Home ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫০

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫০

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫০
তানিশা ভট্টাচার্য্য

সেপ্টেম্বর মাস, ক্যালেন্ডারের পাতায় ১৬ তারিখটা লাল কালিতে গোল করে দাগানো—তানভীর স্কুলে উচ্চ মাধ্যমিকের প্রি-টেস্ট পরীক্ষা। হাতে মাত্র দু’দিন সময়। কিন্তু তানভীর সামনে বইখাতা খোলা থাকলেও ওর মন পড়ে আছে অন্য কোনো এক গহীনে। বিছানায় অ্যাকাউন্টেন্সির প্রবলেম বই আর সাদা খাতাটা অবিন্যস্তভাবে পড়ে আছে। খাতার পাতায় কলমের আঁচড় পড়ার কথা ছিল হিসেবের অঙ্কের, কিন্তু সেখানে অদৃশ্য কালিতে লেখা হচ্ছে কেবল একটিই নাম “আর্ভিক ভাই”।

তানভীর ধ্যান-জ্ঞান, স্বপ্ন-জাগরণ জুড়ে এখন শুধুই আর্ভিক ভাই। আর্ভিক ভাইয়ের গম্ভীর কণ্ঠস্বর, তার হাঁটাচলা, এমনকি তার সামান্য শাসনটুকুও তানভীরের মনে অদ্ভুত এক আলোড়ন তৈরি করে। সে আজ পড়ার বদলে অবিরত আর্ভিকের কথা ভেবেই চলেছে, আপন মনে বিড়বিড় করছে তাকে নিয়ে হাজারো এলোমেলো কল্পনা করছে। এই মোহের ঘোরে সে এতটাই আচ্ছন্ন যে, আর্ভিকের গাড়ির শব্দটাও তার কানে পৌঁছাল না।
অফিস থেকে আজ একটু জলদিই ফিরেছে আর্ভিক। হাতে তার নানারকমের স্ট্রিট ফুডের প্যাকেট, যার সুগন্ধে ম ম করছে চারপাশ। কলিংবেলের শব্দে রান্নাঘর থেকে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলেন রাখী রায়চৌধুরী। আর্ভিক রাখী রায়চৌধুরীর হাতে খাবারের প্যাকেট গুলো দিয়ে শান্ত স্বরে বলল
-“মা, এই নাও তুমি এগুলোকে বেড়ে রাখো, আমি একটু ফ্রেশ হয়ে তানভীকে ডেকে নিয়ে আসছি। একসাথে খাবো।”

মাকে প্যাকেট গুলো দিয়ে আর্ভিক গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে যখন সে তানভীর রুমের সামনে দাঁড়ালো, দেখল দরজাটা সামান্য খোলা আছে। এক চিলতে আলো ঠিকরে আসছে বাইরে। আর্ভিক আলতো হাতে দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই থমকে গেল।
রুমের মধ্যে তানভী বিছানায় বসে আছে ঠিকই, কিন্তু বইয়ের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। সে ঘোরের মাথায় আর্ভিককে নিয়ে এমন কিছু হাবিজাবি কথা বিড়বিড় করে বলে চলেছে, যা আর্ভিকের পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব। তার প্রতিটি কথায় ফুটে উঠছে এক নিষিদ্ধ আবেগের প্রকাশ।
মুহূর্তেই আর্ভিকের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। শান্ত চোখের মণি দুটো রাগে লাল টকটকে হয়ে উঠল। তার ধমনিতে যেন গরম রক্ত টগবগ করে ফুটতে শুরু করেছে। অত্যন্ত ক্রোধে ধুপধাপ পা ফেলে সে তানভীর একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
আচমকা সামনে যমদূতের মতো আর্ভিককে দেখে তানভীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমতা আমতা করে বলতে চাইল

-“আ… আর্ভিক ভাই, আপনি…”
কথাটা শেষ করার সুযোগ পেল না সে। তার আগেই বাতাসের বেগে আর্ভিকের হাতটা উঠে এল এবং সজোরে একটা চড় আছড়ে পড়ল তানভীর গালে। শব্দের প্রতিধ্বনি যেন সারা রুমে ছড়িয়ে পড়ল। তানভী নিজেকে সামলে ওঠার আগেই দ্বিতীয় চড়টা তার গালে পড়ল। এবার আর ভারসাম্য ধরে রাখতে পারল না সে; ছিটকে বিছানা থেকে মেঝের ওপর পড়ে গেল।
কষ্টে, অপমানে আর তীব্র শারীরিক যন্ত্রণায় তানভীর দু’চোখ ছাপিয়ে জল এল। সে কাঁপতে কাঁপতে বিছানার ধার ধরে উঠে দাঁড়াল। তার ছলছল নয়ন জোড়া আর্ভিকের দিকে নিবদ্ধ, যেখানে অভিযোগ আছে কিন্তু ভাষা নেই। আর্ভিক সিংহের মতো হুঙ্কার দিয়ে এগিয়ে এল। তানভীর দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে চিৎকার করে বলল
-“এই মেয়ে! দু’দিন বাদে পরীক্ষা আর পড়াশোনার নামে এইসব করছিস? তোকে এই বাড়িতে কেন আনা হয়েছে? পড়ার জন্য, নাকি এসব প্রেম-পিরিত করার জন্য? ইচ্ছা করছে তুলে একটা আছাড় দিয়ে সব হাড়গোড় গুঁড়ো করে দিই!”
আর্ভিকের রাগী কণ্ঠস্বর দেয়াল ভেদ করে বাইরে চলে যাচ্ছিল। সে রাগী কন্ঠে বলল

-“ভালোবাসার কী বুঝিস তুই? এই সব কারণে পরীক্ষার রেজাল্টটা একবার খারাপ হোক, তারপর তোকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তোর বাড়িতে পাঠিয়ে দেবো!”
তীব্র রাগ নিয়ে তানভীকে এক ঝটকায় দূরে সরিয়ে দিল আর্ভিক। তারপর রুম থেকে গটগট করে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল
-“শুনে রাখ, আমি তোকে ভালোবাসি না! তোর প্রতি আমার যা কিছু যত্ন দেখেছিস ওগুলো সব আমি কর্তব্যের খাতিরে করেছি।”

আর্ভিক চলে যাওয়ার পর তানভী পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর যেন প্রাণহীন কোনো পুতুলের মতো ধুপ করে মেঝের ওপর বসে পড়ল সে। তার দু’চোখ বেয়ে অবিরল ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। যে আর্ভিক ভাইকে নিয়ে সে একটু আগেও স্বপ্নের জাল বুনছিল, সেই আর্ভিক ভাই-ই আজ তার মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে দিয়ে গেল।
তানভীর রুম থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এল আর্ভিক। তার ভেতরে আগ্নেয়গিরির লাভা ফুটছে। সোজা নিজের রুমে ঢুকে সজোরে দরজাটা বন্ধ করে দিল—সেই আওয়াজ যেন পুরো বাড়িতে একটা কম্পন সৃষ্টি করল। আর্ভিক রাগের মাথায় রুমের আসবাবপত্র তছনছ করতে শুরু করল। বেড সাইড টেবিলে রাখা শোপিস, সাজানো ফুলদানি, এমনকি ফ্রেমে বাঁধানো ছবিগুলো একটা একটা করে আছড়ে ভাঙতে থাকল সে। কাঁচ ভাঙার ঝনঝন শব্দে রুমটা রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। পুরো রুম ওলটপালট করে দিয়ে, ক্লান্ত আর উত্তেজিত আর্ভিক একসময় ধুপ করে বিছানায় বসে পড়ল। তার বুকের ধড়ফড়ানি তখনও কমেনি, চিবুক শক্ত হয়ে আছে রাগে।

অন্যদিকে, তানভী যেন এক জীবন্ত পাথরের মূর্তি। আর্ভিক চলে যাওয়ার পর থেকে সে ঠিক সেভাবেই মেঝেতে বসে আছে। গাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু তার ঠোঁট থেকে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। যেন এই বাড়ির অদৃশ্য কোনো নিয়ম তাকে বলে দিয়েছে—এখানে শব্দ করে কান্না করা বারণ। এক অসহ্য যন্ত্রণায় তার দম বন্ধ হয়ে আসছে, মনে হচ্ছে কেউ যেন ভেতর থেকে তার গলাটা টিপে ধরেছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার।
আর্ভিক ভাই তাকে ভালোবাসে না এই কথাটা তার বুকে তিরের মতো বিঁধছে। তখন তার মনে পড়ল আর্ভিকের গলায় “T” অক্ষরের লকেটটার কথা আর্ভিক ভাই বলেছিল তার বউয়ের নামের প্রথম অক্ষর এটা, আর্ভিক ভাইয়ের জীবনে অন্য কেউ আছে এটা ভেবেই তানভীর বুকটা হু হু করে উঠলো।
হঠাৎ অস্পষ্ট দৃষ্টিতে তার নজর পড়ল ঘরের কোণে রাখা গিটারটার দিকে। সে শুনেছে, মনের গহীনে জমে থাকা কষ্ট নাকি সুরের ডানায় ভর করে উড়িয়ে দিলে বুকটা একটু হালকা হয়। তানভী ধীর পায়ে গিয়ে গিটারটা তুলে নিল। তারপর আবার দেওয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে এসে বসল সে। উশকোখুশকো চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে, আর ফর্সা গালে স্পষ্ট হয়ে আছে আর্ভিকের হাতের পাঁচ আঙুলের লালচে দাগ। কাঁপাকাঁপা আঙুলে গিটারের তারে টুংটাং শব্দ তুলল সে। তারপর ভাঙা গলায় গাইতে শুরু করল সেই অব্যক্ত যন্ত্রণার গান

“তুমি না ডাকলে আসব না
কাছে না এসে ভালোবাসব না
দূরত্ব কি ভালোবাসা বাড়ায়?
না কি চলে যাওয়ার বাহানা বানায়?
দূরের আকাশ নীল থেকে লাল
গল্পটা পুরনো
ডুবে ডুবে ভালোবাসি
তুমি না বাসলেও আমি বাসি…”
গানের সুর যেন ঘরের দেয়ালগুলোতে আছড়ে পড়ছিল। একটু থেমে তানভী একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার বুক চিরে আসা সেই দীর্ঘশ্বাসে ছিল এক আকাশ হাহাকার। গিটারে আবার সুর তুলল সে, এবার সুরটা আরও একটু গভীর, আরও একটু কাতর

“এটা কি ছেলেখেলা আমার এই স্বপ্ন নিয়ে?
চাইলে ভেঙে দেবে গড়ে দেবে ইচ্ছে হলে
আমি গোপনে ভালোবেসেছি
বাড়ি ফেরা পিছিয়েছি
তোমায় নিয়ে যাব বলে
একবার এসে দেখ
এসে বুকে মাথা রেখ
ভুলিয়ে দেব চুলে রেখে হাত
দূরের আকাশ নীল থেকে লাল
গল্পটা পুরনো
ডুবে ডুবে ভালোবাসি
তুমি না বাসলেও আমি বাসি…”

গান শেষ করে তানভী স্তব্ধ হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর এক অদ্ভুত শান্ততায় সে উঠে দাঁড়াল। ওড়না দিয়ে চোখের জল আর নাকের ডগা মুছে নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল সে। গালে সেই চড়ের দাগটা তখনও দৃশ্যমান। নিজেকেই লক্ষ্য করে দৃঢ় স্বরে সে বলল
-“আর্ভিক ভাই, আপনি চান আমি ভালো করে পড়াশোনা করি, তাই না? ঠিক আছে, তবে আপনার ইচ্ছাটাই পূর্ণ হবে। আজকের পর থেকে আমার মুখে আর কোনোদিন আপনি ‘ভালোবাসি’ শব্দটা শুনতে পাবেন না। আজ থেকে আমার ধ্যান-জ্ঞান হবে শুধু পড়াশোনা। কখনো আর আপনার কাছে গিয়ে আমার ভালোবাসা প্রকাশ করতে যাব না।”
একটু থেমে মনের গহীনে সে আবার বলে উঠল
-“হয়তো মনে মনে আপনাকে সারা জীবন ভালোবেসে যাব। কারণ আপনিই আমার প্রণয়ের প্রথম পুরুষ। আপনি আমাকে নাই বা ভালোবাসলেন তাতে কী! আমি তো ভালোবাসি।আপনার জায়গা আর কেউ নিতে পারবে না কোনোদিন। আমি আপনাকে দূর থেকেই ভালোবাসব, কিন্তু কখনো আপনার সামনে গিয়ে তা আর বলব না।”
চোখের কোণে জমে থাকা শেষ জলবিন্দুটা মুছে নিয়ে তানভী ওয়াশরুমে গেল। চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে নিজেকে পুরোপুরি শান্ত করল সে। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে পড়তে বসল। এক হাতে গালটা ছুঁয়ে অন্য হাতে কলম ধরল। বাইরে গুমোট রাত, কিন্তু তানভীর মনে তখন এক কঠিন সংকল্পের পাহাড় জমেছে। সে বইয়ের পাতায় ডুব দিল, যেখানে আর কোনো স্বপ্নের স্থান নেই, আছে শুধু রূঢ় বাস্তব আর ভবিষ্যতের যুদ্ধ।

রান্নাঘরের ব্যস্ততার মাঝে রাখী রায়চৌধুরীর কণ্ঠস্বর সপ্তমে চড়েছে। ডাইনিং টেবিলে আর্ভিকের আনা খাবার গুলো প্লেটে সাজানো, কিন্তু যাদের জন্য এই আয়োজন, তাদের দেখা নেই। বিরক্তি আর স্নেহের সংমিশ্রণে তিনি চিৎকার করে ডাকছেন
-“গুল্লু, সিনু! কিরে তোরা আয় না! খাবার তো বেড়ে রেখেছি, সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কি করছিস তোরা? আসবি তো নাকি?”
রান্নাঘরের ভ্যাপসা গরমে আর একটানা ডাকতে ডাকতে তিনি ক্লান্ত। ঠিক সেই মুহূর্তে অফিসের ব্যাগ কাঁধে ঋষি সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। ক্লান্ত ঋষিকে দেখেই রাখী রায়চৌধুরী বললেন

-“ঋষি বাবা, একটু শুনে যা তো।”
মায়ের ডাক শুনে ঋষি রান্না ঘরের দিকে গেল। রাখী রায়চৌধুরী বললেন
-“তুই তো উপরে যাচ্ছিস গুল্লু আর সিনুকে ডেকে দিস তো বাবা। তোর ভাইয়া কখন খাবারের প্যাকেট গুলো দিয়ে আসছি বলে উপরে গেল বলল খাবার গুলো বেড়ে রাখতে।ফ্রেশ হয়ে গুল্লু কে ডেকে আনবে, কিন্তু আর নামার নাম নেই। তুই একটু ওদের ডেকে নিচে নিয়ে আয়, আর নিজেও ফ্রেশ হয়ে আয়। আমি তোর জন্যও খাবার বাড়ছি।”
মায়ের কথায় ঋষি আর দ্বিরুক্তি করল না। সে প্রথমে নিজের রুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে কিছুটা হালকা হয়ে নিল। তারপর ধীর পায়ে প্রথমে গেল তানভীর রুমের দিকে। দরজায় মৃদু করাঘাত করে ভেতরে ঢুকতেই দেখল, তানভী অত্যন্ত মনোযোগের সাথে পড়ার টেবিলে ঝুঁকে আছে। ঋষি কাছে গিয়ে নরম স্বরে বলল
-“বোনু চল মা, খেতে ডাকছে।”

তানভী মুখ তুলল না। তার কণ্ঠস্বর ছিল ভাঙা এবং অস্বাভাবিক রকমের শান্ত। সে শুধু বলল
-“আমার খিদে নেই ভাইয়া, আমি এখন খাব না। সামনে পরীক্ষা, আমায় পড়তে হবে। তুমি যাও।”
ঋষির কানে তানভীর গলার স্বরটা কেমন যেন খসখসে ঠেকল। সে ভাবল, হয়তো পরীক্ষার দুশ্চিন্তায় মেয়েটা এমন করছে। আর তাকে বিরক্ত না করে ঋষি বেরিয়ে এল এবং পা বাড়াল আর্ভিকের রুমের দিকে।
আর্ভিকের রুমের সামনে এসে ঋষি দেখল দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ নয়, সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। সে ভাবল ভাইয়া হয়তো ভেতরেই আছে। রুমের আলো নেভানো দেখে সে অবাক হয়ে অন্ধকারের মাঝেই পা রাখল। সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়েই ঋষি স্তব্ধ হয়ে গেল।
পুরো রুমটা যেন একটা যুদ্ধক্ষেত্র। চারদিকে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে—ফটোফ্রেম, ফুলদানি, শোপিস সব ভেঙে চুরমার। আর সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝে বিছানায় জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে আর্ভিক। তার দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ। ঋষির উপস্থিতি টের পেয়ে আর্ভিক যখন ধীরলয়ে মুখ তুলল, ঋষি যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না।
আর্ভিকের সেই শান্ত, গম্ভীর দুই চোখ যেন জবা ফুলের মতো টকটকে লাল হয়ে আছে। তার বিধ্বস্ত চেহারা আর চোখের জলভেজা ছাপ দেখে ঋষি শিউরে উঠল। তার মুখ থেকে অস্ফুট স্বরে বের হলো

-“ভাইয়া!”
ঋষি অত্যন্ত সাবধানে মেঝের কাঁচের টুকরোগুলো ডিঙিয়ে আর্ভিকের পাশে গিয়ে বসল। আর্ভিকের কাঁধে হাত দিয়ে আস্তে করে জিজ্ঞেস করল
-“ভাইয়া, কি হয়েছে তোমার? আর রুমের এই অবস্থা কেন?”
ঋষির স্পর্শে আর্ভিকের ভেতরের জমাট বাঁধা পাহাড়টা যেন ধসে পড়ল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ঋষিকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠল। এক শক্ত পুরুষের এই করুণ কান্না দেখে ঋষির বুকটা কেঁপে উঠল। অনেক কষ্টে আর্ভিককে সামলাল ঋষি। কিছুক্ষণ পর কান্নার বেগ কমলে আর্ভিক রুদ্ধকণ্ঠে বলল
-“জানিস ঋষি, আজ আমি আবার ওর গায়ে হাত তুলেছি। আমি খুব খারাপ রে, খুব খারাপ! এবার ও আমাকে আবার ভুল বুঝবে…”
ঋষি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল। সে শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আর্ভিকের দিকে। তারপর শান্ত কন্ঠে বলল

-“কি হয়েছে ভাইয়া? সবটা আমাকে খুলে বলো।”
এরপর ধীরে ধীরে আর্ভিক সবটুকু ঘটনা খুলে বলল ঋষিকে। সব শোনার পর ঋষি বুঝল, বাইরে থেকে যাই মনে হোক না কেন, এরা দুজন দুজনকে নিজেদের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। কিন্তু পরিস্থিতির শিকার হয়ে আজ তারা দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে। আর্ভিক আবার বলতে শুরু করল, তার কণ্ঠে রাজ্যের হতাশা
-“ঋষি, ইচ্ছা করলে আমি এখনই ওকে নিজের করে নিতে পারি। ওকে ছেড়ে থাকতে আমারও কষ্ট হয়। সতেরো বছরের অপেক্ষা কি কম কথা? কিন্তু ওর বয়স যে বড্ড অল্প। ওর সামনে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। ও আমাকে বলেছিল ও আই.এস পুলিশ অফিসার হতে চায়। আমি কেমন করে ওর সেই স্বপ্নটা নিজের হাতে নষ্ট করি বল? এই বয়সে সংসারের জালে আটকে দিয়ে আমি ওর পড়াশোনার ক্ষতি করতে চাই না।”
আর্ভিকের কথার মাঝে ঋষি শান্ত স্বরে বলল

-“আসলে ভাইয়া, বোনুর বয়সটাই এমন। এই বয়সে একটু আবেগ আর ভুল তো হয়ই। তুমি চিন্তা করো না, বোনু তোমাকে সত্যিই ভালোবাসে। ও ঠিক তোমার জন্য অপেক্ষা করবে আর তোমাকে ভুল বুঝবে না। তুমি মাফিয়া কিং এভি রয়, তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে বোনুর স্বপ্ন পূরণ করবে কে ভাইয়া?”
ঋষির প্রবোধে আর্ভিক একটু ধাতস্থ হলো। সে চোখ মুছে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল
-“ঠিক বলেছিস ভাই! আমাকে ভেঙে পড়লে হবে না।”

ভোরের আলো জানলার পর্দা ভেদ করে প্রবেশ করল তানভীর রুমে। তানভীর ঘুম যখন ভাঙল সে নিজকে পড়ার টেবিলে আবিষ্কার করল। কালকে রাতে পড়তে পড়তে সে এখানেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তানভীর পেটের ভেতরটা খিদের জ্বালায় মোচড় দিয়ে উঠল। কাল সারারাত পেটে এক দানা অন্নও পড়েনি, কিন্তু এখন তার খাবার প্রয়োজন। মনের যন্ত্রণার চেয়েও শরীরের দাবি এখন প্রকট। তাই টেবিল ছেড়ে দ্রুত চোখ-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে সে নিচে নেমে এল। রান্নাঘরে রাখী রায়চৌধুরী তখন প্রাতরাশের তোড়জোড় করছিলেন। তানভীকে দেখে তিনি স্নেহমাখা স্বরে বললেন
-“গুল্লু, এসেছিস? কালকে রাতে খাওয়ার জন্য এতবার ডাকলাম এলি না। এখন যা তোর আর্ভিক ভাইয়াকে একবার ডেকে আন। কাল রাত থেকে ছেলেটাও কিছু খায়নি। তোরা দুজনে এলে আমি একসাথেই খাবারটা বেড়ে দেব।”
আর্ভিকের নামটা শুনেই তানভীর মনে কাল রাতের সেই কালবৈশাখী ঝড়টা আবার হানা দিল। তার সকালের প্রসন্ন মনে মুহূর্তেই কালো মেঘের ঘনঘটা হলো। আচমকা গালে হাত দিতেই যেন সেই চড়ের জ্বালাটা নতুন করে অনুভব করল সে।
এক অজানা ভয়ে তানভীর পা দুটো অবশ হয়ে এল। তাকে পাথরের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রাখী রায়চৌধুরী আবার তাড়া দিলেন

-“কি হলো রে? যা, দেরি করিস না।”
তানভী যেন এক যন্ত্রচালিত পুতুল। অনিচ্ছাসত্ত্বেও সে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। আর্ভিকের রুমের দরজার সামনে গিয়ে তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল কয়েক গুণ। ভেতরে ঢুকবে কি ঢুকবে না, এই দ্বন্দ্বে প্রায় পাঁচ মিনিট সে দরজার বাইরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। অবশেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, বুকের সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে সে দরজায় দুবার টোকা দিল। ভেতর থেকে কোনো সাড়া এল না। আর্ভিক তখন গভীর ঘুমে মগ্ন।
তানভী অতি সাবধানে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। রুমের ভেতরের দৃশ্য দেখে সে যেন এক পলকে অন্য জগতে চলে গেল। এসি বন্ধ, সিলিং ফ্যানটা শাঁ শাঁ শব্দে ঘুরছে। আর সেই হাওয়ায় আর্ভিকের কপালে এসে পড়ছে তার অবাধ্য চুল গুলো। আর্ভিক খালি গায়ে শুয়ে আছে, পরনে কেবল একটি কালো রঙের ট্রাউজার। ঘুমন্ত অবস্থায় এই কঠোর মানুষটাকে ঠিক যেন এক নিষ্পাপ শিশুর মতো দেখাচ্ছে। কে বলবে, এই মানুষটাই কাল রাতে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে তাকে প্রহার করেছিল?

তানভীরের মনটা এক লহমায় নরম হয়ে এল। তার ইচ্ছা করছিল না আর্ভিকের ঘুমটা ভাঙাতে। কিন্তু বড়মার আদেশ পালন করতেই হবে। সে ধীর পায়ে বিছানার একপাশে বসল। এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল আর্ভিকের মায়াবী মুখশ্রীর দিকে। অবচেতন মনেই তার হাতটা চলে গেল আর্ভিকের মাথায়। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে, পরম যত্নে কপালে এসে পড়া চুলগুলো সরিয়ে দিল। তারপর খুব নিচু স্বরে অনেকটা নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল
-“আপনি কেন আমার হলেন না আর্ভিক ভাই? আপনি আমার হলে কি খুব ক্ষতি হতো?”
কথাটা বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল তানভী। তারপর মনের অবাধ্য আবেগগুলোকে দমন করে আর্ভিককে ডাকতে শুরু করল

-“আর্ভিক ভাই… আর্ভিক ভাই, উঠুন।”
তানভীর ডাক শুনে আর্ভিকের ঘুমের রেশটুকু কেটে গেল। সে খুব ধীরে চোখ মেলল। তানভী ভাবল আর্ভিক হয়তো তাকে কিছু কথা শোনাবে, কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে আর্ভিক কিছুই বলল না। তানভীর জোর করে মুখে একটা ফিকে হাসি টেনে বলল
-“বড়মা আপনাকে নিচে ডাকছে, আসুন।”
আর্ভিক আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে আচ্ছন্ন স্বরে বলল
-“ঠিক আছে, তুই যা। আমি আসছি।”
তানভী রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই আর্ভিক উঠে বসল। আসলে আর্ভিক ঘুমানোর ভান করছিল, তানভীর হাতের স্পর্শ আর তার সেই আর্তনাদ মাখা প্রশ্নটা সে স্পষ্ট শুনেছে। তানভী চলে যেতেই আর্ভিকের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। সে শূন্য দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৪৯

-“তোর হলে কি ক্ষতি হতো বলছিস? ক্ষতিটা তো তোরই হতো রে পাগলী মেয়ে। তুই তো আমার এই ব্যাকুল হৃদয়ের একমাত্র প্রনয়িনী। আমি তো তোকে আমার হৃদয়ের ঠিক মাঝখানে আগলে রেখেছি। কিন্তু আমার হওয়া মানেই তো তোর ডানাগুলো ভেঙে এই সংসারের খাঁচায় বন্দি হওয়া। আমি চাই তুই আকাশে উড়বি, সাফল্যের শিখরে পৌঁছবি। আজ আমি তোর কাছে ভিলেন হয়েই থাকি তানভী, তাতে যদি তোর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হয়, তবে আমি সহস্রবার তোর ঘৃণা সহ্য করতে রাজি আছি। ভালোবাসা মানে শুধু কাছে পাওয়া নয় রে, ভালোবাসা মানে প্রিয় মানুষকে পূর্ণতা দেওয়া।”
আর্ভিকের কণ্ঠস্বর বুজে এল। নিজের আবেগকে আড়াল করতে সে দ্রুত বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল।

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫১