Home ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৫

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৫

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৫
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই

ওড়না ঠিক করে উপরে চোখ তুলে তাকাতেই চোখাচোখি হয়ে গেল দুই বোনের। প্রিয়স্মিতাকে দেখে কয়েক পলক থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল প্রিয়তা।
তার হেয়ার কাট স্টাইল, ড্রেসআপ দেখে ভিমরি খাওয়ার উপক্রম। তবে তার অবাক দৃষ্টিকে মোটেও পাত্তা দিল না প্রিয়স্মিতা; ডাইনিংয়ের ওপর থেকে গ্লাস তুলে পানি ঢালতে লাগল। প্রিয়তা এখনো তাকিয়ে আছে। প্রিয়স্মিতার পরনে একটা সিম্পল ব্ল্যাক জিন্স আর চেক শার্ট। আবার ছেলেদের মতো শার্টের হাতা গুটিয়ে কনুই পর্যন্ত। বুকে ওড়না নেই—যদিও খারাপ দেখাচ্ছে না; অ্যাজ ইউজুয়াল প্রিয়স্মিতাকে যেমন দেখায়।
বোনের রিঅ্যাকশন দেখে মুখে বিরক্তির চিহ্ন ফুটিয়ে তুলল প্রিয়স্মিতা। প্রিয়তা আরও লক্ষ করল, প্রিয়স্মিতার চুলগুলো এখন আর আগের মতো ঘন লম্বা নেই। হাঁটুর নিচে থাকা চুলের লেংথ এখন কাঁধের নিচ অবধি। “এত সুন্দর চুলগুলো এখন আর নেই,” ভেবেই চোখে পানি চলে এলো প্রিয়তার।
প্রিয়স্মিতা ভ্রু বাঁকিয়ে জানতে চায়, “কী, কাঁদছিস কেন?”

“তুমি চুল কেটে ফেলেছ!”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“আই ডোন্ট লাইক লং হেয়ার। সত্যি বলতে লম্বা চুল আমার বরাবরই বড় অপছন্দের। সব দিকে পেঁচিয়ে যায়, বিরক্ত লাগে। এতদিন এটাকে বড় করেছিলাম, দরকার ছিল। এখন এটার দরকার ফুরিয়েছে। তাহলে শুধু শুধু বোঝা কেন বয়ে বেড়াব? আমার কাছে ফার্স্ট প্রায়োরিটি সেলফ কমফোর্ট।”
“কী?”
“হ্যাঁ, এখন ভীষণ আরাম লাগছে। বিশ্বাস কর, এতদিনে মনে হচ্ছে আমি একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে পারছি। নিজের মধ্যে সেই আগের সত্তা ফিল করতে পারছি। নাহলে সারাদিন সং সেজে ঢং করতে ভালো লাগে!”
“তুমি কি এতদিন অভিনয় করতে আপু?”

“এতদিনে এতটুকুও বুঝিসনি? ছু ছু ছু ছু… বড্ড নাদান রে বোন তুই। এখন সেসব ইস্যু ছাড়। এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে শুধু পেরেশান হোস না, এগুলো তুই বুঝবি নাহ্। বাই দ্য ওয়ে, লং হেয়ার ক্যারি করা অনেক টাফ। এত বড়ো বড়ো চুল দিয়ে কী করবি তুই? চাইলে তোর চুলও দুই হাত কেটে ছোট করে দেই, রিল্যাক্সড ফিল করবি।”
আঁতকে উঠে সাথে সাথেই প্রতিবাদ জানাল প্রিয়তা,
“দরকার নেই আপু। তোমার চুলের দরকার নেই, নাই থাকতে পারে। কিন্তু আমার এই চুলগুলো আমার প্রণয় ভাইয়ার অনেক প্রিয়। এগুলোতে জীবন থাকতেও কাঁচি লাগাব না।”
দুই বোনের কথার মধ্যে এসে উপস্থিত হলেন অনন্যা বেগম। মেয়ের মাথা থেকে পা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে নাক সিঁটকে বললেন, “ছি ছি, এগুলো কী পরেছিস? বাড়ি ভর্তি মেহমান, লোকে কী বলবে? নাক কাটাবি নাকি?”
“হু কেয়ারস! কে কী পরবে না পরবে, সেটা তার নিজস্ব স্বাধীনতা। যে যেটা পরে কমফোর্টেবল। আমি এটাতেই ঠিক আছি।”
“এই বাড়িতে স্বাধীনতার থেকে শালীনতাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। যাও, গিয়ে থ্রিপিস-কামিজ কিছু একটা পরে এসো।”
প্রিয়স্মিতার পরিষ্কার জবাব,

“দুঃখিত। আমি যথেষ্ট শালীন অবস্থাতেই আছি। এসব অভিনয় আমার দ্বারা আর সম্ভব হবে না।”
মেয়ের চটাং চটাং কথা শুনে মেজাজ খারাপ হলো অনন্যা বেগমের। মুখ গম্ভীর করে বললেন, “এভাবে কথা বলছ কেন? সুন্দর করে ভদ্রভাবে কথা বলা যায় না?”
প্রিয়স্মিতার পরিষ্কার জবাব, “কীভাবে কথা বলব আম্মু? ভয়েসে তো ফিল্টার লাগানো যায় না।”
“আচ্ছা, তাহলে ও কীভাবে কথা বলে? ও তো পুরো তোর মতোই দেখতে। তারপরও ও কেমন আর তুমি কেমন! আচার-আচরণে এত অমিল কেন?”
তুলনা টানাতে প্রিয়স্মিতার ইগো হার্ট হলো। তীক্ষ্ণ আওয়াজে প্রতিবাদ করে বলল, “কারণ আমি আমার মতো। আমি কেন অন্য কাউকে কপি করতে যাবো? আমি কেন অন্য কারো মতো হতে যাব? আমার নিজস্বতা আছে।”
অনন্যা বেগম আরও কিছু বলতে নিচ্ছিলেন, তখনই তাড়া দিল তরী, “বড় ভাবী, মেজো ভাবী ডাকছে।”
প্রিয়তা আর কিছু না শুনে দৌড়ে চলে গেল ডালের গামলা নিয়ে।

সবাইকে মাছ কুটতে দেখে হাত নিশপিশ করছে প্রিয়তার। কিন্তু জ্যান্ত মাছগুলো এভাবে কাটতে দেখে ভীষণ কষ্টও লাগছে। কেমন চটফট করছে মাছগুলো।
প্রিয়তা মুখ ছোট করে অনুশ্রী বেগমের উদ্দেশ্যে বলল, “বড় আম্মু, মাছগুলো মরার পর কাটলে হয় না?”
“তোর দাবি শুনতে লাগলে তো একসময় মাছগুলোকে আবার পানিতেই ছাড়তে হবে। তাই যা হচ্ছে, চুপচাপ দেখে যা।”
নরম মনটা ব্যথিত হলো প্রিয়তার। সে অন্য পাশের বড় মাছগুলোর দিকে তাকাল। ওগুলো মৃত। সে ওদিকে এগোতে নিতেই অনন্যা বেগম হুঁশিয়ারি দিলেন, “একদম মাছে হাত দিবি না।”

বারণ শুনে প্রিয়তার মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে এলো। মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে অনুনয় করে বলল, “একটা কাটি।”
অনন্যা বেগম ‘না’ করতে পারলেন না। এর আগেই ডালা থেকে একটা মাছ ধরে ফেলল প্রিয়তা।
অনন্যা বেগম হুশিয়ারি দিয়ে বললেন, “ওটা ছাড়! ওটা মাগুর মাছ, হুল ফোটালে ব্যথায় মরে যাবি।”
উনি কথা শেষ করতে পারলেন না। দেখতে দেখতেই চিৎকার দিয়ে উঠল প্রিয়তা। অসাবধানতা বসত হাতের বুড়ো আঙুলটা ক্যাঁচ করে কেটে গেল মাগুর মাছের হুলে। মাগুর মাছ শরীরের জন্য উপকারী হলেও, তার হুল সর্বদাই বিষাক্ত। ব্যথায় প্রিয়তার চোখে পানি চলে এল। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরতে লাগল মেঝেতে। ঠোঁট কামড়ে বিষের জ্বালা হজম করার প্রয়াস করল প্রিয়তা। অনন্যা বেগমকে কিছু বলতে না দিয়ে ছুটে চলে গেল।
প্রিয়তাকে ছুটে যেতে দেখে অনুশ্রী বেগম শুধালেন, “কী হয়েছে?”
উপস্থিত মহিলাদের একজন বলল, “মাগুর মাছের শিংয়ে হাত কাটছে। কী যে ব্যথা হইব এখন!”
অনুশ্রী বেগম চিন্তিত হলেন। এত এত কাজ ফেলে এখন তো মেয়েটার পিছে পিছে ঘোরা সম্ভব না। “উফ! আমার হয়েছে যত জ্বালা। অন্য তিন বউকে মোটামুটি সংসারী বানানো গেলেও, এই মেয়েকে যে কীভাবে সংসারী বানাব, উফ!”

অনুশ্রী বেগম চলে গেলেন। অনন্যা বেগম ভাবলেন মেয়ের পিছু পিছু যাবেন। তবে তার আগেই রান্নাঘর থেকে ডেকে উঠল ইনায়া, “আম্মা, একটু শুনুন!”
অনন্যা বেগম প্রথমে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে গেলেন।
বাড়ির দক্ষিণ দিকের বারান্দায় বসে নির্জনে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে প্রিয়তা। চোখ দিয়ে অনর্গল গড়িয়ে পড়ছে নোনা পানি। সময়ের সাথে সাথে ব্যথা বাড়ছে হুহু করে। রক্ত এখনো এক ফোঁটা এক ফোঁটা করে পড়ছে।
দেখতে দেখতে হঠাৎ কোথা থেকে যেন হন্তদন্ত পায়ে ছুটে এল প্রণয়। প্রিয়তাকে বারান্দার কোণ ঘেঁষে বসে থাকতে দেখে অস্থির কণ্ঠে ডাকল, “জান!”

হঠাৎ প্রণয়ের গলা শুনে কেঁপে উঠল প্রিয়তা। তাড়াহুড়ো করে চোখের পানি মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। ধরা পড়লে রক্ষা নেই। মুখে হাসি ফুটিয়ে ফিরে তাকাল প্রিয়তা। লম্বা লম্বা পা ফেলে দুই-তিন কদমে কাছে চলে এল প্রণয়। প্রিয়তার চোখ-মুখ ধরে দেখতে দেখতে ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
“কোথায় ব্যথা পেয়েছিস?”
প্রিয়তা একটু ভয় পেল। প্রণয় ভাইয়ার তো জানার কথা নয়! সে ভীতি গোপন করে বলল, “কী বলছেন?”
“কথা ঘুরাবি না। দেখা আমায়, কোথায় ব্যথা পেয়েছিস?”
প্রণয়ের অস্থিরতা দেখে আর সত্য গোপন করার সাহস হলো না প্রিয়তার।
“এখানে,”
বলে বুড়ো আঙুলটা তুলে ধরল প্রিয়তা।
রক্তমাখা আঙুলটা দেখতেই বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল প্রণয়ের। তার আন্দাজটা তাহলে মিথ্যে নয়। প্রণয় দ্রুত রক্তমাখা আঙুলটা মুখে পুরে নিল। সামান্য কাঁপল প্রিয়তা। অবাক কণ্ঠে জানতে চাইল,

“আপনাকে কে বলল আমি ব্যথা পেয়েছি?”
“কেউ না।”
“তাহলে কেমনে জানলেন?”
“জানি না। বুকের বা পাশটা চিনচিন করে ব্যথা করছিল। এই ব্যথা তখনই হয় যখন তুই কষ্ট পাস বা কাঁদিস। আমি টের পাই তখন। অস্থির লাগে আমার, নিঃশ্বাস নিতে পারি না। তাহলে বল, আমি বুঝব না?”
প্রণয়ের চোখে ছলছল করছে পানি।
প্রিয়তা টুল থেকে নেমে প্রণয়ের কোলে বসল। দুই হাতে গলা জড়িয়ে বুকে মাথা এলিয়ে দিয়ে বলল, “আই অ্যাম সরি জান।”
“রাখ তোর সরি তোর কাছে। আমার জানকে ব্যথা দিয়েছিস কীভাবে, সত্যি বল?”
“মাগুর মাছের কাঁটায়।”
“কী! এই কথাটা বলতে তোর একটু ও ভয় করছে না? মন চাচ্ছে থাপ্পড়ে ব্রেন নাড়িয়ে দিতে।”
“মারুন।”
“হ্যাঁ, এর পর আমার কলিজাটা পুড়ে ছাই হোক! মন কী চাচ্ছে বলতো?”

“কী চাচ্ছে? আদর করতে?”
“মারতে মন চাচ্ছে।”
“পারবেন?”
“খুব ভালো মতোই জানিস পারবনা, তাই না। আর পারব না বলেই বুঝি সব সময় এমন করে আমার অন্তরে আঘাত করিস? আমার দুর্বলতাকে কষ্ট দিস?”
“কষ্ট দেওয়ার বিনিময়ে যদি এত ভালোবাসা পাই, তাহলে পৃথিবীর সকল কষ্ট আপনার হোক।”
“খুব স্বার্থপর তুই।”
“শুধু আপনার বেলায়।”
“হয়েছে, চল। মেডিসিন লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেব।”
“লাগবে না। শুধু আপনি থাকুন।”
“ময়না পাখি!”
“হুম।”

ড্রয়িং রুমের কার্পেটে হাত-পা ছড়িয়ে গড়াগড়ি খেয়ে কাঁদছে অভিরাজ। তার কান্নার তীব্রতায় উপস্থিত সব পুরুষদের কানে তালা পড়ার উপক্রম, কারো কারো মুখে মায়া, আবার কারো কারো মুখে ঘোর বিরক্তি।
অভিরাজের সামনেই মুন্সি বসে ক্ষুর ধার দিচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে আরও জোরে গলা ফাটিয়ে কাঁদছে অভিরাজ। তার দুই হাত দুই পা শক্ত করে চেপে বসে আছে অরণ্য, তন্ময়, রাজ ও প্রেম।
তন্ময়ের বিরাট ভালো লাগছে ভাইপোকে এমন হেনস্তা হতে দেখে। এমন একটা দিন তো তার জীবনেও এসেছিল, ঠিক এখানেই পড়ে গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদেছে কিন্তু কেউ শুনেনি।
সেদিন সবাই মজা দেখেছে, আজ সেও দেখবে। চোখ-মুখে ঝুলছে তার শয়তানি হাসি। সে অভিরাজের কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে আস্তে করে বলল,

“ইন্নালিল্লাহ পড়ো, মাই সান। আজ তোমার পাখি কেটে সবাইকে বিরিয়ানি বানিয়ে খাওয়ানো হবে। এই যে দেখছো এত মানুষ, সবাই তো বিরিয়ানি খেতেই এসেছে।”
তন্ময়ের কথায় আরও ভয় পেয়ে গেল অভিরাজ। চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠলো, হেঁচকি তুলে বলল,
“এএএএএ চাচ্চু, আমার এত ছোট একটা পাখি খেয়ে সবার পেট ভরবে না, ওদের চলে যেতে বলো।”
“উহু উহু মাই সান, পাখি তো তোমার কাটা পড়বেই।”
মুন্সি প্যান্টে টান দিয়ে খুলে দিতেই দাঁত দিয়ে কামড়ে দিল অভিরাজ।
তার কান্না আর ছটফটানি দেখে সকলেই মনে মনে ব্যথিত হচ্ছেন।
নাতির কান্না শুনে দাদারা ছুটে এলেন। নাতিকে মুড়ি মাখার মতো কচলাতে দেখে ছেলেদের ধমকে উঠলেন সাদমান শিকদার।

“এভাবে কেউ ধরে? সরো তোমরা।”
বলে অভিরাজকে কোলে নিলেন সাদমান শিকদার। অভিরাজ বড় দাদার পাঞ্জাবি খামচে ধরে হেঁচকি তুলে বলল,
“ওরা নাকি আমার পাখি উড়িয়ে দেবে দাদাজান!”
সাদমান শিকদার কৌতুকপূর্ণ গলায় হেসে বললেন,
“আরে না, পাখি থেকে সামান্য দুই একটা অপ্রয়োজনীয় পালক ছেঁটে দেওয়া হবে। মনে হয় রাখবি নাতি? পুরুষ মানুষের জীবনে এই ত্যাগ অহংকার, পুরুষ মানুষ হতে হবে তো।”
“আমার ত্যাগ করা লাগবে না দাদাজান, আমার এমনি থাকুক।”
“আস্তাগফিরুল্লাহ! এই কালে ত্যাগ না করলে ঐ কালে কেঁদে মরতে হবে।”
“কেন?”

সাদমান শিকদার ছেলেদের দিকে তাকালেন। উনার বদমাইশ ছেলেগুলো এদিক-ওদিক তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে।
সাদমান শিকদার নাতির কানে কানে বললেন,
“পরে বিয়ে করতে পারবি না ভাই।”
অভিরাজ আবার প্রশ্ন করার আগে ধরণী কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল।
মুন্সি এক হাতে ক্ষুর আর এক হাতে অভিরাজের পাখির এক টুকরো নিয়ে পান খাওয়া দাঁতে হেসে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ, শিকদার সাহেব আপনার নাতি হালাল হয়ে গেছে। চাইলে কালই একখান মাইয়া দেখে বিয়া পড়াইয়া দিবেন।”
সাদমান শিকদার খুশি হয়ে পকেট থেকে কচকচে ৫০০ টাকার বান্ডিল বের করে মুন্সির হাতে দিলেন।
অভিরাজ দাদাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে শেষ।
সাদমান শিকদার তন্ময়কে বললেন,
“আমার বিছানায় ওর জন্য লুঙ্গি এনে রাখা হয়েছে, নিয়ে আয় তো বাবা।”
তন্ময় চলে গেল।
অভিরাজের চিৎকারের সাথে সাথে প্রণয়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলছে প্রিয়তা। তার হৃদপিণ্ডটা স্বাভাবিকের তুলনায় একটু জোরেই ধুকধুক করছে। তারা দুজনেই দোতলার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষণ।
প্রণয় কানের কাছে ঠোঁট চেপে বলল,

“শেষ, চোখ খোল।”
প্রিয়তা অসম্মতি জানিয়ে বুকের আরও গভীরে মুখ লুকালো। তার শরীর কাঁপছে মৃদু ছন্দে।
“তোকে বারণ করছিলাম এখানে আসতে, শুধু জেদ ধরলি কেন? এমন দিন তো সব পুরুষের জীবনেই আসে।”
প্রিয়তা কাঁপাকাঁপি সামলে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“আপনারও এসেছিল?”
“কেন, তুই দেখিসনি?”
প্রিয়তা আশ্চর্য হয়ে বলল,
“যাহ বাবা, আমি দেখব কীভাবে? তখন কি আমি ছিলাম নাকি?”
“বোকা মেয়ে, তুই এক্সাম দিতে কেন দেখবি? তুই তো দুর্দান্ত রেজাল্ট দেখেছিস।”
“মানে?”
জবাব দিল না প্রণয়। ঠোঁট কামড়ে ক্রুর হাসল, তার চোখে মুখে দুষ্টুমি খেলে গেল।
প্রণয়ের চোখের দিকে তাকাতেই সবটা বুঝে গেল প্রিয়তা। লজ্জায় কান গরম হয়ে উঠল। বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে যেতে যেতে বলল,
“নির্লজ্জ পুরুষ মানুষ!”

প্রণয় পেছন থেকে কোমর জড়িয়ে ধরে পাশের দেওয়ালে চেপে ধরল।
“তুই চাইলে আজকে আবার লাইভ দেখতে পারিস জান। তোর জন্য নাহয় এই বুড়ো বয়সে আরেকবার সয়ে নেব। তবে আবার যদি কাটা পড়ে, তবে তোর ভাগ থেকে লাভের অংশই কাটা পড়বে।”
“সরুন অসভ্য লোক! আপনার মুখে শুধু নষ্ট কথাবার্তা।”
“আর আমার সাথে এই নষ্ট খেলতে মেতে উঠতে লজ্জা কাজ করে না তখন?”
প্রিয়তা ঠোঁটের উপর হাত রেখে মুখ চেপে ধরল,
“চুপ করুন।”
দৃষ্টির মিলন ঘটলো তাদের।
কারো পায়ের শব্দ কানে বাজতেই আতঙ্কিত হলো প্রিয়তা।

“ছাড়ুন।”
“উহু।”
“প্লিজ ছাড়ুন।”
প্রণয় ছাড়লো না। অসহায় চোখ দুটিতে দৃষ্টি রেখে বাঁ হাতে নরম গালে আলতো করে স্লাইড করল।
“ছাড়ব, কিন্তু আই হ্যাভ এ ওয়ান কন্ডিশন।”
“কি?”
“কিস মি, বেবি গার্ল।”
প্রিয়তার চোখ মুখ আরও অসহায় হয়ে এলো। জুতোর শব্দটা এখন আরও কাছ থেকে আসছে। প্রিয়তা লজ্জায় চোখ বন্ধ করতেই তাকে সরিয়ে দোতলার সিঁড়ির নিচে আড়াল হয়ে গেল প্রণয়, আবারও দেওয়ালের সাথে চেপে ধরল।
জায়গার সংকীর্ণতায় সিঁড়ির মাথা লেগে যাচ্ছে প্রণয়ের! হাত দুটো প্রিয়তার দুই পাশে দেওয়ালে রেখে সাপোর্ট দিল। তার নেশাতুর চোখ দুটো যেনো গিলে খাচ্ছে প্রিয়তা কে।
প্রণয় উন্মাদের ন্যায় মুখ ডুবলো গ্রীবা দেশে,
কামিজের নিচে হাত ঢুকিয়ে জড়ানো গলায় বলল,

“উম্ম, কিস মি জান!”
তার চোখ দুটো ঘোলাটে, হাত দুটো বেসামাল।
প্রিয়তা আশেপাশে তাকালো।
“জান!”
প্রণয়কে আর কিছু বলতে দিলো না প্রিয়তা, বুকের খাঁজ অব্দি পৌঁছে যাওয়া মাথা টেনে তুলে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। উন্মুক্ত কোমরে বাঁধা হাতের বাঁধন আরও শক্ত হলো প্রণয়ের।
প্রণয়ের দুই গালে হাত রেখে পাগলের মতো রাফ কিস করছে প্রিয়তা। না ছুলে নেই, কিন্তু একবার ছুঁয়ে ফেললে নিজেকে বড্ড উন্মাদ লাগে তার।
অঙ্গে শিরায়, শিরায় রক্তের অণুতে, অণুতে এ কী বিষ ঢেলে দিলো লোকটা।
সুখের তাড়নায় পিঠ খামচে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেললো প্রিয়তা।
সিঁড়ির ওপর দিয়ে অবিরাম মানুষ চলাচল করছে, আর নিচে উহু উহু।
শিকদার বাড়ির অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলো।

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৪

আকীকা দিয়ে প্রীতমের মেয়ের নামকরণ করা হলো অহনা শিকদার স্নেহা।
আদরে, যত্নে, ভালোবাসায়, খুঃসুটিতে স্বপ্নের মতো কাটছিল জোড়া শালিকের জীবন।
তবে কথায় আছে—অভাগা যেদিকে যায়, সাগর শুকিয়ে যায়। সুখের দিনগুলো বেশি দিন সইলো না তাদের কপালে। আবার জীবনে কালবৈশাখী ঝড় উঠলো।

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৬

3 COMMENTS

Comments are closed.