ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৭
তানিশা ভট্টাচার্য্য
সূর্যদেব তখনও পুব আকাশে মুখ তোলেনি, অন্ধকার আর আলোর এক মায়াবী সন্ধিক্ষণ। চারদিকে পাখিদের কলকাকলি আর ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়ায় ভেসে আসছে শঙ্খধ্বনি। আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। তানভী ও আর্ভিক-দুটি ভিন্ন ধারা আজ এক মোহনায় মিলিত হতে চলেছে।
ভোরবেলাতেই ঘুম ভাঙানো হলো তানভীর। আজ তার ‘দধিমঙ্গল’। বাড়ির বড়রা মিলে আইবুড়ো মেয়েকে দই-চিঁড়ে-খই খাওয়ানোর তোড়জোড় করছেন। ওদিকে রায়চৌধুরী বাড়িতে একই ব্যস্ততা। দুই বাড়িতেই উলুধ্বনি আর শঙ্খধ্বনিতে এক পবিত্র পরিবেশ তৈরি হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, সূর্য ওঠার আগেই এই পর্ব শেষ করে দুই বাড়ির বিবাহিত মহিলারা বেরিয়ে পড়লেন জল সইতে। গঙ্গা নিমন্ত্রণ করে সেই পবিত্র জল নিয়ে আসা হলো, যা দিয়ে নতুন বর-কনেকে স্নান করানো হবে।
সকাল গড়াতেই চৌধুরী নিবাসে শুরু হলো আর্ভিকের গায়ে হলুদ। আর্ভিক আজ সাদামাটা একটা সাদা গেঞ্জি আর ধুতিতে বসেছে, গলায় ঝোলানো লাল গামছা। তার মুখে এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি। প্রথমে বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলারা তাকে হলুদের ছোঁয়া দিয়ে আশীর্বাদ করে গেলেন। কিন্তু আসল মজা তো তখন শুরু হলো যখন ময়দানে নামল নীলাদ্রি, প্রেম, রিকি আর পবিত্ররা।
ওরা সবাই মিলে আর্ভিকের সাথে হাসিমুখে ফটো তুলছিল। হঠাৎ প্রেম আর নীলাদ্রি ইশারা করতেই বাকিরা আর্ভিককে ঠেলতে ঠেলতে লন এর মাঝখানে নিয়ে এল। আর্ভিক কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক বিশাল বালতি হলুদ রঙের মিশ্রণ ওর মাথায় ঢেলে দেওয়া হলো। তবে এটা সাধারণ হলুদ নয়; এতে দই, আটা, ময়দা আর চন্দন মিশিয়ে এক ঘন আঠালো মিশ্রণ তৈরি করা হয়েছিল। আর্ভিক বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করে চিৎকার করে উঠল
-“আরে! তোরা কি পাগল হয়েগেছিস? আমাকে কি তোরা ম্যারিনেট করতে চাইছিস নাকি?”
প্রেম হেসেই খুন। সে আর্ভিকের কানের কাছে এসে রসিকতা করে বলল
-“হ্যাঁ বন্ধু! ঠিক ধরেছিস। বিয়ে মানেই তো একরকম ম্যারিনেশন। আগে ভালো করে মশলা মাখিয়ে তোকে তৈরি করছি, তারপর তো তানভী তোকে সারাজীবনের জন্য হালকা আঁচে রান্না করবে!”
সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। আর্ভিক হলুদ মাখা অবস্থাতেই তাড়া দিয়ে বলল
-“হয়েছে হয়েছে, অনেক ফাজলামি হয়েছে। এবার ছাড় আমায়। তাড়াতাড়ি হলুদটা তানভীর বাড়িতে পাঠিয়ে দে। আমার বউটা আমার জন্য না, এই হলুদের জন্য অপেক্ষা করছে। তোদের জন্য দেরি হয়ে যাচ্ছে!”
ওদিকে ব্যানার্জী মেনশনে তখন উৎসবের আমেজ। বাড়ির লন-এ সুন্দর স্টেজ তৈরি করা হয়েছে। আর্ভিকের বাড়ি থেকে হলুদের তত্ত্ব আসতেই উলুধ্বনিতে চারপাশ মুখরিত হলো। আর্ভিকের গায়ের ছোঁয়া হলুদ তানভীর কপালে আর গালে পরম আদরে ছুঁইয়ে দেওয়া হলো। তানভী আজ হলুদ লেহেঙ্গায় যেন বসন্তের প্রতিচ্ছবি।
কিছুক্ষণ ফটোশুটের পর বড়রা যখন ভেতরে গেলেন, তখনই শুরু হলো আসল কুরুক্ষেত্র। মেঘাদ্রি আর তানভীর কাজিনরা ওত পেতে ছিল। গঙ্গা নিমন্ত্রণের জল ঢালার পর মেঘাদ্রি এক বালতি জল নিয়ে তানভীর দিকে তাড়া করল। তানভী লেহেঙ্গা সামলে ছুটতে শুরু করল সারা লনে। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। মেঘাদ্রি একেবারে লক্ষ্যভেদী নিশানায় পুরো বালতি জল তানভীর ওপর উপুড় করে দিল। তানভী মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভিজে একাকার।
এরপর শুরু হলো “দড়ি টানাটানি” খেলা। ব্যানার্জী বাড়ির বিশাল সুইমিং পুলের একপাশে কনেপক্ষ আর অন্যপাশে বরপক্ষের অতিথিরা। দুই দল দড়ি ধরে প্রাণপণ দিয়ে টানছে। উত্তেজনার এক চরম মুহূর্তে কনেপক্ষ এমন এক হ্যাঁচকা টান দিল যে, বরপক্ষের রিকি আর পবিত্র টাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে সোজা সুইমিং পুলের নীল জলে আছাড় খেল। সেই দৃশ্য দেখে বাকি সবাইয়ের হাসির বাঁধ ভেঙে গেল।
বেলা গড়িয়ে গোধূলি লগ্ন ঘনিয়ে এল। তানভী ও আর্ভিক দুজনেই সনাতনী ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান, তাই বিয়ের আচারগুলোও অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করা হচ্ছে। বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ থেকে শুরু করে কুশণ্ডিকা-প্রতিটি মন্ত্রোচ্চারণে এক আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি হয়েছে।
তানভী সাজতে বসেছে। পার্লার থেকে আসা মেকআপ আর্টিস্টরা তাকে তিল তিল করে সাজিয়ে তুলছে। তার পরনে লাল বেনারসি, যার আঁচল জুড়ে সোনার সুতোর কারুকাজ। গলায় সীতাহার, কপালে চন্দনের সূক্ষ্ম অলঙ্করণ আর মাথায় পাটাসি, চেলির ওড়না। সাজ শেষ হতেই তানভী আয়নায় নিজেকে দেখে লাজুক হাসল। তারপর মেঘাদ্রির দিকে তাকিয়ে বলল
-এই, আমার বরটা কোথায় রে? তাকে তাড়াতাড়ি আসতে বল। আমার পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে, প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে আর খিদে সইতে পারছি না!”
তানভীর কথা শুনে মেঘাদ্রি, সোহাগ আর পার্লারের মেকআপ আর্টিস্টরা হেসে লুটোপুটি খেল। বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে কনের এই ‘খিদের জ্বালা’ যেন এক চিরন্তন সত্য।
ঠিক তখনই বাইরে ব্যান্ড পার্টির আওয়াজ পাওয়া গেল। কোনো গাড়ি নয়, আর্ভিক এসেছে দুধসাদা এক ঘোড়ায় চড়ে। ঠিক যেন কোনো প্রাচীন গল্পের রাজপুত্র। মাথায় টোপর, পরনে রেশমি ধুতি, কারুকাজ করা লাল রঙের পাঞ্জাবি আর গলায় ফুলের মালা। বরযাত্রীরা সব গাড়িতে এলেও আর্ভিকের জেদ ছিল সে তার প্রনয়িনীকে নিতে রাজকীয় বেশেই আসবে। তানভীর এক কাজিন হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে বলল
-“দিভাই! জামাইবাবু এসেছে! ঘোড়ায় চেপে রাজপুত্রের মতো লাগছে ওনাকে!”
তানভীর ঠোঁটে তখন প্রশান্তির হাসি। দোয়েল ব্যানার্জী গিয়ে আর্ভিককে বরণ করে নিলেন। তারপর আর্ভিক কে নিয়ে যাওয়া হল ছাদনাতলায়। কিছুক্ষণ পর তানভীকে আনা হল।
তানভী ও আর্ভিকের শুভদৃষ্টির সময় আর্ভিক যখন তানভীর দিকে তাকাল, তখন পৃথিবীর সব আলো যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। আর্ভিক সবার অলক্ষ্যে তানভীকে দেখে একটা দুষ্টুমি ভরা চোখ টিপ মারল। তানভী লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে নিল।
মডার্ন ডিজাইনের ছাদনাতলায় শুরু হলো বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ। কুশণ্ডিকা ও হোম হওয়ার পর এল চিরপ্রতীক্ষিত মুহূর্ত সাতপাকে ঘোরা। অগ্নিকে সাক্ষী রেখে আর্ভিক আর তানভী সাতবার পাক দিল। এরপর সিঁদুর দান। আর্ভিক যখন তানভীর সিঁথিতে রক্তিম সিঁদুর লেপে দিল, তানভীর চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল। এ জল দুঃখের নয়, এ জল দীর্ঘ লড়াইয়ের পর প্রাপ্তির জল।
বিয়ের পর্ব শেষ হতে হতে রাত গভীর হয়েছে। বরপক্ষ খাওয়া-দাওয়া সেরে একে একে বিদায় নিলেও আর্ভিকের বন্ধুরা রয়ে গেছে। খাওয়ার পর যখন আর্ভিক আর তানভী একসাথে বসেছে, তখনই শুরু হলো নতুন উপদ্রব। আর্ভিক পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল তার জুতো জোড়া গায়েব!
তানভীর কাজিনরা সেই জুতো নিয়ে সারা মণ্ডপে দৌড়াচ্ছে আর আর্ভিকের বন্ধুরা তাদের পেছনে ছুটছে। শেষমেশ রফা হলো বাসর ঘরের দরজায়। তানভীর কাজিনরা পথ আটকে দাঁড়াল। মেঘাদ্রি হাত পেতে দাবি করল
-“দাদাভাই, ৫০ হাজার টাকা না দিলে দরজা খুলব না আর জুতোও ফেরত পাবে না!”
রিকি মেঘাদ্রির পাশে গিয়ে দাঁড়ালো তারপর বলল
-“এবার আমি কনেপক্ষ আমাকেও টাকা দিতে হবে।”
রিকির কথায় সকলে হাসলেও মেঘাদ্রি বিরক্তি মাখা চোখে রিকির দিকে দেখলো। আর্ভিক মুচকি হেসে পাঞ্জাবির পকেট থেকে বের করল এক লাখ টাকার একটি চেক। মেঘাদ্রির হাতে সেটা ধরিয়ে দিতেই সবাই অবাক। প্রেম বলল
-“আর্ভিক তুই কি আগে থেকেই চেক লিখে নিয়ে ঘুরছিলি?”
আর্ভিক তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল
-“একে বলে কমনসেন্স, যা তোদের নেই! আমি জানতাম এগুলো হবে, তাই আগে থেকেই প্রিপারেশন নিয়ে রেখেছিলাম।”
হাসাহাসি আর হুল্লোড়ের মাঝে সবাই বাসর ঘরে প্রবেশ করল। গান-বাজনা, অন্ত্যাক্ষরী আর খুনসুটিতে ঘর মেতে উঠল। সারাদিনের ধকল আর মানসিক উত্তেজনার পর তানভী খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। গল্পের মাঝপথেই সে আর্ভিকের কোলের ওপর মাথা রেখে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
আর্ভিক পরম মমতায় তানভীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। তার বন্ধুরা যে যার মতো ঘরের কোণে বা সোফায় ঘুমিয়ে পড়েছে। আর্ভিক অপলক দৃষ্টিতে তানভীর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আজ সব বাধা দূর হয়েছে। আকাশের চাঁদটা যেন জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখছে এক সফল প্রেমের পরিসমাপ্তি। আর্ভিক এক দীর্ঘ তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল
-“অবশেষে আমার প্রনয়িনী আজ আমার অন্দরের রাণী।”
বাসি বিয়ের সকালে ব্যানার্জী মেনশনের প্রাঙ্গণে এক বিষণ্ণ সুর বেজে উঠল। আনন্দ আর বিদায়ের এই অদ্ভুত সংমিশ্রণ বাঙালির চিরন্তন রীতি। রুদ্র বাবু আজ বড়ই নিঃস্ব। যে মেয়েকে এতদিন বুকের পাঁজরে আগলে রেখেছিলেন, আজ তাকে পরের ঘরে পাঠাতে হবে। বাসি বিয়ের আশীর্বাদের সময় রুদ্র বাবু যখন তানভীর মাথায় হাত রাখলেন, তার দুচোখ দিয়ে প্লাবন নেমে এল। তিনি কাঁপাকাঁপা হাতে আর্ভিকের হাতের ওপর তানভীর হাতটা রাখলেন।
এরপর রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন
-“আর্ভিক, আজ আমার হৃদয়ের টুকরোটাকে তোমার হাতে তুলে দিলাম। জীবনে অনেক ঝড় এসেছে, কিন্তু ও যেন আর কোনোদিন না কাঁদে। আমার মামণিকে একটু দেখে রেখো বাবা।”
পুরো মণ্ডপে তখন এক পিনপতন নিস্তব্ধতা। আর্ভিক রুদ্র বাবুর হাতের ওপর নিজের শক্ত হাত রেখে ধীরস্থির কণ্ঠে উত্তর দিল
-“বাবা, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আপনার মেয়ে এতদিন আপনার কাছে রাজকন্যা ছিল, আজ থেকে সে আমার হৃদয় রাজ্যের রাণী হয়ে থাকবে। ওর চোখের এক ফোঁটা জল আমি আমার পড়তে দেবো না, আর যদি পড়ে তবে তা কেবল সুখেরই হবে, এ আমার প্রতিশ্রুতি।”
আর্ভিকের এই গভীর ও আত্মবিশ্বাসী কথাগুলো উপস্থিত সবার মনে এক প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দিল। বিদায়ের ক্ষণ উপস্থিত। তানভী সবাইকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদছে। তার সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে ছোট ভাই তৃষাণকে ছেড়ে যেতে। তৃষাণ আজ একদম অবুঝ শিশুর মতো আচরণ করছে। সে তানভীকে ছাড়তেই চাইছে না। হেঁচকি তুলতে তুলতে আর্ভিকের পাঞ্জাবি টেনে ধরে বলল
-“আর্ভিক ভাইয়া, তুমি আমার যা আছে সব নিয়ে যাও। আমার খেলনা, আমার মোবাইল, বাইক সব নিয়ে যাও কিন্তু প্লিজ আমার দিভাইকে নিয়ে যেও না। ও চলে গেলে আমি কার সাথে মারপিট করব?”
তৃষাণের এই করুণ আকুতি দেখে উপস্থিত কেউই চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না। আর্ভিক নিজেও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। সে এগিয়ে এসে তৃষাণ কে জড়িয়ে ধরল।
বিদায়বেলায় আর্ভিক এক চমক দিল। বাড়ির সামনে কোনো গাড়ি নয়, দাঁড়িয়ে ছিল রত্নখচিত এক রাজকীয় পালকি। আর্ভিক মুচকি হেসে তানভীর কানে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“বলেছিলাম না, আমার রাণীকে আমি রানীর মতোই নিয়ে যাব!”
লাল বেনারসিতে মোড়া তানভী পালকিতে উঠল, ব্যানার্জী মেনশন পেছনে ফেলে পালকি এগোতে লাগল চৌধুরী নিবাসের দিকে।
চৌধুরী নিবাসে তখন উৎসবের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়েছে। রাখী রায়চৌধুরী বরণডালা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর আর্ভিকরা পৌঁছে গেল। তানভী পালকি থেকে নামতেই তার মাথার উপর রাশি রাশি গোলাপের পাপড়ির বর্ষণ হলো। এরপর বড়দের আশীর্বাদ নিয়ে তানভী দুধে-আলতা ভর্তি থালায় পা রাখল, আর্ভিক তখন আলতো করে তার হাত ধরে রেখেছিল। লাল পায়ের ছাপ ফেলে তানভী অন্দরমহলে প্রবেশ করল, তখন মনে হলো লক্ষ্মী যেন স্বয়ং মর্ত্যে অবতীর্ণ হলেন। তারপর নব দম্পতি ঠাকুর ঘরে গিয়ে ঠাকুরকে প্রনাম করলো। ঠাকুর ঘর থেকে বের হতেই আর্ভিক তানভীকে কোলে তুলে নিল। সকলের সামনে এভাবে তানভী কে কোলে নেওয়াতে তানভী বেশ লজ্জা পেল। তানভী আর্ভিককে বলল
-“কী করছেন নামান! সবাই দেখছে!!”
আর্ভিক তানভীর কথায় পাত্তা দিল না, সকলের সামনে দিয়ে তানভীকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। রুমে পৌঁছে আর্ভিক তানভীকে নামিয়ে একটি আলমারির দিকে ইশারা করে বলল
-“বউ, এই আলমারিতে তোমার প্রয়োজনীয় সবকিছু সাজানো আছে।”
আর্ভিকের মুখ থেকে প্রথমবার ‘তুমি’ সম্বোধন শুনে তানভীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। সে আমতা আমতা করে বলল
-“আপনি তো আমাকে তুই করে বলতেন, হঠাৎ তুমি….”
আর্ভিক কাছে এসে তার কথা থামিয়ে দিয়ে বলল
-“এখন থেকে তুমিই বলব সারাজীবনের জন্য অধিকারটা নিয়ে নিলাম। তুমি তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিচে আসো।”
তানভী আলমারি খুলতেই অবাক হয়ে গেল। সেখানে তার পছন্দের শাড়ি থেকে শুরু করে ডায়েরি, কলম, আরো অনেক কিছু নিখুঁতভাবে সাজানো। তানভী সেখানে থেকে একটা শাড়ি বের করে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিচে এলো। এরপর শুরু হলো বৌভাতের আমেজ ও বর-কনে বরণ করার সেই জনপ্রিয় সব খেলা। আংটি খোঁজা থেকে শুরু করে কড়ি খেলা-আর্ভিক ইচ্ছা করেই প্রতিটি খেলায় তানভীর কাছে হেরে যাচ্ছিল। সে শুধু তানভীর মুখে জয়ের হাসিটা দেখতে চাইছিল।
নিয়ম অনুযায়ী আজ কালরাত, সূর্যাস্তের পর বর-বউ একে অপরের মুখ দেখবে না। রাতে তানভী রাখী রায়চৌধুরীর ঘরেই শুয়েছে। কিন্তু চৌধুরী নিবাস আজ ভরে আছে আত্মীয়স্বজনে। আর্ভিকের জনা দশেক কাজিন বালিশ হাতে নিয়ে বাড়ি চষে বেড়াচ্ছে, কোনো ঘরেই একটুও তিল ধারণের জায়গা নেই। তারা আর্ভিকের ঘরের সামনে এসে দরজায় নক করল, আর্ভিক গটগট করে বেরিয়ে এল। একজন কাঁচুমাচু করে বলল
-“দাদাভাই, কোনো ঘরেই তো জায়গা নেই। আমরা কোথায় ঘুমাব?”
আর্ভিক আড়চোখে একবার বিশাল করিডোরটার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল
-“এত বড় করিডোর চোখে পড়ছে না? যা, ওখানেই শুয়ে পড়।”
বলেই সে দরজাটা দড়াম করে বন্ধ করে দিল। বেচারা কাজিনরা সেখানেই লাইন দিয়ে শুয়ে পড়ল, তাদের সেই অসহায় মুখগুলো দেখে আর্ভিকের হাসির রোল উঠল মনে মনে।
পরের দিন সকালে নিয়ম মেনে তানভী প্রথম পায়েস রান্না করল। পায়েসের সুগন্ধ সারা বাড়ি ছড়িয়ে পড়ল। এরপর শুরু হলো ভাত কাপড়ের অনুষ্ঠান। আর্ভিক সবার সামনে সাজানো এক থালা ভাত আর একজোড়া দামি শাড়ি তানভীর সামনে ধরল। ধীর কণ্ঠে গম্ভীরভাবে বলল
-“আজ থেকে তোমার সারাজীবনের ভাত-কাপড়ের দায়িত্ব আমি নিলাম।”
তানভী মাথা নিচু করে সেই থালা গ্রহণ করল এবং আর্ভিকের চোখের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে উত্তর দিল
-“আর আজ থেকে তোমার আর এই পুরো সংসারের দায়িত্ব আমি নিলাম।”
সন্ধ্যার রিসেপশনটা ছিল এক কথায় অনন্য। শহরের সবচেয়ে বড় লন-এ এক বিশাল স্টেজে আয়োজন করা হয়েছিল। মেকআপ আর্টিস্টরা তানভীকে সাজিয়ে দিচ্ছে। পরনে টকটকে লাল লেহেঙ্গা, কুন্দনের গয়না আর মেকআপ করা। আর্ভিক পড়েছিল সাদা শেরওয়ানি আর রাজকীয় পাগড়িতে।
আর্ভিক তানভীর হাত ধরে স্টেজের দিকে এগোতে লাগলো। স্টেজে ওঠার সময় কৃত্রিম ধোঁয়া চারপাশটা রহস্যময় করে তুলেছিল। স্টেজের ওপর ছিল এক বিশাল শিবলিঙ্গ। আর্ভিক মহাদেবের একনিষ্ঠ ভক্ত। হাজার হাজার অতিথির সামনে তরুণ পুরোহিতরা চারপাশ থেকে বারাণসীর গঙ্গা আরতির মতো আরতি শুরু করলো। আকাশে ফাটতে লাগল রঙ-বেরঙের বাজি।
আর্ভিক আর তানভী পরম ভক্তিতে শিবলিঙ্গের ওপর দুধ দিয়ে অভিষেক করল। তারপর হাত জোড় করে প্রনাম করলো। এরপর মালাবদলের সময় যখন তানভী মালা পরাতে যাবে, আর্ভিক অমনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। হাজারো ক্যামেরার ফ্ল্যাশ তখন সেই দৃশ্যটি বন্দি করে রাখল। আর্ভিক বুঝিয়ে দিল, যে যতবড়ই হোক, প্রিয়তমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসাটা লজ্জার নয় বরং গর্বের।
অবশেষে এল সেই রাত। ফুলের গন্ধে ম ম করছে আর্ভিকের ঘর। গোলাপ ফুলে সাজানো ঘর-বিছানা। আর্ভিকের কাজিনরা দরজায় পথ আটকে দাঁড়িয়ে ছিল। আর্ভিক এবার আর দেরি করল না, সোজা একটা চেক -এ সই করে তাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল
-“ইচ্ছে মতো অ্যামাউন্ট বসিয়ে নিস! এখন সামনে থেকে সর!”
আর্ভিক ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিয়ে দেখল তানভী ঘোমটা টেনে লাজুক মুখে বসে আছে। আর্ভিক এসে আলতো করে তানভীর ঘোমটা তুলে তার কপালে একটা গাঢ় চুমু খেল। আর্ভিকের চোখে তখন ভালোবাসার সাগর। আর্ভিক বলল
-“যাও, ফ্রেশ হয়ে এসো।”
তানভী ফ্রেশ হয়ে আসতেই দেখল আর্ভিক টেবিলে বই-খাতা সাজিয়ে বসে আছে। তানভীকে দেখে আর্ভিক গম্ভীর গলায় বলল
-“বলো তো, ইউপিএসসি-র জন্য লাস্ট কোন চ্যাপ্টারটা পড়েছিলে? বিয়ের জন্য তো অনেকদিন পড়া হয়নি। এবার বসো দেখি পড়তে।”
তানভীর মনে হলো সে চারশো চল্লিশ ভোল্টের কারেন্ট শক খেল। সে থতমত খেয়ে বলল
-“মানে? এই এখন আমি পড়তে বসব?”
আর্ভিক শাসনের সুরে বলল
-“হ্যাঁ, তোমার এক্সাম সামনে।”
তানভী রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে বিড়বিড় করতে লাগল
-“কী অসভ্য লোক রে বাবা! ফার্স্ট নাইটে কেউ কাউকে পড়তে বসায়? একদম আনরোমান্টিক কোথাকার!”
আর্ভিক আড়াল থেকে সবই শুনতে পাচ্ছিল। সে মুচকি হেসে তানভীকে টেনে বিছানায় নিয়ে এল। তারপর বলল
-“ঠিক আছে বাবা, রাগ করতে হবে না। আজ ঘুমিয়ে পড়ো, কাল থেকে পড়া শুরু।”
তানভী অভিমান করে উল্টো দিকে ঘুরে শুয়ে রইল। আর্ভিক পেছন থেকে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
পরের দিন সকালবেলা তানভী সবার আগে উঠে রান্নাঘরে গিয়ে ব্রেকফাস্ট তৈরি করতে শুরু করল। কিন্তু তখনই রাখী রায়চৌধুরী সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি রীতিমতো তানভীকে ধমক দিয়ে বললেন
-“কিরে গুল্লু! তুই এখানে কী করছিস? তোকে আমি বলেছি রান্না করতে? যা, গিয়ে পড়তে বস!”
তানভী চুপচাপ রুমে ফিরে এল। দেখল আর্ভিক আয়েশ করে বিছানায় বসে আছে। তানভী বিরক্তি নিয়ে বলল,
-“আপনারা কি সবাই মিলে আমাকে বইয়ের পোকা বানাতে চান?”
আর্ভিক তানভীর সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর তানভীর দুগালে হাত রেখে তার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্তভাবে বলল
-“তানভী, তুমি বিয়ে করে শুধু আমার ঘরণী হওনি, তুমি রায়চৌধুরী পরিবারের সম্মান হতে যাচ্ছ। বিয়ের আগে তুমি যে স্বাধীন তানভী ছিলে, বিয়ের পরও তুমি সেই একই তানভী আছো। কোনো কিছু বদলায়নি। শুধু বদলেছে তোমার পরিচয়। আমরা সকলে চাই তুমি তোমার লক্ষ্যে পৌঁছাও।”
তানভী আর্ভিকের হাত সরিয়ে পড়ার টেবিলের দিকে এগোতে এগোতে নিচু স্বরে আবারও বলল
-“হুঁ, আনরোমান্টিক কোথাকার!”
আর্ভিক শুনতে পেয়ে হেসে ফেলল। সে পেছন থেকে বলল
-“ঠিক আছে, পরীক্ষাটা একবার হয়ে যাক। তারপর এই আনরোমান্টিক মানুষটা কতটা রোমান্টিক হতে পারে, সেটা তোমাকে সুদে-আসলে বুঝিয়ে দেব!”
তানভী থমকে দাঁড়াল। সে তো খুব আস্তে বলেছিল, তাহলে লোকটা শুনল কী করে? লজ্জায় তার কান গরম হয়ে গেল। আর্ভিক আবারও ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বলল
ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৬
-“ভাবনার জগত থেকে ফিরে এসে পড়তে বসো এবার!”
তানভী বই খুলল বটে, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে লেগে রইল এক চিলতে সুখের হাসি। আজ সে পূর্ণ। তার পাশে এমন একজন মানুষ আছে, যে তাকে শুধু ভালোবাসে না, তাকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেওয়ার সিঁড়ি হতে জানে। এভাবেই শুরু হলো দুই নরনারীর এক নতুন ও রঙিন পথচলা।
