Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৬৫ (২)

শেহেজাদার আদর পর্ব ৬৫ (২)

শেহেজাদার আদর পর্ব ৬৫ (২)
সুমাইয়া ইসলাম নূর

সকালের রোদ তখন অনেকটাই উঁচুতে উঠেছে। ঘড়ির কাঁটা প্রায় দশটা ছুঁইছুঁই। চৌধুরী ভিলার চারপাশে এক শান্ত, প্রশান্ত পরিবেশ। বাগানের ফুলগুলো শিশির ঝেড়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, আর হালকা বাতাসে ভেসে আসছে সদ্য বানানো চায়ের সুগন্ধ।ডাইনিং টেবিলে সবার সকালের নাস্তা প্রায় শেষের পথে।
শুধু বাকি আছে রাজ্য, রেসব, অর্ক, আদিল আর আলভি সবাই একসঙ্গে বসে নাস্তা করছে। কারণ আজই সবাই যে যার বাড়িতে ফিরে যাবে। রাজ্যও হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হবে।নুসরাত চৌধুরী নিজের হাতে একে একে সবার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন। এই রাজ্য, আরেকটা পরোটা নে বাবা।

— না, ফুপি আর পারব না। পারবে। সারাদিন হাসপাতালেই থাকতে হবে। ঠিকমতো না খেলে চলবে?কথা বলতে বলতেই তিনি আদিলের প্লেটে আরেকটা চিকেন পকোড়া দিয়ে দিলেন।আদিল অসহায় মুখ করে বলল,আন্টি এত খাওয়ালে কিন্তু হাঁটতেই পারব না!
নুসরাত চৌধুরী হেসে বললেন,বেশি কথা না বলে খাও।এদিকে নাস্তা শেষ করে চৌধুরী পরিবারের বাকি সদস্যরা ড্রইংরুমের বড় সোফায় বসে চা খেতে খেতে সকালের পত্রিকা পড়ছেন।
আর এই দিকে ইউভি, রেদোয়ান, ইনায়া, পিয়াসা আর তুবা— এই পাঁচজনেরই এখনো দেখা নেই।
রাজ্য হঠাৎ টেবিলের নিচ দিয়ে পা বাড়িয়ে আদিলকে একটা গুঁতো দিল।আদিল চমকে উঠে তাকাতেই রাজ্য ঠোঁট চেপে হাসল। ব্রো… কিছু খেয়াল করেছিস?আদিল ভ্রু কুঁচকে বলল,

— কী?
রাজ্য নাটকীয় গলায় বলল,নতুন বউদের রাখে, বাড়ির দুই রাজপুত্রই এখনো ঘুম থেকে উঠল না!
কথাটা শুনে রেসব মুখ নিচু করে হাসি চেপে রাখল।
অর্ক গলাটা একটু পরিষ্কার করে কাশল। ভোর রাতে রুমে গেছে ওরা… হয়তো অনেক ক্লান্ত।
কথাটা বললেও তার ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি লুকিয়ে রইল না।
ঠিক তখনই…সোফায় বসে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে হঠাৎ লিখন চৌধুরী বিস্ময়ে বলে উঠলেন—
— কী!
সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল।রতিব চৌধুরী পত্রিকা নামিয়ে বললেন,
— কী হয়েছে?লিখন চৌধুরী দ্রুত টেবিলের ওপর রাখা রিমোটটা তুলে টেলিভিশন চালু করলেন।
সব চ্যানেলেই একটাই সংবাদ।স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
“ব্রেকিং নিউজ”
সংবাদ উপস্থাপক গম্ভীর কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন

— “দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান মালিথা ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড কোম্পানির আড়ালে চলছিল বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্য। বহু মাসের গোপন তদন্তের পর সিআইডি আজ প্রকাশ করেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।”ড্রইংরুম মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।সবাই মনোযোগ দিয়ে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে রইল।সংবাদ পাঠক আবার বললেন—
— “সিআইডির তথ্যমতে, মালিথা ইন্ডাস্ট্রির সিইও সাজ্জাদ মালিথা ও তার ছেলে রবার্ট মালিথা দীর্ঘদিন ধরে অর্থপাচার, ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, মাদক চোরাচালান, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা, বিদেশে কালো টাকা পাচার, জাল নথি তৈরি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নামে প্রতারণা এবং একাধিক আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।”
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল রিমঝিম চৌধুরী আর রাশেদ মির্জা এখন ও বাসায় ফেরে নি সংবাদ সম্মেলন নিয়ে ব্যস্ত রিমঝিম প্রথমে টেলিভিশনের দিকে তাকালেন।
তারপর ধীর পায়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন।মুখে রহস্যময় হাসি।যেন এই সংবাদ তার কাছে মোটেও নতুন নয়।চেয়ারে বসতে বসতেই রিমঝিম মুচকি হেসে বললেন—
— কী হলো? নতুন বর-বউরা কোথায়?রেশমা চৌধুরী হেসে বললেন এখনো ঘুমাচ্ছে।
রিমঝিম মাথা নেড়ে মৃদু হেসে বললেন—

— তাই নাকি?
— মালিথাদের কাগুজে সাম্রাজ্য যে আজ ধসে পড়ল… সেই খবরটাও তাহলে দেখবে না!
ঘরের পরিবেশ কেমন ভারী হয়ে আছে।
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো , ইনায়া পিয়াসা তুবা, সাম্মি আর রানি।সবার মুখেই ঘুমের ছাপ।ইনায়ার চোখে এখনো হালকা ঘুমের ঘোর, ক্লান্ত শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এসে সে মিষ্টি গলায় বলল বড় মা… খুব ক্ষুধা লেগেছে। খাবার দাও না।কিন্তু…রেশমা চৌধুরী যেন কথাটাই শুনলেন না।ইনায়া অবাক হয়ে চারদিকে তাকাল।
দেখল চৌধুরী ভিলার প্রতিটি সদস্য টেলিভিশনের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন পৃথিবীর আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই।পিয়াসা কৌতূহলী হয়ে ফিসফিস করে বলল— কী হয়েছে?
টিভির পর্দায় একের পর এক ভিডিও ফুটেজ ভেসে উঠছে। তাদের গোপন গুদাম…অবৈধ অস্ত্র…বিপুল পরিমাণ মাদক…নগদ অর্থে ভর্তি কক্ষ…বিদেশি ব্যাংক হিসাবের নথি…সংবাদ পাঠক আবার বললেন”সিআইডির এক গোপন অভিযানে এসব তথ্য উঠে আসে। তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেছেন এক রহস্যময় যুবক। তার পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই যুবকের সাহসী পদক্ষেপ ছাড়া এত বড় অপরাধচক্রের মুখোশ উন্মোচন করা সম্ভব হতো না।”
এই কথাটা শুনে অর্ক, আদিল, আলভি, রাজ্য আর রেসব একবার একে ওপরের দিকে তাকাল।
তারপর নিজেদের মুখে চাপা হাসি ফুটে উঠল।
ঠিক তখনই সংবাদে দেখানো হলো—

একটি বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত, ভাঙাচোরা বাড়ি।
চারদিক ঘিরে রেখেছে সিআইডি ও বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা।লাউডস্পিকারে বারবার ঘোষণা করা হচ্ছে “রবার্ট মালিথা! আত্মসমর্পণ করুন। পালানোর চেষ্টা করবেন না। পুরো এলাকা ঘিরে ফেলা হয়েছে।”
কয়েক মিনিট পর দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে বিশেষ বাহিনী।ভেতর থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে আনা হলো রবার্ট মালিথাকে।মুখে ধুলো, জামাকাপড় এলোমেলো, চোখেমুখে আতঙ্ক।
সংবাদিক রা এবার সাজ্জাদ মালিথাকে ঘিরে ধরেছেন।একজন সাংবাদিক মাইক্রোফোন এগিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করলেন

— “মিস্টার সাজ্জাদ মালিথা, অভিযোগ রয়েছে
আপনি পরিকল্পিতভাবে চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম আতিক চৌধুরীকে ভুল ওষুধ প্রয়োগ করিয়ে হত্যা করেছিলেন। সেই হত্যাকাণ্ডকে স্বাভাবিক হৃদ্‌রোগে মৃত্যু বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী? সাজ্জাদ মালিথা মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।কোনো উত্তর দিলেন না।
আরেকজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন।”আপনার বিরুদ্ধে খুন, দুর্নীতি, অর্থপাচার, প্রতারণাসহ অসংখ্য অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। আপনি কি সব অভিযোগ স্বীকার করছেন?”তবুও কোনো উত্তর নেই।
শুধু নীরবতা।
ঠিক সেই মুহূর্তে লিখন চৌধুরী ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।তার চোখ দুটো রাগে লাল।
কাঁপা গলায় বললেন আমি জানতাম আমি জানতাম, আমার বাবাকে এই জানোয়ারের বাচ্চাটাই হত্যা করেছিল!কথাটা শুনে ইনায়া আর পিয়াসা হতভম্ব হয়ে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে রইল।ইনায়া কাঁপা গলায় বলল—

— কী…!
— আমাদের দাদুভাই হার্ট অ্যাটাকে মারা যাননি?
পিয়াসাও বিস্ময়ে বলল তাহলে… এতদিন সবাই ভুল জানত?লিখন চৌধুরী রিমঝিম আর রেদোয়ান ছাড়া বাড়ির প্রায় সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।আবার সংবাদে ফিরে গেল দৃশ্য।এবার সাংবাদিকেরা রাশেদ মির্জার সামনে মাইক্রোফোন ধরলেন।
— “মিস্টার রাশেদ মির্জা, আপনি দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন। তদন্তে উঠে এসেছে, রবার্ট মালিথা লন্ডনে বসেও একাধিক অবৈধ চক্র পরিচালনা করতেন। আপনি কি আগে এসব সম্পর্কে জানতেন?”
রাশেদ মির্জা শান্ত গলায় বললেন আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। তদন্তে যা প্রমাণিত হয়েছে, সত্য সেটাই। আমি শুধু চাই, যারা নিরপরাধ মানুষের জীবন নিয়ে খেলেছে, তারা যেন তাদের প্রাপ্য শাস্তি পায়।”
এরপর ক্যামেরা আবার রবার্ট মালিথার দিকে ঘুরল।একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন—

— “আপনি কি বিদেশে বসে অবৈধ অস্ত্র, মাদক এবং অর্থপাচার চক্র পরিচালনা করতেন?”
রবার্ট কোনো উত্তর দিল না।মাথা নিচু করে পুলিশ ভ্যানে উঠে বসল
ঠিক তখনই…
ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল রেদোয়ান।
তারও কিছুক্ষণ পর সাদা টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে, এলোমেলো ভেজা চুলে নিচে নেমে এলো ইউভি।একবারও টেলিভিশনের দিকে না তাকিয়ে সে ডাইনিং টেবিল থেকে একটি আপেল তুলে নিল।
অলস ভঙ্গিতে আপেলে কামড় বসাতে বসাতে গিয়ে রাজ্যের পাশে বসে পড়ল।যেন টেলিভিশনে যা চলছে, তার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই।
অন্যদিকে…রেদোয়ান টিভির দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল।কয়েক সেকেন্ড পর সে ধীরে ধীরে ইউভির দিকে তাকাল।তারপর অর্ক…আদিল…আলভি…একজন একজন করে সবাই শুধু চোখের ইশারায় ইউভির দিকে তাকাল।

কেউ কোনো কথা বলল না।কিন্তু সেই একটুকু ইশারাই যথেষ্ট ছিল।রেদোয়ানের আর বুঝতে বাকি রইল না।মুখে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল।
মনে মনে বলল তাহলে… এই পুরো খেলাটার পরিচালক তুমিই ছিলে।
ইউভি তখনও নির্বিকার মুখে আপেল খাচ্ছে।
মনে হচ্ছে যেন সংবাদে দেখানো ঘটনাগুলো তার কাছে একেবারেই স্বাভাবিক।
নুসরাত চৌধুরী বলে উঠলেন এতদিন আমরা যেটা জানতাম… সব মিথ্যা?রেশমা চৌধুরী নিজের মুখে হাত চাপা দিলেন।নুসরাত চৌধুরীর চোখ ভিজে উঠল।রাজ্য, রেসব, আদিল, আলভি, সাম্মি, তুবা, রানি— সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।ঘরের প্রতিটি মানুষ স্তব্ধ।শুধু চারজনের মুখে কোনো বিস্ময় নেই।
ইউভি…রেদোয়ান, রিমঝিম আর লিখন চৌধুরী।
তাদের চোখে যেন বহুদিনের জানা সত্য আজ সবার সামনে প্রকাশ পেল।

★★ (ফ্ল্যাশব্যাক)★★
গত রাত…
ঘড়ির কাঁটা তখন রাত আড়াইটার কাছাকাছি।
শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে, বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত একটি ভাঙাচোরা বাড়ি।
চারদিকে ঘন অন্ধকার।বাড়িটির চারপাশ নিঃশব্দে ঘিরে রেখেছে সিআইডির বিশেষ টিম।সবাই বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে প্রস্তুত।ওয়্যারলেসে ভেসে এলো নিচু গলা টার্গেট এখনো ভেতরেই আছে। সবাই সতর্ক থাকুন। বাড়ির কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে ইউভি।তার দুই পাশে অর্ক, আদিল, রেসব আর আলভি।পাঁচজনের মুখেই কঠিন নীরবতা।
আজ বহু বছরের অপেক্ষার শেষ রাত।
ইউভি ধীরে ধীরে চোখ তুলে ভাঙা বাড়িটার দিকে তাকাল।তার চোখে কোনো রাগ নেই…আছে বরফের মতো ঠান্ডা প্রতিজ্ঞা।আজ…
তার দাদার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিজ হাতে নিবে
ঠিক তখনই রিমঝিম চৌধুরী আর রাশেদ মির্জা এগিয়ে এলেন।রিমঝিম নিচু গলায় বললেন—
— ইউভি…সবকিছু ঠিক আছে তো?
ইউভি ছোট্ট করে মাথা নাড়ল।

— আজ আর ও পালাতে পারবে না।
হঠাৎ…সিআইডির একজন কর্মকর্তা হাত তুলে সংকেত দিলেন।
— “মুভ!”
মুহূর্তের মধ্যে চারদিক থেকে টিম ভেতরে ঢুকে পড়ল।দরজা ভেঙে বিকট শব্দে খুলে গেল।
ভেতর থেকে গুলির শব্দ ভেসে এলো।ধোঁয়ায় ঢেকে গেল পুরো বাড়ি। রিমঝিম নিচু গলায় বলল সবাই কভার নাও!অর্ক সঙ্গে সঙ্গে আলভি আর রেসবকে নিয়ে অন্য পাশ ঘিরে ফেলল।কয়েক মিনিট ধরে চলল ধাওয়া।হঠাৎ দ্বিতীয় তলার ভাঙা বারান্দা থেকে লাফ দিল রবার্ট মালিথা।মাটিতে পড়েই দৌড় শুরু করল।
— “স্টপ!”সিআইডির সদস্যরা চিৎকার করলেও সে থামল না।ঠিক তখনই…সামনে এসে দাঁড়াল ইউভি।
রবার্ট ঘুরে অন্যদিকে পালাতে চাইতেই আদিল তার পথ আটকে দিল।অন্য পাশে অর্ক।আরেক পাশে রেসব।পেছনে আলভি।রবার্ট বুঝে গেল—আজ আর পালানোর পথ নেই।রাগে উন্মত্ত হয়ে সে ইউভির দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু…ইউভি এক চুলও নড়ল না।রবার্ট কাছে আসতেই এক ঝটকায় তার হাত চেপে ধরে মাটিতে ফেলে দিল।রবার্ট ব্যথায় চিৎকার করে উঠল।তবুও উঠে আবার আক্রমণ করতে গেল।ইউভি এবার দৃঢ় হাতে তাকে প্রতিহত করল।সংঘর্ষের এক পর্যায়ে রবার্ট সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে চলে এলো।মাটিতে বসে হাঁপাচ্ছে সে।ইউভি ধীরে ধীরে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।কয়েক সেকেন্ড নীরবে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিচু, ভারী কণ্ঠে বলল মনে আছে…

আতিক চৌধুরী? একজন সৎ মানুষকে তুই আর তোর বাবা মিলে হাসপাতালের বিছানায় শেষ করে দিয়েছিলি।রবার্ট ভয়ে কাঁপতে লাগল। আমি… আমি…ইউভির কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে উঠল।
আমার দাদুভাই এর মৃত্যুর পর পুরো পরিবার ভেঙে গিয়েছিল। তার ছেলেরা বাবাহীন হয়েছিল।
পুরো চৌধুরী পরিবার অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল।আজ সেই অন্যায়ের বিচার শুরু হলো।
রাগে ইউভির মুঠি শক্ত হয়ে উঠল।সে রবার্টের জামার কলার ধরে টেনে তুললো তোর পাপের রাজত্বে আরো কয়েকদিন রাজত্ব করতে দিতাম কিন্তু তুই আমার কলিজায় হাত দিতে চেয়েছিলি
এখন তোর শরীর থেকে আমি কলিজা আলাদা করব সালা।
রিমঝিম চৌধুরী দ্রুত এগিয়ে এসে তার হাত ধরে ফেললেন।চোখে জল নিয়ে বললেন প্লিজ, ইউভি…

— আইন নিজের হাতে নিস না। তুই ওদের মতো হবি না।আমি আছি আমি কথা দিচ্ছি, ওদের এমন শাস্তি হবে, যাতে সারাজীবন নিজেদের অপরাধের ভার বয়ে বেড়াতে হয়।রাশেদ মির্জাও এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বললেন ইউভি.. একজন অপরাধীকে আইনের হাতে তুলে দেওয়াই সবচেয়ে বড় জয়।আজ যদি তুই রাগের বশে ভুল করিস.. তাহলে তোর আর ওদের মধ্যে পার্থক্য কোথায় থাকবে?
কয়েক মুহূর্ত নীরব দাঁড়িয়ে রইল ইউভি।তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।গভীর একটা নিঃশ্বাস নিল।আবার চোখ খুলে রবার্টের দিকে তাকাল।
তার কণ্ঠে তখন অদ্ভুত শান্তি তোর ভাগ্য ভালো…
আজ তোর বিচার আমি না… আইন করবে।
এই বলে সে রবার্টকে ছেড়ে দিল।পরের মুহূর্তেই সিআইডির সদস্যরা এগিয়ে এসে রবার্টের হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিল।রবার্ট শেষবারের মতো ইউভির দিকে তাকাল।সেই দৃষ্টিতে প্রথমবারের মতো অহংকার নয়…ছিল শুধুই ভয়।
সিআইডির কর্মকর্তা সামনে এসে ইউভির দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন—

— ধন্যবাদ। আপনার দেওয়া তথ্য আর প্রমাণ না থাকলে এত বড় অপরাধচক্রকে ধরা সম্ভব হতো না।
ইউভি মৃদু হাসলো
পুলিশের গাড়িতে করে রবার্ট মালিথাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।আর ইউভি স্থির চোখে তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে।মনে মনে শুধু একটাই কথা বলল দাদুভাই…তোমার হত্যাকারীরা আজ আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে। আপনার জন্য ন্যায়বিচারের পথ আজ শুরু হলো।”তার পাশে এসে নীরবে দাঁড়াল অর্ক, আদিল, রেসব আর আলভি।
কেউ কোনো কথা বলল না।আদিল শুধু ইউভির কাঁধে হাত রাখল।অর্ক মৃদু হেসে বলল—
— চল, বাড়িতে কেউ একজন তোর জন্য অপেক্ষা করছে।ইউভির ঠোঁটের কোণে অবশেষে একফোঁটা হাসি ফুটে উঠল।

(বর্তমান)
ড্রইংরুমজুড়ে তখনও নিস্তব্ধতা।
টেলিভিশনের পর্দায় একের পর এক সংবাদ ভেসে উঠছে, কিন্তু চৌধুরী পরিবারের কারও মুখে কোনো কথা নেই।ইউভি ধীরে ধীরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল।একবার সবার দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,রেদোয়ান, অফিসে যেতে হবে। কয়েকটা জরুরি ফাইল আজই ক্লিয়ার করতে হবে।”রেদোয়ান মাথা নেড়ে বলল,ঠিক আছে, ভাইয়া। আমি রেডি হয়ে আসছি।”ঠিক তখনই রাজ্য নিজের কফির মগটা টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়াল।
হালকা হেসে বলল,”আমাকেও বের হতে হবে। হাসপাতালে আজ কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ সার্জারি আছে। রোগীরা অপেক্ষা করছে।”অর্ক গাড়ির চাবিটা হাতে নিয়ে বলল,আমরাও তাহলে উঠি। অনেকদিন হলো নিজের বাড়িতেও যাওয়া হয়নি।”
আলভি হেসে বলল,চল, সবাই একসাথে বের হই।”
এক এক করে রাজ্য, অর্ক, আদিল, রেসব, আলভি, ইউভি আর রেদোয়ান প্রস্তুতি নিতে নিজেদের রুমের দিকে চলে গেল।
কিন্তু…চৌধুরী ভিলার প্রবীণ সদস্যদের মুখে এখনো সেই বিস্ময়ের ছাপ।এত বছর ধরে যেটাকে সবাই স্বাভাবিক মৃত্যু ভেবেছিল…আজ জানা গেল, সেটা ছিল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।কথাটা যেন কেউ এখনো মেনে নিতে পারছে না।লিখন চৌধুরী অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন।তারপর ধীরে ধীরে রিমঝিমের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

— “রিমঝিম…”রিমঝিম মাথা তুলে ভাইয়ের দিকে তাকাল।জি, ভাইয়া?”
লিখন চৌধুরীর গলাটা কেঁপে উঠল।
— “ওই ছেলেটা যে এতদিন পর্দার আড়াল থেকে সবকিছু করেছে সে কি আমাদের ইউভি?”
ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।রিমঝিম কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।তারপর ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে খুব আস্তে বলল,
—হ্যাঁ, ভাইয়া…ও আমাদের ইউভিই। আজ আমার ইউভি তার দাদুর হত্যাকারীদের আইনের হাতে তুলে দিয়ে ন্যায়বিচারের পথ তৈরি করেছে। এতদিন যে বোঝাটা বুকের ভেতর নিয়ে ঘুরেছি আজ মনে হচ্ছে, আল্লাহ সেই ভারটা একটু হলেও হালকা করে দিয়েছেন।

বিকেলের নরম রোদ ধীরে ধীরে চৌধুরী ভিলার বিশাল বারান্দা পেরিয়ে ড্রইংরুমের মেঝেতে লম্বা ছায়া ফেলছে। বাগানের কদমগাছের পাতাগুলো হালকা বাতাসে দুলছে। দূরে পাখিদেরকিচিরমিচিরে চারপাশটা যেন আরও শান্ত হয়ে উঠেছে।
সকালের সেই ভারী পরিবেশটা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। দীর্ঘদিনের একটা বোঝা নেমে যাওয়ায় যেন পুরো বাড়িতেই স্বস্তির আবহ।রান্নাঘরে আজ বেশ ব্যস্ততা।নুসরাত চৌধুরী, রেশমা চৌধুরী, সাবিহা চৌধুরী সবাই রাতের রান্নায় হাত লাগিয়েছেন।
কেউ সবজি কাটছেন, কেউ মসলা বাটছেন, কেউ আবার চুলার পাশে দাঁড়িয়ে একের পর এক পদ রান্না করছেন।
রান্নাঘরজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে গরম ঘি, কাবাব আর মসলার মনমাতানো সুগন্ধ।এদিকে ড্রইংরুমে পাশাপাশি বসে আছেন চৌধুরী পরিবারের তিন কর্তা—লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী আর রবিউল চৌধুরী রাইহান চৌধুরী একটা কাজে বের হয়েছে।

তিন ভাই খুব মনোযোগ দিয়ে কোম্পানির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছেন।
লিখন চৌধুরী বললেন এখন থেকে নিরাপত্তার দিকটা আরও শক্ত করতে হবেতিন ভাইয়ের কথোপকথনের মাঝেই সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলো দুই নববধূ।
ইনায়া…আর পিয়াসা সাথে তুবা ও আছে
দুজনের পরনেই শাড়ি।তুবা নিজের হাতে অনেক যত্ন করে দুজনকে শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে।
সাম্মি আর রানি অনেক আগেই বাড়ি ফিরে গেলেও তুবাকে কোনোভাবেই যেতে দেয়নি ইনায়া আর পিয়াসা দুজনের আবদারে শেষ পর্যন্ত থেকে গিয়েছে সে।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই রাজ্যের ফোন বেজে উঠল।
— আমি একটু ছাদে গিয়ে কথা বলে আসছি।

বলেই দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল।
এদিকে…ইনায়া আর পিয়াসাকে একসঙ্গে শাড়ি পরে নিচে নামতে দেখেই কথার মাঝখানে থেমে গেলেন তিন ভাই।লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী আর রবিউল চৌধুরী—তিনজনই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন।মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেল।
ঠিক তখনই ছোট্ট আয়াত, আতিকা আর রিধ দৌড়ে এসে চিৎকার করে উঠল,
— “ওয়াও!””তোমাদের দুজনকে একদম নতুন বউ লাগছে!”কথাটা শুনেই ইনায়া আর পিয়াসা দুজনেই লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।মুখে ফুটে উঠল মিষ্টি এক হাসি।পিয়াসা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে লিখন চৌধুরীর সামনে দাঁড়াল।
তারপর ছোট্ট শিশুর মতো প্রশ্ন করল, “বাবা… আমাকে কেমন লাগছে?”লিখন চৌধুরীর চোখ ভরে উঠল স্নেহে।তিনি মুচকি হেসে দুজনের মাথায় আলতো করে হাত রেখে বললেন,
— “মাশাআল্লাহ আল্লাহর কী অপূর্ব সৃষ্টি!”আমার দুটো মেয়ে নয় তোমরা দুটো মা এ
— “আল্লাহ তোদের দুজনকে সবসময় এভাবেই হাসিখুশি রাখুক। সারাজীবন একে অপরের হাত ধরে থেকোআজ যেমন একসঙ্গে হাসছো, জীবনের প্রতিটা পথও যেন এভাবেই একসঙ্গে পার করো
কথাগুলো শুনে পিয়াসা আবেগে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।অন্যদিকে ইনায়ার চোখও চিকচিক করে উঠল।রাতিব চৌধুরী মুচকি হেসে বললেন,

— “আমাদের চৌধুরী ভিলার সৌন্দর্য যেন আজ আরও বেড়ে গেল।”তিনি আলতো করে ইনায়ার মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন,”আল্লাহ তোদের দাম্পত্য জীবন ভালোবাসা আর রহমতে ভরে রাখে
ইনায়া আর পিয়াসা ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যেতেই ঠিক সেই সময় সদর দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল ইউভি আর রেদোয়ান।
সারাদিনের কাজের ক্লান্তি দুজনের মুখেই স্পষ্ট।
ইউভির গায়ে হালকা ধুলো জমে আছে, চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। রেদোয়ানের অবস্থাও প্রায় একই।
ড্রইংরুম পার হওয়ার সময় দুজনের চোখই অজান্তেই রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।আর সেই এক ঝলকেই দুজনের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একই রকম তৃপ্তির হাসি।একদিকে লাল শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে পিয়াসা…অন্যদিকে নীল শাড়িতে ইনায়া…দুজনেই শাশুড়িদের মাঝে দাঁড়িয়ে গল্প করছে।রেদোয়ান নিচু গলায় বলল,

— “দেখেছো, ভাইয়া?”
ইউভি মুচকি হেসে উত্তর দিল,
— “হ্যাঁ…
এরপর আর কোনো কথা না বলে দুই ভাই নিজেদের রুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে।এদিকে রান্নাঘরে…নুসরাত চৌধুরী তরকারিতে নাড়াচাড়া করতে করতেই দুষ্টুমি ভরা চোখে রেশমা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,বুঝছেন বড় ভাবি?”
আমাদের শাশুড়ি তো আমাদের হাতের রান্না খেয়ে কত প্রশংসা করতেন! কিন্তু আমার তো মনে হয় না, আমাদের কপালে ছেলের বউদের হাতের রান্না খাওয়া আছে!”রেশমা চৌধুরীও সঙ্গে সঙ্গে সায় দিলেন।ঠিকই বলেছিস, মেজো। আমাদের কপালে আর বউমাদের হাতের রান্না জুটবে না মনে হচ্ছে।”
আজকালকার মেয়েরা তো শুধু সুন্দর করে সাজতেই জানে!।কথাগুলো যে ইনায়া আর পিয়াসাকে উদ্দেশ্য করেই বলা হচ্ছে, সেটা বুঝতে তাদের একটুও বাকি রইল না।পিয়াসা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।আর ইনায়া সে কি আর এত সহজে হার মানার মেয়ে!মুহূর্তেই শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে ফেলল।দুই হাতা একটু গুটিয়ে আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলল,”ঠিক আছে!”

আজ বিকেলের নাস্তা আমি বানাব। তোমরা সবাই বাইরে যাও কথাটা শুনেই সবাই হেসে উঠল।
রেশমা চৌধুরী হো হো করে হেসে বললেন,
এই মেয়ে! রান্না করা কি এত সহজ? এটা আমাদের ছেলেদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানোর মতো সহজ কাজ না! রান্নাঘরজুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল।
ঠিক তখনই আয়াত আর আতিকা ছুটে এসে পিয়াসার দুই হাত ধরে টানতে লাগল।সোনো আপু চলো না! তোমার সঙ্গে গল্প করব। পিয়াসা অসহায় চোখে একবার ইনায়ার দিকে তাকাল।
ইনায়া মুচকি হেসে মাথা নেড়ে বলল,যাও… আমি সামলে নেব।”অগত্যা পিয়াসাকে নিয়ে দুই বাচ্চা দৌড়ে চলে গেল।বেচারি ইনায়া এবার পুরোপুরি একা।সে চারপাশে একবার তাকাল।তারপর নিজের ফোনটা বের করল।ইউটিউব খুলে সার্চ দিল বিকালের নাস্তা সহজে চিকেন পকোড়া রেসিপি।”
কয়েক সেকেন্ড পর ভিডিও চালু হতেই মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল।ভিডিওতে বলা হচ্ছে—
“প্রথমে বেসন নিন ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— “মা… এইটা কোনটা?।নুসরাত চৌধুরী হেসে বেসনের ডিব্বাটা এগিয়ে দিলেন “এই যে, এটা।”
ভিডিও আবার বলল এবার সামান্য কর্নফ্লাওয়ার…”
ইনায়া আবার প্রশ্ন করল,”বড় মা… কর্নফ্লাওয়ার কোনটা?।রেশমা চৌধুরী হাসতে হাসতে আলমারি খুলে বের করে দিলেন।এরপর একে একে মরিচ গুঁড়ো, গোলমরিচ, আদা-রসুন বাটা…সবকিছুই জিজ্ঞেস করে করে নিতে লাগল ইনায়া।
কিছুক্ষণ পর বড় একটা বাটিতে ময়দা, বেসন আর মসলা মেশাতে গিয়ে নিজের অবস্থাই খারাপ করে ফেলল।দুই হাত ভর্তি ময়দা।গালে লেগে গেছে সাদা আটা।নাকের ডগায়ও একটু ময়দা।কপালের সামনে ঝুলে থাকা চুলগুলো বারবার মুখে এসে পড়ছে।নীল শাড়ির আঁচল বারবার নিচে নেমে যাচ্ছে।বিরক্ত হয়ে একবার আঁচল ঠিক করছে…
আবার চুল সরাচ্ছে…তারপর আবার ময়দা মাখছে।
নিজের অবস্থা দেখে সে নিজেই বিড়বিড় করে বলল,ইয়া আল্লাহ! রান্না করতে এত কষ্ট হয় নাকি!”
রান্নাঘরের সবাই মুখ চেপে হাসছে।
ঠিক তখনই…

সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামতে লাগল ইউভি।
ফ্রেশ হয়ে এসেছে সে।পরনে হালকা আকাশি রঙের ফুলহাতা শার্ট, সাদা প্যান্ট। চুলগুলো এলোমেলো করে রাখা এক হাতে ছোট্ট একটা প্যাকেট।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই তার চোখ পড়ল রান্নাঘরের ভেতরে।আর পরের মুহূর্তেই সে থেমে গেল।তার বেয়াদব বউ…মুখে আটা মেখে প্রায় ছোট্ট একটা ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
এক হাতে ময়দা অন্য হাতে চামচ।কপালে বিরক্তির ভাঁজ।দৃশ্যটা দেখেই ইউভির ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক টুকরো মুগ্ধ হাসি ফুটে উঠল।
সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়েই খুব নরম স্বরে বললো—
— “আমার আদর…”

পিয়াসা তখন ড্রইংরুমের বড় সোফায় বসে আয়াত আর আতিকার সঙ্গে গল্প আর দুষ্টুমিতে মেতে আছে।
এদিকে রান্নাঘরের সামনে এসে একবার ইনায়ার দিকে তাকাল ইউভি পকোড়া বানানোর দৃশ্যটা দেখে ইউভির ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।তারপর সে ধীরে ধীরে এসে পিয়াসার পাশে বসে পড়ল।পিয়াসা অবাক হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
— কিছু বলবে, ভাইয়া?
ইউভি ছোট্ট করে উত্তর দিল,
— হুম।
পিয়াসা আগ্রহ নিয়ে বলল,
— কী বলবে?
কিন্তু ইউভি কোনো উত্তর দিল না।
সে শুধু অপলক দৃষ্টিতে নিজের ছোট্ট বোনটার দিকে তাকিয়ে রইল।
পিয়াসা আবার কাঁধে আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল,
— ওই ভাইয়া… বলো না।
ইউভি মুচকি হেসে বলল,

— খুশি।
— অনেক খুশি তাই না?
পিয়াসা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— কেন বলো তো, ভাইয়া?
ইউভি হালকা হেসে বলল,
— এই যে… শেষমেশ একটা বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা হয়ে ঝুলেই গেলি।
পিয়াসা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— কে বাঁদর?
ইউভি একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
— আর কে! রেদোয়ান।
পিয়াসা এবার হেসে ফেলল।
— আর মুক্তোর মালা কে?
ইউভি স্নেহভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আমার একমাত্র বোন।
পিয়াসা খিলখিল করে হেসে উঠল।
— ভাইয়া…!
ইউভি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— দেখতে দেখতে আমার ছোট্ট বোনটা কত বড় হয়ে গেল।কথাটা শুনে পিয়াসা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।ইউভি আবার নরম গলায় ডাকল,
— বনু…
— হুম, ভাইয়া?

— আমি সবসময় আল্লাহর কাছে তোর জন্য এমন একজন জীবনসঙ্গীই চেয়েছি, যে তোকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসবে।আলহামদুলিল্লাহ… আল্লাহ ঠিক তেমন একজন মানুষকেই তোর জীবনে পাঠিয়েছেন। রেদোয়ান হয়তো সবার সামনে নিজের অনুভূতি খুব বেশি প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু মানুষটা ভীষণ ভালো। নিজের চেয়েও আমার কথা বেশি ভাবে। দাদুভাই চলে যাওয়ার পর ও-ই ছিল আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ। আমাকে ভাইয়ের চেয়ে বন্ধুই বেশি মনে করে।একটু থেমে সে মৃদু হেসে বলল, যে একটা বন্ধুর জন্য এত কিছু করতে পারে… এত ত্যাগ স্বীকার করতে পারে…
সে তার ভালোবাসার মানুষটার জন্য কতটা করতে পারবে, সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি।
তুই খুব সুখে থাকবি, বনু। আমার দোয়া আর ভালোবাসা সবসময় তোদের সঙ্গে থাকবে।
পিয়াসার চোখ দুটো ভিজে উঠল।ইউভি আবার বলল, আর একটা কথা…
রেদোয়ানের খেয়াল রাখিস। ওকে সবসময় বুঝে চলার চেষ্টা করবি। যেন কোনোদিন আমার বোনের নামে ওর একটুও অভিযোগ না থাকে।
পিয়াসা নীরবে ভাইয়ের প্রতিটা কথা মন দিয়ে শুনছিল।তার চোখের কোণে তখন চিকচিক করছে অশ্রুবিন্দু।ইউভি উঠে দাঁড়িয়ে আলতো করে তার মাথায় হাত রেখে বলল,

— আর আমি তো আছিই তোর পাশে সবসময়।
এই বলে পকেট থেকে দুটি খাম বের করে পিয়াসার হাতে দিল।পিয়াসা অবাক হয়ে বলল,
— এগুলো কী?
ইউভি দুষ্টু হেসে বলল, মালদ্বীপের দুইটা হানিমুন টিকিট। কাল সকালেই তোদের ফ্লাইট। দুজন একটু ঘুরে আয়। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলো তৈরি করে নিয়ে আয়।পিয়াসা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।চোখভরা জল নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে শক্ত করে ইউভিকে জড়িয়ে ধরল।কাঁপা গলায় বলল, ধন্যবাদ, ভাইয়া অনেক ধন্যবাদ।
ইউভি মুচকি হেসে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
— ধন্যবাদ না, বনু। শুধু সবসময় সুখে থাকিস।
তোদের হাসিটাই আমার সবচেয়ে বড় উপহার।
ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে ইনায়ার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ ভেসে এলো—
সবাই আসো… নাস্তা রেডি!তার ডাক শুনে একে একে সবাই ডাইনিং টেবিলে এসে বসল।
, রেদোয়ান, পিয়াসা, আয়াত, আতিকা, রিধ— ধীরে ধীরে চৌধুরী পরিবারের সবাই উপস্থিত হয়ে গেল।
ডাইনিং টেবিল ভর্তি গরম গরম চিকেন পকোড়া, সস আর ধোঁয়া ওঠা চা।ইউভি একটা পকোড়া তুলে মুখে দিয়েই নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,

— মা… এই খাবারটা কি মুখে দেওয়া যাবে তো?
পিয়াসা ফিসফিস করে বললো ভাইয়া, খেয়ে নাও। খারাপ হলেও কিন্তু কিছু বলা যাবে না। দেখছো না, তোমার বউটার মুখের কী অবস্থা? আটা মেখে একেবারে ভূত হয়ে গেছে। এত কষ্ট করে শুধু তোমার জন্যই নাস্তা বানিয়েছে!”
কথাটা শুনেই ইনায়ার মুখটা মুহূর্তেই কেঁদে ফেলার মতো হয়ে গেল।রেশমা চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে ইউভির মাথায় হালকা একটা চাঁটি মেরে বললেন,
মারব কিন্তু ইউভি মেয়েটার অবস্থা একবার দেখেছিস?সবার জন্য নাস্তা বানাতে গিয়ে আটা-ময়দা মেখে কী অবস্থা করেছে! আর তুই কিনা খাবার নিয়ে মজা করছিস!সবাই কথা টা শুনে হেসে উঠল।ইউভি চুপচাপ আরেকটা পকোড়া মুখে দিয়ে খেতে লাগল।আর মনে মনে বলল,
“ইসস… আমার বউয়ের সবকিছু এত মজা কেন!

এমনকি বউয়ের বানানো খাবার টাও”এদিকে ইনায়া ইতোমধ্যেই অভিমান করে গিয়ে নুসরাত চৌধুরীর পেছনে দাঁড়িয়েছে।মাঝে মাঝেই আড়চোখে লুকিয়ে লুকিয়ে ইউভির দিকে তাকাচ্ছে।সামনে গিয়ে তাকাবে না। কারন সে এখন অভিমানী করেছে
বিষয়টা ইউভির চোখ এড়াল না।নাস্তা শেষ করে সে ধীর পায়ে নুসরাত চৌধুরীর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
ইনায়া তখনও বুঝতেই পারেনি এখনো নিচের দিকে তাকিয়ে আছে পরের মুহূর্তেই ইউভি একদম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ইনায়ার শাড়ির আঁচলটা হাতে নিয়ে নিজের হাত মুছতে লাগল।
আর খুব আস্তে আস্তে গুনগুন করে গেয়ে উঠল—

শেহেজাদার আদর পর্ব ৬৫

“Mujhe tum chupke chupke
jab aise dekhti ho…
achchi lagti ho…”
হঠাৎ নিজের আঁচলে টান অনুভব করতেই ইনায়া ঘুরে তাকাল।ইউভির মুখে সেই দুষ্টু, বিজয়ীর হাসি।
ইনায়া চোখ দুটো বড় বড় করে মনে মনে বলে উঠল—
“ইয়া আল্লাহ… ধরা পড়ে গেলাম!”

শেহেজাদার আদর পর্ব ৬৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here