্ছে না যা দিয়ে আসল সত্যটা উদ্ঘাটন করবে, রজনী রহমানের মুখোশ টেনে ছিঁড়ে তার ওপর অ্যাটাক নেবে। সব মিলিয়ে বাঁধন মানসিকভাবে একদম বিপর্যস্ত, পাগলপ্রায় অবস্থা।
রাত নয়টার দিকে বাঁধন বাইকটা নিয়ে জনশূন্য রাতের রাস্তায় একাকী দাঁড়িয়ে থাকে। মনমেজাজ একটুও ভালো লাগছিল না বলে সে আজ ডিউটিতে পর্যন্ত যায়নি। ভেতরে কেমন যেন একটা তীব্র ছটফটানি কাজ করছে, মনে হচ্ছে এখনই বাইক ছুটিয়ে রূপার কাছে চলে যেতে। রাস্তার ধারে বাইকটার সাথে হেলান দিয়ে, দুই হাত বুকের ওপর শক্ত করে ভাঁজ করে রাতের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে বাঁধন। শরীরে জড়িয়ে রাখা সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট, রাতের ঠান্ডা বাতাসে তার কপালে এসে পড়া চুলগুলো কিছুটা এলোমেলো ভাবে উড়ছে। হুট করে পকেটে থাকা ফোনটা তীব্র শব্দে বেজে ওঠে। সে চট করে পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে তাকায়, অখিলের নাম্বার থেকে কল এসেছে। বাঁধন কোনো দেরি না করে দ্রুত কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে অখিলের হাঁপাতে হাঁপাতে বলা রক্তাক্ত কণ্ঠস্বর ভেসে আসে,
—- “বাঁধন। কোথায় তুই? জলদি সেদিনের ওই জঙ্গলটায় আয়। বেশি কিছু বলতে পারছি না রে, আমার পায়ে গুলি লেগেছে, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছি না, যে কোনো সেকেন্ডে জ্ঞান হারিয়ে…”
পুরো কথাটুকু শেষ হওয়ার আগেই ওপাশের লাইনটা হুট করে কেটে যায়। বাঁধন চরম উৎকণ্ঠায় চিৎকার করে বলে ওঠে,
—- “হ্যালো অখিল। শুনতে পাচ্ছিস? ওহ শিট, হ্যালো।”
স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে কলটা সত্যিই কেটে গেছে। সে পাগলের মতো আঙুল চালিয়ে আবারও অখিলের নাম্বারে ব্যাক কল দেয়, কিন্তু এবার ওপাশ থেকে রোবোটিক গলায় ফোন বন্ধ দেখায়। বাঁধন দাঁতে দাঁত চেপে চরম ক্ষোভে আর আশঙ্কায় নিজের মনেই বলে ওঠে,
—- “ড্যাম ইট। হোয়াট দ্য হেল ইজ গোয়িং অন।”
সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে বাইক স্টার্ট দিয়ে পুরো গতিতে এক্সিলারেটর চেপে ধরে। তীব্র, কালবৈশাখী ঝড়ের গতিতে বাইক নিয়ে সে ছুটে যায় সেদিনের সেই অভিশপ্ত জঙ্গলের দিকে, যেখানে রাতের আঁধার ফুঁড়ে একটা অচেনা মেয়ে এসে তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। বাঁধন সেই জঙ্গলে এসে পৌঁছাতেই কানে আসে ঠাস ঠাস গুলির শব্দ। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা আঁচ করতে পেরে সে আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করে না। সে দ্রুত জঙ্গলের ভেতর ঢুকতে গেলে আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা একজন কনস্টেবল হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বাঁধনের সামনে দাঁড়ায়। সে তড়িঘড়ি করে একটা স্যালুট ঠুকে অত্যন্ত আতঙ্কিত গলায় বলে ওঠে,
—- “স্যার। ভেতরে যাবেন না স্যার। ওখানে কিছু ইন্টারন্যাশনাল স্মাগলার মডার্ন আর্মস নিয়ে আমাদের ওপর অ্যাটাক করেছে। আমাদের বেশ কয়েকজন ফোর্স অলরেডি ইনজিউরড হয়েছে। আমরা হাইওয়েতে রুটিন ডিউটিতে একটা ট্রাক সাসপেক্ট করে চেক করছিলাম স্যার, হুট করেই ওটার ভেতর ড্রাগসের একটা বড় চালান পাওয়া যায়। আমরা অ্যাকশনে যাওয়ার আগেই ওই ট্রাকের ড্রাইভার আর সাথে থাকা আরও কয়েকজন পালিয়ে এই জঙ্গলের ভেতর ঢুকে পড়ে। আমরা পিছু নিলে ওরা আমাদের টার্গেট করে ফায়ার ওপেন করে, সেলф ডিফেন্সে আমরাও পাল্টা গুলি চালাই। স্যার, আমার রিভলবারের অ্যামো শেষ হয়ে যাওয়ায় আমি অনেক কষ্টে ব্যাকআপের জন্য বাইরে বেরিয়ে আসি। স্যার, ওসি অখিল স্যারকেও ইনফর্ম করা হয়েছিল, তিনি খবর পাওয়া মাত্রই সব রিস্ক নিয়ে একাই জঙ্গলের ভেতর পুশ ইন করেছেন।”
অখিল ভেতরে আছে, আর ফোনে সে বলেছিল তার পায়ে গুলি লেগেছে। তার মানে অখিল এই মুহূর্তে ভেতরে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে ছটফট করছে। এই সত্যিটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতেই বাঁধনের ভেতরের এসপি সত্ত্বা যেন খ্যাপা নেকড়ের মতো জেগে ওঠে। সে নিজের সেফটির তোয়াক্কা না করে, কোনো প্রটেকশন ছাড়াই এক ঝটকায় জঙ্গলের গভীর অন্ধকারের দিকে ছুটে চলে যায়। পেছন থেকে কনস্টেবলটি “স্যার। ভেতরে যাবেন না স্যার, ওটা ডেঞ্জার জোন।” বলে বারবার চিৎকার করে ডাকলেও বাঁধন সেই ডাক কানেই নেয় না। জঙ্গলের ভেতরের দৃশ্যটা আরও বিভীষিকাময়। গাছপালার আড়াল থেকে পুলিশ ফোর্সরা অনবরত ফায়ার করছে আর ওপাশ থেকেও বৃষ্টির মতো গুলি ধেয়ে আসছে। বাঁধনকে কভার ছাড়াই ওভাবে এগিয়ে আসতে দেখে একজন সাব-ইন্সপেক্টর পজিশন ছেড়ে দ্রুত তার সামনে এসে স্যালুট দিয়ে ব্যাকুল হয়ে বলে,
—- “স্যার, প্লিজ লিভ দিস প্লেস। আপনার কাছে কোনো ওয়েপন নেই স্যার। ওরা সংখ্যায় অনেক বেশি আর সবার হাতে অটোমেটিক চাইনিজ রাইফেল আর দামি রিভলবার আছে। যে কোনো মুহূর্তে আপনার বডিতে গুলি লেগে যেতে পারে স্যার, প্লিজ আপনি সেফ জোনে চলে যান।”
বাঁধন তার কোনো কথাই শোনে না। তার চোয়াল শক্ত, চোখ দুটো চারপাশের অন্ধকারের মাঝে শুধু অখিলকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। সে সাব-ইন্সপেক্টরকে এক হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে অত্যন্ত কড়া আর গম্ভীর গলায় বলে,
—- “শাট আপ অ্যান্ড জাস্ট হোল্ড ইওর পজিশন। ওয়ান অফ মাই বেস্ট অফিসার্স ইজ ইন গ্রেট ডেঞ্জার ইনসাইড। আই হ্যাভ… আই হ্যাভ টু ফাইন্ড হিম আউট।”
কথাটা বলেই সে আড়াল থেকে আড়ালে গিয়ে অখিলকে খুঁজতে থাকে। খুঁজতে খুঁজতে হুট করেই একটা সশস্ত্র গুন্ডা ঝোপের আড়াল থেকে সোজা বাঁধনের সামনে চলে আসে। বাঁধনকে একা এবং নিরস্ত্র পেয়ে গুন্ডাটা ক্রুর হেসে তার বুক বরাবর রিভলবার তাক করে ট্রিগার চাপতে যায়। ঠিক তখনি, অন্ধকার ফুঁড়ে কোথা থেকে যেন ঝোড়ো হাওয়ার গতিতে একটা ধারালো তীর ছুটে এসে সরাসরি বিঁধে যায় গুন্ডাটার ডান হাতে। মুহূর্তের মধ্যে গুন্ডাটার হাত থেকে রিভলবারটা মাটিতে ছিটকে পড়ে। সে তীব্র ব্যথায় নিজের হাতটা চেপে ধরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কুকড়ে ওঠে। গুন্ডাটার হাতে বিঁধে থাকা সেই পরিচিত তীরটা দেখামাত্রই বাঁধনের চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে যায়। মস্তিষ্কে মুহূর্তের মধ্যে একটা তীব্র বিদ্যুৎ খেলে যায় সেদিন রাতেও ঠিক একইভাবে একটা মেয়ে তীর ছুড়ে তার জীবন বাঁচিয়েছিল। তার মানে সেই রহস্যময়ী মেয়েটা আবার এসেছে। বাঁধন উন্মাদের মতো চারপাশের ঘন অন্ধকারের দিকে তাকায়, গাছের মগডালে আর ঝোপঝাড়ের আড়ালে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু চারপাশটা এতটাই নিচ্ছিদ্র অন্ধকার যে কাউকেই স্পষ্ট দেখা যায় না। অবশেষে কাউকে না পেয়ে সে আর সময় নষ্ট করে না। সে চট করে নিচু হয়ে মাটিতে পড়ে থাকা গুন্ডাটার রিভলবারটা নিজের হাতে তুলে নেয়। তারপর ঠাণ্ডা মাথায় এক চুলও দয়া না দেখিয়ে সরাসরি ওই গুন্ডাটার পায়ে একটা গুলি চালায়। গুন্ডাটা চিৎকার করে উঠতেই বাঁধন নিজের ফোনটা বের করে স্পেশাল ফোর্সকে ডায়াল করে অত্যন্ত রাশভারী আর কমান্ডিং ভয়েসে বলে ওঠে,
—- “লিসেন টু মি কেয়ারফুলি, জঙ্গলের নর্থ সাইডে চলে আসো, কুইক। এখানে একটা ক্রাইম সাসপেক্টের পায়ে আমি গুলি করেছি, কাম অ্যান্ড অ্যারেস্ট হিম ইমিডিয়েটলি।”
বাঁধন পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ঝোপের আড়ালে পজিশন নেয়। চারপাশ থেকে ধেয়ে আসা বুলেটের জবাব দিতে সে-ও লুকিয়ে লুকিয়ে ফায়ার করতে বাধ্য হয়। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে সতর্ক পায়ে হাঁটতে হাঁটতে হুট করে কারও একটা নিথর বডির সাথে তার পা ঠুকে যায়। হোঁচট খেয়ে বাঁধন প্রায় পড়েই যাচ্ছিল, কিন্তু অনেক কষ্টে নিজের শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখে সে। পকেট থেকে ফোনটা বের করে ফ্লাশলাইটটা জ্বালিয়ে নিচে ধরতেই বিস্ময়ে তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যায়। নিচে রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর হয়ে পড়ে আছে অখিল। তার পায়ে গুলির ক্ষত থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে। বাঁধন বুকে এক তীব্র ধাক্কা খেয়ে মুহূর্তের মধ্যে হাঁটু গেড়ে বসে অখিলের মাথাটা নিজের কোলে তুলে নেয়। সে অখিলের গালে আলতো চাপড়ে ব্যাকুল কণ্ঠে বলে ওঠে,
—- “অখিল। এই অখিল, চোখ খোল। ওপেন ইওর আইজ, ম্যান। ওহ গড।”
কিন্তু অখিলের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। বাঁধন এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি ফোনে আবার ফোর্সকে কল দেয়। চারপাশের চেনা জায়গাটা এক নজরে দেখে নিয়ে সে তীব্র গলায় কমান্ড করে,
—- “লিসেন টু মি, জঙ্গলের বাম দিকের একটা শেওড়া গাছ আছে, দ্রুত গাছটার কাছে আসেন। ফাস্ট।”
বাঁধনের লোকেশন ট্র্যাক করে কথা অনুযায়ী দ্রুত দুজন পুলিশ অফিসার সেখানে এসে হাজির হয়। বাঁধন তাদের দিকে তাকিয়ে তড়িঘড়ি করে অখিলকে এই ডেঞ্জার জোন থেকে বের করে ইমিডিয়েটলি হসপিটালে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। অফিসার দুজন স্ট্রেচারের মতো করে দ্রুত অখিলকে তুলে নিয়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে যায়। অখিলকে সেফ জোনে পাঠিয়ে বাঁধনের ভেতরের ক্রোধ যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সে বাঘের মতো নিঃশব্দে পা ফেলে একটা গুন্ডার পেছনে এসে দাঁড়ায়। গুন্ডাটি যখন ফায়ার করতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই বাঁধন চুপচাপ পেছন থেকে তার চিবুকে ঠান্ডা রিভলবারের নলটা ঠেকিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা ও নিষ্ঠুর গলায় বলে ওঠে,
—- “ডোন্ট ইভেন ট্রাই ডোন্ট ইভেন ট্রাই টু মুভ। নড়াচড়া করলে একদম গিল্লু উড়িয়ে দেব।”
ভয়ে গুন্ডাটা হাত তুলে ফেলে। এভাবেই নিজের নিখুঁত রণকৌশল খাটিয়ে বাঁধন একে একে ৮টা গুন্ডাকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। ধীরে ধীরে জঙ্গলের ভেতর গুলির শব্দ কমে আসে, যা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে দু-একজন ছাড়া বাকি প্রায় সব গুন্ডাই ধরা পড়ে গেছে। পরিস্থিতি শান্ত ভেবে বাঁধন কিছুটা এগিয়ে যেতেই হঠাৎ মুখোমুখি দুটো গুন্ডার সামনে পড়ে যায়। আচমকা এসপি-কে সামনে পেয়ে গুন্ডা দুটো সাথে সাথে বাঁধনের বুক বরাবর রিভলবার তাক করে। বাঁধন বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে উল্টো গর্জে উঠে বলে,
—- “ভালো ভালো বলছি সারেন্ডার কর। নাহলে যদি একবার ধরতে পারি, পাছা দিয়ে রক্ত বের করে দেব।”
কিন্তু গুন্ডা দুটো কোনো কথা না শুনে একসাথে বাঁধনকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। বাঁধন চোখের পলকে ডাইভ দিয়ে পাশে সরে যায় এবং আড়াল থেকে ওদের লক্ষ্য করে পাল্টা ফায়ার শুরু করে। এদিকে একটা গুন্ডা সুযোগ বুঝে পুরোপুরি চুপচাপ হয়ে যায়। সে অন্য গুন্ডাটাকে ইশারায় অনবরত ফায়ার করে বাঁধনকে ব্যস্ত রাখার কথা বলে নিজে লুকিয়ে লুকিয়ে উল্টো দিক দিয়ে ঘুরে সোজা বাঁধনের পিঠে এসে দাঁড়ায়। সে বাঁধনকে পেছন থেকে আঘাত করার জন্য আশেপাশে তন্নতন্ন করে কিছু একটা খুঁজতে থাকে এবং মুহূর্তের মধ্যে মাটিতে একটা মোটা লাঠি পেয়েও যায়। গুন্ডাটা লাঠিটা উঁচিয়ে বাঁধনের মাথায় সজোরে আঘাত করতে যাবে, ঠিক তখনই বাঁধন বাতাসের স্পষ্ট শব্দ পেয়ে বিদ্যুৎ গতিতে সামনে ঘুরে যায়। সে কোনো সুযোগ না দিয়ে গুন্ডাটার বুক বরাবর সজোরে একটা লাথি বসিয়ে দেয়। লাথির চোটে এক ছিটকে মাটিতে গিয়ে পড়ে গুন্ডাটা। বাঁধন রাগে অন্ধ হয়ে গুন্ডাটার ওপর চড়ে বসে এবং নিজের শক্ত হাত দিয়ে ইচ্ছেমতো কিল-ঘুষি মারতে মারতে বলতে থাকে,
—- “জেলের আদর খাওয়ার খুব শখ হয়েছে, তাই না? ইউ ওয়ান্ট আ পিস অফ মি? তার আগে একটু আমার আদর খা স্পেশাল আদর।”
বাঁধন যখন গুন্ডাটাকে মারতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই হুট করে পেছন থেকে অন্য গুন্ডাটা এসে একটা ভারী ইট দিয়ে বাঁধনের মাথায় সজোরে আঘাত করে। আকস্মিক এই প্রচণ্ড আঘাতে বাঁধনের মস্তিষ্ক যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। সে তীব্র ব্যথায় আর্তনাদ করে ওঠে,
—- “আহহহহহ শিট।”
মুহূর্তের মধ্যে বাঁধনের মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে। তীব্র যন্ত্রণায় মাথাটা চেপে ধরে বাঁধন মাটির ওপর লুটিয়ে পড়ে। তার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হতে থাকে। গুন্ডা দুটো এই সুযোগে ক্রুর হাসিতে ফেটে পড়ে এবং বাঁধনের বুক বরাবর রিভলবার তাক করে তাকে শেষ করে দেওয়ার জন্য ট্রিগারে আঙুল চালায়। ঠিক তখনই, হুট করে তাদের পেছন থেকে অন্ধকার ফুঁড়ে কেউ একজন এসে দুজনের গলায় ধারালো, লম্বা তলোয়ার ঠেকায়। নিজেদের গলায় যমদূতের মতো ধারালো লম্বা তলোয়ারের স্পর্শ পেতেই গুন্ডা দুটোর পুরো শরীর ভয়ে কাঁপতে শুরু করে। আর তখনই পেছন থেকে এক গম্ভীর অথচ মিষ্টি মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে আসে,
—- “গুলি ফেলেন। নয়তো এক টানে তলোয়ারটা গলায় চালিয়ে দেব।”
মৃত্যুর এত কাছে দাঁড়িয়ে গুন্ডা দুটো আর সাহস পায় না। তারা কাঁপতে কাঁপতে হাত থেকে রিভলবারগুলো মাটিতে ফেলে দেয়। সেই চেনা মেয়েলি কণ্ঠস্বর কানে আসতেই বাঁধন তার প্রায় বোজে আসা, ঝাপসা চোখ দুটো মেলে সামনে তাকায়। মুহূর্তে তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আবেশে কেঁপে ওঠে। কারণ আজকেও তাকে বাঁচাতে ঠিক সেই মেয়েটিই এসেছে। বাঁধন ভাঙা গলায়, অতি ক্ষীণ সুরে বিড়বিড় করে বলে,
—- “কে -কে তুমি?”
মেয়েটি কোনো উত্তর দেয় না। সে চট করে নিজের সাথে থাকা একটা মোটা রশি বের করে এক চক্করে গুন্ডা দুটোর গলায় ফাঁসের মতো আটকে দেয়। তারপর কোনো দয়া না দেখিয়ে টানতে টানতে দুটোকে একটা মোটা গাছের কাছে নিয়ে যায় এবং সেই গাছের সাথে শক্ত করে বেঁধে ফেলে। ওদের বেঁধেই মেয়েটি দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসে মাটিতে পড়ে থাকা বাঁধনের কাছে। বাঁধনের গায়ের ধবধবে সাদা শার্টটা ততক্ষণে নিজেরই রক্তে মাখামাখি হয়ে লাল হয়ে গেছে। বাঁধন আধো-বোজা, ঝাপসা চোখে অপলক তাকিয়ে থাকে মেয়েটার দিকে। সেদিনের মতোই মেয়েটির মুখটা কাপড়ে ঢাকা, শুধু একজোড়া মায়াবী বাদামি চোখ দেখা যাচ্ছে। বাঁধনের মাথা ফেটে রক্তারক্তি অবস্থা দেখে মেয়েটার চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে, এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে। সে আর দেরি না করে নিজের পরিহিত সাদা জামার নিচের অংশটা অনেক কষ্টে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে হাত দিয়ে টেনে ছিঁড়ে ফেলে। সেই কাপড়ের টুকরোটা দিয়ে সে পরম মমতায় বাঁধনের মাথাটা শক্ত করে বেঁধে দেয়, যাতে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়। কাজ শেষ করেই মেয়েটি সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াতে চায় না। সে যেই উঠে চলে যেতে যাবে, আচমকা বাঁধন নিজের শেষ শক্তিটুকু এক করে তার হাতটা শক্ত করে ধরে এক হ্যাঁচকা টান মারে। হঠাৎ এই টানে মেয়েটি নিজের ভারসাম্য রাখতে না পেরে সরাসরি লুটিয়ে পড়ে বাঁধনের চওড়া বুকের ওপর। স্তব্ধ জঙ্গলের মাঝে দুজনের চোখাচোখি হয়। বাঁধন মেয়েটার সেই চেনা বাদামি চোখের দিকে তাকিয়ে ব্যাকুল স্বরে বলে ওঠে,
—- “কে তুমি? এভাবে বারবার আমাকে বাঁচিয়ে কেন পালিয়ে যাও? কেন আমার সামনে আসো না তুমি?”
মেয়েটি কোনো উত্তর দেয় না। সে তীব্র অস্বস্তি আর তাড়াহুড়ো নিয়ে বাঁধনের বুকের ওপর থেকে উঠতে যায়। কিন্তু বাঁধন তার এই দুর্বল শরীরেও সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে এক ঝটকায় মেয়েটার সরু কোমরটা দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। হুট করে বাঁধনের এই পুরুষালি ও নিবিড় স্পর্শে মেয়েটার পুরো শরীর কেঁপে ওঠে।সে লজ্জায় আর ভয়ে নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নেয়। বাঁধন তার সেই বন্ধ হয়ে যাওয়া মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে এক রোখাপূর্ণ জেদ নিয়ে বলে,
—- “আজ আজ তোমাকে না দেখে আমি কোনোভাবেই ছাড়ব না!”
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৪
মুহূর্তের মধ্যে মেয়েটি চোখ মেলে তাকায় এবং নিজের পুরো শক্তি খাটিয়ে বাঁধনের বুকের ওপর থেকে ওঠার জন্য ছটফট করতে শুরু করে। সে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য যেই একটু ওপরের দিকে ওঠে, ওমনি বাঁধন সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে এক হাত বাড়িয়ে তার মুখ থেকে কাপড়ের টুকরোটা এক টানে খুলে ফেলে।আর সাথে সাথেই চাঁদের আলোর মতো নিমিষেই অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে মেয়েটির সেই চেনা, অপরূপ মুখখানা। চোখের সামনে সেই মুখটা উন্মোচিত হতেই বাঁধনের চোখ জোড়া এক তীব্র তৃষ্ণার্ত চাউনিতে স্থির হয়ে যায়।
