ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫১
তানিশা ভট্টাচার্য্য
সময় যেন এক বহমান নদী, যা কারও জন্য অপেক্ষা করে না। দেখতে দেখতে কেটে গেছে চার-চারটি বছর। সেই চঞ্চল, আবেগী আর কিছুটা ইম্যাচিউর সপ্তদশী কিশোরী তানভী আজ একুশ বছরের এক পূর্ণবয়স্কা নারী। অবয়বে যেমন এসেছে গাম্ভীর্য, স্বভাবেও এসেছে এক দৃঢ় সংযম। এখন কলেজের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী সে। এই কয়েকটা বছর তাকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছে এক নতুন মানুষ হিসেবে।
তানভী এখন আর আগের মতো হুটহাট কথা বলে না। কোথায় কথা বলতে হয়, আর কোথায় নীরব থাকতে হয়—সেটা সে খুব ভালো করেই রপ্ত করে নিয়েছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার এক অদ্ভুত শক্ত দেয়াল সে নিজের চারপাশে তুলে নিয়েছে। উচ্চমাধ্যমিকে অভাবনীয় সাফল্যের পর কলেজের প্রতিটি সেমিস্টারেও সে মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। কিন্তু এই সাফল্যের উজ্জ্বল আলোতেও তার মনের একটা কোণে জমে ছিল ঘন অন্ধকার।
তানভী আর্ভিককে ভালোবেসেছে নিজের অস্তিত্বের চেয়েও বেশি। কিন্তু সেই ভালোবাসাকে সে আর কোনোদিনও শব্দের রূপ দেয়নি। হৃদয়ের মণিকোঠায় অতি সন্তর্পণে লুকিয়ে রেখেছে তার এই গোপন অনুভূতি গুলোকে। অথচ কী বিচিত্র এই ভালোবাসা! যাকে সবচেয়ে বেশি কাছে পেতে চায়, তার থেকেই তানভী দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে প্রতিনিয়ত। প্রয়োজনে যতটুকু কথা না বললেই নয়, ততটাই বলেছে।
আর্ভিক এই পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী। তানভীর এই দূরত্ব, এই উপেক্ষা তাকে ভেতরে ভেতরে দগ্ধ করেছে। সে মুখ বুজে সব সহ্য করে নিয়েছে, যেন এটাই তার ভাগ্য। দিনের আলোয় সবার সামনে তারা খুব স্বাভাবিক, খুব সাধারণ। কিন্তু রাতের অন্ধকার নামলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। প্রতি রাতে যখন সম্পূর্ণ পৃথিবী ঘুমে আচ্ছন্ন হয়, তখন এই দুই মানব-মানবী নিজেদের বালিশ ভেজায় নিঃশব্দ কান্নায়। একে অপরের প্রতি পাহাড়সম অভিমান আর না বলা দীর্ঘশ্বাস মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় রাতের নিস্তব্ধতায়। তাদের কান্না কেউ শোনে না, তাদের হাহাকার দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে নিজেদের কাছেই।
বিকেলের তপ্ত রোদের তেজ তখন কমতে শুরু করেছে। অভিক সাহেবের শখের বাগানে তানভী মনোযোগ দিয়ে গাছে জল দিচ্ছিল। বাড়ির পেছনের এই বাগানটা এখন যেন তানভীর একাকীত্বের সঙ্গী। নানা রঙের ফুলের গাছে পাইপ দিয়ে জল দেওয়ার সময় সে নিজের অজান্তেই হারিয়ে গিয়েছিল কোনো এক ভাবনায়।
হঠাৎ মেঘাদ্রির পদশব্দে তার ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। মেঘাদ্রি একপ্রকার দৌড়াতে দৌড়াতে তানভীর কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল
-“তানভী, চল! আমাদের একটা জায়গায় যেতে হবে। একদম দেরি করিস না, তাড়াতাড়ি গিয়ে রেডি হয়ে নে।”
তানভী ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে তাকাল। তার শান্ত চোখে একরাশ বিস্ময়। সে ধীর গলায় প্রশ্ন করল
-“হঠাৎ কোথায় যাব? আর কেন যেতে হবে?”
মেঘাদ্রির চোখেমুখে এক অস্থির উত্তেজনা। সে তানভীর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল
-“আরে, এখন উত্তর দেওয়ার একদম সময় নেই। তুই এখন চুপচাপ গিয়ে রেডি হবি, ব্যাস!”
তানভী মৃদু প্রতিবাদ জানিয়ে বলল
-“আমি কোথাও যেতে চাই না মেঘাদ্রি। আমাকে কেন জোর করছিস?”
মেঘাদ্রি এবার তানভীর কোনো কথাই কানে তুলল না। সে তানভীর হাত শক্ত করে ধরে টানতে টানতে ঘরের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করল। যাওয়ার পথে সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল
-“তোর থেকে পারমিশন নিতে আসিনি তানভী। চল বলছি, তাড়াতাড়ি চল!”
তানভী টাল সামলাতে না পেরে আর্তনাদ করে উঠল
-“উফ মেঘাদ্রি! আস্তে, পড়ে যাব তো! হচ্ছেটা কী বলবি তো?”
মেঘাদ্রি কোনো উত্তর দিল না। সে প্রায় টেনে হিঁচড়ে তানভীকে তার রুমে নিয়ে এল। তারপর একটা শপিং ব্যাগ তানভীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে নির্দেশ দিল
-“এই নে, এটা পড়ে খুব তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।”
কথাটা বলেই মেঘাদ্রি ঝড়ের বেগে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তানভী হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল রুমের মাঝখানে। হাতে ধরা শপিং ব্যাগটার দিকে সে আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে আছে। হৃদপিণ্ডের স্পন্দন যেন হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে তার। কেন মেঘাদ্রি তাকে এভাবে তড়িঘড়ি করে নিয়ে যেতে চাইছে? আর কেনই বা তার মনে হচ্ছে, এই বিকেলটা আর পাঁচটা সাধারণ বিকেলের মতো নয়?
তানভী কাঁপা কাঁপা হাতে শপিং ব্যাগটা খুলল। ভেতরে সযত্নে ভাঁজ করে রাখা একটি জমকালো লাল রঙের গাউন। কাপড়ের মসৃণতা আর রাজকীয় আভিজাত্য দেখে সে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মনের ভেতর একরাশ দ্বিধা আর কৌতূহল ভিড় করে এল
-“এসব কী?”
সব যেন তানভীর মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে, কোনো সমীকরণই মেলাতে পারছে না সে। তানভীর ভাবনার সুতো ছিঁড়ে দিয়ে দরজার ওপাশ থেকে মেঘাদ্রির অস্থির কণ্ঠস্বর ভেসে এল
-“কিরে, হলো তোর? তাড়াতাড়ি কর, একদম সময় নেই হাতে!”
তানভী আর কালক্ষেপণ করল না। মনের সব প্রশ্নকে একপাশে সরিয়ে রেখে সে দ্রুত তৈরি হয়ে নিল। প্রায় বিশ মিনিট পর যখন রুমের দরজা খোলার শব্দ হলো, মেঘাদ্রি অধৈর্য হয়ে পেছন ফিরে তাকাল। কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেল।
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি কি আসলেই তানভী? নাকি কোনো রূপকথার পাতা ছিঁড়ে আসা এক রাজকুমারী! লাল রঙের গাউনটিতে তানভীকে এক অপূর্ব ‘প্রিন্সেস’ মনে হচ্ছে। তার কোমর ছাপিয়ে যাওয়া রেশমি কালো চুলগুলো খোলা, পিঠে ছড়িয়ে আছে। মুখে যৎসামান্য মেকআপ, কিন্তু সেই স্নিগ্ধতা যেন শত অলঙ্কারের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল। মেঘাদ্রি বলে উঠল
-“অপূর্ব… তোকে জাস্ট অপূর্ব লাগছে!”
মুহূর্তের জন্য মেঘাদ্রি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। সে নিজের চোখের কাজলের অবশিষ্টাংশ আঙুলে নিয়ে পরম যত্নে তানভীর ঘাড়ের এক কোণে ছোট একটা টিপ এঁকে দিল চুলের আড়ালে লুকিয়ে গেল সেই কালো বিন্দুটি। মেঘাদ্রি মৃদু স্বরে বলল
-“কারও নজর যেন না লাগে।”
এরপরই সে স্বাভাবিক হয়ে দ্রুত গলায় বলল
-“এখন চল, আমাদের বেরোতে হবে।”
নিচে নামতে নামতে তানভী একবার চারপাশটা দেখে নিয়ে বলল
-“দাঁড়া মেঘাদ্রি, বড়মা আর আঙ্কেলকে বলে আসি।”
মেঘাদ্রি বাধা দিয়ে বলল
-“আরে, বাড়িতে কেউ নেই এখন। তুই চল তো!”
তানভী অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল
-“কেউ নেই মানে? সবাই কোথায় গেছে এই অসময়ে?”
মেঘাদ্রি এবার কিছুটা বিরক্তির ভান করে তানভীর হাত ধরে টানতে টানতে বলল
-“এত কথা বলার সময় নেই এখন। তাড়াতাড়ি চল, গাড়ি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।”
এক বুক অনিশ্চয়তা আর অজানার ভয় মেশানো রোমাঞ্চ নিয়ে তানভী গাড়িতে গিয়ে বসল। ইঞ্জিন স্টার্ট নিতেই চাকা গড়াতে শুরু করল এক অজানা গন্তব্যের দিকে। তানভী জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল, বাইরের দ্রুত ধাবমান দৃশ্যপটগুলো যেন তার জীবনের বদলে যাওয়া দিনগুলোর মতোই ঝাপসা। সে জানে না এই যাত্রার শেষ কোথায়, কিন্তু তার অবচেতন মন বারবার বলছে—আজকের এই সন্ধ্যা তার জীবনের সব নীরব কান্নার অবসান ঘটাতে চলেছে। গাড়িটি এগিয়ে চলল শহরের বুক চিরে, এক নতুন গল্পের সন্ধানে।
প্রায় আধঘণ্টা পর তানভীদের গাড়িটা যখন থামল, তখন সন্ধ্যার ধূসর আলো মিলিয়ে গিয়ে চারপাশ ঘন অন্ধকারে ডুবে গেছে। এক রহস্যময় স্তব্ধতা যেন প্রকৃতিকে গ্রাস করে নিয়েছে। মেঘাদ্রি গাড়ি থেকে নেমে তানভীর হাত ধরে অতি সন্তর্পণে তাকে এগিয়ে নিয়ে চলল। অন্ধকারে পথ দেখা যাচ্ছে না, শুধু পায়ের নিচে শুকনো ঘাসের মচমচে শব্দ আর অজানা কোনো ফুলের তীব্র সুবাস নাকে আসছে। তানভী কিছুটা ভীত হয়ে পড়ল। মেঘাদ্রির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে সে বিড়বিড় করে বলতে চাইল
-“মেঘাদ্রি, এসব কী হচ্ছে? আমরা…”
কিন্তু কথা শেষ করার আগেই সে অনুভব করল তার হাতটা এখন মুক্ত। পাশে তাকিয়ে দেখল গাঢ় অন্ধকারে মেঘাদ্রি কোথাও নেই। তানভী আর্তকণ্ঠে দুবার ডাকল
-“মেঘাদ্রি! মেঘাদ্রি! কোথায় গেলি তুই?”
অন্ধকার থেকে কোনো উত্তর এল না। ঠিক সেই মুহূর্তে এক অলৌকিক জাদুর মতো হুট করে জ্বলে উঠল হাজারো আলোর রোশনাই। তীব্র আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল তানভীর। দৃষ্টি যখন সইল, তখন পায়ের নিচে তাকিয়ে তানভীর হৃদস্পন্দন যেন থমকে গেল।
তার সামনে হাঁটু মুড়ে প্রপোজ করার ভঙ্গিতে বসে আছে আর্ভিক। আর্ভিকের এক হাতে বিশ্বের অন্যতম দামী এবং দুর্লভ ‘জুলিয়েট রোজ’-এর এক বিশাল তোড়া, আর অন্য হাতে হীরের একটি আংটি, যা আলোর বিচ্ছুরণে আগুনের মতো জ্বলছে। আর্ভিক তার গভীর, মায়াবী চোখ দুটো তানভীর চোখে রাখল। সেই চোখে আজ কোনো লুকোচুরি নেই, আছে শুধু আজন্মের তৃষ্ণা। আর্ভিক তার ভরাট গলায় বলতে শুরু করল
-“তানভী, আজ থেকে একুশ বছর আগে যখন তুই প্রথম এই পৃথিবীতে চোখ মেলেছিলি, সেই ছোট্ট তুলতুলে হাতটা ছুঁয়ে আমি প্রথম ভালোবাসার মানে বুঝেছিলাম। আমি তোর থেকে আট বছরের বড় হতে পারি, কিন্তু আমার হৃদয় তোর নাম জপ করতে শুরু করেছিল সেই তখন থেকেই। এই যে সেই ছোট্ট চঞ্চল তানভী থেকে আজ একুশ বছরের শান্ত গম্ভীর নারী হয়ে উঠলি—এই প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস আমি আমার বুকের ভেতর বয়ে বেড়িয়েছি। একুশ বছর ধরে বুকের মধ্যে একটা আগ্নেয়গিরিকে আমি পুষে রেখেছি শুধু তোর জন্য। আজ সেই আগ্নেয়গিরি শান্ত হতে চায় তোর শীতল ছায়ায়। তুই কি এই একাকী যাযাবরটার ঘর হবি? তুই কি আমার জীবনের শেষ বিকেলের সঙ্গী হবি?”
তানভী নির্বাক তার চোখে তখন অশ্রুর প্লাবন। সে এসব বিশ্বাস করতে পারছে না। আর্ভিক আবার বলল,
-“তোর জন্য বানানো এই “স্বপ্নবিলাস”। তুই কি এই আর্ভিকের হৃদয় রাজ্যের রানী হবি? আমার সোনা বউ হবি?”
‘স্বপ্নবিলাস’ শব্দটি উচ্চারণ করার সাথে সাথে এক নাটকীয় পরিবর্তন ঘটল। ঠিক পেছনেই বিশাল এক রাজপ্রাসাদের মতো অট্টালিকার ওপর আকাশছোঁয়া সার্চলাইটগুলো জ্বলে উঠল। তানভী শিউরে উঠে পেছনে ফিরল। তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক আধুনিক রাজপ্রাসাদ। ধবধবে সাদা আর সোনালি কারুকাজে ঘেরা এক রাজকীয় বাড়ি। নেমপ্লেটে বড় বড় অক্ষরে লেখা— ‘তানভীর স্বপ্নবিলাস’, আর তার নিচেই ছোট করে লেখা— “আর্ভিকের হৃদয়ের রানী”
পুরো বাড়িটি আলোয় সজ্জিত। চারপাশ থেকে ফোয়ারাগুলো নাচতে শুরু করল। চারিদিকে সুশৃঙ্খল রাজকীয় বাগান, যেখানে ফুটে আছে সহস্র রঙের ফুল। তানভী স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। তার মনে পড়ে গেল সেই পুরোনো দিনের কথা, যখন সে আর্ভিকদের গ্ৰামের বাড়িতে গিয়ে ছেলেমানুষি করে বলেছিল—তার রূপকথার রাজাদের মতো বিশাল এক বাগান চাই।
আর্ভিক আলতো করে তানভীর হাতটা ছুঁয়ে বলল
-“তুই বলেছিলি তোর রূপকথার গল্পের রাজাদের বাগানের মতো বাগান চাই। তাই আমি খুব সামান্য চেষ্টা করলাম ওই রকম বাগান বানানোর আমার রানীর জন্য, পছন্দ হয়েছে তোর?”
তানভী তখন বাকরুদ্ধ। সে দুহাতে মুখ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। এই কি সেই আর্ভিক ভাই, যে সেদিন তাকে চড় মেরেছিল ভালোবাসার কথা শুনে। তাই অভিমান করে সে গত কয়েক বছর অবহেলা আর দূরত্ব দিয়ে দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছিল? তানভী আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। কাঁপতে থাকা ডান হাতটি সে আর্ভিকের দিকে বাড়িয়ে দিল—এ এক নীরব সম্মতি, সারাজীবনের জন্য নিজেকে সঁপে দেওয়ার অঙ্গীকার।
তানভী আর্ভিকের হাত থেকে সেই অপূর্ব গোলাপের তোড়াটি নিল। আর্ভিক ধীরলয়ে তানভীর আঙুলে হীরের আংটিটি পরিয়ে দিল। আংটিটি যেন তানভীর আঙুলেই প্রাণ পেল। আর্ভিক উঠে দাঁড়াল। তারপর হঠাৎ শিশুর মতো সরলতায় নিজের দুই কান ধরে বলল
-“ক্ষমা করো সোনা বউ, এত সব আয়োজন করতে গিয়ে বড্ড দেরি হয়ে গেল। অনেক গুলো বছর তোমাকে কাঁদিয়েছি।”
আর্ভিক কথাটি শেষ করতেই তানভী তীব্র আবেগে আর্ভিককে জড়িয়ে ধরল। ঠিক সেই মুহূর্তে চারপাশ থেকে শুরু হলো পুষ্পবৃষ্টি। হাজার হাজার গোলাপের পাপড়ি তাদের ওপর ঝরে পড়তে লাগল। আকাশে ফাটতে শুরু করল বর্ণিল আতশবাজি, যেন অন্ধকার আকাশটাকেও আজ আনন্দে রাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে।
হঠাৎ চারপাশ থেকে হাততালির শব্দ শুনে তানভী আর্ভিককে ছেড়ে একটু সরে দাঁড়াল। সে বিস্ময়ে দেখল, সেখানে উপস্থিত রয়েছে তার অতি আপনজনেরা। তানভীর বাবা-মা, তৃষাণ, অভিক সাহেব, রাখী রায়চৌধুরী, ঋষি, নীলাদ্রি, প্রেম, রিকি আর মেঘাদ্রি—সবার চোখে আনন্দের অশ্রু। প্রত্যেকে হাততালি দিচ্ছে।
ঋষি আর প্রেম তো খুশিতে আত্মহারা হয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে গোল হয়ে নাচানাচি শুরু করে দিয়েছে। তৃষাণ ছোট ছোট পা ফেলে আনন্দে লাফাচ্ছে। শুধু সোহাগ আসতে পারেনি, কারণ সে অন্তঃসত্ত্বা, আট মাস চলছে তার। তবে তার শুভেচ্ছা যেন এই ফুরফুরে বাতাসের প্রতিটি কণা বহন করে আনছে।
আজ আর কোনো দূরত্ব নেই, কোনো অভিমান নেই। এই স্বপ্নবিলাসের উঠোনে দাঁড়িয়ে তানভী অনুভব করল, তার ভালোবাসা আজ পূর্ণতা পেল। চারপাশের বাজি আর হাততালির মাঝে আর্ভিক তানভীর কপালে আলতো করে নিজের ওষ্ঠ ছোঁয়াল, যেন এক নতুন পৃথিবীর অভিষেক হলো আজ। আক্ষরিক অর্থেই, তানভী আজ আর্ভিকের হৃদয়ের চিরস্থায়ী রাজরানী।
ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫০
তানভী আর আর্ভিকের এই মিলন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের ভালোবাসা সময়ের কাছে হার মানে না। শত অবহেলা আর দূরত্বের দেয়াল ভেঙে শেষ পর্যন্ত ভালোবাসাই জয়ী হয়। কারণ, যেখানে হৃদয়ের টান অকৃত্রিম, সেখানে বিধাতাও বাধ্য হন পুরো জগতকে আলো আর ফুলে সাজিয়ে সেই মিলনকে সার্থক করতে।
