শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১২
আফীফা আফনান
”ডিমের পিঠা, নারকেলের নাড়ু, নিমকি, আচার, জামাকাপড়, মেডিসিন, জুতো… হুম, সব ঠিকমতো প্যাক করা শেষ! আর কিছু রাখবি মেহুল?”
ব্যাগ গুছোনো শেষ করে উৎফু্ল্ল গলায় প্রশ্ন ছুড়লেন মিনারা।
মেহুল তার হাত ব্যাগে দৈনন্দিন ব্যবহারের টুকটাক কসমেটিকসগুলো রাখতে রাখতেই মিনারা বেগমের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “আমি মাত্র এক সপ্তাহের জন্য যাচ্ছি মনি! তুমি এমনভাবে হরেক পদের জিনিসপত্র প্যাক করে দিচ্ছ, যেন আমি কয়েক মাসের জন্য দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি! সত্যি বলছি মনি, আমার এত কিছু লাগবে না। আর এই শুকনো নাস্তাগুলো কেন দিয়েছ? আমি কি এসব খাই?”
মিনারা বেগম ট্রাভেল ব্যাগের চেইনটা যত্ন করে লাগাতে লাগাতে মেহুলের দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম ধমকের সুরে বললেন, “সাত-সাতটা দিনের জন্য বাড়ির বাইরে যাচ্ছিস মেহুল, নিয়ে যা! দেখবি ওখানে গিয়ে খিদে পেলে এগুলোই তোর কাজে লাগবে। ”
মিনারা বেগমের কথা শুনে মেহুল মুচকি হেসে এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে মিনারা বেগমের গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল, “আমাকে খুব মিস করবে, তাই না মনি?”
মিনারা বেগম পরম মমতায় মেহুলের হাত দুটো ছাড়িয়ে নিয়ে ওর কপালে ভালোবাসার উষ্ণ এক চুমু আঁকলেন। তারপর চোখ দুটো সামান্য ছলছল করে বললেন, “অনেক মিস করব রে মা! তুই না থাকলে যে এই পুরো বাড়িটা আমার কাছে একদম শূন্য আর খাঁ খাঁ লাগে!”
মেহুল মায়াবী হেসে খোঁচা মেরে বলল, “কেন? তোমার মিনার আছে না? ও তোমাকে একদম একা হতে দেবে না, দারুণ সঙ্গ দেবে!”
কথাটা শুনতেই মিনারা বেগম চোখ কপালে তুলে বললেন, “আরে রাখ তোর মিনার! ওটা তো একটা লেজ ছাড়া বাঁদর! বাড়িতে কি ও স্থির হয়ে টিকে থাকে কখনো? সারাদিন এদিক-সেদিক টো-টো করে লাফিয়ে বেড়ায়!”
মণির মুখে মিনারের এমন বর্ণনা শুনে মেহুল খিলখিল করে হেসে উঠল।
অতঃপর ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে চিরুনি দিয়ে নিজের ঘন চুলগুলো আঁচড়াতে শুরু করল সে। মিনারা বেগম আয়নায় মেহুলের প্রতিবিম্ব দেখে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে এগিয়ে এসে ওর হাত থেকে চিরুনিটা কেড়ে নিলেন। হাত ধরে টেনে এনে বেডের ওপর বসিয়ে দিয়ে বললেন, “এদিকে আয় তো দেখি! তোর চুলে একটু ভালো করে তেল মালিশ করে দিই।”
চুলগুলো হাতে স্পর্শ করতেই মিনারা বেগম হালকা আক্ষেপ করে বলে উঠলেন, “কতদিন চুলে তেলের ছোঁয়া দিস না, বল তো? কি সুন্দর ঘন দীঘল চুলগুলোকে অযত্নে কী বানিয়েছিস মেহুল! নিজের প্রতি কি একটুও খেয়াল বা যত্ন নেই তোর? এই বয়সের বাকি মেয়েদের দেখি দিনরাত পার্লারে চষে বেড়ায় আর তুই নিজের সৌন্দর্যটাকে এভাবে ফেলে রেখেছিস!”
মেহুল মিনারার বকুনি শুনে শুধু মৃদু হাসল, একটা শব্দও মুখ ফুটে বলল না। কারণ মিনারা বেগমের এই শাসনের ভেতর সে সবসময় তার প্রয়াত মায়ের পরশ খুঁজে পায়। মণির কাছে থাকলে তার কখনো মনেই হয় না যে তার নিজের মা এই পৃথিবীতে নেই। এদিকে মিনারা বেগম পরম আদরে মেহুলের সিঁথিতে তেল মালিশ করতে করতে হঠাৎ হালকা গলায় বললেন, “হাঁ মেহুল, আজ কিন্তু আমাদের প্রতিবেশী প্রতিমা দিদির বাড়িতে দাওয়াত! তুই কিন্তু আজ আমার সঙ্গে যাবি । দিদি বারবার তোর কথা বলে দিয়েছেন, তোকে ছাড়া যেন না যাই।”
কথাটা কানে যেতেই মেহুলের ঠোঁটের হাসিটা নিমেষে মিলিয়ে গেল। সে একলহমায় একদম চুপ মেরে গেল।
খানিক বাদে বেশ দ্বিধা আর অনীহা মাখা গলায় বলে উঠল, “আমি যাব না মনি… প্লিজ, আমাকে যেতে জোর কোরো না।”
মিনারা বেগম মেহুলের ভেতরের দ্বিধা আর সামাজিক সংকোচটুকু খুব ভালো করেই বুঝতে পারলেন। লোকে কী বলবে, কী মন্তব্য করবে—এই ভয়টাই তো মেয়েটাকে ইদানীং কোণঠাসা করে রেখেছে!
তাই তিনি তেল দেওয়া শেষ করে মেহুলের কাঁধে দুটো হাত রেখে পরম স্নেহে বললেন, “যাবি না কেন? অবশ্যই যাবি! লোকে তো কত কথাই বলবে মা, হাজারটা মুখ বন্ধ করার সাধ্য আমাদের নেই। পাছে লোকে কিছু বলে—এই ভেবে কি তুই নিজের জীবন থামিয়ে রাখবি? সবার কথা কান দিয়ে মাথায় তুলতে নেই রে মা! আর প্রতিমা দি তোকে কতটা স্নেহের চোখে দেখেন, তা তো তুই জানিসই। আমাকে এত করে বলে দিয়েছেন তোকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে!”
মেহুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে বলল, “কিন্তু মনি, আমি তো এখন হাসপাতালে যাব। ওখান থেকে পেশেন্ট সামলে আসতে আসতে দুপুর হয়ে যাবে। তার ওপর আজ রাতেই আবার রাজশাহীর উদ্দেশ্যে বের হতে হবে…”
মিনারা বেগম কোনো বাহানাই শুনলেন না। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “কোনো অজুহাত নয়! সকালে ডিউটি শেষ করে তুই দুপুরেই সোজা ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে আসবি। ওনাদের অনুষ্ঠান দুপুর থেকেই শুরু হবে। আমি তোর জন্যই অপেক্ষা করে বসে থাকব বাড়িতে। তুই এলেই কিন্তু আমরা দুজন একসাথে যাব, বুঝেছিস?”
মেহুল আর দ্বিতীয় কোনো কথা বাড়াল না, নীরব রইল। কারণ সে ভালো করেই জানে, মিনারা মণিকে কোনো বিষয়ে একবার রাজি করানো অসম্ভব। তিনি যখন একবার ধরেছেন, তখন মেহুলকে সাথে নিয়েই তবে ছাড়বেন!
তাই আর কোন তর্কে না জড়িয়ে একসময় রেডি হয়ে হাসপাতালে ডিউটির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার জন্য মেহুল ধীরপায়ে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। পরনে একদম সাধারণ কিন্তু মার্জিত একখানা সুতির সালোয়ার-কামিজ, চোখে-মুখে পেশাগত জীবনের সেই পরিচিত গাম্ভীর্য।
বাড়ির মূল ফটকের কাছে পৌঁছাতেই মেহুলের চোখ চলে গেল ঠিক পাশের প্রতিবেশী প্রতিমা সিনহাদের বাড়ির দিকে।
পুরো বাড়িটা আজ যেন এক অপার্থিব রূপ ধারণ করে সেজে উঠেছে! হিন্দু শাস্ত্র ও সংস্কৃতি অনুযায়ী সাধের অনুষ্ঠানের ঐতিহ্য মেনে পুরো মূল ফটক থেকে শুরু করে প্রবেশদ্বার পর্যন্ত গাঁদা, রজনীগন্ধা আর লাল-হলুদ ফুলের সতেজ তোরণে সুসজ্জিত করা হয়েছে। প্রবেশদ্বারের ঠিক পাশেই কাঁচের পাত্রে ভাসমান গোলাপের পাপড়ি ও জ্বলন্ত রঙিন প্রদীপ।
আর ফটকের ঠিক ওপরে ঝুলছে ফুটফুটে এক ছোট বাচ্চার হাসিমুখের বিরাট এক পোস্টার—যা পথচলতি যে কাউকেই একপলকে জানান দিচ্ছে যে, আর মাত্র কয়েকটা দিনের অপেক্ষা, তারপরই এই বাড়িতে পদার্পণ করতে চলেছে এক পবিত্র ছোট অস্তিত্ব!
মেহুল কয়েক সেকেন্ড অপলক দৃষ্টিতে সেই সাজসজ্জা আর বাচ্চার রঙিন ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর কোন এক না-বলা তীব্র ব্যথা মোচড় দিয়ে উঠল ওর। হৃদয়ের অতল গভীরে চেপে রাখা কষ্টগুলোকে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দিল না সে, তৎক্ষণাৎ নিজের পলক সরিয়ে চোখ জোড়া অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল।
ঠিক তখনই পাশ থেকে ডাক ভেসে এলো—”মেহুল মামণি, চলুন…”
তাদের বহু বছরের বিশ্বস্ত ও পুরনো ড্রাইভার রহিমের পরিচিত কণ্ঠ কানে আসতেই মেহুল ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবতায় ফিরে এলো।
”হ্যাঁ রহিম কাকা, চলুন,” মৃদু গলায় উত্তর দিয়ে মেহুল আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে সোজা গাড়ির পেছনের সিটে উঠে বসল।
রহিম কাকা গাড়ি স্টার্ট দিতেই ধীরগতিতে গাড়িটা চেনা গলি পেরিয়ে মূল সড়কের দিকে চলতে শুরু করল। মেহুলের বর্তমান গন্তব্য এখন একটাই—সব কষ্ট আর অতীতকে পেছনে ফেলে নিজের কর্মস্থল, হাসপাতাল!
মেহুল যখন হাসপাতালে এসে পৌঁছাল, চারপাশ জুড়ে তখন সেই চিরচেনা ব্যস্ততা, অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আর মানুষের ছোটাছুটি। মেহুল এসবে অভ্যস্ত তাই দ্রুত পায়ে ব্যস্ত করিডোর পেরিয়ে সোজা নিজের কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল।
আজকের দিনটা ওর জন্য বেশ ব্যস্ততার। কারণ আজ রাতেই তাদের বিশেষ মেডিকেল টিম চট্টগ্রাম থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। তাই যাওয়ার আগে জুনিয়র ইন্টার্ন ডাক্তারদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা ও দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার একটা ছোটখাটো মিটিং রাখা হয়েছে।
নিজের রুমে পৌঁছেই আলমারির লকার খুলে দুধসাদা অ্যাপ্রোনটা গায়ে জড়িয়ে নিল সে। এরপর টেবিল থেকে রাজশাহী ক্যাম্পের মূল ফাইলটা হাতে নিয়ে গাম্ভীর্যপূর্ণ পায়ে কনফারেন্স রুমের দিকে এগিয়ে গেল। কনফারেন্স রুমে পৌঁছেই এক দক্ষ ও দায়িত্বশীল চিকিৎসকের মতো সবাইকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পুরো ক্যাম্পের পরিকল্পনা আর কাজের বন্টন বুঝিয়ে দিতে শুরু করল মেহুল।
এদিকে মেহুল যখন ভেতরের পরিবেশ মাতাচ্ছিল নিজের মেধা আর দক্ষতার সুবাসে, ঠিক তখনই হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে এসে থামল এক রাজকীয় ব্ল্যাক মার্সিডিজ বেঞ্জ!
গাড়ির পেছনের জানালার কালো গ্লাসটা ধীরগতিতে নিচে নেমে আসতেই দৃশ্যমান হলো সালমানের প্রখর ও থমথমে মুখশ্রীয়। চোখ থেকে দামি রোদচশমাটা খুলে সে হাসপাতালের উঁচু ভবনের দিকে বাজপাখির মতো প্রখর ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার তাকাল।
এদিকে ড্রাইভিং সিট থেকে রবি দ্রুত নেমে এসে পেছনের দরজা খুলে ধরতেই সালমান গাড়ি থেকে নামল। তার সুঠাম দেহ আর রাজকীয় চালচলন দেখে মুহূর্তের জন্য চারপাশের মানুষ যেন থমকে গেল। এরপরেই অত্যন্ত ভাবলেশহীন মুখে সালমান হাসপাতালের ভেতরে পা রাখল।
হাসপাতালে ঢুকে রবি সোজা মেহুলের কেবিনের দিকে গেল, কিন্তু কেবিনের দরজা লক করা দেখে রবি দ্রুত ঘুরে এসে নিচে রিসেপশনের দিকে পা বাড়াল।
ঠিক তখনই তার সাথে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল হাসপাতালের এক ওয়ার্ডবয়ের—যে কি না কিছুদিন আগের সেই ঝোড়ো রাতে সালমানের লোকজনের হাতে প্রচণ্ড মার খেয়েছিল!
ওয়ার্ডবয়টি রবিকে দেখেই চিনতে পারল এবং ভয়ে আতঙ্কে তার গায়ের পশম খাড়া হয়ে গেল। কারন সেদিন ঝগড়ার সময় রবির হাতে সে পি*স্তল দেখেছিলো। অতঃপর সে রবির হাত থেকে বাঁচতে সেখান থেকে চম্পট দেওয়ার চেষ্টা করতেই রবি তার শার্টের কলার খপ করে চেপে ধরল!
”তোর ডাক্তার ম্যাডাম কোথায়?” রবি বরফশীতল গলায় প্রশ্ন ছুল।
ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ছেলেটি তোতলাতে লাগল, “ম্যা… ম্যাডাম তো ওনার কেবিনে আছেন…”
”কেবিনে নেই! আমি এইমাত্র ওখান থেকে ঘুরে এসেছি। সত্যি করে বল, কোথায় ?” রবির তোপ দাগানো কথায় ছেলেটি কেঁপে উঠলো ।
সে কোনোমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “ভাই, ছেড়ে দেন! আমি… আমি জিজ্ঞেস করে বলছি!”
রবি কলার ছেড়ে দিতেই ছেলেটি এক প্রকার হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সামনে থাকা রিসেপশন ডেস্কের মেয়েটির দিকে এগিয়ে গিয়ে তড়িঘড়ি করে জিজ্ঞেস করল, “ডক্টর মেহুল এখন কোথায় আছেন ?”
মেয়েটি কম্পিউটার স্ক্রিনের দিক থেকে চোখ না ফিরিয়েই জবাব দিল, “ম্যাডাম তো এখন তিনতলার কনফারেন্স রুমে আছেন। ইন্টার্নদের সাথে মিটিং চলছে। কেন, কোনো জরুরি কাজ?”
ঠিক তখনই রবি কড়া পায়ে এগিয়ে এসে বেশ গম্ভীর ও ভিআইপি ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল, “আমার এক বিশেষ পেশেন্টকে দেখাতে হবে। উনি কখন ফ্রি হবেন বলতে পারেন?”
রবির পরনের স্যুট-বুট আর আভিজাত্য দেখে রিসেপশনিস্ট ভাবল—নিশ্চয়ই কোনো প্রভাবশালী মন্ত্রী বা শিল্পপতির লোক হবে! তাই সে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে হেসে বলল, “আমরা তো ঠিক বলতে পারছি না স্যার। আসলে আজ রাতেই আমাদের হাসপাতাল থেকে ডাক্তারদের একটা বিশেষ টিম রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের জন্য রওনা হচ্ছে। ম্যাডাম সেটা নিয়েই মিটিং করছেন।”
”রাজশাহী?!”
শব্দটা কানে যেতেই রবির চোখের মনি জ্বলে উঠল। সে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে দ্রুত পায়ে হেঁটে লবিতে দাঁড়িয়ে থাকা সালমানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে পুরো বিষয়টা জানিয়ে দিল।
’রাজশাহী…’—রবির মুখ থেকে শব্দটা শোনামাত্রই সালমানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত কিন্তু চরম তৃপ্তির হাসি। চোখের সেই বাজপাখির মতো চাহনিতে ফুটে উঠল উন্মাদের মতো জয়ের নেশা!
অতঃপর সানগ্লাসটা পকেট থেকে বের করে চোখে চড়াতে চড়াতে সালমান রহস্যময় কণ্ঠে বিড়বিড় করল—
”তাহলে আমার অপ্সরা এবার ডানা মেলে রাজশাহীতে উড়াল দিচ্ছে? দিক… উড়ে কত দূর যাবে? যেখানেই যাবে, এই সালমান শাহ নেওয়াজকেই পাবে! কারন রাজশাহীর আকাশটা যে শুধুই এই নেওয়াজের !”
ঘণ্টাখানেকের দীর্ঘ মিটিং শেষে মেহুল যখন কনফারেন্স রুম থেকে বের হয়ে এলো, তখনো পুরো হাসপাতালের দৃশ্যপট আগের মতোই ব্যস্ত আর তোলপাড়। করিডোর দিয়ে ট্রলি ঠেলার খটখট শব্দ, স্যালাইনের স্ট্যান্ড হাতে স্বজনদের ছুটোছুটি আর অ্যাম্বুলেন্সের ক্রমান্বয়ে থেমে যাওয়া সাইরেন—সব মিলিয়ে যেন এক চিরচেনা নিয়মের নগরী।
মেহুল তার কিছু সিনিয়র ডক্টরদের সাথে সোজা হেঁটে ডিপার্টমেন্টাল হেডের কেবিনে গেল। সেখানে গিয়ে আগামী এক সপ্তাহের ফ্রি ক্যাম্পের ফাইনাল ফাইল সাবমিট করল এবং তাঁর কাছ থেকে দরকারি নির্দেশনা বুঝে নিল। হেড অব দি ডিপার্টমেন্ট সবটা বুঝে নিয়ে হাসিমুখে মেহুলদের শুভকামনা জানালেন। এরপর মেহুল ওর শ্রদ্ধেয় সিনিয়র ডাক্তারদের কাছ থেকে একে একে বিদায় ও কুশল বিনিময় করল।
সব কাজ গুছিয়ে অ্যাপ্রোনটা হাত ব্যাগে পুরে মেহুল যেই না হাসপাতালের মেইন গেটের দিকে পা বাড়াল—ঠিক তখনই জরুরি বিভাগের সামনে এক অভূতপূর্ব হুলস্থুল পড়ে গেল!
একটা সিএনজি থেকে হন্তদন্ত হয়ে নেমে এলো কয়েকজন মানুষ। তাদের মাঝখান থেকে এক তরুণী গর্ভবতী নারীকে চাদরে মুড়িয়ে ধরে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে দিল তার পরিবার।
”ডাক্তার সাহেব! কই গো আপনারা? কেউ একটু আয়া দেহেন! আমার মাইয়াডা শ্যাষ হইয়া গেল!”—এক প্রবীণ পুরুষের আহাজারিতে এক মুহুর্তের জন্য পুরো এমার্জেন্সি লবি কেঁপে উঠল।
নার্সরা তড়িঘড়ি করে একটা স্ট্রাচার টেনে এনে মেয়েটিকে তার ওপর শায়িত করতেই স্পষ্ট হয়ে উঠল পরিস্থিতি কতটা আশঙ্কাজনক। গর্ভবতী তরুণীটি যন্ত্রণায় কুকড়ে গিয়ে ছটফট করছে, তার সাদা কাপড়ে রক্তের লাল দাগ ফুটতে শুরু করেছে। তীব্র প্রসববেদনায় পুরো হাসপাতাল মাথায় তুলছে সে।
মেহুল কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। ডাক্তারের পোশাক গায়ে না থাকলেও তার গলায় ঝুলানো আইডি কার্ড আর গাম্ভীর্য দেখে এক বৃদ্ধা মহিলা একপ্রকার ধেয়ে এসে মেহুলের দুটো হাত খপ করে চেপে ধরলেন!
বৃদ্ধার জীর্ণ হাত দুটো কাঁপছিল, চোখের কোণে উপচে পড়া নোনা জল। তিনি আকুতিভরা ব্যাকুল কণ্ঠে কেঁদে উঠে বললেন, “আমার নাতনিডারে বাচান ম্যাডাম! অয় খুব কষ্ট পাইতাছে! ওরে একটু দ্যাহেন, আমাগো আর কেউ নাই!”
বৃদ্ধার সেই করুণ চাওয়ায় মেহুলের ভেতরের পেশাদার চিকিৎসক আর কোমল হৃদয়টা একমুহূর্তে জেগে উঠল। রাজশাহীর টেনশন, ক্লান্তি—সব এক ঝটকায় মাথা থেকে উবে গেল।
সে আর এক সেকেন্ডও বিলম্ব না করে দ্রুত গতিতে পেশেন্টের দিকে এগিয়ে গেল।
”রিপোর্টিং ট্রলি আনুন শিগগির!”—নার্সদের উদ্দেশ্যে পেশাদার কণ্ঠে হাঁক দিল মেহুল।
দ্রুত রোগীর পালস চেক করল, পেটে হাত দিয়ে বাচ্চার পজিশন আর ইউটেরাইন কন্ট্রাকশন অনুভব করল সে। ব্লিডিংয়ের মাত্রা দেখেই মেহুলের অভিজ্ঞতা বলে দিল—পরিস্থিতি বেশ জটিল, ক্রাইসিস মোমেন্ট চলছে! পেশেন্টকে এখনই গাইনোকোলজি আইসিইউতে শিফট করা জরুরি।
মেহুল বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে নার্সদের কড়া গলায় নির্দেশ দিল—
”অক্সিজেন মাস্ক লাগান জলদি! পেশেন্ট প্রিক্ল্যাম্পসিয়া আর সিভিয়ার লেবার পেইন নিয়ে এসেছে। ইমিডিয়েট স্ট্রাচার নিয়ে সোজা ৩য় তলার ওটি আর লেবার ওয়ার্ডে মুভ করান! আর শোনো, অন-ডিউটি গাইনি কনসালট্যান্ট আর জুনিয়ার ডাক্তারদের এখনই খবর দাও, ওটিতে যেন এক মিনিটের মধ্যে ট্রলি রেডি থাকে!”
ডাক্তার মেহুলের এমন তৎপরতা আর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় পুরো এমার্জেন্সি টিম নিমেষে অ্যালার্ট হয়ে গেল। নার্সরা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ট্রলি গড়িয়ে সোজা লিফটের দিকে ছুটল। মেহুল নিজেও তাদের পিছু পিছু ছুটল পেশেন্টের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে করতে।
রাজশাহীর উদ্দেশ্যে বের হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে, নিয়তির টানে মেহুল জড়িয়ে পড়ল আর একটা নতুন জীবনকে এই পৃথিবীতে আলো দেখানোর কঠিন লড়াইয়ে!
রোগীকে ইতিমধ্যে ওটিতে ঢুকিয়ে ফেলা হয়েছে। ওটির বাইরে কাঁচের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মেহুল এই হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ গাইনি স্পেশালিস্ট ডক্টর ফাতেমার সাথে দ্রুত কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলছিল। রোগীর ব্লিডিং আর রক্তচাপের যে অবস্থা, তাতে অস্ত্রোপচারের সূক্ষ্ম দিকগুলো বুঝিয়ে দেওয়াটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। ডক্টর ফাতেমা অভিজ্ঞতার সাথে মাথা নেড়ে মেহুলকে আশ্বস্ত করলেন এবং দ্রুত ভেতরে ঢুকে গেলেন।
এদিকে ওটির বাইরে কাঁচের দেওয়ালের ওপাশে রোগীর স্বজনরা উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে নিঃশব্দে অপেক্ষা করছিলেন।
ঠিক তখনই ওটির ভেতর থেকে একজন নার্স ট্রলি নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। স্বজনদের উদ্দেশ্যে তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, “আপনারা দয়া করে একজন বি পজিটিভ ব্লাড ডোনার রেডি রাখুন। ওটিতে রক্ত লাগতে পারে।”
কথাটা শোনামাত্রই সেই প্রসূতি মেয়েটির স্বামী হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এসে কাতর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “নার্স আপা, আমার বউ আর বাচ্চা ভালো আছে তো? কোনো বিপদ হবে না তো?”
নার্সটি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “আপনাদের ভাগ্য ভালো যে হাসপাতালে ঢোকার সাথে সাথে আপনারা ডক্টর মেহুলকে সামনে পেয়ে গিয়েছিলেন! উনি যেভাবে মুহূর্তের মধ্যে পেশেন্টকে হ্যান্ডেল করে ওটিতে শিফট করিয়েছেন, তা না হলে যেকোনো বড় অঘটন ঘটে যেতে পারত।”
কিছুক্ষণ পর ওটির অটোমেটিক গ্লাস ডোর গড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো মেহুল। তার কাজ শেষ, এখন বাকিটুকু গাইনি টিম সামলে নেবে। ওটি থেকে মেহুলকে বের হতে দেখেই নার্সটি আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে সেখান থেকে চলে গেল।
এদিকে মেহুল বেরিয়ে এসে ধীরপায়ে রোগীর ব্যাকুল হয়ে থাকা পরিবারের সদস্যদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তাদের থমথমে মুখগুলো দেখে ও হালকা এক চিলতে আশ্বাসভরা হাসি ফুটিয়ে বলল, “আপনারা একদম টেনশন করবেন না। সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রাখুন, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের ফাতেমা ম্যাম অনেক অভিজ্ঞ একজন ডাক্তার।
ইনশাআল্লাহ সুস্থ মা আর ফুটফুটে সন্তানকেই আপনারা কোলে পাবেন। আর হ্যাঁ, ডেলিভারি শেষ হয়ে বাড়ি ফেরার পরেও ডাক্তারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেন, কোনো বিষয় অবহেলা করবেন না।”
মেহুলের কথাগুলো যেন ওই সাধারণ পরিবারটার কাছে মরুভূমিতে এক পসলা বৃষ্টির মতো শোনাল।
ঠিক তখনই স্বজনদের মাঝখান থেকে সেই বৃদ্ধা মহিলাটি ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন। থরথর করে কাঁপা হাত দুটো বাড়িয়ে পরম স্নেহে মেহুলের মাথায় রাখলেন। চোখে অশ্রম্লান কৃতজ্ঞতা নিয়ে আকুল কণ্ঠে দোয়া করে বললেন, “আইজ আমার নাতনি আর অই অবুঝ ছাওয়ালডার লেগে তুই ফেরেশতা হয়া আইছিলি মা! আল্লায় তোরে সুখে রাখুক, তোর জীবন আলোয় ভইরা দিক!”
বৃদ্ধার এই অকপট ভালোবাসা আর দোয়ায় মেহুলের মনের সমস্ত ক্লান্তি যেন নিমেষে ধুয়েমুছে গেল। অতঃপর সে সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে সালাম জানিয়ে সবার কাছ থেকে বিদায় নিল।
হাসিমুখে হাসপাতালের মেইন গেট দিয়ে বাইরে বের হতেই তার ভ্যানিটি ব্যাগে রাখা ফোনটা ঝংকার দিয়ে উঠল। ফোনটা বর করতেই স্ক্রিনে ‘মিনারা মনি’ নামটা জ্বলজ্বল করছে।
মেহুল বুঝে গেলো সবটা তাই সে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে মিনারা বেগমের কিঞ্চিৎ অধৈর্য ও উদ্বেগভরা কণ্ঠ ভেসে এলো—
”কিরে মেহু, তুই এখন কোথায় রে মা? তোর জন্য ঘর-দোর রেডি করে আমি সাজগোজ করে অপেক্ষা করে বসে আছি! দুপুর গড়িয়ে গেল, তুই এখনো আসছিস না কেন?”
মেহুল অপরাধীর মতো হেসে কোনোমতে সামলে নিয়ে বলল, “এই তো মনি, একটা এমার্জেন্সি পেশেন্ট এসে পড়েছিল… আমি এখন রিকশায় উঠছি, ১০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি!” কথাটা বলেই সে কোনমতে ফোনটা কেটে দিল।
একটা গভীর নিশ্বাস ফেলে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার জন্য মেহুল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একটা খালি রিকশা ডাকবে, ঠিক তখনই কোথা থেকে ৮-৯ বছরের একটা ফুটফুটে ছেলে দৌড়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল!
ছেলেটির হাতে একগুচ্ছ সতেজ, ধবধবে সাদা গোলাপের তোড়া! সে হাসিমুখে তোড়াটি মেহুলের দিকে বাড়িয়ে দিল।
হুট করে এমন উপহার দেখে মেহুল বেশ অবাক হলো। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে সে খুব ভালো করেই চেনে—হাসপাতালের আশপাশে ঘুরে ঘুরে ফুল বিক্রি করে ও। মেহুল আলতো হেসে পরম স্নেহে ছেলেটার মাথার অগোছালো চুলে বিলি কেটে দিয়ে শুধাল, “কার ফুল এটা ?”
ছেলেটি একগাল হেসে চপল গলায় বলল, “আপনারই, ম্যাডাম!”
মেহুল চোখ জোড়া সামান্য ছোট করে আবার জিজ্ঞেস করল, “আমার? কিন্তু তোকে কে দিল এটা আমার জন্য?”
কিন্তু ছেলেটি আর কোনো উত্তর দিল না। মিষ্টি একটা দুষ্টুমিভরা হাসি দিয়ে এক দৌড়ে ভিড়ের মাঝে মিলিয়ে গেল!
মেহুল কিছুক্ষণ সাদা গোলাপের তোড়াটার দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল। ভেবে নিল, হয়তো তার সুস্থ হয়ে যাওয়া কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী পেশেন্টই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এই মিষ্টি উপহারটা বাচ্চার হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। তাই সে আর বেশি ভাবল না। গোলাপের স্নিগ্ধ সুবাসটা বুকভরে টেনে নিয়ে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা খালি রিকশার দিকে এগিয়ে গেল এবং পরম শান্তিতে তাতে চেপে বসল।
এদিকে রিকশাটা ধীরগতিতে চলতে শুরু করতেই, কিছুটা দূরে রাস্তায় পার্ক করে রাখা সেই প্রকাণ্ড কালো মার্সিডিজের গ্লাসটা সামান্য নিচে নেমে এলো।
গাড়ির পেছনের সিটে হেলান দিয়ে বসে আছে সালমান।
দূর থেকে রিকশায় বসে থাকা মেহুলের ঘামভেজা চঞ্চল মুখ আর ক্লান্ত দুটো চোখের মায়াবী ভাব দেখছিল সে। মেহুলের ওই শুভ্রতা, ওই ক্লান্তি আর তার হাতের ওই সাদা গোলাপ—সব মিলিয়ে সালমানের হৃদয়ে ধক করে এক অচেনা, তীব্র শিহরণ জেগে উঠল!
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১১
সালমানের প্রখর চাহনিতে এখন কোনো হিংস্রতা নেই, আছে এক বুক উন্মাদের মতো ব্যাকুলতা। সে গাড়ির কাঁচের ওপর থেকে চোখ না সরিয়েই ঠোঁটের কোণে মোহাচ্ছন্ন এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে ফিসফিস করল—
”সাদা গোলাপগুলো তোমার হাতে বড্ড বেশি মানিয়েছে, অপ্সরা… তবে এই স্নিগ্ধতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ঝড়টার খবর কি তুমি পেয়েছ?”
