শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৭
আয়েশা শেখ
বউ অন্য স্যারের সাথে কথা বলায় রেগে থা*প্পড় মে’রে প্রফেসর বারিশ এমুহূর্তে নেশায় বেসামাল হয়ে স্ত্রীর বুকেই মুখ গুঁজে পড়ে আছে।
বিরক্ত হয় ঝিলমিল। বিয়ের এতগুলো দিন কেটে গেলেও আজকের আগে লোকটা কখনো এতটা কাছাকাছি আসেনি। কিন্তু আজ এসেছে নিজের সবটুকু পশুপনা আর অবাধ্যতা নিয়ে। মাতাল লোকটার ঠোঁটের কোণে একটাই বাক্য বারবার আছড়ে পড়ছে,
— ‘সরি সিয়েনা…’
ঝিলমিল জানে লোকটা নিজের হুঁশে নেই, চেতনাহীনতায় ডুবে আছে। তবুও গলার সমস্ত ঝাঁজ ঢেলে ক্ষোভ উগরে দিল সে,
— ‘গায়ে হাত তুলে এখন আবার এসে মাতলামি করা হচ্ছে? সরি বলা হচ্ছে? দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার, সরুন বলছি!’
সরে যাওয়া তো দূরের কথা, বারিশ তার শক্ত বাহু দুটো দিয়ে আরও শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল স্ত্রীকে। পরিস্থিতি অন্যরকম মোড় নিচ্ছে দেখে ঝিলমিল খানিকটা ভয়ে ধমকে উঠল,
— ‘আপনি কোন সাহসে আমার এত কাছে এসেছেন? আমি কিন্তু এবার চি*ৎকার করে ঘরের সবাইকে ডেকে তুলব!’
—‘ করো।’
বারিশের উন্মত্ত শ্বাসপ্রশ্বাস আছড়ে পড়ছে ঝিলমিলের গলার খাঁজে। বিশাল অবয়বটা পুরোটাই ছোটখাটো মেয়েটার ওপর। চওড়া বুকের সমস্তটা ঝিলমিলের পেটের ওপর রেখে, তার কোমল উরু দুটোকে নিজের ভারি রানের চাপে পিষে রেখেছে। সতেরো বছরের ছিপছিপে শরীরটা সেই দানবীয় চাপের নিচে পড়ে এক ফোটা অক্সিজেনের জন্য হাঁসফাঁস করছে। লোকটার দাঁড়ির খসখসে স্পর্শ কাঁটা দিয়ে উঠছে ঝিলমিলের ত্বকে। মাতাল পুরুষটার এই অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ আর দানবীয় ভারে অবশ হয়ে আসতে লাগল ঝিলমিলের সমস্ত সত্তা।
বারিশ মেয়েটার গলার সংবেদনশীল ভাঁজে নিজের মুখট রেখেই ফের বিড়বিড় করল,
— তুমি মেরেছো আমায়!
বাকরুদ্ধ হয়ে গেল ঝিলমিল। এই লোক বলে কী? ঝিলমিল মেরেছে তাকে? সে লোকটাকে ঠেলে সরানোর জন্য হাতের নরম তালু দুটো চেপে ধরল বারিশের শক্ত বুকে। কিন্তু তার এই ছোট্ট হাতের চাপ বারিশের ওই পাথুরে শরীরে এতটুকুও নাড়া দিতে পারল না। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডের ভয়ার্ত দাপাদাপির মাঝেই সে অস্ফুটে বলে উঠল,
— ‘আমি? আমি আপনাকে মেরেছি?’
বারিশ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না। তার ভেতরের মানসিক ক্লান্তি আর নেশার আবেশে চোখ দুটো বুজে আসছে। সে অন্ধের মতো ঝিলমিলের হাতটা চেপে ধরে টেনে এনে বসিয়ে দিল নিজের বুকের ঠিক বাঁ-পাশে। সেখানকার স্পন্দনটা সাধারণ কোনো হৃদস্পন্দন ছিল না। মনে হচ্ছিল, ক্ষুব্ধ কোনো জন্তু মানুষটার বুকের খাঁচাটা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। যুবকের ওই চওড়া বুকের পশম আর পাতলা শার্টের আড়াল টপকে সেই প্রলয়ঙ্করি তোলপাড় ধরা পড়ল ঝিলমিলের হাতের তালুতে। ভেতর থেকে আসা গভীর এক করুণ আর্তনাদকে কণ্ঠনালীতে চেপে রেখে বারিশ বলে উঠল,
—‘হ্যাঁ, আমি… আমি কষ্ট পেয়েছি। এইখানটায়… ঠিক এইখানটায় ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।’
বারিশের ওই দানবীয় শরীর আর অদম্য হিংস্রতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা করুণ কাতরতা দেখে ক্ষনিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল ঝিলমিল। তবু শক্ত গলায় কোনো মতে উচ্চারণ করল,
—‘ আপনি আমাকে মেরেছেন। গুনে গুনে দুটো থা’প্পড় মেরেছেন।’
—‘কিন্তু ম*রে তো আমি যাচ্ছি, সিয়েনা! ইটস কি*লিং মি ব্যাডলি…’
ঝিলমিল লোকটার এই বাক্যের মর্মার্থ বুঝল কি না কে জানে! এখন পর্যন্ত সে কেবল ওই প্রকাণ্ড দেহটাকে নিজের ওপর থেকে ঠেলে সরানোর আপ্রাণ চেষ্টাতেই ব্যস্ত। প্রফেসরের চওড়া বুকের ওপর রাখা তার নরম হাত দুটো অনবরত ব্যাকুল হয়ে পথ খুঁজছে। অবশেষে কোনো উপায় না পেয়ে, নিজের গলার খাঁজ থেকে প্রফেসরের মুখটা তোলার জন্য লোকটার মাথার চুলগুলো শক্ত হাতে আঁকড়ে টেনে ধরল সে। বারিশ নিজে থেকেই ধীরে ধীরে মুখটা তুলে ঝিলমিলের দিকে তাকাল। নেশার ঘোর লেগে থাকা ঘোলাটে চোখ দুটো কেমন যেন বেসামাল, থমথমে। কূল হারানো কোনো অবুঝ শিশুর ন্যায় ব্যাকুল কাঙালপনা লেগে আছে দৃষ্টিতে। যেন সামনে থাকা কিশোরীই তার একমাত্র আশ্রয়!
সেই অতল, ঘোলাটে আর একঘেয়ে দৃষ্টির মুখোমুখি হতেই নিমেষের মধ্যে থমকে গেল ঝিলমিল। চুলে আঁকড়ে রাখা তার হাতের শক্ত বাঁধনটা নিমেষে শিথিল হয়ে এলো। প্রফেসরের এই উগ্র ভাঙাচোরা রূপটা অনাকাঙ্ক্ষিত এক শিউরে ওঠা কাঁপন তুলে দিল সপ্তদশীর বুকের ভেতর। বেশ কিছুক্ষণ নীরবতার পর, ঝিলমিল নিজের কাঁপতে থাকা গলায় খুব ধীর, মৃদু আওয়াজে বলল,
— ‘স-সরুন…’
কিন্তু এবারও সরার কোনো নামগন্ধ দেখাল না বারিশ। তার ঘোর লাগা দৃষ্টি নেমে এলো কিশোরীর দ্রুত ওঠানামা করা বুক আর পাঁজরের ওপর। হাঁসফাঁস করতে থাকা সেই বুকটার দিকে এক পলক চেয়েই, পরক্ষণেই আবারও সে মুখ গুঁজে দিল ঝিলমিলের গলার উষ্ণ খাঁজে। ডান হাতটা অবলীলায় মেয়েটার তলপেটের কাছে নিয়ে এসে টি-শার্টের ভেতর ঢুকিয়ে দিল সে। অতঃপর তার গলায় নাক ঘষে ঘষে মৃদু-জোরালো গলায় অস্ফুটে গেয়ে উঠল,
— ‘কাটব সাঁতার তোমার অথৈ নদীর জলে,
সুখের ছোঁয়া দেব তোমায়, নাও না বুকে টেনে…’
বলতে বলতে ঝিলমিলের গলায় আলত করে কামড় বসিয়ে দিলো। বিদ্যুতের ঝটকায় তড়িৎ বেগে মাতাল লোকটার হাতটা চেপে ধরল ঝিলমিল। উদর থেকে সেই পুরুষালী হাতখানি সরিয়ে দিল সর্বশক্তি প্রয়োগে। আকস্মিক এই স্পর্শ আর দানবীয় উপস্থিতিতে চোখ দুটো জলে ভরে এলো তার, ভীষণ কান্না পাচ্ছে মেয়েটার! একে তো এই বিশালাকার ভারি শরীরের নিচে পিষে যাচ্ছে, তার ওপর লোকটা শুরু করেছে এই বেপরোয়া অসভ্যতা!
তবে হাত সরিয়েও খুব একটা লাভ হলো না। বারিশ আবার তার ভারী মাথাটা তুলে অন্ধকারের মধ্যেই ঝিলমিলের দিকে তাকাল। অন্ধকারের থমথমে নীরবতায় বারিশের ঘোর লাগা দৃষ্টি এবার ঝিলমিলের ভেজা চোখের ওপর থেকে ধীরে ধীরে নেমে এলো তার ঠোঁটে।
ঘরের নিভু নিভু আবছা আলোতেও কিশোরীর সেই পাতলা, নিখুঁত দুটি ঠোঁট স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। কৃত্রিমতার প্রলেপহীন, তাজা গোলাপের কুঁড়ির ন্যায় ছোট, নরম সেই ঠোঁট দুটো তখন দ্রুত হাঁপানোর দোলায় থরথর করে কাঁপছে। অন্ধকারেও ঠোঁটের সেই হালকা কাঁপনটুকু যুবকের বুঁদ হয়ে থাকা চেতনাকে কেমন যেন টেনে ধরল অদম্য আকর্ষণে। ছড়াচ্ছিল অদ্ভুত এক ব্যাকুলতা।
বারিশ ভ্রুতে সামান্য ভাঁজ ফেলে পলকহীন সেদিকে চেয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। গলার ভেতরের শুষ্কতা মেটাতেই যেন একবার শুকনো ঢোক গিলল সে। তারপর অত্যন্ত ধীরগতিতে নিজের মুখটা স্ত্রীর ঠোঁটের দিকে নামিয়ে আনতে লাগল। ঝিলমিলের পুরো শরীর নিমেষে শক্ত হয়ে কাঠ হয়ে গেল। লোকটার তপ্ত, মদের গন্ধে ভরা ঘন শ্বাস এসে পড়তেই তার বুকের ভেতর অলৌকিক এক ভয়ের কাঁপন বয়ে গেল, শিউরে উঠল গায়ের পশম। আতঙ্কে চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল কিশোরীর। স্বামীর ঠোঁটের সামান্যতম উষ্ণ স্পর্শ তার ঠোঁট ছুঁতে না ছুঁতেই, ভেতর থেকে এক অমানুষিক জোর পৈশাচিক শক্তিতে জেগে উঠল ঝিলমিলের।
অবশিষ্ট শক্তিটুকু জড়ো করে করে সে দুই হাতে বারিশের বুক ঠেলে এক ঝটকায় সরিয়ে দিল। ভারী দেহটা সেই আচমকা ধা’ক্কা সামলাতে না পেরে সরাসরি খাট থেকে নিচে মেঝের ওপর ধপাস করে পড়ে গেল। পড়েই হালকা গুমরে ওঠা আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ল বারিশের গলা দিয়ে। পরক্ষণেই ফ্লোরে চিত হয়ে শুয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল সে।
ঝিলমিল হাঁসফাঁস করতে করতে খাটের ওপর উঠে বসল। বুকটা তার আগুনের মতো জ্বলছে, দ্রুত হাঁপাতে হাঁপাতে খাটের প্রান্ত থেকে সামান্য ঝুঁকল সে। ফ্লোরে পড়ে থাকা মাতালটার দিকে একরাশ ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে থেকে গলার সবটুকু বিষ ঢেলে বিড়বিড় করে উঠল,
— ‘অস*ভ্য লোক একটা! কত বড় সাহস!’
কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না। নিথর হয়ে পড়ে আছে লোকটা। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার পর ঝিলমিলের ক্ষোভের জায়গায় ধীরে ধীরে এসে জমা হলো ভয় আর ধোঁয়াশা। লোকটা কি মাথায় চোট পেল ভীষণ? এত শান্ত কেন? দ্বিধা নিয়ে সে খাটের আরেকটু প্রান্তে ঘেঁষে এল। সাবধানে হাতটা নিচে বাড়িয়ে দিল বারিশের নাকের কাছে। নাক দিয়ে শ্বাস পড়ছে কি না একটু দেখার জন্য।
তক্ষুনি বিদ্যুতের মতো বারিশের একটা হাত ঝিলমিলের বাড়িয়ে রাখা কবজি আঁকড়ে ধরল! চোখ বন্ধ রেখেই এক হ্যাঁচকা টানে খাটের ওপর থেকে ঝিলমিলকে সোজা এনে ফেলল নিজের বুকে। আকস্মিক এই পতন আর টানে ঝিলমিল চিৎকার করে উঠল,
— ‘আরে…!’
কথাটা শেষ হলো না। ফ্লোরে চিত হয়ে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই বারিশ নিজের মজবুত দুই বাহুর বন্ধনে জড়িয়ে ফেলল মেয়েটাকে। প্রকাণ্ড দুটো হাত দিয়ে লোহার শেকলের মতো ঝিলমিলকে নিজের বুকের ওপর শক্ত করে চেপে ধরে রাখল সে।
ঝিলমিল সঙ্গে সঙ্গে ব্যাকুল হয়ে ছটফট করতে লাগল, কনুই দিয়ে লোকটার পাঁজরে গুঁতো মেরে নিজেকে ছাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে চালাতে বলল,
— ‘ছাড়ুন বলছি! ছাড়ুন আমাকে!’
বারিশ চোখের পাতা খুলল না। শুধু স্ত্রীকে বুকের সঙ্গে আরও একটু আঁকড়ে ধরে খিন ঘেরঘেরে গলায় বিড়বিড় করে উঠল,
— ‘চুপ… একদম ছটফট কোরো না। মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে… একটু স্থির হতে দে আমাকে, প্লিজ…’
ঝিলমিলের ঘুম ভাঙল জানালা ভেদ করে বাহিরের আলো চোখে লাগায়। চোখ খুলেই টের পেল, সে এতটুকু নড়তে পারছে না।
কাল রাতে এত হুটোপুটি, এত চেষ্টা করেও কিন্তু লোকটার বাঁধন থেকে এক ইঞ্চিও সরতে পারেনি। ক্লান্তিতে আর অসহায়ত্বে মাথাটা তার বুকে রেখেই ঘুমের দেশে তলিয়ে গিয়েছিল একসময়।
এখনও ঠিক সেভাবেই আটকে আছে সে। মুখের একদম কাছে বারিশের বুকের মৃদু ওঠানামা চলছে। অদ্ভুত এক উষ্ণ নিঃশ্বাস গায় এসে লাগছে। ঝিলমিল এক মুহূর্ত নিশ্বাস বন্ধ করে রইল। তারপর খুব সাবধানে, নিঃশব্দে এক ইঞ্চি এক ইঞ্চি করে আলগোছে নিজেকে ছাড়িয়ে আলাদা করে নিল সে।
বারিশ তখনো অঘোরে ঘুমোচ্ছে। মাঝারি লম্বা চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে, ঢেকে দিয়েছে চোখের কোণ পর্যন্ত। ঘুমন্ত মুখটায় রাতের সেই উগ্রতা বা তীব্রতা কিচ্ছু নেই, কেমন একটা অদ্ভুত অস্থিরতার ছাপ লেগে আছে। ঝিলমিল আর সেখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করল না। সোজা উঠে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমে ঢুকে ভেতরের দরজাটা বন্ধ করে দিল।
বেসিনের বেসিন-কলটা ছেড়ে ঠান্ডা জল মুখে দিতেই সে চমকে উঠল। নাকে এলো টম ফোর্ড পারফিউমের নেশা ধরানো সেই ভারী, কাঠ-কাঠ ঘ্রাণটা যা সারারাত বারিশের গায়ে ছিল। তা এখন ঝিলমিলের নিজের গায়ে, পোশাকে, এমনকি ত্বকে পর্যন্ত একদম লেপ্টে ভেসে আসছে।
সে বাহিরে এসে একটা কালো রঙের পালাজো কূর্তি সেট বের করে নিলো। হাঁটু পর্যন্ত লম্বা কুর্তিটির গায়ে সোনালি রঙের ছোট ছোট মোটিফের কাজ করা। কুর্তির সঙ্গে পড়ে নিলো একই রঙের ঢিলেঢালা ওয়াইড-লেগ পালাজো। তারপর গলায় আলগোছে জড়িয়ে নিল পাতলা কালো দুপাট্টা। এগুলো বারিশই সেদিন কলেজ থেকে ফেরার সময় কিনে দিয়েছিল। আর বলেছিল রুম থেকে বের হওয়ার সময় কোনো টি-শার্ট পড়া চলবে না। সেটাই মানল আজ ঝিলমিল। চুল গুলো পেছনে বেঁধে বাসা থেকে বের হয়ে গেল।
সকাল সকাল অফিসে এসেই কোম্পানির অন্যতম টপ এক্সিকিউটিভ রনির ডেস্কের সামনে গিয়ে বেশ চঞ্চল ভঙিতে কথা বলছে দীঘি। স্মার্ট, সুদর্শন ফারহান এই অফিসে বেশ ভালো একটা স্ট্র্যাটেজিক পজিশনে আছে।
— ‘দীঘি তুমি অফিসে জয়েন করবে এটা আমার কল্পনারও বাহিরে ছিল।’ রনি দীঘিকে বলল। সে এতদিন ছুটিতে ছিল। ছুটি শেষ করে আজই এসেছে।
— ‘আমারও।’ দীঘি বলল। দীঘি যেন কারও অপেক্ষা করছে সেভাবেই বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে।
— ‘ কাজে কতটুকু মন দিয়েছ? ম্যাডাম কিন্তু ফাকি দেওয়া পছন্দ করে না। সেখানে তুমি তার মেয়ে।’
— ‘ আমাকে নিয়ে এত ভেবো না। আমি ঠিক সব সামলে নেব।’ দীঘির দৃষ্টি এখনও দরজায়। কাউকে আসতে দেখেই রনির ডেস্কের দিকে ঝুঁকে পড়ল। বলল,
— ‘চলো আজ অফিস শেষে একটা কফি ডেট হয়ে যাক।’ আকস্বিক এমন আচরণে ঘাব্রে গেল খাটিকটা রনি। চোখ আটকাল দীঘির ফর্সা গলায়। দাড়িয়ে পড়ল। বলল,
— ‘অ-অবশ্যই। তোমার প্রস্তাব আমি ফেরাতেই পারি না।’
দরজার কাচ ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই তাহসিনের চোখ পড়ল দীঘি আর রনির উপর। সাদা ফর্মাল শার্ট গায়ে। চোখে থমথমে গাম্ভীর্য। তাহসিনের পায়ের গতি এক সেকেন্ডের জন্য স্লো হয়ে যায়। তাহসিনের চোয়ালের পেশিগুলো শক্ত হয়ে ফুট উঠে আবার বসে গেল। দেখতে পাচ্ছিল রনি কেমন চোখ দিয়ে দীঘির শরীর গিলে খাচ্ছিল।
কিন্তু মুখে কিচ্ছু প্রকাশ করল না সে। গটগট করে হেঁটে দীঘির গা ঘেঁষে যাওয়ার সময় একবার বরফের মতো ঠাণ্ডা, ধারালো নজর বুলাল দীঘির ওপর। অতঃপর নিজের সহকারীর পাশে সাধারণ এক ডেস্কে এসে বসতে বসতে ঠোঁটে তাচ্ছিল্য ফুটিয়ে বিড়বিড়াল,
— ‘অল উইমেন আর দ্য সেম।’
থানার কাঠের টেবিলের ওপাশে বসে আছেন ইনস্পেক্টর ইমন খান। হাতের সামনে রাখা মোটা ফাইলের পাতায় দ্রুত কলম চালাচ্ছে, মাঝে মাঝে ল্যান্ডলাইনের রিং বাজতেই রিসিভার কানে তুলে সংক্ষেপে দু-একটা নির্দেশনা দিয়ে আবার কাজে ডুব দিচ্ছে। ফাইলের দিকে মনোযোগ দিতেই নারী কন্ঠ কানে ভেসে এলো তার।
দৃষ্টি তুলতেই তার চোখে ধরা দিল কুচকুচে কালো কুর্তি পরিহিতা এক রমণী। শুভ্র ফর্সা গায়ের রঙে কালো কাপড়টা যেন আরও বেশি ফুটে বেরোচ্ছে। ছিপছিপে গড়ন, টিকলো নাক আর হালকা পাতলা গড়নের মাঝেই রূপটা চোখ ধাঁধানো। হ্যাজেল চোখের মণির চোখ দুটোতে বেশ অস্থিরতা।
—‘ জি, আপনার নাম?’ অফিসার ইমন মেয়েটার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল।
মেয়েটি নিজের ওড়নার খুঁটটা আঙুলে শক্ত করে পেঁচিয়ে নিয়ে ধীর গলায় বলল,
— ‘ আমার নাম জাহানারা চৌধুরী ঝিলমিল। আমি একটা অভিযোগের জন্য এসেছি।’
ইমন আবারও ফাইলে নজর দিয়ে সাইন করতে করতে বলল,
— ‘কীসের অভিযোগ? বসুন…’
ঝিলমিল বসল না, একইভাবে দাঁড়িয়ে থেকে গালের দু’পাশে হাত বুলালো। মনে পড়ল কাল রাতের কথা। শুকনো ঠোঁট দুটো একবার ভিজিয়ে নিয়ে ক্ষোভভরা গলায় বলল,
— আমার স্বামী… উনি কাল রাতে আমার গায়ে হাত তুলেছেন। আমাকে দুটো চ*ড় মে”রেছেন। আমি কিছুই করিনি।
অফিসার ইমনের কলম থেমে গেল৷ বিস্মিত চোখে তাকাল মেয়েটার দিকে। এই মেয়ে বিবাহিত? তাও আবার স্বামীর নি*র্যা”তন সহ্য করছে!
ইমন ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
— ‘আপনার বয়স কত?’
ঝিলমিল একটু ইতস্তত করে বলল,
— ‘সতেরো।’
— ‘কিহ?’
ঝিলমিল তড়িঘড়ি মুখে হাত দিয়ে শুধরে নিল,
— ‘না, না! আঠারো… আমার বয়স আঠারো।’
ইমন এক মুহূর্ত মেয়েটির মুখের অস্থিরতা মেপে নিয়ে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল,
— ‘নাম কী আপনার হাজবেন্ডের?’
— ‘প্রফেসর ফাইজান বারিশ শেহরিয়ার।’
কিশোরীর মুখ থেকে এই ভারিক্কি নামখানা শুনতেই ইমনের মুখের সব অবাক ভাব যেন এক নিমেষে ধুয়েমুছে গেল। যেন অবাক হওয়ার মতো কিছুই শোনেনি। একদম না। যেন এটা খুব স্বাভাবিক। তবে এটা ভেবে খারাপ লাগছে, এমন একটা ননির পুতুলকে কীভাবে একটা মানুষ মা”রতে পারল? পরক্ষণেই আবারও সবকিছু স্বাভাবিক ভাবে নিয়ে নিলো।
কলমের ক্যাপটা ডেস্কে হালকা ঠুকে ইমন একদম নিস্পৃহ গলায় বলল,
— ‘তো, আপনি ঠিক কী চান এখন? ওনার নামে জি*ডি করবেন, নাকি সরাসরি নি*র্যা”তনের মা*মলা ঠুকবেন? নাকি আমরা থানায় ডেকে একটা ওয়ার্নিং দেব?’
—‘ স্ত্রী ও শিশু নি*র্যাত”নের মা*মলা দিতে চাই।’
ইমন চোখ দুটো সামান্য সরু করে জিজ্ঞেস করল,
— ‘শিশু? আপনার না বয়স আঠারো?’
ঝিলমিল চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল,
— ‘ইয়ে মানে… সামনে আঠারো হবে। হয়নি এখনও। আর আঠারো বছরের আগে প্রত্যেকেই শিশু।’
— ‘সত্যি মামলা করবেন, নাকি রাগের মাথায় এসেছেন?’
— ‘আমি জেনেবুঝেই এসেছি, অফিসার। আমার কোনো ভুল ছিল না, তাও উনি গায়ে হাত তুলেছেন।’
— ‘নিজের বাসায় বলেছেন?’
— ‘না, বলা যাবে না। বললে তারা আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। আমি আমার স্বামীর বাড়ি ছেড়ে যেতে চাই না।’
ইমন কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল মেয়েটির দিকে। এমন অদ্ভুত কেস সে জীবনে কমই দেখেছে। স্বামীর নামে কেস ঠুকতে এসেছে, আবার স্বামীর বাড়ি ছাড়তেও রাজি নয়! তবে প্রফেসর ফাইজান বারিশ যেখানে জড়িত, সেখানে এমন অদ্ভুত ঘটনা বোধহয় খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।
ইমন ড্রয়ার খুলে একটা সাদা পাতা আর কলম এগিয়ে দিয়ে বলল,
— ‘বেশ। কিন্তু মেডিকেল রি”পোর্ট ছাড়া শুধু দুই চড়ের ওপর ভিত্তি করে না”রী ও শি”শু নি”র্যাত*নের কড়া ধারা বসানো যাবে না। আপনি কাল রাতের পুরো ঘটনাটা বিস্তারিত লিখে নিচে সই করুন। তবে তার আগে আবার ভেবে দেখুন।’
ঝিলমিল মুখটা একটু কাচুমাচু করে গালটা সামান্য এগিয়ে দিয়ে বলল,
— ‘কিচ্ছু ভাবতে পারব না! গাল দেখুন আমার, এখনও লাল হয়ে আছে।’
ঝিলমিল গম্ভীর মুখে পাতায় কাল রাতের ঘটনা বিস্তারিত লিখতে শুরু করল। এদিকে ইমন কোনো কথা না বাড়িয়ে কাঠের টেবিলের ওপর রাখা ল্যান্ডলাইনের রিসিভারটা তুলে নিল। পরিচিত একটা নম্বরে স্পিড ডায়াল করে কানে ফোনটা ঠেকাল সে।
ফ্লোরে অবচেতন অবস্থায় এখনও পড়ে আছেন বারিশ। হঠাৎ বেডের একপাশে রাখা মোবাইল ফোনটা উচ্চশব্দে বেজে উঠল।
একবার, দু-বার, তিনবার…
টানা কয়েকবার রিং হওয়ার পর বারিশের চোখের পাতা দুটো ধীরে কেঁপে উঠল। চেতনা ফিরতেই কপালের রগ দুটো হালকা চাবুক মারার মতো ব্যথায় টনটন করে উঠল তার। সে চোখ না মেলেই অতি কষ্টে হাত বাড়িয়ে ফোনটা কাছে টেনে এনে কল রিসিভ করল সে। ভারী গলায় বলল,
— ‘ হ্যালো..
— ‘প্রফেসর ফাইজান বারিশ? আমি মডেল থানা থেকে ইনস্পেক্টর ইমন বলছি। আপনার অর্ধাঙ্গিনীর পক্ষ থেকে আপনার বিরুদ্ধে স্ত্রী ও শি”শু নি*র্যা”তনের অ*ভিযোগ আনা হয়েছে। আপনি নিজে থেকে থানায় আসবেন, নাকি ফোর্স পাঠাব?’
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৬
কথাটা কানে পৌঁছাতেই বারিশের বন্ধ চোখ দুটো নিমেষে খুলে গেল। চোখের ভেতরের অবচেতন ভাবটা মুহূর্তে হাওয়া হয়ে সেখানে জায়গা নিল তীব্র বিস্ময় আর চরম বিরক্তি। সে ধড়ফড়িয়ে ফ্লোর থেকে উঠে চারপাশ নজর বুলিয়ে দেখল। বিশাল রুমটা সম্পূর্ণ ফাঁকা, কোথাও ঝিলমিলের অস্তিত্ব নেই।
কথা না বাড়িয়ে বারিশ কলটা কেটে দিল। হাতের মোবাইল ফোনটা বিছানার ওপর ছুড়ে ফেলে কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে উঠল,
— ‘ হোয়াট দ্য হেল! এই মেয়ে আমাকে পাগল করে দেবে!’
