শেহেজাদার আদর পর্ব ১৬
সুমাইয়া ইসলাম নূর
সকালের নরম রোদ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো চৌধুরী ভিলা জুড়ে…
চারপাশে আজ অন্যরকম ব্যস্ততা…
বাড়ির সামনে রঙিন কাচা ফুল সাজানো হচ্ছে গেটে আলপনা দিচ্ছে কিছু আর্টিস্ট। বাগানে মানুষের যাওয়া-আসা
রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে নানারকম খাবারের গন্ধ ঢাকার নামকরা কিছু শেফ তিনটা দিন চৌধুরী বাড়ির সমস্ত রান্না তারা করবে।
হাসি, ডাকাডাকি, খুনসুটি—সব মিলিয়ে যেন উৎসব নেমে এসেছে চৌধুরীরি ভিলাই
আর একটু পরেই শুরু হবে—
রিমঝিমের গায়ে হলুদ।
তাই সকাল সকাল সবাই নাস্তা সেরে রেডি হতে ব্যস্ত।
ইউভি আগেই বাড়ির সব মেয়েদের জন্য ২৫টা পার্লার বুকিং করে রেখেছে বারিতে এসেই সাজিয়ে দিয়ে যাবে
যাতে কারও সাজে কোনো কমতি না থাকে।
এইদিকে ইনায়ার রুমেও জমে উঠেছে আলাদা হুল্লোড়…
ইনায়া, পিয়াসা, সাম্মি আর রানি রেডি হওয়ার তোড়জোড়ে ব্যস্ত।
কেউ ড্রেস বের করছে, কেউ গয়না মিলাচ্ছে, কেউ মেকআপ সাজাচ্ছে।
ঠিক তখনই—
পিছন থেকে দুটো হাত এসে ইনায়ার চোখ ঢেকে দিল।
ইনায়া হাত দুটো ছুঁয়েই হেসে বলল—
শয়তানের নানি
এমন ফড়িং মার্কা হাতের মালিক যে শুধু আমার বেবিই এইটা আমি জানি।
তুবা হেসে চোখ ছেড়ে দিল।
সাথে সাথেই পিয়াসা এসে তুবাকে জড়িয়ে ধরে বলল—
তুই আসছিস এত দেরি করলি কেন?
বাল তাড়াতাড়ি রেডি হ।
ফুপি তোকে হলুদের জন্য যে শাড়িটা গিফট করেছে— ওইটাই পরবি।
তুবা, সাম্মি আর রানিও তখন খুনসুটি করতে করতে হলুদের জন্য রেডি হতে লাগল।
রুম ভরে গেল হাসি আর মেয়েদের চেঁচামেচিতে।
এইদিকে—
ইউভি, রেদোয়ান, রাজ্জো, রেসোব আর চৌধুরী বাড়ির সব কর্তারাও ভীষণ ব্যস্ত।
একমাত্র ফুপির বিয়ে বলে কথা—
কোনো কমতি রাখতে রাজি না ইউভি
চারপাশের মানুষ অবাক হয়ে দেখছে—
চৌধুরী বাড়ির সাজসজ্জা দেখে যে কেও বলবে একটা ছোটখাটো রাজপ্রাসাদ।
আত্মীয়-স্বজনের আসা-যাওয়ায় পুরো বাড়ি মুখর হয়ে আছে।
আর ইউভি শুধু বাড়ির অনুষ্ঠানেই থেমে থাকেনি
গরিব, দুঃখী মানুষদের জন্যও বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করেছে।
তার একটাই কথা—
আমার পির খুশির দিনে কেউ যেন খালি হাতে না ফেরে।
ইনায়া শাড়ি পরে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই নিজেই অবাক হয়ে গেল…
মাত্র পাঁচ ফিট উচ্চতার ছোট্ট গড়নটা আজ যেন আরও নিখুঁত লাগছে…
ছিপছিপে কোমল শরীর, একদম পুতুলের মতো গড়া।
তার হলদেটে-ফর্সা গায়ের রঙে সকালের আলো পড়ে সোনালি আভা ছড়াচ্ছে…
মনে হচ্ছে শরীরজুড়ে নরম রোদ মেখে আছে।
গোলাপি আভা মাখা গাল দুটো লাজে আরও টকটকে হয়ে উঠেছে…
নাকটা ছোট্ট আর ধারালো…
ঠোঁট দুটো স্বাভাবিকভাবেই লালচে সবসময় যেন আলাদা করে রঙ ছোঁয়ানো।
চোখ দুটো বড় বড়, টানা আর গভীর
একবার তাকালেই যেন যে কেও থেমে যাবে।
পাপড়িগুলো ঘন আর লম্বা
চোখ নামালেই মনে হয় ছায়া নেমে আসে।
কোমর পর্যন্ত নেমে আসা ঘন হালকা লাল চুলগুলো হালকা ঢেউ খেলানো…
আজ সেই চুলে গাঢ় হলুদ ফুলের মালা গাঁথা
যেন রাতের আকাশে হঠাৎ সোনালি তারা ফুটেছে।
মাথায় ফুলের টিকলি দুই হাতে গাদা ফুলের গাজরা…
পায়ে আর হাতে লাল আলতা দিয়া
ছোট ছোট পায়ের পাতায় আলতা পড়ে আরও মায়াবী লাগছে তাকে।
হলুদ শাড়িটা তার ছোট্ট গড়নে এমন মানিয়ে গেছে—
যেন শুধু তার জন্যই বোনা হয়েছিল শাড়ি টা
মনে হচ্ছিল—
পাঁচ ফিটের কোনো মেয়ে না…
একটা ছোট্ট নরম পুতুল দাড়িয়ে আছে মনে হচ্ছে ছুঁয়ে ফেললেই মিলিয়ে যাবে।
পিয়াসা, তুবা আর সাম্মি একসাথে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল…
তারপর হঠাৎ পিয়াসা দুহাত কোমরে দিয়ে বলল
“বাহহ বেবি… তোকে তো চেনাই যাচ্ছে না আজ!
কার জন্য এমন সেজেছিস হুম?”
তুবা সাথে সাথে বললো
নিশ্চয়ই কোনো সিক্রেট কাহিনি আছে… না হলে আমাদের ইনায়া এভাবে সাজে?
সাম্মি হেসে বলল—
বল না কারে মেরে ফেলবি আজ?
ইনায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে খুব ভাব নিয়ে বলল—
আমার শেহেজাদার জন্য
তিনজন একসাথে চিৎকার করে উঠল—
কীইই?
পিয়াসা তাড়াতাড়ি এসে তার হাত ধরল কে সে? নাম বল।
ইনায়া চোখ টিপে বলল—
সময় হলে জেনে যাবি
এই বলেই সে হালকা দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল…
পেছনে তুবা আর পিয়াসার চিৎকার করে বললো
এই দাঁড়া আজকেই বলবি আমাদের
ইনায়া হাসতে হাসতে করিডোর দিয়ে এগিয়ে গেল…
চারপাশে সবাই ব্যস্ত… হলুদের সাজ, অতিথিদের আনাগোনা, গানের শব্দ…
কিন্তু তার চোখ শুধু একজনকেই খুঁজছে…
ইউভি…
সিঁড়ির পাশ তাকালো নাই বারান্দাই ও নাই বাগানে খুজলো সেখানে ও নাই।
ইনায়া মনে মনে বললো সালা গেলো কোই তিয়া আপুর সাথে নাই তো তিয়া আপু তো ফুপির রুমে রেডি হচ্ছিল ইসস উনি উইভি ভাইয়া কে আমার আগে শাড়ি পরা দেখাই দিলো।
না না আমি এ কি ভাবছি আমার যা করার আজ থেকেই শুরু করবো দারা রে পেকাটি নানি।
তবু ও ইনায়ার বুকের ভেতর অদ্ভুত কাঁপুনি উঠল…
শেষে ধীরে ধীরে ইউভির রুমের সামনে এসে দাঁড়াল।
দরজাটা আধখোলা…
ইনায়া কৌতূহল নিয়ে উঁকি দিতেই—
হঠাৎ ভেতর থেকে একটা শক্ত হাত ইনায়ার কবজি চেপে ধরল
আহ
এক টানে তাকে ভেতরে নিয়ে গেল কেউ…
দরজা বন্ধ হয়ে গেল সাথে সাথে…
ইনায়ার নিঃশ্বাস আটকে গেল যেন
আর সামনে তাকাতেই আর কেও না
ইউভি।
চোখে সেই দুষ্টু চাহনি
ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি নিয়ে বললো
আমার আদর।
ইনায়ার নিঃশ্বাস কেঁপে উঠল…
ইউভি বাইরে যেমন স্বাভাবিক থাকে, এখানে মুখে তার থেকে বেশি কঠিন ভাব ধরে রেখেছে…
কিন্তু চোখ দুটো তাকে অন্য কথাই বলছে।
মনে মনে ইউভি বলল—
আজ তোকে দেখে আমি শেষ আদর…
এভাবে সামনে এসে দাঁড়াস না…
আমার সব হিসাব নষ্ট হয়ে যায়।
কি মারাত্মক লোভনীয় লাগছে তোকে।
সে হঠাৎ ইনায়ার কোমরে হাত রেখে এক টানে আরও কাছে টেনে নিল…
ইনায়ার শরীর এসে ঠেকল তার বুকের সাথে।
ইনায়া কেঁপে উঠে ফিসফিস করে বলল—
কি করছেন…?
ইউভি নিচু হয়ে তার কানের কাছে মুখ এনে খুব আস্তে বলল—
কেন এসেছিস তুই?
একটু থেমে আরও নিচু গলায় বললো
নিজের কত বড় সর্বনাশ করতে এসেছিস জানিস।
ইনায়ার বুক ধকধক করছে…
কথা বের হচ্ছে না।
ইউভি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল
এভাবে সাজিস না…
নিজেকে সামলানো আমার পক্ষে কঠিন হয়ে যাবে।
তারপর হঠাৎ নজর গেল ইনায়ার আঁচলে কাছে কালো কিছু একটা দেখা যাচ্ছে।
সামনের ভাঁজ একটু সরে গেছে।
ইউভির চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।
মনে মনে বললো এই সব পড়া লাগে নাকি এই মেয়ের সবকিছু বেশি বেশি।
সে ধীরে আঁচলটা ঠিক করে টেনে দিল…
তারপর আঁচল থেকে ছোট্ট ক্লিপ খুলে নিয়ে খুব যত্ন করে শাড়ির সাথে এমনভাবে লাগিয়ে দিল, যেন একটুও ফাঁক না থাকে।
সব ঠিক করে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল—
এখন ঠিক আছে।
ইনায়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল…
ইউভি চোখ সরিয়ে নিল, যেন কিছুই হয়নি।
তারপর খুব আস্তে বলল—
তোকে দেখার অধিকার সবার না…
যতটুকু দেখা দরকার, ততটুকুই দেখবে সবাই।
ইনায়ার গাল লাল হয়ে উঠল…
আর ইউভি মনে মনে শুধু একটাই বলল
একদিন তোকে পুরোপুরি আমার করে রাখবো, আদর।
এইদিকে—
ইউভি ইনায়ার থেকে একটু সরে গিয়ে বলল—
তুই যা এখন আমি গোসল করবো।
ইনায়া অবাক হয়ে বলে—
কেন?
ইউভি বলল—
কারণ আমার গোসল ফরজ হয়ে গেছে তাই
ইনায়া বলল—
কেন?
ইউভি মনে মনে বললো
কবে কবে এতো বড় হয়ে গোলো সা*লি বাল এই দিকে আমি ছোট ভেবে ছেরে দিচ্ছি।
এই বলে ইউভি পেছন ঘুরে দাঁড়ায়…
ইনায়া ইউভির হাতের কনিষ্ঠ আঙুলটা ধরে টানে, যেটা সে ছোটবেলা থেকে ধরার অভ্যাস…
ইউভি নিজের হাতের দিকে তাকায়, তারপর ইনায়ার দিকে তাকায়…
ইনায়া বলে—
উভি ভাইয়া…
ইউভি বলে—
হুম বল… তোর ছোটবেলার অভ্যাস এখনো যায়নি নাকি?
ইনায়া বলে—
“উভি ভাইয়া… খুব ক্লান্ত লাগছে… একটু এনার্জি লাগবে…”
ইউভি বলে—
কিসের এনার্জি?
ইনায়া ইউভিকে জড়িয়ে ধরে, তার বুকে মাথা রেখে বলে—
এই যে আমার এনার্জি…
“উফ… শান্তি…
এই বলে ইনায়া দৌড়ে চলে যায় ইউভির রুম থেকে। এই দিকে দরজার আরাল থেকে কেও একজন সব কিছু দেখে ফেলে
মনে মনে বলে—
বিষয়টা এতদূর চলে গেছে… আর আমি চুপ করে আছি আজই সব শেষ করবো।
ইনায়া দৌড়াতে দৌড়াতে করিডোর দিয়ে যাচ্ছিল…
মাথার ভেতর তখনো ইউভির বুকের ধকধক শব্দ ঘুরছে…
ঠিক তখনই—
হঠাৎ সামনে কারও সাথে ধাক্কা খেল।
ধপ করে দুজনেই মেঝেতে পড়ে গেল।
“আহ!”
তিয়া সামলে উঠতেই তার ফোনটা ছিটকে গিয়ে ইনায়ার সামনে পড়ল।
ইনায়া তাড়াতাড়ি উঠে বসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—
“সরি আপু… আমি দেখতে পাইনি… আই’ম রিয়েলি সরি…”
সে ফোনটা তুলে দিতে হাত বাড়াল…
আর তখনই—
স্ক্রিনে চোখ পড়তেই তার হাত থেমে গেল।
ওয়ালপেপারে তিয়া আর ইউভির খুব কাছাকাছি ঘনিষ্ঠ মূহুর্তের একটা ছবি…
দুজনের মুখে হাসি।
ইনায়ার বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।
তিয়া ফোনটা হাতে নিয়ে ঠোঁটে হালকা দুষ্টু হাসি টেনে বলল—
নো প্রবলেম ইনায়া… আমিও তোমাকে দেখতে পাইনি।
একটু চুল ঠিক করে আবার বলল—
হঠাৎ ইউভি বললো, দুই মিনিটের মধ্যে আমার রুমে আসো।
হেসে চোখ টিপে বলল—
গোসল করবে বোধহয়… জানি না আবার কি লাগবে! আমাকে যে কত জ্বালায়… না জানি বিয়ের পর কি করবে!
এই বলে তিয়া নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে ইউভির রুমের দিকে হাঁটতে লাগল।
আর ইনায়া…
স্থির হয়ে বসে রইল মেঝেতে।
তার চোখ ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেল…
ঠোঁট কাঁপছে… শ্বাস আটকে আসছে।
মনে মনে বলল—
আমি… এটা কী দেখলাম আল্লাহ…?
তুমি এটা কেন করলে…?
আমার শেহেজাদা অন্য কারও সাথে…?
সে দ্রুত মাথা নাড়ল—
না না আমি ভুল দেখেছি হয়তো
কিন্তু পরের মুহূর্তেই বুকের ভেতর কেমন যেন করে ওটলো —
তিয়া আপু ওনার রুমে গেল…
আর উনি জানল কীভাবে ইউভি ভাইয়া এখন গোসল করবে?
নিশ্চয়ই ফোনে কথা হয়েছে…
তার মানে… সব সত্যি…
ইনায়া আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না।
চোখ ভরে পানি চলে এলো।
মনে কয়েক শত গালি দিল ইউভি কে।
বালের শেহেজাদা।
সব দিক দিয়ে পারফেক্ট হলেও ক্যারেক্টার বাজে।
ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে সে উঠে দাঁড়াল…
তারপর কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে চলে গেল বাগানের দিকে…
সকাল ঠিক ১২টা বাজে…
চৌধুরী ভিলার বিশাল বাগানের এক কোণায় রাজকীয়ভাবে সাজানো হয়েছে গায়ে হলুদের মঞ্চ…
হলুদ, গাঁদা ফুল, ঝাড়বাতি, রঙিন কাপড় আর তাজা ফুলের ঘ্রাণে পুরো জায়গাটা স্বপ্নের মতো লাগছে।
আরেক পাশে রাখা হয়েছে আবির খেলার আলাদা আয়োজন বাটি ভরতি নানান রংয়ের আবির চারপাশ জমে উঠেছে।
রাতে ছাদে হবে মেহেদির অনুষ্ঠান…
সেটার জন্যও আলাদা সাজ চলছে।
সবকিছুতেই যেন এক রাজকীয় ছোঁয়া।
এইদিকে তিয়া আর পিয়াসা পুরো রেডি হয়ে বাগানে এসে ইনায়াকে খুঁজতে লাগল…
কিন্তু কোথাও নেই।
তারপর সাম্মি আর রানিও যোগ দিল—
সবাই মিলে পুরো বাড়ি, করিডোর, বারান্দা, বাগান—সবখানে খুঁজেও ইনায়ার দেখা নেই।
ওদিকে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে…
এক এক করে সবাই রিমঝিমকে হলুদ মাখাচ্ছে…
তুবা বিরক্ত হয়ে বলল—
এই মেয়েটা আবার কোথায় গেল।
সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে পুকুরপাড়ের দিকে হাঁটতে লাগল।
ঠিক তখনই—
ধপ!
কারও সাথে সোজা ধাক্কা খেল।
তুবা সাথে সাথে চিৎকার করে উঠল—
কোন সালা রে।
সামনের মানুষটা হেসে বলল—
এই উপরে তাকাও… পাঁচ ফিট সাইজের তিয়া যেন বোকা বনে গেল।
তুবা মাথা উঁচু করে তাকাতেই দেখল— রাজ্জো।
চোখ রাগে বড় বড় করে তাকিয়ে আছে তিয়ার দিকে।
তুবা বললে এত বড়ো বড়ো চোখ তাও চোখে দেখেন না নাকি?
রাজ্জো দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে হেসে বলল—
তুমি কি চোখে দেখার মতো জিনিস?
তুবা ভ্রু কুঁচকে বলল—
মানে?
রাজ্জো গম্ভীর ভান করে বলল—
তোমাকে দেখতে হলে ওই যে… কি যেন বলেএকটু ভেবে বলল—
যেটা দিয়ে ছোট জিনিস বড় দেখা যায়
তুবা দাঁত চেপে বলল—
মাইক্রোস্কোপ!
রাজ্জো তালি দিয়ে বলল—
এই তো! নামটা তুমি নিজেই বলে দিলে।
তুবা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এগিয়ে এসে জুতার হিল দিয়ে রাজ্জোর পায়ে চাপ দিল।
রাজ্জো লাফিয়ে উঠে বললো
আহহ! এই মেয়ে খুন করবে না কি?
তুবা কোমরে হাত দিয়ে বলল—
ব্যস্ত আছি, না হলে দেখিয়ে দিতাম এই তুবা আহসান কি জিনিস!
রাজ্জো ব্যথার মাঝেও হেসে বলল—
দেখলাম তো… পুরো বিপদজনক জিনিস।
তুবা চোখ রাঙিয়ে বলল—
আর একবার কিছু বললে অন্য পায়েও দেব!
রাজ্জো পিছিয়ে যেতে যেতে বলল—
না না… শান্তি চাই… তোমার সাথে ঝগড়া করলে আমার আয়ু কমে যাবে।
তুবা নাক উঁচু করে চলে গেল…
রাজ্জো তার যাওয়া দেখে হেসে মনে মনে বলল—
ছোট প্যাকেটে বড় ঝামেলা।
এইদিকে— গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেছে… রিমঝিমের গায়ে শেষ হলুদের পরশ দিয়ে সবাই যখন হাসিখুশি ছবি তুলছিল, তখনই হঠাৎ খেয়াল হলো
ইনায়া কোথাও নেই।
শুরুতে সবাই ভেবেছিল— হয়তো রুমে গেছে… হয়তো তুবাদের সাথে আছে হয়তো ছাদে…
কিন্তু মিনিট কেটে ঘণ্টা ছুঁই ছুঁই— তবুও ইনায়ার কোনো খোঁজ নেই।
মুহূর্তেই পুরো চৌধুরী ভিলার আনন্দের রং বদলে গেল। বাগানে একে একে সবাই জড়ো হলো… কারও মুখে হাসি নেই সবার চোখে ভয়।
বাড়ির গিন্নিরা কান্না শুরু করে দিয়েছে লিখন চৌধুরী বলছে পুকুরপাড় দেখো রাতিব চৌধুরী বলছে গেটের বাইরে খোঁজ নাও।
রিমঝিম কাঁপা হাতে ফোন বের করে বলল— আমি পুলিশে ফোন দিচ্ছি…
ঠিক তখনই—
ইউভি রাগে দাঁত চেপে রেদোয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল—
রেদোয়ান… গিয়ে তোর চাচা লিখন চৌধুরীকে বলে দিস—
আমার আদরকে যদি আমি না পাই… তাহলে এই চৌধুরী বাড়ির শান্তি আমি শেষ করে দিবো… আই রিপিট… শেষ করে দিবো।
যে বাড়িতে আমার আদর নেই… সেই বাড়িতে হাসি থাকবে না… স্বস্তি থাকবে না…
এক ঘণ্টার মধ্যে আমি ওকে চাই আমার সামনে…
নাহলে সবাই দেখে নিবে— ইউভি চৌধুরী নিজের আদরের জন্য কতদূর যেতে পারে…
চারপাশ নিস্তব্ধ।
ইউভির চোখ লাল হয়ে গেছে চোয়াল শক্ত হয়ে হাতের রগ ফুলে উঠেছে
সে আবার ধীরে বলল—
“আমি কাউকে ছিনিয়ে নিতে চাই না… কিন্তু আমার জিনিস কেউ আটকে রাখলে… ছারে দিব না…
বলে দিস ধৈর্য ধরে আছি মানে দুর্বল না এই শেহেজাদা ইউভি চৌধুরী।
চারপাশে চাপা শোরগোল উঠতেই—
এইদিকে লিখন চৌধুরী গম্ভীর মুখে বসে ছিলেন তিনি ধীরে রেদোয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন—
রেদোয়ান… তুমিও গিয়ে তোমার ভাই শেহেজাদ ইউভি চৌধুরী কে বলে দাও—
আমার মেয়েকে আমি এক ঘণ্টার মধ্যে এই বাড়িতে চাই…
“নিশ্চয়ই তোমার ভাই আবার এমন কিছু বলেছে… এমন কিছু করেছে… যার জন্য আমাদের মেয়ে রাগ করে চলে গেছে
একটু থেমে আবার বললেন—
ভালোবাসা যদি থাকে… সম্মানও থাকতে হবে…
আমার মেয়েকে কষ্ট দিয়ে কেউ তাকে পাবে না…
“এক ঘণ্টা… শুধু এক ঘণ্টা সময় দিলাম…”
ঠিক তখনই
বাড়ির দারোয়ান এসে বললো ইউভি বাবা নূর মা তোমার বাইক নিয়ে কিছু সময় আগে বের হইছে
হঠাৎ গেটের সামনে বাইকের শব্দ
সবাই একসাথে তাকালো।
গেট খুলে ভেতরে ঢুকল ইউভির কালো বাইক।
আর বাইক থেকে নেমে একদম শান্ত মুখে… চুলে হালকা হাত বুলাতে বুলাতে … হাতে আইসক্রিম ধরে… ইনায়া হাঁটতে হাঁটতে ভেতরে এসে বলল—
“কি হয়েছে তোমরা এখানে কেন…?
শেহেজাদার আদর পর্ব ১৫
সবাই স্তব্ধ।
যাকে হারিয়ে ফেলেছে ভেবে পুরো বাড়ি পাগল হয়ে গেছে…
সে-ই আবার চিল মুডে বাড়ি ফিরে এলো।
পিয়াসা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলল—
“হারামজাদি! তুই কোথায় ছিলি?”
ইনায়া অবাক হয়ে বলল—
আমি তো মন্টুর দোকানের আইসক্রিম খাইতে গেলাম…”
তুবা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।
রিমঝিম কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরল।
আর ইউভি…?
