ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৮ (২)
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই
মাথায় ঘোমটা দিয়ে শাশুড়ির ঘরে দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়তা। নীল জামদানি শাড়িতে সর্বাঙ্গে নতুন বউ—নতুন বউ একটা ব্যাপার। খুব সুন্দর স্নিগ্ধ এবং মায়াবী দেখাচ্ছে তাকে যেন সদ্য ফুটন্ত কোন তাজা গোলাপ।
অনুশ্রী বেগম কয়েক মিনিট মন ভরে দেখলেন তার পুত্রবধূকে। এতগুলো বছর মেয়ে হিসেবে দেখলে ও ছেলের বউ হিসেবে ওভাবে কোনদিন দেখা হয়নি। এই তো সেই দিনের কথা ছোট্ট ছোট্ট পায়ে সারা বাড়ি দৌড়ে বেড়াতো মেয়েটা আর এটা ওটা বায়না করতে প্রণয়ের কাছে। সেই মেয়েটা দেখতে দেখতে কত বড় হয়েছে।
এগুলো বাদে ও এই মেয়েটাকে ওনার সব থেকে বেশি দামি মনে হয় কারণ এই মেয়েটা উনার ছেলের প্রাণ ভালো থাকার কারণ।
এই মেয়েটা সাথে থাকলে ওনার ছেলেটা সব খারাপ থেকে দূরে থাকে, নিজেকে ভাঙ্গে না, প্রাণ খুলে হাসে। তাহলে উনি কেন ভালোবাসবেন না এই মেয়েটাকে।
অনুশ্রী বেগম অভিজ্ঞ চোখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করলেন প্রিয়তাকে এবং বুঝতে সময় লাগলো না যে সকাল সকাল উনার ছেলেটা কেন এত হাসিখুশি ছিল।
কাল অবধি মেয়েটাকে নিছকই মেয়ে মনে হতো, কিন্তু আজ পরিপূর্ণ নারী মনে হচ্ছে। এটাই বুঝি নারীদের সার্থকতা।
অনুশ্রী বেগম মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। নিজের হাত থেকে সাবেকী আমলের বড় বড় দুটো বালা খুলে পরিয়ে দিলেন পুত্রবধূর হাতে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
লাজুক হেসে সালাম করল প্রিয়তা।
অনুশ্রী বেগম থুতনিতে হাত রেখে সন্তুষ্টি নিয়ে বললেন,
“মাশাল্লাহ আমার ছেলের সাথে খুব সুন্দর মানিয়েছে। দোয়া করি সুখী হও। আল্লাহ তোমাদের নেক হায়াত দান করুন। তোমার সংসার জীবন দীর্ঘ হোক। ভালো থেকো, ভালো রেখো আমার ছেলেকে। আমার ছেলেটা তোমার পাগল। পৃথিবীর সব কিছুর দূরত্ব সে সয়ে নিতে পারবে কিন্তু তোমার দূরত্ব ওটা সইতে পারে না আমার ছেলে। তুমি হয়তো কোনোদিনও তার ভালোবাসার অপরিসীমতা পরিমাপ করতে পারবে না কিন্তু আমি মা তো তাই আমি বুঝি।”
প্রিয়তা মনে মনে আপ্লুত হলো। কে না চায় তার ভালোবাসার মানুষটা তার জন্য পাগল থাকুক। প্রিয়তা তো মনে মনে প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে দোয়া করে যেন তার প্রণয় ভাই তার প্রতি আরো আরো অনেক বেশি পাগল হয়ে যায়, যেন ছেড়ে এক মুহূর্ত ও থাকতে না পারে। আল্লাহ ও মনে হয় তার প্রতিটা আর্জি কবুল করেন।
প্রিয়তা মাথা নিচু করে নম্র কণ্ঠে বলল,
“জি, চেষ্টা করব বড় আম্মু।”
অনুশ্রী বেগম প্রসন্ন হলেন কিন্তু প্রিয়তাকে নিজ অবস্থান বুঝিয়ে দিতে বললেন,
“হুম। কিন্তু এই বউয়েদের অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়, জানো তো দেখেছো নিশ্চয়ই। এত দিন তুমি এই বাড়ির মেয়ে ছিলে তখনকার হিসেবটা আলাদা ছিল, কিন্তু এখন তুমি এই বাড়ির বউ—বড় বউ। সম্পর্কে সবার বড়, সব বউদের বড়। তাই তোমাকেও এখন থেকে সংসারের দায়িত্ব নিতে হবে। নিয়ম সবার জন্য সমান।”
“জি বড় আম্মু।”
“ঠিক আছে। যাও রান্নাঘরে গিয়ে সেজো বউ আর ছোট বউয়ের সাথে নাস্তা বানাও। আর দুপুরবেলা তোমার বড় আব্বু কী খাবে আর কে কে কি কি খাবে জেনে নিয়ে রান্না বসাইয়ো।”
“জি বড় আম্মু।”
“সেজো বউ, মেজো বউ, ছোট বউ”—হাঁক ছেড়ে ছেলের বউদের ডাকলেন অনুশ্রী বেগম।
শাশুড়ির ডাকতে দেরি হলো না কিন্তু ঊষা, ইনায়া, পূর্ণতা—তিনজনই ঘরে এসে হাজির হতে দেরি হলো না।
অনুশ্রী বেগম ছেলের বউদের উদ্দেশে বললেন,
“তোমরা নিশ্চয়ই জানো, ও তোমাদের বড় জা। এখন থেকে সেভাবেই সম্মান করবে। যে কোনো কাজে ওকে ডাকবে, তোমাদের সাথে রাখবে।”
ঊষা নিচু কণ্ঠে বলল,
“জি আম্মা।”
“ঠিক আছে, এখন যাও চারজন।”
“জি আম্মা।”
শাশুড়ির ঘর থেকে বেরিয়ে এলো তারা। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল থিরা আর পরিণীতা। বড় ভাইয়ের বিয়ের খবর শুনে দেখতে এসেছে পরিণীতা। সব সত্যি জানার পর প্রিয়তার প্রতি তার আর বিন্দুমাত্র রাগ নেই বরং এখন সে তার ভাইকে সুখে দেখতে চায়। তার কেবল একটাই চাওয়া—তার ভাইটা যেন এবার একটু সুখের মুখ দেখে।
ওরা সবাই মিলে রান্নাঘরের দিকে এগোল। প্রিয়তা সবার সাথে পায়ে পা মিলাতে গেলে হাত টেনে ধরল ইনায়া।
ঝাড়ি মেরে বলল,
“আস্তে দৌড়া বেয়াদব ছেড়ি! আমি কি এত জোরে যেতে পারি?”
পায়ের গতি থামিয়ে দিল প্রিয়তা। নিজের মনে মনেই একটু পর পর লাজুক হাসছে। ব্যাপারটা খেয়াল করল ইনায়া। বান্ধবীর চোখেমুখে ঈদের চাঁদ জ্বলজ্বল করছে দেখে কপাল কুঁচকে ফেলল।
এক জায়গায় থেমে গিয়ে সন্দিহান গলায় বলল,
“কি ব্যাপার? চোখ-মুখ ঈদের চাঁদ উঁকি দিচ্ছে কেন?”
লজ্জা গিলে নিয়ে স্বাভাবিক হলো প্রিয়তা। ইনায়া এবার ফাক ফুকোর দিয়ে উঁকি-ঝুঁকি মারতে শুরু করল।
উদ্দেশ্য বুঝে দূরে সরে গেল প্রিয়তা। লাজুক হেসে বলল,
“কি করছিস?”
ইনায়া কোনো জবাব না দিয়ে এগিয়ে এসে ঘোমটা নামিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গেই চোখ আটকে গেল তার।
নির্লজ্জ বান্ধবীর হাতে ধরা পড়ে গিয়ে লজ্জায় কাল গরম হয়ে উঠলো প্রিয়তার।
ঘাড়ে, গলায় অজস্র লালচে দাগ। নিঠল ফর্সা ত্বকে দাগগুলো খুবই চোখে পড়ছে। ঘুমটা দেওয়ার দরুন চুলগুলো দেখা যাচ্ছিল না কিন্তু এবার চুলের দিকে নজর গেল ইনায়ার। হাটু ছাড়ানো ঘন কালো চুল গুলো উন্মুক্ত। ইনায়া চুলে ধরে দেখল পানি চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। চোল শুকানোর সময় পায়নি প্রিয়তা, তার আগেই শাশুড়ি ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
ঘটনা ঘটে গেছে বুঝে দাঁত কেলিয়ে হাসল ইনায়া। ক্ষতচিহ্নগুলো দেখিয়ে চিন্তিত হওয়ার ভান করে বলল,
“হায় হায় লো বান্ধবী! এত ব্যথা কিভাবে পেলি?”
প্রিয়তা লজ্জায় কান মুখ গরম হয়ে উঠছে। সে আমতা আমতা করে বলল,
“চুলকানি।”
উত্তর শুনে ফিক করে হেসে দিল ইনায়া। পিঞ্চ মেরে বলল,
“চুলকানি তো বটেই, কিন্তু এই চুলকানি সেই চুলকানি নয় রে পাগলা। এ পিরিতের চুলকানি। এই চুলকানিতে মলম লাগে না, জামাই লাগে! কিন্তু বান্ধবী মনে রেখো—শীতকালে জামাই থাকা নেয়ামত কিন্তু সকাল সকাল গোসল করা ইটস কেয়ামত।”
“ছি! কি নষ্ট তুই। আমি ওসব কিছুই করিনি। আমি পিওর ভার্জিন!”
ওর কথায় পাত্তা দিলোনা ইনায়া। বাঁকা হেসে বেশুরো গলায় গান ধরল—
“ঘটনা এমনি ঘটে না ও বন্ধু রে,
এক হাতে তালি বাজে না।
রাধা কৃষ্ণ দোস্তি করে না ও বন্ধু রে,
ভানটা এমন কিছুই জানো না!”
“ধুর!”
“জাহ বাবা! সত্যি বললেই ইনায়া পচা হয়ে যায়। আচ্ছা বান্ধবী, কেমন ফিলিংস হয়েছে বল তো একটু?”
“কি গায়ে পড়া রে বোইন তুই! বেশরম আওরাত। একটু লজ্জা শরম রাখ, লজ্জা করে না এসব জিগাতে?”
“জাহ! বান্ধবীর কাছে আবার শরম কিসের? বল না, কেমন ফিল করেছিস। এমনি আমার বাশুর কে দেখলেই বোঝা যায় উনার মত সুপুরুষ এই গোটা খানদানের আর একটাও নেই?”
“আমার থেকে তো তোর এক্সপেরিয়েন্স বেশি। আমার জামাই এর দিকে নজর দিবি না। চোখ তুলে ফেলবো।”
বলে চলে গেল প্রিয়তা।
“আরে দাঁড়া বান্ধবী!” —পিছু নিল ইনায়া।
চোখ ভর্তি পানিতে টলমল করছে প্রহেলিকার। তাদের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল প্রহেলিকা, কিন্তু কথার তালে কেউ খেয়াল করলো না।
সবটা শুনে নিঃশ্বাস আটকে আসছে প্রহেলিকার। দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসছে পানিতে। অসহ্য এক কষ্টে গলা চেপে ধরছে। সবটা নিজের চোখের সামনে দেখা সত্ত্বেও মানতে চাচ্ছেনা প্রহেলিকা। প্রিয়তার সর্বাঙ্গে জ্বলজ্বল করছে প্রণয়ের গভীর ভালোবাসার প্রতীক চিহ্ন। তার ভালোবাসার মানুষটা অন্য কাউকে এভাবে ভালোবেসেছে—এটা কল্পনা করতে ও মৃত্যু সময় যন্ত্রণা হচ্ছে প্রহেলিকার। প্রণয় অন্য কাউকে আপন করেছে, ছুয়েছে, ভালোবেসেছে। আর কল্পনা করতে পারল না প্রহেলিকা। হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল।
প্রচন্ড কান্না দলা পাকিয়ে আসছে কন্ঠনালীতে। একসময় আর ধরে রাখতে না পেরে প্রহেলিকা ঝর ঝর করে কেঁদেই দিল।
“কি হয়েছে? কাঁদছো কেন তুমি?”
দরজায় দাঁড়িয়ে জানতে চাইলেন অনুশ্রী বেগম।
প্রহেলিকা অশ্রুসিক্ত চোখে তাকাল। আর কিছু বলার সুযোগ পেলে না অনুশ্রী বেগম। তার পূর্বেই দৌড়ে এসে বুকের উপর হামলে পড়লো প্রহেলিকা।
ভড়কে গেলেন অনুশ্রী বেগম।
হাউমাউ করে চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল প্রহেলিকা। কান্নার তোড়ে কথা সব জড়িয়ে যাচ্ছে।
মাথায় হাত রাখলেন অনুশ্রী বেগম। নরম কণ্ঠে বললেন,
“কি হয়েছে আম্মু? কাঁদছো কেন?”
বহু চেষ্টার পর ভাঙ্গা কন্ঠে অস্পষ্ট কিছু বাক্য বলল প্রহেলিকা,
“আমি মরে যাব বড় আম্মু। একদম মরে যাব… আমি একটু ও সহ্য করতে পারছি না… আমার কলিজাটা টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে… আমাকে এত কষ্ট দিও না বড় আম্মু তোমরা আমাকে মেরে ফেলো। তোমার ছেলে অন্য কারো—এটা আমি সহ্য করতে পারছি না। তোমার ছেলের ভালোবাসায় অন্য কেউ ভাগ বসাচ্ছে বড় আম্মু… তোমার ছেলে অন্য কাউকে আপন করে নিচ্ছে… অন্য কাউকে ভালোবাসছে… অন্য কাউকে… অন্য কাউকে… আমি তোমার ছেলেকে খুব খুব খুব ভালোবাসি বড় আম্মু। তোমার ছেলেকে খুব ভালোবাসি…”
কথা শেষ না হতেই হু হু করে কেঁদে উঠল সে।
কান্নার শব্দে পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন অনন্যা বেগম ও অর্থি বেগম।
অনন্যা বেগম অবাক হয়ে বললেন,
“কি হয়েছে বড় আপা?”
অনুশ্রী বেগম অসহায় দৃষ্টিতে তাকালেন।
হঠাৎ করেই কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল প্রহেলিকা।
“ও তো অজ্ঞান হয়ে গেল! বড় ভাইজানকে ডাকবো?” —ভয়ে বললেন অর্থি বেগম।
অনুশ্রী বেগম শান্ত গলায় বললেন,
“কিছু হয়নি। নরমাল প্যানিক অ্যাটাক। ওকে ধরে ঘরে নিয়ে চলো।”
ওরা দু’জন মিলে প্রহেলিকাকে নিয়ে গেল।
অনন্যা বেগম উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,
“ও এমন করছিল কেন?”
অনুশ্রী বেগম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
“আঘাত পেয়েছে খুব।”
“মানে?”
“এসব নিয়ে আমাদের কথা বলার ঠিক না। বলে লাভ ও নেই। ওর চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে দাও। আর ওকে তিনতলায় বেশি যেতে দিও না।”
আর কোনো প্রশ্ন করলেন না কেউ।
আমি অরণ্য হলেও আমার ভেতরে অরণ্যার অস্তিত্ব টের পাই।
রেস্টুরেন্টের কর্নার সিটে বসে ১৪২ নম্বর গার্লফ্রেন্ডের উদ্দেশে কথাটা বলল অরণ্য। চোখ-মুখ তার খুবই সিরিয়াস।
তার সামনে বসে আছে সাদিয়া। পুরো নাম সাদিয়া কামাল। আর তার বর্তমান পরিচয়—সে অরণ্যের ১৪২ নম্বর গার্লফ্রেন্ড। যদিও এই মহান সত্যটা সম্পর্কে অবগত নয় সে, এমনকি অরণ্যের উদারতা সম্পর্কেও বিন্দুমাত্র ধারণা নেই তার।
অরণ্যের পাশের সিটে বসে প্রচণ্ড মনোযোগের সহিত বড় ভাইয়ের ৫৮০ নম্বর ব্রেকআপ স্টোরি এনজয় করছে তন্ময়। হাতে লেমন মোহিত, একটা করে সিপ দিচ্ছে আর তাদের কাহিনি ইনজয় করছে।
সাদিয়া অরণ্যের কথা শুনে বেকুব বনে গেল। বুঝতে না পেরে বলল,
“অরণ্যা মানে?”
অরণ্য কেশে গলা ঝেড়ে নিল। চোখ-মুখের সিরিয়াস ভাবটা আরও খানিকটা প্রগাঢ় করে বলল,
“মানেটা খুব সহজ। আমি যেকোনো সময় অরণ্য থেকে অরণ্যা হয়ে যেতে পারি। আমাকে বিয়ে করলে কোনো একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখবে আমি তোমার সায়া-ব্লাউজ পরে ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। তখন তোমার মান-ইজ্জত নিয়ে টানাটানি শুরু হবে, বলে দিলাম।”
সাদিয়া কেবল পানির গ্লাসে চুমুক দিয়েছিল। কিন্তু অরণ্যের কথার মর্মার্থ বুঝতে পেরে পানিটা নাক দিয়ে মাথায় উঠে গেল।
অরণ্য টিস্যু এগিয়ে দিয়ে বলল,
“এই শেষ নয়, আরও আছে।”
সাদিয়া কণ্ঠে আতঙ্ক নিয়ে বলল,
“অরণ্য, এগুলো তুমি কী বলছ? তোমার মাথা ঠিক আছে?”
অরণ্য প্রবল আত্মবিশ্বাসের সহিত বলল,
“আমি যা বলছি সব সত্যি বলছি। মিথ্যা বলে আমি তোমাকে ঠকাতে চাই না। বিশ্বাস করো, আজকাল ছেলে দেখলে আমার মনের ভেতর কেমন কেমন হয়। ওইদিন আমার বাসার দারোয়ান ছেলেটাকে দেখলাম গোসল করে রোদে বসে খালি গায়ে সরিষার তেল মাখছে। ছেলেটার খালি গা দেখে আমার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছিল, মুখ ধরফর করছিল, শরীরের মধ্যে শিহরণ খেলে যাচ্ছিল আর—”
কথাটা শেষ করতে পারল না অরণ্য। তার আগেই তার গার্লফ্রেন্ড সাদিয়া,
“ছি!”
বলে বসা থেকে উঠে চলে গেল।
উক্ত সকল দৃশ্য দেখে ফিক করে হেসে দিল তন্ময়।
ফাইনালি ৫৮০ নম্বর ব্রেকআপটাও সাকসেসফুলি ডান।
অরণ্য চোখ-মুখে ঘোর অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তুলে বলল,
“যাহ, চলে গেল!”
তন্ময় অরণ্যের ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“গার্লফ্রেন্ড নাম্বার ২৪৯ কলিং।”
অরণ্য ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে গান ধরল—
“চলে গেছ তাতে কী, নতুন একটা পেয়েছি, তোমার থেকে অনেক সুন্দরী।”
অরণ্য ফোন রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশের মেয়েটা বলল,
“বেবি, তোমার স্পেশাল গিফট অ্যারেঞ্জ করেছি।”
“ওহ রিয়েলি, ডার্লিং!”
“ইয়েস বেব, গেস হোয়াট আ গিফট!”
অরণ্য বক্র হেসে গান ধরল—
“প্রেমিকা নে প্যায়ার সে জো ভি দে দিয়া,
তেরে ওয়াস্তে হ্যায় নিলাম জ্যায়সা।
প্রেমিকা নে প্যায়ার সে জো ভি ছু লিয়া,
তেরে ওয়াস্তে হ্যায় সোনে জ্যায়সা।
প্রেমিকাকে তীর্থ মানো,
প্যায়ার কো ভি স্বর্গ জানো,
প্যায়ার কে সঙ্গীত মেঁ,
উহু মোহিনী সুরাগিণী।
প্যায়ার কে সঙ্গীত মেঁ,
উহু মোহিনী সুরাগিণী।”
“আউউউ! আই লাভ ইউ, বেবি!”
“আই অলসো লাভ ইউ টু, বেবি। ওকে, আই কল ইউ লেটার।”
“ওকে।”
অরণ্য ফোন কেটে দিয়ে হাফ ছাড়ল।
এত তাড়াতাড়ি কথা বলা শেষ দেখে তন্ময় বলল,
“উহু, কী ব্যাপার? এত তাড়াতাড়ি মুরগি ধরে ভেজে খাওয়া শেষ হয়ে গেল?”
অরণ্য প্যান্ট চেপে ধরে তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াল।
ওয়াশরুমের দিকে দৌড় দিতে দিতে বলল,
“প্রকৃতি ডেকেছে, ভাই!”
সাথে সাথেই খপ করে হাত ধরে ফেলল তন্ময়। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“এটা আবার কোন মেয়ে? এতগুলো গার্লফ্রেন্ড আছে, তবুও মন ভরে না? এশিয়া মহাদেশের অর্ধেক মেয়ে কি নিজের ভেতরেই ঢুকাবা?”
প্যান্ট চেপে ধরে সাপের মতো মুচড়ামুচড়ি শুরু করে দিল অরণ্য।
সজোরে ভাইয়ের মাথায় চাটি মেরে বলল,
“পাঠা কোথাকার! সব সময় কি মাথায় মেয়ে ঘোরে? ছাড়, ছাড় বলছি, ছাড়! নইলে এখানেই করে দেব!”
তন্ময়ও নাছোড়বান্দা। আরও শক্ত করে চেপে ধরে জেদি কণ্ঠে বলল,
“প্রকৃতি কোন মেয়ে না বলা পর্যন্ত ছাড়বই না!”
“ওরে ভাই, আমি মুততে যাচ্ছি। খুব জোরে মুতে ধরেছে, ছাড় এবার! না হলে প্যান্টে-ফ্যান্টে করে দেব!”
কথা শুনে তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দিল তন্ময়।
সাথে সাথেই গায়েব হয়ে গেল অরণ্য।
উত্তরার স্বনামধন্য রেস্টুরেন্ট তাজের উত্তর দিকের কর্নারে মুখোমুখি বসে আছেন কয়েকজন সাদা পোশাক পরিহিত অফিসার। তাদের মধ্যে সিআইএ এজেন্ট মার্কো, সিনিয়র ইন্টেলিজেন্স অফিসার ইরফান শেখ এবং জুনিয়র ইন্টেলিজেন্স অফিসার মেহরিমা শিকদার প্রিয়স্মিতা। আপতদৃষ্টিতে তাদের সাধারণ জনগণ ভেবে ভুল করবে মানুষ।
সিনিয়র অফিসারদের সামনে মাথা নত করে বসে আছে প্রিয়স্মিতা। তার নিজের সম্বন্ধে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো ভাষা নেই।
সিআইএ এজেন্ট মার্কো অসন্তুষ্ট কণ্ঠে ঝেড়ে বললেন,
“তুমি কিন্তু নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যাচ্ছ মেহরিমা। নিজের ফোকাস হারাচ্ছ। তুমি কি ভুলে গেলে তুমি এখানে কী করতে এসেছিলে? তোমাকে এখানে কেন পাঠানো হয়েছিল?”
“তুমি নিজের টাস্ক কমপ্লিট না করে সংসার করছো। রিয়েলি! তোমার মতো রেসপন্সিবল ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টের থেকে এটা আশা করা যায় না।”
মাথা নিচু করে নিল প্রিয়স্মিতা।
এজেন্ট মার্কো ইরফানের উদ্দেশে বললেন,
“অফিসার, আপনার কথায় বিশ্বাস রেখে মেহরিমাকে কেস নম্বর ১৫২ অপারেশন গ্লোবাল হান্ট হ্যান্ডওভার করা হয়েছে। এটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা তো জানেন। মেহরিমার থেকে লাস্ট ১ মান্থ কোনো আপডেট পাওয়া যাচ্ছে না। ওর জন্য তো আর কাজ থেমে থাকবে না।”
ইরফান নরম চোখে চাইল প্রিয়স্মিতার দিকে।
প্রিয়স্মিতা মাথা তুলে নম্র কণ্ঠে বলল,
“সরি স্যার।”
“হোয়াট সরি! ইউ নো লাস্ট ওয়ান মান্থে কী কী হয়েছে? তোমার সাথে তো নরমাল টাইমে কন্টাক্টও করা যায় না। তুমি তো জানো আমরা সবাই তোমার কনফার্মেশনের জন্য বসে আছি। তুমি কি টাস্ক কমপ্লিট করতে পারবে না? যদি না পারো তাহলে আমরা অন্য কাউকে দেখব।”
এজেন্ট মার্কোর কথা শুনে আঁতকে উঠল প্রিয়স্মিতা।
এজেন্ট মার্কো ফের বললেন,
“অ্যানসার মি মেহরিমা!”
কিয়ৎক্ষণ চুপ থাকল প্রিয়স্মিতা। অতঃপর চোখ বুজে লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস টেনে বলল,
“নো স্যার, এই মিশনটা আমিই কমপ্লিট করব। আমি আমার লক্ষ্য থেকে এক চুলও সরিনি। আমি এখানে যেটা করতে এসেছি সেটা আমি করেই ছাড়ব। এই অপারেশন আমি সাকসেস করবই।”
“শুধু কথা দিয়ে তো হবে না মেহরিমা। আগে তুমি অনেক স্ট্রেট ফরোয়ার্ড ছিলে কিন্তু এখন তোমার কথায় আর কাজে মিল পাই না। এত দিনে তো তোমার মিশন কমপ্লিট হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।”
“সরি স্যার, আমাকে আর কয়েকটা দিন টাইম দিন। আমি সব ইনফরমেশনসহ ফাইল সাবমিট করে দেব।”
“ওকে, জাস্ট ওয়ান উইক। জাস্ট ওয়ান উইকের মধ্যে আমার সব ইনফরমেশন চাই, না হলে তোমাকে এই কেস থেকে বাদ দেওয়া হবে। মাইন্ড ইট!”
—বলে উঠে চলে গেলেন অফিসার মার্কো।
প্রিয়স্মিতার চোখ-মুখে ফুটে উঠল মিশ্র প্রতিক্রিয়া। না চাইতেও চোখের সামনে ভেসে উঠল বোনের আদুরে মুখটা।
“কী ভাবছিস?”
—প্রিয়স্মিতার হাতের ওপর হাত রেখে শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করল ইরফান।
মৃদু কেঁপে উঠল প্রিয়স্মিতা। অসহায় চোখে চাইল ইরফানের দিকে।
ইরফান বোধহয় বুঝল বোনের পরিস্থিতি। আজ থেকে তো আর দেখছে না মেয়েটাকে। মেয়েটার চোখে এতকাল যে আগুনটা দেখতে পেত, ইদানিং আর সেটা তেমন একটা দেখা যায় না। ইরফানের মাঝে মধ্যে কেন জানি মনে হয়, এক সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো মেয়েটা আজকাল অন্যায়ের সাথে সমঝোতা করতে শিখে যাচ্ছে। এটা সঙ্গদোষ নাকি অন্য কোনো কারণ?
মেয়েটাকে সে আপন বোনের থেকে কোনো অংশে কম ভাবে না। সেই ছোটবেলা থেকে হাতে ধরে তৈরি করেছে। মানসিকভাবে এতটা শক্ত বানিয়েছে যাতে বিশেষ কোনো আবেগ তার ওপর কন্ট্রোল করতে না পারে। ইমোশনকে ব্যালেন্সড রাখতে শিখিয়েছে।
এই মেয়েটা খুবই সম্ভাবনাময়। তার মধ্যে সেই সকল বিশেষ গুণ আছে যা একজন দক্ষ ইন্টেলিজেন্স অফিসারের মধ্যে থাকা জরুরী। ইরফান বিশ্বাস করে একদিন গোয়েন্দা বিভাগের সব থেকে বড় অফিসার হবে প্রিয়স্মিতা। কিন্তু সবার আগে তাকে এই টাস্ক কমপ্লিট করতে হবে। এটাতে হেরে যাওয়া একদম চলবে না।
প্রিয়স্মিতার চোখের পাপড়ি ভিজে উঠেছে দেখে ইরফান আর সহ্য করতে পারল না। ভনিতা ছেড়ে স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,
“তুমি কি ওই ক্রিমিনাল ফ্যামিলির ওপর দুর্বল হয়ে যাচ্ছ প্রিয়স্মিতা? তুমি কি ভুলে গেছ যা কিছু ঘটেছে বা ঘটছে তার সবটাই প্ল্যান? তুমি আমাকে কথা দিয়েছিলে যে তুমি এদের সাথে ইমোশনালি অ্যাটাচড হবে না।”
প্রিয়স্মিতা বলল—
“আমার ভালোবাসা তো প্ল্যান নয় অফিসার।”
ইরফান বলল—
“হোয়াট! এসব লেম এক্সকিউজ দিয়ে নিজের লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে যাবে না প্রিয়স্মিতা। ওই ফ্যামিলির প্রতি তোমার দুর্বলতা আছে কি নেই সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। যদি থেকেও থাকে তাহলে পার্সোনাল লাইফ আর প্রফেশনাল লাইফকে মিক্স করা আমাদের নীতিতে নেই। আমাদের ফিলিংস কন্ট্রোলড।”
ইরফান—
“তাছাড়া তোমাকে এসব বলছিই বা কেন? এখানে ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্টের তো প্রশ্নই আসে না। শুরু থেকে তো সবটাই নাটক ছিল। এত ড্রামা করার তো একটাই কারণ—শিকদারদের বিধ্বস্ত হয়ে ওঠা, তাদের ভেতরের খবরগুলো কালেক্ট করা।”
প্রিয়স্মিতা বলল—
“আই নো অফিসার, সব নাটক, সব মিথ্যে, সব সাজানো। কিন্তু এর মধ্যেও দুটো সত্যি আছে। যার একটা আমার ভালোবাসা আর একটা আমার বোন। এছাড়া অন্যদের নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।”
প্রিয়স্মিতা—
“সবকিছু প্ল্যান মতোই হচ্ছিল, কিন্তু মাঝখান থেকে আরেক আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়া এসে পুরো ব্যাপারটা গুলিয়ে দিল।”
ইরফান বলল—
“যেমন?”
প্রিয়স্মিতা বলল—
“যেমন এটা ১০০০% সিওর—এএসআর আর কেউ নয়, আবরার শিকদার প্রণয়। তার সকল প্রুফ আমি কালেক্ট করে ফেলেছি। আমার কাছে এমন এভিডেন্স আছে যেগুলো ফ্ল্যাশ হলে এএসআর একদম ফিনিশড হয়ে যাবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে—”
ইরফান বলল—
“কী?”
প্রিয়স্মিতা বলল—
“আমি জানতাম আমার বোন খুব ভালোবাসে শিকদারদের বড় ছেলেকে। শুধু ভালোবাসে বললে ভুল হবে, জুনুন। আমি চাচ্ছিলাম যে ওদের মধ্যে কিছু হয়ে যাওয়ার আগেই এএসআর-এর চ্যাপ্টারটা ক্লোজ করে দিতে, সমাজের ক্যানসারটা উপড়ে ফেলতে। কিন্তু শেষ সময়ে এসে সব গুলমাল হয়ে গেল।”
প্রিয়স্মিতা—
“ওই মাফিয়ার জন্য আমার বোনের সাথে এএসআর-এর বিয়ে হয়ে গেল। সম্পূর্ণ মস্তিষ্ক ফাঁকা লাগছে এখন আমার। আমি কী করে ওই ক্রিমিনালের থেকে আমার বোনকে আলাদা করব? এএসআর হিউম্যান ট্র্যাফিকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। কী গ্যারান্টি আছে যে আমার বোনকেও সে পাচার করে দেবে না?”
ইরফান বলল—
“তো মিস প্রিয়তা কি এএসআর-এর হিস্ট্রি সম্বন্ধে সব জানে?”
প্রিয়স্মিতা বলল—
“আই গেস না। কারণ সব জানলে এত নরমাল থাকতে পারত না।”
ইরফান বলল—
“কী মনে হয়? প্রিয়তা সব সত্যিটা জানার পরেও কি এএসআর-কে চাইবে?”
প্রিয়স্মিতা বলল—
“মেয়েটা পুরো উন্মাদ। চাইলে অবাক হব না।”
ইরফান বলল—
“এগুলো তো তোমার পার্সোনাল ইস্যু। এগুলোর জন্য তো আর দেশ বসে থাকবে না। তোমার কাছে যেহেতু সব প্রমাণ আছে তাহলে সেগুলো সাবমিট করে দিচ্ছ না কেন?”
প্রিয়স্মিতা বলল—
“দেব, তবে এখনই নয়। আমাকে এক সপ্তাহ সময় দিন। আগে আমার বোনকে ব্যাপারটা জানাতে হবে। আমার আপনজনের সংখ্যা খুবই লিমিটেড। আমি আমার বোনকে হারাতে পারব না।”
ইরফান বলল—
“তুমি জানো প্রতি ওয়ান উইকে কী কী হয়?”
প্রিয়স্মিতা বলল—
“জানি, তবুও—”
ইরফান বলল—
“ওকে, মনে রাখবে জাস্ট ওয়ান উইক!”
দূর থেকে এসব দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গেল অরণ্য। দাড়ি কমা ঠিক করে দিয়ে তাকিয়ে রইল সে। যদিও সে দূরে থাকায় কথাগুলো শুনতে পায়নি, কিন্তু ইরফানের সাথে এমনভাবে কী কথা বলছে জানার আগ্রহ হলো। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ফেরার পথেই এদের দিকে চোখ পড়েছিল তার। বিষয়টা কেমন সন্দেহজনক ঠেকল তার নিকট।
শিখদার বাড়ির লাইব্রেরি রুমের সোফায় থমথমে মুখে বসে আছে সাদমান শিখদার ও খালিদ শিখদার। তাদের সম্মুখে বসে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে ইরফান।
পাশ থেকে গলা খাঁকারি দিয়ে কেশে উঠল প্রীতম। এই সময় ইরফানের উপস্থিতিতে সকলেই বড় বিব্রত।
সবার চুপসে যাওয়া মুখের দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে ইরফান। এদের মুখ দেখে সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে এরা কিছু একটা লুকানোর চেষ্টা করছে।
ইরফান প্রীতমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এমন চোরের মতো করছিস কেন? কোনো সমস্যা? হঠাৎ করে বিয়ের কথা বন্ধ করে বললি বিয়ে হবে ধুমধাম করে, এরপর পুরো লাপাত্তা!”
প্রীতম অসহায় চোখে তাকালো সাদমান শিখদারের দিকে।
সাদমান শিখদার কেশে গলা পরিষ্কার করলেন। রাশভারী কণ্ঠে বললেন—
“তোমার কাছে মিথ্যে বলে নিজেদের দোষ ঢাকতে চাই না বাবা। একটা সমস্যা হয়ে গেছে।”
ইরফানের ভ্রুদ্বয়ের ভাঁজ আরও সংকুচিত হলো। কপাল কুঁচকে বলল,
“কী সমস্যা?”
সাদমান শিখদার কোনো রাখঢাক রাখলেন না। ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটা বললেন ইরফানের নিকট।
সবটা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল ইরফান।
সাদমান শিখদার মাথা নত করে বললেন,
“আমরা তোমার আর তোমার পরিবারের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী বাবা। আমরা আসলে পারিনি আমাদের সন্তানকে সঠিক শিক্ষা দিতে।”
কিন্তু উনার এসব কথা বোধহয় ইরফানের কান দিয়ে ঢুকল না। মাথায় শুধু বাজতে থাকল—শ্বেতা এখন অন্য পুরুষের সাথে আছে। নিজের প্রিয় নারীকে অন্য পুরুষের সাথে কল্পনা করা যে কতটা যন্ত্রণার, তা বোধহয় সেই মানুষটা ব্যতীত কেউ বলতে পারবে না।
ইরফানের চোখ-মুখে ক্রোধে লাল হয়ে গেল। সে কোনো ধরনের কোনো বাক্য ব্যয় ছাড়াই উঠে চলে গেল।
অসহায় চোখে সেই যাওয়া দেখে গেলেন সাদমান শিখদার ও প্রীতম। এত ভালো একটা ছেলে তারা হারালেন শুধু তাদের মেয়ের মূর্খামির জন্য। কিন্তু সত্যি কি এই কাহিনী শেষ, নাকি অপেক্ষা করছে আরও ভয়ানক কিছু?
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার পূর্বেই বাসায় ফিরে এল প্রণয়। অফিসের কাজে তার কিছুতেই মন লাগছে না। ভেতরটা শুধু উশখুশ করছিল তার প্রিয় ফুলটার জন্য। একটুখানি ছুঁয়ে দেওয়ার তাগিদে বারবার উতলা হয়ে উঠেছিল মন, তাই নিজেকে আর বেশি কষ্ট না দিয়ে সব কিছু ছেড়েছুড়ে বিকেল হওয়ার আগেই বাসায় ফিরে এল প্রণয়।
সত্যি বলতে ক্লান্ত লাগছে ভীষণ। মিনিট দশেক নিজের প্রাণটাকে বুকে জড়িয়ে না বসলে মন শান্ত হবে না, ক্লান্তি দূর হবে না।
প্রণয় ক্লান্ত শরীরটা টেনে রুমে প্রবেশ করল। তপ্ত কণ্ঠে আদেশ ছুড়ে দিয়ে বলল,
“ঝটপট বুকে আয় তো দেখি, খুব ক্লান্ত লাগছে।”
বিছানায় মুখ ঘুরিয়ে বসে ছিল প্রিয়তা।
প্রণয় তার প্যান্টের পকেট থেকে কাগজে মোড়ানো কিছু একটা বের করে ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখল।
প্রিয়তা ঘুরে তাকালো প্রণয়ের দিকে। ধীর পায়ে এগিয়ে এগিয়ে এল নিকটে।
প্রিয়তার চেহারা অবলোকন করে কপালের মাঝ বরাবর ভাঁজ পড়ল প্রণয়ের। প্রিয়তা টাচ করার পূর্বেই দুই কদম পিছিয়ে গেল।
ভ্রু কুঁচকে বলল,
“একি! তুমি এখানে? আর ওর কাপড় পরেছ কেন?”
প্রিয়তা অবাক হওয়ার চেষ্টা করে বলল,
“মানে কী বলছেন প্রণয় ভাই?”
মেজাজ চড়ে গেল প্রণয়ের। তবু ও কণ্ঠে শীতলতা ধরে রেখে বলল,
“তুমি দুদিনের যোগী মেয়ে কার সামনে নাটক করছ জানো? তুমি যার ছদ্মবেশ নিয়েছ সে আমারই আত্মার অংশ—আবরার শিকদার প্রণয় কোনোদিন ও নিজের আত্মাকে চিনতে ভুল করে না। বিশেষত ওই দুটো চোখ কখনো আমায় ফাঁকি দিতে পারে না।”
প্রণয়ের জবাবে বক্র হাসির দেখা মিলল প্রিয়স্মিতার ওষ্ঠে। সে ব্যঙ্গ করে বলল,
“তাই বুঝি? তাহলে বিয়ের পর চিনতে পারলেন না কেন?”
হাসল প্রণয় তাচ্ছিল্যের সুরে,
“পরস্ত্রীর চোখের গভীরে তাকানো আবরার শিকদার প্রণয়ের পার্সোনালিটির সাথে যায় না। আমার প্রাণটা যদি অন্য কারো নামে হালাল হয়ে যেত, তবে আমি প্রয়োজনে প্রাণ দিত, তবুও তার দিকে তাকাত না।”
“হুম, তা বেশ। তা বেশ। কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই জানেন আমি আমার বোনের মতন না। চেনেন নিশ্চয়ই আমায়।”
প্রণয় বাঁকা হাসল। বুকে হাত গুঁজে বলল,
“তুমি সম্পর্কে আমার বোন লাগো, বয়সেও অনেক ছোট। এর বাইরে আমার নিকট তোমার আর কোনো পরিচয় নেই।”
“ভুল ভাবলেন। আমি আপনার মতো মানুষের বোন হতে ইন্টারেস্টেড না। এমনকি আপনার মতো মানুষের তো এই দুনিয়াতে থাকারই অধিকার নেই।”
প্রণয়ের চোখের দৃষ্টি শীতল, সে জবাব দিল না।
প্রিয়তা ফের বলল,
“আপনি আমার বোনকে বিয়ে করে ওর জীবনটা নষ্ট করলেন কেন বলুন?”
“তোমার বোন আমাকে চায়, আর তোমার বোনের ইচ্ছা আমার জন্য আদেশ।”
জবাব শুনে তেতে উঠল প্রিয়স্মিতা। রাগান্বিত কণ্ঠে বলল,
“আমার বোনকে আমি আপনার সাথে থাকতে দেব না। আপনি আমার বোনকে ছেড়ে দিন।”
ক্লান্তিতে হাই তুলল প্রণয়। ভাবলেশহীন কণ্ঠে বলল,
“দুঃখিত, বাসর সেরে ফেলেছি। এখন আর ছাড়তে পারব না।”
বলে হেলেদুলে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল প্রণয়।
জবাব শুনে ভ্যাবাচেকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল প্রিয়স্মিতা।
ড্রয়িং রুমের সোফায় গা এলিয়ে বইয়ের পাতায় ডুবে ছিল প্রিয়তা। মনে বইছে টানটান উত্তেজনার ঝড়। হাতে তার প্রিয় লেখিকা সুরাইয়া রাফার এক সময়ের খুব জনপ্রিয় নভেল বুক ‘সঙ্গীন প্রণয় আসক্তি’। ২০২৪-২০২৫ সালের দিকে এই গল্প ছিল সবার মুখে মুখে। এমনকি এখনও এর ক্রেজ কমেনি।
প্রিয়তার মতে উপন্যাস জগতে শত শত নায়ক আসবে-যাবে, কিন্তু জায়ান ক্রীতিকের মতো আর হবে না। এই বইটা এই নিয়ে চতুর্থবার পড়ছে প্রিয়তা। তার মতে এই বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় লাইন—
“Love is temporary but obsession is permanent.”
এমন সময় কলিং বেলের বিকট শব্দে মনোযোগ ছুটে যায় প্রিয়তার। তির্যক বিরক্তিতে নাকের পাটা ফুলে ওঠে। অসহ্য লাগে খুব। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে কারো দরজাটা খুলে দেওয়ার, কিন্তু কেউ খোলে না। একের পর এক বেলের শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে যায় প্রিয়তা। তীব্র অনিচ্ছাতে এক সময় উঠে দাঁড়ায়।
বইটা বন্ধ করে দরজা খুলে দেয়। সামনে দাঁড়িয়ে আছে ২৬-২৭ বছর বয়সী এক যুবক।
প্রিয়তা ঠিক চিনল না উনাকে। দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে আন্তরিক ভঙ্গিতে বলল,
“জি, ভেতরে আসুন।”
প্রিয় সেই অতি কাঙ্ক্ষিত মুখটা দেখে চোখে পানি টলমল করে উঠছে নির্ভানের।
প্রিয়তা দেখল লোকটা হাঁ করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। অস্বস্তিতে পড়ে গেল প্রিয়তা। নম্র কণ্ঠে বলল,
“কিছু বলবেন?”
রিনরিনে পরিচিত সেই মধুর কণ্ঠস্বর, তবে চেনা সেই তেজটা নেই।
চোখের পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল নির্ভানের। আচমকা প্রিয়তার হাত দুটো ধরে বলল,
“তুমি এমনটা কী করে করতে পারলে চড়ুই? একবারও মনে পড়ল না আমার কথা? তুমি তো সব জানতে তারপর কেন আমাকে নিঃস্ব করে দিলে?”
অচেনা ব্যক্তির এমন প্রতিক্রিয়ায় ভড়কে গেল প্রিয়তা। ঝট করে হাত ছাড়িয়ে নিল নির্ভানের কাছ থেকে। মনে মনে রেগে গেলেও ভদ্রতা বজায় রেখে বলল,
“কী বলছেন এসব আপনি? আর কে আপনি? আমাকে এসব কেনই বা বলছেন?”
নির্ভানের বুক ভারী হয়ে এল পাহাড়সম যন্ত্রণায়। ফের প্রিয়তার হাত দুটো ধরে বলল,
“তুমি আমাকে চিনতে পারছ না সিরিয়াসলি? যার শাসনে ১৬-১৭ বছর মানুষ হয়েছে তাকে চিনতে পারছ না? তুমি তো আমায় কথা দিয়েছিলে ফিরে আসলে তুমি আমার হবে, তাহলে কী করে অন্যের হয়ে গেলে?”
“মানলাম ডক্টর চৌধুরীর মতো এত স্বনামধন্য নই, কিন্তু তোমাকে ভালোবাসাতে তো কমতি রাখিনি। তাহলে কেন আমার সাথে এমন করলে?”
নির্ভানের কথা শুনে মুখ হাঁ হয়ে গেল প্রিয়তার। সে বোধহয় বুঝতে পারল ব্যাপারটা। আবারও নির্ভানের হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“আপনি ভুল করছেন। আপনি যে ভাবছেন আমি সে নই, আমি প্রিয়তা।”
“কী!”
“জি, আপনি যাকে খুঁজছেন আমি তার বোন। সব কিছু নিশ্চয়ই জেনেই এসেছেন। আপনি এসে বসুন, আমি আপুকে ডেকে দিচ্ছি।”
ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৮
নির্ভান অবাক হলো প্রিয়তাকে দেখে। সে শুনেছিল প্রিয়স্মিতার যমজ বোন আছে, তাদের মধ্যে মিলও আছে। কিন্তু এত মিল!
প্রিয়তা গলা উঁচিয়ে হাঁক ছাড়ল,
“আপু! আপু! দেখ কে যেন এসেছে।”
প্রিয়তা নির্ভানের উদ্দেশ্যে বলল,
“আপনি বসুন, আমি ডেকে আনছি।”

Kub valo laglo next