মিহি পর্ব ৩৮ (২)
রুপন্তী সরকার
ওরা দুইজন ফ্রেশ হয়ে নিলো। অভ্র এসে দরজায় নক করে…
“কিরে তোগো দরকারি কাম হয় নাই? কালকে ৫-৬ ঘন্টার নাম কইরা সারারাত সারাদিন রুমের মধ্যে ডুকে আছিস এখন বাজে বেলা ১ টা হুস আছে?”
রিদ দরজা খুলে দিয়ে বললো।
“যা সুফ বানিয়ে নিয়ে আয় আমার বউ অসুস্থ।”
“এখন সুফ খাবে?
রিদ অভ্রর দিকে তাকিয়ে বললো
“হু”
অভ্র এবার মিহি কে খেয়াল করলো। চাদরমুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। অভ্র মিহির কাছে গিয়ে বললো।
“টুইংকেল শরীর কি বেশি খারাপ?”
মিহি চাদরের নিচ থেকে বললো।
“না বেশি না একটু”
অভ্র বললো
“তো মুখ ডেকে আছো কেনো ব্যাঙ্কেটের নিচ থেকে বের হও টুইংকেল”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
এই বলেই অভ্র মিহির উপর থেকে চাদর সরিয়ে দিতে যাবে। এমন সময় রিদ এসে অভ্রর হাত ধরে বললো
“খুব ব্ল্যাঙ্কেট গায়ে দিয়ে আছে তাতে কি তোর চুলকাচ্ছে? যা সুফ বানিয়ে নিয়ে আয়। আমার পাখি অসুস্থ।”
“হো দুনিয়ায় তেগো একারই বিয়া হইছে তোর পাখি একাই অসুস্থ হয়। আজ কেউ নাই বইলা”
মিহি হঠাৎ বলে উঠলো
“তিথি আপু তো আছে”
মিহির কথা শুনে অভ্র মুখ ফুলিয়ে চলে গেলো।
এর মধ্যেই রিদের কাছে পুলিশের কল আসে। রিদ বেলকুনিতে চলে যায়। ওই পাশ থেকে একটা পুলিশ বললো
“মিস্টার চৌধুরী আমরা ডক্টর ক্রিভানের বিষয়ে তদন্ত করে করেছি এবং কিছু জিনিস জানতে পেরেছি। আপনি ইমিডিয়েটলি পুলিশ স্টেশনে আসুন।”
“আচ্ছা যাচ্ছি”
এইদিকে রিদ মিহির কাছে এসে ওর কানে কানে বললো।
“তুমি খেয়ে একটু রেস্ট নিও প্রিন্সেস। কালকে থেকে তোমার উপর অনেক ধকল গেছে। আমি একটু পুলিশ স্টেশন যাচ্ছি। টাটা”
এই বলেই রিদ চলে গেলো।
এইদিকে….
ক্রিভান কে রাতে অনেক মারধর করা হয়েছে। এখনো ওকে
ওর মুখ কিন্তু ও কিছুতেই মিহির নাম নেওয়া বন্ধ করছে না। হাউমাউ করে কাঁদছে আর মিহির নাম নিয়ে যাচ্ছে।
এক সাথে ২-৩ জন পুলিশ মিলে ক্রিভান কে শান্ত করতে পারছে না। একজন পুলিশ অফিসার বললো
“আরে ভাই ওই মেয়েটা বিবাহিত। দুনিয়ায় এতো মেয়ে থাকতে ওর জন্যই কান্না করতে হবে?”
ক্রিভান একটু হেসে বললো
” ও আমার বার্বিডল ও আবার আমার কাছে এসেছে। একটু না হয় ভালোইবেসেছি তাই বলে আমাকে এভাবে মারবেন?”
“দেখ ভাই একে তো তুই অন্যের বউকে কিডন্যাপ করেছিস তার উপর মেয়েটা কে হয়ত বাজে ভাবে স্পর্শ করেছিস যার কারণে মেয়েটা সুইসাইড করার চেষ্টা করেছে। এক কথায় তুই ওকে বাধ্য করেছিস। তাহলে তোকে কি ছেড়ে দিবো?”
ক্রিভান এবার জোরে চিৎকার করে বললো
“আল্লাহর কসম আমি ওরে বাজে ভাবে স্পর্শ করি নি। ও তো আমার বার্বিডল ওকে বাজে ভাবে ছোঁয়ার কোনো ইচ্ছে ছিলো না আমার। আমি জানি না ও কেনো এমন করছিলো। ও আমাকে কেনো এতো ঘৃণা করছিলো? আগে তো আমাকে খুব ভালোবাসতো। এখন কেনো বাসে না?
যায়হোক ও আমাই ঘৃণা করলে করুক আমি ওকে ভালোবাসলেই হবে”
পুলিশ গুলো এবার ভালো ভাবে ক্রিভান কে বুঝাতে লাগলো। কিন্তু কিছুতেই শুনছে না নিজের মতো আবল তাবল বকে যাচ্ছে। ক্রিভান কিছুতেই ওর ভুল শিকার করছে না।
পুলিশ গুলো এবার ওকে ইচ্ছে মতো মারতে থাকে। দীর্ঘ সময় মারধরের পর ক্রিভান অবশেষে
সেন্সলেস হয়ে পড়ে। অবস্থা এতটাই খারাপ হয় যে সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। অন্যদিকে, রিদ পুলিশ স্টেশনে এসে ক্রিভানকে না পেয়ে জানতে পারে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। কোনো কথা না বাড়িয়ে সেও সোজা হাসপাতালের দিকে রওনা হয়।
হাসপাতালে গিয়ে রিদ দেখে, ক্রিভানের কেবিনের সামনে দুইজন পুলিশ অফিসারের সঙ্গে ডক্টর কথা বলছেন। ডক্টরের কথা শুনে রিদ স্তব্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন টেস্টের মাধ্যমে জানা গেছে, ক্রিভান নিয়মিত হাইড্রোজেন ড্রাগ নেয়, আর সেটা আজ–কাল না, বহু বছর ধরে।
রিদ চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব শোনে।
পরে অফিসারদের কাছ থেকে ধীরে ধীরে পুরো সত্যিটা জানতে পারে।
ক্রিভানের শৈশব কেটেছে একা একা। বাবা–মা দুজনেই কার অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর, তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় চাচার বাড়িতে। সেখানে তার চাচা সম্পত্তির ভাগ দিতে হবে বলে ওকে অনেক নির্যাতন, শারীরিক মারধর, মানসিক অত্যাচার, অবহেলা করে। অথচ এত কিছুর ভিতরে ক্রিভান পড়াশোনায় অসম্ভব ভালো ছিল। কিন্তু মাঝেমাঝেই অন্যমনস্ক হয়ে যেত, আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দিত। এরপর মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়। ক্রিভান ছিলো অনেক শান্ত প্রকৃতির। কারো সাথে তেমন কথা বলতো না। ওদের ডিপার্টমেন্টের একটা মেয়ে ছিলো নাম স্নিগ্ধা। মেয়েটা অসম্ভব সুন্দর। ক্রিভানের সাথে ওর খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়। এরপর ওরা এক সাথে ২ বছর থাকে। আস্তে আস্তে ওদের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়। ক্রিভান স্নিগ্ধা কে বার্বিডল বলে ডাকতো। ওরা একে অপরকে অসম্ভব ভালোবাসে। ওরা ঠিক করে বিয়ে করবে। ক্রিভান স্নিগ্ধা কে নিয়ে বিয়ের শপিং করে করতে যায়। শপিং শেষ ওরা বাহিরে আসে। স্নিগ্ধা ক্রিভান কে বলে
“ওই দোকান থেকে একটা ফুল এনে দিবা?”
ক্রিভান স্নিগ্ধা কে দাড়াতে বলে ফুল নিতে যায়। ফিরে এসে দেখে গোটা রাস্তায় তার বার্বিডলের রক্ত ছড়িয়ে আছে। ক্রিভান স্তব্ধ হয়ে যায়। কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। ছুটে যায় স্নিগ্ধার কাছে। আশে পাশে মানুষের ভিড় জমে গিয়েছে। স্নিগ্ধার নিথর দেহখানা পড়ে আছে। ক্রিভান গিয়ে স্নিগ্ধার মাথা ওর কোলে নিয়ে বললো
“আমার এই দুনিয়ায় কেউ নেই বার্বিডল আমাকে ছেড়ে যেও না আমি কি নিয়ে বাঁচবো? কাকে নিয়ে বাঁচবো?”
স্নিগ্ধা আলতো হাসার চেষ্টা করে বললো
“আমি আবার ফিরবো।আবার ফিরবো”
এর পর ও শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে। সেদিন ক্রিভান কেঁদেছিলো খুব কেদেছিলো। তখন থেকে ও আশা করে থাকে ওর বার্বিডল ওকে কথা দিয়েছে সে ফিরবে।
অতিরিক্ত মানসিক চাপ আর পুরনো স্মৃতি মাথার ভেতর জমে জমে একসময় বিস্ফোরণ ঘটায়। সেখানে পড়াশোনার চাপ, একাকীত্ব, আর চাপা ট্রমা, সব মিলিয়ে সে ধীরে ধীরে ড্রাগের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ড্রাগই হয়ে ওঠে তার পালানোর রাস্তা।
কিন্তু সেই ড্রাগই একসময় তার বাস্তবতা নষ্ট করে দেয়। প্রথম যেদিন মিহি কে দেখে তখন ওর মনে হয় মিহিই ওর বার্বিডল। মিহি দেখতে অনেকটা স্নিগ্ধার মতো। ওর চোখ ওর এলোমেলো চুল। মিহি কে দেখে ক্রিভান ভাবে ওর বার্বিডল তার কথা রেখেছে সে সত্যিই ফিরেছে। তারপর ক্রিভান মিহির বিষয়ে খোঁজ লাগাই। তবে জানতে পারে ও বিবাহিত। সেদিন অনেক নেশা করে। এরপর থেকে ঠিক করে মিহি কে এবার নিজের করবেই। একবার হারিয়েছে এবার আর হারাতে দিবে না। মিহি হয়ে উঠে ক্রিভানের ভালো থাকার সঙ্গী। মিহি কে দেখলে ওর ড্রাগস নিতে হতো না। তবে যখন মিহি কে কাছে পেতো না তখন পাগলের মতো করতো। আর ড্রাগস নিতো।
সব কথা শোনার পর রিদ আর চুপ থাকতে পারে না। সে ধীরে ধীরে কেবিনের ভেতরে ঢোকে। বিছানায় শুয়ে থাকা ক্রিভান চোখ মেলে তাকায়। রিদকে দেখে হেসে ওঠে,
“আমি একদিন ঠিক আমার বার্বি ডলকে নিজের করেই ছাড়বো। ও ফিরেছে শুধু আমার জন্য। তোর জন্য না। ও আমাকে বলেছে ও আসবে।”
এই কথায় রিদের ভেতরটা জ্বলে ওঠে। সে হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে ক্রিভানের গলা চেপে ধরে।
“তোকে মারতেও এখন ইচ্ছা করছে না,” রিদ দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “আবার তোর এই কথা সহ্যও হচ্ছে না। তোর কাহিনী জানার পর শুধু আফসোস হচ্ছে। ”
কয়েক সেকেন্ড পর রিদ নিজেকে সামলে নেয়, হাত সরিয়ে নেয় গলা থেকে। রিদ একটু নরম গলায় বলে,
“তুই যেটাকে ভালোবাসা ভাবছিস, ওটা ভালোবাসা না, ক্রিভান। ওটা আমার ভালোবাসা। তোর ভালোবাসা বেঁচে নেই ক্রিভান। ও মিহি আমার আমার আমার প্রিন্সেস ও। ওকে তুই তোর বার্বিডলের সাথে গুলিয়ে ফেলেছিস।”
ক্রিভান হেসে ফেলে।
মিহি পর্ব ৩৮
“ না সে আমার বার্বিডল। ও আমাকে কথা দিয়েছে ও আসবে। আর ও সত্যিই এসেছে। সবাই আমাকে ছেড়ে গেছে। বাবা-মা, বাড়ি, শৈশব… সবাই। বার্বিডল ও যদি চলে যায় তাহলে তো আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো”
রিদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“ভালো হয়ে যা, ক্রিভান। সত্যি ভালো হয়ে যা। ভালো একটা ডাক্তারের কাছে ট্রিটমেন্ট নে। না হলে আমার প্রিন্সেস এর নাম যদি তোর মুখে থেকে শুনি, তাহলে তোকে কি করবো আমি নিজেও জানিনা। তোর না তোর অতীত এর কথা ভাববো না তো অসুস্থতার কথা জানে মেরে দেব।
বলে রিদ কেবিন থেকে বের হয়ে আসলো।
সব গুলিয়ে যাচ্ছে। একটা ছেলে ওর প্রিন্সেস কে নিজের ভালোবাসা বলে দাবি করছে ওর বুকের ভেতর টা জ্বলে যাচ্ছে।
