Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৬১

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬১

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬১
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

—’ ই’নারের হুকটাও কি এখন আমাকে আটকে দিতে হবে?’
লজ্জায় কাঁচুমাচু হয়ে থাকা মুখটা কিছুতেই ঘুরিয়ে পিছু ফিরতে পারলো না তিতির। তলপেটের তীব্র চাপে চোখমুখ কুঁচকে আছে। এমন অবস্থায় যুবকের মজা মশকরায় সায় দেওয়ার মতো অবস্থা মোটেই নেই রমনীর। রমনীর পেলব ত্বকের দিকে নজর দিলে মনে হবে লহু কণা ঠিকরে বের হয়ে আসতে চাইছে। ঈশান নিজেড কোমড়ের ট্রাউজার খানা চড়িয়ে এগিয়ে এসে দাড়ালো তিতিরের খুব কাছে। রমনীর কাঁধে কাছে মুখ এনে থামলো। তপ্ত নিঃশ্বাসের ছোঁয়া পেতেই হাত কাঁপলো মেয়েটার। ঈশান ফিচেল হেসে শুধালো,
—’ এতক্ষণ আদর করলাম, ফিরতি আদর পেলাম। উন্মাদনায় সব ভুলে বসে ছিলাম দু’জন। তারপরও লজ্জা কাটেনা কেনো? আমাকে লজ্জা পাওয়ার মতো আর কি-ই কারণ বাকি আছে তোর। হু? ‘
রমনীর লজ্জারুণ মুখটা আঙুলের ডগা ছুঁয়িয়ে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ফেললো ছেলেটা। রক্তিম নাকের ডগায় ছোট্ট চুমু এঁকে বললো,

—’ হাত সরা। আমি লাগিয়ে দিচ্ছি।’
লজ্জায় দ্বিগুণ আড়ষ্ট হয় মেয়েটা। আবেগ, অনূভুতি বাঁধ মানতে চায়না এই পুরুষ তার কাছে আসলেই। অথচ আদর পরবর্তী এই সময় টুকু বড্ড লজ্জার। মুখ তুলে নজরে নজরে মেলানোই দুষ্কর মেয়েটার কাছে। ঈশান যতটা সহজে পারবে ভেবেছিলো, সেটা হলো না। পুরুষালি হাতে দু-দুবার টেনেও হুক বসাতে পারলো না জায়গা মতো। ভ্রু জোড়া ঘুঁচে এলো। চিন্তিত কন্ঠে শুধালো,
—’ এটা কি ভুল মাপের পরেছিস আবার?’
তিতির জবাব দেয় না। বক্ষজোড়ার ভাজে নিশ্চল হাতখানা চেপে সামনে সরে যেতে চায়৷ ঈশান সরতে দেয় না। বৃষ্টির পানিতে ধুয়েমুছে গেছে দু’জনের শরীর। বৃষ্টিবিলাস করতে করতে খোলা ছাদের নিচে বউকে কাছে পেয়ে, বিন্দুমাত্র আদরের কার্পণ্য করেনি ছেলেটা। এখন নিচে নামতে হবে তো। আকাশে সূর্যের দেখা না থাকলে বেলা বারছে সেটা না বোঝার কোনো কারণ নেই। তিতিরের নির্মেদ কটিদেশ আঁকড়ে ধরলো ঈশান। কাঁধের ওপর নিচের চিবুক ঠেকিয়ে ফিসফিস করে শুধালো,

—’ শীত লাগছে খুব? ‘
ক্ষীন মাথা নাড়ালো মেয়েটা। এতো ঝুম বৃষ্টিতে টানা ভিজেও শীত লাগছে না কেনো, এই প্রশ্ন শুধালে জবাব দিতে পারবে না সে। সিঁড়িঘরের শুকনো বিছানায় বসে আছে সে। বাইরে আদরের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছিলো বৃষ্টির তীব্রতাও। আবেশে বারবার ঝংকার তুলছিলো রমনীর তনু দেহটা। আদরের মাঝেই ঈশান নিয়ে এসেছিলো এ ঘরে। মেয়েটার ভেজা চুলগুলো গড়িয়ে এখনো টপটপ করে বারিকণা ঝরছে। ঈশানেরও তাই। কটিদেশের ওপর আঙুলের আঁকিবুঁকি অব্যহত রেখে ঈশান ফিসফিস করে বললো,
—’ তাহলে কি আবার উত্তপ্ত হচ্ছে শরীর? আবার কাছে চাইছিস আমাকে? ‘
—’ নাআআআ। ‘
তিতিরের এহেন চেঁচিয়ে ওঠার হেতু বুঝলো না ঈশান। গম্ভীর মুখে শুধালো,

—’ চাস না?’
—’ এখন চাই না।’
—’ আমার আদর ভালো লাগেনি। ‘
—’ বেশি বোঝেন আপনি।’
—’ তাহলে?’
—’ নিচে চলুন। সবাই উঠে পরেছে এতক্ষণে। কেউ দেখলে?’
—’ ঘরে গিয়ে আদর করতে দিবি, আরেকবার।’
তিতির আড়ষ্ট কন্ঠে মিনমিন করে বললো,
—’ হুক টা আটকে দিন। না হলে সরুন।’
ঈশান এ যাত্রায় পুনরায় নজর দিলো রমনীর উন্মুক্ত পিঠের দিকে। মাখনের মতো পিঠের ওপর এক টুকরো কাপড়ের অংশ জোড়া লাগাতে পারছে না সে। মানা যায়! অবশ্য মনোযোগের অভাবও দেখা দিচ্ছে। মেয়েটার পিঠের বা পাশের ওই কালো কুচকুচে তিলটা তার মনোযোগ নষ্ট করে দিচ্ছে। এখন দোষ কার!
ঈশান তিলটার ওপর নিজের খসখসে আঙুল ছুঁয়িয়ে শীতল কন্ঠে বললো,

—’ লাগছে না ই’নার টা। মাপ ছোট লাগছে। নতুন কিনতে হবে। ‘
—’ আপনি ছাড়ুন, দয়া করে। আমি লাগিয়ে নেবো।’
ঈশানের অবাধ্য হস্তজোড়া এরইমধ্যে বেহায়াপনা শুরু করে দিয়েছে। চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেললো তিতির। নরম সত্ত্বার ওপর আক্রমণ চালানো পুরুষালি শক্তপোক্ত হাতজোড়া চেপে ধরলো। হাসফাস করে কোনো মনে শ্বাস টেনে বললো,
—’ এখন আর পাগলামি করবেন না। সরুন।’
ঈশান এক ঝটকায় বিছানার ওপর ফেললো মেয়েটাকে। মুখচোখ ঢেকে যাওয়া সিক্ত কেশরাজি হাত ছুয়িয়ে সরিয়ে দিলো। রমনীর বন্ধ চোখজেরার পাপড়ি তিরতির করে কাঁপছে। শীতল অথচ বাকা স্বরে বললো,
—’নিজ হাতে মেপে দেখলাম। কি বুঝলাম জানিস?’
রমনীর মুখ ফুটে কোনো শব্দ উচ্চারন হলো না। এমন বেয়াহা প্রশ্নের কি-ই বা জবাব দেওয়া যায়! ঈশান অশ্লীল হাসলো এবারে। মেয়েটার কন্ঠদেশে নাকমুখ ঘষে হাস্কিস্বরে বললো,

—’ বিড়াল ছানার শরীরের মাপঝোঁকের বেশ উন্নতি হয়েছে দেখছি ! যাক, আমার হাতের এলেম আছে বল? চিন্তা করিস না–কাল গিয়ে মাপ মতো এনে দেবো সব। আজ এভাবেই দেখি তোকে।’
তিতির লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে ফেললো। দাঁত কিড়মিড় করে মনে মনে বলে উঠলো,
—‘ দেখা বাদ আছে কিছু ! এখনো নাকি মন ভরে না। অসহ্য পুরুষ! ‘
তবে মুখে অবশ্য অন্য কিছু বলে বসলো। ইচ্ছাকৃত নয়। বরং হুট করেই স্বামীকে একটুখানি খোচা দেওয়ার সুযোগ মিস করতে মন চাইলো না। আচমকা আখিজোড়া খুললো, মুখজুড়ে বাঁকা হাসি খেলা করলো মেয়েটার। বাঁকা কন্ঠেই বলে উঠলো,
—‘ হাহ্, দু’দিনেই ? বয়স হয়ে গিয়েছে। চোখের ডাক্তার দেখান । পাগলের সুখ মনে মনে!’
ঈশান ব্যাস্ত ছিলো মেয়েটার গলার খাঁজে আঁচড় কাটতে। মাঝপথে থামতে হলো তাকে। চোখমুখ অন্ধকার করে মুখ তুললো। মেয়েটা কি বললো এই মাত্র! বয়স নিয়ে খোঁটা শেষ পর্যন্ত!
তিতির আশ্চর্য ঈশানকে রেখে হাতের ফাঁক গলিয়ে উঠে বসলো। ঈশানের প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই জামাকাপড় নিয়ে ছুটলো ঘর লাগোয়া বাথরুমটায়।

বৃষ্টি থামেনি এখনো অবধি। ঈশান তিতির ছাদ থেকে নামতে গিয়ে চোখ পরলো ছদের বেহাল অবস্থার দিকে। তারা এতটাই নিজেদের মধ্যে ডুবে ছিলো যে, ছাদের এই হাল চোখেই পরেনি এতক্ষণ। তিতির আর্তনাদ করে উঠলো এ যাত্রায়৷ ছাঁদের অধিকাংশ গাছ তার লাগানো। সব এলোমেলো হয়ে আছে। কোনোটার আবার টবগুলো ভেঙেচুরে আছে। ঈশান দরজা খুলতে যাচ্ছিলো। মেয়েটার আর্তনাদে এগিয়ে পিছু ফিরে তাকালো। তিতির তার কোলেই এখবো।
—’ গাছগুলো। ‘
—’ হ্যা। তো?’
—’ দেখুন কি অবস্থা। ‘
—’ নিচে গিয়ে মালি কে পাঠিয়ে দিচ্ছি। সব ঠিক করে দেবে।’
তিতির কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললো,
—’ আমার খুব শখের গাছগুলো।’
—’ জানিতো সেটা।’
—’ আমি ঠিক করে তবেই নিচে যাবো।’
ঈশান সরু চোখে তাকায় কোলের মধ্যে থাকা বিড়াল ছানারটার দিকে। গোলগোল চোখ করে তাকিয়ে আছে। ঠিক করে যাবে, এটার মানে হলো–ঈশানকে ঠিক করতে হবে। ঈশান মেয়েটাকে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বিশাল ছাতার নিচে বসাতে বসাতে বললো,

—’ তুই পারবি? ‘
—’ অবস্থায় রেখেছেন?’
প্রশ্নটা এক প্রকার বিরবির করেই বললো তিতির। তবে কর্ণগোচর হলো যুবকের। ঘাড় অন্য দিকে ফিরিয়ে হেসে ফেললো সে। কিন্তু এদিকে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—’ ঈশান আরশাদ দেওয়ান কে এখন মালি বানিয়ে ফেল।’
—’ এতটুকু তো করতেই পারেন।’
—’ কি দিবি কাজটা করলে?’
—’ এইটুকু কাজের জন্যও কিছু চাই? ‘
—’ চাই।’
—’ ছোটলোক। ‘
—’ আজ জানলি?’
—’ যখন কাছে আসেন, তখনই বুঝি। দা’নবের মতো খু’বলে খায়।
—’ কিছু বললি? ‘
দাঁতে জিব কেটে দু’দিকে মাথা নাড়লো মেয়েটা। আদুরে গলায় বললো,
—’ দেবো। এখন কাজটা করুন। দেখুন আমার প্রিয় জারুলের গাছটা পরে আছে, বাগানবিলাস টাও।’
ঈশান বুকে আড়াআড়ি হাত ভাজ করে চোখ উল্টে বললো,
—’ আগে পাওনার হিসেব বুঝে নেই। পরে কথা রাখবি না।’
—’ বলুন। কি চাই।’
ঈশান দুষ্টু হাসলো। তিতিরের ভেজা ঠোঁটে বৃদ্ধাঙ্গুলি চেপে বললো,
—’ আরেকবার আদর করতে দিতে হবে…! এখানেই…। ‘

–’ আ- আপনার নামে আমি নারী নির্যাতনের মামলা করবো, দেওয়ান সাহেব। এই বলে দিলাম কিন্তু। আর সহ্য করতে পারছি না। অসভ্য আপনি একটা। মেরে ফেলতে চান আমাকে।’
ঈশান বড্ড অসহায় মুখে তাকালো মেয়েটার মুখ পানে। মুখটা লাল টকটক করছে। বৃষ্টির ফোঁটা এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে দুই দেহ। ঈশান অত্যন্ত মিহি কন্ঠে বললো,
—’ আর একটু, সহ্য কর। প্লিইজ।’
এ যাত্রায় চোখ উল্টে এলো মেয়েটার। দু হাতে খামচে ধরে রাখা ঈশানের কাঁধ জোড়া। ঈশান ব্যাস্ত হস্তখানা কাজ করে যাচ্ছে নিজ গতিতে। তিতির ঠোঁট কামড়ে ধরলো নিজের। যন্ত্রনায় শরীর অবশ ঠেকছে এতক্ষণ। ঈশান ঝুঁকে এসে ভেজা চুমু আঁকলো স্ত্রীর সিক্ত ফুলো গালে। আরেক দফা শান্ত কন্ঠে আউরালো।
—’ আর একটু, হয়ে এসেছে। একটু সহ্য কর। তুই ছটফট করে সরে যাস বলেই তো শেষ করতে পারছি না। জাস্ট স্টে স্টিল। একটু আর।’

—’ একটু বলতে বলতে কতক্ষণ হলো, হিসেব আছে? মেরে ফেলুন আজই।’
দরজার হাতলে হাত রেখে দু’বার ধাক্কা দিলো রাফি। উহু, খুলছে না তো। অথচ এপাশ থেকে তালাও ঝোলানো নেই। ভিতর থেকে বন্ধ কি তাহলে? বৃষ্টির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে বেশ জোরে। চিন্তিত মুখে আরেক দফা ধাক্কা দিতে যাওয়ার আগেই ভিতর থেকে এসব শব্দ কানে এলো ছেলেটার। ভ্রু জোড়া কুচকে বিজ্ঞের মতো দাড়িয়ে রইলো। ভিতরের কথপোকথন বোঝার চেষ্টা করলো। কিন্তু পাঁচ বছর বয়সী ছোট্ট মস্তিষ্কে এতো গভীর আলাপন বোধগম্য মোটেই হলো না। রাফি ঠোঁট কামড়ে পিছন ফিরলো। নিশি আসছিলো তার সাথে, কই দেখতে পাচ্ছে না তো! এদিকে ভিতরের মানুষ গুলোর কন্ঠস্বর তার অতি পরিচিত। কেউ কথা বললে আড়ি পাতা অন্যায়। কিন্তু পরিচিত কন্ঠস্বরের টানে কান ঠেকালো দরজার। ভিতরের শব্দ গুলো কেমন জড়িয়ে আসছে। একে তো বৃষ্টি, তার ওপর কেঁদে কেঁদে কথা বলছে মেয়েটা। রাফি কিছু ভাবার মধ্যেই টের পেলো কন্ঠজোড়া কার! বার্বি আর বড় ভাইয়া! রাফি ব্যাস্ত মুখে তাকিয়ে থাকে বন্ধ দরজায়। গত রাতেই তার প্রিয় কার্টুনে একটা ফাইটিং সিন ছিলো। এমন শব্দই হচ্ছিলো তো। ফাইটিং করতে গিয়ে হাপাচ্ছিলো কার্টুনের ওই বিল্লি টা। রাফি চিন্তিত মুখে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামার উদ্যোগ করার মাঝেই পদশব্দ শুনতে পেলো। ওদিকে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে দেখলো নিশিকে। চেচিয়ে উঠলো একপ্রকার,

—’ বড় আপু , ছাঁদে কিছু একটা হয়েছে। কেমন আওয়াজ শুনতে পেলাম। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে, কি সব বলছে কেমন গুঙিয়ে গুঙিয়ে। তার ওপর ভিতর থেকে বন্ধ ছাদের দরজা। ‘
নিশি সবেই সিঁড়ি ভেঙে ছাদে আসছিলো। আসার কারণ আছে বইকি। রাফির জুতো জোড়া কাল ধুয়ে ছাদে শুকোতে দেওয়া হয়েছিলো। ভুলে তোলা হয়নি, বেচারার মর্নিং শিফটের ক্লাস। উঠতে হয় বেশ ভোরে। ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়েই মনে পরেছে জুতোর কথা। ছাঁদ সচরাচর তালা লাগানো থাকে। রাফি সে তালা খুলতে পারবে না। সেই হেতুতে চাবি হাতে রাফির সাথে নিশি এসেছে। আজ ভার্সিটি আছে তার। বিধায় দ্রুড উঠতে হয়েছে তাকেও। রাফি চেঁচাচ্ছে কয়েক সিঁড়ি ওপরে। ছাঁদের ওপাশে অস্বাভাবিক কিছু শুনে ছুটে এসেছে ভয়ে। নিশি ভ্রু কুচকে তাকালো। রাফি পুনরায় একই কথা বলে উঠলো।
—’ বিশ্বাস করছো না বড়পু? সত্যি। কেমন জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে কারা জেনো, আর কি জানি বলছে।’
নিশির হাত গতকালের আধভেজা জামাকাপড়। সিড়িকোঠার ঘরে একেবারে শুকোতে দিয়ে যাবে সে-সব। রাফির উদ্ভট কথার পাত্তা না দিয়ে, ধীর পায়ে উঠতে উঠতেই বললো,

—’ ভূত মনে হয়।’
রেলিং চেপে সজোরে দু’দিকে মাথা ঝাকালো রাফি। ভূত নয়, সেটা বুঝিয়ে চেঁচিয়ে বললো,
—’ কিন্তু ভূত বলে তো কিছু নেই। তাছাড়া ভূত আমাদের বার্বির নাম ধরে বারবার ডাকবে কেনো? আর বার্বিই বা ভূতের ডাকে সাড়া দেবে কেনো। নাকি ভূত বার্বিকে তুলে নিয়ে যেতে চাইছে, তাই বার্বি ভয়ে ওভাবে গোঙাচ্ছে? হ্যা? কেমন আ, উ ধরনের শব্দ। সত্যিই।’
এ যাত্রায় পা জোড়া থমকে গেলো নিশির। হাস্যজ্জল মুখটার রঙ মিলিয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ। ওপরে আসার সময় ভাইয়ের রুম খোলা দেখেছিলো না? তখন খেয়াল দেয়নি। শুকনো ঢোক গিললো রাফির কথার মানে খুঁজলো মস্তিষ্ক।
—’ এই জামাটা নিচেই ফেলে এসেছিলো বড়পু। সদ্য ভেজা একদম।’
এক-এক করে সবাই আসবে নাকি এখন! নূরির কন্ঠ পেতেই তর্জনী ঠোঁটে ঠেকিয়ে চুপ করতে ইশারা করলো নিশি। নূরি কপালে ভাজ ফেলে ততক্ষণে এসে দাড়িয়েছে বোনের পাশে। মাথা নাড়িয়ে শুধোলো চুপ করতে বলার হেতু। নিশি অসহায় চোখে তাকালো ছাঁদের দরজার দিকে। ইশারা করলো সেদিকে।
—’ চাবি আনোনি? নিয়ে আসবো?’
নূরির প্রশ্নে ডানে বায়ে নাথা নাড়তেই, কয়েক ধাপ উঁচু থেকে আরেক দফা চেচিয়ে উঠলো ছোট্ট রাফি। আধো আধো গলায় বলে উঠলো,

—’ বার্বিকে মনস্টার এটাক করেছে, ছোটপু। বার্বি ব্যাথা পাচ্ছে, এইমাত্র বললো সেটা। কিছু একটা করো তোমরা।’
নিশি অসহায় মুখে কিছু বলার আগেই হুড়মুড়িয়ে সিঁড়ি ভেঙে ছাঁদের দরজার কাছে চলে এলো নূরি। দরজায় হাত বাড়াতে যাবে তখনই ভিতর থেকে বড্ড মিহি শব্দ পেলো। হা হয়ে গেলো মেয়েটার মুখ। ওড়নায় মুখ চাপা দিলো তৎক্ষনাৎ। রাফির কবজি ধরে ঝড়ের বেগে নেমে এলো নিশির কাছে। নিশির মুখপানে তাকিয়ে অসহায় দৃষ্টি ফেলে, রাফিকে নিচু কন্ঠে বললো,
—’ ভুল শুনেছিস,ভাই। কোনো শব্দ নেই। সারাদিন কার্টুনের চেচামেচি দেখিস। সে-সবই মাথায় ঘোরে। নিচে গিয়ে রেডি হয়। জুতো নিয়ে আমরা আসছি।’
রাফি ছটফট করে আঙুলে ইশারা করলো ছাঁদের দিকে।
—’ কিন্তু আমি যে শুনলাম।’
—’ কিচ্ছু শুনসনি। মনের ভুল। বার্বি ঘুমাচ্ছে। ‘

রাফি নিজ কানে যা শুনছে এখনো অবধি, তা ভুল কি করে হয়! বাচ্চা ছেলেটার মুখ অসহায়ত্ব ভর করলো এসে । দু হাত সজোরে নেড়ে সেটা প্রকাশও করলো। ছোট বলে কখন তার কথার গুরুত্ব দেওয়া হয়না। অথচ সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে বার্বি আর ঈশানের কন্ঠস্বর। তার ওপর মাঝেমধ্যেই পুরুষ কন্ঠস্বর টা অন্য রকম শোনাচ্ছে। সেটাই বোধহয় ভূতের কন্ঠ। রাফি চোখমুখ কুচকে বলে উঠলো,
—’ তোমরা বুঝতে পারছো না। ওপরে আসছো না কেনো। এসো, নিজ কানে শুনে যাও। ‘
এমন সময় আরেক দফা ‘আ’ সূচক শব্দে একপ্রকার লাফিয়ে উঠলো রাফি। কেঁদে ফেললো এবারে। তার বার্বিকে কেউ ব্যাথা দিচ্ছে, বড় ভাইয়া একা সামলাতে পারছে না। এটা সে কি করে মানবে! রাফি কান্নার মাঝেই কোনোমতে বলে উঠলো,
—’ বার্বিকে ভূতে ব্যাথা দিচ্ছে বড়পু। বার্বি কাঁদছে। বড় ভাইয়া বারবার বলছে আর একটু তাই হয়ে যাবে।
ভূত আর বড় ভাইয়ার মধ্যে ফাইট হচ্ছে বার্বিকে নিয়ে। কি কান্ড…শুনবো এসো। ওদের হেল্প করি। এসো না তোমরা।’

এদিকে বজ্রাহত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দু বোন। শেষের চিৎকার টা তারাও শুনেছে। বাইরে ঝমঝম বৃষ্টির মৃদু শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে বন্ধ দরজার এপাশ থেকেও। এতো সকাল বেলা এই দম্পতি ছাঁদে তাদের মধুরাত সেলিব্রেট করছে,তাও আবার শ্রাবন মাসের ঘোর বৃষ্টির মাঝে। ভাবতেই মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো দু’জন। নূরির মুখটা রক্তিম হয়ে আছে, নিশিরও তাই। নিশি শুকনো ঢোক গিলে হাত নেড়ে নেমে আসতে ইশারা করলো রাফিকে। নূরির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো,
—’ এরা কি শেষমেশ ছাঁদে? এই বৃষ্টির মধ্যে! সারারাত কি এখানেই ছিলো? ছিহ্ ছিহ্। কি লজ্জা। রাফির মুখ বন্ধ করবো কি করে। ও তো গিয়ে মাইকিং করবে গোটা বাড়িতে। ইয়া মাবুদ।’
নূরি নিজের অসহায়, হতভম্ব মুখে দাঁড়িয়ে আছে। নিশি এ যাত্রায় রাফির দিকে তাকিয়ে সামান্য গলা উঁচিয়ে ডেকে উঠলো,
—’ নেমে আয় ভাই। এই স্বরবর্ণে আওয়াজ তোর- আমার শুনতো নেই। এ ফাইট সে ফাইট না। আয় আয় নেমে আয়।’
রাফির চঞ্চল পা নেমে এসেছে কয়েক সিঁড়ি। তবে না তো কান্না থেমেছে, আর না তো ভাই বোনের জন্য চিন্তা। নূরি ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে কন্ঠে মিথ্যা শান্তনা দিয়ে বললো,
—’ বার্বি, বড় ভাইয়া ওদের রুমে। আমি মাত্র দেখে এলাম। ছাঁদে ওরা সত্যিই ভূত। আর জানিস তো রাফি, ভূতদের কথা কিন্তু কাউকে বলতে নেই। তাহলে রাতের আধারে এসে তোকেও…’

রাফির মুখ রক্তশূণ্য দেখালো এ যাত্রায়। তাকে আরও মিনিট পাঁচেক ভুলভাল বুঝিয়ে মুখ বন্ধ রেখে নিচে পাঠানো হলো। দীর্ঘশ্বাস ফেললো দু’জন। নিচে যাবে নাকি এখানে দাড়িয়ে পাহারা দেবে। মা,চাচি বা বাড়ির বড় অন্য যে কেউ এখন ছাঁদের দিকে আসলে একটা কেলেঙ্কারির কান্ড ঘটবে। নিশি হতাশ মুখে তাকালো বোনের দিকে। নূরি এতক্ষণে একটু স্বাভাবিক হয়েছে। ধপ করে বসে পরলো সিঁড়ির ওপর। গম্ভীর মুখে নিশি কেও ইশারা করলো পাশে বসতে। নিচু গলায় বললো,
—’ সিড়ি ঘরে বড় মা গতকাল আচারের বয়াম রেখেছিলো। সেগুলো নিতে আসবে যখন তখন। রাতে যা বৃষ্টি হয়েছে, ছাদের গাছগুলোর কি অবস্থা সে-সব দেখতেও যে কেউ চলে আসতে পারে। বিশেষত ছোট ভাইয়া, এগুলো বেশির ভাগ তিতিরের লাগানো গাছ। সামান্য বৃষ্টি হলেই সে ছুট লাগায় ছাঁদেএ…’
যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়। একেবারে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাওয়া প্রবাদ বাক্য এটা। নূরির মুখের কথা মুখেই রইলো। ঘুম ঘুম মুখে চোখ ডলতে ডলতে নয়ন হাজির৷ দুই বোনকে এভাবে বসে থাকতে দেখে ঘুম কন্ঠে শুধালো,

—’ এখানে বসে আছিস কেনো? ‘
নূরি অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো কিয়ৎক্ষন। আজ গোটা বাড়ি জানাজানি হয়ে একটা লজ্জার ব্যাপার ঘটবে।
—’ তুমি এখানে কেনো?’
নয়ন দু হাতে কপালের চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করতে করতে ওপরে হাঁটা ধরলো। গম্ভীর গলায় জবাব দিলো,
—’ ঝড়ে গাছগুলো বোধহয় যা তা অবস্থা। দেখি সর।’
ভাইয়ের দু পা চেপে ধরবে কি-না এই মূহুর্তে এটা ছাড়া আর কোনো বুদ্ধি মাথায় এলো না নূরির। তার পাশ কাটিয়ে নয়ন ওপরে উঠতে যাবে তার আগেই ভাইয়ের পা খানা জড়িয়ে ধরলো মেয়েটা। সিঁড়ির মধ্যে চিত হয়ে শুয়ে পরলো একপ্রকারে। নয়ন হতভম্ব। বোনের হাতের বাঁধন থেকে পা খানা টানতে টানতে বললো,
—’ পাগল নাকি? পা চেপে ধরছিস কেনো? ‘
নিশি ঠোঁট টিপে হেসে ফেললো একপ্রকার। বসে না থেকে হুড়মুড়িয়ে উঠে গিয়ে দাঁড়ালো ভাইয়ের সামনে। মিনমিনে কন্ঠে বললো,

—’ ছাঁদের চাবি পাওয়া যাচ্ছে না। ভিতর থেকে লক পরেছে। পরে আসতে হবে।’
—’ ধাক্কা দিলেই খুলবে। বৃষ্টিতে আটকে আছে হয়তো। দেখি আমি।’
নূরি তখনো পা ছাড়েনি। তার দিকে তাকিয়ে বিরক্ত মুখে বললো,
—’ লাথি খেতে না চাইলে সর। কোন মতলবে এখানে বসে আছিস?’
—’ ছাঁদে যেয়ো না।’
—’ কি সমস্যা ছাঁদে? ‘
—’ বৃষ্টি হচ্ছে। ‘
—’ আমি নিচে নেমে শাওয়ার নিয়ে অফিস যাবো। সর। ভিজলে সমস্যা নেই।’
নূরি পা ছাড়লো ভাইয়ের ছোটখাটো একটা লাথি খেয়ে। কবজি টেনে ধরবে ততক্ষণে নয়ন দরজার কাছে গিয়ে দাড়িয়েছে। সজোরে ধাক্কাও দিয়ে ফেলেছে দু-দুবার। সত্যিই দরজা লক। ভিতর থেকে লক। নয়ন কপাল কুচকালো। ঘাড় বাঁকিয়ে নিচে দন্ডায়মান দুই বোনের দিকে তাকিয়ে বললো,
—’ কে ভেতরে?’
কান পাতলেই শুনতে পাওয়া যায় কারোর মিহি স্বরে কান্নার আওয়াজ। নয়নের মুখের আদল পরিবর্তন হলো। কারণ কান্নারত মেয়েলি কন্ঠ টা তিতিরের। থমকালো সে। বোনদের মুখের দিকে তাকাতেই মস্তিষ্ক নত করলো দু’জন।

–’ দরজাটা গিয়ে খুলছেন না কেনো? কেউ ছাঁদে এলে এভাবে বন্ধ দরজার এপাশে আমাদের দেখলে কি ভাববে!’
নত মস্তিষ্কে লাজুক কন্ঠে বলা তিতিরের কথার পরিপেক্ষিতে জবজবে ভেজা শার্টটা গায়ে জড়ালো ঈশান। রক্তে মাখামাখি টাইলসের অংশ। তিতিরের দিকে ফিরে বললো,
—’ পা ফেলার চেষ্টা করবি না। আমি নিয়ে যাচ্ছি নিচে। বোস।’
সবেই দ্রুত পায়ে নিচে নামার জন্য পা বারিয়েছে নয়ন। শব্দ করে স্টিলের দরজাটা খুলে যেতেই পা থমকালো। চকিত ফিরলো পিছনে। বৃষ্টি হচ্ছে বাহিরে এখনো। যথারীতি সেই বৃষ্টিতে ভিজে একসাড় হয়ে আছে ঈশান। নয়ন তাকে এড়িয়ে ভিতরে দেখার চেষ্টা অবধি করলো না। দু সিঁড়ি নেমে এসে ধীর গলায় শুধালো,
—’ এতো সকালের বৃষ্টিতে কেউ ভেজে! ‘
ঈশান হত-বিহবল হয়ে দেখলো তিনজনকে। এরা এখানে কখন এসেছে! একেক জনের মুখের অবস্থা বেশ শোচনীয়। ঈশান গম্ভীর কন্ঠে আউরালো,
—’ তোরা এখানে কেনো এ সময়।’
নয়নের মুখটা আগের তুলনায় গম্ভীর হয়েছে বড্ড। এক নিষিদ্ধ কারণে বুকটা জ্বালা করছে ক্রমাগত। কাট কাট কন্ঠে বললো,

—’ ছাঁদের গাছগুলো দেখতে এসেছিলাম।’
—’ উল্টো হয়ে কথা বলছিস কেনো?’
—’ তোমরা নামবে কি নিচে? নাকি…’
—’ নাহ্, তিতিরকে নিয়ে আসি দাঁড়া। হাটতে পারবে না ও।’
উপস্থিত তিনজনে লজ্জায় মাটিয়ে মিশে গেলো একপ্রকারে। নূরি খামচে ধরলো নিশির হাত। ওড়নায় মুখ চাপা দিয়ে বললো,
—’ ভাইয়া এতোটা ঠোঁটকাটা কবে থেকে হলো! খোদা। হাঁটতে পারবে না, এটাও মুখে বলছে তাও আবার এতো নির্বিকার গলায়! ‘
নিশিও সেটাই ভাবছে। ভাইয়ের উন্মাদনা গতরাতে দেখেছে ওই গেট টুগেদারে। তিতিরের প্রতি ছেলেটা আজকাল কতটা অবসেসড্ সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ভাবাভাবির মধ্যেেই নয়ন ফিরে তাকালো ভাইয়ের দিকে। স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
—’ বার্বির বৃষ্টিতে ঠান্ডা লাগে। এই সাঝ সকালে বৃষ্টিতে না ভিজলেও পারতে।’
তিতিরের প্রতি নয়নের অন্য ভাবে এই টানের দিকটা ঈশানের মতো চালাক মানুষের নজর এড়ায় কীভাবে! এড়ায়নি। প্রথম দিন থেকেই অবগত সে। তবে আজকে নয়নের এই কথাটা খুব একটা পছন্দ হলো না ঈশানের। রাশভারি জবাব দিলো তৎক্ষণাৎ।

—’ সে চিন্তা আমার আছে, নয়ন। ছাদে কোনো দরকার থাকলে আসতে পারিস। আমি তিতির কে নিয়ে নিচে যাবো।’
কেউ-ই ছাদে ওঠার সাহস টুকু করলো না। উল্টো নিশি আর নূরি ঝটপট পা বাড়ালো নিচে নামতে। নয়ন কিন্তু নড়াচড়া করলো না। স্তব্ধ পা জোড়া বেহায়ার মতো আটকে রইলো সেখানেই।
—’ খচখচ করছে এখনো। আর কাচ নেই তো?’
তিতিরের অসহায় কন্ঠের জবাব দিলো না ঈশান। মেজাজ চটে গিয়েছে অজানা কারণে। সময় নষ্ট না করে কোলে তুলে নিলো মেয়েটাকে। দ্রুত পায়ে নেমে আসতেই নয়নের দৃষ্টি গিয়ে আটকালো ঈশানের দু হাতের মধ্যে থাকা তার ভালোবাসার নারীটির দিকে। যে এখন তার জন্য নিষিদ্ধ। তার ভাইয়ের বউ। তবে মেয়েটার বা পায়ের দিকে খেয়াল হতেই ব্যাস্ত হলো ছেলেটা।
—’ কি হয়েছে ওর পায়ে? মণি? ‘
তিতির অপরাধি মুখে তাকালো স্বামীর দিকে। ঈশান বারংবার নিষেধ করা সত্বেও পাকনামি করে উঠে গিয়েছিলো ভাঙাচোরা টবগুলোর মধ্যে। ফলস্বরূপ পায়ে চোখা একটা কাচ গেথে গিয়েছে। ঈশানের মুখ রাগে অন্ধকার হয়ে আছে।ঈশান গম্ভীর মুখে পাশ কাটিয়ে নেমে এলো সিঁড়ি ভেঙে। ছোট্ট করে জবাব দিলো,
—’ কাচ বিঁধেছে! ‘

ভারি বর্ষনে স্কুল কলেজ একপ্রকার বন্ধের পথে। রাস্তাঘাটে হাঁটু সম পানি এসে জমা হয়েছে। বেলা হয়েছে। বৃষ্টি ক্ষান্তি দিয়েছে কিছুক্ষণের জন্য। ঘরে থাকতে থাকতে দম বন্ধ অবস্থা তমার, সবেই বেরিয়েছে বাড়ির ভিতর থেকে। আজকাল তিতিরের কাছেও যাওয়া হয়না। নয়নের মুখোমুখি আরও পরতে চায় না সে। তিতির বোঝে সে কথা। তাই তমা কে না ডেকে নিজে এসে সময় কাটিয়ে যায়।
তমা সবেই বেরিয়েছে দোকানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। বাবা বাড়ি নেই, ঢাকা গিয়েছেন। ফিরতে আরও সাতদিন। বাড়িতে মানুষ তারা তিনজন। এদিকে রান্নার সময় তার মায়ের খেয়াল হয়েছে লবনের কৌটা পুরো শূন্য। ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছে একটা রিকশার আশায়। যদিও দোকান বেশ কিছু দূরেই। তবে, রাস্তায পানি জমে থাকায় হেঁটে যাওয়া সম্ভবত নয়।
প্রায় মিনিট দশেক সময় দাঁড়িয়ে থেকেও একটা রিকশার দেখা মিললো না। উপয়ান্তর না পেয়ে পাজামা খানা তুলে হাঁটা ধরতে যাবে তখনই তীক্ষ্ণ হর্ণে পিছু ফিরে তাকালো। দেওয়ান বাড়ির ভিতর থেকে গাড়ি বের হচ্ছে। মুখ কালো হয়ে এলো তমার। এমন জায়গায় দাড়িয়ে আছে, গাড়িটা যেতে গিয়ে নির্ঘাত ভিজিয়ে দেবে।
ঈশানকোণে ঘন কালো মেঘ পুনরায় জমায়েত হচ্ছে। যেকোনো সময় বৃষ্টি শুরু হবে বলে। রিকশার জন্য অপেক্ষা করাই উচিত হয়নি। তমা একদম কিনারা ঘেষে দাঁড়ালো রাস্তার। গাড়িটাকে পাস করে দিলো। হাতে ইশারা করলো গাড়িটাকে চলে যেতে।
গাড়িটা গেলো না, বরং এসে থামলো তমার ঠিক পাশেই। প্রকৃতিতে বর্ষন শুরু হয়নি ঠিকই। কিন্তু রমনীর মনের বর্ষন এতক্ষণে শুরু হয়ে গিয়েছে। নয়নের গাড়ি এটা! ছাতার আড়ালে এতক্ষণ খেয়াল করেনি সেটা। মুখের ওপরের ছাতাটা আর একটু হেলে দিতেই কাচ নেমে এলো গাড়ির, দু’বার হর্ণও বাজলো। ভিতর থেকে নয়ন গম্ভীর স্বরে ডেকে উঠলো,

—’ এই বৃষ্টির মধ্যে বাইরে কি?’
মানুষ টা যে তার জন্যই গাড়ি থামিয়েছে সেটা আর বুঝতে বাকি নেই তমার। মুখ আড়াল করে রাখা ছাতাটা পিছন দিকে হেলে, অপ্রস্তুত হেসে জবাব দিলো,
—’ দোকানে যাচ্ছিলাম।’
—’ চাচ্চু ফেরেনি?’
—’ নাহ্।’
—’কি কি আনতে হবে লিস্টটা আমাকে দাও। অফিস থেকে ফেরার সময় নিয়ে আসবো।’
তমা নিজের বুকের দ্রিমদ্রিম শব্দ উপেক্ষা করে মৃদু হেসেই বললো,
—’ আপাতত লবন লাগবে। এবং সেটা এক্ষুনি। ড্রপ করে দেবেন দোকান অবধি?’
নয়ন মাথা ঝাঁকালো। ইশারা করলো গাড়িতে উঠে বসতে।
কি পরিমাণ বৃষ্টি গতরাতে হয়েছে, তা রাস্তায় বের না হলে সম্ভবত টের পাওয়া যেতো না। আশেপাশের নিচু খেতগুলো তলিয়ে গিয়েছে। বিলের মতো দেখতে লাগছে আশপাশটা। তমা ঠোঁট কামড়ে বসে আছে। পানির জন্য রাস্তার অবস্থা বুঝতে পারা যাচ্ছে না, গাড়ি চলছে একদম ধীর গতিতে। বন্ধ গাড়ির ভীতর নয়নের সাথে সময় কাটানো বোধহয় এটাই প্রথম বার। তাও অমন একটা ঘটনার পরে, তমা ইতস্তত করছে বড্ড বেশি। ওদিকে নয়নের মুখের ভাবান্তর নেই কোবো। আচমকা মুখ খুললো তমাই প্রথমে। মিহি কন্ঠে বলে উঠলো,

—’ কেমন আছেন সেটা বললেন না তো।’
গাড়ি থেমে গিয়েছে। সামনে খাদ আছে কি-না মাথা উচিয়ে দেখার চেষ্টা করছে ছেলেটা। তমার দিকে না ফিরেই বললো,
—’ ভালো।’
—’ আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না?’
—’ দেখতেই পাচ্ছি ভালো আছো। না হলে এই বৃষ্টি মাথায় নিশ্চয় বের হতে না।’
—’ আপনার ব্যবহার এখনো ঠিক হয়নি।’
—’ ঠিকই আছে।’
তমার রাগ হলো এবারে। গাড়ির কাচ নামিয়ে রাস্তা পরখ করতে ব্যাস্ত ছেলেটা। তমার এখন খুব বাজে একটা কাজ করে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। আচ্ছা, এখন যদি নয়নের কলার চেপে সে একটা চুমু খায়, কিছু কি হবে? ভাবাভাবির মধ্যেই অঘটন একটা ঘটিয়েই ফেললো তমা। চুমু খেলো না, তবে নিজের নরম হাতখানা ছোঁয়ালো নয়নের হাতে। চমকে উঠলো নয়ন। ছিটকে হাত সরিয়ে নেওয়ার আগেই দু’হাতে খামচে ধরলো তমা। ইতস্তততা পায়ে পিষে কেঁদে উঠলো হু হু শব্দে।

—’ আমি আপনাকে ভালোবাসি, নয়ন ভাই। আজ কাল থেকে নয়। বহু দিন আগে থেকে। সত্যি ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি।’
নয়ন স্তম্ভিত হয় তমার এহেন কান্ডে। মেয়েটার চোখের পানিতে ভিজে উঠেছে হাত হাতখানা। নয়ন কেনো ধরনের সাড়াশব্দ দিলো না, এদিকে তমা কেঁদেই যাচ্ছে। ভালোবাসার পুরুষের মুখ থেকে কাঙ্ক্ষিত কোনো প্রতিত্তোর না পেয়ে কান্নার তীব্রতা বারলো আরও দ্বিগুণ। নয়ন নিজের হাতটা সময় নিয়ে সরিয়ে নিলো। মেয়েটার কান্না তার হৃদয় অবধি পৌছেছে বলে মনে হলো না। তমা মুখ তুলে তাকাতেই, নয়ন হালকা কন্ঠে বললো,
—’ ভালোবাসলেই তাকে পাওয়া যায়, এমন ধারনা নিয়ে চলাফেরা করে বোকারা। চরম বোকামি এটা। তোমার এটা আবেগের বয়স, তমা।’
তমার কান্না আটকে এলো। হাতের উল্টো পিঠে চোখজোড়া মুছে প্রশ্নাত্নক দৃষ্টি ফেলে বললো,
—’ আমার বয়স বিশ পার হচ্ছে, নয়ন ভাই। আমি বাচ্চা মেয়ে আর নেই। আবেগের বয়স ওই ষোল, আঠারো আমি পেরিয়ে এসেছি। আপনাকে ভালোবেসেছি বছরের পর বছর ধরে। যে বয়স টায় আবেগের উৎপত্তি। ঠিক তকন থেকে। এখন সেটা আবেগ পেরিয়ে ভালোবাসায় রুপ নিয়েছে। এটা কবে বুঝবেন আপনি?’

—’ সেটা হলেও…তাতে কি! বললামই তো। আমরা যাকে চাই, সবসময় কি তাকে পাই।’
—’ আপনি যাকে ভালোবাসেন, সে আপনাকে চায়না?’
নয়নের নির্বিকার করে রাখা মুখটা কেমন রক্তশূণ্য দেখালো। সকালে ঈশান তিতিরের ওই ঘনিষ্ঠ শব্দগুলো! যদিও পরে টের পেয়েছে, মেয়েটার পা কেটে যাওয়ায় কাঁদছিলো। তবুও৷ ঈশান যেভাবে নিজের বুকে মিশিয়ে রেখেছিলো তিতিরকে। ভাবতেই শরীর অবশ ঠেকলো। চোখ জ্বালা করে উঠলো। তমার মুচকি হাসলো।
—’ আমরা যাকে পাই না, তার জন্য অপেক্ষা করি। আর যাকে পাই বিনা পরিশ্রমে, তাকে অবহেলা করে যাই। তাই তো, ভাইয়া?’
— ‘ তোমার সাথে আমার এ ধরনের নিচু বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলবে এটা আমি কল্পনাও করিনি, তমা। আমাদের সম্পর্কের দিকটা মাথায় রাখছো না তুমি। এহেন পাগলামি যায়না তোমার সাথে। আমি তোমাকে কখনো এই নজরে দেখিনি।’
তমা নাক টানলো। ওড়নার অংশে চোখ মুছে সোজা হয়ে বসলো।
—’ আগে সত্যি করে জবাব দিন। যাকে আপনি ভালোবাসেন, সে আপনাকে ভালো বাসে না?’
—’ তমা..!’
—’ ধমকানোর মতো কিছু বলিনি আমি। জবাব দিন। না হলে আমি গাড়ি চালাতে দেবো না। ‘
নয়ন বিরক্ত হয় বড্ড। মাঝরাস্তায় গাড়ি থামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে আবার। অফিসে দেরি হচ্ছে তার।

—’ নয়ন ভাই?’
—’ বাসে না। তো?’
তমা একপেশে হাসলো। কপালের ওপর এসে পরে থাকা একগোছা চুল নিজের কানে গুঁজে অসহায় কন্ঠে বললো,
—’ তাহলে কিসের অপেক্ষা করছেন? ফিরে আসবে কি সে?’
—’ কখনো না।’
—’ কখনো আসবে মনে মনে এই প্রতিক্ষা করেন?’
—’ নাহ্। আসবে না।’
—’ তাহলে?’
—’ ভালোবাসি আমি তাকে।’
—’ আমিও ভালোবাসি আপনাকে।’
—’ এ ভালোবাসার ফিরতি হিসেবে কিচ্ছু পাবে না তুমি।’
—’ সে তো আপনিও পাবেন না। তবুও তো অপেক্ষা করছেন।’

নয়ন থমকে থাকে। স্টেয়ারিং এ চেপে রাখা হাত দু’খানা শক্ত হয় । চরম সত্য এটা। তিতির কখনো তার হবে না। কখনো না। সম্ভবই না। ভাগ্যের দোটানায় কখনো যদি ঈশান তিতিরের সম্পর্কের ইতি ঘটে, তবুও মেয়েটা তার হবে না। পরিবার সম্ভবত হতে দেবে না। নয়ন চোখ বুজে রাখে। মাথা ঠেকায় সিটে। তমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকিয়ে রইলো ছলছল চোখে। আরেকটা বার কি হাত টা ধরা উচিত। ভালো না বাসুক, ভরসা হিসেবে পাশে থাকা উচিত কি তার? ভালোবাসার মানুষ অন্য কাউকে ভালোবাসে, এটা মানা কতটা যন্ত্রনার সেটা সে তো ভালো করেই জানে। সুতরাং নয়নকে একতরফা দোষ দেবে কি করে সে!
তমা এবার আর স্পর্শ করলো না ছেলেটাকে। মৃদু কন্ঠে বললো,
—’ আমাকে কখনো আপনি ওই নজরে দেখেননি। এটা সত্য। কিন্তু আমি যে আপনাকে ওই নজরে দেখতাম, সেটা আপনি টের পেতেন। এটাও সত্য। মানেন বা –না মানেন। ‘
—’ তুমি চুপ করবে দয়া করে?’
—’ ওই মেয়ে কখনো ফিরবে না। সেটা কি করে জানেন?’
—’ সে বিবাহিত।’
চমকায় তমা। একজন বিবাহিত নারীর জন্য এতোটা পাগল হয়ে আছে!

—’ আপনার ভালোবাসার নারীকে অন্য পুরুষ স্পর্শ করে। তার নামে হালাল সে। আপনি নিজের জীবন এগিয়ে না নিয়ে, কিসের ইতিহাস গড়তে চাচ্ছেন?’
—’ আমি পারবো না।’
—’ আপনি চেষ্টা করছেন না। সে নারী কি সুখে আছে তার স্বামীর সাথে? ‘
—’ খুব।’
—’ তাহলে আপনার উচিত খুশি হওয়া। ভালোবাসার মানুষ খুশি আছে, এটা শুকরিয়া আদায় করার জিনিস। নিজেকে ভালোবাসুন এখন। নিজের কথা ভাবুন। অতীত আঁকড়ে জীবন চলে না। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে কদম ফেলতে হয়।’
—’ এতোই সহজ?’
—’ সহজ কখন বললাম। চেষ্টাই তো করছেন না।’
নয়ন রক্তিম চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে। ওই একটা নারীর জন্য এ জীবনে কোনো নারীর স্পর্শ তো দূর, নজর তুলেও দেখেনি। অথচ সেই নারীর বিরহে ছটফট করছে বিগত তিনটে মাস। এক মূহুর্তের জন্যও ভুলতে পারছে না। হয়তো বুকের আগুন চাপা পরে ছিলো, আজকে তমার এই কথাগুলোয় সে-সব জ্বলে উঠেছে দ্বিগুণ হারে। নয়ন ঠান্ডা গলায় বললো,

—’ তুমি অনেক ভালো মনের মেয়ে। ভালো কেউ অপেক্ষা করছে তোমার জন্য। ‘
—’ সিনেমার ডায়লগ দেবেন না। ভালোবাসি আমি। বিয়ে করতে চাই। সংসার চাই আপনার সাথে। আপনাকে চাই, পুরোটা। আপনার মন, আপনার দেহ, আপনার স্পর্শ। সবেতে আমি অধিকার ফলাতে চাই। আপনার সন্তানের মা হতে চাই।’
—’ নির্লজ্জতা বন্ধ করো তমা। এ কি ধরনের বেহায়াপনা। ছিহ্!’
তমা শব্দ করে হেসে ফেললো। নয়ন এক নজর তাকালো তমার দিকে। মেয়েটা কি পরিমাণ বুঝদারের মতো কথা বলে আছে। এর আগে কখনো তমার দিকে কোনো ধরনের অন্য চিন্তা নিয়ে তাকায় নি সে। কখনো না। আজকেও গভীর ভাবে তাকিয়েও কোনো অনূভুতি কাজ করলো না। তমা হাসলো, হতাশার হাসি। বুকটা চিনচিন করছে তার। নয়নের দৃষ্টির ভাষা যে বুঝতে পারছে সে।
তমা হালকা কন্ঠে বললো,
—’ আমি আমার শেষ সীমানা পর্যন্ত আপনার জন্য।বেহায়াপনা করে যাবো, নয়ন ভাই। আবার বলছি শেষ সীমানা পর্যন্ত। যেদিন বেহায়াপনা থামবে, মনে করবেন অপেক্ষা করতে করতে ভালোবাসা মরে গিয়েছে। সেদিনের পর কে জানে, আপনার মন হয়তো গলে গেলো। অথচ আমি আর আপনার রইলাম না।’
নয়নের চটে যাওয়া মেজাজ চটে গেলো দ্বিগুণ। ধমকে উঠলো একপ্রকার। গাড়ির দরজা খুলে চিৎকার করে বললো,

—’ নামো প্লিইজ। তোমাকে আর এক সেকেন্ড সহ্য করতে পারছি না আমি। প্লিইজ, তমা। চোখের সামনে থেকে চলে যাও। শ্বাস নিতে দাও।’
ছলছল চোখে ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকে তমা কোনোমতেই শুধালো,
—’ আমার জন্য শ্বাস আটকে আসছে? অথচ আমি আপনার…’
—’ প্লিজ, লিভ।’

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬০ (২)

আর বসে থাকার মানেই হয়না। নয়নকে রীতিমতো উদভ্রান্তের মতো লাগছে। বাইরের দিকে তাকালো তমা। তারা যেখানে আছে, একদম মাঝামাঝি জায়গা। আশেপাশে বিস্তৃত ফসলহীন জমি। সব পানিতে পরিপূর্ণ। পাকা রাস্তায় সম্ভবত হাটুসম পানি। তমা নিঃশব্দে নেমে গেলো গাড়ি থেকে। তার ধারনা ভুলই প্রমানিত হলো। পানির উচ্চতা আরও বেশি। নয়ন আর এক মূহুর্ত দেরি করলো না। গাড়ি টান দিলো সবেগে। রাস্তার পানি ভিজিয়ে দিয়ে গেলো মেয়েটাকে। না তো তমার সেই পুরুষ আর থামলো, আর না তো মেয়েটার অবস্থা একটি বার দেখতে চাইলো।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here