ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৪
তানিশা ভট্টাচার্য্য
হাতে খাবারের থালা নিয়ে দোতলার সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলেন রুদ্র বাবু। বাবার মন, মুখে কঠোরতার মুখোশ থাকলেও অন্তরে মেয়ের জন্য এক সমুদ্র মায়া। ভাবলেন, রাগের মাথায় হয়তো অনেক কিছু বলে ফেলেছেন, কিন্তু মেয়েটা তো সেই বিকেল থেকে না খেয়ে আছে। নিজের হাতে তানভীর প্রিয় খাবারগুলো সাজিয়ে এনেছেন তিনি। দরজার ভারী তালাটা খুলতেই একটা শীতল বাতাস তাকে অভ্যর্থনা জানাল। কিন্তু রুমের ভেতরে পা রাখতেই রুদ্র বাবুর হাতের থালাটা মেঝেতে পড়ে ঝনঝন শব্দে ভেঙে গেল।
-“মামণি!”
বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। জানালার পর্দাগুলো উধাও, স্লাইডিং ডোরটা খোলা, আর রাতের অন্ধকার বিদ্রূপ করছে তাকে। সারা রুম শূন্য, কোথাও নেই তানভী। রুদ্র বাবুর আর্তচিৎকারে নিস্তব্ধ বাড়িটা কেঁপে উঠল। সেই শব্দ শুনেই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন দোয়েল ব্যানার্জী আর তৃষাণ।
ফাঁকা ঘরের দৃশ্য দেখে দোয়েল ব্যানার্জী আর্তনাদ করে উঠলেন
-“আমার মেয়ে কই? ও কোথায় গেল?”
তৃষাণ জানালার দিকে এগিয়ে গিয়ে ঝুলন্ত চাদরের সারি দেখে শিউরে উঠল
-“বাবা! দিভাই জানালা দিয়ে পালিয়েছে!”
সারা বাড়িতে যখন বিশৃঙ্খলা আর হাহাকার, ঠিক তখনই রুদ্র বাবুর পকেটে থাকা ফোনটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠল। একটা মেসেজ। কাঁপা হাতে ফোনটা বার করে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই রুদ্র বাবুর চোয়াল শক্ত হয়ে এল, কপালে ধমনীগুলো রাগে আর আতঙ্কে নীল হয়ে উঠল। মেসেজটাতে লেখা ছিল
“প্রিয় পুরনো শত্রু, আশা করি আমাকে মনে আছে? তোমার ভাইঝি… আরে না না, তোমার তথাকথিত মেয়ে এখন আমাদের কব্জায়। নিজের মেয়ের শেষ হয়ে যাওয়াটা যদি নিজের দুচোখে দেখতে চাও, তবে নিচে পাঠানো লোকেশনে চলে এসো। বেশি দেরি করো না কিন্তু! আমার আবার ধৈর্য্য কম।”
মেসেজটা পড়া শেষ হতেই রুদ্র বাবুর চারপাশটা যেন বনবন করে ঘুরতে লাগল। অতীতের কালো ছায়া আজ তার বর্তমানকে গ্রাস করতে এসেছে। তিনি কোনো কথা না বলে পাগলের মতো বেরিয়ে যেতে চাইলেন। দোয়েল ব্যানার্জী ওনার হাত চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন
-“কী হয়েছে রুদ্র? কার মেসেজ? আমাদের মেয়ে কোথায়?”
রুদ্র বাবু কঠিন স্বরে শুধু বললেন
-“এখন এতো কিছু বলার সময় নেই। তাড়াতাড়ি চলো, মামণি বড় বিপদে পড়েছে। এক মুহূর্ত দেরি হলে ওকে আর ফিরে পাব না!”
শহরের কোলাহল থেকে দূরে, এক নির্জন প্রান্তরে আর্ভিকের গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার ধারে এক বিশাল ঝিল, যার কালো জল রাতের চাঁদের আলোয় এক মায়াবী রূপ নিয়েছে। আর্ভিক গাড়ির ওপর পা ঝুলিয়ে বসেছিল। তার উদাস দৃষ্টি সেই গভীর জলের দিকে। চোখের কোণ বেয়ে শ্রাবণের ধারার মতো জল গড়িয়ে পড়ছে। বিচ্ছেদের যন্ত্রণা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।
হঠাৎ নীরবতা চিরে তার ফোনের রিংটোন বেজে উঠল। অন্যমনস্ক আর্ভিক প্রথমে খেয়াল করেনি, কিন্তু রিংটোনের একঘেয়ে শব্দে তার ধ্যান ভাঙল। ফোনটা কানে নিতেই ওপার থেকে আসা একটি কণ্ঠস্বর শুনে তার শরীর পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। আর্ভিকের চোখের জল শুকিয়ে সেখানে ধিকধিক করে জ্বলে উঠল প্রতিশোধের আগুন। সে কেবল দাঁতে দাঁত চেপে ওপারে থাকা লোকটাকে উদ্দেশ্য করে বলল
-“ওকে… আই এম কামিং!”
ফোনটা কেটেই সে সজোরে আছাড় মারল রাস্তায়। ফোনের কাঁচ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল পিচঢালা পথে। আর্ভিক আকাশ ফাটানো চিৎকার করে একটি নাম উচ্চারণ করল
-“জ্যাকসন!”
সেই চিৎকারে ঝিলের ধারের বুনো পাখিরা ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। আর্ভিকের শান্ত মূর্তি নিমেষেই এক ভয়ংকর রুদ্ররূপে রূপান্তরিত হলো।
অন্যদিকে, চৌধুরী নিবাসের ড্রয়িংরুমে তখন এক অসহ্য দুশ্চিন্তার মেঘ জমেছে। সোফায় বসে আছেন অভিক সাহেব। পাশে চিন্তিত মুখে বসে আছেন রাখী রায়চৌধুরী। অভিক সাহেব ঋষিকে উদ্দেশ্য করে বললেন
-“ঋষি, তোমার ভাইয়াকে একবার ফোন কর তো। এত রাত হলো, ছেলেটা কোথায় গেল?”
ঋষি সোফায় বসে পর পর তিনবার ফোন করার চেষ্টা করল। প্রতিবারই যান্ত্রিক নারীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল। অভিক সাহেব ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন
-“কী হলো?”
ঋষি মাথা নিচু করে ক্ষীণ স্বরে বলল
-“বাবা ভাইয়ার ফোনটা সুইচ অফ বলছে।”
রাখী রায়চৌধুরী নিজের আঁচল জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন
-“আমার ছেলেটার কোনো বিপদ হলো না তো? ও তো কোনোদিন এরকম করে না। হে ঈশ্বর, আমার সন্তানকে রক্ষা করো!”
অন্ধকারের বুক চিরে উন্মোচিত হলো এক বীভৎস অধ্যায়। তানভী যখন চোখ মেলল, তার চারপাশটা গুমোট আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধে ভরা। হাত-পা কাঠের চেয়ারের সাথে শক্ত করে বাঁধা, মুখের কাপড়ের বাঁধনটা তার আর্তনাদকে গলার ভেতরেই শ্বাসরোধ করে দিচ্ছে।
হঠাৎ ভারী বুটের শব্দে তন্দ্রা কাটল তার। সামনে এক দীর্ঘকায় অবয়ব। লোকটা নিষ্ঠুর তৃপ্তিতে তানভীর মুখের বাঁধন খুলে দিতেই তানভী তীব্র স্বরে বলে উঠল
-“কে আপনারা? কেন আমাকে এখানে আনা হয়েছে? কী করেছি আমি?”
লোকটা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সেই হাসিতে শয়তানের উল্লাস। তানভীর চিবুকটা সজোরে চেপে ধরে সে বলল
-“তুই কিছু করিসনি, সব তোর বাপ করেছে! তোকে মেরে আমি প্রতিশোধ নেব।”
তানভীর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল
-“মানে? বাবা তো…”
-“বোকা মেয়ে! তোর আসল বাপের কথা বলছি। তোর মাকে মারার প্রতিশোধ নিতে সে আমায় মারতে গিয়েছিল। কিন্তু নিজের অনুগত প্রহরীদের বিশ্বাসঘাতকতায় সে নিজেই নিজেকে শেষ করে দিল। কত ইচ্ছে ছিল আমার, ওকে নিজের হাতে তিলে তিলে মারার! সেই সাধ মেটেনি বলে আজ তোকে তুলে এনেছি।”
জ্যাকসনের লোহার মতো আঙুলগুলো তানভীর কোমল চামড়ায় বসে যাচ্ছিল। তানভী যন্ত্রণায় ছটফট করছিল, আর ঠিক সেই মুহূর্তে…হঠাৎ এক প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে পড়ল গুদামের বিশাল দরজাটা। ধুলোর আস্তরণ আর কুয়াশার মতো ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে এক ছায়া মূর্তি আবির্ভূত হলো। সে যেন কোনো মর্ত্যের মানুষ নয়, সাক্ষাৎ যমরাজ। তার পরনে সাদা শার্টের ওপর কালো হাফ-কোট, কালো প্যান্ট আর লেদারের বুট। হাতের কালো ঘড়িটা ঝিকিয়ে উঠল আগুনের আলোয়।
তানভী বিস্ময়ে চেয়ে রইল। এ কি সেই আর্ভিক? না, এ যেন ধ্বংসের দেবতা ‘মাফিয়া কিং এভি রয়’। তার কপালে ঝুলে থাকা এলোমেলো চুলগুলো হাওয়ায় উড়ছে, চোখের মণি দুটো আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছে। আর্ভিক মেঘনাদ স্বরে হুঙ্কার দিয়ে উঠল
-“জ্যাকসন! তোর এত বড় সাহস যে তুই আমার তানভীর গায়ে হাত দিস? এতো দিন অনেক পাপ করে পালিয়ে পালিয়ে বেরিয়েছিল, কিন্তু আজ তোর জীবনের শেষ দিন।”
জ্যাকসন তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল
-“আহা! এভি রয়! আজ তো দেখছি মেঘ না চাইতেই জল। এক খাঁচায় দুই শিকার!”
আর্ভিক বাঁকা হেসে বলল
-“শিকার কে হয়, সেটা সময়ই বলবে।”
মুহূর্তের মধ্যে শুরু হলো রণক্ষেত্র। গুলির শব্দে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। ঠিক সেই সময় রুদ্র বাবু পুলিশ নিয়ে সেখানে আছড়ে পড়লেন। তৃষাণ কোনোমতে তানভীর হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিল। তানভী পাগলের মতো আর্ভিকের দিকে ছুটতে গেল, আর ঠিক সেই সময়েই জ্যাকসন তার বন্দুক তাক করল তানভীর দিকে।
-“তানভী!”
আর্ভিকের আর্তচিৎকার আর গুলির শব্দ একসাথে মিশে গেল। তানভী কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল আর্ভিক তার সামনে পাহাড়ের মতো ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর পর দুটো বুলেট আর্ভিকের বুক লাগল। তানভীর পৃথিবীটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। চারপাশটা যেন এক লহমায় নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আর্ভিকের সাদা শার্টটা লাল রক্তে ভিজে একাকার। তানভী এক বীভৎস চিৎকার করে আর্ভিককে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু আর্ভিকের চোখে তখনো প্রতিশোধের নেশা। শরীর থেকে শক্তি হারিয়ে গেলেও সে টলে পড়ল না।
আহত বাঘের মতো আর্ভিক গুলি চালাল। প্রথম গুলিতেই জ্যাকসনের হাতের বন্দুক ছিটকে গেল, দ্বিতীয় গুলিতে সে হাঁটু গেড়ে মাটিতে পড়ে গেল। আর্ভিক এবার টেনে একটা কাঠের চেয়ার নিয়ে এল। জ্যাকসনের রক্তাক্ত দেহের সামনে সে আয়েশ করে বসল, বাঁ পায়ের ওপর ডান পা তোলা, চোখেমুখে আভিজাত্য আর চরম অবজ্ঞা। রক্তাক্ত ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে আর্ভিক তার শেষ সংলাপ দিল
-“জ্যাকসন, এভি রয়কে মারার বুলেট এখনো কোনো কারখানায় তৈরি হয়নি। আমি মরি না, আমি শুধু গল্পের ইতি টানি। আর আজকের গল্পের ইতি তোর রক্ত দিয়ে লেখা হবে।”
বলেই সে জ্যাকসনের দুই ভ্রুর মাঝখানে অব্যর্থ নিশানায় ট্রিগার টিপে দিল। এক পলকে শেষ হয়ে গেল এক পাপের অধ্যায়। বন্দুকটা হাত থেকে খসে পড়ল আর্ভিকের। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তানভী দৌড়ে এসে তাকে আগলে ধরল। আর্ভিক ম্লান হেসে তানভীর গালটা স্পর্শ করল রক্তমাখা হাতে। তারপর অতি কষ্টে বলল
-“আমাকে ক্ষমা করে দিস বউ… হয়তো আমাদের একসঙ্গে পথ চলা হলো না। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস দেখ, তোকে পাওয়ার আগেই তোকে ছেড়ে যেতে হচ্ছে। তবে কথা দিচ্ছি, মৃত্যুর ওপারেও আমি শুধু তোকেই ভালোবাসব।”
তানভী কান্নায় ভেঙে পড়ল। সে আর্ভিকের মুখে হাত চাপা দিয়ে বলল
-“চুপ করুন! কিচ্ছু হবে না আপনার। একদম এসব অলক্ষুণে কথা বলবেন না!”
-“খুব কষ্ট হচ্ছে রে বউ… একটু জড়িয়ে ধরবি?”
বলতে বলতে আর্ভিক তার মাথাটা তানভীর কাঁধে এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজালো। তানভীর সাদা চুরিদার তখন আর্ভিকের তপ্ত রক্তে লাল হয়ে গেছে। তানভী আর্ভিক কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রুদ্র বাবু কে বলল
-“বাবা অ্যাম্বুলেন্স ডাকো।”
রুদ্র বাবু হন্তদন্ত হয়ে অ্যাম্বুলেন্স ডাকলেন। প্রায় দশ মিনিট পর অ্যাম্বুলেন্স এল, আর্ভিকের নিথর প্রায় দেহটা স্ট্রেচারে তোলা হলো।
অন্ধকার চিরে ভোরের আলো ফুটেছে ঠিকই, কিন্তু ব্যানার্জী আর রায়চৌধুরী পরিবারের আকাশে আজ এক অনিশ্চিত কালবৈশাখীর মেঘ জমে আছে। হাসপাতালের করিডোরে সাদা দেয়ালগুলো যেন এক একটি মৌন সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে।
বাতাসে ফিনাইল আর ওষুধের কটু গন্ধ। রুদ্র বাবু আর অভিক সাহেব অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন; দুজনেরই জুতোর শব্দ নিস্তব্ধ করিডোরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। রাখী রায়চৌধুরী কান্না করতে করতে প্রায় সংজ্ঞা হারানোর পথে, তাকে সামলাচ্ছেন দোয়েল ব্যানার্জী,যার নিজের চোখের জলও আজ বাঁধ মানছে না। তৃষাণ ও ঋষি এক কোণে পাথরের মতো বসে আছে।
আর তানভী? সে যেন এক জ্যান্ত লাশ। তার চোখের পলক পর্যন্ত পড়ছে না। তার সাদা চুরিদারে লেগে থাকা আর্ভিকের সেই তপ্ত রক্ত এখন শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে। কিন্তু তানভীর কাছে ওটা কেবল রক্ত নয়, ওটা তার ভালোবাসার শেষ চিহ্ন।
দীর্ঘ এক ঘণ্টা পর অপারেশন থিয়েটারের লাল আলোটা নিভে গেল। দরজা খোলার শব্দ হতেই সবাই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেলেন। ডাক্তারবাবু মাস্ক খুলতে খুলতে ক্লান্ত স্বরে বললেন
-“দেখুন, ওর শরীর থেকে প্রচুর ব্লিডিং হয়েছে। অপারেশন সফল হলেও এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। যতক্ষণ না পেশেন্টের জ্ঞান ফিরছে, ততক্ষণ ও বিপদমুক্ত নয়। এখন শুধু ভগবানের কাছে প্রার্থনা করুন।”
কিছুক্ষণ পর আর্ভিককে কেবিনে শিফট করা হলো। সাদা ধবধবে বিছানায় আর্ভিক শুয়ে আছে নিথর হয়ে। মুখে অক্সিজেনের মাস্ক, হাতে স্যালাইনের নল। সবাই একে একে কেবিনে প্রবেশ করল। তানভী যখন দরজায় দাঁড়াল, সবাই নিঃশব্দে তাকে জায়গা করে দিল।
তানভী টলমল পায়ে এগিয়ে এল বিছানার পাশে। সে আর্ভিকের মুখের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন এক মুহূর্ত চোখ সরালেই কেউ তার পৃথিবীটাকে চুরি করে নিয়ে যাবে। আচমকা সব বাঁধ ভেঙে গেল তানভীর। সে আর্ভিকের ক্ষতবিক্ষত বুকের একপাশে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল।
-“এই তো সেই বুক, যা আমাকে সব বিপদ থেকে আগলে রাখে। আজ কেন সেটা এভাবে ধসে পড়ল? আর্ভিক চোখ খুলুন! আপনি না মাফিয়া কিং? আপনি না এভি রয়? তবে এই সামান্য কয়েকটা বুলেট কেন আপনাকে এভাবে থামিয়ে দিল? দেখুন চোখ খুলুন না হলে কিন্তু আমি আপনার সাথে কথা বলব না।”
তানভীর প্রতিটি শব্দ যেন উপস্থিত সবার হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধতে লাগল। কান্নার রোলে ভারী হয়ে উঠল কেবিনের বাতাস। হঠাৎ তানভীর মনে পড়ে গেল সেই গোধূলি বেলার কথা। একদিন বাড়ির ছাদের রেলিং ধরে সে আকাশ দেখছিল। হঠাৎ আর্ভিক পেছন থেকে এসে বলেছিল
-‘তানভী!’
সেদিন চমকে গিয়ে তানভী বলেছিল
-‘উফ! আপনি কি যে করেন না। আর একটু হলেই হার্ট অ্যাটাকে আমি মরেই যেতাম!’
আর্ভিক সেদিন তানভীর ঠোঁটে নিজের আঙুল ছুঁইয়ে এক নিবিড় আবেশে বলেছিল
-‘চুপ! একদম এসব কথা বলবি না। মৃত্যু তোকে ছোঁয়ার আগে যেন আমাকে স্পর্শ করে। তোর ওপর আসা প্রতিটি আঘাত যেন প্রথমে আমার ওপর দিয়ে যায়।’
আজ সেই কথাগুলো তানভীর কানে বাজছে। আর্ভিক তার কথা রেখেছে; সে নিজের বুক পেতে দিয়েছে তানভীর জন্য। অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর অভিক সাহেব ধীর গলায় বললেন
-“তোমরা সবাই এবার বাড়ি যাও। গত রাতটা সবার ওপর দিয়ে অনেক ধকল গিয়েছে। আমি এখানে থাকছি।”
রাখী রায়চৌধুরী যেতে চাননি তাকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে গাড়িতে তোলা হলো। অভিক সাহেব এবার তানভীর কাছে এসে পরম মমতায় মাথায় হাত রাখলেন
-“মামণি, তুমিও যাও। জামাকাপড়গুলো রক্তে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। একটু ফ্রেশ হয়ে এসো।”
তানভী এবার আর্ভিকের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরল। তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা
ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৩
-“না আঙ্কেল, আমি কোথাও যাব না। আমার আর্ভিককে একা ফেলে আমি এক পা-ও নড়ব না। এই রক্ত তো নোংরা নয়, এ তো আমার বেঁচে থাকার কারণ। ওনার জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত আমি কোথাও যাবো না।”
তানভীর এই অটল পাহাড়ের মতো জেদ দেখে কেউ আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। সবাই চলে যাওয়ার পর কেবিনে এখন শুধু দুজন, এক নিথর রাজা আর তার ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী। তানভী আবার আর্ভিকের বুকে মাথা রাখল। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, যেন প্রকৃতির চোখ দিয়েও আর্ভিকের এই আত্মত্যাগের জন্য জল ঝরছে।
