Home মোহশৃঙ্খল মোহশৃঙ্খল পর্ব ২১ (২)

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২১ (২)

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২১ (২)
মাহা আয়মাত

রাত এখন সাড়ে নয়টা। ঠিক আটটা বাজে থেকেই মিশান মেহজাকে তার নিজের রুমে এনে রেডি করাচ্ছে। পুরো দেড় ঘণ্টা ধরে। কিন্তু কেন সাজানো হচ্ছে, সেই কারণটা মেহজা কিছুতেই বুঝতে পারছে না। লাল সিল্কের শাড়ি, স্ট্রেইট করা চুল, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক, কানে সাদা কুন্দন পাথরের দুল আর চোখে গাঢ় কাজল। শাড়িটা পড়িয়ে দিয়ে গেছেন আস্মিতা তালুকদার। আস্মিতা তালুকদারও জানেন না, মেহজাকে কেন এমনভাবে সাজানো হচ্ছে। তবে বিবাহিত মেয়েকে বেশি প্রশ্ন করাও ঠিক না ভেবে তিনি শুধু শাড়িটা পরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেছেন। আর মেহজাকে সাজিয়ে দিয়েছে মিশান। সাজ শেষ হতেই মিশান খেয়াল করে শাড়ির কুচিটা একটু এলোমেলো, তাই নিচু হয়ে সেটাও ঠিক করতে লাগে।
মেহজা আর তার বিরক্তি ধরে রাখতে পারে না।

— কি হয়েছে, বাল! বলবি তো এভাবে সাজাচ্ছিস কেন?
মিশান মুখ তুলে মেহজার দিকে তাকায়।
— একদম বকবে না আপু! কত সুন্দর করে সাজিয়ে দিচ্ছি আর তুমি বকতেছো!
মেহজা চোখ রাঙিয়ে বলে,
— এই স্মল পিপল! তোকে বলছি আমি আমাকে সাজিয়ে দিতে? আর তুই কারণ বল! কেন সাজাচ্ছিস!
মিশান শাড়ির কুচির দিকে তাকিয়ে বলে,
— এই তো হয়েছে গেছে!
মেহজা ভ্রু কুচকে বলে,
— কি?
মিশান হেসে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

— শাড়ির কুচি! একদম পারফেক্ট!
মেহজা দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— মিশান আমি কিন্তু সব খুলে ফেলবো!
মিশান দ্রুত মাথা নেড়ে বলে,
— এই না না! আমার সামনে কেন খুলবে! তোমার জামাইয়ের সামনে গিয়ে খুলো!
— একটা লাথি দিবো! দাড়া আম্মুকে বলছি তোকে মেরে সাইজ করতে!
মিশান হেসে মেহজার হাত জরিয়ে ধরে বলে,
— পরে বলবে! এখন চল!
মেহজা ভ্রু কুঁচকে বলে,
— কোথায়?
— জিজুর কাছে!
মেহজা অবাক বলে,
— উনার কাছে?
— হ্যা। দ্রুত চল।
মিশান মেহজাকে সাথে করে রুম থেকে বের হয়ে করিডোর পেরিয়ে তারা গিয়ে দাঁড়ায় আরভিদের রুমের সামনে। দরজার কাছে এসে মিশান হেসে বলে,

— যাও ভেতরে! জিজু তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।
কথাটা শুনে মেহজার মধ্যে হালকা লজ্জার ঢেউ উঠে। সে এত সাজগোজ করেছে, আরভিদ ভেতরে অপেক্ষাও করছে। তাহলে কি ভেতরে বিশেষ কিছু আছে?
মিশান আবার মুচকি হেসে বলে,
— তুমি ভেতরে যাও, আমি যাচ্ছি।
মিশান চলে গেল। মিশানের চলে যাওয়ার দিকে এক নজর দেখে মেহজা আবার চোখ ফেরায় আরভিদের দরজার দিকে। এক কদম এগিয়ে গিয়ে আলতো করে দরজাটি ঠেলে দিতেই সেটি ধীরে খুলে গেল। ভেতরে তাকিয়ে মেহজা থমকে দাড়ায়। পুরো রুমের চারপাশে ছোট ছোট মোমবাতি জ্বলছে। কিছু ছোট লাইটও জ্বালানো, যেগুলো ঘরটাকে নরম আলোয় উষ্ণ করে তুলেছে। মেঝেতে ছড়ানো গোলাপের পাপড়ি। রুমে হালকা ফুলের গন্ধ। এর মাঝে মেহজার নাকে পরিচিত একটা পারফিউমের গন্ধ এলো। আরভিদের পারফিউম।

ঠিক তখনি মেহজার চোখ পড়ে ডানদিকে। আরভিদ হালকা আলোয় এগিয়ে আসছে। এক মুহূর্তে জন্য মেহজার হৃদয় থমকে যায়। আরভিদের পড়নে সাদা শার্ট-প্যান্ট। শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত ফোল্ড করা। আরভিদের সিল্কের কয়েকটি চুল কপালে পড়ে আছে। বাম হাতে চকচকে সিলভার ব্রেসলেট। হাতের অনামিকা আঙুলে ছোট্ট সিলভার রিং। সব মিলিয়ে আরভিদকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। আজকে অন্য দিনের তুলনায় আরও তার বেশি সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। চোখ ফেরানো যাচ্ছে না তার থেকে!মেহজাও চোখ সরাতে পারছে।
আরভিদ কাছে এসে মেহজার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। মেহজা ধীরে হাত বাড়িয়ে আরভিদের হাতে হাত রাখে। আরভিদ মেহজার হাতটা ধরে তাকে রুমের ভেতর নিয়ে আসে। দরজা বন্ধ করে ডানদিকে এনে দাঁড় করায় একটি ছোট সাজানো গোল টেবিলের সামনে। দুটো চেয়ার রাখা। টেবিলের ওপর সাদা সিল্ক কাপড়, তার উপর ছড়িয়ে আছে গোলাপের পাপড়ি, মাঝখানে তিনটা ধাপে সাজানো মোমবাতি। আর এক কোণে রাখা লাভ শেপের কেক। সাদা আইসিংয়ের ওপর দুটো লাল গোলাপ। পাশে দুটি জুসের গ্লাস। আর খাবারে রয়েছে মাশরুম ক্রিম সুপ, চিকেন কাটলেট, লবস্টার, বিফ স্টেক, ক্রিম পাস্তা।
মেহজা এসব দেখে বিস্মিত হয়ে বলে,

— এতোসব কিছু…..
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মেহজা আরভিদের দিকে তাকাতেই দেখে আরভিদ এক হাঁটু গেড়ে বসে একটা ছোট রিং এর বক্স ধরে রেখেছে। বক্সের মধ্যে পিঙ্ক ডায়মন্ডের একটি রিং। আরভিদ রিংটি হাতে নিয়ে মেহজার দিকে বাড়িয়ে গভীর চোখে তাকিয়ে নরম স্বরে বলে,
— মেহু, আমাদের মধ্যে থাকা দূরত্ব, দেয়াল সবকিছু ভেঙে আমাকে নিজের করে নিবি? এই রাগি কারদারকে নিজের করে নিবি? ওয়াদা করছি নিজেকে পরিবর্তন করে তুই যেমন চাস তেমন হয়ে যাবো! হবি আমার?
মেহজা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,

— নাহ!
আরভিদের মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে মেহজার দিকে তাকিয়ে থাকে। তখনি মেহজা ধীর কন্ঠে বলে,
— আপনার পরিবর্তন হতে হবে না! আপনি যেমন তেমন আরভিদ কারদারেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে আমার মন আর আমি!
আরভিদ গভীর শ্বাস নিয়ে হেসে উঠে। রিংটা মেহজার বাম হাতের অনামিকায় পরিয়ে দেয়। তারপর মেহজার হাতে আলতো চুমু খেয়ে মেহজার চোখে চোখ রেখে বলে,
— তুই আমার জীবনের সেই অমূল্য রত্ন, যাকে আমি নিজেকে বিক্রি করে হলেও কিনতে চাই।
মেহজা বিস্ময় আর আনন্দে শুধু তাকিয়ে থাকে। তার চোখেমুখে উপচে পড়ছে খুশি। আরভিদ উঠে দাঁড়ায়।
মেহজার হাত ধরে বলে,
— চল কেক কাটি।
দুজনেই টেবিলের কাছে আসে। কেকের উপর লেখা—ফরএভার ইউরস জালেমা—তার নিচে টানা একটি ছোট হার্ট। আরভিদ ছুরি তুলে মেহজার হাতে ধরিয়ে দেয়। মেহজার হাতের উপর নিজের হাত রেখে দুজনে মিলে কেক কেটে নেয়। প্রথমে আরভিদ মেহজাকে কেক খাইয়ে দেয়, তারপর মেহজা আরভিদের মুখের সামনে কেক তুলে ধরতেই আরভিদ হালকা হেসে খেয়ে নেয়। আরভিদ পাশ থেকে দুটি টিস্যু নিয়ে একটা মেহজাকে দেয়, আরেকটা দিয়ে নিজে হাত মুছল। তারপর চেয়ার টেনে ধরে মেহজাকে বসতে বলে চোখের ইশারায়। মেহজা বসলে আরভিদও তার বিপরীত চেয়ারটাতে বসে।
আরভিদ জুসের গ্লাস তুলে মেহজার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,

— জালেমা, এ সুইট লিটল টোস্ট টু সেলেব্রেট আওয়ার ভেরি ফার্স্ট ডেট টুগেদার আফটার দ্য ওয়েডিং!
মেহজাও নিজের গ্লাস তুলে আরভিদের গ্লাসে হালকা ঠুকে টোস্ট করে। তারপর দুজনেই একসাথে গ্লাসে চুমুক দেয়। তাদের দৃষ্টি আটকে আছে একে অপরের চোখে।
আরভিদ চুমুক শেষে গ্লাসটা নামিয়ে টেবিলে রেখে মেহজাকে বলে,
— গ্লাস নামানোর পর আরভিদ মাশরুম সুপের ডিসটা বাড়িয়ে দিল। মেহজা বাটিতে সুপ নিয়ে নিল।
মেহজা লজ্জমিশ্রিত হেসে আস্তে করে বলে,

— অফকোর্স মাই ডিয়ার হাসবেন্ড।
আরভিদ হাসে মেহজার কথায়। সে মেহজার দিকে মাশরুম স্যুপের ডিশটা এগিয়ে দেয়। মেহজা বাটিতে সুপ নেয়। তারপর দুজনেই খেতে শুরু করে। দুজনেই মাঝে মাঝে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। মেহজার চেহারা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। তবুও লজ্জার লালচে রঙ তার গালে লেগে আছে।
অল্প কিছু খাওয়ার পর আরভিদ উঠে দাঁড়িয়ে মেহজার দিকে এগিয়ে আসে। মেহজার দিকে হালকা ঝুকে হাত বাড়িয়ে মুচকি হেসে বলে,
— রেড ভোল্টেজ?
মেহজা তাকায়,
— হুম?
আরভিদ নরম স্বরে বলে,
— মে আই ডান্স উইথ ইউ?

মেহজা মুচকি হেসে আরভিদের হাতে হাত রেখে সে উঠে দাঁড়ায়। আরভিদ টেবিল থেকে রিমোটে ক্লিক করতেই সাউন্ড বক্সে “Mareez-e-Ishq” গানটা বাজতে শুরু করে। আরভিদ মেহজাকে এনে মাঝখানে দাঁড় করায়। সে বাম হাতটা পাশে তুলে এগিয়ে দেয়। মেহজা নিজের ডান হাতটা আলতো করে তার হাতে রাখে। আরভিদ ডান হাতটা মেহজার কোমরে রেখে তাকে আরও কাছে টেনে আনে।
দুজনের শ্বাস একে অপরের মুখে লাগছে। চোখে চোখ রেখে মুহূর্তটা কিছুক্ষণ থমকে থাকে। তারপর দুজনে গানের তালে ধীরে ধীরে নাচতে শুরু করে। সাউন্ড বক্সে গান বাজছে,

Talab hai tu, tu hai nasha, gulaam hai dil ye tera.
Khul ke zara jee loon tujhe, aaja, meri saanson mein aa.
Mareez-e-ishq hoon main, kar de dawa
Haath rakh de tu dil pe zara.
Oh-oh, haath rakh de tu dil pe zara.

গানের শেষের দিকে আরভিদ হাত তুলে মেহজার তর্জনী আঙুলটা আলতো করে ধরে তাকে ঘুরাতে থকে। ঘুানোর শেষের দিকে আরভিদ মেহজাকে হালকা বাকা করে ধরে সামনে ঝুঁকে মেহজার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। মেহজার ডান হাত থাকে আরভিদের বাম কাঁধে, আর বাম হাত দিয়ে সে ধরেছিল আরভিদের ডান হাতের পেশি। মেহজাও মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে আরভিদের দিকে।
আরভিদ আর নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে না। সে মেহজাকে টেনে নিজের বুকে চেপে ধরে এবং মেহজার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। মুহূর্তেই চুমুটা গভীর হতে থাকে। আরভিদের হাত মেহজার গাল স্পর্শ করে তাকে আরও কাছে টেনে নিচ্ছে। অন্যদিকে মেহজাও থেমে নেই। সে আরভিদের মাথার পেছনের চুল খামচে ধরে আরভিদকে সাড়া দিতে থাকে। সে এমন ভাবে জরিয়ে ধরে রেখেছে যেন সেও ছাড়তে চাইছে না আরভিদকে। কয়েক মিনিট পর দুজনেই আলাদা হয়ে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে। দুজনের বুকে সমান তালে ঢেউ খেলছে দ্রুত শ্বাস।
হঠাৎই আরভিদ মেহজাকে কোলে তুলে নেয়। মেহজা বিস্মিত হলেও কিছু বলার আগেই আরভিদ তাকে বিছানায় আলতোভাবে শুইয়ে দেয়। তারপর নিজে দাঁড়িয়ে শার্টের বোতাম খুলতে লাগে। আরভিদের চোখে গভীর, মাতাল করা নেশা। কণ্ঠে গভীর আকুলতা,

— আজকে আমি অনেক সুখ চাই মেহু! অনেক সুখ!
মেহজার মুখ লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে উঠে। সে শুধু তাকিয়ে থাকে আরভিদের দিকে। তার শ্বাস ভারী হয়ে আসছে। আরভিদ শার্ট খুলে পাশে ফেলেই মেহজার ওপর উঠে পড়ে। তবে শরীরের সবটুকু ভার মেহজার উপর ছাড়ে না। আরভিদ মেহজার গাল ছুঁয়ে বাজখাঁই কন্ঠে বলে,
— আজকে নিজেও পাগল হবো! তোকেও পাগল করবো! আজকে আমার আদরের সুখে তোকে পাগল করে দেবো!
বলেই আরভিদ আবার মেহজার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে আরভিদ মেহজার ঠোঁট থেকে নেমে গলা, কাঁধ চুমু দিতে থাকে। মেহজার পুরো শরীরে অদ্ভুত উত্তাপ আর শিহরণ তৈরি হচ্ছে। সে ঠোঁট কামড়ে আরভিদের প্রতিটি স্পর্শ অনুভব করছে। আরভিদ মেহজার আঁচলটা টান দিয়ে বুক থেকে সরিয়ে মেহজার বুকে চুমু দিতে শুরু করে। মেহজার শরীর কাঁপছে, মন যেন অদৃশ্য কোনো জায়গায় ভেসে যাচ্ছে। সে বারবার ঠোট ভিজিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে, আরভিদের স্পর্শে যেন পুরো দুনিয়া হারাচ্ছে। তার হাত স্বভাবসিদ্ধ ভালোবাসায় আরভিদের পিঠ বুলাচ্ছে। ঠিক তখনি তার চোখ গিয়ে পড়ে সিলিং এর ওপর। একটা টিকটিকি!

মুহূর্তেই মেহজার সমস্ত ছটফট থেমে যায়। শিহরণ কেটে গিয়ে জায়গা নেয় ভয় আর আতঙ্ক। সে হঠাৎই আরভিদকে জোরে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। আকস্মিক ধাক্কায় আরভিদ অপ্রস্তুত হয়ে বিছানার শেষ প্রান্তে গিয়ে পড়ে। মেহজা দ্রুত উঠে বসে আচল টেনে নেয় বুকে। তারপর দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে যায়। মেহজার চোখ বড় বড়, মুখ ফ্যাকাশে।
আরভিদ স্তব্ধ হয়ে যায়। সে কিছুই বুঝতে পারে না মেহজা তাকে কেন ধাক্কা দিলো। আর কেনই বা উঠে দাঁড়িয়ে গেল।
আরভিদ হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে মেহু?
মেহজা বেড থেকে একটু পিছিয়ে গিয়ে ভয়ে ফ্যানের দিকে আঙুল তোলে,
— ঐ যে টিকটিকি!
মেহজার কথা শুনে আরভিদ কয়েক সেকেন্ড হতবাক হয়ে থাকে। সে একবার টিকটিকির দিকে তাকায়, আবার মেহজার দিকে।
আরভিদ বলে,

— তো কি হয়েছে?
মেহজা বিরক্ত হয়ে বলে,
— তো কি হয়েছে মানে? আপনি জানেন না আমি টিকটিকি ভয় পাই?
আরভিদ শান্তভাবে বলে,
— হুম, কিন্তু সেটা তো ছোট থাকতে। তখন তুই শুনেছিলি টিকটিকি কামড় দিলে মানুষ মরে যায়, তাই ভয় পেতে।
মেহজা চোখমুখ কুচকে বলে,
— ভয় আমি এখনোও পাই! আপনি দ্রুত টিকটিকিটাকে মারেন!
আরভিদ একটু বিরক্ত হয়ে বলে,
— মেহু, এটা ঐখানেই আছে। এদিকে আসছে না। চলে যাচ্ছে। ছাড় তুই এটাকে।
মেহজা চোখ রাঙিয়ে বলে,

— না ছাড়বো না! আপনাকে আমি যা বলছি সেটাই করেন। টিকটিকিটাকে মারেন!
আরভিদ হতাশ হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। রাগে তার মনে হলো নিজের মাথার চুল নিজেই ছিঁড়ে ফেলবে, কারণ মেহজাকে তো কিছু করতে পারবে না! আর না কিছু বলতে পারবে! অনিচ্ছা সত্ত্বেও আরভিদ বিছানা থেকে নেমে নিচে রাখা শার্টটা তুলে পরে নেয়। তারপর সাইড টেবিল থেকে পানির বোতলটা হাতে নিয়ে মনে মনে বলে,
— আজকে সালা তোকে চেপ্টা বানাবো! আসার আর সময় পাস না!

আরভিদ মনে মনে কথাটা বলতে বলতে বেডে উঠে দাঁড়ায় টিকটিকিটাকে মারতে। কিন্তু টিকটিকি সিলিংয়ে, বেশ উঁচুতে। আরভিদ লাফ দিয়ে মারতে যায়, কিন্তু টিকটিকি সরে অন্যদিকে চলে যায়। সে আবার লাফ দেয়, টিকটিকি আবার সরে যায়। আরেকবার লাফ দেয়, এবার জোরে। ঠিক তখনি ধড়াম শব্দে সে বেডের মাঝখান দিয়ে নিচে ভেঙে পড়ে। মেহজা বলদের মতো তাকিয়ে থাকে। আরভিদ নিজেও কয়েক সেকেন্ড বুঝতে পারে না কী হয়েছে। তারপর বুঝতে পারে, সে বেডটাই ভেঙে ফেলেছে! সে ধীরে আশপাশে তাকায়, তারপর মেহজার দিকে। মেহজা এখনো মুখ হাঁ করে বেডের দিকে তাকিয়ে আছে।

আরভিদ ভাঙা বেড থেকে উঠে আসে। দাঁড়িয়ে বেডের মাঝখানে ফাটলটা দেখে আবার মেহজার দিকে তাকায়। মেহজা এখনও স্তব্ধ। আরভিদ কিছু বলতে নিবে, ঠিক তখনি মেহজা বলে,
— এটা কি করলেন! এখন আমরা ঘুমাবো কিভাবে?
আরভিদ ভয়ে ভয়ে সামান্য হাসার চেষ্টা করে,
— দুজনে সোফায় এডজাস্ট করে নিবো!
মেহজা এবার আরভিদের দিকে এমনভাবে তাকায় যেন তাকে কাঁচা চিবিয়ে ফেলবে। আরভিদ জোর করে হাসি ধরে রাখে মুখে।
— আর বাড়ির মানুষ কি ভাববে? সবাই কি মনে করবে?
— সবাইকে ক্লিয়ার করে দিবো আমি! কিভাবে বেড ভেঙেছে!
মেহজা দাঁতে দাঁত চেপে মেকি হাসি দিয়ে বলে,
— তাই?
আরভিদ হেসে মাথা নেড়ে বলে,
— হ্যা।
মেহজা আরভিদের হাত ধরে দরজার সামনে এনে দাঁড় করায়। আরভিদ অবাক হয়ে বলে,
— কি হয়েছে? এখানে আনলি কেন?
মেহজা দরজা খুলে আরভিদকে পেছন দিকে থেকে লাথি মেরে বাইরে বের করে দিয়ে বলে,

— তোকে লাথি মেরে বের করে দেওয়ার জন্য! পটলা একটা!
বলে দরজা বন্ধ করে দেয়। মেহজা দরজা বন্ধ করে সোফায় এসে বসে পড়ে। রাগে এবং টেনশনে তার চোখে পানি চলে আসে। সে চিন্তায় পড়ে যায়। মিশানের কানে যদি এই বেড ভাঙার কথা যায়, তাহলে মিশান তাকে আর কাউকে সামনে যেতে দেবে না। তার উপর এরকম সুন্দর একটা রাত নষ্ট হয়ে গেল। এই কারণেও তার কান্না পাচ্ছে।
আরভিদ মাটিতে পড়ে থেকেই ঘুরে যেই মেহজাকে ডাক দেবে, এমন সময়ই পাশ থেকে শোনে,
— হোয়াট দা ফাচ! মেসির বোন দেখি! মেসিও এতো জোরে গোল করে না!
আদ্রিক অর্তিহার রুমের সামনে হাতে সুপ্যের বাটি নিয়ে তারই দিকে তাকিয়ে আছে। আদ্রিকের ঠোঁটে খেলছে দুষ্টু একচিলতে হাসি।
আরভিদ দ্রুত উঠে দাঁড়ায়, যেন কিছুই ঘটেনি। তারপর না বোঝার ভান করে বলে,

— কিসের গোল? কী বলছিস?
— আচ্ছা, জনগণ জিনিসটা কেমনভাবে নেবে?
আরভিদ ভ্রু কুঁচকে চোখ ছোট করে বলে,
— কোন জিনিসটা?
আদ্রিক হাসি দিয়ে বলে,
— এই যে, যেখানে আইনমন্ত্রী নিজেই মাঝরাতে বউয়ের হাতে কেলানী খেয়ে রুম ছাড়া হয়, তাও কোনো বিচার না পেয়ে! তাহলে সাধারণ মানুষ বিচার পাবে কীভাবে?
আরভিদ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— তাদের বলবে টা কে?
আদ্রিক আগের মতোই হাসি দিয়ে বলে,
— এসব খবর হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ে বেড়ায়!
— সেই অশুভ হাওয়াটা বুঝি তুই ই ছাড়বি?
আদ্রিক হাসতে হাসতে বলে,

— দুনিয়াতে আর মেয়ে ছিল না? ওরই প্রেমে পড়ার দরকার ছিল? কৌশালীরটার প্রেমে পড়লে অন্তত বউয়ের কাছে ইজ্জত পেতে! দরকার হলে আমি কৌশালীকে দিয়ে তোকে ধাক্কা মেরে কেকের উপর ফেলে দিতাম!
আরভিদ দৃঢ় গলায় বলে,
— দুনিয়ায় হাজার হাজার কোটি মেয়ে থাকলেও মেহুর কোনো সেকেন্ড পিস ছিল না! আমার বউ অনলি ওয়ান পিস!
আদ্রিক ঠোঁটের কোনে অভ্যাসগত হাসি টেনে বলে,
— অনলি ওয়ান পিস তো অবশ্যই! নাহলে আইনমন্ত্রী জামাইকে লাথি মেরে রুম থেকে বের করে দেয়, তাও রোমান্টিক মোমেন্টে!
আরভিদ বিরক্ত হয়ে বলে,
— সালা, বাজে বকা বন্ধ করবি?
— ওর এত ক্যাচ ক্যাচ সহ্য করিস কীভাবে?
আরভিদ রাগি চোখে তাকিয়ে বলে,
— সালা, বউ হয় আমার! সাবধানে কথা বল! নয়তো সারাজীবন আমার বোনের সামনে চার দাত ছাড়া ছেলের সাথে সংসার করতে হবে!
আদ্রিক হেসে বলে,

— সমস্যা নেই, দাত লাগিয়ে নেবো!
আরভিদ বিরক্তি নিয়ে বলে,
— তাও বলবি?
— অবশ্যই! ওর ডিস্টার্ব শুধু তোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না! আমাকেও পিঞ্চ মারে!
— তুই কী এমন রাষ্ট্রের ভালো কাজ করেছিস, যে আমার বউ তোকে গলায় মালা পরাবে?
আদ্রিক মেকি হাসি দিয়ে বলে,
— তা তোর বউয়ের কোন ভাড়া-ভাতে আমি ছাই দিয়েছি?
আরভিদ স্বাভাবিক গলায় বলে,
— অর্তির কারণে ও তোকে সহ্য করতে পারে না! ওর মতে অর্তির সব কষ্ট তোর কারণে! তার ওপর কালকে সত্যি টা শোনার পর তোকে আরো সহ্য করতে পারে না!
আদ্রিক নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে বলে,
— সালা বেইমান! পেটে কথা থাকে না তাই না? বউয়ের কাছে গিয়ে বন্ধুকে এক্সপোজ করে দিয়েছিস!
আরভিদ শান্তভাবে বলে,
— মেহু কান্না করছিল। ওর কান্না দেখে কষ্ট লেগেছিল, তাই সত্যিটা বলে দিয়েছি।
আদ্রিক ব্যাঙ্গ করে বলে,

— ওলেলে! কাল বউ সামান্য কান্না করেছে দেখে কষ্ট লেগেছে, কিন্তু বেডে কান্না করানোর সময় খেয়াল থাকে না, সালা?
আরভিদ চোখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকায়। আদ্রিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আবার বলে,
— মীরজাফর তো ভারত-বাংলাদেশেই বদনাম! কিন্তু তোর বেইমানি প্রকাশ হলে পুরো দুনিয়ায় বদনাম হয়ে যাবি! সালা মীর জাফরের দাদা!
বলেই আদ্রিক ঘুরে চলে যেতে নিলে আরভিদ পেছন থেকে বলে কঠিন গলায় বলে উঠে,
— আগে যা হয়েছে হয়েছে। এখন অর্তিকে সব ভুলিয়ে হাসিখুশি রাখ! আমি আমার বোনের কষ্ট একদমই সহ্য করবো না, আদ্রিক!
আদ্রিক থেমে ঘুরে তাকিয়ে বলে,

— ওকে কিন্তু…
আরভিদ ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
— কিন্তু কী?
আদ্রিক বাঁকা হেসে বলে,
— বেডে কষ্ট দেওয়ার অনুমতি আছে ভাইয়া?
আরভিদ রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— সালা বেয়াদব! বড় ভাই হই আমি ওর!
আদ্রিক গর্ব করে বলে,
— এই জন্যই তো জিজ্ঞেস করলাম! কত ভালো বোনের জামাই পেয়েছিস দেখেছিস?
আরভিদ বিরক্ত হয়ে বলে,
— তোর মতো নির্লজ্জ দুটো দেখিনি!
আদ্রিক হাসে,
— দেখবিও না। আচ্ছা, আমি যাই। বউ আমার রুমে ওয়েট করছে!
আরভিদ ভ্রু কুঁচকায়। তা দেখে আদ্রিক হাসতে হাসতে বলে,
— স্যুপের জন্য, ব্যাটা! সব কথা ডার্টি ভাবে নিস কেন? ডার্টি মাইন্ড!
বলেই আদ্রিক পা ফেলে এগিয়ে যায়। আদ্রিকের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আরভিদ বিরবির করে বলে,
— নির্লজ্জ একটা!
আদ্রিক তার রুমের সামনে এসে ঘাড় বাকা করে একটু দূরেই দাড়িয়ে থাকা আরভিদের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোনে অভ্যাসগত হাসি টেনে ব্যঙ্গ করে বলে,

— ব্যাথা করছে? মলম লাগবে? তোর বউকে বলিস মলম লাগিয়ে দেবে! কিছু হলেই বলে, মলম লাগাই দিবো!
বলে আর দাঁড়ায় না। আদ্রিক দ্রুত পা ফেলে হেঁটে তার রুমে ঢুকে পড়ে। আদ্রিককে রুমে ঢুকে যেতে দেখে আরভিদ এগিয়ে এসে দরজায় নক করে করুণ গলায় বলে,
— মেহু তুই কিভাবে পারলি আমাকে লাথি মেরে বের করে দিতে? তাও আমার আপন বউ হয়ে?
আরভিদ কয়েক মিনিট দরজার সামনে অপেক্ষা করে, কিন্তু ভিতর থেকে কোনো উত্তর আসে না। অবশেষে আরভিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচে লিভিং রুমে নেমে আসে। এসে সোফায় বসে পড়ে। কারণ সে বুঝে গেছে, আজ আর তার রুমে ঢোকার কোনো সুযোগ নেই। তাই অগত্যা আজ রাতটা এখানেই ঘুমাতে হবে।

অর্তিহা বেডে শুয়ে আছে। সন্ধ্যা থেকে তিনবার বমি করেছে। একবার তো মাথা ঘুরে পড়েই যাচ্ছিলো কিন্তু ভাগ্য ভালো, আদ্রিক তাকে ধরে ফেলেছে। নাহলে বড় বিপদ হতো। এরপর থেকেই আদ্রিক তাকে বেডে বসিয়ে রেখেছে। অর্তিহার শরীরও দুর্বল লাগছে, তাই সেও বিশ্রাম নিচ্ছে। আদ্রিক রুমের দরজা খুলে প্রবেশ করে, হাতে স্যুপের বাটি। সে অর্তিহার কাছে এসে বেডে বসে। অর্তিহা মুখের কাছে স্যুপের চামচটা ধরে বলে,
— আজকে আমার জন্য বউ সাজতে হবে দেখে বিকেল থেকেই অসুস্থ হয়ে বসে আছিস!
আদ্রিকের কথা শুনে অর্তিহার প্রচন্ড রাগ হয়। কিছুটা রাগমিশ্রিত গলায় বলে,
— আপনি কি বলতে চাচ্ছেন? আমি বমির নাটক করেছি? বিকেল থেকে যে তিনবার বমি করেছি, সেগুলো মিথ্যে? আমি সুস্থ?
আদ্রিক অর্তিহার মুখের সামনে স্যুপ টা ধরে রেখেই শান্ত গলায় বলে,

— নাটক করছিস না! কিন্তু রাতে আমার কাছে আসতে হবে, সারাদিন এই চিন্তাই করেই তো শরীরটা খারাপ করেছিস!
অর্তিহা রাগে অভিমানে মুখ ফিরিয়ে বলে,
— দিন! আমি খেতে পারবো!
আদ্রিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— কেন? খাইয়ে দিচ্ছি তো আমি!
— প্রয়োজন নেই! সেবা করছেন দেখেই তো এতো অভিযোগ!
আদ্রিক কিছু শোনে না। অর্তিহার মুখের সামনে স্যুপ ধরে রাখে। নির্লিপ্ত চোখের ইশারায় অর্তিহাকে খেতে বলে। প্রথমে অর্তিহা জেদ করে না খেলেও, শেষে আদ্রিকের ভয়ে বাধ্য হয়ে স্যুপ মুখে তুলে খেতে শুরু করে।
আদ্রিক খাওয়াতে খাওয়াতে প্রশ্ন করে,
— বল তো, অর্তি, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে দামি কি?
অর্তিহা কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দেয়,

— অ্যান্টিম্যাটার।
আদ্রিক হাসি দিয়ে বলে,
— না! তোর ব্রেইনটা! এটা কখনো ব্যবহার হয়নি। একদম আন-ইউজড! চড়া দামে বিক্রি করা যাবে!
অর্তিহা গাল ফুলিয়ে বলে,
— আমার দেখা সবচেয়ে খারাপ মানুষটা আপনি!
আদ্রিক ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করে,
— তোর চোখে একমাত্র আমিই খারাপ? আর তোর বাপ, ভাই ধোঁয়া তুঁলশি পাতা?
অর্তিহা মুখ ফ্যাকাশে করে নরম স্বরে বলে,
— আমি কখন বললাম ভাইয়া ভালো? ভাইয়াও আপনার মতো! ভাইও মেহুকে ভয় দেখায়! কষ্ট দেয়! অত্যাচার করে!
আদ্রিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,

— তোর যে মেহু, তাকে দুনিয়ার কেউ অত্যাচার করতে পারে না! বরং সে দুনিয়ায় এসেছে মানুষকে অত্যাচার করতে। এই পৃথিবীর বুকে সবার শান্তি বিনষ্ট করতে। আর সে তার কাজ সবচেয়ে বেশি করে প্রয়োগ করে তোর ভাইয়ার উপর!
— একদমই না! ভাই যে রাগি! ভাইয়ের রাগে সবাই কাঁপে!
— আর তোর সেই রাগি ভাইকেই একটু আগে তোর অবলা মেহু লাথি মেরে কাঁপিয়ে দিয়েছে!
অর্তিহা মুখ ফিরিয়ে বলে,
— এটা কখনো সম্ভব না!
আদ্রিক আগের মতোই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দেয়,
— আমি নিজ চোখে দেখেছি।
অর্তিহা মুখ ঘুরিয়ে চোখে দ্বিধা নিয়ে তাকায় আদ্রিকের দিকে।
— সত্যিই?
আদ্রিক বাঁকা হেসে বলে,

— হুম। দরজাটা খুলে তোর ভাইকে পেছনে একটা জোর লাথি মেরে রুম থেকে বের করে করিডরে ফেলে, দরজাটা লাগিয়ে দিয়েছে।
— আপনার খুব খুশি লাগছে তাই না? যেভাবে এক্সাইটেড হয়ে বলছেন!
— আমি তো তোর খুশির জন্য বললাম।
অর্তিহা ভ্রু কুচকে বলে,
— আমি কেন খুশি হবো?
আদ্রিক আগের মতোই বাঁকা হেসে বলে,
— তোর তো খুব কষ্ট, ভাবছিস তোর ভাই মেহুকে মারে। ভাবলাম, তুই শুনলে খুশি হবে যে তোর ভাই মেহুকে কষ্ট দেয় না। উল্টো, তোর ভাইকে মেহু দিনরাত উদ্দাম কেলানি দেয়!
অর্তিহা অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে থাকে। সে ভাবছে, এক মানুষ কিভাবে ভাবতে পারে যে তার ভাইকে মারলে সে খুশি হবে।
অর্তিহা নরম স্বরে বলে,

— কিন্তু মেহু ভাইয়াকে মারলো কেন? ভাইয়া কি করেছে?
আদ্রিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দেয়,
— ঐ আপদকে কারও কিছু করতে হয় না! এমনিই বিপদ হয়ে এসে হাজির হয় সবার সামনে!
অর্তিহা এবার কিছুটা দৃঢ় গলায় বলে,
— একদম এভাবে বলবেন না মেহুকে! নয়ত…
আদ্রিক চোখ সরু করে ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— নয়ত কি?
অর্তিহা আদ্রিকের চোখে চোখ রেখে গাল অভিমানী কন্ঠে বলে,
— নয়ত আমি কেঁদে দিবো!
আদ্রিক হেসে ফেলে। তার হাসি দেখে অর্তিহা গাল ফুলিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয় অন্যদিকে। আদ্রিক হাসি থামাতেই অর্তিহা বলে,

— সরুন, আমি ভাইয়ের কাছে যাবো!
— কেন?
— মেহু ভাইকে রুম থেকে বের করে দিলে ভাই কোথায় ঘুমাবে?
— কারদার বাড়িতে রুমের সংকট হয়েছে। তাই তোর ভাই মাটিতে ঘুমাবে।
— মাটিতে কেন? বাড়িতে তো অনেক খালি রুম!
— তাহলে এমন বোকার মতো বলছিস কেন? ভাইয়া কোথায় ঘুমাবে!
— ভাইয়ের কাছে যাবো!
আদ্রিক স্যুপের বাটিটা টেবিলে রেখে অর্তিহার মুখ টিস্যু দিয়ে মুছে বলে,
— শরীর খারাপ তোর। ঘুমা।
অর্তিহা আদ্রিককে সরানোর চেষ্টা করে বলে,
— না! আমার শরীর ভালো!
— শরীর ভালো? তাহলে আদর করি?
অর্তিহা মন খারাপ করে বলে,
— ঘুমাচ্ছি!

বলেই শুয়ে পড়ে। আদ্রিক হেসে অর্তিহার শরীরে কম্বল টেনে রুমের লাইট বন্ধ করে পাশে এসে শুয়ে পড়ে। অর্তিহাকে বুকের মাঝে টেনে ধরে। অর্তিহা কিছু বলে না, আর না বাধা দেয়। কারণ বলেও কোনো লাভ নেই, আদ্রিক শুনবে না। আর বাধা দিলে অযথা শক্তি খরচ হবে। আদ্রিক অর্তিহার মাথায় হাত বুলাতে থাকে। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারে অর্তিহা ঘুমিয়ে গেছে। ঠিক তখনি আদ্রিকের ফোনে কল আসে। ফোন আগেই সাইলেন্ট করা ছিল, কারণ সে জানতো কল আসবে। আদ্রিক কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মিরাজ বলে,
— বস, কাজ হয়ে গেছে। পার্সেল দিয়ে এসেছি।
আদ্রিক বাকা হেসে বলে,
— ঠিক আছে।
বলেই কান থেকে ফোন নামিয়ে কেটে দেয়। তারপর অপেক্ষা করতে থাকে সেই অজানা কিন্তু পরিচিত নাম্বার থেকে কল আসার।
শায়রা বিছানায় এলোমেলো ভঙ্গিতে পড়ে আছে। চোখ দুটো নিস্তেজ, মুখ ফ্যাকাশে যেন প্রাণহীন এক কাঠপুতলি। আজ সারাদিন সে রুম থেকে বের হয়নি।সবাই ডাকতে ডাকতে ক্লান্ত, তবু সে দরজাও খুলেনি।
চারপাশে নিস্তব্ধতা জমাট বেঁধে আছে। ঠিক তখনই দরজায় হঠাৎ নক। শায়রার শরীরের প্রতিটা রক্তকণা যেন ঝাঁপিয়ে ওঠে রাগে। কতবার বলেছে, সে একা থাকতে চায়! তবুও কেউ কেন কথা শোনে না? রাগে টেবিল থেকে ফুলদানি তুলে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজা খুলেই বাড়ি মারতে যাবে, এমন সময় মেইড আঁতকে ওঠে, দুহাতে মুখ ঢেকে বলে,

— ম্যাম ম্যাম! আমাকে মারবেন না!
শায়রা থেমে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। মেইড কাঁপতে থাকা হাতে একটা ছোট বক্স এগিয়ে দেয়।
— আপনার জন্য একটা পার্সেল এসেছে, এটাই দিতে এসেছি!
শায়রা আরও রেগে একপা এগিয়ে এসে গর্জে ওঠে,
— এই পার্সেলের জন্য আমাকে ডিস্টার্ব করেছিস? আজ তোকে মেরেই ফেলবো!
মেইড তড়িঘড়ি করে বলে,
— ম্যাম, পার্সেল কারদার স্যার পাঠিয়েছেন!
শায়রার হাত থেমে গেল। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— কে পাঠিয়েছে?
মেইড ভয়ভয়ে বলে,

— একটা লোক এসে পার্সেল টা দিয়ে যায় আর বলে আদ্রিক স্যার পাঠিয়েছেন।
শায়রা বক্সটার দিকে তাকায়। মাঝারি সাইজের, র‍্যাপিং পেপারে মোড়া। ফুলদানিটা মেইডের হাতে দিয়ে পার্সেলটা নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। বিছানায় বসেই তাড়াহুড়ো করে র‍্যাপিং খুলে ফেলে। ভেতরে আরেকটা বক্স, যা কাটতে কাঁচি দরকার। সাইড টেবিল থেকে কাঁচি এনে বক্স খুলতেই মাঝখানে একটা পেনড্রাইভ।
পেনড্রাইভ হাতে নিয়ে শায়রার মনে অদ্ভুত অস্থিরত জাগে,
— আদ্রিক এতে কি পাঠিয়েছে?
ল্যাপটপ অন করে পেনড্রাইভ লাগাতেই একটা অডিও দেখতে পায়। প্লে করতেই ঘর ভরে যায় এক অস্বস্তিকর শব্দে। আদ্রিক আর অর্তিহার কবুল বলার অংশ দিয়ে বানানো একটি র‍্যাপ সং! এক মুহূর্তেই কানে যেন আগুন ধরে যায় শায়রার। শায়রা দ্রুত অডিও বন্ধ করে। চোখ বেয়ে জল টুপ করে পড়ে। আদ্রিকের সেই ‘কবুল’ শব্দটা যেন বুকের ভেতর নতুন করে ছুরি চালিয়ে দিয়েছে। পুরনো ক্ষতের ওপর আবার লবণ ছিটানো হচ্ছে। আর লবণ ছিটাচ্ছে সেই মানুষটাই, যাকে সে ভালোবাসে। কাঁপা হাতে শায়রা ফোন তুলে কল দেয় সেই নিষ্ঠুর মানুষটাকে, যে তাকে কষ্ট দিয়ে সুখ পায়। কল যেতেই সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ।
আদ্রিকের গলা ভেসে আসে,

— তোর কলেরই অপেক্ষায় ছিলাম লিটল বিচ!
আদ্রিকের কণ্ঠস্বর শুনেই শায়রা বুঝে যায়, আদ্রিকের মুখে নিশ্চয়ই সেই নিষ্ঠুর হাসিটা ফুটে আছে এখন।
শায়রা কাতর গলায় বলে,
— এটা কি আদ্রিক?
— গিফট লিটল বিচ!
শায়রা ভাঙা স্বরে বলে,
— কেন এতো কষ্ট দিচ্ছো?
আদ্রিক হেসে বলে,
— শত্রুকে কষ্ট দিতে কার না ভালো লাগে বল? তবে আমার একটু বেশিই ভালো লাগে!
শায়রা আর কান্না আটকে রাখতে পারে না।
— আমি তোমার শত্রু?
— হুম।
— কি করেছি আমি? যে তোমার শত্রু হয়ে গেলাম!
— তুই তো জানিসই, আমার কাছে কোনো মেয়েকে সহ্য করতে পারি না! কেউ ঘেঁষলে তাকে শত্রু মনে করি!
— এই প্রথম শুনলাম, কাউকে ভালোবাসলে তার শত্রু হয়ে যেতে হয়!
আদ্রিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,

— ফাক লাভ! আই হেইট দিস ওয়ার্ড!
— ঠিক আছে, ভালোবাসি বলবো না। কিন্তু ভালোবাসাও বন্ধ করবো না।
— তুই কি মনে করিস, এইসব কথা আমার উপরে ইফেক্ট করে?
— আমার চোখের জলই তোমাকে ইফেক্ট করতে পারেনি। আমার মুখের কথা কি করবে!
— ভাইবোন দুইটাই সেন্টি খাস!
শায়রা চোখের জল মুছে তাচ্ছিল্য ভরা হাসি দিয়ে বলে,
— পাষাণ!
আদ্রিক মৃদু হেসে বলে,

— যখনই মন খারাপ লাগবে, গানটা শুনবি। দেখবি মনটা আরো খারাপ হয়ে যাবে।
থেমে আবার বলে,
— তোর ভাইকেও বলিস শুনতে!
শায়রা বিস্ময়ে বলে,
— তুমি কি এই পেনড্রাইভটা ভাইয়াকেও পাঠিয়েছো?
— দায়িত্ব ছিল পাঠানো! বেচারা কত শখ করেছিল অর্তির নামে কবুল পড়বে! যাক, অর্তির নামে কবুল বলতে না পারুক। অর্তি আমার নামে কবুল পড়েছে, সেটাই শুনুক! অবশ্য কালকে যা শুনিয়েছি না! এখনো বোধহয় কানে বাজছে!
— কি শুনিয়েছো?
— আমার আর অর্তির কবুল বলা!
— কিভাবে? তুমি তো ভাইয়াকে গ্যারেজে রেখেছিলে! তাহলে ভাইয়া কিভাবে শুনবে?
— বলেনি? আচ্ছা আমিই বলি! ২৪টা সাউন্ড বক্স দিয়ে আদর করে কানে ঢুকিয়েছি!
— সাউন্ড বক্স দিয়ে?

— হ্যাঁ, ২৪টা সাউন্ড দিয়ে। যাতে ওর শুনতে কোনো সমস্যা না হয়! দেখেছিস, কত ভাবি তোদের কথা! এতো কিছু করার পরও তোর ভাই কালকে এসে আমার সাথে রূঢ়লি কথা বলেছে! তারপরও কিছু মনে করিনি! এত টাকা খরচ করে তোদের জন্য গানটা বানিয়েছি!
— তোমার প্রেমে আরো গভীরভাবে পড়ে গেলাম! কষ্ট দিতে এত আয়োজন! তাহলে সুখ দিতে গেলে কত আয়োজন হবে তোমার!
— হুম ঠিক বলেছিস! অর্তিকে সুখ দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি! এই যে এখনোও সুখ দিয়ে ঘুম পারালাম!
— পাষাণ একটা!
আদ্রিক হেসে ফোন কেটে দেয়। ফোনটা নামিয়ে শায়রা ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তাচ্ছিল্য মেশানো এক অসহায় হাসি ঠোঁটে লেগে থাকে। তার জীবনে দেখা সবচেয়ে অদ্ভুত, সবচেয়ে নির্মম মানুষটা আদ্রিক কারদার। তার প্রতিটা আচরণ মানুষকে বিস্মিত করে। মনে হয়, একজন মানুষ এতটা পাষাণ হৃদয়েরও হতে পারে? হয়তো পারে আর সে হৃদয়টা শুধু আদ্রিকেরই।

আরভিদ অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পরও ঘুমোতে পারছে না, তাই বিরক্ত হয়ে উঠে বসে। অবশ্য ঘুম আসবেই বা কীভাবে? প্রথমত, সোফায় শোয়ার অভ্যাস নেই তার। দ্বিতীয়ত, মেহজার অভ্যাস হয়ে গেছে। বুকটা কেমন শূন্য শূন্য লাগছে। তাই ঘুম না আসাটা স্বাভাবিকই। আরভিদ সোফার হাতলে কনুই রেখে কপালে হাত দিয়ে বিরক্ত হয়ে বসে আছে। ঠিক তখনি সিঁড়ির দিক থেকে পায়ের শব্দ শোনা যায়, মনে হয় কেউ নামছে। আরভিদ তাকাতেই দেখে, তাহিয়া কারদার আর কৌশলী সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। পেছনে মেইড, তার হাতে লাগেজ।
ওরা লিভিং রুমে এলে মেইড কৌশলীর লাগেজগুলো নিয়ে চলে যায়। তাহিয়া আরভিদকে সোফায় দেখে অবাক হয়ে বলেন,

— তুমি এখানে?
আরভিদ শান্ত গলায় বলে,
— ফোনে কথা বলার জন্য এসেছি।
তাহিয়া বলেন,
— ওহ!
আরভিদ এবার চোখ ঘুরিয়ে কৌশলীর দিকে তাকায়। কৌশলীও ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। মুখটা শুকনো, কেমন ফ্যাকাশে মনে হচ্ছে।
আরভিদের দৃষ্টি টের পেয়ে তাহিয়া কারদার মন খারাপ করে বলেন,
— এই দেখো, কৌশলী হঠাৎ বলছে ও আবার লন্ডন ফিরে যাবে! এতো করে বললাম, তবু শুনছে না! তুমি একটু বলো না আরো কয়েকটা দিন থেকে যেতে!
কৌশলী চুপ করে আরভিদের দিকে তাকিয়ে থাকে।যেন অপেক্ষা করছে আরভিদ কিছু বলবে, আটকাবে। আরভিদ যদি একবার বলে, সে থেকে যাবে। কারণ সে তো ভালোবাসে আরভিদকে।
কিন্তু আরভিদ কৌশলীর সেই আশায় পানি ঢেলে শান্ত গলায় বলে,
— যেতে দাও, মম। আঙ্কেল-আন্টি অনেকদিন ধরে একা। তার ওপর ওর পড়াশোনারও ক্ষতি হচ্ছে।
কৌশালীও নিজেকে সামলাতে আর ভেতরের কষ্ট লুকাতে হেসে বলে,
— হ্যাঁ, ও ঠিকই বলেছে। মম-ড্যাড অনেকদিন ধরে একা। আর আমিও তাদের খুব মিস করছি।
তাহিয়া মাথা নেড়ে বলেন,
— হুম। আচ্ছা, পরেরবার আপু আর দুলাভাইকে নিয়ে আসবা।
কৌশলী কিছু বলে না, শুধু হাসে। তারপর আবার আরভিদের দিকে তাকায়। প্রাণ ভরে ভালোবাসার মানুষটিকে দেখতে থাকে। কারণ আবার কবে, কখন তাকে এতো কাছে, সামনাসামনি দেখার সুযোগ হবে কেউ জানে না। হয়তো সেই সৌভাগ্য আর হবে না। তাই এখন প্রাণ ভরে দেখে নিচ্ছে আরভিদকে।
তাহিয়া বলেন,

— আরভিদ, তুমি কি কৌশলীকে এয়ারপোর্টে দিয়ে আসতে পারবে?
আরভিদ সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর স্বরে বলে,
— মম, আমি পারব না। কৌশলী তো আর বাচ্চা নয় যে তাকে দিয়ে আসতে হবে! আর সাথে ড্রাইভার তো আছেই।
কৌশলী শান্ত গলায় বলে,
— না আন্টি, কোনো দরকার নেই। আমি একাই যেতে পারব। আচ্ছা আন্টি, লেট হয়ে যাচ্ছে। এবার আমি যাই।
তাহিয়া কারদার বলেন,
— আচ্ছা, সাবধানে যেয়ো। আর পৌঁছে আমাকে কল করে জানাবে!
— আচ্ছা আন্টি।
তারপর আরভিদের দিকে তাকিয়ে, চোখে জমে থাকা কষ্টটা লুকাতে না পেরে বলে,

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২১

— চলে যাচ্ছি। তোমার জন্যই দেশে এসেছিলাম। লন্ডনে গেলে তোমার কথা খুব মনে পড়বে। কারণ তোমাকে আমি কখনোই ভুলতে পারব না। ভালো থেকো।
এই বলে কৌশলী দ্রুত পা বাড়িয়ে মেইন ডোর দিয়ে বেরিয়ে যায়। হয়তো ইচ্ছে করেই এত তাড়াহুড়ো করে চলে গেছে নিজের চোখের জল লুকাতে।

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২২