শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৫
সুমাইয়া ইসলাম নূর
রাতের আকাশটা তখনও কালো মেঘে ঢাকা।
মুষলধারে বৃষ্টি ধীরে ধীরে ঝিরিঝিরি হয়ে এসেছে। দূরের শহরের আলো বৃষ্টিভেজা কুয়াশার আড়ালে ঝাপসা হয়ে আছে। চারপাশে বইতে শুরু করেছে শীতল বাতাস।ইনায়া এখনও ছাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই হাত ছড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ধরার চেষ্টা করছে।মাঝে মাঝে ঘুরছে, আবার কখনো মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসছে।ইউভি কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে সেই দৃশ্য দেখছে।
হঠাৎ ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা এসে লাগতেই ইনায়া কেঁপে উঠল।
ব্যস!ইউভির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।
এক ঝটকায় ইনায়াকে নিজের কাছে টেনে নিল সে।
তারপর কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো একদম চুপ। আর একটা কথাও না।
ইনায়া কিছু বলার আগেই তাকে কোলে তুলে নিল ইউভি। ইউভি ভাইয়া! নামান আমাকে!
— না। সবাই দেখবে!
— দেখুক।
— আমার বউকে আমি নিয়ে যাচ্ছি, সমস্যা কোথায়?ইনায়া লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেলল।
ইউভি এক মুহূর্তও দেরি না করে নিজের রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করল।রুমে ঢুকেই তাকে নামিয়ে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
— পাঁচ মিনিট।ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে চেঞ্জ করে বের হবি, বেয়াদপ।না হলে নিজেই আবার বৃষ্টিতে ফেলে আসব।ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে জিভ বের করে ভেংচি কাটল। আহা! খুব ভয় পেলাম!
— ভয় পাওয়াবো নাকি?
না না, যাচ্ছি!
বলেই দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল ইনায়া। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলো সে।গায়ে ইউভির সাদা টি-শার্ট।
ভেজা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কাঁধ জুড়ে ছড়িয়ে আছে।ইউভি এক ঝলক তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।তারপর মাথা নেড়ে বলল,
বেয়াদপটা দিন দিন আরও বেয়াদপ হচ্ছে।
— আমার টি-শার্টটা এত সুন্দর লাগছে কেন তোর গায়ে?ইনায়া খিলখিল করে হেসে উঠল।
— কারণ মালিক সুন্দর।
— তাই নাকি?
— অবশ্যই।
ইউভি মুচকি হেসে চেঞ্জ করতে চলে গেল।
আরও কিছুক্ষণ পর হালকা আকাশি রঙের একটি টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার পরে ফিরে এলো।
এসে দেখল, ইনায়া এখনও ঠিকমতো চুল মুছতে পারেনি অর্ধেক ভেজাই রয়ে গেছে।ইউভি বিরক্ত হয়ে বলল, এভাবে চুল শুখাই কে বিয়াদোব ?
— আমি।
— তাই তো বুঝেছি।
ইউভি ড্রয়ার থেকে হেয়ার ড্রায়ার বের করে তাকে নিজের সামনে বসিয়ে দিল।তারপর খুব যত্ন করে চুল শুকাতে শুরু করল।উষ্ণ বাতাসে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে লাগল ইনায়ার লালচে চুলগুলো।
ইনায়া আয়নায় তাকিয়ে মুচকি হাসছে।
ইউভি হঠাৎ ঝুঁকে এসে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
আদর
— জী?
— তোর ঘাড়ের ওই ছোট্ট লাল তিলটা একদম তোর মতোই বেয়াদপ।ইনায়া অবাক হয়ে বললো কেন?
সবসময় আমার দিকে তাকিয়ে থাকে একটু আদর পাওয়ার জন্য ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় লাল হয়ে গেল।
এদিকে পিয়াসা ড্রেস চেঞ্জ করে এসে দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়।বাইরে তখনও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে।
ঠান্ডা বাতাস এসে বারবার এলোমেলো করে দিচ্ছে তার চুলগুলো।দূরের আকাশে মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ক্ষীণ ঝলক দেখা যাচ্ছে।মুগ্ধ হয়ে সেই দৃশ্যই দেখছিল পিয়াসা।
ঠিক তখনই পাশ থেকে ভেসে এলো এক পরিচিত পুরুষালি কণ্ঠ—গরম গরম কফি খেয়ে নাও, ম্যাডাম। জানিস যখন আমি ব্যতীত অন্য কারোর ছোয়া মানে বৃষ্টির ছোঁয়া তোর সহ্য হয় না, তখন ভিজতে যাস কেন?
পিয়াসা চমকে পিছনে তাকাল।তারপর মুহূর্তেই চোখদুটো আনন্দে চকচক করে উঠল।
তুমি..
কথাটা বলেই প্রায় দৌড়ে তার সামনে চলে এলো।
এরপর গম্ভীর মুখ করে বলল, এই যে মিস্টার!
তুমি কবে থেকে লুকোচুরি খেলা শুরু করলে বলো তো? একবারও বললে না আজ দেশে আসছো!
রেদোয়ান মুচকি হেসে কফির মগটা এগিয়ে দিল।
মাঝে মাঝে একটু সারপ্রাইজ তো দেওয়া যায়, ম্যাডাম । সবকিছু আগে বলে দিলে মজাটা কোথায়?
তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে পিয়াসার কপালে হাত রাখল।জ্বর আসেনি তো? কাশি, শ্বাসকষ্ট?
ইনহেলার নিয়েছিস?এক নিঃশ্বাসে এতগুলো প্রশ্ন শুনে পিয়াসা হাসতে লাগল। আরে বাবা থামো!
— আমি ঠিক আছি।
তুমি না একদম ডাক্তারদের থেকেও ভয়ংকর।
রেদোয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল, তোর ব্যাপারে আমি ভয়ংকরই।তুই অসুস্থ হলে আমার ভালো লাগে না।
কথাটা শুনে পিয়াসার মুখের হাসিটা একটু নরম হয়ে গেল।সে ধীরে ধীরে নিজের হাতটা রেদোয়ানের হাতে রাখল।ঠিক তখনই রেদোয়ানের চোখ পড়ল পিয়াসার আঙুলে থাকা হীরার আংটিটার দিকে।
কয়েক সেকেন্ড সেটার দিকে তাকিয়ে থেকে সে মুচকি হাসল।এখনও খুলিসনি দেখছি।
পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে হাত লুকিয়ে ফেলল।
খুলব কেন? রেদোয়ান আর কোন কথা বারালো না
এরপর দুজনে পাশাপাশি বসে কফি খেতে লাগল।
সামনে বৃষ্টিভেজা রাত চারপাশে শান্ত পরিবেশ।
মাঝে মাঝে বৃষ্টির শব্দ আর দুজনের হাসি মিলেমিশে এক অদ্ভুত সুন্দর আবহ তৈরি করছিল।
অন্যদিকে গভীর রাত
বৃষ্টি তখন অনেকটাই থেমে এসেছে।ইনায়া ঘুমিয়ে আছে নিশ্চিন্তে।ইউভির বুকের ওপর মাথা রেখে।
হঠাৎ ইউভির ফোনটা কেঁপে উঠল।স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি নাম—
“পি মনি”
ইউভির চোখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল।
খুব সাবধানে ইনায়ার মাথাটা বালিশে রেখে সে উঠে দাঁড়াল।তারপর বারান্দায় গিয়ে কল রিসিভ করল।
— বলো, পি
ওপাশ থেকে ভেসে এলো রিমঝিমের কঠিন কিন্তু অস্থির কণ্ঠ। ইউভি…
জানোয়ার এর বা*চ্চা গুলো আমাকে অ্যাটাক করেছিল।
ইউভির চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
— What? তুমি ঠিক আছো?রিমঝিম চৌধুরী ঠান্ডা গলায় বলল,Relax.
আমি রিমঝিম চৌধুরী। কোনো রাস্তার গুণ্ডা এসে আমাকে সহজে কিছু করতে পারবে না। তবে একটা বিষয় ক্লিয়ার। এরা আমার পেশাগত শত্রুপক্ষ নয়।
ওদের টার্গেট অন্য কিছু ছিল।ইউভি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।তারপর ধীর গলায় বলল,
মালিথার লোক।
— আমি প্রায় নিশ্চিত।
রিমঝিম হালকা হেসে বলল, Interesting…
তাহলে ওরা জানেই না কার গায়ে হাত দিতে গিয়েছিল।ইউভির চোখ মুহূর্তেই ঠান্ডা হয়ে গেল।
— That’s their biggest mistake.খুব বড় ভুল করে ফেলেছে ওরা।রিমঝিম শান্ত গলায় বলল,
এখন কী করবে, মিস্টার চৌধুরী?ইউভি বারান্দার অন্ধকার আকাশের দিকে তাকাল ইউভি তারপর নিচু স্বরে বলল, শাস্তি। তবে আমার স্টাইলে। আর সেটা ওরা কল্পনাও করতে পারবে না।রিমঝিম মুচকি হেসে বলল, এখন চিনতে পারছি।
— এটাই আমার ভাতিজা হঠাৎ ইউভির কণ্ঠ আবার নরম হয়ে গেল পি এক্ষুনি হাসপাতালে যাও।
— Complete checkup. তুমি এখন একা না।
বুঝেছো?রিমঝিম বিরক্ত গলায় বলল,
আমার কিছু হয়নি।ইউভি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
রাজ্জোকে আমি এখনই জানাচ্ছি। আমি আর রেদোয়ানও বের হচ্ছি।
রিমঝিম হেসে ফেলল। Yes boss. এখন রাখি কল কেটে যাওয়ার পরও কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল ইউভি।বৃষ্টির শেষ ফোঁটাগুলো তখন বারান্দার কার্নিশে আঘাত করছে।তার চোখে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল সেই ভয়ংকর শান্ত দৃষ্টি।যে দৃষ্টির অর্থ একটাই আমি আসছি
গভীর রাত।
পুরনো পরিত্যক্ত একটি দোতলা বাড়ির।
বাড়িটির চারপাশে ঘন ঝোপঝাড় আর বিশাল বিশাল গাছ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় বহু বছর ধরে এখানে মানুষের পা পড়েনি।বাড়ির ভেতরের একটি ঘরে বসে আছে রবার্ট মালিথা।
তার সঙ্গে আরও কয়েকজন বিশ্বস্ত লোক।মাত্র একদিন আগে দেশে ফিরেছে সে।টেবিলের উপর ছড়িয়ে রয়েছে কিছু ফাইল, কয়েকটি ছবি আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি।রবার্ট বিরক্ত গলায় বলল,
ওই মেয়েটা বেঁচে গেল কীভাবে? একটা সাধারণ কাজও তোরা ঠিকমতো করতে পারিস না?
তার কথায় উপস্থিত সবাই মাথা নিচু করে রইল।
ঠিক তখনই…হঠাৎ পুরো বাড়ির আলো একবার দপ করে নিভে আবার জ্বলে উঠল।
সবাই চমকে চারদিকে তাকাল। কী হলো?
জেনারেটর চেক কর!একজন লোক দ্রুত বাইরে বেরিয়ে গেল।কিন্তু কয়েক মিনিট পেরিয়ে গেলেও সে আর ফিরে এলো না।রবার্টের কপাল কুঁচকে গেল। কোথায় গেল ও?আরেকজনকে পাঠানো হলো।সেও আর ফিরল না।এবার ঘরের ভেতর অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে এলো।
বাইরে শুধু বাতাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে
হঠাৎ..উপরতলার করিডোর থেকে ভেসে এলো ভারী কোনো কিছুর পড়ে যাওয়ার শব্দ।
ধপ!সবাই একসঙ্গে চমকে উঠল। কে ওখানে?কোনো উত্তর নেই।রবার্ট উঠে দাঁড়াল।তার ভেতরে অস্বস্তি বাড়তে লাগল।রবার্টের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। কে? কে আছে এখানে?
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ সব আলো নিভে গেল।চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল তারপর আবার আলো জ্বলে উঠল।কিন্তু এবার ঘরে রবার্ট ছাড়া আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই।তার লোকগুলো কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে।দূরের কোনো ঘর থেকে ভেসে আসছে গোঙানির শব্দ।
রবার্ট দৌড়ে সেখানে পৌঁছে দেখলোতার কয়েকজন লোক মেঝেতে পড়ে আছে।জীবিত, কিন্তু সম্পূর্ণ অক্ষ*ম অবস্থায়।কেউই বুঝতে পারেনি কী ঘটেছে।
কেউ কাউকে দেখেনি।কেউ আক্র*মণকারীর মুখ পর্যন্ত দেখতে পারেনি।রবার্টের কপাল বেয়ে ঠান্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়ল।হঠাৎ তার ঠিক পেছনে খুব শান্ত একটি কণ্ঠ ভেসে এলো—
— খেলা তো সবে শুরু হলো, মিস্টার মালিথা।
রবার্ট দ্রুত পিছনে ঘুরল।কেউ নেই।
শুধু খোলা জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া রাতের বাতাস।বয়ে যাচ্ছে আর দূরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি ছায়ামূর্তি দেখা দিলো
একজনের ঠোঁটে ছিল হালকা হাসি।আরেকজনের চোখে ছিল অদ্ভুত শীতলতা।কয়েক সেকেন্ড পর ছায়া দুটো রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
রবার্ট এবার নিজেই এগোতে শুরু করল।
ঠিক তখনই তার পেছনে খুব শান্ত একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—এই সাহস নিয়ে এসেছিলি বানদির ছেলে ?
— এইটুকুতেই ভয় পেয়ে গেলি সালা?রবার্ট মুহূর্তেই ঘুরে দাঁড়াল।কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই—
ধপ!
একটা শক্ত আঘাতে তার চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে গেল।পরের মুহূর্তেই সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।পুরো ঘটনা এত দ্রুত ঘটল যে সে আঘাতটা কোথা থেকে এলো সেটাও বুঝতে পারল না।কয়েক সেকেন্ড নীরবতা বয়ে গেলো তারপর অন্ধকারের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো দুটি ছায়ামূর্তি।
রেদোয়ান নিচে পড়ে থাকা রবার্টের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল। ব্যস? এত তাড়াতাড়ি?
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইউভি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— ব্রো…এত দূর থেকে আসলাম, আর সালা এক আঘাতেই আউট!এভাবে খেললে কোনো মজা পাওয়া যাই না।
রেদোয়ান হাসি চেপে বলল,আমি তো ভাবছিলাম অন্তত পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকবে। এ তো দেখি রেকর্ড করে ফেলল।ইউভি মাথা নাড়িয়ে বলল,সালা কে খাজা কাঁঠাল খাওয়াতে হবে।রেদোয়ান মুচকি হেসে বলল,চল ভাইয়া। আজকের মতো শিক্ষা যথেষ্ট।ইউভি শেষবারের মতো অচেতন রবার্টের দিকে তাকাল।তারপর দুজনই নিঃশব্দে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
সকালের সূর্যটা যেন আজ একটু বেশিই উজ্জ্বল।
আকাশ ছিল একদম নির্মল। অবশেষে চলে আসলো সেই দিন টি শহরের প্রতিটি বিজনেস হাউস, প্রতিটি কর্পোরেট অফিস, প্রতিটি সংবাদমাধ্যমের নজর আজ নিবদ্ধ এক জায়গায়।
ইন্টারন্যাশনাল কর্পোরেট এক্সিলেন্স অ্যান্ড বিজনেস র্যাংকিং অ্যাওয়ার্ড ২০২৬।
সারা বছর ধরে হওয়া প্রতিযোগিতা, ব্যবসায়িক সাফল্য, আন্তর্জাতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক অবদান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কর্পোরেট পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে—
এই বছরের সেরা কোম্পানি কে?
বিশাল অডিটোরিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা সবাই উপস্থিত।সামনের সারিতেই বসে আছে পুরো চৌধুরী পরিবার।
লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী, রবিউল চৌধুরী, রায়হান চৌধুরী, নুসরাত চৌধুরী, সাবিহা চৌধুরী, রেশমা চৌধুরী, রিমঝিম চৌধুরী, ইনায়া, পিয়াসা— সবাই।অন্যদিকে বসে আছে মালিথা পরিবারও।
রবার্ট মালিথার মুখে আজও সেই কালচে দাগ স্পষ্ট।এক চোখের পাশটা এখনও ফোলা।
হাতে ব্যান্ডেজ।তার চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি আর অস্থিরতা।কারণ সে নিশ্চিত ছিল—এবার প্রথম স্থান তাদেরই হবে।
মঞ্চে উপস্থাপক উঠে এলেন।
পুরো হলরুম মুহূর্তেই নীরব হয়ে গেল।
উপস্থাপক গম্ভীর কণ্ঠে বললেন— এবার আমরা ঘোষণা করতে যাচ্ছি ২০২৬ সালের সেরা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের নাম সবাই নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করতে লাগল।কয়েক সেকেন্ডের উত্তেজনাপূর্ণ নীরবতার পর তিনি ঘোষণা করলেন—
— “দ্য নম্বর ওয়ান কোম্পানি অব দ্য ইয়ার ইজ…”
— “চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কোম্পানি!”
মুহূর্তেই পুরো অডিটোরিয়াম করতালিতে ফেটে পড়ল।চারপাশে ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানি।
চৌধুরী পরিবারের সবার মুখে আনন্দের হাসি ফুটে উঠল।লিখন চৌধুরী ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
তার চোখে মুখে কোনো অহংকার নেই।
শুধু তৃপ্তি।বহু বছরের পরিশ্রমের তৃপ্তি।
তিনি মঞ্চে উঠে পুরস্কার গ্রহণ করলেন।
অন্যদিকে রবার্ট মালিথা ও সাজ্জাদ মালিথার মুখ মুহূর্তেই কালো হয়ে গেল।তাদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।কিন্তু সবচেয়ে বড় ধাক্কা তখনও বাকি।
উপস্থাপক আবার মাইক্রোফোন হাতে নিলেন।
— “এবার ঘোষণা করা হবে দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম।”হলরুমের সবাই আবার নীরব হয়ে গেল।
বেশিরভাগ মানুষই ধরে নিয়েছিল এবার নিশ্চয়ই মালিথা ইন্ডাস্ট্রিজের নাম ঘোষণা হবে।রবার্টের ঠোঁটেও আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটে উঠল।কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেই হাসি উধাও।
উপস্থাপক উচ্চস্বরে বললেন “দ্য সেকেন্ড বেস্ট কোম্পানি অব দ্য ইয়ার… “এএসইউ কর্পোরেশন!”
এএসইউ — আল্টিমেট স্ট্র্যাটেজিক ইউনিটি কর্পোরেশন।পুরো হলরুমের সবাই স্তব্ধ।হয়ে গেল
তারপর আবারও করতালির ঝড় বয়ে গেলো
রবার্ট মালিথার চোখ প্রায় কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম।কারণ মালিথা ইন্ডাস্ট্রিজ এবার প্রথম তো নয়ই—দ্বিতীয় স্থানও পায়নি!
এরপর উপস্থাপক বললেন—
এবং আজকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো.
— “এএসইউ কর্পোরেশনের সিইওকে দ্বিতীয় পুরস্কার প্রদান করবেন প্রথম স্থান অর্জনকারী কোম্পানির চেয়ারম্যান মিস্টার লিখন চৌধুরী।
চারপাশে আবারও বিস্ময়ের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
ঠিক তখনই হলরুমের একপাশে স্পটলাইট গিয়ে থামল।ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল একজন যুবক।
কালো স্যুট।সাদা শার্ট তীক্ষ্ণ চাহনি।
অদ্ভুত এক ব্যক্তিত্বর অধিকারী শেহেজাদ ইউভি চৌধুরী।
পুরো হলরুমের দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো তার উপর।
ইউভি দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে নিজের স্বভাবসুলভ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে মঞ্চের দিকে হাঁটতে লাগল।তার হাঁটার ভঙ্গিতেই যেন আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়ছে।সামনের সারিতে বসে থাকা বহু আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী পর্যন্ত মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
মঞ্চে ওঠার আগমুহূর্তে ইউভির চোখ গিয়ে থামল রবার্ট মালিথার উপর।
রবার্ট আগুন ঝরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
ইউভি শুধু ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটিয়ে নিজের ডান হাতের দুই আঙুল দিয়ে চোখের পাশের কালো দাগের দিকে ইশারা করল।তারপর মুচকি হেসে ভ্রু তুলল।ইশারাটা খুব ছোট ছিল।কিন্তু রবার্ট বুঝে গেল।মুহূর্তেই তার মুখ লাল হয়ে উঠল।রাগে হাতের গ্লাসটা প্রায় ভেঙে ফেলল সে।
আর ইউভি কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে মঞ্চে উঠে গেল।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে বাবা আর ছেলে।
লিখন চৌধুরী কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইলেন ইউভির দিকে।তার চোখে স্পষ্ট গর্ব।হয়তো মনে মনে সেই ছোট্ট ছেলেটাকেই দেখছেন—যে একদিন তার আঙুল ধরে হাঁটতে শিখেছিল।আজ সেই ছেলেই শত শত কোম্পানিকে পিছনে ফেলে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে।পুরো অডিটোরিয়াম নিঃশব্দ হয়ে গেল।লিখন চৌধুরী ধীরে ধীরে পুরস্কারটা ইউভির হাতে তুলে দিলেন।
আর সেই মুহূর্তেই ক্যামেরার ফ্ল্যাশে আলোকিত হয়ে উঠল পুরো মঞ্চ।সামনের সারিতে বসে থাকা রেশমা চৌধুরীর চোখ ভিজে উঠল।রায়হান চৌধুরী মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন।নুসরাত চৌধুরী সাবিহা চৌধুরী রিমঝিম চৌধুরী ইনায়া, পিয়াসা— সবার মুখেই গর্বের হাসি ফুটে উঠলো
পুরস্কার হাতে নিয়ে ইউভি মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াল।কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললো
— “আজকের এই অর্জন শুধুমাত্র আমার নয়।”
“এএসইউ কর্পোরেশন এতদূর আসার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান একজন মানুষের।”
ইউভি মঞ্চের সামনে বসে থাকা রেদোয়ানের দিকে তাকাল।তারপর স্পষ্ট কণ্ঠে বললো
— “মাহতিব রেদোয়ান চৌধুরী।”
মুহূর্তেই ক্যামেরা গিয়ে থামল রেদোয়ানের মুখে।
রেদোয়ান বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে।
ইউভি আবার বললো।আমি হয়তো সিইও।”
কিন্তু এই সাম্রাজ্যের অর্ধেক স্বপ্ন, অর্ধেক পরিশ্রম, অর্ধেক সফলতা আমার ভাইয়ের। তাই এই অ্যাওয়ার্ড আমি আমার ভাই মাহতিব রেদোয়ান চৌধুরীকে উৎসর্গ করলাম।”
শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৪
এক মুহূর্ত নীরবতা পালন করলো সবাই
তারপর পুরো হলরুম দাঁড়িয়ে করতালি দিতে শুরু করল।স্ট্যান্ডিং ওভেশন।
রেদোয়ানের চোখ ভিজে উঠল।
ইউভি শুধু মুচকি হেসে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
অন্যদিকে রবার্ট মালিথা দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইল।
