রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২৯
ইয়ুশরা রিমু
রাতের নিস্তব্ধতা ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে উঠলো।দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক, মাঝে মাঝে গাছের পাতায় বাতাসের মৃদু শব্দ ।সব মিলিয়ে চারপাশটা অদ্ভুত শান্ত।
কিন্তু সেই শান্তির মাঝেও দু’জন মানুষের চোখে তখনও ঘুম আসেনি।বেলা চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলেও তার মাথার ভেতর যেন সারাদিনের সমস্ত ঘটনা একে একে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সকালে আব্বুর সিদ্ধান্ত, নিজের ঘর থেকে সায়রের ঘরে আসা, সায়রের এতটা বোঝাপড়া, আর এখন একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে থাকা।সবকিছু যেন খুব দ্রুত বদলে গেছে।কিছুদিন আগেও এই মানুষটার সামনে দাঁড়ালে তার বুক ধুকপুক করতো ভয়ে, অস্বস্তিতে। অথচ আজ সেই মানুষটার পাশে শুয়ে থেকেও তার ভেতরে আগের মতো ভয় নেই।বরং আছে অন্যরকম একটা অনুভূতি।যে অনুভূতির নাম সে নিজেই জানে না।বেলা ধীরে ধীরে চোখ মেলে পাশে তাকালো।সায়র চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। মুখটা আগের মতোই গম্ভীর, কিন্তু ঘুমের মধ্যে সেই কঠোরতা অনেকটাই নরম হয়ে এসেছে।বেলা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো।নিজেকেই মনে মনে বললো,
—এই মানুষটা এতো সুন্দর কেন?
কথাটা ভাবতেই তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন নরম হয়ে এলো।ঠিক তখনই সায়রের কণ্ঠ শোনা গেলো,
—এতক্ষণ ধরে আমাকে দেখছিস কেন?
বেলা চমকে উঠলো।সে ভেবেছিল সায়র ঘুমিয়ে গেছে।তাড়াতাড়ি চোখ বন্ধ করে বললো,
—আমি দেখছিলাম না।
সায়র চোখ না খুলেই মৃদু হেসে বললো,
—হুম। আমি তো কিছুই দেখিনি।
বেলা বিরক্ত হয়ে বললো,
—আপনি ঘুমান।
—ঘুমানোর চেষ্টা করছি।
—তাহলে কথা বলছেন কেন?
—কারণ কেউ একজন আমাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না।
বেলা অবাক হয়ে বললো,
—আমি কী করলাম?
সায়র এবার চোখ খুলে তার দিকে তাকালো।
—তুই যদি এভাবে তাকিয়ে থাকিস, তখন আমার ঘুম আসবে কীভাবে?
বেলার গাল আবারও লাল হয়ে উঠলো।সে সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে বললো,
—আপনি আবার শুরু করেছেন।
সায়র মৃদু হেসে বললো,
—আচ্ছা, আর বলছি না।
কয়েক মুহূর্ত দু’জনেই চুপ করে রইলো।তারপর বেলা খুব আস্তে বললো,
—সায়র ভাই?
—হুম?
—আপনারা কি আমার উপর কখনো রাগ হয়?
সায়র এবার সম্পূর্ণভাবে তার দিকে ফিরলো।
—কেন এমন মনে হলো?
বেলা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
—আমাদের মধ্যে যা হয়েছে সবকিছু এত হঠাৎ হয়েছে। আপনার জীবনটাও তো বদলে গেছে। হয়তো আপনি ভেতরে ভেতরে আমার ওপর রাগ করেন।
সায়র কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলো।তারপর শান্ত কণ্ঠে বললো,
—তোর ওপর রাগ করার মতো কিছু তুই করিসনি, বেলা।
বেলা চুপ।
—আর একটা কথা মনে রাখিস। আমাদের জীবনে যা হয়েছে, তার সবকিছুর জন্য তুই নিজেকে দোষী ভাববি না।
বেলার চোখ দুটো ধীরে ধীরে ভিজে উঠলো।সায়র সেটা লক্ষ্য করেও কিছু বললো না।বেলা মুখ ঘুরিয়ে চোখের পানি মুছে নিলো।
—আপনি এত ভালো কেন?
প্রশ্নটা শুনে সায়র কিছুটা অবাক হলো।
—আমি ভালো?
বেলা মাথা নাড়লো।
—হুম।
সায়র মৃদু হাসলো। এরপর বিরবির করে বলে,
—হুম। ভালো মনে করিস তাহলে দূরে দূরে থাকিস কেন।
— কিছু বললেন??
— না।
বেলা হালকা হাসলো।কিছুক্ষণ পর সত্যিই তার চোখে ঘুম নেমে এলো।সায়র লক্ষ্য করলো, কয়েক মিনিটের মধ্যেই বেলার শ্বাস-প্রশ্বাস ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে গেছে।সে আর কিছু বললো না।শুধু অন্ধকার ঘরের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললো,
—তোকে কোনোদিন ভয় পেতে দেবো না, বেলা। তোকে কখনো কোনো অস্বস্তি বোধ করতেও দিবনা। কিন্তু এই না যে আমি আমার অধিকার ছেড়ে দিব।
রাত যত গভীর হতে লাগলো, ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে মধ্যরাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। সারাদিনের ব্যস্ততার পর বাড়ির প্রতিটি মানুষ তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। করিডোরের বাতিগুলোও একে একে নিভে গেছে, শুধু সায়রের ঘরের জানালা দিয়ে আসা হালকা চাঁদের আলো বিছানার একপাশে নরম ছায়া ফেলে রেখেছিলো।
বেলা তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। সারাদিনের ক্লান্তি আর নানা চিন্তার পর কখন যে তার চোখে ঘুম নেমে এসেছে, সে নিজেও টের পায়নি। সায়রও চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলো, কিন্তু তার ঘুমটা ছিলো অগভীর। পাশে শুয়ে থাকা বেলার মৃদু শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দটুকুও যেন তার অজান্তেই খেয়াল করছিলো সে।হঠাৎ দূরে কোথাও মেঘ গর্জে উঠলো।গম্ভীর সেই শব্দে খান বাড়ির নিস্তব্ধতা কেঁপে উঠলো।সায়র ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো।জানালার বাইরে তখন আকাশের চেহারা পুরোপুরি বদলে গেছে। কিছুক্ষণ আগেও যে আকাশটা পরিষ্কার ছিলো, সেখানে এখন কালো মেঘের ভারী স্তর জমে আছে। বাতাসও হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে জোরে বইতে শুরু করেছে।সায়র বিছানা থেকে উঠে বসলো।ঠিক তখনই ,ঝড়ের প্রথম ঝাপটায় জানালার পর্দা হঠাৎ উড়ে উঠলো।সায়রের ভ্রু কুঁচকে গেলো।সে বুঝতে পারলো, জানালাটা খোলা রয়েছে।
বিছানা থেকে উঠে জানালার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগেই বাইরে থেকে প্রবল বাতাসের সঙ্গে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা ঘরের ভেতরে ছিটকে আসতে শুরু করলো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঠান্ডা পানির ফোঁটায় মেঝে ভিজে গেলো।সায়র দ্রুত জানালাটা বন্ধ করতে এগিয়ে গেলো।কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই আকাশ ফা’টানো এক বিকট ব’জ্রপাত হলো।বাজের শব্দে পুরো ঘরটা যেন কেঁপে উঠলো।বেলা আচমকা ঘুম থেকে উঠে বসলো।তার চোখ দুটো ভয়ে বড় হয়ে গেলো।
—সায়র ভাই!
সায়র সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকিয়ে বলে,
—আমি এইখানেই আছি।
বেলার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। বাইরে তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। বাতাসের তীব্র শব্দের সঙ্গে একের পর এক ব’জ্রপাত যেন রাতের নিস্তব্ধতাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে।বেলা ভয়ে বিছানার চাদরটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো।আরেকবার প্রচণ্ড শব্দে ব’জ্রপাত হতেই সে অজান্তেই চোখ বন্ধ করে ফেললো।সায়র দ্রুত জানালাটা বন্ধ করে পর্দা টেনে দিলো। তারপর ঘরের আলোটা জ্বালিয়ে বেলার কাছে ফিরে এলো,
—ভয় পেয়েছিস?
বেলা কিছু বলতে পারলো না। শুধু খুব আস্তে মাথা নাড়লো।সায়র বিছানার পাশে বসে শান্ত কণ্ঠে বললো,
—কিছু হবে না। আমি আছি।
বেলা চোখ তুলে তার দিকে তাকালো।কথাটা খুব সাধারণ, অথচ এই মুহূর্তে তার কাছে যেন পুরো পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্বাস মনে হলো।ঠিক তখনই আবার বিকট শব্দে ব’জ্রপাত হলো।বেলা চমকে উঠে অজান্তেই সায়রকে আঁকড়ে ধরলো।দু’জনেই কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেলো।
বেলা নিজের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো, সে কখন সায়রকে আকরে ধরে ফেলেছে।লজ্জায় নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইলো।কিন্তু সায়র তাকে ছাড়লো না।বরং খুব স্বাভাবিকভাবে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখে শান্ত গলায় বললো,
—ছাড়তে হবে না।
বেলা ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালো।সায়রের চোখে কোনো দুষ্টুমি নেই। শুধু গভীর শান্তি আর আশ্বাস।সে খুব আস্তে বললো,
— শব্দ কমুক। এতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই।
বেলা কিছু বললো না।শুধু তার আঙুলগুলো সায়রের পিঠের মধ্যে আরও একটু শক্ত হয়ে এলো।বাইরে বৃষ্টি তখন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। জানালার কাঁচ বেয়ে পানির ধারা নেমে আসছে, বাতাসে গাছের ডালপালা একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে অদ্ভুত শব্দ তৈরি করছে।সায়র নিরবতা ভে’ঙ্গে বেলার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলো।
—আমি জানি, ছোটবেলা থেকেই তুই ব’জ্রপাত ভয় পাস।
বেলা তার বুকের কাছে মুখ লুকিয়ে রেখেই খুব আস্তে বললো,
—আমি চেষ্টা করি ভয় না পেতে।
—জানি।
—কিন্তু পারি না।
সায়র মৃদু গলায় বললো,
—পারতে হবে না।
বেলা ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালো।
—মানে?
সায়র তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
—সব ভয় নিজেকে একা সামলাতে হয় না।
কথাটা শুনে বেলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।সায়র আবার তার মাথায় হাত রাখলো,
—যখন ভয় লাগবে, তখন আমাকে জড়িয়ে ধরবি। অন্তত যতক্ষণ আমি পাশে আছি, ততক্ষণ তোকে সাহসী হওয়ার অভিনয় করতে হবে না।
বেলার চোখ দুটো ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো।ঠিক তখনই আবার প্রচণ্ড শব্দে ব’জ্রপাত হলো।বেলা চমকে উঠে আবারও সায়রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।সায়র এবার মৃদু হেসে তার পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো,
—এই তো। এভাবেই থাক।ভয় পাস না।
বেলা চোখ বন্ধ করে রইলো।বাইরে তখন ঝড় আরও তীব্র হয়েছে। বৃষ্টির ধারায় জানালার কাঁচ ঝাপসা হয়ে গেছে। বাতাসের শব্দে মনে হচ্ছে, পুরো রাতটাই যেন ঝড়ের দখলে চলে গেছে।কিন্তু ঘরের ভেতরে সায়রের বাহুর মধ্যে বেলার ভয়টা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলো।কিছুক্ষণ পর বেলা খুব আস্তে বললো,
—সায়র ভাই?
—হুম?
—আপনি জানতেন আমি বজ্রপাতকে ভয় পাই?
—হুম।
—কীভাবে?
সায়র কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললো,
—সবকিছু মনে থাকলেও, তোর সম্পর্কে সব কিছু মনে আছে আমার।
বেলার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠলো।সে আবার মুখ লুকিয়ে ফেললো।
—আপনি এমন কথা বলেন কেন?
সায়র মৃদু হেসে বললো,
—কী বললাম?
—যেগুলো শুনলে আমার অদ্ভুত লাগে।
—অদ্ভুত লাগছে?
বেলা মাথা নাড়লো।
—হুম।
—খারাপ লাগছে?
বেলা একটু ভেবে খুব আস্তে বললো,
—না।
সায়রের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো।
—তাহলে থাক।
সে খুব আস্তে বললো,
—আপনি থাকলে সত্যিই ভয়টা কম লাগে।
কয়েক মুহূর্ত দু’জনেই চুপ করে রইলো।বেলা এখনও সায়রকে জড়িয়ে আছে।সায়রও তাকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো চেষ্টা করলো না।বরং তার মাথার ওপর হাত রেখে ধীরে ধীরে বললো,
—এখন চোখ বন্ধ করে ঘুমা।
—আবার ব’জ্রপাত হলে?
—আমি আছি।
—খুব জোরে হলে?
—তখনও আমি আছি।
বেলা একটু হেসে বললো,
—আপনি সবকিছুর উত্তর এভাবেই দেন কেন?
সায়রও হেসে ফেললো।
—তোর ভয় কমানোর জন্য দরকার হলে সারারাত একই উত্তর দেবো।
বেলা এবার সত্যিই হেসে ফেললো।তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলো।বাইরে ঝড়-বৃষ্টি তখনও অবিরাম চলছে।
কিন্তু সায়রের বুকের কাছে মাথা রেখে, তার বাহুর নিরাপদ আশ্রয়ে বেলার মনে হচ্ছিলো।এই মুহূর্তে পৃথিবীর আর কোনো শব্দই তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।সায়র নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলো, বেলার চোখ ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছে।সে খুব আস্তে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।তারপর ফিসফিস করে বললো,
—ঘুমিয়ে পড়, বেলা। আমি থাকতে তোর এতো ভয় কিসের?
বেলা আধো ঘুমের মধ্যেই সায়রকে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।সায়রের বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক অনুভূতিতে ভরে উঠলো।সে জানে না এই সম্পর্ককে ভবিষ্যৎ কোথায় নিয়ে যাবে, জানে না সামনে কত বাধা অপেক্ষা করছে, কিন্তু এই মুহূর্তে একটা বিষয় তার কাছে খুব পরিষ্কার।বেলাকে ভয় পেতে দেখলে তার নিজের ভেতরেও অদ্ভুত এক অস্থিরতা তৈরি হয়।আর সেই অস্থিরতার একমাত্র উত্তর যেন তাকে আগলে রাখা।বাইরে তখনও মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে।ঝড় ধীরে ধীরে তার তীব্রতা হারাচ্ছে।আর সেই ঝড়ের রাতেই, কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই, দু’জন মানুষের মাঝখানে তৈরি হয়ে গেলো এক নিঃশব্দ নির্ভরতা।যে নির্ভরতার শুরু হয়েছিলো ভয়ের মুহূর্তে,আর হয়তো একদিন সেই নির্ভরতাই তাদের ভালোবাসার সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে।
সকালের প্রথম আলো জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে ঘরের ভেতরে এসে পড়তেই বেলার ঘুম ভেঙে গেলো।কিছুক্ষণ সে চোখ বন্ধ করেই শুয়ে রইলো।তারপর হঠাৎ মনে পড়লো।সে নিজের ঘরে নেই।সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলে পাশে তাকালো।বিছানার অন্য পাশটা খালি।বেলা একটু অবাক হয়ে উঠে বসল।সায়র কোথায় গেলো?ঠিক তখনই বাথরুমের দরজা খুলে সায়র বেরিয়ে এলো। চুল ভেজা, হাতে তোয়ালে। বেলার দিকে তাকাতেই তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো,
—গুড মর্নিং ।
বেলা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললো,
—আপনি এত সকালে উঠে গেছেন?
—আমি প্রতিদিনই উঠি।
—আমি তো জানি কিন্তু কলেজ তো কিছুদিন বন্ধ।
সায়র টেবিলের ওপর রাখা একটা কাপের দিকে ইশারা করে বললো,
—তোর জন্য কফি বানিয়েছি।
বেলা অবাক হয়ে তাকালো।
—আমার জন্য?
—হুম।
সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামলো।কাপটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো।তারপর খুব আস্তে বললো,
—আপনি আমার জন্য কফি বানিয়েছেন?
সায়র ভুরু কুঁচকে বললো,
—এত অবাক হওয়ার কী আছে?
—আপনি কফি বানাতে পারেন?
—প্রয়োজন হলে অনেক কিছুই পারি।
বেলা মৃদু হেসে ফেললো।
—তাহলে আগে কখনো দেখিনি কেন?
সায়র শান্ত গলায় বললো,
—আগে তো তুই আমার রুমে থাকতি না।
কথাটা শুনে বেলা থমকে গেলো।তারপর চোখ নামিয়ে ফেললো।এই ছোট্ট কথাটাও যেন তার মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি তৈরি করলো।সায়র সেটা বুঝতে পেরে আর কিছু বললো না।
নিচে তখন সকালের নাস্তার প্রস্তুতি চলছে।নাজনীন সুলতানা টেবিলে খাবার সাজাচ্ছেন। বিহান চেয়ারে বসে মোবাইল দেখছে। সারোয়ার খান খবরের কাগজ পড়ছেন।কিছুক্ষণ পর সিঁড়ি দিয়ে বেলা আর সায়রকে একসঙ্গে নামতে দেখা গেলো।বিহান সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলটা নামিয়ে ফেললো।তার ঠোঁটে দুষ্টু হাসি।
—ওহ্! সকাল সকাল দু’জন একসঙ্গে হাজির!
বেলা ল’জ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো।সায়র শান্তভাবে চেয়ারে বসে বললো,
—বিহান, সকালে শুরু করিস না।
বিহান হেসে বললো,
—আমি তো কিছুই বলিনি। শুধু দৃশ্যটা উপভোগ করছি।
বেলা বিরক্ত হয়ে বললো,
—ভাইয়া!
—আচ্ছা আচ্ছা, চুপ।
নাজনীন সুলতানা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।কিন্তু ঠিক সেই সময় সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একজনের চোখে দৃশ্যটা গিয়ে আটকে গেলো।মমতাজ বেগম।তিনি দেখলেন সায়র স্বাভাবিকভাবে বসে আছে, আর বেলা তার পাশে।এক মুহূর্তেই তাঁর মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেলো।তিনি ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলেন।চেয়ারে বসে কঠিন গলায় বললেন,
—বাহ্! এখন দেখি সকাল শুরু হওয়ার আগেই অনেক কিছু বদলে গেছে।
টেবিলের পরিবেশ মুহূর্তেই থমকে গেলো।বেলা কাপটা নামিয়ে ফেললো।সায়র মায়ের দিকে তাকালো।
—আম্মু, কী হয়েছে?
মমতাজ বেগম ঠান্ডা গলায় বললেন,
—কিছু হয়নি। নিজের চোখে যা দেখছি, সেটাই বললাম।
সারোয়ার খান খবরের কাগজ নামিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
—মমতাজ, সকালের সুন্দর সময়টা ন’ষ্ট করো না।
মমতাজ বেগম কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।আর কিছু না বলে খেতে বসলেন।
নাস্তা শেষ করে সবাই চলে যাওয়ার পর মমতাজ বেগম বেলাকে নিজের ঘরে ডাকলেন।বেলা ঘরে ঢুকতেই মমতাজ বেগম দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—দরজাটা লাগিয়ে দে।
বেলা দরজা বন্ধ করে সামনে এসে দাঁড়ালো।মমতাজ বেগম কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে।হঠাৎ বললেন,
—তুই আমার ছেলেকে কেড়ে নিতে চাস, তাই না?
বেলা হতভম্ব হয়ে তাকালো।
—কী?
—যেভাবে তোর মা একদিন আমার প্রিয় মানুষটাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিলো, তুইও ঠিক সেভাবেই আমার ছেলেকে কেড়ে নিতে চাইছিস।
বেলার মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেলো,
—আমার মায়ের নামে মিথ্যা কথা বলবেন না, চাচি।
—মিথ্যা?
—হ্যাঁ, মিথ্যা। আমার মা আপনার কাছ থেকে কী কেড়ে নিয়েছে?
মমতাজ বেগমের চোখে হঠাৎ পুরোনো কষ্টের ছায়া নেমে এলো।কিন্তু তিনি কিছু বললেন না।বেলা আরও এক পা এগিয়ে এসে বললো,
—বলুন। কীভাবে কেড়ে নিয়েছিলো?
মমতাজ বেগম মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
—সেই কথা তোর জানার দরকার নেই।
বেলা তীক্ষ্ণ গলায় বললো,
—জানার দরকার নেই মানে? আমার মাকে নিয়ে কটু কথা বলবেন, অথচ কারণটা বলবেন না?
—তুই বুঝবি না।
—তাহলে বুঝিয়ে বলুন।
—আমি বলবো না।
বেলা এবার রাগ সামলাতে না পেরে বললো,
—তাহলে আমার মায়ের নামে আর একটা কথাও বলবেন না।
মমতাজ বেগম চোখ রাঙিয়ে বললেন,
—তুই আমাকে শাসাচ্ছিস?
—না। শুধু আমার মাকে নিয়ে মিথ্যা অপবাদ দিতে নিষেধ করছি।
—তোরা মা মেয়ে দুটোই ন”ষ্ট!
বেলার চোখে আ”গুন জ্ব’লে উঠলো।
—আমার মাকে আপনি যা খুশি বলবেন, আর আমি চুপ করে শুনবো । এটা ভুলেও ভাববেন না।
মমতাজ বেগম তাচ্ছিল্য করে বললেন,
—তোর মা কম কিছু করেনি আমার জীবনটা এলোমেলো করতে।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে বললো,
—আপনি জানেন নআমার মা কেমন। তাই এমন কথা বলবেন না আমার সহজ সরল মা’কে নিয়ে।
—আমি খুব ভালো করেই জানি।
—তাহলে কীভাবে কেড়ে নিয়েছিলো বলুন!
আবারও মমতাজ বেগম চুপ।
বেলা এবার একটু ব্যঙ্গ করে বললো,
—নাকি শুধু অভিযোগ করার সময় মনে থাকে, প্রমাণ দেওয়ার সময় মনে থাকে না?
মমতাজ বেগম রেগে গেলেন।
—বেশি কথা বলিস না, বেলা!
—আপনিই তো কথা শুরু করেছেন।
—তুই আমার ছেলের জীবন থেকে দূরে থাক।
বেলা চোখ বড় বড় করে বললো,
—আপনার ছেলে কি কচি খোকা, যে আমি কেড়ে নেব?
মমতাজ বেগম থমকে গেলেন।
বেলা এবার এক নিঃশ্বাসে বলে গেলো,
—সায়র ভাই প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ, নিজের ইচ্ছা আছে। উনি কার সঙ্গে কথা বলবেন, কার পাশে থাকবেন, সেটা উনি ঠিক করবেন। আমি কাউকে কেড়ে নিতে যাইনি। আর আমার ঠেকা পরেনি কেড়ে নিতে যাবো আপনার ছেলেকে।
—তুই ওকে ফাঁদে ফেলেছিস। সেজন্য ওকে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
—আমি?
বেলা নিজের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললো,
—আমি যদি ফাঁদ পাততাম, তাহলে প্রথম দিন থেকেই সায়র ভাইকে আমার পেছনে ঘুরাতাম। উল্টো উনিই আমাকে সবসময় সামলে যাচ্ছেন।
মমতাজ বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন,
—তুই খুব চালাক হয়ে গেছিস।
বেলা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,
—আপনার কাছ থেকে শিখছি।
—আমার সঙ্গে তর্ক করিস না!
—তাহলে আমার মায়ের নামে কথা বলবেন না।
—আমি যা সত্যি, তাই বলেছি।
—সত্যি হলে বলতে এত ভয় কেন?
মমতাজ বেগমের মুখটা হঠাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো।কয়েক মুহূর্ত তিনি কোনো উত্তর দিলেন না।বেলা সেটা লক্ষ্য করলো। বেলা আর কিছু না বলে ।দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বললো,
—আজ থেকে ভুলেও আমার মাকে নিয়ে কটু কথা বলবেন না। এই আমি বলে রাখছি।
মমতাজ বেগম পেছন থেকে বললেন,
—তুই আমাকে আমার ছেলের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিস। আমার বড় বড় কথা বলছিস। অসভ্য মেয়ে।
বেলা দরজায় হাত রেখে ঘুরে দাঁড়ালো।
—আমি কাউকে সরাচ্ছি না, চাচি। আপনি নিজেই যদি দূরে চলে যান, তার দোষ আমার না।
কথাটা বলে বেলা দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো।ঘরের ভেতর একা দাঁড়িয়ে রইলেন মমতাজ বেগম।তার চোখের সামনে আবারও বহু বছর আগের সেই পুরোনো স্মৃতি ভেসে উঠলো।কয়েক মুহূর্ত পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।পরক্ষণেই যেন তাঁর ভেতরে জমে থাকা সমস্ত রাগ একসঙ্গে বি’স্ফো’রিত হলো।
—বেয়াদব মেয়ে!
চিৎকার করে টেবিলের ওপর রাখা ফুলদানিটা তুলে সোফার দিকে ছুড়ে মা”রলেন তিনি। ফুলদানিটা মেঝেতে পড়ে বিকট শব্দে ভেঙে গেলো।
—আমার সঙ্গেই তর্ক করে! আমাকে মুখের ওপর জবাব দেয়!
রাগে তাঁর বুক দ্রুত ওঠানামা করতে লাগলো।তিনি সোফার ওপর থাকা কয়েকটা কুশন একে একে ছুড়ে ফেললেন।
—একদম ওর মায়ের মতো ছেলে ধরা মেয়েলোক! একই র’ক্ত তো!আমার ছেলেকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে আবার আমাকেই কথা শোনাচ্ছে!
তিনি কয়েক পা এদিক-ওদিক হাঁটলেন।হঠাৎ থেমে আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালো।তার চোখে তখন রাগের পাশাপাশি পুরোনো অভিমানের আ”গুন জ্ব’লছে। সে বললো,
—না। এবার আমি ওকে জিততে দেবো না।একবার আমার জীবনটা এলোমেলো হয়েছে। এবার আমার ছেলের জীবন এলোমেলো হতে দেবো না।তোর মা কী করেছিলো, সেটা তুই জানিস না, বেলা। জানলে আজ এত বড় বড় কথা বলতে পারতিস না।
রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২৮
কিন্তু পরক্ষণেই নিজের কথায় নিজেই থেমে গেলেন।তিনি জানেন, সেই পুরোনো সত্যি আজ প্রকাশ করার সময় এখনও আসেনি।মতাজ বেগম চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে শ্বাস নিলেন।কিছুক্ষণ পর তাঁর চোখ পড়লো মেঝেতে পড়ে থাকা ভাঙা ফুলদানিটার দিকে।তারপর দৃঢ় গলায় বললেন,
—মনে রাখিস বেলা, যতদিন আমি বেঁচে আছি, ততদিন তোর স্বপ্ন কোনোদিন পূর্ণ হতে দেবো না। এই ভাঙা ফুলদানিটা যেমন এক মুহূর্তে টু’করো টু’করো হয়ে গেলো, তেমনি টু’করো টু’করো করে দেবো তোর আমার ছেলেকে নিয়ে সংসার সাজানোর স্বপ্ন।
