বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৫৯
ইশরাত জাহান
রাতের খাবার সেরে যে যার ঘরে গেলো।শোভা আনমনে আছে অনেকক্ষণ।দর্শন পরখ করে দেখলো।শোভাকে আনমনা দেখে দর্শন প্রশ্ন করে,“কি হয়েছে তোমার?”
শোভা রাগী চোখে দর্শনের দিকে তাকালো।দর্শন ভরকে গেলো।ভ্রু কুঁচকে বলে,“আমার ছোঁয়া পেতে পেতে আমার মতো রাগী হয়েগেলে নাকি?”
“আমি আপনার মতো উগ্র রাগী নই।”
“হ্যাঁ,সে তো দেখতেই পাচ্ছি।আমার মতো রাগী হতেও পারবে না।”
“কেন?”
“আমার মতো রাগী হতে হলে যে তোমাকে আমার মতো করে ট্রিট করতে হবে।”
“আপনার মতো করে ট্রিট করতে হবে মানে?”
দর্শন বিছানা থেকে উঠে শোভার কাছে এসে আচমকা শোভার হাত টেনে শোভাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে। শোভার প্রশ্নের উত্তর মুখে না দিয়ে কাজে দেখিয়ে দেয়।শোভার ওষ্ঠ দখলে নিয়ে কিছুক্ষণ পর ছেড়ে বলে,“আমি রাগ করলে যেমন তোমাকে হার্ড কিস করি তেমনটা তুমি পারবে না ওয়াইফি।”
বলেই শোভার ওষ্ঠে বাইট দিয়ে দূরে সরল।শোভা ব্যথায় নিজের ঠোঁটে হাত দিয়ে আরও বেশি ব্যাথা অনুভব করে।আয়নার সামনে গিয়ে নিজের ঠোঁটের বেহাল দশা দেখে দর্শনের দিকে তাকিয়ে বলে,“আপনার কি সব রাগ আমার ঠোঁটের উপর ঝাড়তে হবে?”
“হুমমম,এতে করে যেমন তোমার শাস্তি হবে ঠিক তেমন হালকা রোমান্সটাও হয়ে যাবে।”
“এটাকে রাগ বলে!আবার রোমান্স!”
“ইটস কল হার্ড রোমান্স ওয়াইফি।”
“রোমান্স কত প্রকারের?”
“আমি কি জানি?”
“তাহলে বলছেন কেন এইমাত্র যেটা ছিল ওটা হার্ড রোমান্স?”
“কারণ এটাকে হার্ড রোমান্স বলে তাই।”
“এটাকে যেহেতু হার্ড রোমান্স বলে,সেহেতু পৃথিবীতে আমার অজানা আরো অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত রোমান্স নিশ্চয়ই আছে।যেগুলো নিয়ে আপনি পিএইচডি করে রেখেছেন।”
“তা অবশ্য করেছি।”
“বলুন ওগুলোর নাম কি?”
“বলব না করে দেখাবো।রাজি আছো ওয়াইফি?”
“অসভ্য পুরুষ মানুষ।”
“স্বামীরা রোমান্স করতে চাইলে তাকে অসভ্য পুরুষ বলে না ওয়াইফি।তাকে বলে বীরপুরুষ।”
শোভা চোখ ঘুরিয়ে টেবিলের কাছে আসে।টেবিলের উপরের এলোমেলো বইগুলো গোছানোর সময় বিড়বিড় করতে থাকে।মূলত সিনথিয়াকে বকছে।দর্শন ল্যাপটপে কাজ করতে শোভার বিড়বিড় শুনল কিন্তু কথাগুলো স্পষ্ট না।বিছানায় বসা অবস্থায় থুতনিতে হাত দিয়ে শোভার দিকে তাকালো।শোভা রাগ ঝাড়ছে বইগুলো দিয়ে।বইয়ের উপর বই রাখছে যেনো একটা বই দিয়ে আরেকটা পিটাচ্ছে।দর্শন বুঝতে পারছে না তার বউয়ের ঠিক কী হলো।আবারও প্রশ্ন করে,“এত রাগ কেন?”
“কিছু না।আপনি কাজ করুন।”
দর্শন ল্যাপটপ বন্ধ করে।শোভার কাছে তেড়ে আসে। যা দেখে রাগী শোভা গেলো চুপসে।এবার দর্শন নিজেই রেগে আছে।শোভা থতমত খেয়ে বলে,“কি হলো?”
দর্শন শোভার থুতনি জোরেই চেপে ধরে।শোভা ব্যথায় হাত নামাতে চাইলেও পারল না।দর্শনের চাওয়ার বিরুদ্ধে কোনকিছুই করতে পারবে না মেয়েটা। শোভার সাথে রেজিস্ট্রেশন করেছে মানে শোভাই তার রেজিস্ট্রি করা প্রপার্টি।তাই তার সাথে নিজের মতো করে চলবে।শোভা ভয়ে ভয়ে আছে এখন।দর্শন হুমকির সাথে বলে,“তোমার জীবনের সাথে আমি জড়িয়ে আছি ওয়াইফি।তুমি হাসবে কেন,কান্না করবে কেন এমনকি রাগটাও কেন করবে এটা জানার অধিকার আমার।তোমার সমস্ত অনুভূতির সাথে আমি জড়িয়ে থাকবো।সুতরাং আমাকে ইগনোর করবে না।ফলাফল কিন্তু খুব খারাপ হবে।”
শোভা বেক্কল বনে গেলো।কখন ইগনোর করলো দর্শনকে!শুধু অভিমান করেছিল।শোভা এবার কান্না করে দেয় দর্শনের সামনে।দর্শন রাগ অবস্থায় শোভার কান্না দেখে ভরকে গেলো।মেয়েটাকে এতদিন যতই শাস্তি দিক কখনও এমন কান্না করেনি।বেশ শক্তই থাকে মেয়েটা।আজ কি হলো?শোভাকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে।শোভা ছাড়াতে চায়।দর্শন বলে,“অনর্থক শক্তি ব্যয় করবে না ওয়াইফি।আমার শক্তির কাছে তুমি তুচ্ছ।তাই শান্ত থাকবে যখন আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরব।”
শোভা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে,“আপনার কথামত চলতে হবে নাকি আমাকে?”
“হুমমম চলবে।”
“পারবো না।আমার জীবন আমি আমার মতো করে চালাবো।”
দর্শনের হাত ঢিলা হয়েগেলো।শোভার দিকে তাকালো রক্তিম চোখে।রেগে হংকার ছেড়ে প্রশ্ন করে,“কি বললে?”
শোভা চোখের পানি মুছে বলে,“আমার জীবন আমার মতো করে চালাবো।আপনার কথামত সবসময় চলতে বাধ্য নই আমি।আমারও স্বাধীনতা আছে।”
“স্বাধীনতা!”
“হ্যাঁ,স্বাধীনতা।আমারও স্বাধীনতা আছে।”
কথাগুলো বলবার সময় শোভা অন্যদিকে ফিরে ছিল।যার কারণে দর্শনের রক্তিম চোখজোড়া দেখতে পেলো না।কথা শেষ করে যেই দর্শনের দিকে ফিরল শোভার কলিজা কেঁপে উঠল যেনো।যে স্বাধীনতা চেয়েছিল সে এখন নিজেকে গালী দিচ্ছে মনে মনে।দর্শন শোভার হাতদুটো জব্দ করে ধরে বলে,“কেমন স্বাধীনতা চাই তোমার?”
শোভা থমকে আছে।এমন প্রশ্নের উত্তর তার গলা অব্দি আটকে আছে।দর্শনের সামনে বলতে গিয়ে গলা ভার হয়ে আসছে।দর্শন উত্তর না পেয়ে চিৎকার করে বলে,“স্পিক।”
শোভা কেঁপে উঠল।কান চেপে ধরার ইচ্ছা জাগলো কিন্তু হাত তো দর্শন ধরে আছে।চোখ দিয়ে টুপটুপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে।শোভা চায়না এখানে দাঁড়িয়ে কান্না করতে।ওর দমবন্ধ লাগছে এখন।কাপা কাপা কণ্ঠে বলে,“আমি বাইরে যাবো।”
“এই রাতে?তবে এটাই তোমার স্বাধীনতা?”
“আমি কিছু জানি না।শুধু বাইরে যেতে চাই।”
“চলো আমার সাথে।”
“না,আমি একা যাবো।”
“সম্ভব না।তুমি যেখানে যাবে আমার সাথেই যাবে।”
শোভা রেগে ঝাড়ি দিয়ে বলে,“বললাম না আমি একা যাবো।আমি আপনার থেকে দূরে থাকতে চাই।আপনার সাথে থাকতে চাই না এখন।”
“এইটুকু স্বাধীনতা চাও তুমি আমার থেকে?”
“হ্যাঁ।”
“আর ইউ শিওর?”
“একদম।”
“এরপর যা ঘটবে তার জন্য যেনো আমাকে দায়ী করবে না ওয়াইফি।”
শোভা ভরকে গিয়ে বলে, “ম মানে?”
দর্শন হিংস্র চাহনির সাথেই বলে,“আমার থেকে দূরে থাকতে চাও।এইটুকু ব্যবস্থা আমি তোমাকে করে দিবো।কেনো দিবো না?আমার ওয়াইফির চাওয়া বলে কথা।পূরণ তো করতেই হয়।তবে এই চাওয়া পূরণ এর ফল যেটা হবে তার জন্য আমি দায়ী থাকবো না।”
শোভার গা কাপছে দর্শনের হুমকিতে।দর্শন আর কোনো কথা না বলে শোভার হাত ধরে বাইরে গেলো।শোভা ভয়ে কেঁপে উঠে বলে,“ছাড়ুন আমার হাত।”
দর্শন রেগেই আছে।রাগে মুখ লাল।চোখ দেখে যে কেউ ভয়ে পালাবে।মুখে একটা কথাও বলছে না।শোভা এবার চিৎকার দিয়ে বলে,“হাত ছাড়ুন আমার।ওদিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
দিজা ও সিনথিয়া দ্রুত বেরিয়ে এলো শোভার চিৎকার শুনে।দর্শনকে হিংস্র রূপে দেখে দুজনেই ভয়ে দরজার কাছে আটকে থাকলো। দিজা কষ্ট পেলো শোভার মুখ দেখে কিন্তু সিনথিয়া হাসছে। দিজা দ্রুত এগিয়ে এসে বলে,“কি হয়েছে?”
দর্শন ধমকে বলে,“স্বামী স্ত্রীর মাঝে ঢুকবি না দিজা।নিজের ঘরে যা।”
দিজা এক পা পিছিয়ে নেয় ভয়ে।শোভার অসহায় মুখের দিকে চেয়ে বলে,“ভাবীকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছো?”
“জাহান্নামে,যদি তুইও যেতে না চাস তাহলে আমার কথা শুনে চুপচাপ ঘরে যা।”
দর্শন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো। দিজার এবার শোভার অবস্থা দেখেই কান্না পেলো।যতই হোক সেও মেয়ে।তাও আবার দুর্বল প্রকৃতির। দিজা বলতে গেলে শোভার থেকেও দুর্বল।ওর মুখ চলে শুধু দিদারের সাথে।আবদার থাকে মা বাবা আর দাদাজানের কাছে।আর সবাইকে মান্য করে চলে।সেই মেয়ে এখন কীভাবে ভাবীকে তার জম ভাইয়ের হাত থেকে বাঁচাবে বুঝতে পারছে না। দিজা দৌড়ে ঘরে এসে দিদারকে কল দেয়।দিদার ধরতেই দিজা কাপতে কাপতে বলে,“ভাইজান উন্মাদের মত আচরণ করছে।ভাবীকে নিয়ে বাইরে গেলো।ভাবী বারবার নিজেকে ছাড়াতে চায়।”
দিদার ঘুমের ঘোরে শুনে বলে,“স্বামী স্ত্রী রোমান্টিক টাইম স্পেন্ড করছে।তাতে তোর কি?”
“আরে ওরা এই রাতে বাইরে গেলো।”
“স্বামী স্ত্রী মিলেই তো গেলো।সমস্যা কোথায়?”
“ভাইজানের চোখমুখ রাগে লাল।”
“আরে ওই ব্যাটা এমনিতেই রাগী।চব্বিশ ঘণ্টা গম্ভীর মুখ সিরিয়াস রাখলে তার মধ্যে রোমান্টিক ভাব আসবে ক্যামনে!দেখ গিয়ে বউয়ের সাথে রোমান্টিক মুহূর্তে এমন একশন দেখিয়েছে যে বউ ভয় পেয়ে পালাতে চাইছে।তাই ভাইজান নিজেও আরও রেগে লাল হয়ে আছে।”
“ভাবী বারবার নিজেকে ছাড়াতে চাইছে তো।”
“ওমন বর রোমান্টিক হলেও ভয়ংকর।ভাবী পালাতে চাইবে না তো কি তুই পালাবি?”
“ধুর!তোর মুখ না রকেট।তোর কাছে কল দেওয়াই বেকার।”
“তাহলে আমার কাছে কল দিয়েছিস কেন?আমি আহ্বান করেছিলাম?”
“দিতাম দাদাজানকে কিন্তু এখন রাত দুইটা।তাই দাদাজান বা আব্বাজানকে বিরক্ত করতে চাই না।বয়স্ক মানুষ আরও বেশি ঘাবড়ে যাবে।”
দিদার এবার দিজাকে বোঝাচ্ছে, “শোন মাথামোটা,রাতের বেলা স্বামী স্ত্রী মিলে বাইরে ঘুরতে যায়।চন্দ্র বিলাস করতে।তুই সিঙ্গেল মানুষ এসব বুঝবি না।”
“তুই কয়টা বউ ঘরে রেখেছিস শুনি?বলদ কোথাকার!চন্দ্র বিলাস করতে কেউ জঙ্গলের দিকে যায়?ওখানে চাঁদ দেখার উপায় কোথায়?গাছের ডালে ভরে আছে।তারসাথে আছে বটগাছ।ভাবী তো বটগাছে খুব ভয় পায়।”
“সাথে তো ভাইজান আছেই।পেরা নাই।জঙ্গলে চাঁদ না থাকলেও মঙ্গল আছে।তাতেই ওদের কোনো এক বিলাস হয়ে যাবে।”
“রাখ তোর বিলাস।বলদ একটা।আমি আছি চিন্তায়।আল্লাহ না জানে ভাবীর আজকে কি হয়!মেয়েটা আমাদের দায়িত্বে থাকে।ওর কিছু হলে ওর ভাই ভাবীকে কি জবাব দিবো?”
“ওর ভাই ভাবীকে কোনো জবাব দিতে হবে না।একটা ভাগ্নি এলে এমনিতেই সবাই বুঝবে ঘটনা কি।সবাই তোর মতো আবাল না।”
“মুখ সামলে কথা বল বেয়াদপ।”
“কথাই তো বলতে চাইনি।তুই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কথা বাড়ালি।”
“তোর মতো বেয়াদপকে কল দেওয়াই আমার ভুল।”
“এখন কপাল চাপড়া।আমি রাখলাম।”
বলেই কল কেটে দিলো দিদার। দিজা চিন্তা করছে।সিনথিয়া পিছন দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে,“দিদার কি বলল?”
“বলল চিন্তা না করতে।”
“ঠিকই তো।ওদের নিয়ে চিন্তা করতে হবে কেন?”
“ভাইজানকে তুমি চেনো না ভালোকরে।”
“এখানে চেনার কি আছে?”
“তুমিও দিদারের মতো বলছো!আবার যেনো এখন বলো না আজকের এই মুহূর্তের ফল হিসেবে আমরা ভাগ্না ভাগ্নি পেতে যাচ্ছি।”
সিনথিয়া কপাল কুঁচকে বলে, “হোয়াট?”
দিজা মাথা নাড়িয়ে বলে,“দিদার তো এটাই বলল।”
সিনথিয়া এতক্ষণ দিজার কথায় গুরুত্ব না দিলেও এবার দিজার হাত ধরে দিলো দৌড়।সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় মনে মনে বলে,“ভাবলাম মিরাক্কেল ঘটেছে।আমি কিছু না করলেও ওদের সংসারে আগুন লেগেছে কাল থেকে আমি তাতে ঘি ঢালবো এখন শুনি কাহিনী অন্য।”
সিনথিয়াকে দৌঁড়াতে দেখে দিজা বলে,“পাগল হয়েগেলে নাকি?”
“দ্রুত চল।দেরি হলেই পাগল হয়ে যাব।”
দিজার মাথায় ঢুকলো না।সিনথিয়া ভাবছে দর্শন ও শোভা জঙ্গলে রোমান্স করতে গেছে।সদর দরজার কাছে এসে সিনথিয়া ও দিজা দুজনেই দাঁড়িয়ে পড়ল।পিছন থেকে লক করা।সিনথিয়া বিরক্তির সাথে বলে,“এবার?”
“ঘরে ফিরতে হবে।এছাড়া উপায় নেই।ভাইজান বলেই দিয়েছে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে না ঢুকতে।”
সিনথিয়া আশপাশ তাকিয়ে মনে মনে বলে,“ঢুকব তো আমি অবশ্যই।নাহলে ওই ছেলের অহংকার আমি মাটিতে পুঁতে ফেলব কিভাবে?”
জঙ্গলের কাছে এসে দাঁড়ালো দর্শন।দর্শনের আচমকা দাঁড়ানোর কারণে পিছনে থাকা শোভা ছিটকে পড়তে নেয়।দর্শনের শক্ত হাতের বাঁধনে পড়তে পারল না কিন্তু হাপিয়ে উঠলো।দর্শনের কাঁধে মাথা ঠেকে।দর্শন সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে শোভার হাত ধরে সামনে নিয়ে এসে শোভাকে দূরে সরিয়ে দেয়।শোভা অবাক হয়ে তাকায়।দর্শন স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে,“আমার থেকে দূরে যেতে চেয়েছো।এই রাতে বাইরে আসতে চেয়েছো।তোমার সব চাওয়া আমি পূরণ করবো।”
শোভা চারপাশ তাকালো। উপরে গাছের ডাল পাতায় ভরে আছে। চাঁদের আলোটাও নেই এখানে।শোভার মনে পড়ল এখানে বটগাছ আছে কয়েকটা।বটগাছের সাথে লম্বা লম্বা শিকড়ের মত ঝোলানো জিনিসগুলো শোভার পিঠে এসে বাড়ি দিচ্ছে।শোভা পিঠে হাত দিতেই অনুভব করে।দর্শন কয়েক কদম দূরত্বে চলে গেলো।শোভা অন্ধকারে দেখতে পাচ্ছে না।দর্শনের সাথে বাড়ি ফিরে যেতে চায় এখন।মুখ ফুটে বলে,“আমি তো বাইরে বলতে ডায়নিং রুমে যেতে চেয়েছিলাম।”
বিপরীতে কোনো কথা শোনা গেলো না।বুঝলো দর্শন চলে গেছে।এবার শোভার ভয় আরো বেড়ে গেলো।গা কাপছে।এই গরমেও শীত লাগছে শোভার।গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। জোরে জোরে বলে,“আমার ভয় করছে। দয়া করে এমন শাস্তি দিবেন না।”
শোভার কথার বিপরীতে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা দিলো না।দর্শন তো চলে গেছে।শোভার ভয়ে গা হাত পা কাপতে শুরু করে।মনে হয় আশেপাশে কালো ধোয়ার মত কিছু উড়ছে।ভয়ে আয়াতুল কুরসি পাঠ করে।তিন কুল পড়ে নিজের গায়ে ফু দিলো।নিজেকে শান্ত করতে ব্যস্ত কিন্তু মন শান্ত হয়না।মনে হচ্ছে পিছন থেকে এই শিকড় তাকে জড়িয়ে ধরবে।তার গলা চেপে ধরবে।তার আজকেই এই পৃথিবীতে শেষ দিন।হাতের উপর দিয়ে একটা শুকনো পাতা বেয়ে পড়ল।উদ্ভট ভাবনায় থাকা শোভা ভয়ে চিৎকার দিয়ে বলে,“বাঁচাও।”
বলেই মাটিতে বসে পড়ে শোভা।এতক্ষণ কান্নায় শব্দ না হলেও এবার চিৎকার দিয়ে কান্না করছে শোভা।আফসোস তার কান্নার শব্দ বাড়ির ভিতরে যাবে না।গেলেও বা কী?কিছুই করার নেই।কারণ দর্শন দরজায় তালা দিয়ে রেখেছে।শোভা বেচারি হাউমাউ করে কান্না করে।কান্নায় ভেঙে পড়ে বলে,“আমি আপনার কাছে থাকবো না।কালকেই চলে যাব আমি যশোরে।”
কথাটা বলা মাত্রই শোভার গায়ের উপর দিয়ে কি যেনো পড়ল।শোভা ব্যাথা পায়নি কিন্তু ভয়ে থাকার কারণে আটকে উঠেছে।মাটিতে ভর দিয়ে উঠতে চাইলে হাতে শুকনো কিছু বাদার কারণে আবারও ভয় পেলো।আশপাশ থেকে ইদুর,বিড়ালের শব্দও আসছে।দূরে তালগাছে আছে বাবুই পাখির বাসা।সেখানে হয়তো বাবুই পাখিরাও আছে।শোভা ভাবছে ওরাও কি ঘুমিয়ে গেলো?এই রাতে পশু পাখির ডাক শুনতে ভয় লাগছে শোভার।সবাইকে নিজের শত্রু মনে হচ্ছে।কারণ শোভা ছোট বেলায় শুনেছে রাতের বেলা জ্বীনেরা নাকি পশু পাখির রূপ ধরে আসে।বিশেষ করে কালো বিড়াল।এই বাড়িতে একটা কালো বিড়াল আছে।দর্শন পুষতে আনেনি কিন্তু খাবার পর মাছের যে অবশিষ্ট কাটা থাকে ওগুলো দর্শন একটা পাত্রে করে জঙ্গলে নিয়ে আসে।যাতে বিড়ালটি বাসার মধ্যে না এসে এই জঙ্গলে থেকেই খাবার পায়।মাঝে মাঝে ক্যাট ফুড নিয়ে আসে দর্শন।সবকিছু করলেও যখন বিড়ালটি দর্শনের কাছে ভালোবাসা দিতে আসে তখন দর্শন দূরে সরিয়ে বলে,“ডোন্ট কাম টু মি।”
বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৫৮
বিড়াল ইংরেজি বোঝে কি না কে জানে!শোভা শুধু ওদের ভাব দেখেছিল সেদিন।বিড়াল অবশ্য মুখ শুকনো করে দূরে গিয়ে একটা গাছের নিচে শুয়ে পড়ে।সেই বিড়ালটাকে দেখে তখন মায়া লাগলেও এখন বিড়ালের কথা ভাবতেই ভয়ে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।বলা তো যায়না বিড়ালের উপর জিনে ভর করলো কি না!
