ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১১
মুশফিকা রহমান মৈথি
“ওই প্যারাসাইটের কথা আমি ভাবিও না। শি ইজ নান টু মি।”
রাতুল সাথে সাথেই বাধা দিলো। কিঞ্চিত ধমকের সুরে বললো,
“আমি জানি তুই আপসেট কিন্তু তাই বলে এভাবে বলিস না!”
“তোমরা লায় দেও বলেই সে গিল্টফ্রি ভাবে অন্যায় করে যায়। ধরাকে সরাজ্ঞান করে। শি ইজ জাস্ট এ ব্র্যাট। নানাজান না আঁটকালে..একমাত্র অনাথ বিধায় আমি এতো তার অকাজগুলো দাঁত কামড়ে সহ্য করতাম। বাট এবার লিমিট ক্রস করে ফেলেছে। যাক গে, সে আমার কেউ নয়। তাই তার কাজে আমার আসলে কিছুই যায় আসে না। তবে আমি অবাক হয়েছি মার কাজে। সে কি করে কাঞ্চনকে প্রশ্রয় দিলো? প্রতিটা কাজের কনসিকোয়েন্স আছে। আমি তার বাচ্চামোর কনসিকোয়েন্স ভুগছি। আমার কলিগ আজকে হাসপাতালে। যদিও খুব মারাত্মক কিছু হয় নি। হতে তো পারতো। আমি শুধু মায়ের কথা ভেবে আমার ডিউটি ছেড়ে চলে এসেছি। আই ওয়াজ টেনসড। তার কি একটু ভাবা উচিত হয় নি! ওই অসহ্য মেয়েটা বুদ্ধি দিলো আর সে রাজী হয়ে গেলো।”
কাঞ্চনের আর শোনার ধৈর্য্য হলো না। চোখ থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছে। ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। দ্রুত পায়ে সে সরে এলো। মঞ্জিলটাকে বিষাক্ত একটা জায়গা মনে হলো। ফলে এক দৌড়ে পুকুর পাড়ের সিঁড়িতে ধপ করে বসে পড়লো। শ্যাওলাওয়ালা পরিত্যক্ত পুকুরের মধ্যে তার অবয়ব দেখা যাচ্ছে। অবয়বের দিকে ভেজা চোখে তাকিয়ে রইলো কাঞ্চন।
ভেতরটা কেমন চেপে আসছে। দুঃখগুলো কান্নারুপে চোখ থেকে বইছে কিন্তু বুকের ভার কমছে না। ছোট্ট মস্তিষ্কে যেই মুহূর্তগুলো তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর এবং প্রিয় মুহূর্ত ছিলো, সেগুলো আস্তে আস্তে বিষাক্ত হয়ে উঠলো। স্নিগ্ধর সাথে তার স্মৃতি গুলো খুব সামান্য। অথচ সেই সামান্য স্মৃতিগুলোও খুব যত্নে আগলে রেখেছিলো কাঞ্চন। তার এস.এস.সি তে ভালো করার পর তার দেওয়া একটি দামী কলম আছে, যা কাজিনমহলের কেউ পায় নি। আম গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার পর তাকে পিঠে করে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলো লোকটা। কাঞ্চনের মনে আছে, গতবছর মঞ্জিলের সবাই তার জন্মদিন ভুলে গিয়েছিলো। শুধু স্নিগ্ধ ভাই তাকে ডেকে তীক্ষ্ণ স্বরে বলেছিলো,
“এই আজকে তোর জন্মদিন না? শুভ জন্মদিন৷”
এই সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্মৃতিগুলো লোকটির করুণা ছিলো। শুরু থেকে লোকটি তাকে করুণা করে এসেছে এতোদিন। আর কাঞ্চন সেই করুণার আবেগে ভেসেছিলো। ক্ষুদ্র জীবনের এই মুহূর্তগুলো তার সবচেয়ে প্রিয় ছিলো, অথচ মনে হলো কেউ কালো কালি ঢেলে দিয়েছে তার স্মৃতির পাতায়। ভেতরটা কেন যেন তিক্ত হয়ে উঠলো। সেই তিক্ততায় দম বন্ধ হয়ে এলো কাঞ্চন। এই প্রথম খুব আফসোস হলো, সে অনাথ। তার কোনো ঢাল নেই। এতো বিশাল একটা পৃথিবীতে তাকে ভালোবাসা কেউ নেই। তার ভাগে শুধু করুণাই লেখা।
নিজেকে খুব অসহায় লেগেছিলো। বাবার উপর রাগ হয়েছিলো। যদি দায়িত্ব নাই নিতে পারে তবে সে মাকে বিয়ে কেন করেছিলো? মায়ের উপর অভিমান হলো। কেন মা তাকে এই বিশাল পৃথিবীতে একা ফেলে চলে গেলেন। সাথে নিয়ে গেলে কি হতো? সেই সাথে সরফরাজ পটনভীর প্রতি ঘৃণা হলো। হাহাকার হলো হৃদয়ে। সেদিন খুব কেঁদেছিলো আঠারো বছরের মেয়েটি। তবে একটা জিনিস খুব ভালো হয়েছিল, তা হলো নদীর স্রোতের মতো বহমান আবেগের বাঁধ দিতে পেরেছিলো কাঞ্চন। যে ডায়েরিটা সে সাজিয়েছিলো কখনো স্নিগ্ধ ভাইকে নিজের মনে কথাগুলো জানানোর মাধ্যম হিসেবে। সেই ডায়েরিটা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলো। ক্ষণিকের জন্য এই আবেগগুলো আঁটকা পড়ে হাঁসফাঁস করেছিলো। মনটা বারবার দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিলো। মাঝে মাঝে এই কঠিন বাস্তবতা থেকে পালাতেও ইচ্ছে হত। এতো সহজ ছিলো না সেই সময়টা। এই স্ট্র্যাগল শুধু দুটো মানুষ জানে, পৃথুলা এবং অঞ্জনা। স্নিগ্ধ ভাইকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়াটা খুব কঠিন একটা বিষয়। মন এবং মস্তিষ্কের তীক্ষ্ণ লড়াইয়ে মাঝে মাঝে খুব ক্লান্ত হয়ে যেত। সেই প্রভাব পড়াশোনায় পড়লো। এইচ.এস.সি পরীক্ষা ভালো হয় নি। নাম্বার কম এসেছে। মেডিক্যাল এডমিশন এক্সাম দিয়েছিলো, চান্স হয় নি। পাবনা বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিতে চান্স পেয়েছিলো কিন্তু দাদাজান তাকে দূরে যেতে দিবেন না। তাই প্রাইভেটে ভর্তি করালেন, ফার্মেসিতে।
এর মধ্যে একটা খুব অদ্ভূত ঘটনা ঘটলো। পুকুরপাড়ের পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসেছিলো কাঞ্চন। তার চোখ ওই ঘোলাটে পানিতে আবদ্ধ। কৃষ্ণচূড়া ফুল পড়ে পানিটা কেমন লাল লাগছে। ঠিক তখনই একটা বিশাল ছায়া পড়লো তার সামনে। পাশে তাকাতেই ভ্রু কুঁচকে গেলো। ভারীক্কি স্বর কানে এলো,
“তোর সাথে কিছু কথা আছে!”
স্নিগ্ধ ভাইয়ের চাকরি আবার আগের মতো চলমান। কাঞ্চন বেপরোয়া ভঙ্গিতে তাকালো। খুব অনীহার সাথে বললো,
“আমার সাথে তো তোমার কোনো কথা থাকার কথা না!”
“কিন্তু আছে!”
“আমার শুনতে বা বলতে ইচ্ছে করছে না।”
“মানে?”
“মানে হলো অহেতুক একটা প্যারাসাইটের সাথে কথা বলার কোনো মানে নেই। আমি এখানে আমার মন ভালো করতে এসেছি। আমাকে বিরক্ত করো না!”
স্নিগ্ধ ভাই কিছুটা সময় তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর একটা ফোঁশ করে নিঃশ্বাস ফেলে গম্ভীর গলায় বললো,
“সেদিনের জন্য আই এম সরি!”
“আমি তোমার সরি চেয়েছি!”
স্নিগ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“আমি জানতাম না মা তোকে ফোর্স করেছিলো আমার অফিসে ফোন করতে। তবে দোষ তোরও ছিলো। আমি অলমোস্ট চাকরি হারাতে বসেছিলাম। যাক গে, যেহেতু সেদিন আমি হার্সভাবে রিয়েক্ট করেছি। তাই আমি সরি বলছি!”
কাঞ্চন তাচ্ছিল্যভরে বললো,
“দয়া করছো!”
“ত্যাড়ামি ছাড়া স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারিস না?”
কাঞ্চন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আরোও অনেকটা সময় বসে থাকার ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু এখন আর ভালো লাগছে না। তাই সে উঠে দাঁড়ালো। তার পায়ে জুতো নেই। সে খালি পায়ে এসেছিলো। তাই দাঁড়ানোর সাথে সাথেই একটা ইটের টুকরো বিঁধলো পায়ে। মাথায় পৌছালো সেই তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা। ফলে অনুভূতিগুলো সতেজ হলো। হালকা হেসে বললো,
“আমার ভুলে মহাভারত অশুদ্ধ আর তোমার ভুলভাল অন্তরাল, ইটস নট ফেয়ার। হিপোক্রেসি কি ভি সীমা হোতি হ্যায়। যাক গে, আমার এসব নিয়ে কথা বলার ইচ্ছে নেই। অহেতুক একটা প্যারাসাইটের সাথে কথা বলে সময় নষ্ট করো না। বরং তাদের সাথে কথা বলো যারা যোগ্য! আসছি।”
বলে চলে যেতে নিলে হাতটা টেনে ধরলো স্নিগ্ধ। হ্যাচকা টানে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারালো কাঞ্চন। নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই বাড়ি খেলো সিমেন্টের মতো শক্ত বুকে। স্নিগ্ধর কপালের রগ দপদপ করছে। কঠিন, অনুভূতিশূণ্য গলায় বললো,
“আমার কথা শেষ হয় নি!”
কাঞ্চনের চরম রাগ হলো। এক ঝটকা নিজের হাত ছাড়িয়ে রাগী স্বরে বললো,
“খবরদার এভাবে আমাকে ধরবে না। আমি কেউ না তোমার! তুমি কেউ না আমার। নিজের নবাবী অন্যখানে দেখাও। আমার উপর না।”
বলেই এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো না সে। হনহন করে হেটে গেলো পটনভী মঞ্জিলের দিকে। সেদিন আর কান্না পেলো না, বুক ভার হলো না। বরং একটা শান্তি বয়ে গেলো জ্বলন্ত বুকে। কাঞ্চন ভেবেছিলো সে এই বিশ্রী অনুভূতির বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে গেছে। নিজেকে শক্ত করে ফেলেছে। যে বাঁচে তার রুলসে। বেপরোয়া, বেগালাম, চিল জীবন তার। কিন্তু সেই জীবন এখন আবার সাপের মতো ফনা তুলেছে সিমেন্টের বস্তা। এখন সে খ্যাঁচম্যাচ করে না। এখন সে দয়া দেখায় আহ্লাদের সাথে। যা আরোও জঘন্যভাবে প্রভাব ফেলছে কাঞ্চনের জীবনে। স্নিগ্ধের কাজ তাকে খুব কনফিউজ করে তুলছে। স্নিগ্ধ কেন তাকে বিয়ে করেছে সেটার কোনো লজিক্যাল রিজোনিং খুঁজে পাচ্ছে না সে। যে কেউ মনে করতে পারে, স্নিগ্ধ বুঝি তাকে ভালোবাসে। কিন্তু যাকে একটা সময় প্যারাসাইট বলে আখ্যা দিয়েছিলো। যে মেয়েটি নেহায়েত ব্র্যাট তার কাছে, তাকে আর যাই হোক সে ভালোবাসে না। কাঞ্চন বিশ্বাসও করে না। আর যদি স্নিগ্ধ তাকে ভুলক্রমে ভালোও বেসে থাকে সেটাকে সে দু পয়সার জন্য দাম দিবে না। কারণ আত্মসম্মান সবার আগে। সে এই পটনভীদের দয়ার পাত্রী হতে চায় না। সে বাঁচবে নিজের জন্য। ভুল করবে, পাগলামী করবে। কিন্তু নিজের জন্য বাঁচবে। কারোর দিকে তাকাবে না। কাউকে পরোয়া করবে না। তাতে তাকে অভদ্র, পাকনা, অসহ্য, বেয়াদব যা ট্যাগ দেওয়ার দিবে। লোকের ট্যাগ শুধু একটা শব্দ। সেই শব্দে নিজেকে বাঁধবে না কাঞ্চন। সে উন্মুক্ত বিহঙ্গীর মতো বাঁচবে।
পটনভী মঞ্জিলে আলো জ্বলে উঠেছে। সন্ধ্যা হতে না হতেই বাহিরের সব লাইট জ্বলে উঠে। জুলফিকার পটনভীর একান্ত সেক্রেটারি মুহিব কাকার দায়িত্ব এটা। কিন্তু তিনি কামচোর। পুকুরের এদিকটার লাইট নষ্ট আজ এক মাস। উনি লাইট লাগান না। কারণ পুকুরের এই দিকে কেউ আসে না। চাচারা মদ খেলেও আড়ালে খান, যেখানে আলো কম। তাই কারোর মাথা ব্যথা নেই। এখানে আসে শুধু কাঞ্চন। অতীতের স্মৃতিচারণ করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে ঠিক নেই। আলো না থাকায় মশা তাকে জেঁকে ধরেছে। কপালে তিনটা মশা বসে রক্ত খেয়ে ঢোল হয়ে পড়ে আছে, মেয়েটির খবর নেই। স্নিগ্ধ কিছুসময় তাকিয়ে রইলো তার ঘুমন্ত অর্ধাঙ্গিনীর দিকে। হাত দিয়ে মশাগুলো তাড়ালো। তারপর নিঃশব্দে তাকে কোলে তুলে নিলো। উষ্ণ ওম পেতেই বেড়ালের বাচ্চার মতো গুটিয়ে গেলো কাঞ্চন। খুব সাবধানে তাকে নিজের ঘরে নিয়ে গেলো স্নিগ্ধ।
বিছানায় শুইয়ে কম্বল টেনে দিলো গলা পর্যন্ত। এসির টেমপারেচারটা ছাব্বিশে রেখে ঘর থেকে বের হতেই দেখলো অঞ্জনা এবং পৃথুলা দাঁড়িয়ে আছে। তারা হয়তো কাঞ্চনকে নিতে এসেছে। পৃথুলা কিছু বলার আগেই স্নিগ্ধ ভারী স্বরে বললো,
“কাঞ্চন ঘুমাচ্ছে। ডিসটার্ব করিস না।”
পৃথুলা ঘাড় কাত করে আবার অঞ্জনাকে নিয়ে নিচে চলে গেলো। প্রীতি আপুর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা এসেছে। ঘর গমগম করছে। এরমধ্যে কাঞ্চন ঘুমাচ্ছে নীরবে।
কাঞ্চনের ঘুম ভাঙলো পর দিন সকালে। এলার্ম বেজে বেজে ক্লান্ত মোবাইলটা চার্জ খুইয়ে বন্ধ হয়ে আছে। মানুষ এলার্ম দিলে একটা বা দুটো দেয়। কাঞ্চনের এলার্ম থাকে ৮ টা। তার উঠা প্রয়োজন নয়টায়। এলার্ম বাজা শুরু হয় সকাল ৭.২০ থেকে। প্রতি বারো মিনিট পর পর এক এক এলার্ম। কিন্তু কাঞ্চনের ঘুম ভাঙ্গে নয়টা পঁচিশে। ধরফরিয়ে উঠে সে। কোনো মতে দাঁত মেজে শুধু প্লাজো বদলে একটা মোবাইল প্যান্টে নিজেকে গলিয়ে সেই বাসার টি-শার্টটা পড়েই সে ছুটে ভার্সিটিতে। চুলটাও পথেই আঁচড়ায়। ঠোঁটের ফাঁকে ঝুলতে থাকে একটা মুড়ানো পরোটা।
আজ অবশ্য তা হলো না। ঘুম ভাঙ্গলো এলার্ম বাজার আগে। মাথা ব্যথা করছে প্রচুর। নাক বন্ধ। পানি পড়ছে। গলায় ব্যথা। এতো ঘুমানোর পরও এতো বিরক্ত লাগছে। মনে হচ্ছে ঘুমের ঘাটতি পূরণ হয় নি। অথচ সে প্রায় বারো ঘন্টার বেশি ঘুমিয়েছে। আশপাশটা দেখলো ঢুলুঢুলু চোখে। স্নিগ্ধের ঘরে, স্নিগ্ধের বিছানায় বসে আছে সে। পাশের সাইড টেবিলে ঢাকা দেওয়া একটি প্লেট পড়ে আছে। আহ্লাদী ঢং। ইচ্ছে করে দু হাত বেঁধে বিচুটি ঘষে দিতে।
কাঞ্চন হাই তুললো। চুল টেনে খোঁপা বাঁধলো। অলস ভঙ্গিতে ফ্রেশ হলো। সালোয়ার কামিজ সে আর পড়বে না। ওই মানুষের কথা মত সে চলবে না। তার জীবনে শুধু তার রুলস চলবে। ওই সিমেন্টের বস্তা তার জীবনটা কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছে। সে চায় সবাই তার আঙ্গুলে নাচুক। কিন্তু কাঞ্চন রেবেল। যদি সিমেন্টের বস্তা তাকে ডানে যেতে বলে সে বামে যাবে। বিয়ে করার শখ সে একেবারেই ঘুঁচিয়ে দিবে।
বুয়ার ঘর থেকে নিজের জামাকাপড়গুলো উদ্ধার করে একটা জার্মানীর জার্সি গায়ে দিলো কাঞ্চন। সাথে সাথে হাঁচি শুরু হলো। হাঁচির পর হাঁচি। থামছেই না।
ডাইনিং হলে তখনও মানুষের ভিড় হয় নি। বড়চাচাকে দেখা গেলো। তিনি চলে এসেছেন হাসপাতাল থেকে। হাতে খবরের কাগজ খুলে রাখা। উনি খবর কি আদৌ পড়েন কি না সন্দেহ। রান্নাঘরে তখন চায়ের পাতিল বসানো হয়েছে। লুবুর মা পা ছড়িয়ে পান বানাচ্ছে। কাঞ্চন তাকে বললো,
“লুবুর মা আমাকে লাল চা দাও। গলা ব্যথা করছে!”
“নিজে বানায়ে লও। আমার হাত ভরা।”
মহিলার চুলগুলো যদি একটা একটা করে ছেঁড়া যেত? কি বদের বদ। কিন্তু চাচীরা ওকে ছাড়া চলতে পারে না। ফলে নিজেই চা বানালো কাঞ্চন।
চা হাতে ডাইনিং হলে যেতেই দেখলো পাপীরা আসছে। পৃথুলার চোখ লাল টকটকে। মিড টার্মের সিলেবাস দিয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে শুরু। অঞ্জনার চুলে জট বেঁধেছে। রিদম অবশ্য খুব চিল। পকেটে হাত গুঁজে শিষ বাজাচ্ছে। তাকবীরের চোখ বসে গেছে। কেমন জম্বির মতো হাটছে। মনে মনে কাঞ্চন বললো,
“আরোও ইঞ্জয় কর! প্রীতি আপুর শ্বশুরবাড়িতে যেয়ে মর!”
ভাবতে না ভাবতেই আরেকটা হাঁচি দিলো কাঞ্চন। খুব নাক কেঁটে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। বড় ফুপু সাথে সাথেই শুধালেন,
“ঠান্ডা লাগাইসিস কেমনে?”
চমকে উঠলো কাঞ্চন। এই মহিলার পা বেড়ালের মত নরম। নাকটা টেনে কাঞ্চন ভাঙ্গা গলায় বললো,
“জানি না। সকাল থেকে নাক বন্ধ। পানি পড়ছে। গলা ব্যথা, মাথা ব্যথা!”
“আহারে! যাক ভালো হয়েছে তুমি ঘুমাইছিস। আমি তোকে ডাকছিলাম। বাবু বললো তুই ঘুমাচ্ছিস। তাই আর ডাকি নি। তোর জন্য একটা জিনিস কিনে এনেছি।”
ফুপু মাঝে মাঝে স্নিগ্ধ ভাইয়াকে বাবু বলে। যা আদিখ্যেতা। কাঞ্চন মুখ বাঁকিয়ে বললো,
“কে বাবু? তোমার বাবুর তো এখন বাবুর বাবা হবার বয়স ফুপু! ওই বুইড়াকে বাবু কেমনে বলো!”
“যাহ! মায়ের চোখে বাচ্চারা সবসময় ছোটই থাকে!”
এর মধ্যেই ডাইনিংয়ে প্রবেশ করলো স্নিগ্ধ। জগিং করে পুরো শরীর ঘেমে গেছে। হাতাকাটা কালো ট্যাংক টপটা ঘামে ভিঁজে আছে। চুল অবিন্যস্ত। মুখটা আরোও তামাটে এবং ধাঁরালো লাগছে। গলায় একটা টাওয়াল ঝুলছে। একেবারে নাস্তা খেয়ে উপরে রুমে যাবে সে। সে আসতেই বড় ফুপু বলে উঠলেন,
“এই বাবু এদিকে আয়!”
বলেই একটা আংটির বাক্স খুলে তার হাতে দিলেন। গদগদ স্বরে বললেন,
“নাও নিজের বউকে পরিয়ে দাও। এই আংটিটা আমি কাঞ্চনের জন্য বানিয়েছি। তোমাদের তো এনগেজমেন্ট হয় নি। তাই এখন পরিয়ে দেও!”
রিদম পরোটায় কামড় দিতে দিতে বলল,
“সাত সকালে এখন এনগেজমেন্ট হবে নাকি আয়েশা ফুপ্পি?”
“হ্যা সমস্যা কি!”
“না না, যেখানে কনে এক্সচেঞ্জ হয়ে যায়, এক্সচেঞ্জড কনে টিশার্ট আর প্যান্ট পড়ে বিয়ে করতে পারে সেখানে জার্মানির জার্সি আর জগিং ড্রেসাপে ডাইনিং টেবিলে এনগেজমেন্ট হতেই পারে!”
কাঞ্চন এবার মুখ খুললো। বিরক্তির সাথা বললো,
“আমার আংটিফাংটি ভালো লাগে না ফুপ্পি। মনে হয় কেউ ইট বেঁধে দিছে। আমি এসব পরবো না। তুমি তোমার কাছে রাখো। আমাকে দিলে আমি কিন্তু বেঁচে ফুসকা খেঁয়ে ফেলবো।”
“থাবড়া খাবি? পর। পরতে পরতে অভ্যাস হয়ে যাবে। আমি পাতলাই বানাইছি!”
কাঞ্চন আরোও একটা হাঁচি মেরে বললো,
“তাও আমি পরবো না। তুমি রেখে দাও!”
“এই আমি বলেছি না পরবি। এই আব্বা, ওরে পরায়ে দে তো!”
ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১০
স্নিগ্ধ প্রখর দৃষ্টিতে এতোটা সময় তাকিয়ে ছিলো। কোনো কথা না বলেই সে খপ করে ধরলো কাঞ্চনের হাত। লোহার মতো হাতের স্পর্শে গা জ্বলে উঠলো কাঞ্চনের। কাঞ্চন ছাড়াতে চাইলেও পারলো না। স্নিগ্ধ কোনো ভনীতা ছাড়াই কাঞ্চনের অনামিকা আঙ্গুলে আংটিটা পরিয়ে দিলো। বিরক্তি, রাগে কাঞ্চন গজগজ করছে। নাকও চুলকাচ্ছে। তাই আংটি পরানোর সাথে সাথে সে একটা হাঁচি দিয়ে বসলো তাও ঠিক স্নিগ্ধর মুখের উপর। “আলহামদুলিল্লাহ” বলে মুখ তুলতেই দেখলো স্নিগ্ধ মুখ কঠিন করে আছে। থুথুর ছিঁটে পড়েছে তার মুখে। বলে কপালে তীব্র ভাঁজ। তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। পকেট থেকে একটা বসুন্ধরার টিস্যুর প্যাকেট বের করে কাঞ্চনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
“নাক পরিষ্কার করে নে।”….
