ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৪৯
তানিশা ভট্টাচার্য্য
সোহাগ আর প্রেমের রিসেপশনের ভিলাটি আজ রাতে যেন অপরুপ সাজে সেজে উঠেছে। ভিলার প্রবেশদ্বার থেকেই শুরু হয়েছে শ্বেতশুভ্র রজনীগন্ধা আর গোলাপি টিউলিপের এক দীর্ঘ সুগন্ধি পথ। ওপর থেকে ঝুলে থাকা কাঁচের লণ্ঠনগুলো থেকে চুঁইয়ে পড়া মায়াবী আলো সেই ফুলেদের গায়ে পরে এক অদ্ভুত আভা তৈরি করেছে। পুরো ভিলাটি মুড়ে দেওয়া হয়েছে দুধ-সাদা সিল্কের পর্দায়, যা হালকা হাওয়ায় মাঝেমধ্যেই দুলছে। বাগানের মাঝখানে থাকা বিশাল ফোয়ারাটির জলরাশির ওপর নীল রঙের আলোকসম্পাত করা হয়েছে, যার কলতান পুরো পরিবেশকে এক শান্ত শীতলতা উপহার দিচ্ছিল।
ভিলার মূল হলে ঢোকার মুখে সারি সারি ঝাড়লণ্ঠন ঝোলানো, যেগুলোর স্ফটিক থেকে ঠিকরে পড়া আলো মেঝের মার্বেলের ওপর তারার মতো ঝিকমিক করছে। ডেকোরেশনের প্রতিটি কোণে আভিজাত্য আর আধুনিকতার এমন এক নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে, যা দেখে মনে হচ্ছিল এটি কোনো সাধারণ রিসেপশন নয়, বরং কোনো রাজকীয় উৎসবের মঞ্চ।
বাতাসে ভাসছিল হালকা চন্দন আর পারফিউমের মিশ্র এক ঘ্রাণ, যা আগত অতিথিদের ইন্দ্রিয়কে এক নিমেষে মোহিত করে দিচ্ছিল। ভিলার প্রতিটি অলিন্দ থেকে শুরু করে বারান্দা—সবটাই যেন আজ ভালোবাসার রঙে রঙিন।
মায়াবী আলোকসজ্জায় মোহিত রাজকীয় ভিলার অন্দরে আর্ভিক, তানভী আর ঋষি প্রবেশ করল। সজ্জিত স্টেজের ঠিক মাঝখানে বসেছিল নবদম্পতি—প্রেম আর সোহাগ। প্রেমকে মেরুন রঙের শেরওয়ানিতে বেশ সুদর্শন দেখাচ্ছিল, আর সোহাগের পরনে ছিল ভারী কারুকার্য করা সবুজাভ লেহেঙ্গা। আর্ভিকদের দেখে ওদের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক খেলে গেল। আর্ভিক ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে প্রেমের কাঁধে হাত রাখল।
-“Congratulations ভাই! বৈবাহিক জীবন তোদের সুখের হোক।”
আর্ভিকের গলায় এক চিরচেনা বন্ধুত্বের টান। প্রেম হেসেই আর্ভিক কে জড়িয়ে ধরল
-“ধন্যবাদ ভাই।”
তানভী এবার সোহাগের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সোহাগের হাত দুটো জড়িয়ে ধরে মিষ্টি হেসে বলল
-“সোহাগ দিদিভাই, তোমাকে আজ একদম পরীর মতো লাগছে!”
সোহাগও ম্লান হেসে তানভীর গালটা টিপে দিয়ে বলল
-“তোকেও কিন্তু আজ অপার্থিব সুন্দর লাগছে।”
আর্ভিক নিজের পকেট থেকে একটা ছোট মখমলের বাক্স বার করল। প্রেমের হাতে সেটা তুলে দিয়ে বলল
-“আমাদের তরফ থেকে এটা তোদের দুজনের জন্য ছোট একটা উপহার।”
বাক্সের ভেতরে ছিল হীরের সূক্ষ্ম কাজ করা একজোড়া আংটি, যা সেই উজ্জ্বল আলোয় আগুনের শিখার মতো জ্বলজ্বল করে উঠল। এরপর আর্ভিকরা নবদম্পতির সাথে ফোটো তুলল।
হঠাৎ তানভীর চোখ পড়ল এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা রিকি আর মেঘাদ্রির ওপর। আর্ভিকের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে চপল পায়ে ও সেদিকে এগিয়ে গেল। ভিড়ের মাঝে দ্রুত এগোতে গিয়ে আচমকা এক আঠারো-উনিশ বছরের তরুণের সাথে তানভীর সজোরে ধাক্কা লাগল। তরুণটি বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে কড়া স্বরে বলতে যাচ্ছিল
-“চোখে কি দেখতে…….”
কিন্তু বাক্যটি শেষ হলো না। তানভীর অপার্থিব সৌন্দর্যের সামনে ওর কণ্ঠস্বর যেন অতলে হারিয়ে গেল। গোলাপী-সাদা লেহেঙ্গায় মোড়া সপ্তদশীর ডাগর চোখের ভীরু চাউনি দেখে সে মোহাবিষ্টের মতো চেয়ে রইল। তানভী ভীত কণ্ঠে বলল
-“সরি দাদাভাই, আমি ভিড়ের মাঝে খেয়াল করিনি।”
তানভী পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হতেই সেই তরুণটি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে খপ করে তানভীর নরম হাতটা চেপে ধরল। এক লহমায় তানভীর সারা শরীর হিম হয়ে গেল। এক অজানা পুরুষালির স্পর্শে ও কুঁকড়ে গিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে প্রায় দৌড়ে বন্ধুদের কাছে চলে গেল।
স্টেজের ওপর দাঁড়িয়ে কথা বললেও আর্ভিকের বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ নজর প্রতিমুহূর্তে তানভীকে অনুসরণ করছিল। দৃশ্যটা দেখে ওর চোয়াল শক্ত হয়ে এল, চোখের মনিতে জ্বলে উঠল এক ভয়ঙ্কর দাবানল।
বন্ধুদের কাছে পৌঁছেও তানভী যেন স্বাভাবিক হতে পারছিল না। ও চুপচাপ বসে রইল, বারবার নিজের হাতের দিকে তাকাচ্ছিল—সেখানে যেন সেই অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের দাগ রয়ে গেছে। মেঘাদ্রি তানভীর ম্লান মুখ দেখে চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করল
-“কিরে তানভী, কী হয়েছে তোর? শরীর খারাপ লাগছে?”
তানভী চারপাশটা একবার আড়চোখে দেখে নিয়ে নিজেকে সামলে বলল
-“ন..না রে, কিছু হয়নি, এমনিই।”
রিকি হাসতে হাসতে বলল
-“আচ্ছা ছাড়, রিসেপশন পার্টিতে কি কেউ মনমরা হয়ে বসে থাকে? চল এনজয় করি!”
এদিকে আর্ভিক নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল—সাড়ে ন’টা বেজে গেছে। আর্ভিক যখন তানভীকে ডিনারের জন্য ডাকতে যাবে, ঠিক তখনই ওর ফোনে একটা কল বেজে উঠল। ফোনটা কানে দিয়ে আর্ভিক নিচু কিন্তু হিমশীতল স্বরে আদেশ দিল
-“বাচ্চা ছেলে, বেশি কিছু করার দরকার নেই। শুধু ওর ডান হাতটা ভেঙে দাও, যাতে দ্বিতীয়বার কোনো নারীর হাত ধরার সাহস ও আর জীবনে না পায়।”
নির্লিপ্তভাবে কলটা কেটে আর্ভিক তানভীর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তানভী তখন বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেতে ছিল, কিন্তু আর্ভিক ওকে একপ্রকার জোর করেই খাবার টেবিলের দিকে নিয়ে গেল। রাতের ডিনার সেরে ওরা প্রেম আর সোহাগের থেকে বিদায় নিল।
আগস্ট মাস, ক্যালেন্ডারের পাতায় ১৪ তারিখ। গত কয়েক মাস ধরে প্রেম আর সোহাগের সাজানো সংসারে যেন কালবৈশাখীর মেঘ জমেছে। আইপিএস অফিসার হিসেবে প্রেমের কাঁধে এখন নতুন এক জটিল কেসের দায়িত্ব। ফাইলের স্তূপ আর অপরাধীদের জেরা করতে করতে ঘড়ির কাঁটা কখন মাঝরাত পেরিয়ে যায়, প্রেম টেরও পায় না। আর এই ব্যস্ততাই হয়ে দাঁড়িয়েছে সোহাগের অভিমানের কারণ। সোহাগের মনে হয়, প্রেমের কাছে এখন অপরাধী ধরার নেশা তার ভালোবাসার চেয়েও বড়।
আজ সকালেও সেই একই চেনা দৃশ্য। প্রেম তড়িঘড়ি করে ইউনিফর্ম পরে রেডি হচ্ছে অফিসে যাওয়ার জন্য। সোহাগ জানলার ধারে মুখ ভার করে বসে আছে। প্রেম ওর পাশে গিয়ে ধীরলয়ে বসল। সোহাগের কাঁধে হাত রেখে নরম সুরে জিজ্ঞেস করল
-“কী হয়েছে তোমার? এতক্ষণ ধরে কত কথা বললাম তোমার সাথে কিন্তু তুমি একটা কথাও বললে না?”
সোহাগ ঝট করে কাঁধ থেকে প্রেমের হাতটা সরিয়ে দিল। অভিমানী স্বরে বলল
-“আমার কিছু হয়নি। তোমার তো দেরি হয়ে যাচ্ছে, তুমি অফিস যাও। চোর-ডাকাতরা তো তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছে!”
প্রেম এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোহাগের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
-“বলো কী করব? কাজটা তো আমাকেই করতে হবে। দেশ আর দশের দায়িত্ব কি অস্বীকার করতে পারি?”
সোহাগ এবার ঘুরে তাকাল, চোখের কোণে নোনা জল চিকচিক করছে।
-“আমি কি তোমাকে কাজ করতে বারণ করেছি? তুমি যাও না, ভালোভাবে যাও।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই সোহাগের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল তানভীর নাম। সোহাগ চোখের জল মুছে কলটা রিসিভ করল
-“হ্যাঁ তানভী, বলো।”
ওপার থেকে তানভীর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ ভেসে এল
-“সোহাগ দিদিভাই! কাল তো আর্ভিক ভাইয়ের জন্মদিন। আমি একটা দারুণ সারপ্রাইজ প্ল্যান করেছি। উনি তো এখন গুজরাটে, অফিসের কাজে ওখানে গিয়েছেন। কাল বিকেলে ফেরার কথা। আমি কাল বিকেলেই একটা ছোট অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। তোমরা সবাই এসো কিন্তু!”
সোহাগ প্রেমের দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলল
-“তানভী, আমি আর রিকি তো যাবই। কিন্তু তোমার প্রেম দাদার কথা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। ওনার যা ব্যস্ততা…”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই প্রেম সোহাগের হাত থেকে ফোনটা একপ্রকার ছিনিয়েই নিল। চোখেমুখে দুষ্টুমি মাখা হাসি ফুটিয়ে ওপার থেকে তানভীকে বলল
-“না না তানভী, তোমার দিদিভাই ভুল বলছে। আমি অবশ্যই আসব। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আর্ভিকের জন্মদিন আর আমি থাকব না, তা কি হয়?”
তানভী ওপার থেকে খিলখিল করে হেসে উঠল।
-“আচ্ছা প্রেম দাদা, মনে করে আসবেন কিন্তু!”
কলটা কেটে গেল। সোহাগ অবাক হয়ে প্রেমের দিকে তাকাল। প্রেম মুচকি হেসে সোহাগের কপালে একটা আলতো চুমু খেয়ে বলল
-“অভিমান কোরো না আর, আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি এসে তোমাকে নিয়ে শপিং করতে যাবে।”
সোহাগের ঠোঁটের কোণে দীর্ঘ সময় পর এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
১৫ ই আগস্টের সকালটা শুরু হয়েছিল এক পশলা বৃষ্টির স্নিগ্ধতা নিয়ে। চৌধুরী নিবাসের বড় ছেলে, তথা আর্ভিকের জন্মদিন। শহর জুড়ে হয়তো তাকে অনেকেই ভয় পায়, কিন্তু এই চার দেয়ালের ভেতর সে শুধুই এক আদরের সন্তান এবং তানভীর ‘আর্ভিক ভাই’।
ভোর থেকেই তানভীর ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। সারা বাড়িটা সে একাই সাজিয়েছে। সাদা আর নীল অর্কিডের মিশেলে বসার ঘরটা এখন এক অপার্থিব রূপ নিয়েছে। রাখী রায়চৌধুরীও অবাক হয়ে দেখছিলেন মেয়েটার কর্মতৎপরতা। তানভী রান্নাঘরে গিয়ে রাখী রায়চৌধুরীর হাতে হাত মিলিয়ে আর্ভিকের সব পছন্দের পদ সাজিয়েছে। তবে একটা জিনিসে ও কাউকে হাত দিতে দেয়নি—সেটা হলো আর্ভিকের পছন্দের পায়েস। নিজের হাতে গোবিন্দভোগ চাল আর ঘন দুধের সেই পায়েস যত্ন করে বানিয়ে রেখেছে।
রুদ্র বাবু আর দোয়েল ব্যানার্জীকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও অফিসের জরুরি কাজের চাপে তাঁরা আসতে পারেননি। তবে ঋষি গিয়ে তৃষাণকে নিয়ে এসেছে। ছোট তৃষাণ তার প্রিয় আর্ভিক ভাইয়ের জন্য নিজের হাতে একটা সুন্দর ‘বার্থডে কার্ড’ বানিয়েছে, যাতে রংপেন্সিলের ছোঁয়ায় ফুটে উঠেছে একরাশ ভালোবাসা। তানভী শুনেছে, আর্ভিক দোকানের অতিরিক্ত ক্রিম দেওয়া কেক একদম পছন্দ করে না। তাই সে নিজের হাতে বানাচ্ছে চকলেট ফ্লেভারের ফ্রুট কেক।
রান্নাঘরের কাজ সেরে তানভী নিজের রুমে গিয়ে বসল। ওর হাতে একটা ধবধবে সাদা রুমাল। সূঁচ-সুতো নিয়ে ও তাতে ফুটিয়ে তুলছে ‘আর্ভিক’ নামটা। সাথে ছোট ছোট নকশা। তানভী কোনোদিন সেলাই শেখেনি, এটাই ওর প্রথম প্রচেষ্টা। এই একটা নাম ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে কতবার যে সূঁচের ডগা ওর আঙুল ফুঁড়ে এপার ওপার হয়ে গেছে তার ঠিক নেই। তানভী মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল
“আর্ভিক ভাই আমার সব পছন্দ জানেন, অথচ আমি আজও ওনার পছন্দ গুলো জেনে উঠতে পারলাম না।”
ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর দুটো। আর্ভিকের ফেরার কথা ছিল ঠিক এই সময়েই। কিন্তু সদর দরজায় কোনো আওয়াজ নেই। অস্থির হয়ে তানভী নিচে নেমে অভিক সাহেব আর রাখী রায়চৌধুরীর কাছে গেল। ঋষি সেখানে বসে ফোন ঘাটছিল। তানভীকে উতলা দেখে ঋষি ম্লান হেসে বলল
-“বোনু, ভাইয়ার ফ্লাইট লেট হয়েছে। আসতে আসতে সন্ধ্যে ছ’টা বেজে যাবে।”
তানভীর মুখটা মুহূর্তেই মেঘলা হয়ে গেল। অভিমানী মনে গজগজ করতে করতে ও সোফায় গিয়ে ধপ করে বসল।
ঘড়ির কাঁটা যেন আজ মন্থর গতিতে চলছে। বিকেল পাঁচটা নাগাদ রিকি, মেঘাদ্রি, নীলাদ্রি এবং প্রেম-সোহাগ এসে পৌঁছাল। রাখী রায়চৌধুরী আর অভিক সাহেবের সাথে কুশল বিনিময় করে ওরা তানভীর কাছে গেল। সবাই ভেবেছিল তানভীকে ডেকোরেশনে সাহায্য করবে, কিন্তু বসার ঘরের নিখুঁত সাজসজ্জা দেখে মেঘাদ্রি অবাক হয়ে বলল
-“কিরে তানভী! তুই একাই এই সব করেছিস? আমাদের জন্য তো কিছু করারই রাখিসনি!”
তানভী মৃদু হেসে বলল,
-“ঠিক আছে, তোরা বোস। আর্ভিক ভাই এক্ষুনি চলে আসবেন।”
সন্ধ্যে ৬টা বেজে ১০ মিনিট। চৌধুরী নিবাসের মেইন গেট দিয়ে আর্ভিকের কালো গাড়িটা প্রবেশ করল। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি ওর চোখেমুখে স্পষ্ট। ট্রলি ব্যাগটা টেনে আর্ভিক সদর দরজার সামনে দাঁড়াল। কলিংবেল বাজাতে গিয়ে দেখল দরজাটা আলগা করে ভেজানো রয়েছে। আর্ভিক কিছুটা অবাক হলো। বাড়ির দরজা এভাবে খোলা রেখে সবাই কোথায় গেল? ভেতরে ঢুকতেই ওর বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। কোনো সাড়াশব্দ নেই। আর্ভিক একটু বিচলিত গলায় ডাকল
-“মা! তানভী! কোথায় তোমরা?”
কোনো উত্তর নেই। আর্ভিক দেওয়াল হাতড়ে লাইটের সুইচটা টিপতেই মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকার চিরে জ্বলে উঠল আলো। চারপাশ থেকে সবাই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল
-“হ্যাপি বার্থডে টু ইউ!”
তৃষাণ আর ঋষি সজোরে দুটো কালার-সেল ফাটাল। রুপোলি আর সোনালি কাগজের কুচিগুলো আর্ভিকের গায়ে মাথায় ঝরে পড়ল। আর্ভিক স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঋষি ওর হাত থেকে ট্রলি ব্যাগটা নিয়ে বলল
-“সারপ্রাইজ ভাইয়া!”
আর্ভিক বিস্ময় কাটিয়ে ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল
-“এসব কে করল? কার পরিকল্পনা?”
সবাই একসাথে আঙুল দিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তানভীকে দেখিয়ে দিল। আর্ভিক একমুহূর্ত নিষ্পলক চোখে তানভীর দিকে তাকিয়ে রইল। আর্ভিকের প্রিয় রং নীল তানভী সেই মতো হালকা নীল রঙের একটা শাড়ি পড়েছে। শাড়িতে তানভীকে আজ অপূর্ব লাগছে। আর্ভিক ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ওর কাছে। তানভীর মাথার চুলগুলো একটু আলুথালু করে দিয়ে মায়াবী গম্ভীর কণ্ঠে বলল
-“থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ, অর্কিড।”
রাখী রায়চৌধুরী এগিয়ে এসে আর্ভিক কে বললেন
-“বাবা, যা ফ্রেশ হয়ে আয়। তারপর কেক কাটা হবে।”
আর্ভিক মায়ের কথায় হাসিমুখে সিঁড়ি দিয়ে উপরে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল। ওর ক্লান্তি যেন এক নিমেষেই ম্যাজিকের মতো গায়েব হয়ে গেছে।
আর্ভিক নিজের রুমের দরজাটা খুলতেই ওপর থেকে তাজা গোলাপের পাপড়ি বৃষ্টির মতো ওর ওপর ঝরে পড়ল। মেঝের দিকে চোখ যেতেই দেখল, চমৎকার করে সাজানো হরেক রঙের ফুল দিয়ে লেখা
‘হ্যাপি বার্থডে আর্ভিক ভাই’
আর্ভিকের বুঝতে বাকি রইল না, এই নিভৃত আয়োজনের কারিগর তার সপ্তদশী। আর্ভিক আপনমনেই এক চিলতে হাসল।
ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই তানভী পরম আবেশে আর্ভিকের চোখ দুটো নিজের দু-হাতে চেপে ধরল। পা টিপে টিপে ওকে নিয়ে গেল বাড়ির পেছনের গার্ডেনে। আর্ভিকের তাজা ফুল খুব পছন্দ। তাই তানভী পুরো বাগানটাকে ফুলের স্বর্গরাজ্য বানিয়ে তুলেছে। পায়ের নিচে নরম ঘাসের ওপর ছড়িয়ে আছে অসংখ্য লাল গোলাপের পাপড়ি আর রঙিন বেলুন।
তানভী হাতের বাঁধন আলগা করল, আর্ভিক আস্তে আস্তে চোখ মেলে সামনের দৃশ্য দেখে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইল। ওর দু-চোখে তখন বিস্ময় আর গভীর তৃপ্তি। আর্ভিক এক পলক তানভীর দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে জানাল
-“ধন্যবাদ।”
সবাই মিলে এবার কেক কাটার জায়গায় জড়ো হলো। আর্ভিক যখন চকোলেট ফ্রুট কেকটা কাটছিল, চারপাশ থেকে ‘হ্যাপি বার্থডে’ গানের কলি গুঞ্জরিত হয়ে উঠল। রাখী রায়চৌধুরী পাশে এসে দাঁড়ালেন। আর্ভিক কেকের প্রথম পিসটা হাতে নিল, রাখী রায়চৌধুরী মৃদু হেসে বললেন
-“জানিস বাবা, গুল্লু আজ সকাল থেকে তোর জন্য কী খাটাখাটনিটাই না করেছে! এই কেকটা ও নিজের হাতে তোর জন্য বানিয়েছে।”
আর্ভিক তানভীর দিকে মোহিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল
-“তাহলে তো প্রথম ভাগ পাওয়ার অধিকার তোরই সবথেকে বেশি।”
এই বলে আর্ভিক কেকের পিসটা তানভীর দিকে বাড়িয়ে ধরল। কিন্তু তানভী না-সূচক মাথা নেড়ে আর্ভিকের হাত ধরে প্রথমে রাখী রায়চৌধুরী এবং পরে অভিক সাহেবকে কেক খাওয়াল। তানভীর এমন আচরণ দেখে আর্ভিক মৃদু হাসলো।
এরপর আর্ভিক আর তানভী একে অপরকে কেক খাইয়ে দিল। এরপর আর্ভিক একে একে প্রেম, নীলাদ্রি, সোহাগ, রিকি, মেঘাদ্রি, তৃষাণ, ঋষি সবাইকে কেক খাওয়ালো। প্রেম আর নীলাদ্রি আর্ভিক কে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করল ও কী উপহার চায়, আর্ভিক তৃপ্তির হাসি হেসে বলল
-“ভগবানের দয়ায় আমার কাছে সব আছে। শুধু তোদের এই বন্ধুত্বটুকু শেষ অবধি সাথে থাকলে হবে।”
নীলাদ্রি আর প্রেম একসাথে বলে উঠল
-“নিজেদের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোর পাশে থাকব ভাই।”
তৃষাণ ওর ছোট হাতে বানানো সেই কার্ডটা আর্ভিকের হাতে তুলে দিল। আর্ভিক সেটা খুলে দেখল সেখানে লেখা আছে
“Arvik Bhaiya you are my best friend and also a best brother in the world. Love you Bhaiya ❤️.”
আর্ভিক তৃষাণকে কাছে টেনে নিয়ে ওর গালে একটা গভীর স্নেহের চুমু খেল।
এরপর রাতের খাবারের পালা। রাখী রায়চৌধুরী আর তানভী মিলে এক এলাহী আয়োজন করেছেন। আর্ভিকের সব কটি প্রিয় পদ সেখানে উপস্থিত। তবে সবার আগে রাখী রায়চৌধুরী এক চামচ পায়েস আর্ভিকের মুখে তুলে দিলেন। পায়েসটা জিভে ঠেকতেই আর্ভিক ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল
-“পায়েসটা কে বানিয়েছে?”
রাখী রায়চৌধুরী তানভীকে দেখিয়ে দিলেন, আর্ভিক হঠাৎ গম্ভীর মুখে ঘোষণা করল
-“ঠিক আছে, এই পায়েসের পুরো পাত্রটা আমাকে দাও। এই পায়েস আমি একাই খাব, কাউকে এক ফোঁটা দেব না।”
সবাই তো অবাক! তানভী অবাক হয়ে বলল
-“এতটা পায়েস আপনি একা খাবেন আর্ভিক ভাই।”
-“হুমম। আমার জন্য বানিয়েছিস আমি খাব না।”
-“আপনার যতটা ইচ্ছে খান, কিন্তু সবাইকে দেব না কেন?”
আর্ভিক অনড়। ও কারোর কথা না শুনে পায়েসের পাত্রটা নিয়ে সটান নিজের রুমে চলে গেল। সবাই এই পাগলামি দেখে হাসাহাসি করলেও আর্ভিক যখন নিচে নেমে এল, ও আর কোনো কথা বলল না।
রাতের ভোজ শেষে ছাদের খোলা চত্বরে সবাই বসে আড্ডা দিচ্ছে সেখানে চাঁদের আলো এসে পড়েছে, সবাই আর্ভিককে গান গাওয়ার জন্য ঘিরে ধরল। আর্ভিক মৃদু হেসে নিজের গিটারটা হাতে তুলে নিয়ে বলল
-“গান আমি গাইতে পারি, তবে একটা শর্ত আছে। তোদের সবাইকে আমার গানের সুরের সাথে গলা মেলাতে হবে।”
সকলে সমস্বরে রাজী হতেই পরিবেশটা এক আনন্দঘন আবেশে ভরে উঠল। আর্ভিকের আঙুলের ছোঁয়ায় গিটারের তারে টুংটাং শব্দে এক অপূর্ব ঝঙ্কার তুলল সে। গভীর গম্ভীর কণ্ঠে গেয়ে উঠল
“প্রেমেরই নীল ইশারাতে এলোমেলো হাওয়া
মনেরই মাঝে জাগালো আরো আরো চাওয়া
আগুন আগুন ভালোবাসা
নেভালে যে নেভে না….”
গানের প্রতিটি কলিতে যেন এক অদৃশ্য অনুরাগের ছোঁয়া মিশে আছে। সুরের মূর্ছনায় পুরো ছাদ মেতে উঠেছে, আর্ভিকের চোখের তীক্ষ্ণ অথচ মায়াবী চাউনি বারবার তানভীর ডাগর চোখে গিয়ে থমকে যাচ্ছে। তানভীও সেই সুরের ইন্দ্রজালে আবিষ্ট হয়ে লজ্জিত মুখে আর্ভিকের দিকে তাকাচ্ছে। দুজনের এই নিভৃত চোখাচোখি যেন হাজারো না বলা কথা গানের তালের সাথে বাতাসে ভাসিয়ে দিচ্ছে।
রাতের আড্ডার শেষ করে রিকি, মেঘাদ্রি, নীলাদ্রি, সোহাগ, প্রেম বিদায় নিল।
রাত তখন গভীর। তানভী রান্নাঘরের বোতলে জল ভরতে গিয়ে হঠাৎ দেখল একটা বাটিতে একটুখানি পায়েস পড়ে আছে। কৌতূহলবশত তানভী একটা চামচ নিয়ে সেখান থেকে একটু খানি পায়েস মুখে দিল। মুখে দিতেই ওর সারা শরীর রি-রি করে উঠল। ছিঃ! ও কি পায়েসে চিনির বদলে নুন ঢেলে দিয়েছে? তানভীর মনে পড়ল, জন্মদিনের পায়েস মায়েদের খেতে নেই তাই রাখী রায়চৌধুরী খান না ওনার সাথে অভিক সাহেবও খান না। ঋষি তখন তৃষাণ কে আনতে গিয়েছিল। আর সে তাড়াহুড়ো করে পায়েসটা চেখে দেখেনি।
তানভী বুঝতে পারল, আর্ভিক ভাই ওই সময় কেন পায়েসের পাত্রটা নিয়ে ওভাবে চলে গিয়েছিলেন, যাতে বাড়ির অন্য কেউ বা বন্ধুরা এই নুন মেশানো পায়েস খেয়ে তানভীকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করতে না পারে। এই নুনে বিষ হয়ে যাওয়া পায়েস টা আর্ভিক ভাই কত তৃপ্তির সাথে খেলেন।
নিজের ওপর একরাশ রাগ নিয়ে তানভী সেই সেলাই করা রুমালটা হাতে নিয়ে আর্ভিকের রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আর্ভিক তখন বিছানা ঠিক করছিল। ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আর্ভিক বলল
-“বাইরে কেন? ভেতরে আয়।”
তানভী গুটি গুটি পায়ে ভেতরে ঢুকে কাঁপা গলায় বলল
-“সরি আর্ভিক ভাই। আমার জন্য আপনার স্পেশাল দিনটা একদম মাটি হয়ে গেল। আমি পায়েসে ভুল করে নুন দিয়ে ফেলেছিলাম। আসলে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে এমন হয়ে গেছে।”
তানভীর চোখের পাতা ভিজে এল নোনা জলে। আর্ভিক ধীরপায়ে এগিয়ে এসে তানভীর দুই বাহু আলতো করে আঁকড়ে ধরল। ওর মনে মনে তখন একটাই কথা— ‘আরে পাগলী, তুই যদি বিষও দিস, আমি সেটাও হাসিমুখে খেয়ে নেব’। আর্ভিক শান্ত স্বরে বলল
-“কাঁদছিস কেন? আর তোকে কে বলেছে তোর জন্য আমার জন্মদিনটা মাটি হয়ে গেল। এবারের জন্মদিনটা আমার জীবনের সবথেকে স্পেশাল ছিল। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।”
তানভী অবাক চোখে চাইল। মানুষটার প্রতি ওর দুর্বলতা যেন প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে। ও নিজের হাতে তৈরি সেই রুমালটা আর্ভিকের দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল
-“আপনার পছন্দ সম্পর্কে আমার জানা নেই, তাই এটা বানিয়েছি।”
আর্ভিক রুমালটা হাতে নিয়ে দেখল কী যত্নে সূঁচ ফুটিয়ে ফুটিয়ে ওর নাম লেখা হয়েছে। ও আবেগাপ্লুত হয়ে বলল
-“সব দামি গিফটের চেয়েও এটা আমার কাছে অমূল্য সম্পদ।”
-“সামান্য একটা কাপড়ের টুকরো আপনার কাছে অমূল্য সম্পদ?”
-“তুই বুঝবি না।”
তানভী আর্ভিককে জিজ্ঞেস করল
-“আর্ভিক ভাই আপনার কী গিফট চাই বলুন না প্লিজ।”
আর্ভিক হেসে তানভীর অগোছালো চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল
-“সামনের মাসে তোর পরীক্ষা, ভালো রেজাল্ট করিস—এটাই আমার শ্রেষ্ঠ উপহার হবে।”
ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৪৭+৪৮
এরপর আর্ভিক আলমারি থেকে একটা সুন্দর শপিং ব্যাগ বের করে তানভীর হাতে দিল। তানভী খুলে দেখল সেখানে একটা চমৎকার ‘চানিয়া চোলি’ রয়েছে। চানিয়া চোলি হলো একটি ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় পোশাক, যা মূলত গুজরাট ও রাজস্থানের নারীরা উৎসব, বিশেষ করে নবরাত্রিতে পরে থাকেন। এটি একটি লম্বা স্কার্ট (চানিয়া), ব্লাউজ (চোলি) এবং ওড়নার সমন্বয়। এটি সাধারণত উজ্জ্বল রঙের, এমব্রয়ডারি কাজের ও আরামদায়ক সুতির কাপড়ের হয়।
তানভীর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আর্ভিক কোমল কণ্ঠে বলল
-“সারাদিন অনেক খেটেছিস, এবার গিয়ে ঘুমিয়ে পড়।”
