Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৪৮

মহামায়া পর্ব ৪৮

মহামায়া পর্ব ৪৮
তুশকন্যা

মধ্যরাতে চারপাশ জুড়ে শুনশান নীরবতা। অনবরত তুষার ঝড়ছে; ক্রমশই শীতের প্রকোপ বাড়ছে। রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্ট আর গাড়ির হেডলাইটের হলদেটে স্থির আলোয় যেন সবকিছু থমকে আছে। গায়ে কোট জড়িয়ে হাত-পা গুটিয়ে গাড়ির ভেতর ঘুমিয়ে আছে আনায়া। কেনীথ তার পাশেই চুপচাপ বসে। নিস্তেজ দেহটা সিটে এলিয়ে দিয়ে, মুখটা পাশে ফিরিয়ে রেখেছে। মোহাবিষ্ট দৃষ্টিতে অপলকভাবে আনায়ার দিকে তাকিয়ে আছে সে। ক্ষণে ক্ষণে বুক চিঁড়ে বেরিয়ে আসছে দীর্ঘস্থায়ী ভারী শ্বাস। নিষ্পাপ মুখাবয়ব, পরিচয়ে তার অর্ধাঙ্গিনী অথচ পাগলামিতে তার মতোই একটা ছোট্ট উন্মাদনার প্রতিচ্ছবি যেন আনায়া।
কেনীথ অকস্মাৎ আনমনেই কিছুটা ঘুরে, আনায়ার দিকে নড়েচড়ে বসল। হঠাৎ আনায়ার দিকে খানিকটা ঝুঁকে ঘুমন্ত মুখটাকে আরেকটু কাছ থেকে অবলোকন করল। একমুহূর্তে জন্য তার মাঝে মুগ্ধতা ফুটে উঠলেও, পরমুহূর্তেই চোখদুটো সরু ও মুখাবয়ব গম্ভীর করে সে হঠাৎ আনায়ার কপালের নিকট হাত বাড়াল। দু’আঙ্গুলের সাহায্যে কপালের মধ্যভাগে আলতোকরে একটা টোকা দিয়ে নিরেট স্বরে বিড়বিড় করল,
“পাগলী!”

বলতেই না বলতেই সে এক চিলতে মুচকি হাসল। কিন্তু আচমকা ঘুমন্ত আনায়াকে নড়াচড়া করতে দেখে, মূহুর্তেই সে হাসিটুকু মিলিয়ে গেল। কেনীথ তড়িঘড়ি করে আনায়া থেকে এক লহমায় সরে এলো। নিজের সিটের উপর টানটান হয়ে বসে, দৃঢ় স্বরে গলা খাকিয়ে উঠল। আনায়া সেই অস্ফুট শব্দে নড়েচড়ে অকস্মাৎ চোখ মেলল। চোখের সামনে সবকিছু অযাচিত দিকবিদিক দেখে আনায়া হকচকিয়ে গেল। আঁতকে পাশে মুখ ফেরাতেই আরো বেশি ভড়কে গেল।
শূন্য মাথায় মনে মনে ভাবতে লাগল—এটা আবার কোন কল্পনার ঘোরে ডুবে আছে সে। সাধের আরাধ্যের পুরুষ কেনো তার সামনের বসে আছে? কিভাবে সম্ভব এটা? আবার কেমন করে অপলকভাবে চেয়েও আছে। এটা সত্যি নাকি কল্পনা?
আনায়াকে এমন হতবিহ্বল হতে দেখে, কেনীথ আবারও গলাটা ঝেড়ে নিয়ে বলল,
“রাত অনেক হয়েছে, এবার বাড়িতে যাওয়া উচিত।”
আনায়া তার কথা শুনে তটস্থ হবার চেষ্টা করল। দুহাতে চোখ-মুখ ডলে চারপাশটা অবলোকন করতেই বুঝল সে এখনো গাড়িতে। আর পাশেই তার বাড়ির সম্মুখপ্রান্ত। আনায়া বেখেয়ালিতে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল,

“বাড়ি চলে এসেছি?”
কেনীথ আনায়ার থেকে নজর সরিয়ে, স্টিয়ারিং এর দিকে মুখ ফেরাল। মাথা নেড়ে আওড়াল,
“হুম।”
আনায়া আবারও খেয়ালি-পনায় মুখ ঢেকে অবোধের ন্যায় হাই তুলতে তুলতে বলল,
“এখন কি চলে যেতে হবে?”
কেনীথ সামান্য ভ্রু উঁচিয়ে তার দিকে মুখ ফেরাল। আনায়ার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সে এখনো ঘুমের ঘোরেই ডুবে আছে। কেনীথ কিছু বলল না দেখে, আনায়া নিজের মতো একই নেশালো স্বরে আওড়াল,
“আচ্ছা তবে ভালো থাকুন। আমি এখন যাচ্ছি…”
একাই টেনেটুনে সিটবেল্টটা খুলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল আনায়া। দুবার এগিয়ে যেতে যেতে, হঠাৎ পেছনের দিকে হাত নাড়িয়ে বলল,
“টা-টা!”
বলেই সে ঢলতে ঢলতে এলোমেলো পায়ে কেনীথের চোখের সামনে দিয়েই বাড়ির মূল দরজার চৌকাঠ অব্দি এগিয়ে গেল। অতঃপর নিচের দিকে খানিকটা ঝুঁকে পড়ল সে। দরজার পাশে থাকা একটা ফুলের টবের নিচ থেকে চাবিসরূপ কিছু একটা টেনে বের করল। তারপর আর কোনো বিলম্ব না করে সুন্দর মতো বাড়ির ভেতরে আলগোছে ঢুকে পড়ল।
সবটাই দূর হতে একমনে দেখে গেল কেনীথ৷ আনায়া ঠিকঠাক বাড়ির ভেতর অব্দি পোঁছে গিয়েছে তা নিয়ে আশ্বস্ত হতেই ভারী শ্বাস ফেলল। গাড়ির কাচটা তুলে তৎক্ষনাৎ স্টার্ট দিয়ে জায়গা প্রস্থান করল সে।

ঘুমের ঘোরেই ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাচ্ছে আনায়া। হঠাৎ ঠাস করে নিজের ঘরের দরজা খুলতে গিয়ে তার হুঁশ হলো। অকস্মাৎ চমকে উঠে চারপাশটা দেখে নিতেই তন্দ্রা ছুটল। বিস্ময়ের সাথে পূর্বের সবটা মনে করতেই আনায়া শুষ্ক ঢোক গিলল। নিজের অবস্থান বুজে নিয়ে, মাথা বাঁকিয়ে একবার সাবা আর আইজেলের ঘরে উঁকি দিল। পরক্ষণেই নজর দিল নিজের ফোনে। ফোনটার সাইলেন্ট করে রাখায় সারাদিনে আইজেলের শতখানেক ফোনকল আর সাবার হিসেব ছাড়া টেক্সট—কোনোটাই তার খেয়ালে আসেনি।
আনায়া মনে মনে ভাবল যা হওয়ার হয়েছে, কাল দুজনকে ভুজুংভাজুং কিছু একটা বুঝিয়ে কাহিনি মিটিয়ে নেবে। কিন্তু এখন তো তাকে….
আনায়ার ভাবতে দেরি কিন্তু নিজের ঘরে ঢুকে সোজা বারান্দায় ছুরটে দেরি নেই। সে বারান্দায় এসে থামতেই দেখল, সুদূরে কেনীথের গাড়িটা হনহনিয়ে এগিয়ে একটা সময় তুষারঝড়ের আড়ালে হারিয়ে গেল। আনায়া ভারী শ্বাস ফেলে, নিজের প্রতিই কিছুটা বিরক্ত হলো। এটা কেমন দিন কাটল তার। সবকিছুই কেমন গোঁজামিল।

আনায়া উদাসীন হয়ে নিস্তেজ মনে বারান্দার দরজাটা লাগিয়ে ঘরে ঢুকল। গায়ের জামাটা পরিবর্তন করে সাদামাটা ক্যাজুয়াল ড্রেস পড়ে ওয়াশরুম হতে বেরিয়ে এলো। ফোনটা হাতে নিয়েই ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। এখন তো আর ঘুমই আসবে না। বসে বসে কি করা যায়?
তার চেয়েও বড় কথা, কেনীথ আজ যা কিছু করল সবকিছু তার কাছে এতটা কেন অপ্রত্যাশিত, কেনো সবটা কাল্পনিক মনে হচ্ছে? সত্যিই কি লোকটা আজ তার এতোগুলো দিনের তীব্র আকাঙ্খা, অপেক্ষার পর তার কাছে ধরা দিয়েছিল? কিন্তু কিভাবে?
আনায়ার কাছে এখনো সবটা নিজের বিভ্রম বলে মনে হচ্ছে। সাথে এ-ও খেয়াল করে দেখেছে, যখন থেকে সে বাস্তব কেনীথের সংস্পর্শে ঘেঁষতে শুরু করেছে,তখন থেকে তার কাল্পনিক পুরুষটা আর দেখা দেয়না। কত অদ্ভুত না বিষয়টা? আনায়া এমন সব এলোমেলো ভাবনা ভাবতে ভাবতেই মুচকি হাসল।
ভালোলাগার এই মূহুর্তটুকু কাটতে না কাটতেই যখন আবার কেনীথের গার্লফ্রেন্ডের কথা মাথায় এলো—তখনই দৃশ্যপট পুরোপুরি পাল্টে গেল। আনায়ার রাগ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সে ধপ করে শোয়া হতে বসে পড়ে ভাবতে লাগল, এইবার তার সত্যি সত্যি ঠিক কি করা উচিত?

—“আমি এ কেমন গোলকধাঁধায় ডুবে যাচ্ছি? আমি তো চেয়েছিলাম আজ থেকে ওনাকে শুধু ঘৃণা করব, আর কখনো ওনার আশেপাশে ঘেঁষব না। কিন্তু আজকেই কেনো ওনার ওমন কিছু করতে হলো? এখন ঘৃণা করব না ভালোবাসে পাগল হবো?
লোকটা এমন কেনো,মাবুদ? আমার পুরো সিস্টেম বিগড়ে দিচ্ছেন উনি। সবকিছু বিগড়ে যাচ্ছে। আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি, আমি বরবাদ হয়ে যাচ্ছি।”
বলতে না বলতেই আনায়া বিছানায় হাত-পা ছুঁড়ল; অতিরঞ্জিত ভঙ্গিতে গড়াগড়ি করতে করতে চাপা স্বরে চেঁচালে,
“বাবাআআআহ্! তোমার মেয়ে বিগড়ে গেছে, বাবা! লোকটা তোমার মেয়ের সর্বনাশশশ করে দিয়েছে!”

রাত প্রায় তিনটা বাজতে চলল। কেনীথের ঘরে এখনো আলো জ্বলজ্বল করছে৷ সে ঘুমায়নি। বরং এই মাঝরাতে স্কেচবুক আর পেন্সিল নিয়ে বসেছে সে। গায়ে কালো টাউজার-টিশার্ট; সোফার সাথে হেলান দিয়ে ফ্লোরে একহাটু ভাজ করে দৃঢ় ভঙ্গিতে বসে আছে। স্কেচবুকটা একহাটুর উপর, আশেপাশে আরো কিছু পেন্সিল ছড়িয়ে আছে। বেশ কিছুক্ষণ হতে কিছু একটা এঁকে চলেছে সে। তবে কাজটা সম্পন্ন করতে তার খুব বেশি বেগ পেতেও হলো না। হাতের দক্ষতায় স্বল্প সময়ের মাঝেই দুটো মানুষের মুখাবয়ব তৈরি করে সে ক্ষ্যান্ত হলো।
অতঃপর বখাটের ন্যায় দেখতে মানুষদুটোর মুখাবয়বের ছবি তুলে কাউকে তৎক্ষনাৎ পাঠিয়ে দিল কেনীথ। কোনো এক বিশেষ নাম্বারে ফোন করে থমথমে গম্ভীর স্বরে আদেশ দিল,
“ছেলেদুটোকে খুঁজে বের করে একস্ট্রা ট্রিটমেন্ট দিতে হবে। লোকেশন পাঠিয়ে দিচ্ছি; আশেপাশে খোঁজ নিলেই চলবে।”

কাজ শেষ! স্কেচবুক আর পেন্সিলগুলো গুছিয়ে রেখে কেনীথ নিজের ম্যাকবুকটা নিয়ে বিছানায় গিয়ে বসল। ঘুমানোর আগে শেষ কয়েকটা ডকুমেন্টারি চেক করে নিতে হবে। একমাত্র কোম্পানির কাজের প্রেসার ব্যতীত আর কোনোকিছুতেই সে খুব একটা মাথা ঘামায় না।
কেনীথ ল্যাপটপ হতে নজর সরিয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিল কোনো এক প্রয়োজনে। কিন্তু মধ্যরাতে অকস্মাৎ একখান মেসেজ পেয়ে তার কপাল খানিক কুঁচকে গেল। বিড়বিড় করে বলল,
“রাত বাজে তিনটা; এখনো ঘুমায়নি?”
কেনীথ খানিক মনঃক্ষুণ্ন হলেও, মুহূর্তেই সে ‘জুলি দ্য আইসললি’ ছদ্মনামক সেই অবাধ্য রমণীর সাথে মেসেজ আদান-প্রদানে খানিক নিবিষ্ট হলো।
—“হাই জান কি করো?”
কেনীথ হয়তো ঘুমিয়ে গিয়েছে এই ভাবনায় আনায়ার মন খানিকটা ছটফট করছিল। কিন্তু তার জীবনে পাগলামির উপরও তো বোধহয় কোনো ঔষধ নেই। যথারীতি মেসেজটা পাঠিয়েই নিরাশ হয়ে বসেছিল কোনো উত্তর মিলবে না ভেবে। কিন্তু খানিকক্ষণ বাদেই কেনীথের প্রত্যুত্তরে সে চমকে উঠল।

—“রাত তিনটা বাজে, ঘুমান।”
আনায়া চোখ পিটপিট করে ভারী শ্বাস ফেলল। বিড়বিড় করে বলল,”যাক ঘুমায়নি তবে!”
পরমুহূর্তেই সে তড়িঘড়ি করে লিখল,
—“ধূর কিসের ঘুম, ঘুম আসে না আমার।
বলো না তুমি কি করো?”
—“ফাইল চেক করছি, কাজ শেষ হলে ঘুমিয়ে পড়ব।”
—“ওহ, তার মানে তো ব্যস্ত আছো।”
আনায়া ভাবুক মনে লেখে। কেনীথ ল্যাপটপ আর ফোনের স্ক্রিন দুটো ব্যালেন্স করে রিপ্লাই দিতে থাকে,
—“জ্বী।”
—“ঘুমাবে যখন, তা একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
—“হ্যাঁ অবশ্যই।”
—“এই বয়সে বউ ছাড়া একা একা ঘুমাতে কষ্ট হয়না?”
মেসেজটা দেখে কেনীথের আর কিছু লিখতে ইচ্ছে করল না। বরং মনের মাঝে প্রশ্ন জাগল, এই মেয়ে কি কোনোদিনও শুধরাবে না? মাঝরাতে সেই একই তামাশা করতে এসেছে।
ওদিকে আনায়া রিপ্লাই না পেয়ে ছটফট করতে লাগল,
—“ধূর, কাজের মেসেজ দেখলেই আর রিপ্লাই দাও না। বড্ড পঁচা তুমি।”
নিজের ক্ষিপ্ত মেজাজ চেপে রেখে,আদুরে ঢঙে বাক্যদুটি লিখলেও মুখে কটাক্ষ করে মুখ ভেঙচিয়ে আওড়াল,
“ঢং, কিসের পঁচা। বজ্জাত এইটা, বজ্জাত!”
আনায়া আবারও লিখল,
—“তুমি কি আমার মেসেজের রিপ্লাই দেবে? নাকি আমি চলে যাবো?”
—“……..
—“আশ্চর্য তো, আচ্ছা তবে নতুন কিছু বলি।”

আনায়া অন্তত এইটুকু বুঝেছে যে, কেনীথ সব ধরনের মেসেজের রিপ্লাই করে না৷ যেটা প্রচন্ড বিরক্তকর হলেও, তার কিছুই যেন করার নেই৷ আনায়া ফোনটা দুহাতে চেপে, ঘুম জড়ানো চঞ্চল মনে কিছু একটা ভাবল। পরক্ষণেই লিখল,
“আজকের ওয়েদারটা সুন্দর না? ইচ্ছে করছে স্বামীটাকে এক্ষুনি ধরে এনে, ঠেসে দুটো চুমু খাই। কিন্তু আমার তো স্বামীই নাই।”
মাঝরাতের বিভ্রমে এমন একখান মেসেজ পাঠিয়েই আনায়া থতমত খেল। যেন কানের পিঠ দিয়ে মরতে মরতে বেঁচে গেল সে। মেসেজ পাঠানোর শেষমুহুর্তে যদি শেষে’র লাইনটা না লিখত—তবে নিশ্চিত আজ ধরা পড়ে যেত।
আনায়া বুকে হাত চেপে, বুক ভরে শ্বাস টেনে নিয়ে বিড়বিড় করল,
“সেরেছে, এখনই ধরা খেয়ে যেতাম!”
অন্যদিকে কেনীথ বিরক্তি নিয়ে মেসেজটা পড়ামাত্রই থমকে গেল। কিঞ্চিৎ বিস্ময় নিয়ে বিড়বিড় করল,
“কত বড় অসভ্য!”
পরমুহূর্তেই ভ্রু-যুগল কুঁচকে তৎক্ষনাৎ প্রত্যুত্তর করল,

—“আপনার স্বামী নেই?”
—“নাহ্, নেই তো!”
—“তবে বিয়ে করছেন না কেনো?”
—“তুমি যে কি বলো…”
আনায়া গা দুলিয়ে হেসে হেসে প্রত্যুত্তর পাঠিয়ে, সাথে সাথে দাঁত কিড়মিড়িয়ে ফোনের স্ক্রিনে টাইপ করতে করতে আওড়াল,
“খেয়ে দেয়ে আর কাজ নেই। এতো সহজে বেটার ঘাড় থেকে নামব আমি?”
—“ভুল কি বললাম? মাঝরাতে অন্যের হাজবেন্ডকে বিরক্ত না করে, বিয়ে করলেই তো পারেন।”
ততক্ষণে কেনীথের রিপ্লাই চলে এলো। কিন্তু একটা বিষয় খেয়াল করেই আনায়া এক চিলতে কুটিল হাসল।
—“এক সেকেন্ড এক সেকেন্ড, অন্যের হাজবেন্ড মানে?তোমার বউ আছে?”
—“হ্যা আছে।”
—“সত্যি?”
—“মিথ্যে বলার তো কিছু নেই।”
—“তাহলে ঐ ৪-৫টা গফ-জফ, ওরা কি? বউ থাকার পরও…”
—“এটাই কি স্বাভাবিক না?”
—“আ…হাহ, হা…স্বাভাবিকই তো। কিন্তু তোমার বউ তোমায় কিছু বলে না? যতই হোক, ঘরে বউ রেখে সাথে আবার চারটা-পাঁচটা গার্লফ্রেন্ড রাখা—এটা তো কোনো দেশেরই মেয়ে মেনে নিবে না। আমার মনে হয়, এলিয়েনদের বউয়েরাও মেনে নেয় না। তাহলে?”
কেনীথ বিস্তারিত কিছু না লিখে, সংক্ষেপে লিখল,

“আমার বউ আমার সাথে থাকে না।”
—“তো কোথায় থাকে?”
—“থাকে হয়তো কোনো চিড়িয়াখানায়!”
মুহূর্তে রমণীর ললাটে ভাজ পড়ল। চোখ-মুখ কুঁচকে থমথমে ক্ষোভ নিয়ে বলল,
—“তুমি কি আমার সাথে ফাজলামো করছো?”
—“না!”
—“তাহলে? এসব কেমন কথা?”
আনায়া অজান্তেই রাগে কিছুটা ফুঁসে উঠেছিল। কিন্তু প্রত্যুত্তর পাওয়া মাত্রই তার মুখাবয়ব খানিক শিথিল হলো।
—“আমার বউয়ের সাথে আমরা বন্ডিংটা একটু আলাদা।”
—“কেমন, কেমন?”, আনায়া ভ্রু-জোড়া কপালে তুলে চপল হয়ে লিখল।
—“আমি আর আমার বউ সেপারেশনে থাকি।”
নিমিষেই আনায়ার চোখমুখ ব্যাঙ্গাত্বকভাবে ভেচকে গেল। একরাশ বিরক্তি নিয়ে সে বিড়বিড় করল,
“কচু গাছে থাকি আমি। একটু আগেই ঠেসে ঠেসে খাওইয়ে, এখন আবার সেপারেশনের কেচ্ছা শুরু করেছে।”
এদিকে আবারও নোটিফিকেশনের আওয়াজে রমণীর ধ্যান ভাঙল। দেখল,
“তো মিস জুলি দ্য আইসললি! বিয়ে কবে করছেন?”

—“করব না।”
আনায়ার নিরাসক্ত মনোভাব। কেনীথ এক চিলতে তির্যক হেসে ভ্রু উঁচিয়ে শুধালো,
—“কেনো?
—“বিয়েশাদি তো সবাই করে। আমি ভাবছি, বিয়ে-টিয়ে আর করব না। সোজা পরকীয়া করব। আপনি করবেন নাকি—বউ রেখে আমার সাথে পরকীয়া?
কেনীথ মেসেজটার দিকে টানা দুমিনিট চেয়ে রইল। চোখের কোণে চাপা হাসির রেশ রইলেও, মুখে সে ত্যাক্ততার সাথে আওড়াল,
“দিন দিন আসলেই লিমিট ছাড়া অসভ্য হয়ে যাচ্ছে।”
পরমুহূর্তেই কি যেন ভেবেচিন্তে, আনায়ার সাথে তাল মিলিয়ে লিখল,
—“হ্যা করাই যায়।”
—“সত্যি বলছেন?”
আনায়ার চোখেমুখে উপচে পড়া বিস্ময়।এতোসহজে মেনে নিল কিভাবে, তাই তার বোধগম্য নয়।
—“হুম।”
—“বাপরে, যদি আপনার বউ কোনোভাবে আমাদের পরকীয়ার ব্যাপারে জেনে যায়? তখন কি করবেন? এটা তো একপ্রকার ক্রাইম,তাই না?”

—“দ্যান আই’ম আ ক্রিমিনাল।”
আনায়া চোখদুটো সরু করে লাইনটার দিকে তাকিয়ে রইল। তাচ্ছিল্যের সহিত হেসে লিখল,
—“বুঝেছি, বুঝেছি…তো আমরা কি পরকীয়া এখন থেকেই শুরু করব?”
—“আজ আমি খুব টায়ার্ড। কাল থেকে শুরু করি?”
—“আচ্ছা, আচ্ছা, তাহলেই কাল থেকেই পরকীয়া স্টার্ট করব।”
আনায়া থামতে না থামতেই আবারও তার কি যেন মনে পড়ল, ‘ওহ হ্যা,আসল কথাই তো জিজ্ঞেস করা হয়নি।’
সে দ্রুত হাত চালিয়ে লিখল,
—“কিন্তু আরেকটা কথা।”
—“কি?”
—“ধরুন আপনি আপনার বউয়ের জন্য যা যা করতে পারেন, তা কি বাকি মেয়েদের জন্যও করতে পারেন? মানে যারা আপনার আরো গফ-টফ আছে, ওদের জন্যও…”
আনায়ার মনে অবাধ সন্দেহ। কোনোভাবে উত্তরটা পেয়ে গেলেই যেন, তার অনেক সমীকরণ মিলে যাবে। কিন্তু কেনীথের প্রত্যুত্তরগুলো ছিল তার জন্য নিত্যন্তই অপ্রত্যাশিত।
পুরুষ তার ঠিকই বুঝেছিল, ঘুমে ঢলতে থাকা বউ তার মাঝরাতে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই হাজির হয়েছে। যথারীতি সে খানিকটা ভেবেচিন্তেই উত্তর দিল,
“টাকা-পয়সা’র তো আর কমতি নেই। বউকে যা দিতে পারি, তা আর পাঁচটা মেয়েকেও দেওয়ার মতো এবিলিটি আছে আমার।”
আনায়া স্তব্ধ, হতভম্ব হয়ে বসে রইল। চোয়ালটা খানিক শক্ত হলো, ভেতরের চঞ্চলতা জমে শীতল কুন্ডলীতে পরিণত হলো। সে নিজেকে স্থির রেখে লিখল,

—“বাহ, বেশ ভালো তো ব্যাপারটা। তো তোমার বউ আর তুমি যেহেতু সেপারেশনে থাকো, তাহলে তোমাদের মাঝে নিশ্চয় বন্ডিং খুব একটা ভালো নয়। তাই না?”
—“হুম।”
—“তোমার বউ সম্পর্কে আর দুচারটে কিছু বলো! সে কি দেখতে সুন্দর না? দেখতে কি খুব বাজে?”
—“বাজে তো বলব না, তবে আহামরিও কিছু না। এভারেজ! বাট শী ইজ নট মাই টাইপ।”
—“ওহ! সে তোমার টাইপের নয়? তাহলে তোমার কি টাইপের মেয়ে পছন্দ?”
—“একটু বোল্ড, একটু গ্লামারাস…এমন কিছু হলে ভালো হয়।”
আনায়ার চোখমুখ চুপসে আছে। চোখেমুখে বিরক্তি নাকি ক্ষিপ্ততার আভাস তা স্পষ্ট নয়। সে মূর্তির বেশে কেবল টাইপ করে যাচ্ছে।

​—“মরীচিকা পুষতে ভালোবাসেন তাহলে?”
রমণীর লেখনীতে হঠাৎ থমথমে গম্ভীর্যতা নেমে এসেছে। যা দেখে অজান্তেই শুষ্ক হাসল কেনীথ। লিখল,
​—“মন্দ কি তাতে? মরীচিকা অন্তত ছুটে চলার ভ্রমটা টিকিয়ে রাখে।”
​—“ছুটে চলা নয়, ওটা আসলে ঘূর্ণিপাক। শেষমেশ শূন্য হাতে বালুচরে আছড়ে পড়া।”
​—“পতন তো অবশম্ভাবী। তৃষ্ণাহীন দীর্ঘায়ুর চেয়ে ওই উদগ্র মরীচিকাই শ্রেয়।”
​—“যার তীব্রতা সইতে পারবে না, তার পেছনে ছুটে লাভ কী?”
​—“পুড়ে যাওয়াটাও এক ধরনের প্রাপ্তি।”
​—“অথচ আপনি ছাই হওয়াটাকেই ব্যক্তিত্ব বলছেন!”
​আনায়া একমনে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। আঁধারের মাঝে একটুকরো কৃত্রিম আলোয় তার বিষন্ন মুখাবয়বটা জ্বলজ্বল করছে। অদ্ভুতপূর্বক ভাবে সে এখন বুঝতে পারছে না, তার বর্তমান অনুভূতি ঠিক কি রূপ। কেনীথ কোনো প্রত্যুত্তর না করায় সে নিজেই লিখল,
“আপনি আজ যাকে এভারেজ বলে দূরে ঠেলে দিচ্ছেন, সে যদি কখনো অন্য কারও উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠে? সহ্য করতে পারবেন?”

কেনীথ কথার ফাঁকে ফাঁকে অফিশিয়াল কাজগুলো সেরে নিয়েছে। ম্যাকবুকটা বন্ধ করে সাইডটেবিলে সরিয়ে রেখে সে রুমের লাইটগুলো বন্ধ করে দিল। ফোনটা আবারও হাতে নিয়ে, আনায়ার মেসেজটুকু একঝলকে অবলোকন করে তৎক্ষনাৎ বিশেষ কিছু ভাবল। পরমুহূর্তেই সেই ভাবনায় তার বুকে চিঁড়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস নির্গত হলো। টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে বিছানায় শুতে শুতে আনমনা হয়ে লিখল,
​—“অন্যের গল্পে তার স্থান কী হবে, তা নিয়ে পড়ে থাকার মতো সস্তা কৌতূহল তো আমার নেই।”
আনায়া তাচ্ছিল্য সরূপ একচিলতে শুষ্ক হাসল,
​—“সত্যিই নেই? নাকি স্রেফ হারানোর ক্ষতটা ঢাকতে অহংকারের মুখোশ পরছেন?”
​—“মুখোশটাই বোধহয় আমার আসল চেহেরা। ওটা নিয়ে কাটাছেঁড়া না করাই ভালো।”
আনায়া নিঃশব্দে হাসল। সঠিক কোনো প্রতিক্রিয়া করার সুযোগ সে পাচ্ছে না। আজকের মতো কথোপকথনে ইতি টানতে লিখল,
“ভালো থাকুন তবে,গুড নাইট।”
কেনীথ ভ্রু উঁচিয়ে লিখল,
—“এতো দ্রুত ঘুম পেয়ে গেল?”
—“জ্বী।”

আনায়া সংক্ষেপে উত্তরটা দিয়েই ফোনটা বন্ধ করল। মিনিট পাঁচেক স্তব্ধ হয়ে বিছানায় বসে রইল। ভেতরের সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। খানিকক্ষণ পূর্বের স্মৃতিগুলোও কেমন ধূম্রজাল বলেই মনে হলো তার। কিছুক্ষণ থমথমে অবয়ব নিয়ে বসে থাকার পর, হঠাৎ আনায়া আবারও নিজের ফোনটা আনলক করে দেখল—কেনীথ অফলাইনে চলে গিয়েছে। আনায়া তাচ্ছিল্য করে ক্ষীণ হাসল; কিছুক্ষণ আগের চলা সকল কথোপকথনগুলো আবারও আনমনে কিছুটা সময় ক্রল করে দেখল। লোকটার একেক সময় একেক রূপে ধরা দিচ্ছে। এ কেমন বহুরূপী? নাকি সে নিজেই অবোধ। হাতের কাছে কাছে সবটা থাকার পরও কোনো সমাধান পাচ্ছে না।
এই পর্যায়ে নিজের সকল রাগ-ক্ষোভ ক্রমশই উপচিত হলো। আনায়া নিজেকে সামলাতে পারল না। শান্ত মেয়েটা হঠাৎ ক্ষিপ্ত বাঘিনীর ন্যায় ক্ষেপে গিয়ে, হাতের ফোনটা সম্মূখের দিকে ছুঁড়ে মা’রল। মুহূর্তেই তা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে নানান অংশে বিভক্ত হলো। বেশ অনেকটা আওয়াজ হলেও আনায়া তাতে মাথা ঘামালো না। বদ্ধ ঘরে বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরে, নিরেট স্বরে বিড়বিড় করল,
“সত্যিকার অর্থে ধূম্রজালের সেই মায়াবী মরীচিকাটা বোধ-হয় আপনি নিজেই,তাই না? যা দেখাচ্ছেন তা আপনি নন, আর যা আড়ালে ঢাকছেন তার হদিস আমায় দিচ্ছেন না।
ঘটনা যদি তাই হয় তবে, এতো সহজে ছাড়ব না আপনাকে। অপেক্ষা করুন, সবকিছু খুঁজে বের করব। তারপর এমন কিছু করব, যা আজ পর্যন্ত কেউ কখনো করেনি; আপকা জিনা-পিনা বারবাদ কারদুঙ্গা মিস্টার!”

মিউনিখের ঘড়িতে যখন নিঝুম রাত তিনটার কাঁটা ছুঁইছুঁই, সুদূর ইতালির সিসিলিতেও তখন ঠিক একই প্রহর—নিস্তরঙ্গ, স্তব্ধ রাত তিনটা। অতন্দ্র কৃষ্ণবর্ণ সাগরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে এক সুবিশাল অট্টালিকা।পারিপার্শ্বিক জনমানবহীন নিস্তব্ধতাকে পাশ কাটিয়েও তার পরতে পরতে লেপ্টে আছে আভিজাত্য আর বিলাসিতার এক অবাধ্য আস্ফালন। আর এটা সেই সিসিলি, যেখানে কালে কালে নানান পাপের সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে—মাফিয়া কিংবা সন্ত্রাসদের বিশাল সব বিশ্বব্যাপী কুখ্যাত জনগোষ্ঠী। যাদের অস্থিত্ব আজও টিকে আছে এই ধূম্রজালের মাটিতে।
​সিসিলির এই নিস্তব্ধ প্রাসাদসরূপ বাড়িতে এক বিশেষ গোপন কক্ষে অবিন্যস্ত আলো-ছায়ার খেলায় ধীরপায়ে পায়চারি করছে এক দীর্ঘদেহী পুরুষ। পরনে তাঁর ডার্ক ব্রাউন রঙের হাইনেক সোয়েটার আর কালো ট্রাউজার। মাথার সিল্কি কালোচুলগুলো বেশ গুছিয়ে ব্যাকব্রাশ করা। এক হাত ট্রাউজারের পকেটে গভীর করে গুঁজে রেখে অন্যহাতে আলতো করে ধরে আছে কফির মগ। ক্ষণে ক্ষণেই সেই তেতো স্বাদের ডাবল এস্প্রেসো তাঁর রুক্ষ ঠোঁট স্পর্শ করছে। কক্ষের মৃদু আলোয় সেই ছায়ামানবের সুগভীর চোখেমুখে এক অবাধ, তীক্ষ্ণ বিরক্তির রেখা স্পষ্টত ফুটে উঠছে।

দূরের এক কাঠের টেবিলের উপর থাকা সোনালী রঙের গ্রামোফোন হতে ভেসে আসছে ‘bella caio’ নামক সেই বিশ্বখ্যাত ইতালিয়ান প্রেরণাদায়ক গানের পরিচিত সুর। ছায়ামানব সেই নেশালো বিদ্রোহী সুরের তালে ঠোঁট নাড়িয়ে সুর মেলাচ্ছে। কিন্তু কোথাও যেন একটা বিশেষ ঘাটতির দেখা মিলেছে।
​ভাবগম্ভীর, দৃঢ়চেতা সেই পুরুষের মনের গহীনে জ্বলছে এক অব্যক্ত ক্ষোভ। চোখের সামনে সগর্বে জ্বলতে থাকা বিশাল মনিটরগুলোর দিকে তাকাতেই বিরক্তিটা যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেল তাঁর। বেশ কয়েকটা দিন ধরে এক সম্পূর্ণ অপরিচিতা রমণীর প্রতিটি পদক্ষেপ তাঁকে অবলোকন করতে হচ্ছে। মিউনিখের গার্ল ক্রাশ খ্যাত মোহময়ী ইমানির জন্য প্রতিবারের মতো অদ্ভুত সব উপহার না পাঠিয়ে এবার সে পাঠিয়েছিল পাঁচটি বিশেষ পুতুল। যেগুলোর সাধারণ চোখদ্বয়ের মাঝেই লুকিয়ে আসল রহস্য। কিন্তু সেই পুতুলগুলো কেনো ইমানির হাত এড়িয়ে এই অজ্ঞাত মেয়ের শোবার ঘরে স্থান পেল—এই জটিল সমীকরণ মেলাতেই যেন তাঁর ক্ষুরধার মস্তিষ্কের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছে। ইমানি কি পারত না, নিজের অহংকারকে চূর্ণ করে তার উপহার গ্রহণ করতে। এই মেয়েটির পরিবর্তে ইমানি তার নিজের বেডরুমে পুতুলগুলোকে জায়গা দিতে! কিন্তু না, ইমানি তা করেনি। সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে সে তার উপহার বিক্রি করে দিয়েছে।

​ছায়ামানব হতাশ, সে ভীষণ হতাশ। গত কয়েকটা দিন ধরে না চাইতেও স্ক্রিণে ভেসে থাকা মেয়েটির অদ্ভুত খেয়ালিপনা আর পাগলামি তাঁকে চোখের সামনে অবলোকন করতে হয়েছে। সাধারণ কোনো পুরুষ হলে হয়তো এতক্ষণে এই অনাহূত মেয়ের ওপর থেকে নজরদারি সরিয়ে নিত, কিন্তু সে তা করেনি। তাঁর তুখোড়, হিসেবি মস্তিষ্ক অবিরত এক অদ্ভুত বার্তা দিয়ে চলেছে—এই বিভ্রান্তিকর, রহস্যময়ী মেয়েটিই একসময় তাঁর কোনো এক কাঙ্ক্ষিত, বিশেষ অভিসন্ধি পূরণের মোক্ষম হাতিয়ার হয়ে উঠবে।

মহামায়া পর্ব ৪৭

​মনিটরগুলোর সুবিশাল স্ক্রিন থেকে বিচ্ছুরিত নীলাভ আলোর সামনে থমকে দাঁড়াল সেই ছায়ামানব। চপল আনায়া কখনো নানান ছলাকলা তো কখনো ক্ষিপ্ত হয়ে জিনিস ছুঁড়ে ফেলা—সবটাই সে নিরাসক্ত মনোভাবে পরখ করেছে। আপাতদৃষ্টিতে আনায়া পুতুলগুলো হুড়মুড়িয়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়তেই মনিটরের ফুটেজগুলো সব ভুমিকম্পের ন্যায় নড়েচড়ে উঠল। মূহুর্তেই সবক’টা মনিটর ঝাপসা ফুটেজে পরিপূর্ণ হলো।
যা দেখে ছায়ামনবের ঠোঁটের কোণে খেলে গেল এক ধারালো তির্যক ও রহস্যময় হাসি। সে জানে এই দৃশ্য সকাল হতেই আবার স্বাভাবিক হবে। স্ক্রিণের সেই অদ্ভুত মেয়েটি আবারও পুতুলগুলোকে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখবে। কিন্তু রাত হলেই আবারও এমনই দৃশ্যের দেখা মিলবে। সে যাক গে, এসব নিয়ে তার তেমন ভাবান্তর নেই। সে তেঁতো এস্প্রেসোটুকু মুখে নিয়ে, থমথমে ভারী কণ্ঠে ইতালিয়ান কিংবা সিসিলিয়ান ভাষায় এক অদ্ভুতপূর্বক সংমিশ্রণে আওড়াল,
“উন্নি আমমুচ্চি, ইমানি? আ মে ভে-রা প্রে-দা সি তু।”
[ কোথায় পালাবে, ইমানি? আমার মূল শিকার তো তুমিই! ]

মহামায়া পর্ব ৪৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here