Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৭

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৭

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৭
অনামিকা তাহসিন রোজা

শ্রাবণের কথা শুনেছে ধারা। বরাবরই স্বামীর কাছে বাধ্য মেয়ে সে। তাই আর দুশ্চিন্তা করেনি সাদিক বা কনিকা কে নিয়ে। শ্রাবণ শেখ যখন কথা দিয়েছে যে তাদের খুঁজে বের করে আনবেই, তখন সেটাই হবে। শুধু শুধু অযথা দুশ্চিন্তা করবে না ধারা। তাই সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শ্রাবণের পাশে রেলিং এ হাত রেখে নিজেও দাঁড়ালো। শ্রাবণ কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে ধারার দিকে তাকালো একপলক। সে মোটেই এ বিষয়ে অবিশ্বাস করতে পারবে না যে সে পুরোপুরি ধারাতে মত্ত হয়ে গেছে, দুর্বল হয়েছে প্রবলভাবে। এক কথায় ধারা তার প্রয়োজন এবং প্রিয়জন। এমন এক প্রয়োজন যা অক্সিজেনের মত কাজ করে, বেঁচে থাকার অযুহাত দেয়। আর এমন এক প্রিয়জন যে কিনা সারাটা জীবন সঙ্গীনি হয়ে পাশে থাকবে, ভালবাসবে। ব্যস এইটুকুই! আর কিছু চাওয়া নেই শ্রাবণের।

মানুষের মন পরিবর্তনশীল। কিছু ক্ষেত্রে লোভী মনটা নীতি থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে সত্ত্বাকে। বায়না ধরে অনেক ধরনের চাওয়া-পাওয়া। যেমন এইতো এই মুহুর্তেই শ্রাবণ ভেবেছিল তার আর কিছুই চাওয়া-পাওয়ার নেই। অথচ সহসা তার ব্যকুল মনটা অবাধ্য হলো। এই তারাভরা সুন্দর রাতের আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে রূপার থালার ন্যায় চাঁদটা উপভোগ করার পাশাপাশি প্রিয়তমার সুরেলা কন্ঠে গান শুনতে ভীষন উদগ্রীব হলো। মনের চাওয়া-পাওয়া কখনো লুকোতে পারে না শ্রাবণ। তাই সে এক পলক ধারার ক্লান্ত মুখশ্রী দেখে সম্মানের সাথেই ডেকে উঠলো নরম সুরে,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—” মিসেস শেখ..!”
সম্বোধন টা খুবই আকর্ষণীয় ধারার জন্যে। যখনই শুনে, যতবারই শুনে, তখনই চমকে যায়, ততবারই শিহরিত হয়। এবারো হলো। এরপর মাথা নামিয়ে একটুখানি দৃষ্টি ফেলে সাড়া দিল,
—” হুম!”
—” এই স্নিগ্ধ রজনীতে আলোকিত তারাময় আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে নিজের সহধর্মিণীর মেনিমুখো গলায় খুবজোর একটা গান শুনতে পারলে অস্থির মনটা শান্ত হতো।”

বিশাল এক বাক্যে শ্রাবণ তার ছোট্ট আবদার টা তুলে ধরল ধারার সম্মুখে! নীরবে তার কথার ভেতরে থাকা শ্রদ্ধা টুকু দিয়ে বুঝিয়ে দিল, সামান্য এটুকু একটা আবদারটা তার কাছে কতটা মূল্যবান! কতটা গুরুত্বপূর্ণ! কতটা আবেগময়!
লজ্জাবতী গাছ ছুঁয়ে দিলে পাতার গুটিয়ে যাওয়ার মত শ্রাবণের এমন ভয়ানক আবদার শুনে ধারাও গুটিয়ে এলো। সর্বাঙ্গ অন্যরকম ভালো লাগায় ভরে উঠলো। সে একবার ভাবলো না করবে, রাজি হবে না। তবে চোখ তুলে তাকিয়েই অধীর মায়াভরা চোখ নিয়ে অপেক্ষারত পুরুষ টিকে দেখেই সমস্ত প্রতিবন্ধকতা ভুলে গেলো ধারা।
ঠোঁট ভিজিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করল। এই তিমিরান্তিক রাতে পাশে নিজের প্রিয় পুরুষ কে নিয়ে কেমন গান গাইতে হয়? জানা নেই ধারার। তবুও অনেকক্ষণ ভাবলো। সময় দিল শ্রাবণ। অনিমেষ তাকিয়ে রইলো ধারার লাল হয়ে থাকা মুখটির দিকে। বেশ কিছুক্ষণ যাওয়ার পর ধারা বড় করে শ্বাস নিল। অনেক ভেবেচিন্তে একটা গান পছন্দ করে গাইতে শুরু করল মিহি কন্ঠে,

—” দুটি মন আর নেই দুজনার,
রাত বলে আমি সাথী হব যে
ফাগুনের রাতে আমি
রূপকথা হয়ে কাছে রব যে।
দুটি মন আর নেই দুজনার!
ফুল বলে রঙে আর ছেও না
পাখি বলে আর গান গেও না
আমাদের মিতালীর মায়াতে
কানে কানে কত কথা কব যে!
দুটি মন আর নেই দুজনার!”

পুরোনো দিনের বাংলা গানে যে কতটা আবেগ রয়েছে তা আজকালকার জেনারেশন একটু চেষ্টা করলেই উপলব্ধি করতে পারবে৷ টের পাবে, আগের গানের মাধ্যমে কত ধরনের আবেগ প্রকাশ পায়। প্রত্যেক টা গানেই রয়েছে অনন্য অর্থ! ধারার গাওয়া গানটাও বেশ সুন্দর ছিল। শ্রাবণ মুগ্ধ হলো। সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হলো গানের কথা গুলোতে! ইশ! কোথায় যে হারিয়ে গেলো গানগুলো সব! আজকাল আর ইউটিউবে সার্চ দিয়ে জোর করে না দেখলে সামনেই আসে না। গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া কেও শোনেও না।

শ্রাবণ অজান্তেই চোখ বন্ধ করে ধারার গান শুনছিল। সুরেলা কন্ঠটা থেমে যেতেই সেও চোখ খুলে। ধারার দিকে দৃষ্টি ফেলে দেখল মেয়েটা কেমন থমথমে মুখ করে তাকিয়ে রয়েছে। ভ্রু উঁচিয়ে কী হয়েছে জানতে চাইলো শ্রাবণ। ধারা যেন হকচকিয়ে গেলো। কয়েক মুহূর্ত আগে পর্যন্ত যে গান গেয়ে তার সমস্ত হৃদয় ঢেলে দিয়েছিল, সেই আবেশেই ডুবে ছিল, এখন আবার বাস্তবের ভার তাকে চেপে ধরেছে। ঠোঁট কাঁপলো সামান্য, কিন্তু চোখের ভাষা গোপন করল না। সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো, অসংখ্য দ্বিধা, ক্লান্তি, তবু একটা গভীর ভালোবাসার আভাসও।
ধারা মন খারাপ প্রসঙ্গে কিছু বলল না। তবে হাতে থাকা দুটো কাজু বাদাম এবার শ্রাবণের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
—” আমি আপনার আবদার রেখেছি, এবার আপনি রাখুন। বাদাম দুটো খেয়ে নিন। আমি মোটেই দুর্বল নই। আপনি ফু দিয়ে চেক করুন, যদি সত্যি সত্যি না উড়ে গিয়েছি, তবে কিন্তু খুব খারাপ হবে!”
শ্রাবণ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকলো। তারপর ধীরে ধীরে একপলক হাসি ফুটলো ওর ঠোঁটে। ও এগিয়ে এসে খুব আলতো করে ধারার হাতটা ধরল। একটুখানি ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,

—” যথাআজ্ঞা মিসেস শেখ। আপনার কথা অমান্য করলে তো বিরাট পাপ হবে। তবে, বলতেই হয়, শেখ বাড়ির বউয়ের তেজ ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে। বাহ! অধিকারবোধ! হুম, আই লাইক ইট!”
বলেই ধারার হাত থেকে বাদাম তুটো খেয়েও নিল শ্রাবণ। ধারা কোনমতে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল। ধারার বুকটা আবার কেঁপে উঠলো। এত সহজে এই মানুষটা কেন তার ভেতরটা ভেঙেচুরে দেয়? তার স্বর কেঁপে উঠলো,
—” আপনি বারবার এমন বলেন কেনো? আমি তো শুধু আপনার স্ত্রী… এতটুকুই।”
শ্রাবণ এবার চোখ গাঢ় করে তাকালো ধারার দিকে। কণ্ঠের গভীরতায় যেন ঝড় বইলো,

—” না, তুমি শুধু স্ত্রী নও। তুমি আমার শান্তি, তুমি আমার শক্তি, তুমি আমার বেঁচে থাকার কারণ। আমি হয়তো সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারি, কিন্তু তোমার থেকে কখনো না। তোমাকে ছাড়া…আমি অসম্পূর্ণ।”
ধারা একেবারেই দমে গেলো। বুকের ভেতর তোলপাড় করা আবেগ আর চোখের পানির গড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত। কিন্তু তবুও জেদ ধরে কান্না আটকালো সে। মাথা ঘুরিয়ে আকাশের দিকে তাকালো। তারারাও যেন এ রাতে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, এই দুজন মানুষকে সাক্ষী রাখতে। শ্রাবণ নীরবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর হঠাৎ ফিসফিস করে বলল,

—” এমন করে আর দূরে সরে যেও না ধারা। আমি শপথ করছি, তোমার জীবনে আর কোনো ঝড় আসতে দেবো না।”
ধারা এবার চোখ বন্ধ করলো, ঠোঁট নড়ে উঠলো নিঃশব্দে। মনে হলো বলতে চাইছে, আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না, কেবল সেই নিশ্চুপ সম্মতি শ্রাবণকে উজ্জ্বল করে তুললো ভিতর থেকে। ধারা যখন ভাবলো মুহুর্তটা বোধহয় এভাবেই কেটে যাবে, তখন শ্রাবণ আবারো ডেকে উঠলো,
—” ম্যাডাম!”
অসহায় মুখ তাকালো ধারা। লোকটা কি তাকে মেরে ফেলার কৌশল করেছে? বারবার ভিন্ন ভিন্ন কাঁপিয়ে তোলা সম্বোধনে কেনো যে ডাকছে। মানুষটা কি বোঝে না, এসব সহ্য করার ক্ষমতা নেই ধারার। অতিরিক্ত সুখ অনেকসময় অসহ্যকর হয়ে পড়ে মানুষের। কিন্তু কী আর করার! শ্রাবণ শেখ ডেকেছে যে! ধারা কে তো তার ঐতিহাসিক ভঙ্গিতে সাড়া দিতেই হবে,

—’ হুমম! ”
শ্রাবণ এবার বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে কন্ঠে একরাশ মায়া মিশিয়ে বলতে শুরু করল,
—” বিমূর্ত এই রাত্রি আমার
মৌনতার সুতোয় বোনা
একটি রঙ্গিন চাদর।
সেই চাদরের ভাজে ভাজে
নি:শ্বাসেরই ছোঁয়া,
আছে ভালবাসা, আদর।”
খুব সাবলীল ভাবে কথাগুলো বলে ধারার দিকে তাকালো শ্রাবণ। বিস্ময়াভিভূত মেয়েটার কপালে দু আঙুলে টোকা দিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—” গানটা কি পারো তুমি?”
খানিক অবাক হলো ধারা। চোখ পিটপিট করে শুধালো,
—” এটা বুঝি গান ছিল?”
ফিক করে হাসলো শ্রাবণ,
—” হুম, গানই তো।”
—” তবে আপনি গেয়ে শোনালেন না কেনো?”
ধারার অভিমানী কন্ঠে বলা কথাটায় আবারো নিঃশব্দে হাসলো শ্রাবণ। ঠোঁট কাঁমড়ে বলল,
—” আমি গাইতে পারি না। কথাগুলো ভালো লাগে। তাই কবিতার মত বললাম। তুমি এই গানটা শিখে নিও। তোমার কন্ঠে শুনতে চাই!”
ধারা রাজি হলো। হাসি মুখে মাথা দুলিয়ে কিছু একটা মনে পড়তেই উচ্ছ্বসিত হলো। শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,

—” আপনি কি কাল অফিসে যাবেন?”
শ্রাবণ মাথা নাড়লো, সে যাবে। ধারা থুতনিতে আঙুল বুলিয়ে কিছু একটা চিন্তা করে বলল,
—” পরশু তো শুক্রবার। ফ্রি থাকলে আমায় একটু ঘুরতে নিয়ে যাবেন?”
মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি— এই বিষয়টার মত ধারার কথাটা হয়ে গেলো। কারন শ্রাবণ নিজেই এই কথাটা বলতে চাইছিল ধারাকে। মিসেস শেখের নিজের এমন আবদার করাতে আরেকটু ভালো লাগলো শ্রাবণের। সে এবার ধারার হাত ধরে বলল,

—’ কাল যেতে চাও? অফিসে যাব না তাহলে।”
আঁতকে উঠলো ধারা। এই লোক পাগল নাকি? অফিস ফাঁকি দিয়ে ঘুরতে যেতে চাইছে। তাই দুহাত নেড়ে বলল,
—’ না না, কাল যাব না। আপনার অফিস আছে। পরশু নিয়ে যাবেন।”
শ্রাবণ ঠোঁট চেপে বোঝার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো। এরপর ধারার হাত ধরে নিজের কাছে টেনে আনলো। যন্ত্রের মত এগিয়ে আসলো ধারা। এবার পেছন থেকে শ্রাবণ জড়িয়ে ধরল আলতো করে। ঘাড়ে থুতনি ঠেকিয়ে আদুরে ভঙ্গিতে জানতে চাইলো,

—’ কোথায় ঘুরতে যাবে বলো!”
মন খারাপ হলো ধারার। মিনমিন করে বলল,
—” আমি তো এখানকার কিছু চিনি না। একটা সুন্দর জায়গাতে নিয়ে যাবেন, যেখানে সেই বেলী ফুল আছে, ফুচকা আছে।”
শ্রাবণ মানলো। মাথা নেড়ে কঠোর মুখভঙ্গি করে বলে উঠলো,
—” ঠিক আছে ম্যাডাম! তেমনটাই হবে। তবে পরশু আমি ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তোমায় আরেকটা… না না, আরো দুটো জায়গায় নিয়ে যাব।”
ধারা উদগ্রীব হলো,

—” কোথায়?”
শ্রাবণ ধারার নাকটা আদুরে ভঙ্গিতে টেনে দিয়ে বলল,
—” সেটা তো সারপ্রাইজ! বলা যাবে না।”
ধারার ভালো লাগলো। অন্যরকম ভালো লাগলো। সারপ্রাইজ জিনিস টার মাঝে একটা জাদু আছে, যা যেকোনো মানুষের খুশি আনতে পারে। পরবর্তীতে সেই সারপ্রাইজ ছোট কোনো গিফট হলেও আনন্দ তেমনই থাকে। তাই ধারাও খুব খুশি হলো। এক মুহুর্তের জন্য একটু আগের কষ্ট ভুলে গিয়ে আনন্দে বিমোহিত হয়ে বড় করে শ্বাস টানলো। তবে ভুলল না কনিকার কথা, শুধু বিড়বিড় করে বলল,—যেখানেই আছিস, ভালো থাকিস বোন!

মহান সৃষ্টিকর্তাই মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করেন। কথায় আছে, তিনি যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। মাঝে মাঝে এ কথার কোনো যুক্তি মানুষেরা খুঁজে না পেলেও অধিকাংশ সময় তা ফলে যায়। হয়তো সাদিক- কনিকার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। সাদিক আগে থেকেই কনিকা কে পছন্দ করতো, তাকে বউ হিসেবে পেয়ে সে মোটেই কষ্ট পায়নি। সে মেয়েটাকে পেতে চেয়েছিল। তবে দুঃখের কথা হলো, এতটা বাজে ভাবে পেতে চায়নি। সেদিন গ্রাম থেকে বের করে দেয়ার পর কনিকা আ’ত্ম’হ’ত্যা করার চেষ্টা করেছিল। একমাত্র সাদিকই জানে সে কতটা কষ্ট করে মেয়েটাকে সামলিয়েছে। পাগলের মত কান্নাকাটি করেছিল মেয়েটা। অনুমতি না থাকায় বেচারা সাদিক পারেনি বুকে আগলে নিতে, আদুরে মুখটায় আদর করে বলতে, তুমি কষ্ট পেও না। আমি তো আছিই।

সাদিকের এক বাল্যকালের বন্ধু ছিল। নাম আতিক। সে গত বছরে নদীতে গোসল করতে গিয়ে মারা গিয়েছিল। তার বিধবা মা, পাশের গ্রামেই একটা বাড়িতে একা বসবাস করত। একমাত্র ছেলে মারা যাওয়ায় মহিলা ছিলেন একদম নিঃস্ব। সাদিক বিসমিল্লাহ বলে সেই আতিকের বাড়িতে পা রেখেছিল। একটু আশ্রয়ের আশায়। আতিকের মা কে সব বুঝিয়ে বলেছিল কিছুদিনের জন্য আশ্রয় দিতে, পরে ব্যবস্থা হলে কয়েকমাসের মধ্যেই তারা চলে যাবে৷ আতিকের মা একটুও বিরক্তবোধ হননি। বরং কনিকা কে আদর করে ঘরে উঠিয়েছিলেন। সাদিককে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন,
—’ যতদিন ইচ্ছা তোরা এইখানে থাকিস। আমার এ জীবনে আর কিছু নাই রে। তোদের আসাতে খুশি হইছি। আবারো এক ছেলে পাইলাম, সাথে বউমাও!”

কনিকা স্তব্ধ হয়ে ছিল। সাদিক যা যা করতে বলেছে তাই রোবটের মত করেছে। সাদিকের খুব খারাপ লাগছিল এই ভেবে যে সে কনিকা কে হাসিখুশি ভাবে পেলো না। তবে ওইদিন রাতে যখন সাদিক আর কনিকা কে এক ঘরে থাকতে দেয়া হলো, সেদিনই যা হবার হলো। সাদিক ভেবেছিল মেয়েটা তাকে অবহেলা করবে৷ তাই সে মেঝেতে পাটি বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কনিকা কে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সকাল বেলা উঠে দেখেছিল তার চওড়া বুকে বিড়ালের মত গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে কনিকা। চোখের নিচে পানির দাগ এখনো স্পষ্ট। নিজের পরনের শার্টটার বুকের অংশ ভেজা দেখে সাদিক বুঝলো, মেয়েটা সারারাত তারই বুকে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়েছে। অবাক হলো সে, কষ্ট পাওয়ার সাথে সাথে অন্যরকম ভালো লাগা অনুভব করল। বুঝতে পারল, মেয়েটা তার কাছেই আশ্রয় নিয়েছে। বুঝেছে সাদিক ছাড়া তার আর কেও নেই। সেই অভিশপ্ত মুহুর্তটা তে ভীষণ বিতৃষ্ণা নিয়ে কবুল বললেও, সেই সকালে সাদিক কনিকা কে জড়িয়ে নিয়ে বিড়বিড় করে মন থেকে বলেছিল,

—” কবুল, কবুল, কবুল!”
আর কনিকার মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে বিমুগ্ধ হয়ে উচ্চারণ করল
—” আলহামদুলিল্লাহ!”
তাই সব মিলিয়ে শ্রাবণের কথাই সত্য হলো। সাদিক কনিকার সাথে সেই বাড়িতে বেশ ভালো করেই থাকছিল। কনিকার মধ্যে কয়েকদিন বেশ সংকোচ ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সাদিক কে এবার অন্য চোখে দেখা শুরু করলো। পরিবর্তন হলো ডাক, পরিবর্তন হলো কথা বলার ভঙ্গি। সাদিকও এদিক সেদিক কাজ করে চাকরি জোগাড় করার চেষ্টা করতে থাকলো৷ আপাতত খামারে কাজ করছে সে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যপার এই যে, এই কয়েকদিনেও কেও কনিকার খোঁজ নিতে আসেনি৷ কনিকার বাবা -মাও খোঁজেনি মেয়েটাকে। কনিকা এখনও ভাবে, কেনো বাবা-মা তাকে খুঁজছে না? তারা কি কনিকা কে মৃত ভেবে ভুলে গেলো? এসব ভাবলেই বুক ফেটে কান্না আসে কনিকার! কিন্তু কাঁদে না। আর কাঁদলে তো হবে না। তাকে শক্ত থাকতে হবে।

রাতটা কোনোমতে কাটিয়ে সকাল সকাল গোসল করে তৈরী হয়ে নিল শ্রাবণ। জিহান এবং মুনিরার বিষয়টা নিয়েও সে খুব চিন্তিত। মুনিরা উধাও। এদিকে যদি এখন জিহান কেও খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে তো কিছুই হবেনা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শার্ট পড়ছিল শ্রাবণ। তখনি বারান্দা থেকে স্নিগ্ধ ফুলটা ঘরে ঢুকলো। সহসা মিষ্টি একটা গন্ধ পেলো শ্রাবণ। চোখ বুঁজে বুক ভরে টেনে নিল সুবাস টা। ধারা বারান্দা থেকে এসে বিছানায় বসে বসে শ্রাবণের রেডি হওয়া দেখছে। শ্রাবণ আয়না দিয়ে ধারাকে এক পলক দেখে নিয়ে মিষ্টি হেসে জানতে চাইলো,

—” কী দেখছো?”
হা করে তাকিয়ে ছিল ধারা। শ্রাবণের কথায় সংবিৎ ফিরে পেয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
—” না না, তেমন কিছু না!”
দুষ্টু হাসলো শ্রাবণ,
—” তাহলে কেমন কিছু?’
ধারা এবার আমতা আমতা শুরু করলো। সত্যি কথাটা কী বলা যায়? কিছুক্ষন নিজের মনের সাথেই যুদ্ধ চালালো ধারা। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে ভীষন রকম লজ্জা পেয়ে বলেই বসলো,
—” আপনাকে সাদা শার্টে দারুণ মানায়। আমার খুব পছন্দ। ”
প্রশংসা পেয়ে খুশি হলো না শ্রাবণ। কী যেন একটা কমতি হলো। তাই ভ্রু কুঁচকে আসল কথা জানার জন্য জিজ্ঞেস করে বসলো,

—” সাদা শার্ট পছন্দ, নাকি সাদা শার্টে আমায় পছন্দ?”
ধারা মিথ্যে বলে না। শ্রাবণকে তো বলবেই না। আবার মিথ্যে বললে যদি রেগে যায়! তাই, ঠোঁট চেপে মাথা নিচু করে আঙুলে ওড়না দিয়ে খুট পাকিয়ে মিনমিন করে বলল,
—’ সাদা শার্টে আপনাকে পছন্দ! ”
খুশি হলো শ্রাবণ। মনে মনে বিজয়ের হাসি হাসলো। তবে বাইরে থেকে কঠোর মনোভাব বজায় রেখে বড় করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হতাশ হয়ে বলে উঠলো,
—” তবুও “ভালোবাসি” বলবে না? তোমার মুখ থেকে এই কথা শোনার জন্য আমায় তপস্যা করতে হবে মনে হয়!”
অবাক হলো ধারা। সোজা হয়ে বসে বিস্ময় নিয়ে বলে উঠলো,
—” বলিনি মানে? বলেছিলাম তো!”
তৎক্ষনাৎ মাথা নেড়ে প্রতিবাদ করল শ্রাবণ। আয়নায় তাকিয়ে নিজের চুল ঠিক করে টাই পড়তে পড়তে বলল,
—” কখন? কবে?”
ধারা জেদ ধরে বলল,

—” আপনার মনে নেই? আমি তো বলেছি। ওই যে সেদিন যে আপনাকে জড়িয়ে…
বলতে বলতেই থেমে গেলো ধারা। হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল। বড় চোখ করে তাকালো শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি দেখে যা বোঝার বুঝে নিল। তাই মিনমিনিয়ে বলে উঠলো,
—’ আমি বলেছি। আপনার মনে নেই।”
শ্রাবণ ঠোঁট কাঁমড়ে কাঁধ উঁচিয়ে বলল,
—’ কি জানি! আমার তো একটুও মনে নেই!”
ধারা মনে মনে মুখ ভেঙচালো। ইশ! মিথ্যে কথা বলার জায়গা পায় না। ঠিকই মনে আছে নিজেরও। অথচ নাটক করছে! ধারা মনে মনে পণ করল, সেও এসব কখনো স্বীকার করবে না। তবে শ্রাবণের দুষ্টু হাসিতে ধারাকে তেঁতে উঠে বলল,

—” গতরাতে কতবার বললাম, বাদাম দুটো খেয়ে নিন। কথা তো শুনছিলেন না। দেখেছেন, আপনার কেমন স্মৃতিশক্তি লোপ পাচ্ছে! এই জন্যই গরিবের কথা বাসি হলেও ফলে! হুহ!”
বলেই মুখ ভেঙচালো ধারা। তা দেখে ফিক করে হাসলো শ্রাবণ। তার সাথে মেয়েটাকে ফ্রি হতে দেখে খুশি হলো। এইতো ধীরে ধীরে আর পাঁচটা দম্পত্তির মত তারাও খুনসুটি করছে। বুক ভরে গেলো শ্রাবণের। কিছু একটা ভেবে হাত নিশ্চল রেখে কঠোর মুক্তি বজায় রেখে আদেশ ছুঁড়লো,
—” আমার টাই টা একটু বেঁধে দেবে?”
ধারা বিস্ফারিত চোখে তাকালো শ্রাবণের দিকে। চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বলল,
—”আমি?”

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটি হালকা ঘাড় কাত করে চওড়া হাসি দিয়ে বলল,
—” হ্যাঁ, তুমি ছাড়া আর কে? নিশ্চয়ই পাশের বাসার আন্টি আসবেনা। স্ত্রী হয়ে যদি স্বামীর টাই-টুকু বাঁধতে না জানো, তবে তো মহা লজ্জার ব্যাপার।”
ধারা একদম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। পাশের বাসার আন্টির কথা শুনে অসহায় মুখ করে তাকালো। তার সত্যিই খুব মায়া হয়। লোকটা কোনো কারন ছাড়াই আন্টিকে ডেকে আনে। সে এবার ভাবুক হয়ে বলল,
—” কিন্তু আমি তো জানিই না কীভাবে বাঁধে এগুলো!”
শ্রাবণ এবার আয়না থেকে সরে সামনে ফিরে তাকালো। গম্ভীর চোখে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। তারপর মুচকি হেসে এগিয়ে গেল ধারার দিকে। দু’হাত ভাঁজ করে তার সামনে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বলল,
—” জানো না? তাহলে শিখে নাও। আমি শিখিয়ে দিচ্ছি। এসো!”

বলেই হাত ধরে টেনে আনলো। ধারার বুকটা ধক করে উঠলো। মুখের সব রঙ গাঢ় লাল হয়ে গেলো। কী করবে কিছু বুঝলো না। তবুও কেমন যেন মোহাবিষ্ট হয়ে এগিয়ে এলো। আঙুলগুলো কাঁপছিল, তবুও শ্রাবণের টাইটা হাতে নিলো সে। শ্রাবণ খুব মনোযোগ দিয়ে ওর প্রতিটি চলন দেখছিল। যতবার ধারা ভুল করল, ততবার সে দু’হাত দিয়ে আলতো করে ওর হাতের উপর নিজের হাত রেখে ধরিয়ে দিল,
—” না, এভাবে না। এই ফাঁক দিয়ে নিতে হবে। হ্যাঁ, এখন এভাবে ঘুরিয়ে…!”
ধারা শ্বাস নিতে পর্যন্ত ভুলে যাচ্ছিল। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা মনে হচ্ছিল শ্রাবণও শুনতে পাচ্ছে। এত কষ্ট করে কেও পাথরও ভাঙে না। একসময় টাই বাঁধা শেষ হলো। ধারা তাড়াতাড়ি হাত ছেড়ে পিছিয়ে গেল, যেন ধরা খেয়ে গেছে। শ্রাবণ আয়নার দিকে তাকিয়ে হাসি চেপে বলল,

—” মন্দ হয়নি। তবে আরেকটু প্র্যাকটিস করলে বেশ হয়ে যাবে।”
ধারা মুখ নামিয়ে গুনগুন করে বলল,
—” আমি তো পারিনা, তাই করতে চাইনি… আপনি-ই জোর করলেন।”
শ্রাবণ এবার সরাসরি ওর দিকে ঘুরে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ওর চোখের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,

—” সব শিখবে ধারা। শিখতে হবে তো। কারণ, আমি চাই তুমি শুধু আমার জন্যই সব শিখো।”
ধারা চোখ বন্ধ করে ফেললো। এত কাছাকাছি এই মানুষটাকে পেয়ে তার আর কোনো ভাষা রইলো না। কেবল নিঃশ্বাসের শব্দই যেন ঘর ভরিয়ে তুললো। শ্রাবণ এবার মিষ্টি হেসে সুটকেস হাতে নিয়ে বেরোতে চাইলে হুট করে টান অনুভব করে। ফিরে চাইতেই দেখে ধারা তার শার্টের হাতার কোণা একটুখানি টেনে ধরেছে৷ শ্রাবণ ফিরে জিজ্ঞেস করল,
—” কী? ”
ধারা ভীষন লজ্জা পাচ্ছে। তবে কিছু করার নেই। তার বদ অভ্যাস হয়েই গেছে। খুব কম সময়েই লোভী হয়েছে বোধহয়। তাই খুব আমতা আমতা করে বলে উঠলো,
—” আপনি বোধহয় কিছু ভুলে যাচ্ছেন!”

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৬

শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে ভাবলো। কিছু ফেলে যাচ্ছে কিনা দেখলো। নাহ, সবকিছু তো ঠিকঠাকই রয়েছে। তাই বিভ্রান্তিকর দৃষ্টিতে ধারার দিকে তাকিয়ে বোঝালো সে কিছু ভুলে যায়নি মনে হয়। অথচ ধারা ঠোঁট উল্টে রইলো। বেশ কিছুক্ষণ পর শ্রাবণ বুঝতে পারল সে কী গুরুত্বপূর্ণ কাজটা করতেই ভুলে গেছে৷ মনে পড়তেই শীট বলল শ্রাবণ। নিজের প্রতিই বিরক্ত হলো। সুটকেস টা আবারো রেখে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো ধারার মুখোমুখি। মাথা নিচু করে থাকা ধারার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে থুতনি ধরে তুলে ধরল লাজে রাঙা মুখটা। সময় নিয়ে চুমু খেলো কপালে। প্রতিদিন অফিস যাওয়ার আগে এই কাজটা করা খুবই জরুরি। নইলে সারাদিন কারোরই ভালো কাটে না। কপালে উষ্ণ ঠোঁট জোড়ার স্পর্শে কেমন যেন আবেশে ডুবল ধারা। চোখ বুঁজে শ্বাস নিল বড় করে, সহসা পেল মন পাগল করে দেয়ার মত একটা সুবাসের। বুঝতে পারল শ্রাবণ শেখের পারফিউমের সাথে নিজের গায়ের ঘ্রাণটা মিলেমিশে একাকার হয়ে নেশালো গন্ধ টা সৃষ্টি করেছে। নিজেকে সুখী মনে হলো ধারার৷ আজ খুব করে বলতে ইচ্ছে করল, হ্যাঁ সে সুখী। ভীষণ সুখী!

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৮