শ্রাবণ ধারার রূপকথা শেষ পর্ব
অনামিকা তাহসিন রোজা
কথা রেখেছে শ্রাবণ। একটুও গড়িমসি না করে ধারা কে নিয়ে রাত দশটার পর বেরিয়ে পড়েছে ফুচকা খাওয়ার উদ্দেশ্যে। এত রাতে ফুচকাওয়ালা নাও থাকতে পারে। তাই সন্ধ্যা তেই শ্রাবণ খবর নিয়ে এসেছে যে ব্রিজের ওপারে ফুচকার দোকান বসবে কিনা, এবং রাত বারোটা পর্যন্ত সমস্ত ফুচকা ওয়ালারা এই ব্রিজের ওপরে থাকে বলে তারা নিশ্চিত করেছে শ্রাবণক। ধারা তো শুনে মহাখুশি। রাতের বেলা ভদ্র মেয়ের মত সমস্ত খাবার ঠিক করে খেয়ে এসে আপাতত শ্রাবণ শেখের মন রক্ষার চেষ্টায় রয়েছে এবং তাতে সফলঃ হয়েছে। তারই ফল সে এখন শ্রাবনের সাথে গাড়িতে করে ব্রিজের ওপরের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। ধারার খুশি দেখে কে? শ্রাবণ বউয়ের দিকে তাকাচ্ছে আর ভ্রু কুঁচকে ভাবছে ফুচকার প্রতি এত ভালোবাসা কেন? কী আছে ফুচকার মধ্যে, যা শ্রাবণের মধ্যে নেই! সর্বনাশ! শেষে কিনা শ্রাবন শেখ ফুচকা কেউ হিংসা করা শুরু করলো? অবশ্য কারণ রয়েছে। আজকাল সে দেখতে পাচ্ছে তার বউ তাকে বাদে দুনিয়ার সবকিছুকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসছে, যা মনে মনে একদমই সহ্য করছে না শ্রাবণ শেখ। তার মতে তার বউ শুধু তাকেই ভালবাসবে! কেন ফুচকা, চটপটি, চকলেট, আইসক্রিম এসব কে ভালবাসতে যাবে? অত্যন্ত মারাত্মক ভাবনার বিষয়!
এসব ভাবতে ভাবতেই গন্তব্যে পৌঁছে গেল শ্রাবণ ও ধারা। গাড়ি থামাতেই শ্রাবণ বেরিয়ে এসে ধারার দিকের দরজা খুলে দিল। হাত বাড়িয়ে দিল বউয়ের দিকে। চোখ দিয়ে শাসিয়ে বলল,
—”আস্তে ধীরে নামো। ”
ধারা অসহায় নেত্রে চেয়ে থেকে বলে উঠলো,
—” আপনি এমন করছেন, যেন আমার নয় মাস হয়ে গিয়েছে। এখনো তো কিছুই হয়নি। দেখুন, পেট টাও এখনো ঠিকঠাক করে ফুলেনি। ”
বলেই নিজের পেটে হাত দিয়ে দেখলো ধারা।
শ্রাবণ সাথে সাথে ধমক দিল। ভুলে গেল তার বউয়ের প্রতি ভালোবাসা, আদর, স্নেহ সবকিছু। শাসিয়ে রাম ধমক দিয়ে বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—” আমার থেকে তুমি বেশি বোঝো? বেয়াদব! যা বলছি তাই করো। এখনো পেট ফুলেনি বলে কি তুমি লাফিয়ে লাফিয়ে ব্যাঙের মতো বেড়াবে?আহাম্মক কোথাকার!”
ধারা ছলছল নয়নে তাকালো শ্রাবণের দিকে। লোকটা যখন তখন যেখানে সেখানে তাকে ধমক দেওয়া শুরু করেছে। এমন চলতে থাকলে তো ধারা গুটিয়ে যাবে। মান সম্মান কি আর থাকবে? আসলে শ্রাবণ এমন এক অবস্থায় পড়েছে যে সে না পারছে সহ্য করতে, না পারছে কিছু বলতে। এমনিতেই ছেলেটা সবকিছু নিয়ে অনেক বেশি চিন্তিত। ধারার জন্য প্রচুর পরিমাণে চিন্তায় আছে সে। তার ওপর এসব কাহিনী দেখে তার মাথা কাজ করছে না। তাই রাগের মাথায় ধারা কে ধমক দিয়েছে সে। অকারণে এভাবে রাগ দেখালো তার মুরগির বাচ্চার মত বউটাকে।
কিন্তু পরক্ষণেই ধারার চোখ জোড়া দেখে সে বুঝতে পারল যে এই সময়ে এই মুহূর্তে সে কত বড় ভুল করে ফেলেছে। সাথে সাথে মনে মনে নিজেকেই থাপ্পড় মারল শ্রাবণ। এরপরে ঠোঁট ভিজিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে অনেক বেশি মিষ্টি সুরে ধারা কে বলল,
—” না মানে, প্রথম থেকেই সতর্ক থাকা ভালো ধারা। তুমি এত অগোছালো কেনো বলোতো? নিজের বেলাতেই কোনো কিছু খেয়াল করো না! আর এদিকে আমার কিছু হলেই তো হুট করে ম্যাচিইউর্ড হয়ে যাও।”
শ্রাবণের অভিযোগ মেশানো কথাটায়ও হেসে ফেলল ধারা। বাড়িয়ে দেয়া হাত টা ধরে উঠে এলো গাড়ি থেকে। শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বলল,
—” আমায় বকাবকি করার জন্য এক প্লেট ফুচকা বেশি খাব।”
শ্রাবণ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। ধারার হাসি মুখটা দেখে আর দ্বিমত করলো না। বুক ভরে শ্বাস ফেলে ধারার হাত ধরে নিয়ে এলো একটা ফুচকার দোকানের সামনে। সেখানে ধারাকে একটা টেবিলে বসিয়ে মধ্যবয়সী ফুচকাওয়ালা মহিলা টিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
—” বউ কে নিয়ে এলাম চাচি। ফুচকা বানাতে শুরু করুন, আমি আসছি।”
বলে ধারাকে বলল,
—” আমি গাড়ি পার্ক করে রেখে আসছি। তুমি বোসো এখানে। হুম?”
ধারা মাথা নেড়ে ঠিক আছে বলল। শ্রাবণের প্রস্থানের পরই মাঝবয়সী মহিলা টি আঁচলে নিজের হাত মুছে এগিয়ে এসে ধারাকে দেখে বলল,
—” মাশাআল্লাহ! বউ তো দেখি চাঁদের টুকরা। নাম কী তোমার মা?”
ধারা হেসে বলল, ” ধারা…ধারা শেখ।”
মহিলা টি বোধহয় খুশি হলেন ভীষণ। মিষ্টি মুখে বললেন,
—” ফুচকায় কি ঝাল দেব?”
ধারার চোখ চকচক করে উঠলো। ও আশেপাশে তাকিয়ে সতর্ক হয়ে তাড়াহুড়ো করে বলল,
—” জ্বি হ্যাঁ, অনেক বেশি ঝাল দেবেন। উনাকে আবার বলবেন না ঠিক আছে? আমি অনেকদিন ঝাল ফুচকা খাইনি। পারলে বোম্বাই মরিচ দিবেন।”
মহিলাটিও হেসে বলল,—” আইচ্ছা।”
তারপর ফুচকা বানাতে চলে গেলো। ধারা আশেপাশে তাকিয়ে জায়গা টা লক্ষ্য করতে থাকলো। কেনো যেন হুট করেই বুক ভার হয়ে গেলো তার। মাত্রই তো ঠিক ছিল সব। হুট করেই কেনো যেন ধারার মনে হলো সে কিছু একটা ভুলতে বসেছে। গ্রাম থেকে আসার পর সে একটা দিনও চাচা চাচি, কনিকা, তার ভাই দুটোর কোনো খোঁজ নেয়নি। তৎক্ষণাৎ ধারার বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। ফুচকাতে ঝাল দেওয়ার কথাটা বলার কারণেই তার কণিকার কথা মনে পড়েছে। মেয়েটা প্রচুর ঝাল খেতে পারত। না জানি কোথায় আছে এখন, কেমন আছে, তাও জানা নেই। সেই ঘটনাটা তো প্রায় ভুলতে বসে ছিল ধারা। অথচ এতটাই ভয়ানক সেই কাহিনী যে লোম খাঁড়া হয়ে যায়। এই মুহুর্তে এই জায়গায় বসে ধারা নিজেকেই দোষারোপ করতে থাকলো। আর বারবার মনে হলো, শুধুমাত্র তার জন্যই কনিকাকে গ্রাম ছাড়া হতে হয়েছে। বাড়িছাড়া হতে হয়েছে। ঘরছাড়া হতে হয়েছে। এই ভেবেই ধারার চোখে আপনাআপনি পানি চলে আসলো। অথচ বোকা মেয়েটা এটাও জানে না যে, যদি সত্যিই এমনটা হতো, তাহলে হয়তো শুধুমাত্র তার জন্যই কনিকা এখন সুখে আছে। সংসার করতে পারছে।
হুট করেই নিজের গালে কারো হাতের ঠান্ডা স্পর্শ পেল ধারা। চমকে তাকিয়ে দেখলো শ্রাবণ একরাশ মায়া ভরা দৃষ্টিতে ধারাকে দেখছে, আর তার চোখের পানি মুছে দিচ্ছে। ধারা নিজেকে সামলে দ্রুত ঠিকঠাক করে নিল। দ্রুত চোখের পানি মুছতে গেলে শ্রাবণ ফট করে তার হাত ধরে ফেলল, এরপরে নিজের হাতের মুঠোয় আদুরে হাত দুটো নিয়ে মিষ্টি স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—” কাঁদছো কেন? কী হয়েছে?”
ধারা জবাব না দিয়ে আগে মুখ লুকিয়ে চোখের পানি মুছতে ব্যস্ত হলো। শ্রাবণ ধারার পাশে ঘেঁষে বসে আবারো টেনে নিলো কাছে। বলল,
—” এক সেকেন্ডের জন্য আমি তোমার থেকে দূরে গেলে, সবসময় এসে দেখি তোমার চোখে পানি। এমনটা কেনো? এমন হতে থাকলে তো আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতেই পারবো না।”
ধারা নিজেকে সামলাল। উল্টো শ্রাবণের প্রশ্নের জবাবে অভিমানী স্বরে হেসে বলল,
—” আপনি আমায় ছেড়ে যাবেনই বা কেনো? আমায় ছেড়ে না গেলেই হয়। যখন বুঝেনই যে আপনাকে ছাড়া একটা সেকেন্ডও আমার বিষের মত মনে হয়, তবে কেনো ছেড়ে যেতে চাইবেন?”
শ্রাবণ ঠোঁট কাঁমড়ে হাসল। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
—” হুম, তাও ঠিক। এই জন্যই তো ছাড়ার প্রশ্নই উঠে না। সম্ভব হলে তোমায় সারাক্ষণ নিজের সাথে বেঁধে রাখতাম। আজকাল ঘুমোতেও ভয় লাগে।”
ধারা অবাক হলো। হতবাক হয়ে জিনিস করলো,
—” কেনো?”
শ্রাবণ এমনভাবে তাকালো যেন কেও চুরি করার পর জিজ্ঞেস করছে চুরি করা কি পাপ? ধারার দিকে তাকিয়ে শ্রাবণ কঠোর ব্যক্তিত্ব নিয়ে বলল,
—” মনে নেই? সেদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙেছিল আমার, তখন বারান্দায় গিয়ে আমি কী দেখেছি তা মনে নেই? হাউমাউ করে বারান্দায় বসে কে কাঁদছিল? ভূতে?”
ধারা তটস্থ হলো। আশেপাশে তাকিয়ে এড়িয়ে যেতে চাইলো বিষয়টা। আসলে কয়েকদিন আগে শ্রাবণ মাঝরাতে হুট করেই চমকে ওঠে। হঠাৎ করে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় সে পাশে দেখে ধারা নেই। সব সময় সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই শ্রাবণ ধারাকে নিজের বুকের কাছেই দেখে। কিন্তু মাঝরাতে ধারা কে না দেখে তার মাথা ঠিক থাকে না। নানা ধরনের ওলোটপালট চিন্তা তার মাথাতে ঘুরপাক খেতে থাকে, এবং সে দ্রুত বিছানা থেকে উঠে সারা ঘরে খুঁজতে থাকে ধারাকে।
তখন বারান্দায় দৃষ্টি ফেলে এসে দেখে যে ধারা হাউমাউ করে কাঁদছে। অকারণে মেয়েটাকে এভাবে কাঁদতে দেখে শ্রাবণ কোনো কিছু বুঝতে পারে না। শুধু দ্রুত গিয়ে মেয়েটাকে আগলে নিয়েছিল বুকে। পরবর্তীতে বারবার জিজ্ঞেস করার পরেও ধারা বলেনি যে সে কেন কাঁদছিল। অনেক জোর জবরদস্তি করার পর ধারা শুধু এইটুকু বলেছে যে, তার বাড়ির কথা মনে পড়ছে, খারাপ লাগছে। এটুকুই! ব্যাস।
কিন্তু শ্রাবণ জানে যে এটা কোনো যৌক্তিক কারণ নয়। ধারা শুধু শুধু কাঁদছিল না। অবশ্যই কোনো অন্য কারণ ছিল। এই জন্যই কাঁদছিল। কিন্তু জেদি ধারা মোটেই মুখ খুলেনি, শ্রাবণ ওই ঘটনাটা কে ইঙ্গিত করেই কথাটা বলেছে। ধারাকে এখন এভাবে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলতে দেখে শ্রাবণ ব্যঙ্গ করে বলল,
—’ সেই রাতের কথা কিন্তু আমি এখনো ভুলিনি ধারা। এজন্য আমার এখন ঘুমোতেও ভয় লাগে। আমি ঘুমালে যদি তুমি একাকী কোথাও গিয়ে কান্নাকাটি শুরু করো। তোমায় বারবার বলেছি যে সব কথা আমায় বলবে, এমনকি যদি কাঁদতে মন চায় তবে আমার বুকের কাছে এসে কাঁদবে। আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে কান্না থামিয়ে দেবো আমি। একা একা কান্না করে, কান্না জমিয়ে রেখে, ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেয়ে কিছুই হয় না, সেই কষ্ট বাড়ে বৈকি কমেনা!”
ধারা কথাগুলো শুনেও চুপ রইল। হুট করেই ঠোঁট ভিজিয়ে মাথা নামিয়ে স্থির হয়ে রইলো। শ্রাবণও আর জোর করল না। এমনিতেই মেয়েটাকে সে কোনো কিছু নিয়ে জোর করতে চায় না। অস্বস্থিতে ফেলতে চায় না। তাই সেও এড়িয়ে গেল বিষয়টা। ধারার হাতটা এগিয়ে এনে আঙ্গুলে আঙ্গুল গুঁজে ধরে রাখল শক্ত করে। অস্ফুট সুরে বলল,
—” এই আমি তোমায় এক আকাশ পরিমাণ ভালোবাসি ধারা। এই ভালোবাসার সংজ্ঞা আমি জানিনা। শুধু এটুকু জানি, আমার সবটা যেমন তোমার, তোমার সবটাও আমার। এমন কি তোমার দুঃখ, কষ্ট সবকিছু। তাই তোমার চোখের পানি আমার হৃদয়কে ক্ষত করতে সক্ষম। বারবার এভাবে আমায় আঘাত করতে পারোনা তুমি। এতটা দুঃখী রাখিনি তোমায় আমি। সর্বোচ্চ সুখ দেওয়ার চেষ্টা করছি। তাই অন্তত স্বামী হিসেবে আমায় আমার প্রাপ্যটা দিও। আর সেই প্রাপ্য টা হবে- তোমার সুখ, তোমার খুশি থাকা। ”
কনিকা আজ বিরাট বড় একটা ভুল করে ফেলেছে। সাদিক বাজার থেকে আজ আপেল কিনে এনেছিল। কোনো এক কারনে আজ ফলের দামও বেশ কম ছিল। তাই সাদিকও সুযোগ বুঝে কিনে এনেছে আপেলসহ আরো কয়েকটা ফল। কিন্তু বেচারি কনিকা আপেল কাটতে গেলেই ঘটে বিপত্তি। অসাবধানতার বশে কেটে যায আঙুলের ডগা! আর্তনাদ করে ছুরি ফেলে নিজের আঙুল চেপে ধরে কনিকা। সাদিক গোসল করে কাপড় শুকোতে দিচ্ছিল। কনিকার চিৎকার শুনে সে দ্রুত রান্নাঘরে যায়। কনিকার হাতে রক্তের দাগ দেখে প্রায় আঁতকে উঠে কনিকার কাছে এসে তার হাত চেপে ধরে, এলোমেলো অবস্থা তারও,
—” আয়হায়! কী হইলো কনা? কেমনে কী করলা? হাত কাইট্টা ফালাইছো? ইশ! দেখি দেখি। হাতখান সরাও। এদিকে আসো। কিচ্ছু হইবো না! ”
সাদিক নাকি বেশ শান্ত একজন মানুষ, অথচ এখন কেমন যে অধৈর্য হয়ে সে ছোটাছুটি করা শুরু করেছে। দ্রুত সে রুমাল দিয়ে বেঁধে দেয় কনিকার আঙুল টা। কনিকা এতক্ষণ রোবটের মত দেখছিল সাদিকের পাগলামো। এরপর মিনমিন করে বলল,
—” না মানে, অতখানও কিছু হয় নাই তো। অল্প একটু কাটছে। কিচ্ছু হইবো না।”
সাদিক কনিকার আঙুলে ফু দিচ্ছিল। কনিকার কথা শুনে বিরক্ত হয়ে বলল,
—” চুপ থাকো। তোমারে কে মাতব্বরি করে আপেল কাটতে যাইতে বলছিল? আমি তো এসে করতামই।”
কনিকা এ পর্যায়ে শুকনো ঢোক গিলে মাথা নামালো। ঠোঁট ভিজিয়ে মিনমিন করে বলল,
—” আসলে, আমার খুব আপেল খাবার মন চাইছিল। তাই অপেক্ষা করতে পারি নাই।”
সাদিক কি আর পারে কনিকা কে একটা কথাও বলতে। নিজেরই গলার স্বর থমকে গেলো তার। কিছু বলার মত পেলো না। চোখ নামিয়ে নিলো সাদিক। কনিকার হাতের দিকে তাকিয়ে রইলো। এরপর কিছুক্ষণ স্থির থেকে ছোট্ট শ্বাস ফেলল। কনিকার হাত টা উঠিয়ে ঠোঁটে ছুঁইয়ে দিলো। চুমু খেলো অনেক ছোট করে। এরপর বলল,—
” আমারই দোষ। আমি ভুইলা গেছিলাম। ”
বলে কনিকাকে বসতে বলে সাদিক চলে গেলো রান্নাঘরে। আপেল কেটে একটা প্লেটে সাজালো, এরপর আনা আঙুল আর কমলাও নিলো। কনিকার পাশে বসে আপেলের টুকরো তুলে ধরলো কনিকার মুখের সামনে।
কনিকা খেলো সাদিকের বাড়িয়ে দেয়া আপেল টা। এরপর নিজেও সাদিককে খাইয়ে দিলো। সাদিকের মুখে রাগ নেই, শুধু একধরনের নীরব মায়া জমে আছে। আপেলের টুকরোটা কনিকার মুখে দিয়ে সে যখন ফিরতি কামড়টা পায়, তখন এই ছোট্ট ঘরটার মধ্যেই পুরো পৃথিবী থেমে যায়। দু’জনের হাত, দু’জনের চোখ, দু’জনের নিঃশ্বাস সবকিছু একরকম নরম আর টলটলে। এইভাবে কি মানুষ ভালোবাসে? এত সহজভাবে?এত সাধারণ দিনে? এত সামান্য ঘটনায়? হ্যাঁ, ওদের জীবনটাই এমন।
কনিকার আঙুলে একটু আঘাত লাগলে সাদিকের পৃথিবীই উল্টে যায়, আর সাদিকের সামান্য বিরক্তি দেখলে কনিকার হৃদয়ই ভেঙে পড়ে। তবুও ঝগড়া নেই, কষ্ট নেই,শুধু একটু অস্থিরতা, তারপর আবার গা-জুড়ে ছড়িয়ে পড়া শান্তি। এই দুই মানুষ জানেই না কীভাবে বড় করে ঝগড়া করতে হয়। জানে শুধু কেমন করে পাশে থাকতে হয়।
কনিকা একটা ছোট্ট নিশ্বাস ফেলল। সাদিক পাশে, একদম কাছে। তার কোমল মনের ভিতরটা ভরে উঠল এক অদ্ভুত নিশ্চিন্ততায়। এটাই তাদের জীবন। এভাবেই কেটে যাবে, কখনো আপেলের কাটে একটু ব্যথা, কখনো সাদিকের বকা, কখনো কনিকারের চুপচাপ হাসি, তারপর আবার মিলেমিশে ফেলে আসা সব দুশ্চিন্তা। এভাবেই দিন যাবে। এভাবেই রাত নামবে। এভাবেই দুজনের জীবন ধীরে ধীরে মায়ায় ভিজে উঠবে। কোনো নাটকীয়তা নেই, কোনো বড়সড় ঝড় নেই, শুধু দু’জন মানুষ, যারা একে অপরকে ভালোবাসে সবচেয়ে সহজ, সবচেয়ে সত্যিকারের উপায়ে। এই সরলতার মধ্যেই তাদের গল্প শেষ নয়, বরং ঠিক এখান থেকেই শুরু হয় নিঃশব্দ, অচঞ্চল, আজীবন টেকে এমন ভালোবাসা।
ধারা বোধহয় বিপত্তি ঘটাতে অনেক বেশি পারদর্শী। এই যে সে শ্রাবণের আড়ালে ফুচকাতে এত ঝাল চেয়েছিল, তারই ফল হিসেবে সে এখন বসে বসে শ্রাবণের নীরব রাগ দেখছে আর নিজের অবস্থা দেখছে। অতিরিক্ত ঝাল দেওয়ার ফলে বেচারি ধারার নাকে মুখে মরিচ এর ঝাঁঝ উঠে গেছে। আসলে ধারা এটা বুঝতেও পারেনি যে এতদিন ঝাল না খাওয়ার কারণে আর এখন তার প্রেগনেন্সির কারণে অতিরিক্ত ঝাল খেতে পারছে না সে। সে যে ঝাল সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে তাও বুঝতে পারেনি। তাই হুট করে এতদিন পর অতিরিক্ত ঝাল খাওয়ার কারণে তার অবস্থা একদম কাহিল হয়ে গেল। আর এসব বসে বসে শুধু দেখতে থাকলো শ্রাবণ শেখ। তার ইচ্ছে করলো ধারাকে ধরে নদীর পানিতে কিছুক্ষন ডুবিয়ে রাখতে। তবুও মনের শান্তি মিলবে না বলে সে শুধু তাকিয়ে রইল আর মেয়েটার অস্থির ভঙ্গিতে হাঁপানো দেখতে থাকলো। ধারা এ পর্যায়ে আরও তিন গ্লাস পানি খেলো, এরপরে শ্রাবণকে বলল,
—’আপনি কেমন মানুষ হ্যাঁ? আমি এদিকে ঝালে মরে যাচ্ছি, আর আপনি তাকিয়ে রয়েছেন। ”
শ্রাবণ দাঁত খিঁচিয়ে শক্ত কণ্ঠে জানান দিল,
—” মুরগি কোথাকার! মাতব্বরি করে ঝালটা চেয়েছিল কে, সেটা তুমি আগে বলো আমায়। কই! আমার টাতে অতো বেশি ঝাল নেই।”
এ পর্যায়ে মেকি হেসে দমে গেল ধারা, তবুও ঝাল কমলো না বলে হাঁপাতে থাকলো বারবার করে। জিভ সহ পুড়ে যাচ্ছে সবকিছু। বউয়ের এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে শ্রাবণের বড় করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আশেপাশে তাকিয়ে সতর্ক হয়ে নিল। দেখলো কেউ তাদেরকে দেখছে কিনা। এত রাতে এমনিতেই লোকজন নেই। তার ওপর আশেপাশে কাউকে না দেখে শ্রাবণ এবারে এগিয়ে আসলো। কোনরকম আগাম সতর্কবাণী ছাড়াই ধারা কে টেনে নিল নিজের কাছে। সেকেন্ডের মধ্যে এগিয়ে গিয়ে নিজের ঠোট দিয়ে ধারা ঠোঁট চেপে ধরল।
অনেক নিয়ম দেখেছে ধারা। ঝাল কমানোর অনেক টেকনিক জানা আছে তার। যেমন, এক বালতি পানি গেলা, দুই প্যাকেট মিষ্টি, কয়েকটা চকলেট, মধু ঢকঢক করে গেলা, চিনি চিবিয়ে গেলা। অথচ এতসব টেকনিক লাথি মেরে ফেলে শ্রাবণ যে বউয়ের ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে চুমু খেয়ে ঝাল কমাবে তা ধারনার বাইরে ছিল।
এভাবেও যে কেও ঝাল কমায় তা বুঝতে পারেনি বেচারি ধারা। শক্ত করে চেপে ধরে রীতিমতো শ্রাবণ চুমু খেতে শুরু করল ধারাকে। বেচারী ধারা চমকে থমকে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইল। চমকে থমকে যাওয়া ধারা না পারছে শ্রাবণকে সরাতে, না পারছে একটু শ্বাস নিতে। কোন মতে চুপচাপ থাকার পর প্রায় ৫ মিনিট পর ধারার ঠোঁট ছেড়ে দিল শ্রাবণ। এরপরে নিজেও পানি খেয়ে নিল। সরু চোখে তাকালো তার মুরগির বাচ্চার মত বউটার দিকে, বেচারি ধারা স্তব্ধ হয়ে চোখ বড় করে স্থির হয়ে রয়েছে। সেই যে শ্রাবণ তাকে যেভাবে ধরেছিল ঠিক সেভাবে সে এখনো স্থির হয়ে পাথরের মত রইল। এমন অবস্থা দেখে শ্রাবণ হাসি আটকাতে পারল না। হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল,
—” ঝাল কমেছে মিসেস শেখ?”
ধারা কোনমতেই চোখের মনি সরিয়ে শ্রাবণের দিকে তাকাল। এর পরে যন্ত্রের মতো মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিল,
—” হ্যাঁ কমেছে। শুকরিয়া।”
শ্রাবণ ফিক করে হেসে হো হো করে হাসতে শুরু করলো। ধারা সাথে সাথে নিজের ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। লজ্জায় মাটির নিচে ঢুকে যেতে মন চাইলো তার। ইশ! কি লজ্জা! কি লজ্জা! আবার বলে কিনা শুকরিয়া! এখন কোনোমতেই সে মুখ দেখাবে না বলে কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো। শ্রাবণ হাসতে হাসতে আবারো ধমক দিলো ধারাকে,
—” আরো ঝাল খাবেন ম্যডাম? আরো কয়েকটা মরিচ দিতে বলি? শুধু পরে আমার এই মেডিসিন সহ্য করতে হবে! রাজি?”
ধারা তড়িঘড়ি করে মাথা নেড়ে বলল,
—” উহু। রাজি না। একটুও রাজি না। মোটেই রাজি না। অশভ্য লোক। রাস্তাঘাটে এসব কে করে? ছিহহহ!”
শ্রাবণ মোটেই পাত্তা দিল না তার বউয়ের কথা। সে আরাম করে আরো ফুচকা খেতে শুরু করল। আর ধারার অবস্থা থেকে হাসতে হাসতে কাহিল হয়ে পড়ল। ধারা মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকলো শ্রাবণের হাসি। ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকা সত্বেও একটু করে চোখ বের করে দেখতে থাকলো শ্রাবণকে। আর যাই হোক না কেন, মানুষটা চমৎকার, তাই না? এবারে শ্রাবণের সাথে ধারাও হাসতে শুরু করল। হাসতে হাসতে শ্রাবণের কাছে এগিয়ে গিয়ে তার বাহু জড়িয়ে ধরে লাল আভায় পূর্ণ মুখ লুকোলো বুকের মধ্যে। শ্রাবন কি প্রত্যাখ্যান করবে নাকি তার বউকে? এত বোকা সে নয়। তাই নিজেও আগলে নিল মেয়েটাকে। ধারা আবেশে চোখ বুঁজে শান্ত ভঙ্গিতে রইল।
সময় এগোলো। রাত বেড়ে গিয়েছে। জোছনার আলো তার ঝলকানি বাড়িয়ে দিয়েছে। শ্রাবণ ব্রিজের উপর বেঞ্চে বসে রয়েছে, তার কাঁধে মাথা রেখেছে ধারা। দুজনেরই চোখ খোলা আকাশের ইয়া বড় চাঁদটার দিকে। রূপালি থালার মত চকচক করা চাঁদ টার দিকে তাকিয়ে ধারা বলল,
—” এই এমন একটা রাতে আপনার ঘরে প্রথম পা রেখেছিলাম।”
শ্রাবণ হাসলো। বলল,
—” এই এমন একটা রাতেই তোমার সাথে প্রথম ঘুরতে গিয়েছিলাম।”
ধারা আবারো বলল,
—” এই এমন একটা রাতেই আপনার সাথে প্রথম ঘুমিয়েছিলাম।
শ্রাবণ কিছুক্ষণ ভেবে বলতে থাকলো,
—” এই এমন একটা রাতেই তোমায় প্রথম ভালোবেসেছিলাম। এই এমন একটা রাতেই প্রথমবারের মতো তোমায় বুকে টেনে নিয়েছিলাম, আর এই এমন একটা রাতেই তুমি আমার মন চুরি করে নিয়েছিলে।”
ধারা মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলো চাঁদটার দিকে। শ্রাবণের কথাগুলো শুনে নিঃশব্দে হেসে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,
—” আজ এই এমন একটা রাতেই আপনার সাথে বসে এসবের স্মৃতিচারণ করছি।”
শ্রাবণ হাসলো। চোখ বুঁজে বলল,
—” হুম। তবে আজ রাতটায় একটু ভিন্নতা রয়েছে।”
ধারা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
—” কেমন ভিন্নতা?”
শ্রাবণ ধারার দিকে তাকালো। কপালে চুমু এঁকে দিয়ে নাকে আদর করে বলল,
—” এতদিন আমরা দুজন ছিলাম, আজ আমরা তিনজন!”
তৎক্ষনাৎ ধারার চোখে পানি এসে ভিড় করে। ঠোঁট কাঁমড়ে নিজেকে সামলায় সে। নাহ, দুঃখে নয়। আনন্দে কান্না পাচ্ছে তার। ভীষণ কান্না পাচ্ছে। জীবন যে তাকে এমন একটা সুখপ্রান্তে এনে দাঁড় করাবে তা সে নিজেও ভাবতে পারেনি। হুট করেই ধারার চোখ এলোমেলো দৃষ্টিতে শ্রাবণকে দেখে। হুট করেই অদ্ভুত এক ইচ্ছে জাগ্রত হয় তার। দমাতে পারলো না সে। শুকনো ঢোক গিলে ধারা কাঁদো কাঁদো গলায় শ্রাবণকে বলে,
—” একটা আবদার করব?”
শ্রাবণ বলে,
—” করে ফেলো।”
ধারা বাচ্চাদের মত করে আদুরে ভঙ্গিতে বলল,
—” আপনার কপালে একটা চুমু খাই?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকালে ধারা তড়িঘড়ি করে বলল,
—” বিশ্বাস করুন এটা মোটেই আমার আবদার নয়। এটা বাবুর আবদার দেখুন পেটের মধ্যে কি রকম করছে। আসলে সে-ই চাইছে আপনাকে চুমু খেতে। এজন্য আমায় বলছে।”
শ্রাবণ চোখ সরু তাকালো ধারার দিকে। যে মেয়ে নিজেই একটু আগে শ্রাবণকে বলেছিল যে এখনো তার পেট ফুলেনি, সেই মেয়ে এখনই বলছে যে বাচ্চা নাকি কি রকম করছে। আবার সে ওটা টেরও পাচ্ছে। এঃ কি সম্ভব? শ্রাবণ কি বুঝেনি তার বউয়ের অজুহাত! তাই সে চোখ সরু করে তাকিয়ে রইল। এবারে ধারা দমে গেল। মিনমিন করে বলল,
—” না আসলে, বাবুর মা-ই চাইছে। আবদার টা যদি পূরণ করতেন, তবে বাবু খুশি হবে।”
শ্রাবণকে নড়তে দেখা গেলো না। বরং স্থির হয়ে শুকনো ঢোক গিলল সেও। নিজে আগে ধারার কপালে চুমু খেলো সময় নিয়ে, এরপর কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল,
—” জিজ্ঞেস করে চুমু খাওয়ার মত অপরাধ কোরো না মেয়ে। শ্রাবণ শেখ তোমার। যা খুশি যখন খুশি সব করতে পারো। জাস্ট এই চোখের পানি দিয়ে খুন করা নিষিদ্ধ।”
ধারা হাসলো। লম্বা চওড়া মানুষটার কপালে চুমু খেতে হলো একটু খানি উঁচু হয়ে। এরপর দ্রুত ভঙ্গিতে মুখ লুকিয়ে ফেলল শ্রাবণের বুকে। হাসলো শ্রাবণ! কি অদ্ভুত এক অবস্থা! যার জন্য লজ্জা পায়, তার বুকেই মুখ লুকিয়ে ফেলে। শ্রাবণ সুযোগ পায়। জিজ্ঞেস করে আবারো,
—” বলো না ধারা, সেদিন কেনো কাঁদছিলে?”
ধারা চোখজোড়া ফট করে খুলে ফেলে। কিছুক্ষণ স্থির থেকে মাথা নেড়ে বলে,
—” সত্যিই বাড়ির কথা মনে পড়ছিল।”
শ্রাবণ এবারের দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বললো না কিছু। সুন্দর মুহূর্ত টা নষ্ট করতে চাইল না। তাই আবারও ধারার কপালে চুমু খেলো। চাঁদের দিকে দৃষ্টিপাত করলো। ধারা আগের থেকেও বেশি শক্ত করে চেপে ধরল শ্রাবণকে। তার চোখ জোড়া হুট করেই কেমন যেন অস্থির হয়ে রইল চাঁদের দিকে।
ধারা হাসলো। মলিন হেসে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। সে কি আর কখনো বলতে পারে শ্রাবণকে সেই রাতের কান্নার কারণ। সে কখনোই শ্রাবণ কে বলবে না। সে বলবে না যে সে সবকিছুর সত্য জেনে গিয়েছে। সে সব জেনে গিয়েছে, জেনেছে তার আসল পরিচয়, তার বাবা, মা, তার নানার অতীত, সবকিছু। এমনকি সে এটাও জানতে পেরেছে তার সাথে শেখ বাড়ির সম্পর্ক। সালমা চৌধুরীর সাথে তার সম্পর্ক। সবকিছু জানতে পেরেছে সে। আর এসব জানতে পারার পরে নিজের মায়ের দুঃখের কথা মনে করেই সে সেদিন কাঁদছিল। নাহ! এটা নিয়ে তার কোনো আফসোস নেই যে সালমা চৌধুরী তার দুঃসম্পর্কের খালামণি হবে, একটুও আফসোস নেই। শুধু এটুকুই আফসোস যে সে নিজের পরিচয় সম্পর্কে এতদিন অবগত ছিল না।
যদিও ধারা এখন সব ভুলে যেতে চাইছে। সেই রাতে কান্নাই ছিল ওই বিষয় নিয়ে ধারার শেষ কান্না। সে প্রতিজ্ঞা করেছে ওসব মনে করে সে আর কখনো কাঁদবে না। কখনো কষ্ট পাবে না। কারণ তার কাছে সবকিছু আছে। একটা চমৎকার পরিবার রয়েছে, আদর্শ স্বামী রয়েছে, অনাগত সন্তান আসছে,— এত সুন্দর পৃথিবীতে তার সবকিছুই রয়েছে। এখন এত কিছুর পরে সে কেনোই বা কষ্ট পাবে। সবকিছু ভেবে নিয়ে বড় করে শ্বাস ফেলল ধারা। শ্রাবণের বুকে মাথা রেখে বিড়বিড় করে বলে উঠলো,
—” ভালোবাসি শেখ সাহেব!”
শ্রাবণ শুনতে পেয়েছে ধারার কথা। বুকের কাছে এসে প্রিয়তমা এত মিষ্টি করে ভালোবাসার কথা জানান দিবে আর শ্রাবণ শেখ তা শুনতে পাবে না, এমন কি হয়? কথাটা কর্নকুহরে পৌঁছানো মাত্রই শ্রাবণ নিজেও চাঁদের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলো,
—” আমিও ভালবাসি মিসেস শেখ!”
রাতের আকাশটা যেন ধীরে ধীরে আরও নরম হয়ে এসেছে। চারদিকের শব্দ থেমে গেছে, কেবল নদীর পানি আর হাওয়ার পাতলা গুঞ্জন। ব্রিজের রেলিংয়ের উপর ভেসে আসা জোছনার আলোয় দুটো মানুষের জীবন যেন তিল তিল করে সাদা হয়ে উঠছে। ধারা আর শ্রাবণ পাশাপাশি বসে রইলো। দুজনেই চাঁদের দিকে তাকিয়ে, কিন্তু অনুভব করছে একে অপরকে। হাওয়া যখন একবার হাসছে, ধারা তখন শ্রাবণের কাঁধে মাথা রাখছে, আর হাওয়া যখন একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলছে, শ্রাবণ তখন ধারার মাথায় নরম করে কপালে চুমু দিচ্ছে। জোছনার আলো ঠিক যেখানে তাদের গায়ে লেগে পড়ছে, মনে হয় প্রকৃতি যেন নিজের হাতে একটা পরিবারকে আলো দিয়ে মুড়িয়ে দিচ্ছে।
ধারা ভেতরে ভেতরে হাসছে, নিজের সন্তানকে নিয়ে কতগুলো রাত সে কল্পনা করেছে, আজ সেই কল্পনা যেন চাঁদের আলো ছুঁয়ে বাস্তব হয়ে উঠছে। শ্রাবণ তাকিয়ে আছে ধারার দিকে, তার স্ত্রী, তার ভালোবাসা, আর এখন তার অনাগত সন্তানের মা। মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে স্বপ্নিল সম্পদগুলো আজ তার পাশে বসে আছে। তাদের কথা নেই, অথচ নীরবতার মাঝেই কত কথা।
ধারা হাত রাখল নিজের পেটের উপর, ছোট্ট প্রাণটা সেখানে নিঃশব্দে ঘুমোচ্ছে। শ্রাবণ সেই হাতের উপর নিজের হাতটা রাখলো। দুই হাতের উষ্ণতায়, তাদের তৃতীয় জীবনের গল্প শুরু হয়ে গেছে। হঠাৎ ধারা হাসলো, খুব ছোট্ট, খুব শান্ত এক হাসি। বলে উঠল অদ্ভুত ভাবে,
— ” আমাদের শুরুটাও ছিল এমন একটা রাতেই, আর দেখেন, শেষটাও রাতেই হলো। যেন প্রকৃতি আগে থেকেই লিখে রেখেছিল, আমাদের জীবনের সব সুন্দর মুহূর্তগুলো রাতেই ফুটবে।”
শ্রাবণ ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলো। তারপর নরম স্বরে বলল,
— ” রূপকথা যে রাতেই রচিত হয়!”
ধারা মাথা তুললো। চাঁদের আলোয় শ্রাবণের চোখ দুইটা শান্ত নদীর মতো লাগছে। তারপর সে খুব ধীরে, নিঃশ্বাস আটকে যাওয়া গলায় বলল,
— ” কীসের রূপকথা?”
শ্রাবণের বুক কেঁপে উঠল। সে হেসে, খুব নিঃশব্দে, যেন চাঁদের সাথেই কথা বলছে এমন ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
— ” আমাদের রূপকথা। শ্রাবণ ধারার রূপকথা।”
ধারা বোধহয় খুব খুশি হলো। হাসলো মেয়েটা। তারপর দুজনেই আবার তাকালো আকাশের দিকে। মনে হলো, চাঁদটাও যেন একটু বেশি উজ্জ্বল।রাত আরও ঘন হলো। বাতাসে ফুলের গন্ধ, নদীর শব্দ, আর দুটো মানুষের ভালোবাসা, সব মিলিয়ে এক অব্যাখ্যেয় শান্তি। এভাবেই, যে রাত তাদের প্রথম দেখা, প্রথম স্বপ্ন আর প্রথম ভালোবাসা ধরে রেখেছিল, সেই রাতই আজ তাদের নতুন জীবনের প্রথম পৃষ্ঠা খুলে দিল। তাদের গল্প এখানেই শেষ, কিন্তু ভালোবাসা শুরু হলো ঠিক এখনই।
চাঁদটা খুব কাছে নেমে এসেছে। সে নিজেই দেখতে চায় রূপকথার নায়ক–নায়িকার শেষ দৃশ্যটা। ব্রিজের ওপর হালকা ধোঁয়ার মতো জোছনা ছড়িয়ে পড়েছে। মনে হয়, পৃথিবী আজ ইচ্ছে করে একটু বেশি নরম হয়ে গেছে। এই রাতের জোনাকিরা দেরি করলো না, আশেপাশে উজ্জ্বলতার ঝিলিক ছড়িয়ে বারবার বলতে থাকল,
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৫২
❝ চাঁদের নরম আলোয় ভেসে যায় দু’জনার শ্বাস,
হৃদয়ের ভেতর ফোটে নীরব বেহালার আওয়াজ।
হাতের ছোঁয়ায় জেগে ওঠে হাজার বছরের নদী,
ভালোবাসা যেন নিয়তির লেখা সোনালি প্রতিশ্রুতি।
রাতের আকাশও থমকে শোনে দু’জনার কথা,
তাই শেষ থেকে শুরু হলো শ্রাবণ ধারার রূপকথা।❞
