Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ২৯

রাগে অনুরাগে পর্ব ২৯

রাগে অনুরাগে পর্ব ২৯
সুহাসিনি ফাতেহা

“আমি কিচ্ছু দেখিনি! বি..বিশ্বাস করুন! আমি অন্ধ হয়ে গেছি! বাকি জীবনের জন্য চোখদুটো নষ্ট হয়ে গেছে। আমি কিছু দেখেছি! না…না ইয়ে মানে ওই আমি…”
থামল তিতলি! কি বলতে কি বলে ফেলল। দুহাতে নিজের মুখ চেপে ধরল। এত্তো লজ্জা লাগছে তার বলে বুঝাতে পারবে না। লজ্জায় কথা গোলমাল করে ফেলেছে। এই মুখ সে আর ভাল্লুককে দেখাতে পারবে না। মনে হচ্ছে ফারাজের না বরং তার কিছু খুলে গিয়েছে।
ওদিকে ফারাজ খান এখনো ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছেন ঠিক একই জায়গায়। তালগোল পাকিয়ে চেয়ে আছেন বেয়াদব বউয়ের কথা শুনে। সুদর্শন মুখখানায় তার সে-কি সন্দিহান ভাব! তার বলিষ্ঠ পা দুটোর ঠিক নিচে মেঝেতে অপরাধীর ন্যায় ঘড়াঘড়ি খাচ্ছে সফেদ রঙা তোয়ালেটা। ফারাজের কপালে ভাঁজ পড়ল গভীর। চিবুক শক্ত হলো। ঘাড় ডলতে ডলতে কামড়ে ধরল নিজ নিম্নাংশের অধর। তৎক্ষণাৎ শিরদাঁড়া বাঁকিয়ে মেঝে থেকে তুলে নিলো তোয়ালেটা। পরক্ষণে শক্ত মুখভঙ্গি বজায় রেখে তোয়ালেটা কোমরে পেঁচাতে পেঁচাতে সন্দেহের কন্ঠে শুধালো,

“তোমার চোখের চিকিৎসা করাতে হবে বেয়াদব!”
“না,না, না! আমার চোখ আপনাকে দেখেই নষ্ট হয়ে গেছে।”
লজ্জার চরম সীমানায় গিয়ে দাঁত খিঁচে শব্দটা উচ্চারণ করল তিতলি। জ্বিভ কা*টছে বারবার। আল্লাহ! লোকটার কোনো লজ্জা নেই আবার তার সাথে কথাও বলে। আর এদিকে সে লজ্জায় ম*রে যাচ্ছে।
ফারাজ সোফায় বসে ট্রাউজার পরতে পরতে কপাল কুঁচকে নিলো তৎক্ষণাৎ! এমনিতে মেজাজ বিগড়ে গেছে এমন ঘটনায়। শক্ত মেজাজের মধ্যেও বেয়াদব বউকে জ্বালাতে দুষ্ট কণ্ঠে আওড়াল,
“ভবিষ্যতে আবার দেখলে সে দেখা যাতে বিফলে না যায় সে ব্যবস্থা এখন করে দিবো। আমার হাতে আবার সময় কম বউ! জাস্ট ওয়েট! তার আগে এক পা ও যেন দরজার দিকে না যায় বেয়াদব!”
তিতলি লজ্জায় আড়ষ্ট হলো আরও বেশি। কান দু’টো এখনো ঝাঁঝাঁ করছে তার। আজ তার লজ্জিত হওয়ার দিন। লজ্জায় লজ্জায় মরে যাওয়ার দিন। উফ! কণ্ঠে ঝাঁঝ এনে দাঁত খিঁচে বলল,
“আ..পনি আর আমার সামনে আসবেন না। আপনাকে দেখলে আমার শুধু হাসি পাবে। আমার মতো ভন্ড হলে বুঝতেন সিরিয়াস মুহূর্তে হাসি আটকানো কতটা কষ্টের।”
এটুকু বলে তিতলি লজ্জায় লাল হয়ে দ্রু’ত মাথা নিচু করে দরজার দিকে যেতে যেতে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“নি’র্লজ্জ, বে’হায়া লোক মুখে লাগাম নেই কোনো। ওনার ল’জ্জা নাই থাকতে পারে, তাই বলে কি আমার ও নেই?”

বিড়বিড় করে বলা কথাটা কিভাবে যেন শুনে ফেলল ফারাজ। ট্রাউজার পরা শেষে ভেতর থেকে তোয়ালে বের করতে করতে শক্ত কণ্ঠে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমি রুম থেকে যাওয়ার পারমিশন দেইনি এখনো। কথার অবাধ্য হচ্ছো কেন? দাঁড়াও বলছি! কিছু করার আগেই যেহেতু নির্লজ্জ….”
কথা শেষ হতে না হতেই তিতলি ঝড়ের গতিতে দরজা খুলে দৌড় দিলো।
ফারাজ একটু দেরি করে ফেলেছে। নয়তো আজ কিছু একটা হয়েই যেত। বেঁচে গেলো এবার। যুবকের ফেলা রাখা হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়েছে আনমনে। দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে শক্ত মেজাজে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“খুব সাহস বেড়েছে না? ঘড়ির কাঁটা কিন্তু ঘুরছে। দিন পেরিয়ে রাত আসবে। তখন বুঝাবো নির্লজ্জতা কাকে বলে বেয়াদব!”

বলে আকাশসম রাগ নিয়ে ঠাস করে দরজা লাগলো ফারাজ। অবাধ্য বেয়াদব বউকে সামনে পেলে কিছু না কিছু একটা হবেই। না হলে তার অশান্ত মন শান্ত হবে না কিছুতেই। আজ সে এই বউকে ছাড়বে না। কোনো ভাবেই ছেড়ে দিবেনা। খেয়ে ফেলবে না আজ এই বউকে সে একদম? আজ সেও দেখবে কে বাঁচায় তার এই বেয়াদব বউকে তার হাত থেকে।
রুমে ঢুকতেই সহসা তার ফোন বেজে উঠল। এই সময়ে আবার কার ফোন এলো। ফারাজ বিরক্তির রেশ নিয়েই স্টাডি টেবিল থেকে মোবাইল নিয়ে দেখল আলভী কল করেছে। ফারাজ ধরল না।
২ সেকেন্ড পর আবার এলো। এবার রিসিভ করে কানে ধরলো,
ফারাজ কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে আলভী বলল,
“দিনদুপুরেও কি নাদান শিশুটার সাথে ফষ্টিনষ্টি করছিস নাকি? এতগুলো ফোন করলাম একটাও রিসিভ করিস নি!”
ফারাজের মেজাজ এমনিতে ঠিক নেই। তারউপর আলভীর এমন কথা শুনে আগুনে ঘি পরার মতো কাজ করল। তাও রাগ কন্ট্রোল করে বলল,

“কি জন্য ফোন করেছিস সেটা বল!”
আলভী ওপাশ থেকে দাঁত কেলিয়ে বলল,
“তোর এটিএম কার্ডটা আমরাই নিয়েছিলাম সেদিন। এখন কয় টাকা আছে সেটা দেখার জন্য ব্যাংকে এসেছি। তুই চাইলে আসতে পারিস বিরিয়ানি খাওয়াবো তোর টাকা দিয়ে।”
ফারাজ জানতোই তার এটিএম কার্ড যে আলভীরাই নিয়েছে। কিন্তু কিছুই বলেনি। এখন যেহেতু মুখে স্বীকার করে বলতেছে তাই সেও খোঁচা মেরে বলল,
“তোদের দান খয়রাত করেছি, এবার ফোন রাখ!”
“না না আগে বল সুখবর কখন শুনবো? আমার ছেলে হলে তোর মেয়ের সাথে বিয়ে দিবো।”
ফারাজ ফোন কেটে দিলো।

তিতলি ওই সময় রুম থেকে যে পালিয়ে এসেছে আর ভুল করেও রুমে যায় নি। ভালোই বুঝতে পেরেছে ভাল্লুক তার কথায় রেগে গিয়েছে। রাগুক! সেদিন সে শাড়ি চেঞ্জ করার জন্য খুলেছে বলে, খোঁচা মেরে বলছে, সে ইচ্ছে করে দেখাচ্ছে। এখন যে উনি..ভেবেই জিভ কাটলো তিতলি। মনে মনে বলল,
“এখন কার সাথে ভাব দেখাবেন! হুহ! খুব তো খোঁচা দিচ্ছিলেন আমার রুম, আমার রুম এখন থেকে এটা আমার রুম, আপনি আমার রুমের গেস্ট! আমার সাথে আর ভাব দেখাতে আসলে আপনাকে এই কথাটা শুনাবো প্রথমে।”
নাছিমা বেগমের মেয়ে নীলা এসে তিতলির পাশের বসে জিজ্ঞেস করলো,
“ওই সময় উপর থেকে এভাবে দৌড় দিলে কেন?”
তিতলি ভাবুক হয়ে পড়ল। মেয়েটার মা একটা ডাইনী! কিন্তু মেয়েটা ভালো। তার সাথে অনেক মিশে। ভালো ব্যাবহার করে। তিতলি কিছুক্ষণ রুমে হওয়া ঘটনা ভাবলো। পরক্ষণেই বেঘোরে দাঁত কেলিয়ে বলল,
“রুমে তেলাপোকা ছিলো তাই..তাই!”
“তেলাপোকা কোথায় থেকে আসবে?”

“ছিলো তো বড় তেলাপোকা। আমার উপর উঠতে চেয়েছিল তাই দৌড়ে পালিয়ে এসেছি।”
“কিহহ! তাহলে ফারাজ ভাইয়া কোথায় ছিলো? তুমি কিছু বলো নাই কেন? সেদিন একটা সিরিয়াল দেখলাম বউয়ের গায়ে আরশোলা উঠায় আরশোলাকে খেয়ে ফেলছে ভাবি।
“আরশোলা কি আবার?”
নীলা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আরে ভাবি আরশোলা মানেই তো তেলাপোকা।”
তিতলি চোখ বড় বড় করে অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
“কিহ? আমি প্রথম শুনলাম।”
এর মাঝেই ফারিন বেগমের ডাক পড়লো ডাইনিং টেবিলে। ওরা দুজন কথা বাদ দিয়ে ড্রয়িংরুমে গেল। এতক্ষণ শাশুড়ির রুমে বসে ছিলো তিতলি।
দুপুরের খাবার খেতে বসেছে সবাই। ফারিন বেগম ভাত বেড়েছেন। সবাই একে একে এসে চেয়ার টেনে বসেছেন। শুধু ফারাজ বাদে। আফজাল খান, ফরহাদ,হুশিয়ার সাহেব সহ ছকিনা খাতুন ফারাজের খালা নাছিমা বেগম ও তার মেয়ে নীলা।
ফারিন বেগম পুত্রবধুর উদ্দেশ্য বললেন,
“ফারাজকে গিয়ে ডেকে আনো তিতলি মা। মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে।”
তিতলি সে কথা শুনে মুখ তুলে তাকাতেই তক্ষুনি ফারাজকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখল। পরনে ধূসর রঙা একটা টি-র্শাট আর কালো ট্রাউজার। মারাত্মক সুন্দর লাগছে। ফারাজ দেখার আগেই তিতলি চোখ নামিয়ে শাশুড়িকে বলল,

“এসে গেছেন! ডাকা লাগবে না আম্মু!”
ফারিন বেগম সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে ছেলেকে বললেন,
“আমি আরো তিতলিকে পাঠাচ্ছিলাম তোকে ডাকতে। তোর জন্য সবাই অপেক্ষা করে আছি তাড়াতাড়ি বসে পড়।”
ফারাজের মুখটা দেখে বুঝা দায় যে ঘন্টাখানেক আগেও তার ইজ্জতের ফালুদা হয়েছিল। মুখখানা তার সে-কি গম্ভীর। চেয়ার সবগুলো তে সবাই বসে আছে। শুধু তিতলির পাশেরটা খালি। ফারাজ একবার বেয়াদব বউয়ের দিকে তাকিয়ে চেয়ার টেনে বসল পাশাপাশি।
তিতলি কেঁপে উঠল ফারাজের উপস্থিতিতে।
না খেয়েই প্লেটের ভাত হাত দিয়ে নড়াচড়া করছে। আফজাল খান সেটা দেখে পুত্রবধুকে বললেন,
“না খেয়ে বসে আছো কেন আম্মু?”
ফারাজ এতক্ষণ ধরে সব খেয়াল করছে। কিন্তু কিছু বলছে না। তিতলি শ্বশুর আব্বুকে বলল,
“এইতো খাচ্ছি আব্বু!”
ছকিনা খাতুন ভাতের লোকমা মুখে নিতে নিতে বললেন,

“সরম পাইতাছে নাতবউ! কয়দিন বাদে ঠিক অই যাইবো।”
ফারিন বেগম তিতলির প্লেটে কাতাল মাছের বড় দেখে একটা খন্ড তুলে দিয়ে বললেন,
“খাও মা। কিছু লাগলে বলো। লজ্জা পাওয়ার কোনো কারণ নেই।”
তিতলি রয়েসয়ে কোনোরকমে বলল,
“জ্বি আম্মু!”
নাছিমা বেগম মুখ বাঁকালেন। এসব দেখে তিনি অতিষ্ট। মেয়েকে কত বলেন, ফারাজের আশেপাশে থাক” ছেলেদের দৃষ্টি হচ্ছে চম্বকের মতোন। মেয়ে মানুষ দেখলই হুঁশে থাকে না। কিন্তু মেয়ে তার কথা শুনে না।
হুশিয়ার সাহেব খেয়ে ফেলেছেন। পানি খেয়ে নাতির উদ্দেশ্য বললেন,
“আমি তোর নানিরে বিয়া করার পর থেইকে নিজের হাতে ভাত খাবায় দিতাম। এহনো দি! আর এহন তো যুগ বদলাইছে পোলাপাইন মাইনষে বিয়ার কথা হুনলেই লাফাইয়া উঠে। বউ কইতেই হাগল থাকে। তুই হুশিয়ার সাহেবের নাতি হইয়া কি কইরলিরে?
বলতে বলতে হুশিয়ার সাহেব পানের বাটা থেকে পান নিয়ে তাকালেন নাতির দিকে। সবাই মিটিমিটি হাসতে লাগলো। আর ফারাজ রাগে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

রাগে অনুরাগে পর্ব ২৮

“তোমার নাতবউর দুইটা হাত আছে নানাভাই! কজ আমার বউ আমি যখন ইচ্ছে খাইয়ে দিবো তোমার ভাবতে হবে না।
বলতে বলতে তিতলির পাশ থেকে উঠে দাঁড়াল। অনেকটা শব্দ করেই ধুপধাপ পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। আর ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের বেয়াদব বউয়ের দিকে তাকাচ্ছে বারবার। তিতলিও কি মনে করে আস্তে করে মাথা উঁচিয়ে সিঁড়ি দিকে তাকায় দেখার জন্য। সঙ্গে সঙ্গে চোখ মিলল দুজনের। তিতলি মুখ ভেংচি কাটলো। ফারাজের নজরে এরায় না সেটা। বিড়বিড় করে আওড়াল,
“রুমে একবার শুধু আসো তারপর মুখ ভেঙ্গানো বাহির করবো। মুখ আর মুখের জায়গায় থাকবে না।”

রাগে অনুরাগে পর্ব ৩০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here