সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫১
জাবিন ফোরকান
আরেফিন বাড়ি একটুও বদলায়নি। আজও দন্ডায়মান আভিজাত্যের শীতলতা গর্ভে ধারণ করে। যখন ভেতরে ঢুকলাম, তখন বুকের ভেতর কেমন অচেতনতা ভর করল। মীরা আমাকে অনুসরণ করছে পিছনে। রোজিনা দরজা খুলে দৌঁড়ে খবর দিতে চলে যেতেই আমি হলঘরে প্রবেশ করলাম। এই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালজুড়ে রয়েছে আমার জীবনের সবথেকে তিক্ত স্মৃতিরা। তার সঙ্গে বৈবাহিক জীবনের কিছু মধুর সময়ের আবাহন। এই বাড়ির বাতাস এতটাই ভারী লাগলো যে ঠিকমত শ্বাস নিতে পারলাম না।
হলঘরের ডাইন ইন টেবিলে বসে আছে আয়দান। সামনে তার বেশকিছু বইপত্রের বহর। কিছু লিখালিখি করছে, পাশে চা এবং নাস্তা রাখা। আমার অস্তিত্ব টের পেয়ে নিজের কাজ বন্ধ করে ঘুরে তাকালো সে। খানিকটা বিস্মিত না হয়ে পারলাম না। চোখের সামনে দেখা মানুষটা যে ওই নালায়েক আয়দানই সেটা বিশ্বাস করে উঠতে আমায় খানিক হিমশিম খেতে হলো। চেহারা, বেশভূষায় এতটা বদল কিভাবে সম্ভব? অন্য সময় হলে এই বিষয়টাই আমার চিন্তায় মুখ্য হয়ে দাঁড়াতো। তবে আজ বেশি মাথা ঘামানোর সুযোগ পেলাম না। মনটা আতঙ্কে জমাট বেঁধে আছে।
নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো আয়দান। বই খাতা বন্ধ করে হেঁটে এলো সামনে। অদূরে দাঁড়ানো মীরার দিকে এক পলক চেয়ে পরক্ষণে সে আমার চোখের দিকে তাকালো।
“তুই? এখানে কি চাই?”
উত্তর করা গেলোনা। এর আগেই নিচতলার অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে এলেন জেসমিন এবং জাফর। পিছু পিছু আতঙ্কিত এক রোজিনা। জেসমিনের চোখমুখ কেমন যেন খিঁচে আছে। ভ্রুজোড়ার মাঝে তীব্র এক ক্রোধের ভাঁজ। অপরদিকে জাফর একইসঙ্গে বিচলিত এবং বিস্মিত।
“তুমি এখানে কি করছ?”
প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন জাফর। নিজের স্ত্রীকে খানিক জোর করেই সোফায় বসিয়ে দিলেন, বুঝি ইশারায় বারণ করলেন কোনো প্রতিক্রিয়া করতে। আমি অবশ্য সেদিকে বিশেষ নজরপাত করলাম না। এগিয়ে গেলাম পায়ে পায়ে। আয়দানের সামনে দাঁড়ালাম। এতক্ষণ যাবৎ হাতে ধরে রাখা লাল মলাটে মোড়ানো একটি ফাইল তুলে নিঃশব্দে বাড়িয়ে ধরলাম। ভীষণ অবাক হয়ে আয়দান দেখলো আমায়। পরক্ষণে ফাইলটি হাতে নিলো।
“জাফর, এই মেয়ে কোন সাহসে আমার বাড়িতে পা রাখলো?”
“জেসমিন। একটুখানি চুপ করে বসো, প্লীজ!”
জেসমিন এবং জাফরের কথোপকথনের মাঝেই আয়দান ফাইলটা খুলে দেখলো। আমি নিগূঢ় চেয়ে দেখলাম তার অভিব্যক্তি। প্রথমে তার বাদামী চোখজোড়া বেশ মনোযোগ দিয়ে ফাইলের প্রথম দিককার লাইনগুলো পড়লো। যত নিচে নামলো, তত ওই চোখের মাঝে কাঁপুনি সৃষ্টি হলো। একটা সময় সেই কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়লো তার হাতের মাঝেও। যেন বৈদ্যুতিক তরঙ্গ খেলে যাচ্ছে পুরুষটির শরীরজুড়ে, এমন এক ভীষণ উন্মাদনা তার অস্তিত্বজুড়ে। আয়দান এক পলক চোখ তুলে আমায় দেখলো, অবিশ্বাস মাখা দৃষ্টিতে।
“কি ব্যাপার? ওটা কি?”
জাফরের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে চেয়ে রইলো আয়দান। একচুল নড়তে পারছেনা বুঝি সে। বাকরুদ্ধ, জমাট বাঁধা তার অস্তিত্ব। ছেলের এমন প্রতিক্রিয়া পিতা মাতা উভয়কে বিস্মিত করলো। জাফর হনহন করে এগিয়ে এসে আয়দানের হাত থেকে ফাইলটা রীতিমত কেড়ে নিলেন। অতঃপর নির্বাকতা বরণ করলেন তিনিও।
“তোমরা বাপ ছেলে দুজন মিলে কি পাগল হয়ে গিয়েছ?”
জেসমিন রোজিনাকে ইশারা করতেই মেয়েটা জাফরের কাছ থেকে ফাইলটা নিয়ে তাকে দিলো। জেসমিন সোফায় এলিয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে ফাইল খুলে দেখতে লাগলেন। ক্ষণকাল প্রয়োজন হলো শুধু। পরক্ষণে আলিশান ভঙ্গি ত্যাগ করে শিরদাঁড়া টানটান রেখে বসলেন তিনি। ফাইলের পাতাগুলো এমনভাবে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলেন যেন তিনি এতটা জোর দিয়ে উল্টালেই ভেতরের তথ্যগুলো বদলে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা বদলানোর নয়।
“জায়দানের মেডিক্যাল রিপোর্ট। হি ইয সাফারিং ফ্রম বোন ম্যারো ফেইলিওর।”
রীতিমত ফিসফিস করে উচ্চারণ করলাম আমি। অথচ রুমে উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ শুনতে পেয়েছে নিশ্চিত। নাহলে ওভাবে কেঁপে উঠত না কেউই। রোজিনা বেচারীকে দেখলাম আমার কথা শুনে মুখে ওড়না চেপে দিয়েছে, চোখজোড়া ছলছল করে উঠলো তার। অন্যদিকে নিস্তব্ধ, নির্বিকার জেসমিন। তখনো তিনি চেয়ে আছেন ফাইলের দিকে, স্থিরভাবে, একদৃষ্টে।
“ওর ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য ডোনার প্রয়োজন।”
এবার খানিকটা জোর গলায় উচ্চারণ করতে পারলাম। শরীর ভেঙে আসছে বারবার। মনে হচ্ছে মাথা ঘুরে পড়ে যেতে পারি যেকোনো মুহূর্তে। কেউই কোনো শব্দ উচ্চারণ করছেনা, একেকটি জীবন্ত পাথর যেন। অবশেষে ফাইলটা ঠাস করে বন্ধ করে জেসমিন অদ্ভুতুড়ে এক গম্ভীর গলায় বললেন,
“তো আমাদের কাছে কেন এসেছিস?”
প্রশ্নটায় তিক্ততা ছিল না, কোনো ক্রোধও ছিলোনা। একেবারে ফাঁপা, অনুভূতিহীন। অথচ এরপরেও মনে হলো সরাসরি আমার বুকে বিধলো কথাটা। এখানে দয়ার কোনো স্থান নেই, নেই কোনো নাড়ির টান। আছে কেবল বছর বছরের জমা ক্ষোভ, অতীতের জেদ এবং মানসিক অশান্তি। খানিকটা সময় স্তব্ধ দাঁড়িয়ে থাকলাম আমি। তারপর সেটাই করলাম, যেটা আমার কাছে একমাত্র খোলা পথ।
আরেফিন বাড়ির সকলের সামনে মেঝেতে দুই হাঁটু মুড়ে বসে পড়লাম আমি। জাফর এবং জেসমিন উভয়ে হতবাক হয়ে চেয়ে রইলেন। তবে আয়দান আমার সামনে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলোনা। হনহন করে হেঁটে গেলো সে ডাইন ইন টেবিলে। প্রচন্ড কাঁপতে থাকা হাতে জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালতে চাইলে ধপাস করে গ্লাসটা পানি সমেত গড়িয়ে পড়ে গেলো। মীরা দূর থেকে এগিয়ে এসে ধরে ফেললো গ্লাসটা। তারপর আয়দানের কাঁপা হাত থেকে জগ নিয়ে খানিকটা পানি ঢেলে দিলো। আয়দান পানিটা ঢকঢক করে পান করলো, যেন কত বছরের পিপাসার্ত সে! কপালে এবং ঘাড়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে তার। আশেপাশে কি হচ্ছে, না হচ্ছে সেসব দৃশ্যে আমি বেশি মনোযোগ দিতে পারলাম না। জাফর এগিয়ে এলেন,
“কি করছো তুমি সাবিন?”
আমার শ্বশুরের কন্ঠস্বর কেমন যেন দূর্বল শোনালো। তাতে মেশানো অপরাধবোধ এবং দুশ্চিন্তা। আমি হাঁটুর উপর ছড়িয়ে থাকা কার্ডিগানের কাপড় চেপে ধরলাম আঙুলের মাঝে। এতটা শক্তভাবে যে আঙুল থেকে রক্ত সরে ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো। সমর্পিত গলায় আর্জি জানালাম,
“আমাকে আমার স্বামীর জীবনটুকু ভিক্ষা দেবেন?”
আজ প্রথম সাবিন নামক বেয়াদব মেয়েটা নতজানু হয়েছে পৃথিবীর সামনে। মাথা ঝুঁকিয়েছে ক্ষমতার পদতলে। আমি সাবিন, আমার শিরদাঁড়া কোনোদিন কারো সমীপে বাঁকা হয়নি, না তো কোনোদিন সহ্য করেছে কোনপ্রকার অন্যায়। অথচ আজ, আজ আমার একটুও লজ্জা হচ্ছেনা। অহমিকা গুঁড়িয়ে গিয়েছে। বুকজুড়ে শুধু একটাই আকাঙ্ক্ষা তারস্বরে চেঁচিয়ে যাচ্ছে।
আমায় পারতে হবে। সাবিন, তোকে পারতে হবে। ওই লোকটার জন্য। তোর জীবনের একমাত্র সম্বলটার জন্য। তুই তো স্বার্থপর, তাকে ছাড়া নিঃস্ব হয়ে যাবি তুই। তাকে ধরে রাখতেই হবে, সেটা নিজেকে টেনে কাদায় নামিয়ে হলেও।
সামান্য মুখ তুলে সামনে থাকা মানুষগুলোকে দেখলাম। সোফায় থাকা জেসমিন, মুখজুড়ে যার পাথুরে অভিব্যক্তি। ডাইন ইন টেবিলে ঘেঁষে দাঁড়ানো আয়দান, বিপরীত দিকে জাফর। এই মানুষগুলো! কোনোদিন এই মানুষগুলোর কাছে ভিক্ষার থলি নিয়ে হাজির হতে হবে ভেবেছিলাম কি?
তবুও বাড়িয়ে ধরলাম নিজের দুহাত। সংকোচ ছাড়াই। থরথর করে কাঁপলো আমার হাতজোড়া। আজ বেয়াদব সাবিন পরাজয় বরণ করলো ভাগ্যের সুমুখে। আমার গলা কাঁপলো,
“মারুন, কাটুন। যা মন চায় আমায় করুন। শুধু নিজের ঘরের ছেলেটাকে বাঁচিয়ে নিন। বিনিময়ে যদি বলেন এই পরিবার ছাড়তে, এই জগত ছাড়তে, আমি বিনা বাক্যে তাই করব।”
নীরবতা। শনশন এক হাওয়া খেলে গেলো। ঘরের ভেতর হাওয়া কোথা থেকে এলো টের পেলাম না। নীরবতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো পরের মুহূর্তেই।
“আমার পা ধরতে পারবি?”
জেসমিনের হিমশীতল কন্ঠস্বর আমার কানে বেজে উঠলো। কেমন অনুভূতি হলো? আমি জানিনা। সেটুকু বুঝে ওঠার আগেই দৃষ্টি হলো ঝাপসা, অথচ মুখে কঠোরতা। আমি তৎক্ষণাৎ বিনা দ্বিধায় জবাব দিলাম,
“ওর জন্য আমার প্রাণটা লিখে দিলাম, সেখানে পা ধরা আর কি নতুন ব্যাপার? আমি পারবো।”
আমার বক্তব্যে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো জগৎজুড়ে। প্রত্যেক জোড়া চোখ নিবদ্ধ শুধু আমার অস্তিত্বে। স্পষ্ট টের পেলাম একেকজনের দৃষ্টির ভার।
জগৎ শুধু পুরুষের ভালোবাসা দেখে। একজন নারীর ভালোবাসা থেকে যায় নিশ্ছিদ্র পর্দার অন্তরালে। অথচ আজ, এই মানুষ কিংবা অমানুষগুলো চোখ মেলে এক নারীর ভালোবাসা দেখে নিলো।
জেসমিন বোধ হয় আমার কাছ থেকে এমন উত্তর আশা করেননি। তিনি কি ভেবে এমন শর্ত রেখেছেন, আমি জানিনা। তবে রেখে যখন ফেলেছেন, তখন নিজের আত্মমর্যাদা থেকে বুঝি পিছু হটতে পারলেন না। এই মহিলা ঠিক কি চিন্তা করছেন? সেটা আমারও আজ বোধগম্য হলোনা। তার মুখ থেকে কিছুই ঠাওর করার উপায় নেই। তিনি সহসাই শাড়ির প্রান্ত তুলে নিজের একটি পা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। বুঝি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়লেন।
“ধর তবে আমার পা। ধরে মাফ চা। স্বীকার কর তুই ভুল ছিলি। এই পরিবারের সঙ্গে হাজারো অন্যায় তুই করেছিস। আমার সন্তানকে চক্রান্ত করে আমার থেকে দূরে সরিয়েছিস। স্বীকার করে নে সংসার ভাঙা একটা কালনাগিনী তুই।”
নির্বাক চেয়ে রইলাম আমি। ভোঁতা একটা যন্ত্রণা হচ্ছে ভেতরে। আত্মসম্মান গুঁড়িয়ে যাওয়ার কিনা জানিনা। জাফর এগোনোর চেষ্টা করলেন, তবে হাত তুলে থামিয়ে দিলেন জেসমিন। তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করে পুনরায় বললেন,
“পা ধর নাহলে সোহাগের আশা ছেড়ে দে।”
একটি দীর্ঘ প্রশ্বাস টানলাম। চোখজোড়া বুঁজে নিলাম ক্ষণিকের জন্য। বন্ধ চোখের পাতায় ভাসলো ওই মায়াময় মুখখানি। বাদামী জ্বলজ্বলে নয়ন, তাতে চশমা, নমনীয় এক স্নেহমাখা দৃষ্টি। একমাত্র আশ্রয়, একমাত্র ভরসা, একমাত্র সঙ্গী, একমাত্র ভালোবাসা, আমার একমাত্র সবকিছু জায়দান! তার জন্য আমি এটুকু পরাজয় মেনে নিতে পারবনা?
যখন চোখ খুললাম, তখন আমার দৃষ্টির অশ্রু শুকিয়ে গিয়েছে। তাতে কোনো অনুভূতি আর অবশিষ্ট নেই। আছে শুধু তাড়না, উন্মত্ত তাড়না। হাঁটুতে ভোর দিয়েই এগিয়ে গেলাম সোফার কাছে, জেসমিনের পদতলে। যে মানুষটার সঙ্গে আমি জীবনে কোনোদিন মানিয়ে চলতে পারিনি, কোনোদিন তার সামনে নিজের মাথা নিচু করিনি, আজ তারই পা ধরতে আমার একটুও হাত কাঁপলোনা।
“আমাকে মাফ করে আপনার ছেলেকে…”
বিড়বিড় করে বলতে বলতে জেসমিনের বাড়িয়ে রাখা পায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম আমি। অথচ সেই পদতল আমার ছোঁয়া হলোনা। এর আগেই ভিন্ন একজোড়া হাত আমার হাত দুটো ধরে ফেললো। নিজের কব্জিতে সজোর টান অনুভব করলাম। নতজানু অবস্থা থেকে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে বাধ্য হলাম কয়েক সেকেন্ডের মাঝে। হতবাক হয়ে সামনে তাকালাম, দন্ডায়মান আয়দান। বাদামী চোখের মাঝে অদ্ভুতুড়ে লালচে রঙের ছোঁয়া। ভ্রুজোড়া কুঁচকে গিয়েছে, ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বুঝি নিয়ন্ত্রণ করছে সে নিজের রাগকে। আমার হাত ছুঁড়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে অত্যন্ত কর্কশ গলায় সে বললো,
“একমাত্র রব ছাড়া আর কারো সামনে মাথা নত করা যায়না তুই জানিস না? বেয়াদবিটা তো ঠিকই দেখাতে পারিস, তবে আজ সেই বেয়াদবিগিরি কোথায় তোর?”
আয়দানের কন্ঠে ভীষণ তেজ। রীতিমত প্রতিধ্বনিত হলো তার কন্ঠস্বর হলঘরের প্রতিটি দেয়ালজুড়ে। আমার উপর থেকে দৃষ্টি হটিয়ে সে এবার তাকালো সোফায় বসে থাকা নিজের জন্মদাত্রীর দিকে। কন্ঠ থেকে তেজ বিদায় নিলো ঠিকই, কিন্ত ভার কমলো না একটুও।
“আজ যদি সাবিন তোমার পা ধরে, তবে তোমায় মা ডাকা আমার জন্য হারাম হয়ে যাবে।”
আয়দানের হিমশীতল কন্ঠস্বরে সকলে হতবিহ্বল হয়ে পড়লো। প্রসারিত দৃষ্টি মেলে দেখলাম আমি ছেলেটাকে। সুউচ্চ দন্ডায়মান, পর্বতসম প্রহরী সত্যের। জেসমিন অবিশ্বাস মাখা কন্ঠে ছেলেকে বললেন,
“কি বললি তুই?”
“সেটাই, যেটা তুমি শুনতে পেয়েছ। তুমি অন্যায় করছো, আর একজন মানুষ হিসাবে এর প্রতিবাদ করা আমার কর্তব্য। আমার প্রতিবাদ এটাই, যদি তুমি জেনে বুঝে এই অন্যায় করো, তবে সেই মুহূর্ত থেকে আমি তোমায় আর মা বলে ডাকবো না।”
“নিজের জন্মদাত্রী মায়ের সঙ্গে এভাবে কথা বলিস! সেটা অন্যায় নয়?”
অতি সূক্ষ্ম এক হাসির ধারা ছুঁয়ে গেলো আয়দানের অধরে। আরবী ভাষায় একটি আয়াত উচ্চারণ করে সে অনুবাদ করে বললো,
“হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাও—যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে, অথবা পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়…”
পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো আয়দান জেসমিনের দিকে। নিঃশ্বাস আটকে আমি সহ সবাই চেয়ে রইলাম। সোফার একটি হাতলে হাত রেখে ঝুঁকে আয়দান নিজের মায়ের চোখে চোখ রাখলো, জড়ানো এক ব্যাথাতুর গলায় উচ্চারণ করলো,
“ছোটবেলা থেকে তুমি আমার ভাইকে মনস্টার বানিয়ে এসেছ। তবে আজ আমি তোমাকে সত্যিটা বলি। দ্যা রিয়েল মনস্টার ইয ইউ, জেসমিন শিকদার, ওনলি ইউ!”
জেসমিন স্তব্ধ। নিজের সবথেকে প্রিয় সন্তানের মুখে এমন বাক্য কোনোদিন শুনতে পাবেন ভেবেছেন কি? আয়দান নিজের মায়ের সমস্ত অভিব্যক্তি পর্যবেক্ষণ করে দ্বিতীয় দফায় বললো,
“আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটাবার চোখ খুলে নিজেকে দেখো। গর্ভধারিনী মা নয়, একজনের শৈশবের খু*নীকে দেখতে পাবে!”
নির্বাকতার সীমানা আজ পেরিয়েছে গোটা। কারো মাঝে নেই কোনো অনুভূতি প্রকাশের মতন শব্দ। সোফা ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো আয়দান। নিজের কোমরে হাত রেখে একটি নিঃশ্বাস ফেললো,
“আর তুমি আব্বু!”
সটান ঘুরে দাঁড়িয়ে নির্বাক জাফরের মোকাবেলা করলো সে,
“অপরাধবোধ তোমার ঠোঁট সেলাই করে দিয়েছে। যে অপরাধবোধ তোমাকে নিজের স্ত্রীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে দেয়নি, সেই অপরাধবোধ তোমার সন্তানকে বাঁচাতে পারবে? ইউ নো হোয়াট আব্বু? ঘরে চুড়ি পরে বসে থাকো! না, সেটাও করতে হবেনা, তাহলে মহীয়সী নারী জাতির অপমান করা হবে। পুরুষ, নারী, মানুষ, তুমি কোনো জাতিরই হিস্যা নও! স্রেফ একটা ধোঁকাবাজ!”
সবকিছু ছেড়ে হনহন করে এগোলো আয়দান। এক হাতে আমার কব্জি পাকড়াও করে রীতিমত টানতে টানতেই ঘরের বাইরের দিকে এগোলো। মীরার কাছে পৌঁছে অপর হাতে পাকড়াও করে নিলো তাকেও।
“হাসপাতালে চল।”
শুধু একটা ছোট বাক্যই সে উচ্চারণ করলো আমার উদ্দেশ্যে। অতঃপর আমাদের দুজনকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো বাড়ির বাইরে। বেরোনোর আগে আমি পিছন ফিরে হতবিহ্বল দুই পিতা মাতাকে দেখলাম। যারা আদতেই জগতের সবথেকে ব্যর্থ পিতা মাতা।
আয়দান সাবিন এবং মীরাকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর বেশ খানিকটা সময় চুপ করে থাকলেন জাফর। তার দুহাত মুষ্টিবদ্ধ হলো, পরক্ষণে আবার তিনি শরীরের সমস্ত ভার ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘ এক প্রশ্বাস টানলেন। সোফায় বরফের মতন বসে থাকা স্ত্রীকে দেখে তিনি বললেন,
“আমি তোমার সঙ্গে অনেক অন্যায় করেছি, জেসমিন। সেই সবকিছুর শোধ তুমি আমার উপর তুলতে পারতে, তবে আমার ছেলেটাকে আঘাত করলে কেন?”
কোনো জবাব নেই। নিরুত্তর সময়। জাফরের চোখের কোণে টলটলে অশ্রু জমতে শুরু করলো। নিজের কপালে হতাশার হাত ঠেকিয়ে তিনি বলতে থাকলেন,
“দিনের পর দিন, বছরের পর বছর আমি চুপ ছিলাম। এই কারণে নয় যে আমি আমার ছেলেটাকে ভালোবাসি না। বরং এই কারণে যে, আমি অপরাধী ছিলাম! আমার অপরাধবোধ আমাকে চুপ করিয়ে রেখেছে। তোমার মুখটা দেখলেই আমার মনে হতো, কত না অন্যায় করেছি এই নারীর সঙ্গে আমি! বিনিময়ে সে যা যা করছে সবটাই আমার কর্মফল। কিন্তু কর্মফল তো আমার ভোগ করার দরকার ছিলো, আমার ছেলেটার না! আজ দেখো, আমার ছেলেটা সবকিছু ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সত্যিই চলে যাচ্ছে। এবার তুমি খুশি তো, জেসমিন?”
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫০ (২)
নিশ্চুপতা। জেসমিন বসে আছেন পাথরের মতন। জাফরের গাল গড়িয়ে অশ্রুফোটা প্রবাহিত হলো। সেটা বৃদ্ধাঙ্গুলিতে মুছে নিয়ে পরিহাসের হাসি হাসলেন তিনি।
“ইউ নো হোয়াট জেসমিন? ইউ ওন। তুমি জিতে গিয়েছ। এই পরিবারে শেষমেষ শুধু একটা মানুষই ভালো থাকবে। সেটা তুমি!”
জাফর আর দাঁড়ালেন না। দ্রুতপায়ে হেঁটে দরজার দিকে এগোলেন। জেসমিন স্থির দৃষ্টিতে স্বামীকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে দেখলেন শুধু। তিনি জানেন, জাফরও এখন ছেলের পিছু পিছু হাসপাতালে যাচ্ছেন।
