বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৯
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
দিনভর ঝিরঝিরে বৃষ্টির ধারা ভিজিয়ে দিয়েছে আশপাশটা। শুকনো মড়মড়ে পাতাগুলো ভিজে আছে ধুলোবালির মিশ্রনে। আদ্র তখনও মায়ের কবরেই পড়ে আছে। শুভ্র রঙা শার্টটা বৃষ্টির ধারায় এতক্ষনে ভিজা বসেছে। লেপ্টে গিয়েছে শরীরে। আদ্রর শরীরটা শীতল হয়ে এল যেন। বৃষ্টির পানির ঠান্ডায় আর শীতল হাওয়ায় জমে আসে। আদ্র তবুও মাকে ছেড়ে যেতে নারাজ। যাবেও বা কোথায়? যাওয়ার জায়গা আছে কি? আম্মু একবার বলেছিল না মা চলে গেলে সে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাবে? আসলেই আদ্র আজ নিঃস্ব। একেবানর নিঃস্ব। আদ্র কাঁদে। ভেজা মাটির সুভাস নাসারন্ধ্রে বহন করেই ঐটুকু মাটিকে কেমন জড়িয়ে ধরে বিড়বিড় করল,
“ আমায় তোমার কাছে নিয়ে যাও না আম্মু। কোথায় যাব আর বলো? কোথাও যে যাওয়ার জায়গাটুকু নেই। আমার কোথাও কোন আপন মানুষ নেই, আপন নীড় নেই। আমি ফিরব কোথায় বলো? কোথায় ফিরব? আমাকে একা করে কেন চলে গিয়েছিলে বলো? কেন? ”
আদ্র ওভাবেই থাকে। দূর থেকে দেখলে বোধহয় মনে হবে এই এক উন্মাদ পাগল। নয়তো কেউ কবরে এমন লেপ্টে পড়ে? চুমু খায়? ফিসফিস করে? আদ্র তো করছে। আদ্র ফের আবারও বলে উঠল,
“ আমায় নিয়ে যাও আম্মু। প্লিজ। এই পৃথিবী থেকে তোমার কাছে নিয়ে যাও। প্লিজ আম্মু।
উহহ,শোনো আম্মু, যাওয়ার আগে একবার বাটারফ্লাইকে দেখব প্রাণভরে। কোলে তুলব, চুমু খাব। প্রাণভরে জড়িয়ে ধরব। শুধু একটাবার! একটাবার।
যাওয়ার আগে একবার মিথিকেও দেখে যাব আম্মু। একটাবার আড়াল থেকে প্রাণভরে তাকাব। জানি, সামনে গেলেই ঘৃণা নিয়ে চাইবে আমার দিকে। তীব্র ঘৃণায় মুখচোখ কুঁচকে নিবে। আমি জেনেবুঝে সে ঘৃণা কুড়াই কি করে বলো? তাই আড়াল হতে দেখব। দেখব, যে মেয়েটিকে একদিন সহ্যই করতে পারতাম না, সে মেয়েটিকেই।
তুমি জানো আম্মু? আমি বোধহয় মিথির প্রতি করা অন্যায়গুলো ভেবে ভেবেই ভালোবেসে ফেলেছি। অনুশোচনায় ছটফপ করেছি। তুমি বলেছিলে না তোমার মেয়েটাকে কোন একদিন ঠিকই ভালোবেসে ফেলব ভেবে তুমি বিয়েটা দিয়েছিলে? দেখো, আজ আমি তোমার মেয়েটার প্রতি সত্যিই দুর্বলতা টের পাই অথচ তুমি নেই। মিথিও নেই। বিয়েটাও নেই। ”
আদ্র আবারও চুপ থাকে। অনেকটা সময় চুপ থাকে। তারপর আবারও আক্ষেপ নিয়ে বলল,
“ আম্মু, কতদিন হলো আমি তোমার হাতের বিরিয়ানি খাই না। তুসি আর বিরিয়ানি রান্না করো না। আমায় বেড়ে দাও না। আম্মু? জেলের ঐ নুন-ঝাল ছাড়া খাবার খেতে খেতে জিভ পঁচে গেছে কেমন। তুমি তো আমার জন্য কত কি রান্না করতে তাই না? আজ তুমি থাকলে নিশ্চয় রান্না করতে কত কি তাই না? আম্মু? আমার না ক্ষিধে পেয়েছে খুব। পেটের ভেতর চিনচিন করছে। দেখো, দেখো না? আমার ক্ষিধে পেয়েছে। অথচ তোমার মতো কেউ খাবার এগিয়ে দেওয়ার মতো নেই। ”
আদ্রর সত্যিই ক্ষিদে পেয়েছেে।পেটের ভেতর চিনচিন করছে ক্ষিধেতে। অথচ কেউ নেই তার। পকেটে টাকাও নেই রাস্তার কোন রেস্তোরা বা হোটেল থেকে খাবার কিনে খাবে। এতই দুর্ভাগা হবে আদ্র কখনো ভেবেছিল? ভাবেনি তো। মা বাবার আদরের আদ্রের এহের পরিণতি তো হবে কেই বা কল্পনা করেছিল?
আদ্র সন্ধ্যে অব্দিই মায়ের কবরে পড়ে থাকল। অতঃপর সন্ধ্যে একটু আগে ক্লান্ত পায়ে বেরিয়ে এল। এক পলকে তাকিয়ে থাকল শখের বাড়িটার দিকে। ওটা তার বাড়ি? না তো। আদ্র চোখ বুঝে। বড়বড় শ্বাস ফেলে পা বাড়াল একবার আমজাদ সাহেবের সাথে দেখা করবে বলে। অতঃপর সেভাবেই পা বাড়িয়ে বাড়ির ভেতরে গেল। বহুকিছুইরই পরিবর্তন ঘটেছে এতগুলো দিনে। আদ্র এক পা দুই পা করে গেল আমজাদ সাহেবের ঘরেই। তখন তার দাদী ছিল না। আমজাদ সাহেবকে একা পেয়েই হেসে বলে উঠল সে,
“ এখনো বেঁচে আছিস তাহলে? আমার আম্মুকে মেরে নতুন বউকে নিয়ে মেতেছিলি না জানোয়ার? রেখেছে? তোকে যত্নে রেখেছে আমার মায়ের মতো? রাখবেও না। ”
আদ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল শুধু। শান্তি পাচ্ছে সে আমজাদ সাহেবের অবস্থা দেখে। আসলেই শান্তি পাচ্ছে। এইটুকু দেখার জন্যই তো এল সে। আদ্র দাঁড়াল না। আমজাদ সাহেবের চোখের অশ্রু, বিস্ময় এবং অপরাধবোধ দেখেই পা বাড়াল ধীর ভঙ্গিতে। দাঁড়াল না। আর একটুও দাঁড়াল না।
তখন রাত প্রায় দশটা। আকাশটা আঁধারে ঘেরা। মিটিমিট করে জ্বলছে আকাশের তারাগুলোও। মিষ্টি ঘুমিয়েছে এইতো ঘন্টাখানেক হলো। ঘুমালে মেয়েটাকে আরো মিষ্টি লাগে। একদম আদুরে ফুল। হিমেল মিষ্টিকে বুকে জড়িয়েই ঘুম পাড়িয়েছিল। এবং এতোটা সময় বুকে জড়িয়েই চেয়ে দেখছিল ঐটুকু মিষ্টিকে। যেন এইতো আধো আধো স্বরে হিম বলে ডাকত। দুই হাত বাড়িয়ে কোলে উঠে বসত। হিমেল ভাবে। ভেবেই হেসে ফেলল। মুখ নামিয়ে মিষ্টির কপালে চুমু আঁকল আলতো করে। অতঃপর জানালার ধারে বসা মিথির দিকে চাইল। কেমন নিরব চেয়ে আছে তাদের দিকেই। মুখে একটুকরো হাসি। মিথি এমন চুপচাপ বসে থাকে যখন তার মাথাটা ব্যথা হয়। হিমেল তাই বুঝতে বাকি হলো না কেন বসে আছে। ফিসফিস করে বলল,
“ ওভাবে বসে আছিস কেন? মাথা ব্যথা করছে? ”
মিথি তাকাল। হ্যাঁ, মাথাটা ব্যথা করছে। তবুও উত্তর করল,
“ দেখছিলাম। আপনাকে আর প্রাণকে। ”
“কেন? ”
“ ভালো লাগছিল দেখতে। ”
হিমেল হাসে। আলতো করে মিষ্টিকে উঠে বসেই বলল,
“ তখন থেকেই দেখছিস। একঘেয়েমি লাগবে তো এবারে। ”
মিথি হাসল। উত্তর করল,
“ ভালো লাগার জিনিসের প্রতি তাকিয়ে থাকতে একঘেয়েমি আসে না, বুঝলেন? কেন? আপনার আসে একঘেয়েমি? ”
হিমেল হেসে ফেলল। সে যে তাকিয়ে থাকে তার খোঁচা দিল? বলল,
“ আমার প্রশ্ন তোলা থাক। এদিকে আয়। মাথায় হাত বুলিয়ে দিব। মাথা ব্যথা চলে যাবে। ”
“ কে বলল মাথা ব্যথা করছে? ”
“ ওভাবে পেঁচার মতো বসে থাকার আর কোন কারণ দেখছি না । এখন আয় এখানে।”
মিথি গেল না। ওভাবেই বসে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ কেন? ”
হিমেল গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“ তোকে পার্সেল করে পাচার করে দিব তাই। ”
“ পেঁচা বললেন কেন? ”
“ এইজন্য আসবি না? ”
“ আগে বলুন, পেঁচা বললেন কেন? ”
হিমেল ফের উত্তর করল,
“ ইচ্ছে হয়েছে। আসলে আয়, না আসলে আমি ঘুমাচ্ছি। ”
এইটুকু বলার ঠিক কয়েক মুহূর্ত পরই ঘরের আলোটা নিভিয়ে দেওয়া হলো। মিথি বসা ছেড়ে তখন বিছানার পাশটায় এল। একদম হিমেলের সামনে এসেই ডাক দিয়ে বলল,
“ আসলাম।”
হিমেল চোখ বুঝার ভান ধরেছিল। এখন চোখ খুলল মিনমিন করে৷ ড্রিম লাইটের আলোতে মিথির মুখটা দেখে নিয়েই ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ তো? ”
“ সরুন। ঘুমাব। ”
হিমেল কপাল কুঁচকাল। ওপাশের জায়গাটা পুরোপুরিই খালি আছে। তবুও এই মেয়ে বলছে সরতে। উত্তর করল,
“ ওপাশে ঘুমা। ”
“ মাথা ব্যথা করছে। সারিয়েন দিন। ”
“ আমিই কেন? ”
“ ডাকলেন কেন তাহলে? ”
হিমেল হেসে ফেলল এবারে। উঠে বসে হেলাস দিয়ে বসল। মিথি ততক্ষনে তার মাথাটা রাখল হিমেলের কোলেই। হিমেল যখন তার হাতটা মিথির মাথায় ছোঁয়াল, চুলে হাত বুলাতে লাগল ঠিক তখনই মিথি চোখ বুঝে নিতে নিতে বলল,
“ আদর-যত্ন দিয়ে আমাকে বড্ড আদুরে বাচ্চা বানিয়ে দিচ্ছেন বুঝলেন? অথচ আমি এমন ছিলাম না। ”
হিমেল হেসে জবাব করল,
“ খুব ভালো, বাচ্চাই ভালো। বাচ্চা ভালো লাগে আমার। ”
মিথি সঙ্গে সঙ্গেই চাইল আবার। মুহূর্তেই শুধাল,
“ হু, বাচ্চা তো ভালোই। শুনুন? আপনার কি মনে হয় না তিনজনা থেকে চারজনা হওয়া উচিত আমাদের? ”
গম্ভীর স্বরে উত্তর এল,
“ না, মনে হয় না। ”
“ কেন?”
হিমেল মুখটা ঝুঁকাল কিছুটা। অতঃপর ঠোঁটজোড়া দিয়ে মিথির কপালে গভীর স্পর্শ এঁকে দিতে দিতেই বলল,
“ মিথিফুল, আমার জীবনে তুই ই সব। বিশ্বাস কর মিথিফুল, আমি তোকে পেয়ে পৃথিবীর সবচাইতে বেশি খুশি হয়েছিলাম জীবনে। আমার জীবনে তুই আর মিষ্টি সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমার আর কিছুই চাই না।”
মিথি শুনল। ওভাবেই বলল,
“ কিন্তু মিষ্টি তো চায় একটা পিচ্চি। আমি তো চাই আরেকটা পিচ্চি। খুব করে চাই আমার ভেতর আরেকটা প্রাণের আগমণ হোক খুব খুব সুখ আর আনন্দ নিয়ে। নতুন করে আরো একবার খুশি আর আনন্দে মা হওয়ার সুখ আসুক আমার জীবনে। ”
“ উমম! আমি আপনাকে ছোট্ট সংসারটায় নিত্যনতুনভাবে সুখসুখ অনুভূতিতে রাখব ম্যাম। তবে মিষ্টির আদরে ভাগ বসুক এইটুকু আমি চাই না। আমি চাই না, কখনো ভুলেও আমার দিকে আঙ্গুল উঠুক। আমি চাই না আপনাকে আরো একবার হারানোর ভয় পেতে। ”
এইটুকু বলে ফের আরো একবার চুমু আঁকল মিথির কপালে, ডান গালে এবং নাকে। নরম কন্ঠে জানাল,
“ আমরা সবসময়ই তিনজনাই থাকব। হুহ? আমাদের শুধু মিষ্টিই থাকুক হুহ? মিষ্টি সবসময়ই তার পাপা এবং মাম্মার সব আদরের অধিকারী হবে। সবসময়ই! হুহ? বিশ্বাস কর, আমি মিষ্টিকে অনেকখানি ভালোবাসি মিথি। ওর ঐ ছোট্ট মনে কখনো আমার জন্য অভিমান, অভিযোগ তৈরি হোক আমি চাই ই না। আমি চাই না ওর ভালোবাসা ভাগ হওয়াতে ও কষ্ট পাক। ”
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৮
আদ্র প্রায় সপ্তাহখানেক শহরের অলিতে গলিতে ঘুরঘুর করেছে একটাবাররমিথির দেখা পাওয়ার আশায়। একটাবার যদি মিথিকে পেত তাহলে তো একটাবার বাটারফ্লাই অব্দিও পৌঁছাতে পারত। আদ্র বহু খোঁজার পরই সাইয়ারার সাহায্যে মিথির ঠিকানাটা পেল। আজর প্রায় দুদিন যাবৎ সে বিল্ডিংটার সামনে সময়ে অসময়ে হাজির হচ্ছে ।দূর থেকে দেখে যাচ্ছে। তবুও দেখা মিলল না। আদ্র যখন এই নিয়ে আফসোস করছিল খুব করে, হতাশা নিয়ে আজকের মতো ফিরে যাচ্ছিল ঠুক তখনই চোখে পড়ল একটা যুবক বয়সী ছেলের কোলে একটা ছোট্ট মতো মেয়ে। দেখতে হুবুহু, হুবুহু যেন মিথির মতোই চেহারাটা। আদ্র বিস্ময় নিয়ে চাইল। বুক ধুকফুক করছে তার।ওই বাচ্চা মেয়েটাই কি মিথির আর তার…আদ্র আর ভাবতে পারে না যেন। গুলিয়ে ফেলে সবটা। হৃদস্পন্দন বাড়ে।শুধু বিড়বিড় করে বলল,
” মিথি? মিথি, ওই কি…”
