Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১০ (২)

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১০ (২)

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১০ (২)
‎আফীফা আফনান

‎হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট এবং চিফ ডক্টরের কেবিনের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত শান্ত পরিবেশে হাত দুটি পেছনে বেঁধে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেহুল।
‎​বিশাল কাঁচের টেবিলের ওপাশে বসে থাকা সিনিয়র ডাক্তার আহমেদ কবির মেহুলের দিকে বেশ প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকালেন। টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটা বন্ধ করে তিনি একটু হেলান দিয়ে বসে বেশ গম্ভীর ও আন্তরিক কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন—

‎​”ডক্টর মেহুল, আপনাকে ডেকেছি একটা ইম্পর্টেন্ট অ্যানাউন্সমেন্টের জন্য। আগামী পরশু দিন আমাদের হাসপাতাল থেকে একটা বিশেষ মেডিকেল টিম এক সপ্তাহের জন্য রাজশাহীতে যাচ্ছে। সেখানে একটা বেশ বড়সড় ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে দূর-দূরান্তের দুস্থ ও সাধারণ মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হবে।”
‎​মেহুল শান্ত মনে কথাগুলো শুনছিল। সিনিয়র ডাক্তার একটু থেমে মৃদু হেসে আবার যোগ করলেন—
‎​”আপনার পেশাদারিত্ব, কাজের প্রতি নিষ্ঠা আর ইমারজেন্সিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আমি গত কয়েক দিনে শুনেছি এবং নিজে বেশ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই, আপনিও আমাদের এই মেডিকেল টিমের অংশ হয়ে এই ফ্রি ক্যাম্পে আমাদের সাথে যোগ দিন। আপনার মতো একজন ডেডিকেটেড ডক্টর এই টিমে থাকাটা আমাদের সবার জন্যই খুব প্লাস পয়েন্ট হবে।”

‎​সিনিয়র ডাক্তারের মুখে এমন প্রশংসা এবং সম্মানজনক প্রস্তাব শুনে মেহুলের চোখে-মুখে এক পরম তৃপ্তি আর কৃতজ্ঞতার আভা ফুটে উঠল। একজন ডাক্তারের কাছে মানুষের সেবা করার সুযোগ পাওয়াটাই তো সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি!
‎​সে বিনয়ের সাথে মাথা কিছুটা ঝুঁকিয়ে মৃদু হেসে গম্ভীর কিন্তু সুদৃঢ় কণ্ঠে বলল—
‎​”থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ, স্যার! আমার প্রতি এত বড় বিশ্বাস আর আস্থা রাখার জন্য আমি সত্যিই আপনার কাছে ভীষণ কৃতজ্ঞ। একজন ডাক্তার হিসেবে অসহায় আর দুস্থ মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারাটা আমার জন্য পরম সৌভাগ্যের।”
‎​মেহুল একটু থেমে, নিজের আত্মবিশ্বাসী চোখ দুটি সিনিয়র ডাক্তারের দিকে তুলে ধরে স্পষ্ট ভাষায় যোগ করল—

‎​”আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন স্যার, আমি আমার টিমের সাথে থেকে নিজের সর্বোচ্চ সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব। রাজশাহীর এই ফ্রি ক্যাম্পেইন যেন পুরোপুরি সফল হয়, সেদিকে আমার শতভাগ ডেডিকেশন থাকবে।”
‎​মেহুলের এই স্পষ্টবাদিতা, প্রফেশনালিজম আর কাজের প্রতি এমন ডেডিকেশন দেখে সিনিয়র ডাক্তার আহমেদ কবির অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন। তিনি মুখে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি নিয়ে মাথা নেড়ে বললেন, “আই নো দ্যাট, ডক্টর মেহুল! অল দ্য বেস্ট। আপনার টিম লিডারের কাছ থেকে বাকি সব ডিটেইলস আর গাইডলাইনস সংগ্রহ করে নিন।”
আহমেদ কবিরের কথা সমাপ্ত হতেই ‎​মেহুল স্যারকে বিনীতভাবে সম্মান জানিয়ে ধীর পায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো—সামনে আসা এক সপ্তাহের এই নতুন মিশনের প্রস্তুতি নেওয়ার উদ্দেশ্যে।

‎​সেদিন হাসপাতালে আর তেমন বিশেষ কোনো কাজ ছিল না। তাই মেহুল পুরো ওয়ার্ডে একবার শেষ রাউন্ড মেরে নিজের বাকি কাজগুলো ইন্টার্ন ডাক্তারদের সুন্দর করে বুঝিয়ে দিল। অতঃপর সন্ধ্যা নামতেই সে চটজলদি বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়ল। একে তো সে নিজের গাড়ি নিয়ে আসে নি তারওপর অপেক্ষা করেও সিএনজি না পাওয়ায় শেষমেশ একটা রিকশা ডেকেই বাড়ির পথ ধরল মেহুল।
‎​মেহুলদের বাড়ির কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ রিকশার গতি কিছুটা শ্লথ হলো। ঠিক তখনই মেহুলের চোখ গেল তাদের বাড়ির পাশের ছোট পার্কটার দিকে। সন্ধ্যার আবছা আলো-আঁধারিতে মেহুল স্পষ্ট দেখল—শিরিনা বেগমের মতো কেউ একজন অত্যন্ত সতর্ক আর চোরের মতো চারপাশ নজর রাখতে রাখতে পার্কের ভেতরের দিকে ঢুকে যাচ্ছে!

‎​এই ভরসন্ধ্যায় মামির মতো কাউকে হঠাৎ এত সতর্কভাবে পার্কে ঢুকতে দেখে মেহুলের মনের ভেতর সন্দেহের দানা বাঁধল। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে রিকশা থামিয়ে পার্কের কাছেই নেমে পড়ল। রিকশাওয়ালার ভাড়া চুকিয়ে সে অতি সাবধানে ধীর পায়ে পার্কের ভেতরে প্রবেশ করল।
‎​কিন্তু ভেতরে ঢুকে মেহুল অবাক হয়ে দেখল—পুরো পার্ক একদম ফাঁকা, নিঝুম মারমারি নীরবতা! এই মাত্র না সে মামির মতো কাউকে ভেতরে আসতে দেখল, তাহলে মানুষটা গেল কই? মেহুল চারপাশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল, কিন্তু মামির কোনো দেখা পেল না আর না অন্য কারো।
তাই মনের ভুল ভেবে ‎​হতাশ হয়ে সে যেই না পার্ক থেকে বের হয়ে নিজের বাড়ির দিকে এগোবে, ঠিক তখনই তার নজরে পড়ল আনিকা! মাথায় লম্বা করে ঘোমটা টেনে সে দ্রুত পায়ে পার্কের পেছনের দিকের ছোট পকেট গেটটার দিকে হেঁটে যাচ্ছে।
‎​মেহুলের সন্দেহ এবার আরও গাঢ় হলো। তাই সে নিঃশব্দে আনিকার পিছু নিল।
এদিকে ‎​আনিকা দ্রুত গতিতে হেটে পার্কের পেছনের গেটটি পার হয়ে সরু গলিটায় ঢুকে পড়লো যেন তাকে কেউ তাড়া করছে। অতঃপর সেখানে গিয়েই সে নিজের মাথায় থাকা ঘোমটা এক ঝটকায় খুলে ফেলল। তারপর এক দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজের হাতের বেশ বড় সাইজের বাজারের ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে এক শয়তানি মুচকি হাসি ফুটাল। আর
‎​ঠিক সেই মুহূর্তেই তার কাঁধে এসে পড়ল কারো শক্ত হাতের স্পর্শ!

‎​”আহ্!”
‎​আনিকা চমকে উঠে প্রায় লাফিয়ে দূরে সরে গেল! আকস্মিক ধাক্কায় তার হাতের ভারী বাজারের ব্যাগটা ততক্ষণে হাত গলে মাটিতে পড়ে গিয়েছে। ব্যাগের মুখ খোলা থাকাতে ভেতরের নানা পদের জিনিসপত্র পিচঢালা রাস্তায় চারদিকে গড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ল।
‎​জিনিসগুলো মাটিতে পড়ে যেতে দেখে আনিকা রাগে-ক্ষোভে চোখ তুলে সামনে তাকাতেই তার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল—সামনে হাত দুটো বুকে বেঁধে শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে মেহুল!
‎​আকাশভাঙা মেঘের মতো হুট করে মেহুলকে এভাবে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আনিকা এক মুহূর্তের জন্য বেশ ভড়কে গেল, মুখ শুকিয়ে ছাই হয়ে গেল তার।
‎​এদিকে মেহুলের ধারালো দৃষ্টি এখন রাস্তায় গড়িয়ে পড়া জিনিসপত্রের দিকে। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ঝুকে একটা চকচকে লাল আপেল কুড়িয়ে নিল। আপেলটার গায়ে এখনো শহরের এক নামীদামী সুপার শপের লোগো দেওয়া বারকোডের স্টিকার জ্বলজ্বল করছে!
‎​মেহুল আপেলটা হাতের তালুতে হালকা নাচাতে নাচাতে এক চিলতে বিষাক্ত হাসি হেসে বলল—
‎​”বাহ্! চমৎকার তো! সারাজীবন আমার বাপের টাকায় গিলে গিলে পেট ভরিয়েও শখ মেটেনি, তাই শেষমেশ কিনা নিজের শখ মেটাতে চুরিবিদ্যা শুরু করতে হলো? বাহ্ আনিকা, বেশ অগ্রগতি তো তোদের!”
‎​আনিকা এক লহমায় তেতে উঠল! তার কান দিয়ে যেন গরম ধোঁয়া বের হতে লাগল। সে আঙুল উঁচিয়ে চিৎকারের গলায় বলল—

‎​”একদম ফালতু কথা বলবি না মেহুল! কাকে চোর বলছিস তুই, হ্যাঁ?! চুরি করতে যাব কোন দুঃখে? এগুলা সব আমি কিনেছি, আমার স্বামীর কষ্টে উপার্জিত টাকায় কিনেছি!”
‎​মেহুল উচ্চস্বরে হেসে উঠল। সেই হাসিতে শুধুই অবহেলা আর কটাক্ষ! সে তাচ্ছিল্যের সুর বাড়িয়ে বলল—
‎​”ওহ্ তাই নাকি? তোর স্বামীর আবার এত টাকা কবে হলো রে? তাই তো বলি, শহরের সবচেয়ে দামি সুপার শপ থেকে তোকে ভিআইপি কেনাকাটা করাচ্ছে! হুম, তা অবশ্য ভালোই মিলিয়েছিস তোরা দুজন—তুই যেমন ছ্যাঁচড়া চোর, তোর স্বামীটাও তেমন জোচ্চোর আর বাটপাড়! ভালো দুটোতে একদম রাজযোটক জমেছে!” বলেই মেহুল স্থান ছেড়ে যেতে পা বাড়ালো।
ওদিকে ‎​মেহুলের প্রতিটি বাক্য তখন যেন আনিকার গায়ে বিষাক্ত চাবুকের মতো গিয়ে লাগল। তার সমস্ত শরীর রাগে-ক্ষোভে তখন রি রি করে জ্বলতে শুরু করেছে। মেহুলকে এই মুহূর্তে তার চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে!

‎​আনিকার স্পষ্ট মনে আছে, আজ তার এই ভিখারির মতো জীবনের জন্য একমাত্র এই মেহুলই দায়ী! আরমানের সাথে বিয়ে হয়ে রাজরানী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল সে, আর আজ দু-বেলা ভালো একটু খাবারের জন্য কঙালদের মতো মায়ের মুখাপেক্ষী হয়ে পথ চেয়ে বসে থাকতে হয় তাকে!
‎​তার ওপর, কিছুদিন আগেই সে শুনেছে—মেহুল নাকি আরমান আর তার সুইজারল্যান্ডে হানিমুনের জন্য কেনা সেই বিলাসবহুল টিকিট দুটো তার বাবার এসিস্ট্যান্ট লিয়াকত আলীকে দিয়ে দিয়েছে! লিয়াকত আলী নাকি সেই টিকিটে নিজের বউকে নিয়ে সুইজারল্যান্ড ঘুরে এসেছে! এই খবরটা জানার পর থেকে মেহুলের প্রতি আনিকার ক্ষোভ ও ঘৃণা হাজার গুণে বেড়ে গিয়েছিল।

তাই ‎​আজ সুযোগ বুঝে সব অপমানের বদলা নিতে এবং মেহুলকে অন্তরে আঘাত করার জন্য আনিকা নিজের চোখ দুটো হিংসায় ছোট ছোট করে, মেহুলের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বিষাক্ত গলায় খোঁচা মেরে বলে উঠল—
‎​”তুই হেরে গেছিস মেহুল, কারণ আমি এখন মিসেস আরমান। তোর সাধের আরমান ভাইয়ের বউ।”
আকস্মিক আনিকার এমন কথাতে মেহুল থমকে দাঁড়ালো, কিন্তু ‎​মেহুলের মুখে কোনো আঘাতের চিহ্ন ফুটল না, নেই কোনো চোখের জল বা আক্ষেপের ছায়া। বরং তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে স্থির, শান্ত হাসি। একবিন্দু তোথলানো ছাড়াই সে পেছন ফিরলো সোজা আনিকার চোখের দিকে তাকিয়ে বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল—
‎​”কংগ্রাচুলেশনস! আমার ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্টকে এত আদরে বরণ করে নেওয়ার জন্য। আসলেই যোগ্য জিনিসই যোগ্য পাত্রে গিয়ে পড়েছে।”

‎​মেহুলের এই চরম শান্ত ভাব দেখে আনিকার ভেতরের অহংকার যেন ধাক্কা খেল। দাঁত কটমট করে উঠে, মেজাজ হারিয়ে তাচ্ছিল্যের সুর আরও বাড়িয়ে আনিকা বলল—
‎​”কী রে? খুব হিংসা হচ্ছে, তাই না? হওয়াটাই স্বাভাবিক। আফটার অল, তোর এত বছরের প্রেমিককে বিয়ে করে আজ আমি তার ছায়াসঙ্গিনী, তার বউ হয়ে আছি!”

‎​মেহুল এবার হালকা করে এক গাল হাসল—যে হাসিতে হিংসা নয়, ছিল করুণা আর স্বস্তির স্পষ্ট ছাপ। চোখ দুটিকে আরও দৃঢ় করে সে বলল—
‎​”হিংসা? তুই তো আমার উপকার করেছিস, আনিকা! বড় জোড় বাঁচিয়ে দিয়েছিস আমাকে। যে লোক বাড়িতে বউ থাকা সত্ত্বেও ‘অন্য নারীকে ভালোবাসার’ দোহাই দিতে পারে, এমন ছ্যাঁচড়া আর ব্যক্তিত্বহীন মানুষকে নিজের বর বানানো তো দূরের কথা—তাকে আমার শত্রুর তালিকায় রাখার যোগ্যতাটুকুও দিই না আমি। তাই ওর আসল জায়গা তোর মতো আবর্জনার কুড়ানিই কাছেই ঠিক আছে।”
‎​কথা শেষ করে মেহুল আনিকাকে এক চুলও পাত্তা না দিয়ে পাশ কাটিয়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল। আর অন্যদিকে রাস্তার মাঝখানে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কেবল আনিকা, যার কথিত ‘জয়’ এইমাএ এক নিমেষে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে গেছে।

‎আনিকার সাথে গলির মুখে তর্ক ঝগড়া শেষ করে মেহুল ধীর পায়ে বাড়িতে ফিরে এলো। ‎​বাড়ির দরজার লক খুলে ভেতরে ঢুকতেই রান্নাঘর থেকে থালা-বাসন নাড়াচাড়ার টুংটাং শব্দ কানে এলো তার। মিনারা আছে ভেবে মেহুল পা চালিয়ে সোজা রান্নাঘরের দিকে হেঁটে গেল। ভেতরে ঢুকতেই দেখল—শিরিনা বেগম বেশ ব্যস্ত ভঙ্গিতে চুলার কাছে দাঁড়িয়ে তরকারি নাড়ছেন।
‎​মেহুল আড়ম্বর ছাড়াই সোজা গিয়ে শিরিনা বেগমের একদম মুখোমুখি দাঁড়াল।
‎​হঠাৎ করে মেহুলকে এভাবে সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে শিরিনা বেগম চমকে উঠলেন! তার হাত থেকে খন্তিটা যেন সশব্দে পড়ে যাচ্ছিল। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে মুখে একটা কৃত্রিম, হালকা হাসি ফুটিয়ে বললেন, “কখন এলে মেহুল? খেয়ালই করিনি মা… কিছু লাগবে তোমার? চা করে দেব?”
‎​মেহুলও পাল্টা এক চিলতে হাসি হাসল—যে হাসির পেছনে লুকিয়ে আছে ধারালো তীক্ষ্ণতা! সে অতি শান্ত গলায় বলল—

‎​”এসেছি তো তখনই মামি… যখন আপনি পার্কে ‘খাবার ডেলিভারি’র কাজ সারতে গিয়েছিলেন! কিন্তু সেখানে তো সুযোগ হলো না, তাই ভাবলাম এখন একটু সামনাসামনি দেখা করে নিই।”
‎​আকস্মিক মেহুলের মুখে এমন স্পষ্ট কথা শুনে শিরিনা বেগমের মুখের কৃত্রিম হাসি নিমেষে উবে গেল! তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। তিনি চরম আতঙ্কে তোতলাতে তোতলাতে বললেন—
‎​”ক… কিসের কথা বলছ মা? কিসের পার্ক? আমি… আমি তো কোথাও যাইনি! বিকেল থেকে তো রান্নাঘরেই আছি!”
‎​এতক্ষণ মেহুলের চোখ-মুখে হালকা ভাব থাকলেও এবার তার অভিব্যক্তি এক মুহূর্তে কঠিন ও বরফশীতল হয়ে উঠল। সে শিরিনা বেগমের আরও কিছুটা কাছে ঝুকে, একদম নিচু ও ফিসফিসানো অথচ ভয়ংকর কণ্ঠে বলল—

‎​”আমার সামনে একদম বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলবেন না, মামি! আপনি হয়তো ভুলে গেছেন, আমাদের এই পুরো বাড়ির আর এরিয়ার চারপাশে আর ঢোকার মুখে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো আছে! আপনি কখন বের হয়েছেন, হাতে কী ছিল, আর পার্কে কার সাথে দেখা করেছেন—সবকিছুই কিন্তু রেকর্ড হয়ে গেছে!”
‎​মেহুলের মুখে ‘সিসিটিভি ক্যামেরা’র নাম শুনতেই শিরিনা বেগম যেন পুরো জমে পাথর হয়ে গেলেন! তার মুখ থেকে আর কোনো শব্দ ফুটল না। সত্যি তো! তিনি এই সিসিটিভি ক্যামেরার কথা বেমালুম ভুলেই বসেছিলেন! চুরির ফাঁদ যে এভাবে তার নিজের গলাতেই আটকে যাবে, তা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি!

এদিকে ‎​মেহুল শিরিনা বেগমকে একটু দেখলো অতঃপর এবার তার কণ্ঠে আরও তেজ ও ক্ষোভ ঢেলে কঠিন চোখে শিরিনা বেগমের দিকে তাকাল। তার প্রতিটি শব্দ যেন চাবুকের মতো গিয়ে আঘাত করতে লাগল মামির গায়ে। মেহুল বরফশীতল গলায় স্পষ্ট উচ্চারণে বলল—
‎​”আমার মামা যদি আজ অসুস্থ হয়ে উইলচেয়ারে বন্দি না থাকতেন, তবে বহু আগেই আপনাকে আপনার ওই কুপুত্র আর মেয়ের মতো এই বাড়ি থেকে লাথি মেরে বের করে দিতাম! কারণ আপনারা মা-মেয়ে দুটোই সমান বিশ্বাসঘাতক!”
‎​কথাটা শেষ করে মেহুলের ঠোঁটের কোণে এক তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে সামান্য ঝুকে মামির চোখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে ধীর কণ্ঠে যোগ করল—

‎​”তবে আপনার হাবভাব দেখে তো মনে হচ্ছে, আপনার বুঝি মামা আর নিজের ছোট মেয়ে মিথিলার প্রতিও কোনো টান নেই! টান থাকলে অন্তত নিজের স্বার্থের জন্য এই বাড়ির সাথে এত বড় বেইমানি করতেন না। আশা করি ভুলে যাননি—মিথিলার পড়াশোনা থেকে শুরু করে সব খরচ এখনো আমরাই বহন করছি! তাই বলছি, এখনো সময় আছে… সোজা পথে চলে আসুন আর নিজেকে শুধরে নিন! তা না হলে আপনার পরিণতিও আপনার বড় মেয়ে আনিকার মতোই হবে! ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে হবে… কথাটা যেন মাথার ভেতর ভালো করে গেঁথে থাকে!”
‎​মেহুলের এই ভয়ংকর হুমকি আর ধারালো কথার বাণে শিরিনা বেগম রীতিমতো থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। তার কপাল বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরতে শুরু করল। মেহুলকে তিনি যতো দেখছেন ততোই অবাক হচ্ছেন, ভয়ে আর অপরাধবোধে তিনি হাত-পা ঠান্ডা করে ফেললেন, কী বলবেন বা কী করবেন কিছুই ভেবে উঠতে পারছিলেন না!
‎​ঠিক তখনই বাড়ির প্রধান ফটক খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন মিনারা বেগম। তার ঠোঁটে লেগে আছে এক চিলতে প্রসন্ন ও তৃপ্তির হাসি।
‎​এদিকে মিনারা বেগমকে দেখে শিরিনা বেগম যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেলেন! তিনি দ্রুত ঘাম মুছে, মাথা নিচু করে চুলায় চায়ের পানি চাপানোর ভান করতে লাগলেন—যেন একটু আগেই এখানে কোনো ঝড়ের তাণ্ডব বয়ে যায়নি!

অপরদিকে ‎​মিনারা বেগম হাসিমুখে মেহুলের কাছে এগিয়ে এসে ওর গালে হাত রেখে আদর করে বললেন, “কী রে, কখন এলি তুই?”
‎​মেহুল ঠোঁটের কোণে মায়াবী এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল, “একটু আগেই মনি! এতক্ষণ তো মামির সাথেই কথা বলছিলাম। তা তুমি ভরসন্ধ্যায় কোথায় ছিলে, সেটা বলো তো?”
‎​মেহুলের প্রশ্নে মিনারা বেগমের মুখের হাসি যেন আরও একটু প্রশস্ত হয়ে উঠল। বেশ উৎফুল্ল কণ্ঠে তিনি বললেন, “আমাদের প্রতিবেশী প্রতিমা দি আছে না? ওনার ছেলে অর্ণবকে তো চিনিস?”
‎​মেহুল হালকা মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, চিনেছি। তা কী হয়েছে ওনার?”
‎​”বাচ্চার বাবা হচ্ছে রে!” মিনারা বেগম যেন আনন্দ চেপে রাখতে পারছেন না। “এই তো সেদিনের কথা… মনে হয় এই কিছুদিন আগেই তোর সাথে খেলতে এসে মিনারের কাছে মাইর খেয়ে নালিস করতে আসত! পুরো গার্ডেন চেঁচামেচি করে মাথায় তুলত! সেই ছোট অর্ণব নাকি আজ বাবা হচ্ছে! ওর স্ত্রী শ্রেয়ার কাল সাধের অনুষ্ঠান।”

‎​মেহুল ভ্রু কুঁচকে হালকা হেসে বলল, “তা তুমি এখন সেখানে গিয়েছিলে কেন? তোমার কী কাজ?”
‎​”প্রতিমা সকালে ফোন করে যেতে বলেছিল রে। আমার সাথে ওনার খুব ভাব বুঝলিতো, কিন্তু সংসারের কাজের চাপে দুপুরে যেতে পারিনি, তাই ভাবলাম এখনই একবার ঘুরে আসি। কিন্তু গিয়েই তো আটকে গেলাম! প্রতিমা তো ছাড়তেই চাচ্ছিল না। তাই তেরি হলো। আর সত্যি বলছি মেহুল, শ্রেয়াকে কী যে সুন্দর লাগছে দেখতে! সন্তান পেটে আসলে নারীরা যেন আপনাতেই এক স্বর্গীয় সৌন্দর্যে ভরে ওঠে! কাল আমাদের পুরো পরিবারকে ওদের বাড়িতে দাওয়াত করেছে, বুঝলি মেহুল?”
‎​মেহুল তার মনিন প্রতিটা কথা নিঃশব্দে শুনল। কিন্তু প্রতিউত্তরে ওর মুখ দিয়ে শুধু ছোট্ট একটা শব্দই বের হলো—”ওহ্…..এর বেশি সে আর কিছু বলতেই পারলো না।”

‎​প্রতিবেশীর ঘরে নতুন প্রাণ আসছে, ঘরে ঘরে খুশির আমেজ—এটা নিঃসন্দেহে আনন্দের সংবাদ। একটা অনাগত সন্তান পরিবারে বয়ে নিয়ে আসে হাজারো আলো, হাজারো স্মৃতি। কিন্তু আজ এই ‘বাচ্চা’ শব্দটাই যেন মেহুলের বুকের একদম সুপ্ত ক্ষতটায় নতুন করে এক চরম আঘাত করল!
‎​না চাইতেও ভেতরটা কোনো এক অজানা আগুনে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল ওর। অতীতের কোনো এক বিভীষিকা, অসম্পূর্ণ কোনো স্বপ্ন আর অব্যক্ত কোনো যন্ত্রণা একলহমায় ওকে গ্রাস করে ফেলল। বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে, অথচ মুখে তা প্রকাশ করার উপায় নেই!

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১০

‎​মিনারর মুখের সেই অনাবিল আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের সামনে নিজের হৃদয়ের এই রক্তক্ষরণ লুকাতে মেহুল কষ্ট করে একটা হাসির প্রলেপ লাগাল। কিন্তু চোখের কোণে জমে ওঠা নোনা জলের বাষ্পটুকু আড়াল করতে সে তড়িঘড়ি করে নিজের মনির দিকে তাকিয়ে বলল, “মনি, আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসি…”
‎​কথাটা শেষ করেই মেহুল দ্রুত পায়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল—নিজের বুকের ভেতরে জমাট বাঁধা পাহাড়সম কষ্টগুলোকে আঁধার ঘরে একাকী সামলে নেওয়ার জন্য।

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১১