ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৬
তানিশা ভট্টাচার্য্য
হাসপাতালের বিষণ্ণ শ্বেতশুভ্র দেয়ালগুলো যেন আজ এক নতুন আশার আলোয় উদ্ভাসিত। আর্ভিকের জ্ঞান ফেরার পর থেকেই ব্যানার্জী আর রায়চৌধুরী পরিবারের উপর থেকে শোকের ছায়া কাটতে শুরু করেছে। রুদ্র বাবুর স্নেহমাখা সম্মতি যেন মরুভূমিতে এক পশলা বৃষ্টির মতো ঝরে পড়েছে।
সাতদিন পর আর্ভিক বাড়ি ফিরল। তবে আজ সে কেবল চৌধুরী নিবাসের বড় ছেলে হয়ে ফেরেনি, সে ফিরেছে এক বিজয়ী প্রেমিকের রাজকীয় বেশে। বাড়ির প্রবেশপথে রাখী রায়চৌধুরী বরণডালা সাজিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। উলুধ্বনি আর শঙ্খধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত। কিন্তু আর্ভিকের চঞ্চল চোখ দুটি ভিড়ের মাঝে বারবার খুঁজছিল সেই একজনকে, যার প্রার্থনায় সে আজ যমরাজের দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে।
“ব্যাকুল এ মন মানে না বারণ,
খোঁজে শুধু সেই মায়াবী হিরণ।”
তানভী আজ বাড়ির অন্দরমহলে নিজেকে একরকম লুকিয়েই রেখেছে। লোকলজ্জার ভয় নয়, বরং এক তীব্র লজ্জামিশ্রিত ভালোলাগা তাকে গ্রাস করেছে। যে রুদ্র বাবু একদিন সিংহের মতো গর্জে উঠে বলেছিলেন, আজ তিনিই হাসিমুখে মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলেছেন
-“মামণি, তোমার পছন্দের মানুষটিকে সাজিয়ে তোলার দায়িত্ব কিন্তু এবার তোমার।”
আর্ভিকের শরীরের ক্ষতগুলো এখনও পুরোপুরি শুকোয়নি, কিন্তু হৃদয়ের ক্ষত আজ নিঃশেষে বিলীন। সে ধীরপায়ে চৌধুরী নিবাসের ছাদে গিয়ে দাঁড়াল। ফুরফুরে বসন্তের বাতাস বইছে। চাঁদের আলোয় সারা ছাদ যেন রুপোলি চাদরে ঢাকা।
হঠাৎ এক জোড়া হাতের স্পর্শে আর্ভিক কেঁপে উঠল। সুগন্ধি চন্দনের ঘ্রাণ আর কাঁচের চুড়ির নিক্কন জানিয়ে দিল, তার প্রণয়িনী এসেছে। তানভী আজ সেজেছে বাসন্তী রঙের শাড়িতে, কপালে ছোট একটি লাল টিপ আর চোখে কাজল।
আর্ভিক ঘুরে দাঁড়িয়ে তানভীর দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। নিস্তব্ধ রাতে কেবল তাদের একেঅপরের হৃদস্পন্দনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। আর্ভিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাব্যিক স্বরে বলল
-“জানিস তানভী, যখন বুলেটের আঘাতে শরীরটা অবশ হয়ে আসছিল, তখন যন্ত্রণার চেয়েও বেশি ভয় পাচ্ছিলাম তোকে হারানোর। মনে হচ্ছিল, আমাদের গল্পটা কি তবে অসমাপ্তই থেকে যাবে? কিন্তু তোর ওই ‘আর্ভিক’ ডাকটা আমাকে অন্ধকারে তলিয়ে যেতে দেয়নি।”
তানভী তার ভেজা চোখে আর্ভিকের বুকের ক্ষতটার দিকে তাকালো তারপর ফিসফিসিয়ে বলল
-“আপনি ছাড়া এই তানভী কেবল একখণ্ড পাষাণ। আপনি আমার শ্বাস, আপনিই আমার বাঁচার আশ্বাস। আজ থেকে আর কোনো আড়াল নেই, কোনো দেয়াল নেই। আমাদের আকাশ আজ মেঘমুক্ত।”
আর্ভিক তানভীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। পরের মাসেই স্থির হলো বিয়ের লগ্ন। দুই পরিবার যেন এক আনন্দোৎসবে মেতে উঠল।
সময়ের চাকা তার আপন গতিতে ঘুরে চলল। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে বসন্তের বিদায়বেলা ঘনিয়ে এসেছে, আর প্রকৃতিতে লেগেছে নতুনের ছোঁয়া। চৈত্র শেষের তপ্ত রোদ ম্লান হয়ে এখন চারদিকে বৈশাখী মেঘের আনাগোনা। ঠিক হয়েছে, আগামী এপ্রিলের শুভ লগ্নেই সম্পন্ন হবে তানভী ও আর্ভিকের চার হাত এক হওয়ার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আজ সেই প্রতিক্ষিত বিয়ের ঠিক এক সপ্তাহ আগে, রুদ্র বাবুর বাড়িতে আয়োজিত হয়েছে আশীর্বাদের জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান।
সকাল থেকেই ব্যানার্জী মেনশন যেন সেজে উঠেছে। গেট থেকে সদর দরজা পর্যন্ত রজনীগন্ধা আর গাঁদা ফুলের মালায় সেজেছে পুরো বাড়ি। বসার ঘরের মাঝখানে পাতা হয়েছে দুটি সুদৃশ্য কাঠের আসন। সেখানে পাশাপাশি বসে আছে তানভী ও আর্ভিক।
তানভীর পরনে আজ ঘিয়ে রঙের তসরের শাড়ি, চওড়া লাল পাড় তার আভিজাত্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কপালে লাল টিপ, কানে সোনার ঝুমকো আর চুলে জড়ানো জুঁই ফুলের গাজরা। তার শান্ত স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকালে মনে হয়, যেন আকাশ থেকে কোনো অপ্সরা মর্ত্যে নেমে এসেছে। পাশে বসা আর্ভিক; তার পরনে বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবি আর সাদা ধুতি। আর্ভিকের চোখে আজ কোনো ধ্বংসের নেশা নেই, আছে কেবল এক বুকভরা তৃপ্তি।
একে একে বড়রা এগিয়ে এলেন। থালায় সাজানো ধান, দুর্বা, চন্দন আর মিষ্টি। প্রথমে এগিয়ে এলেন বাড়ির বড় বড় কর্তা-গিন্নিরা। রুদ্র বাবু ও দোয়েল ব্যানার্জী প্রথমে আসলেন। রুদ্র বাবুর দুচোখ আজ ভিজে উঠেছে। যে মেয়েকে তিনি এত গুলো বছর আগলে রেখেছিলেন, আজ তাকেই অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার শুভক্ষণ সমাগত। আর্ভিকের কপালে চন্দনের তিলক পরিয়ে দিয়ে রুদ্র বাবু আশীর্বাদ করলেন। তিনি পকেট থেকে একটি মখমলের ছোট বাক্স বের করলেন। সেখানে ঝিলিক দিচ্ছিল একটি নীল হীরে বসানো সোনার আংটি। আর্ভিকের আঙুলে সেটি পরিয়ে দিয়ে তিনি একটি সোনার ভারী চেন তার গলায় পরিয়ে দিলেন। তারপর রুদ্র বাবু মৃদু স্বরে আর্ভিককে বললেন
-“আর্ভিক, আজ থেকে আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় সম্পদ তোমার হাতে তুলে দেওয়ার শপথ নিলাম। ওকে ভালো রেখো।”
আর্ভিক ও তানভী দুজনেই নিচু হয়ে ওনাকে প্রণাম করল। এরপর এলেন অভিক সাহেব ও রাখী রায়চৌধুরী। রাখী রায়চৌধুরীর মুখে এক পরম মমতাময়ী হাসি। তিনি তানভীর চিবুক স্পর্শ করে চুমু খেয়ে এক অনবদ্য হীরের নেকলেস তার গলায় পরিয়ে দিলেন। চকমকে সেই হীরের দ্যুতি তানভীর রূপকে যেন আরও সহস্রগুণ বাড়িয়ে দিল। আশীর্বাদের ধান-দুর্বার ছোঁয়া আর শঙ্খধ্বনিতে পুরো ঘরটা এক দিব্য আবেশে ভরে উঠল।
হাসি-ঠাট্টা আর আনন্দের এই মহোৎসবের মাঝখানেও একটি কোণ যেন গুমোট হয়ে ছিল। সে আর কেউ নয়, সে হলো তৃষাণ। সকাল থেকেই তৃষাণ তার চোখের কোণে জমে থাকা জলটা বারবার আড়ালে মুছে নিচ্ছে। তার মনে হচ্ছে, এই বাড়িটা যেন হঠাৎ একা হয়ে যাচ্ছে। ছোটবেলায় দিদির হাত ধরে হাঁটা থেকে শুরু করে পড়াশোনার জন্য বকুনি খাওয়া-সবই এখন স্মৃতি হয়ে যাবে। দিদি তো পরের বাড়িতে চলে যাবে, তখন তার মান-অভিমান শোনার মানুষটা কই? আশীর্বাদ পর্বের শেষের দিকে তৃষাণকে ডাকা হলো। রুদ্র বাবু হাসিমুখে বললেন
-“তোজো দিভাইকে মিষ্টি খাওয়াও?”
তৃষাণ কাঁপাকাঁপা হাতে মিষ্টির প্লেট থেকে একটা মিষ্টি চামচে তুলে নিয়ে এগিয়ে এল। তানভী হাসিমুখে ভাইয়ের দিকে তাকাল, তৃষাণের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে মিষ্টির টুকরোটা তানভীর মুখে তুলে দিতে যাবে, হঠাৎ তার হাতটা থরথর করে কেঁপে উঠল। চোখের জলগুলো আর বাঁধ মানল না, টুপটুপ করে গড়িয়ে পড়ল। তৃষাণ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে তানভীর গলার কাছে মুখ গুঁজল। সে শিশুর মতো কাঁদতে কাঁদতে অস্পষ্ট স্বরে বলল
-“দিভাই, তুই চলে গেলে আমার কী হবে রে? আমাকে কে বকবে? আমার বায়না কে সইবে? তুই না থাকলে এই বাড়িটা যে শ্মশান হয়ে যাবে দিভাই!”
তৃষাণের এই আকস্মিক কান্নায় উপস্থিত সকলের চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল। হাসিখুশি ঘরটা মুহূর্তেই এক বিষাদময় গাম্ভীর্যে ভরে গেল। তানভী নিজেও নিজেকে সামলাতে পারল না। সে তার ছোট ভাইটাকে বুকের মধ্যে জাপটে ধরল। তানভীর চোখের জল তৃষাণের মাথায় মিশে একাকার হয়ে গেল। সে ভাইয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে বলতে লাগল
-“পাগল ছেলে! এভাবে কাঁদছিস কেন! আমি কি হারিয়ে যাচ্ছি নাকি? তুই ডাকলেই তো আমি চলে আসব। তুই আমার সোনা ভাই না… কান্না বন্ধ কর তৃষু!”
আর্ভিক শান্ত দৃষ্টিতে এই ভাই-বোনের অমর ভালোবাসা দেখছিল। সে বুঝল, তানভীর জন্য এই মায়ার বাঁধন ছিন্ন করা কতটা কঠিন। আর্ভিক উঠে এসে তৃষাণের কাঁধে হাত রাখল।
বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। আকাশের বুক জুড়ে কালো মেঘের ঘনঘটা, যেন বৈশাখী ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। কিন্তু ব্যানার্জী মেনশনের অন্দরে তখন অন্য এক প্রস্তুতির পালা। একই দিনে আর্ভিক তানভী আইনত বিবাহে আবদ্ধ হবে, তাদের রেজিস্ট্রি ম্যারেজের আয়োজন হচ্ছে।
রুমের ভেতর একপাশে গোল টেবিল ঘিরে বসে আছেন রেজিস্টার অফিসার। তার সামনে ধবধবে সাদা আইনি নথি। ঘরোয়া এই অনুষ্ঠানে সাক্ষী হিসেবে হাজির হয়েছে আর্ভিকের প্রাণের বন্ধুরা—নীলাদ্রি, প্রেম, সোহাগ। বন্ধুদের চোখেমুখে দুষ্টুমি আর আনন্দের ছটা। তারা বারবার আর্ভিককে খোঁচা দিচ্ছে
-“কিরে! অবশেষে তবে খাঁচায় বন্দি হচ্ছিস?”
আর্ভিক হাসছে। তার এই হাসিটা বিরল, যা আজ কেবল তানভীর সান্নিধ্যেই সম্ভব হয়েছে। কলম তুলে নিয়ে আর্ভিক নথিতে সই করল, ঘর ফেটে পড়ল করতালিতে। এরপর তানভীর পালা। কাঁপাকাঁপা হাতে তানভী তার সইটা করল। রেজিস্টার অফিসার স্মিত হেসে ঘোষণা করলেন
-“আপনারা এখন থেকে আইনত স্বামী-স্ত্রী।”
এই ঘোষণাটি শোনার পর আর্ভিক ও তানভী একে অপরের দিকে তাকাল। দীর্ঘ লড়াই, মৃত্যুভয়, পারিবারিক জেদ আর বিচ্ছেদের হাহাকার পেরিয়ে আজ তারা এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। বাইরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমেছে। ধুলোর সোঁদা গন্ধে বাতাস মাতাল।
তৃষাণ দরজার আড়াল থেকে দেখছিল দিদির এই নতুন পরিচয়। তার কষ্ট হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সে জানে, দিদি তার পৃথিবীর সবচেয়ে যোগ্য মানুষের কাছেই আশ্রিত হয়েছে। আর্ভিক যে মানুষটা তানভীর জন্য নিজের বুক পেতে দিতে পারে, তার চেয়ে বেশি কেউ তানভীকে ভালোবাসতে পারে না।
আর্ভিক সবাইকে মিষ্টিমুখ করানোর মাঝে একবার তানভীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল
-“সবশেষে তবে আমার প্রনয়িনী আমারই হলো!”
তানভী কেবল লজ্জায় মুখ নিচু করে রইল।
সময় যেন পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে উড়ে চলেছে। দেখতে দেখতে বিয়ের সময় ঘনিয়ে এল। আজ তানভীর মেহেন্দি আর সঙ্গীত। ব্যানার্জী মেনশন আজ কোনো রাজপ্রাসাদের চেয়ে কম সাজেনি। আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মিশেল ফুটে উঠেছে বাড়ির প্রতিটি কোণায়। সদর দরজায় আলপনা, আর সারা বাড়ি জুড়ে মায়াবী হলদেটে আলোর রোশনাই। বিশাল উঠোনে তৈরি করা হয়েছে সঙ্গীতের রাজকীয় মঞ্চ, যা মখমল আর রজনীগন্ধার ঝালরে সুসজ্জিত।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই ব্যানার্জী মেনশন ভরে উঠেছে আমন্ত্রিত অতিথিদের কোলাহলে। বসার ঘরের এক কোণে আভিজাত্যপূর্ণ কারুকার্য করা সোফায় রাজকন্যের মতো বসে আছে তানভী। তার পরনে গোলাপী রঙের ভারী লেহেঙ্গা। একজন নিপুণ মেহেন্দি শিল্পী গত এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তার দুহাত জুড়ে সূক্ষ্ম কলকা আঁকছেন। কিন্তু চঞ্চল তানভীর কাছে এই এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকা যেন এক অগ্নিপরীক্ষা। তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সামনে চলতে থাকা নাচ-গানের আসরের দিকে।
মঞ্চে তখন ধুম লেগেছে। মেঘাদ্রি আর সোহাগ তানভীর পক্ষ নিয়ে পুরো আসর মাতিয়ে রেখেছে। তাদের নাচের তালে সারা ঘর মুখরিত। তানভী বারবার আড়চোখে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে আর মনে মনে গজগজ করছে
-“আর কতক্ষণ? হাত দুটো যেন অসাড় হয়ে গেল!”
মেহেন্দি শিল্পী মৃদু হেসে বললেন
-“একটু ধৈর্য্য ধরুন দিদিভাই, হাতের তালুর ঠিক মাঝখানটায় গোল জায়গাটা ফাঁকা রেখেছি আপনার হবু বরের নামের জন্য। ওটা শেষ করলেই ছুটি।”
ঠিক সেই মুহূর্তে গেটের কাছে এক প্রচণ্ড শোরগোল শোনা গেল। গানের আওয়াজ ছাপিয়ে ভেসে এল পরিচিত বন্ধুদের উল্লাসধ্বনি। তানভী ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই তার হৃদপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ঋষি, নীলাদ্রি, প্রেম আর রিকি, পবিত্র, পেখম পুরো দলবল নিয়ে স্বয়ং আর্ভিক হাজির! আর্ভিক ভেতরে প্রবেশ করতে করতে গান গাইছে
“Tere ghar aaya main aaya tujhko lene
Dil ke badle mein dil ka nazraana dene
Meri har dhadkan kya bole hai
Sun sun sun….”
পাশে থেকে বাকিরা সবাই একসাথে গেয়ে ওঠে
“Saajanji ghar aaye hay
Saajanji ghar aaye
Dulhan kyon sharmaaye hay
Saajanji ghar aaye…”
আর্ভিককে এই অবেলায় নিজের বাড়িতে দেখে তানভী যেমন অবাক হলো, তার চেয়েও বেশি তার চোখেমুখে খেলে গেল এক অদ্ভুত আনন্দের দ্যুতি। আর্ভিক আজ যেন কোনো এক রূপকথার রাজপুত্র। তার পরনে ধবধবে সাদা লিনেন কুর্তা আর পাজামা, কাঁধে ঝোলানো হালকা কাজের উত্তরীয়।
আর্ভিক সোজা হেঁটে এসে তানভীর সামনে দাঁড়াল। তার চোখে তখন দুষ্টুমি আর গভীর ভালোবাসার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। মেহেন্দি শিল্পীর হাত থেকে মেহেন্দির কোণটা এক প্রকার কেড়ে নিয়েই সে তানভীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। তানভীর সেই ফাঁকা রাখা হাতের তালুটা নিজের বা হাতের ওপর আলতো করে টেনে নিল আর্ভিক। তানভী বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বলল
-“আপনি? আপনি এখানে কেন? আর মেহেন্দি দিয়ে কী করছেন?”
আর্ভিক কোনো উত্তর দিল না। অত্যন্ত ধীর স্থির মনে, পৃথিবীর সমস্ত মমতা ঢেলে দিয়ে সে তানভীর হাতের তালুর ঠিক মাঝখানে নিজের নামটা লিখল। আর্ভিকের হাতের স্পর্শে তানভীর শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে কেবল অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার প্রিয় মানুষটির দিকে। আর্ভিক নামটা লিখে তার পাশে একটি ছোট্ট হৃদয়ের চিহ্ন এঁকে দিয়ে মুখ তুলে তানভীর চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল হাজারো অপ্রকাশিত কাব্যের ভাষা।
রাত তখন প্রায় বারোটা। নাচে-গানে আর হুল্লোড়ে সময় কোন দিক দিয়ে বয়ে গেছে কেউ খেয়াল করেনি। ভূরিভোজ শেষ করে এবার বিদায় নেওয়ার পালা। আর্ভিক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তার নীলাদ্রিদের উদ্দেশ্যে গম্ভীর স্বরে বলল
-“আরে চল এবার! যেতে যেতেই তো এক ঘণ্টা লাগবে। আবার ভোর চারটের সময় উঠতে হবে দধিমঙ্গলের জন্য!”
নীলাদ্রি আর প্রেম হাসতে হাসতে বলল
-“হ্যাঁ হ্যাঁ বরের এখন বিয়ের তাড়া লেগেছে!”
সবাই গাড়ির দিকে এগোতে লাগল। আর্ভিক পা বাড়াতে গিয়েও একবার থমকে দাঁড়াল। সে ঘুরে ফিরে এল তানভীর কাছে। বাড়ির আড়ালে, এক চিলতে নির্জনতায় তানভীকে কাছে টেনে নিয়ে আর্ভিক খুব নিচু স্বরে বলল
-“আর মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা তানভী… তারপর সারা জীবনের জন্য তুই আমার।”
কথাগুলো বলেই আর্ভিক দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল গাড়ির দিকে। যেতে যেতে একটা গান গাইল
ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৫
“চলনা সুজন পালায় দুজন,ওদের কে দিয়ে ফাঁকি
কোন সমান্তরাল পথের বাকে,বাসা বানিয়ে থাকি….”
আর্ভিকের বলা কথাগুলো তানভীর কানে মধুর মতো বর্ষিত হলো। তানভী বেলকনির রেলিং ধরে তাকিয়ে রইল মিলিয়ে যাওয়া গাড়ির হেডলাইটের আলোর দিকে। তার দুহাতে মেহেন্দির গাঢ় নকশা আর মনের গহীনে কালকের সেই শুভ লগ্নের প্রতীক্ষা। ব্যানার্জী মেনশনের আলোকসজ্জা যেন ফিসফিস করে বলছিল-“কাল এক নতুন সূর্য উঠবে, যা পূর্ণ করবে এক অমর প্রেমের গল্প।”
