Home ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৫

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৫

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৫
তানিশা ভট্টাচার্য্য

দুপুরের তপ্ত রোদ হাসপাতালের করিডোরে জানলা দিয়ে এসে বিঁধছে। কেবিনের ভেতরে তখনও এক অসহ্য নিস্তব্ধতা। তানভী একইভাবে আর্ভিকের বুকের একপাশে মাথা রেখে নিশ্চুপ হয়ে আছে, যেন সে ওই হৃদস্পন্দনটুকুকে পাহারা দিচ্ছে। হঠাৎ দরজায় মৃদু করাঘাত করে ভেতরে প্রবেশ করল ঋষি। তার হাতে খাবারের টিফিন ক্যারিয়ার আর তানভীর জন্য এক সেট পরিষ্কার পোশাক।
ঋষি কিছুক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখল তার বোনটার বিধ্বস্ত অবস্থা। কালশিটে পড়া চোখ আর উস্কোখুস্কো চুলে তানভীকে চেনা দায়। ঋষি ধীরপায়ে এগিয়ে এসে তানভীর কাঁধে হাত রাখল। এরপর অত্যন্ত কোমল স্বরে ডাকল
-“বোনু, অনেক হয়েছে। এবার একটু ফ্রেশ হয়ে আয় তো। নিজের শরীরের দিকে তো তাকা একবার!”

তানভী প্রথমে কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি আর্ভিকের মুখে স্থির। ঋষি আবার জোরাজুরি করায় সে যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো উঠে দাঁড়াল। ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে-মুখে জল দিয়ে পোষাক পাল্টে সে ফিরে এল, ঋষি ততক্ষণে খাবার বেড়ে রেখেছে। তানভী খেতে চাইছিল না, তার গলার কাছে যেন দলা পাকিয়ে আসছিল। কিন্তু ঋষি আজ কোনো অজুহাত শুনল না; বড় ভাইয়ের অধিকারে সে জোর করে কয়েক লোকমা ভাত তানভীর মুখে তুলে দিল।
বিকেলের দিকে প্রেম, সোহাগ আর নীলাদ্রি হাসপাতালে এল। তাদের চোখেমুখেও দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। বন্ধুর এই অবস্থা দেখে তারা বিমর্ষ হয়ে কেবিনে বসে রইল। কিন্তু আর্ভিকের জ্ঞান ফেরার কোনো লক্ষণ তখনও দেখা দিল না।
সন্ধ্যা নামতেই হাসপাতালের করিডোরে ব্যানার্জী আর রায়চৌধুরী পরিবারের অভিভাবকরা এসে উপস্থিত হলেন। রুদ্র বাবু, দোয়েল ব্যানার্জী, তৃষাণ, রাখী রায়চৌধুরী আর অভিক সাহেব, সবার চোখেমুখে অনিদ্রা আর আশঙ্কার ছাপ। ডাক্তারবাবু রাউন্ডে এসে আবারও পরীক্ষা করে গেলেন, কিন্তু ওনার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ কাটল না।

হাসপাতালের বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন রুদ্র বাবু। ওনার ব্যক্তিত্বের সেই কঠোর কাঠিন্য ভাব যেন আজ কিছুটা ম্লান। অভিক সাহেব ধীরপায়ে এসে ওনার পাশে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না। একসময় নিরবতা ভেঙে অভিক সাহেব করুণ স্বরে বললেন
-“রুদ্র, আমার ছেলেটা কি সত্যিই ক্ষমার অযোগ্য?”
অভিক সাহেবের কথায় রুদ্র বাবু ওনার দিকে তাকালেন। অভিক সাহেব আবারও বলা শুরু করলেন
-“ছোটবেলায় ও তো কত অন্যায় করেছে, তুই তো সবটা ক্ষমা করে দিতিস। তবে আজ কেন এত কঠোরতা বন্ধু? তানভীকে ছাড়া আমার ছেলেটা মরে যাবে রুদ্র। ওকে এত বড় শাস্তি দিস না। আর্ভিক তো তোরও ছেলের মতো…”
রুদ্র বাবু কোনো উত্তর দিলেন না। তবে ওনার দৃষ্টিতে তখন কোনো ক্রোধ ছিল না; বরং ছিল এক গভীর মায়া আর নিজের ভুলের প্রতি এক গোপন অনুশোচনা। তিনি যেন নিজের মনের আয়নায় নিজেকেই নতুন করে দেখছিলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে কেবিনের ভেতর থেকে এক মৃদু গোঙানির শব্দ পাওয়া গেল। তানভী আর্ভিকের হাতে হাত রেখে বসে ছিল, হঠাৎ অনুভব করল আর্ভিকের আঙুলগুলো নড়ে উঠল।

-“আর্ভিক! আর্ভিক!”
তানভীর আর্তনাদ শুনে ডাক্তার আর নার্সরা ছুটে এলেন। ধীরে ধীরে, খুব ধীরে আর্ভিক তার চোখের পাতা মেলল। ঝাপসা দৃষ্টিতে সে প্রথমে দেখল তার শিয়রে বসে থাকা জলভরা চোখের প্রনয়িনীকে। আর্ভিকের ঠোঁটে এক ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।
জ্ঞান ফেরার সংবাদটা বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ল করিডোরে। ঋষি হন্তদন্ত হয়ে বাইরে এসে রুদ্র বাবু আর অভিক সাহেবকে খবর দিল
-“বাবা, আঙ্কেল! ভাইয়ার জ্ঞান ফিরেছে!”
ঋষি ভেতরে চলে গেল। অভিক সাহেব রুদ্র বাবুর দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে দ্রুত পায়ে কেবিনের দিকে এগিয়ে গেলেন। সেখানে গিয়ে অভিক সাহেব ডাক্তারের সাথে কথা বললেন। ডাক্তারবাবু হাসি মুখে জানান
-“He is now completely out of danger. তবে কিছুদিন বেড রেস্টে থাকতে হবে।”
অভিক সাহেব হাত জোড় করে ডাক্তারবাবু কে ধন্যবাদ জানালেন। ডাক্তারবাবু মৃদু হেসে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন।

কেবিনের ভেতরটা তখন এক স্বর্গীয় আনন্দে ভরে উঠেছে। রাখী রায়চৌধুরী আর দোয়েল ব্যানার্জী চোখের জল মুছছেন। আর্ভিক সবার দিকে একবার তাকিয়ে তানভীর হাতটা আরও শক্ত করে ধরল। ঠিক তখনই দরজার কাছে রুদ্র বাবু এসে দাঁড়ালেন। ওনাকে দেখে ঘরে থাকা সবাই কিছুটা তটস্থ হয়ে পড়লেন। রুদ্র বাবু ধীরপদে আর্ভিকের বেডের পাশে এসে দাঁড়ালেন। ঘর ভর্তি মানুষের দিকে তাকিয়ে তিনি শান্ত স্বরে বললেন
-“তোমরা সবাই একটু বাইরে যাবে? আর্ভিকের সাথে আমার কিছু পার্সোনাল কথা আছে।”
কেউ দ্বিমত করল না। সবাই একে একে বেরিয়ে গেল। এখন কেবিনে শুধু অপরাধবোধে দগ্ধ এক পিতা আর মৃত্যুঞ্জয়ী এক প্রেমিক উপস্থিত।
রুদ্র বাবু আর্ভিকের বেডের পাশে থাকা টুলটা টেনে বসলেন। কাঁপা হাতে আর্ভিকের মাথায় হাত বুলিয়ে অত্যন্ত কোমল আর আর্দ্র কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন
-“এখন শরীর কেমন লাগছে বাবা?”
আর্ভিক কিছুটা অবাক হলো। আঙ্কেলের কণ্ঠে এই মায়া সে বহুদিন শোনেনি। সে ক্ষীণ স্বরে উত্তর দিল
-“ভালো আঙ্কেল।”

রুদ্র বাবু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। ওনার দুচোখ বেয়ে অশ্রু ধারা নেমে এল। আর্ভিকের দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন
-“আমাকে ক্ষমা করে দিস বাবা! তোদের অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। আমি ভুল! না না ভুল না, আমি অন্যায় করেছি। তোদের আলাদা করতে চেয়ে আমি বড় পাপ করে ফেলেছিলাম। তুই তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠ বাবা, আমি কথা দিচ্ছি আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তোদের দুজনের চার হাত এক করে দেব।”
আর্ভিকের চোখেও জল এল, কিন্তু তার মুখে ছিল বিজয়ী হওয়ার এক শান্ত হাসি। সে অতি কষ্টে বলল
-“আঙ্কেল, ওভাবে বলবেন না। বাবা হিসেবে আপনি একদম ঠিক করেছিলেন। আপনার জায়গায় আমি থাকলে হয়তো এমনই করতাম। আপনি তো আমাকে নিজের ছেলে মানেন তাহলে ছেলের কাছে বাবারা কী কখনও ক্ষমা চায়? আপনি ক্ষমা চেয়ে আমাকে আর লজ্জা দেবেন না, আঙ্কেল।”

কেবিনের দরজার কাঁচ দিয়ে এই দৃশ্যটা দেখছিল তানভী। তার দুচোখ বেয়ে শ্রাবণের ধারার মতো জল গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এ জল বিচ্ছেদের নয়, এ জল প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার এবং এক দীর্ঘ সংগ্রামের সফল পরিণতির।
রুদ্র বাবু চোখ মুছে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। এবার ওনার গলায় সেই পুরনো দরাজ কণ্ঠ। একটু রসিকতা মেশানো সুরে আর্ভিককে বললেন

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৪

-“এই ছেলে এইভাবে শুয়ে থাকলে চলবে না! ওঠো ওঠো, সামনে অনেক কাজ… বিয়ে করতে হবে তো!”
বলেই রুদ্র বাবু হো হো করে প্রাণখোলা হাসিতে ফেটে পড়লেন। আর্ভিকের ঠোঁটেও এক টুকরো অনাবিল হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠল, যা হাসপাতালের এই বিষণ্ণ পরিবেশকেও এক মুহূর্তেই রাঙিয়ে দিল।

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৬