Home রোমান্টিক ভাইয়া রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬০

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬০

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬০
মহাসিন

রাত এখন দশটা। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর স্নিগ্ধ জোছনায় ভরপুর এক মায়াবী রাত। জানালার পর্দা ভেদ চাঁদের আলো এসে লুটিয়ে পড়েছে ঘরের মেঝেতে। তীব্র গরমে এসির মৃদুমন্দ বাতাসেও যেন স্বস্তি মিলছিল না শাপলার।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে উঠে দাঁড়াল। শেষমেশ উপায়ান্তর না দেখে আলমারি থেকে বের করে নিল তার পছন্দের শাড়িটি। নিজেকে একটু সতেজ করতে পা বাড়াল ওয়াশরুমের দিকে।
শাওয়ারের শীতল জলধারা যখন তার তপ্ত শরীরে স্পর্শ করল, এক নিমেষে ক্লান্তি ধুয়ে মুছে গেল। স্নিগ্ধ রঙের ব্লাউজ আর পেটিকোট পরে তৈরি হলো। কিন্তু আসল বিপত্তি বাধল শাড়ি পরতে গিয়ে। শাড়ি পরার অভ্যাস তার নেই বললেই চলে। এই প্রথমবার নিজের হাতে শাড়ি গুছিয়ে পরতে গিয়ে সে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। শাড়িটা হাতে নিয়ে অসহায় মুখে বেরিয়ে এলো সে।
খাটে বসে উপন্যাসের বই পড়ছে সিয়াম। শাপলাকে শাড়ি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে হাসিমুখে তাকাল,

_”কিরে, শাড়ি না পরে এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
শাপলা একটু লজ্জা মেশানো গলায় বলল, _”আসলে কিছুতেই ঠিকঠাক শাড়ি পরতে পারছি না। বারবার কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।”
সিয়াম বইটা পাশে রেখে শান্ত গলায় বলল,
_ “না পারলে জোরাজুরি করার দরকার নেই। অন্য কোনো ড্রেস পরে নিলেই হয়।”
শাপলা অভিমানী স্বরে জানাল,
_ “না, আজ কেন জানি শাড়ি পরার খুব শখ হয়েছে আমার।”
সিয়াম বিছানা থেকে নেমে নেমে গেল। তার চোখেমুখে এক চিলতে দুষ্টুমি আর ভালোবাসা। সে বলল,
_ “ঠিক আছে, কাছে আয়। আমি পরিয়ে দিচ্ছি।”
শাপলা অবাক হয়ে তাকাল,
_”আপনি পারবেন? শাড়ি পরা তো সহজ কাজ নয়!”
সিয়াম ফোনটা হাতে নিয়ে ইউটিউব থেকে টিউটোরিয়াল বের করল। আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
_ “আমি না পারলে ভিডিও তো আছেই। আর তোকে আজ শাড়ি পরানোর দায়িত্বটা যখন আমার, আমি তা ঠিকঠাক পালন করবই।”

শাপলা মৃদু হেসে সিয়ামের সামনে এগিয়ে এলো। ভিডিওর প্রতিটি ধাপ খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সিয়াম পরম মমতায় শাপলাকে শাড়ি পরিয়ে দিতে লাগল। কুচিগুলো গুছিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে আঁচল ঠিক করা প্রতিটা কাজেই তার অসীম ধৈর্য। সবশেষে সিয়াম শাড়ির কুচিগুলো নিখুঁত করে গুছিয়ে দিল, শাপলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল।
মুগ্ধতা ঝরে পড়ল তার চোখে। সে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
_”বাহ্! আপনি তো দেখি ভিডিওর চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর করে শাড়ি পরিয়ে দিয়েছেন!”
সিয়াম তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল,
_ “সে তো হবেই! এখন বল, আমার এই পরিশ্রমের বিনিময় বা পারিশ্রমিক কী দিবি?”
শাপলা কিছুটা লাজুক হাসি দিয়ে জানতে চাইল, _”আমি কী দিতে পারি বলুন?”
সিয়াম রহস্যময় হেসে বলল,
_ “সেটা তোর ওপর ছেড়ে দিলাম। তোর যা খুশি তাই দিতে পারিস।”
শাপলা এক মুহূর্ত ভাবল, তারপর সিয়ামের চোখের দিকে তাকিয়ে তার খুব কাছে এগিয়ে এলো। আলতো করে সিয়ামের ঠোঁটে ভালোবাসার এক নিবিড় ছোঁ_ য়া এঁকে দিল সে। তারপর মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল,
_”এবার কি আপনি খুশি?”
সিয়াম চোখ বুজে এই মুহূর্তটুকু অনুভব করল। মৃদু সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল সে।
শাপলা হঠাৎ মনে করে বলল,

_”আচ্ছা, আপনি না বলেছিলেন আমাকে একটা গিফট দেবেন?”
সিয়াম চোখ খুলে মুচকি হেসে বলল,
_ “হ্যাঁ, মনে আছে। আগে চোখ দুটো বন্ধ কর।”
শাপলা পরম বিশ্বাসে চোখ বন্ধ করল। সিয়াম ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে গিফট পেপারে মোড়ানো একটি ছোট বাক্স বের করে শাপলার হাতে রাখল।
_”এবার চোখ খোল।”
শাপলা চোখ মেলে অবাক হলো। এর পর দ্রুত বাক্সটা খুলল। ভেতরে চমৎকার একটি পায়েল। শাপলার চোখ আনন্দে চিকচিক করে উঠল। সে আবদার করে বলল,
_”অনেক সুন্দর! কিন্তু এটা আপনিই পরিয়ে দিন না।”
সিয়াম শাপলার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। শাপলার একটি পা নিজের হাঁটুর ওপর রেখে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে পায়েলের হুক লাগিয়ে দিল। সবশেষে, শাপলার পায়ের পাতায় আলতো করে এক চু \মু খেল সিয়াম। চাঁদের আলোয় ভরা এই রাতে, ভালোবাসার এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো যেন এক অপূর্ব উপন্যাস হয়ে ধরা দিল তাদের জীবনে।

রাত এখন গভীর। নিঝুম পরিবেশে চারপাশটা যেন স্তব্ধ হয়ে আছে। নিরব বারান্দার রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে, হাতের স্মার্টফোনটার দিকে তার বারবার নজর যাচ্ছে। চুমকিকে সে অনেকবার কল দিয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই ওপাশ থেকে নিস্তব্ধতা তাকে তাড়া করে ফিরছে। নিরব অস্থির হয়ে বারবার ফোন দিচ্ছে, কিন্তু চুমকি রিসিভ করার কোনো লক্ষণই নেই।
ঠিক এই মুহূর্তেই নীলাঞ্জনা বারান্দার পাশ দিয়ে করিডোর ধরে নিজের রুমের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ নিরবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে থমকে দাঁড়াল। নিরবের উপস্থিতি তাকে বিস্মিত করল।
নীলাঞ্জনা কিছুটা গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, _”তুমি এই গভীর রাতে এখানে দাঁড়িয়ে কী করছো?”
হঠাৎ পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে নিরব চমকে পিছু ফিরল। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে সে বলল,
_”না, মানে… তেমন কিছু না। এমনিই, বাইরে বেশ হাওয়া দিচ্ছে তাই একটু দাঁড়িয়ে আছি।”
নীলাঞ্জনা ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
_ “কেন? রুমের এসি কি নষ্ট হয়ে গেছে যে, মাঝরাতে এভাবে বারান্দায় এসে হাওয়া খেতে হচ্ছে?”
নিরব শান্ত গলায় উত্তর দিল,
_”না, আসলে রুমে একদম ভালো লাগছিল না। চারদেয়ালের মাঝে দম বন্ধ হয়ে আসছিল, তাই ভাবলাম এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়াই।”

নীলাঞ্জনা আর কোনো কথা বাড়াল না, কোনো মন্তব্য না করেই সে তার রুমের দিকে চলে গেল। নিরব আবার একা হয়ে গেল বারান্দায়। হঠাৎ তার পকেটের ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়ে নিরবের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। চুমকি কল দিয়েছে।
সে দ্রুত কল রিসিভ করলো,
_ “হ্যালো?কতক্ষণ ধরে তোমাকে কল দিচ্ছি, রিসিভ করছিলে না কেন?”
ওপাশ থেকে চুমকির মিষ্টি কণ্ঠ ভেসে এল, _”ফোনটা সাইলেন্ট করা ছিল, তাই খেয়াল করিনি।”
নিরব নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল,
_”খেয়েছ কিছু?”
_”হুঁ, খেয়েছি। আপনি খেয়েছেন?”
_”হুঁ।”
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর চুমকি মৃদু হাসির সুরে বলল,
_”আচ্ছা আপনি আমরা সাথে কথা বলেন কেন?”
নিরব তার চোখের দৃষ্টি আকাশের দিকে রেখে বলল,
_ “আমার তোমার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে, তাই বলি। কিন্তু তুমি কেন কথা বলো?”
চুমকি একটু ভেবে বলল,

_ “জানি না। তবে ভীষণ ইচ্ছে করে আপনার সাথে কথা বলতে। আপনার সাথে কথা বললে অদ্ভুত এক শান্তি পাই। ইচ্ছে করে আপনার আরও কা/ছে যাই…”
চুমকি কথাটি বলেই যেন কিছুটা লজ্জা পেল।
নিরব অবাক হয়ে বলল,
_ “এই, কী বললে তুমি?”
চুমকি নিজেকে সামলে নিয়ে চট করে বলল,
_”কই? কিছুই না তো।”
নিরব দুষ্টুমি ভরা গলায় বলল,
_ “না, তুমি কী যেন বললে।?”
চুমকি ভান করে বলল,
_”আরে না।”
নিরব এবার একটু গম্ভীর হলো। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
_”চুমকি, আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।”
চুমকি আগ্রহ নিয়ে বলল,
_”হ্যাঁ, কী বলতে চান? বলুন।”
_”না, ফোনে এসব বলা যাবে না।”
_”তাহলে?”
_”আমি তোমাকে সামনাসামনি বলতে চাই।”
_ “তাহলে কি কাল দেখা করবেন?”
নিরব এক মুহূর্ত না ভেবেই বলল,
_ “তুমি চাইলে অবশ্যই দেখা করব।”
চুমকি ফোনের ওপাশ থেকে বলল,
_”আচ্ছা ঠিক আছে। আমি আপনাকে লোকেশন মেসেজ করে দিচ্ছি। আগামীকাল সেখানে দেখা হবে।”
_”ওকে, তাহলে রাখি এখন,” বলেই নিরব কলটি কেটে দিল।
ফোনটা পকেটে রেখে এক বুক আশা আর অদ্ভুত এক ভালো লাগা নিয়ে নিরব তার রুমের দিকে হাঁটা দিল।

সকালের সোনালি আলোয় চারপাশ ভরে উঠেছে এক অপূর্ব মায়ায়। সূর্য ধীরে ধীরে উঁকি দিয়ে পৃথিবীকে নতুন করে সাজিয়ে তুলছে। তার নরম রশ্মি জানালা দিয়ে প্রবেশ করে ঘরের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে পড়েছে। বাইরের গাছের ডালে পাখিরা কিচিরমিচির করে আনন্দের গান গাইছে, যেন সকালকে স্বাগত জানাচ্ছে। হালকা বাতাসে ফুলের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে।
সিয়াম শাপলাকে নিজের বুকের কাছে জ/ ড়ি /য়ে ধরে গভীর ঘুমে মগ্ন। তার শক্তিশালী বাহুর নিরাপদ আশ্রয়ে শাপলা সারা রাত স্বপ্নের জগতে ভেসে বেড়িয়েছে। কিন্তু সকালের প্রথম আলো তার চোখে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল। সে আস্তে আস্তে উঠতে চাইল, কিন্তু সিয়ামের আলিঙ্গন এতটাই মধুর যে ছাড়তে ইচ্ছে করছে না।
“কোথায় যাচ্ছো এত সকালে?” সিয়ামের ঘুমজড়ানো, মিষ্টি কণ্ঠস্বরে আবদার মিশে আছে। চোখ না খুলেই সে আরও শক্ত করে শাপলাকে কা/ছে টে/নে নিল।
শাপলা হেসে ফেলল। তার গালে লজ্জার আভা। “ঘুম ভেঙে গেছে তো, তাই উঠছি। সবাই হয়তো জেগে গেছে।”
“না না… এত তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে দেব না তোমাকে,” বলতে বলতে সিয়াম চোখ খুলে তাকাল। তার চোখে ভালোবাসা আর একটু দুষ্টুমি মেশানো। “আরেকটু সময় আমার কা/.ছে থাকো।”
এই বলে সে শাপলাকে আরও কা/.ছে টে/.নে নিল। তারপর ধীরে ধীরে শাপলার কপালে, চোখে, আর অবশেষে ঠোঁট দুটিতে মধুর চু/.ম্ব/.ন বসিয়ে দিল। চু/.ম্ব./ন./টি এতটাই গভীর ও আবেগপূর্ণ যে শাপলার হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হয়ে উঠল। সিয়ামের আদরে শাপলার শরীরে মিষ্টি শিহরণ খেলে গেল। লজ্জায়, আনন্দে আর ভালোবাসায় তার গাল দুটি গোলাপের মতো লাল হয়ে উঠল। মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তটি যেন চিরকাল ধরে রেখে দিতে পারলে ভালো হয়।

কিন্তু লজ্জা সামলাতে না পেরে শাপলা হালকা করে সিয়ামকে সরিয়ে দিয়ে উঠে পড়ল। মুখ ভেংচি দিলো ।
সিয়াম হেসে বিছানায় শুয়ে রইল, চোখে এখনও সেই দুষ্টু হাসি।
শাপলা ওয়াশরুমে গিয়ে মুখ হাত ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল। চুলগুলো সুন্দর করে আঁচড়ে বেঁধে, ড্রয়িং রুমের দিকে চলতে লাগলো।
সকালের মিষ্টি রোদ এখন সবেমাত্র ড্রয়িং রুমের জানলা গলে এসে পড়েছে সোফাটায়। অলস একটা সকাল। শাপলা চলে এলো।
নীলাঞ্জনা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আড়মোড়া ভেঙে শাপলা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
_”কফি খাবে?”
শাপলা ছোট করে উত্তর এলো, _”না।”
নীলাঞ্জনা এদিক ওদিক তাকিয়ে সিয়ামকে না দেখে শাপলাকে জিজ্ঞেস করল,
_ “আচ্ছা, সিয়াম কোথায় ?”
_ “এখনো ঘুমাচ্ছে।”
এমন সময় হঠাৎ রান্নাঘর থেকে বিকট একটা শব্দ হলো। মনে হলো ভারী কোনো জিনিস মেঝেতে আছড়ে পড়েছে। আচমকা এই শব্দে ড্রয়িং রুমের গল্পগাছা নিমেষেই থেমে গেল। সবাই এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল।নীলাঞ্জনা শাপলার দিকে তাকিয়ে একটু চিন্তিত গলায় বলল,
_”যাও তো শাপলা, একটু গিয়ে দেখো তো রান্নাঘরে কী হলো!”
শাপলা দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে এলো। কিন্তু এখানে পা রাখতেই তার চোখ চড়কগাছ! একটা অচেনা ছেলে হন্তদন্ত হয়ে রান্নাঘরের জিনিসপত্র একটা বস্তায় ভরছে। ভয়ে আর বিস্ময়ে শাপলা চিৎকার করে উঠল,
_ “চোর! চোর! ঘরে চোর ঢুকেছে!”
চিৎকার শুনে ড্রয়িং রুম থেকে সবাই তড়িৎ গতিতে ছুটে এলো। ছেলেটি বেগতিক দেখে জানলা দিয়ে লাফিয়ে পালানোর চেষ্টা করল, কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। আরিফ ক্ষিপ্রতার সাথে তাকে জাপটে ধরে ফেলল। রাগত স্বরে বলল,

_ “তোর এত বড় সাহস! আমাদের বাড়িতে চুরি করতে এসেছিস?”
এই বলে সে ছেলেটিকে টে/নে হিঁ/চ/ড়ে ড্রয়িং রুমে নিয়ে এলো।
এতক্ষণে হট্টগোল শুনে চোখ ডলতে ডলতে সিয়ামও ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। চারপাশের পরিস্থিতি দেখে অবাক হয়ে সে প্রশ্ন করল,
_”কী হয়েছে এখানে?”
শাপলা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
_”চোর চুরি করতে ঢুকেছিল!”
পাশ থেকে কবিতা গম্ভীর মুখে রায় দিল,
_”একে এখনই পুলিশে দেওয়া দরকার। একদম সোজা থানা!”
পুলিশ শব্দটা শুনতেই চোর ছেলেটির আঁতকে উঠলো । সে এক ঝটকায় আরিফের পা জ/ ড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল,
_”দোহাই আপনাদের, আমাকে পুলিশে দেবেন না।”
বিরাজ একটু এগিয়ে এসে উপহাসের সুরে বলল,
_ “আইরে বাবা! এতই যখন পুলিশের ভয়, তাহলে চুরি করতে এলি কেন?”
ছেলেটি অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে ধরা গলায় বলল,
_”তাছাড়া আর কী করব বলুন? কত জায়গায় ঘুরেছি, কোথাও কোনো কাজ পাচ্ছি না। অভাবের তাড়নায় শেষমেশ এই পথটাই বেছে নিতে হলো।”

কলি অবশ্য ছেলেটির কথায় গলল না। সে বিরক্ত হয়ে বলল,
_”চোরের মুখে এত বড় বড় কথা! চোরের সাথে এত কথা না বাড়িয়ে পুলিশে সোপর্দ করো তো।”
কিন্তু নীলাঞ্জনার মনটা একটু নরম হলো। সে ছেলেটির দিকে এগিয়ে এসে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
_”কবে থেকে চুরি করা শুরু করেছ?”
ছেলেটি কেঁদে ফেলে বলল,
_”আজকেই প্রথম…”
কথাটা শোনামাত্র ড্রয়িং রুমের গুমোট পরিবেশটা হালকা হয়ে গেল। সবাই হোহো করে হেসে উঠল। শাপলা হেসে কুটিপাটি হয়ে বলল,
_”আহারে বেচারা! প্রথম দিনেই একেবারে হাতে নাতে ধরা পড়ে গেল!”
সিয়াম ছেলেটির সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে এখন কৌতুহল। সে নরম সুরে জিজ্ঞেস করল,
_ “তোর নাম কী রে?”
ছেলেটি নিচু স্বরে উত্তর দিল,
_”পলাশ।”
_”তোর বাড়িতে কে কে আছে?”
_”আমার মা আর একটা ছোট বোন আছে।”
_”পড়াশোনা কতদূর করেছিস?”
_”জি, ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি।”
সিয়াম একটু ভেবে বলল,

_ “আচ্ছা পলাশ, তোকে যদি একটা কাজ দেওয়া হয়, তুই আর চুরি করবি না তো?”
পলাশ চোখ মুছে বুকভরা আশা নিয়ে বলল, _”আমি কাজ পেলে আর কোনোদিন এই পথে পা বাড়াবো না, সত্যি বলছি!”
সিয়াম এখন আরিফের দিকে তাকিয়ে বলল, _”ভাইয়া, আমাদের গেটের জন্য তো একজন নির্ভরযোগ্য দারোয়ান দরকার ছিল। পলাশকে রাখলে কেমন হয়?”
আরিফ একটু ইতস্তত করে বলল,
_”আইডিয়াটা ভালোই। তবে যদি আবার চুরি করে পালায়?”
নীলাঞ্জনা পলাশের চোখের দিকে তাকাল। সেখানে কোনো কুটিলতা নেই, সে পলাশকে বলল,
_”তোমাকে যদি আমাদের বাড়ির গেটে দারোয়ানের কাজ দিই, তুমি করবে তো?”
পলাশ মাথা নেড়ে বলল,
_”হ্যাঁ, আমি মন দিয়ে কাজ করব।”
নীলাঞ্জনা একটু হেসে হুঁশিয়ারি দিল,
_”সাবধান, আবার যেন চুরি টুরি করো না!”
সিয়াম এসে পলাশের কাঁধে হাত রেখে বলল,
_ “ঠিক আছে, তাহলে কাল সকাল থেকেই তুমি দারোয়ানের কাজে যোগ দিচ্ছ।”
পলাশ কৃতজ্ঞতায় চোখ মুছতে মুছতে ড্রয়িং রুম থেকে চলে যেতে উদ্যত হলো। হঠাৎ নীলাঞ্জনা পেছন থেকে ডাকল,

_ “এই, দাঁড়াও!”
পলাশ থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকাল।
নীলাঞ্জনা জিজ্ঞেস করল,
_ “সকালে কিছু খেয়েছ?”
পলাশ মাথা নিচু করে বলল,
_ “না।”
নীলাঞ্জনা বাড়ির ভেতরের দিকে ইশারা করে বলল,
_ “তাহলে সকালের খাবারটা খেয়ে তারপর যাও।”
এই দৃশ্য দেখে কবিতা মুখ বাঁকিয়ে, একটু ভেংচি কেটে ফিসফিস করে বলল,

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫৯

_”এই বাড়িতে যে আরও কত নাটক দেখতে হবে কে জানে! চোর এলো চুরি করতে, পেয়ে গেল চাকরি! এখন আবার জামাই আদরে ব্রেকফাস্টও খাবে!”
কবিতার কথায় আবারও একটা হাসির রোল বয়ে গেল ড্রয়িং রুমে। এরপর সব রাগ ক্ষোভ ভুলে, এক অদ্ভুত আনন্দঘন পরিবেশে সবাই মিলে একসঙ্গে সকালের নাস্তা করতে বসে গেল। এক চোরের জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো এভাবেই।

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here