শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩৩
অনামিকা তাহসিন রোজা
ভালোবাসা নিয়ে মানুষ অনেক সাহিত্য লিখেছে। কিন্তু একটা জিনিস খুব কম লেখা হয়। যে মানুষটা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, সে সবসময় সবচেয়ে আগে হ্যাঁ বলতে পারে না। কারণ ভালোবাসা আর বিশ্বাস এক জিনিস না। ধারা এই মুহূর্তে শ্রাবণকে ভালোবাসে কিনা, প্রশ্নটাই হাস্যকর। ও তো এতদিনেও ভালোবাসা ছাড়তে পারেনি। সমস্যা সেখানে না। সমস্যা হলো, যে মানুষটার জন্য বুক ফেটে যায়, সেই মানুষটার সামনে ভেঙে পড়ার ভয় সবচেয়ে বেশি। তাই ধারা কিছু বলল না। শুধু বসে রইল। বেগুনি আলোয় তার চোখদুটো আরও ঝাপসা দেখাচ্ছে। কোলের উপর রাখা ফুলের তোড়ার কয়েকটা পাপড়ি ভিজে গেছে। সে বুঝতেও পারছে না কখন থেকে চুপচাপ কাঁদছে। শ্রাবণও কিছু বলল না। হাঁটু গেড়ে বসেই রইল। তার হাতের রিংয়ের বক্সটা এখনো বাড়ানো। অদ্ভুত ব্যাপার! একটুও ক্লান্তি নেই, একটুও তাড়াহুড়ো নেই। কয়েকদিন আগে এই মানুষটাই নিজের অনুভূতি স্বীকার করতে পারছিল না। আজ একই মানুষ একটা উত্তরের জন্য নিশ্বাস আটকে বসে আছে। সময় থেমে গেছে যেন। ধারা একবার ঠোঁট কামড়ে চোখ মুছল। আরও একবার। হলো না। ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়ল। শ্রাবণের বুক মোচড় দিল। সে কাতর কন্ঠে ডাকল,
—” ধারা..? ”
ধারা মাথা নাড়ল। কিন্তু মুখ তুলল না। শ্রাবণ শুকনো ঢোক গিলে আবার বলল,
—” কিছু বলো। ‘না’ বললেও বলো। রিজেক্ট করলে করো। কিন্তু চুপ থেকো না। তোমার এই চুপ করে থাকা খুব ভয়ংকর।”
ধারা এবার ধীরে ধীরে মাথা তুলল। চোখ লাল, নাক লাল। কিন্তু চোখদুটোতে মনে হয় রাগ নেই। যেটা আছে, সেটা আরও বিপজ্জনক। মায়া। সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল শ্রাবণের দিকে। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
—” এমনভাবে বলছেন যেন বিয়েই হয়নি। রিজেক্ট করলেও বা কী? ও-ই যা ছিল, সেটাই থেকে যাবে। এখন মহাভারত অশুদ্ধ হলেও শ্রাবণ শেখ আমার স্বামী।”
শ্রাবণ মাথা নাড়ল,
—” সে তো তোমার খারাপ স্বামী। প্রেমিকও নয়। আজ শ্রাবণ শেখ প্রেমিক হয়ে তোমার কাছে এসেছে। হাতটা বাড়িয়ে দিলে এবার ভালো স্বামী পাবে। সাথে প্রেমিকও।”
ধারা চোখের পানি মুছলো। আবারো রিংটার দিকে তাকাল। আরেকবার তাকাল শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। ধারা হাত বাড়াল ঠিকই, কিন্তু রিং এর দিকে নয়। শ্রাবণের গালের দিকে। খুব সন্তপর্ণে ধারা শ্রাবণের চোখের কোণে জমে থাকা পানিটা আঙুল দিয়ে মুছে দিল। ধারার আঙুলটা ছুঁয়ে গেল শ্রাবণের চোখের কোণ। খুব সামান্য একটা স্পর্শ। কিন্তু শ্রাবণের মনে হলো কেউ যেন বুকের ভেতরে জমে থাকা অন্ধকারে একটা জানালা খুলে দিয়েছে। সে স্থির হয়ে রইল। নড়ল না। ধারা চোখ নামিয়ে ফেলল আবার। তারপর খুব ধীরে হাতটা নামিয়ে নিল। শ্রাবণ ভাঙা গলায় বলল,
—” এত কাঁদাচ্ছি তোমায়, তবুও আমার চোখের পানি মুছিয়ে দিচ্ছো?”
ধারা মাথা নিচু রেখেই বলল,
—” অভ্যাস।”
শ্রাবণের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ধারা এবার ঠোঁট কামড়ে হাসার চেষ্টা করল। পারল না। মাথা নিচু রেখেই বলল,
—” জানেন, আমি ছোটবেলা থেকেই খুব বোকা। যাদের আপন ভাবি, তাদের উপর রাগ ধরে রাখতে পারি না। আমি আপনাকে ক্ষমা করিনি। করবও না এত সহজে। আপনি এত কষ্ট দিয়েছেন, এত অপমান করেছেন, আমি একদিনও ভুলিনি।”
শ্রাবণ চোখ নামিয়ে নিল। ধারা কাঁদতে কাঁদতেই বলে গেল -” আপনি জানেন আমি কতবার ওই স্টোর রুমে বসে ভেবেছি আমি আসলেই এত বিরক্তিকর? এত খারাপ? কেন আমার দিকে তাকান না? কেন আমি সুন্দর না? কেন আমি আপনার আপন মানুষ না?”
শ্রাবণের গলা শুকিয়ে গেল। ধারা মাথা নাড়ল,
—” আপনি জানেন সবচেয়ে বেশি কষ্ট কবে পেয়েছিলাম?”
শ্রাবণ আস্তে বলল,
—” কবে?”
ধারা হেসে ফেলল। সেই কান্নার মাঝেই হেসে বলল,
—” যেদিন বুঝেছিলাম আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারব না।”
ধারা দুই হাত তুলে খুব আস্তে শ্রাবণের দুই গাল ধরল। শ্রাবণ শ্বাস নিতে ভুলে গেল। চোখ বুঁজে ফেলল আবেশে। ধারা কাঁদছে। চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে রইল শ্রাবণের চোখে। তারপর ঝুঁকে এসে খুব ধীরে নিজের কপালটা শ্রাবণের কপালে ঠেকিয়ে দিল। শ্রাবণ যেন জমে গেল। শীতল হাওয়া বয়ে গেল তার শরীর দিয়ে। ধারা চোখ বন্ধ করে ভাঙা গলায় বলল,
—” ক্ষমা করব না।”
—” কোরো না।”
শ্রাবণের বুক কেঁপে উঠল। ধারা ফিসফিস করল,
—” কষ্ট দেব। অনেক কষ্ট দেব।”
—” দিও।”
আরও একটু কাছে এলো। নাক টেনে বলল,
—” কথা বলব না মাঝেমাঝে। ইগনোর করব। ঝগড়া করব।”
—” যা ইচ্ছে তাই কোরো।”
ধারা থামলো না। যেন কোনো আত্মা ভর করেছে তার মাঝে। নইলে নিজে থেকে কি কখনো এতটা কাছে আসতো সে? এভাবে চমকাতো শ্রাবণ শেখকে? ধারা আরো জোরে চেপে ধরল শ্রাবণের গাল। কপালে কপাল ঠেকানো থাকাতে একে অপরের শ্বাস শুনতে পারছে তারা। শ্রাবণ কোনোভাবে নিজেকে সামলে রয়েছে। হাত কাঁপছে অনবরত। ধারা আবারো ভাঙা গলায় বলতে চাইলো,
—” কিন্তু আমি আপনাকে ভালো…
—” শশশ। চুপ করো। ”
শ্রাবণ এক হাতে ধারার ঠোঁট চেপে ধরল। অস্থির হয়ে থামিয়ে বলল,
—” তুমি এ কথা আর বলবেই না ধারা। আমার শেষ হয়নি। আমি আগে বলব। মন ভরে বলব। যতবার তুমি তোমার চোখ দিয়ে এতদিন বলেছো, ততবার বলব। যখন আমার এই মরুভূমির ন্যায় মনটা সিক্ত হবে, যখন আমার মনে হবে এবারে একটু মনটাকে শান্ত করার দরকার, তখন আমিই তোমার কাছে শুনে নেব। আমি আবদার করব। কিন্তু এখন তুমি আর বোলো না। আজ আমার পালা। আজ শুধু আমি বলব। আমি করব। আমি ভালোবাসব।”
ধারা আর পারল না। শব্দ করে কেঁদে উঠল। সহ্য হলো না শ্রাবণের। সেও আর পারল না। কাঁপা হাতে খুব আস্তে ধারার কব্জি ধরল। বামহাত টা নামিয়ে এনে সেভাবেই আগে আংটিটা পড়িয়ে দিল। এরপর সেই অনামিকা আঙুলে ঠোঁট ছোঁয়াল। আঙুলে চুমু খেতে গিয়ে শ্রাবণের চোখের পানি ফোঁটায় গিয়ে সিক্ত করল ধারার হাত। ধারা চোখ বন্ধ করল। শ্রাবণ আবার বলল,
—” এইযে আংটি পড়ালাম। এখন থেকে তুমি আমার। এবার তুমি নিজেও আর আমার থেকে আমার ধারাকে আলাদা করতে পারবেনা। কখনোই না।”
শ্রাবণের ঠোঁট ছুঁয়ে রইল ধারার অনামিকায়। সময়টা খুব ছোট ছিল। কিন্তু তাদের দুজনের জন্য যেন কয়েক বছরের দূরত্ব ওই কয়েক মুহূর্তেই গলে গেল। ধারা চোখ বন্ধ রেখেই দাঁড়িয়ে রইল। তার আঙুলে লেগে আছে শ্রাবণের উষ্ণ নিশ্বাস, সাথে নোনতা পানির স্পর্শ। অদ্ভুত! এই মানুষটার কাছে সে কতদিন শুধু একটু ভালোবাসা চেয়েছে। একটু গুরুত্ব। একটু নিজের মানুষ হওয়ার অনুভূতি। আজ সেই মানুষটা তার হাত ধরে এমনভাবে কাঁপছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা হারিয়ে ফেলে আবার ফিরে পেয়েছে। ধারা ধীরে চোখ খুলল। শ্রাবণ এখনো নিচু হয়ে আছে। মাথা নিচু থাকলেও চোখের পানি এখনো থামেনি। ধারা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে ডাকল,
—” শেখ সাহেব।”
শ্রাবণ মাথা তুলল। চোখদুটো লাল। ধারা তাকিয়ে রইল। অনেকক্ষণ। তারপর হঠাৎ দুই হাত তুলে শ্রাবণের শার্টের কলারটা ঠিক করে দিল। মনে হলো একদম অভ্যাসবশত। যেভাবে এতদিন মনে মনে করতে চেয়েছে। শ্রাবণ থমকে গেল। ধারা ভাঙা গলায় বলল,
—” এভাবে কাঁদলে আপনাকে ভালো লাগে না।”
শ্রাবণ হেসে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই,
—” কিন্তু তোমার জন্য কাঁদতে ভালো লাগছে।”
ধারার বুকটা কেঁপে উঠল। সে দ্রুত অন্যদিকে তাকাল। কিন্তু এবার পালালো না। উঠে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় রইল। শ্রাবণ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। এত কাছে দাঁড়িয়ে আছে তারা যে মাঝখানে যেন আর কোনো দূরত্ব নেই। তবুও শ্রাবণ হাত তুলেও থেমে গেল। একবার চোখে চোখ রাখল। খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল,
—” একটা আবদার ছিল।”
ধারা ভ্রু কুঁচকাল,
—” কী?”
—” জড়িয়ে ধরতে পারি?”
প্রশ্নটা শুনে ধারা চমকে তাকাল। কারণ এতদিন সব বিষয়ে তো এই মানুষটা কখনো জিজ্ঞেস করেনি। সবসময় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ অনুমতি চাইছে। ধারার চোখ আবার ভিজে উঠল। সে কিছু বলল না। শুধু এক পা এগিয়ে এলো। আর খুব আস্তে নিজেই কপালটা শ্রাবণের বুকে ঠেকিয়ে দিল। শ্রাবণের শ্বাস থেমে গেল। তারপর যেন বহুদিনের আটকে রাখা ভয় নিয়ে, খুব ধীরে দুই হাত তুলে ধারাকে জড়িয়ে ধরল। ধারা প্রথমে শক্ত হয়ে ছিল। তারপর খুব ধীরে তার দুই হাতও উঠল। একটা হাত গিয়ে থামল শ্রাবণের পিঠে, আরেকটা শার্টটা মুঠো করে ধরল। শ্রাবণের চোখ বন্ধ হয়ে গেল। ধারা এতদিন পর একটুখানি আশ্রয় পেয়ে বিড়ালছানার মত মুখ লুকিয়ে খুব আস্তে বিড়বিড় করল
—” আপনাকে ঘৃনা করি।”
শ্রাবণ নিচু স্বরে বলল,
—” এভাবে কাছে থেকে ঘৃনা করলেও সমস্যা নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, তোমার অনুভূতির ঠিক নেই। একটু পরেই আবারো ভালোবাসি বলতে পারো।”
ধারা ভ্রু কুঁচকে রাগান্বিত গলায় কিছু বলতে গিয়েও হেসে ফেলল। শ্রাবণের বুক কেঁপে উঠল। সে আরও একটু কাছে টেনে নিয়ে কাঁপা হাসিতে বলল,
—” কখনো ভেবেছিলে এভাবে আমার বুকে মাথা রেখে হাসবে?”
শ্রাবণকে অবাক করে দিয়ে ধারা বলল,
—” ভেবেছিলাম। তাই তো থেকেছি। অপেক্ষা করেছি।”
ধারা চোখ বন্ধ করেই খুব আস্তে যোগ করল,
—” তবে আপনি বেশি খুশি হবেন না। শাস্তি এখনো শেষ হয়নি।”
শ্রাবণ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩২
—” সমস্যা নেই।”
ধারা ভ্রু কুঁচকাল,
—” কেন?”
শ্রাবণ ধারার চুলে চুমু খেয়ে তার মাথার উপর গাল রেখে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করল,
—” যাবজ্জীবন তোমার কাছেই কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোমায় ও তোমার দেয়া সব শাস্তি কবুল।”
