Home সিকান্দার শাহ্ সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩২

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩২

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩২
Raiha Zubair Ripti

দুপুরের খাবার শেষ হতেই উঠোনজুড়ে অলস নীরবতা নেমে এলো। প্রচণ্ড গরমে যেন বাতাস পর্যন্ত হাঁপিয়ে উঠেছে। ঘরের পাছ কোনায় মমতাজ বেগম আর সুমি থালা-বাসন ধুচ্ছেন। মারিয়া মুনতাহার সঙ্গে গল্প করছে।
রশিদ বলল,
“চলো ভাই, গেরামডা একটু ঘুইরা দেহাই।”
সিকান্দার রাজি হলো। বারান্দা থেকে নেমে ধীরে ধীরে গ্রামের পথ ধরে হাঁটতে বের হলো। সঙ্গে জামাল ও আছে।

হাঁটতে হাঁটতে সিকান্দার চারপাশ ভালো করে লক্ষ্য করছিল।একটা সময় এই গ্রাম নিশ্চয়ই খুব প্রাণবন্ত ছিল। উঠোনে উঠোনে ধান শুকাতো, খালে ছেলেরা সাঁতার কাটত, মাঠে লাঙল চলত। কিন্তু এখন সেসব কিছুই নেই। আছে কোথাও ভাঙা ঘর, কোথাও শুকিয়ে যাওয়া পুকুর, কোথাও ফসলহীন মাঠ। কয়েকটা বাড়ির সামনে গরুর খুঁটি আছে, কিন্তু গরু নেই। বিক্রি করে দিতে হয়েছে। একটু সামনে যেতেই বিশাল এক বটগাছ চোখে পড়ল। গাছটার নিচে দশ-বারোজন কিশোর আর যুবক গোল হয়ে বসে আছে। কারও বয়স তেরো, কারও পনেরো, কারও আবার আঠারো-উনিশ। প্রথমে মনে হলো গ্রামের ছেলেরা বুঝি গল্প করছে।
কাছে যেতেই স্পষ্ট দেখা গেল—দশ-বারো বছরের কয়েকটা ছেলে গোল হয়ে বসে তাস খেলছে। একজন মুখে বিড়ির ধোঁয়া ছাড়ার অভিনয় করছে। আরেকজন তাস ছুঁড়ে দিয়ে বলল,

“এইবার দেখ, এক হাতেই সব শেষ কইরা দিমু!”
আরেকজন হেসে উঠল,
“আগে জিত, তারপর বড় বড় কথা কইস।”
সিকান্দার থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তার চোখে বিস্ময়ের সঙ্গে কষ্টও ফুটে উঠল।
“এরা স্কুলে যায় না?”
রশিদ বিব্রত হয়ে মাথা নিচু করল।
” না,যায় না৷ ”
“ কেনো? ”
“ পড়াশোনা ভালো লাগে না তাই যায় না। ”
” ওদের বাবা মা কেউ কিছু বলে না?”
জামাল তিক্ত হেসে বলল,

” না। কতবার কইছি। কিন্তু এখন বাপ-মায়েরও সময় নাই। কেউ জমির চিন্তায়, কেউ ঋণের চিন্তায়। পোলাপান কার লগে মিশতাছে, কী করতাছে দেইখা রাখার মানুষও কম।”
একটি ছেলে হেরে গিয়ে রাগে তাস ছুড়ে ফেলল। আরেকজন অশ্রাব্য ভাষায় গাল দিল। সিকান্দারের কপাল কুঁচকে গেল। এদের বয়সে তার হাতে ছিল বই। আর এরা তাস খেলছে! ঠিক তখনই একটি ছোট ছেলে দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“এই… তাড়াতাড়ি খেল! মজনু ভাই আইলে আবার টাকা লইয়া যাইবো!”
সিকান্দার শুনে তাকাল।
“মজনু ভাই কে?”
রশিদ নিচু স্বরে বলল,
“গেরামের কিছু বখাটে পোলা আছে। ছোটগুলারে তাস খেলতে বসায়। পরে জুয়া শেখায়। জিতলে ভাগ নেয়, হারলেও ভাগ নেয়।”
সিকান্দারের মুখ শক্ত হয়ে গেল। ধীরে ধীরে বটগাছটার দিকে এগিয়ে গেল। তাকে আসতে দেখে কয়েকজন ছেলে একবার শুধু তাকালো। তারপর আবার খেলায় মনোযোগ দিলো। সিকান্দার শান্ত গলায় বলল,
“তোমাদের নাম কী?”
তারা বিরক্ত বোধ করলো এমন প্রশ্নে। মুখের হাবভাব তাই বললো। একজন উত্তর দিলো,

“ আপনারে কমু ক্যান? আপনে কেডা? ”
“ আমি সিকান্দার। ”
তারা কায়েকজন নামটা ঠোঁটের আগায় উচ্চারণ করলো একবার।
“স্কুলে যাও তোমরা?”
“ না। ”
“ কেনো? ”
“ ভাল লাগে না পড়াশুনা। পড়লে জ্বর আহে। ”
“ পড়াশোনা করতে ভালো লাগে না। তাস খেলতে ভালো লাগে? ”
“ হ,আমনে খেলবেন? ”
“ না,এসব পঁচা খেলা খেলি না আমি। ”
“ পঁচা খেলা কেমনে? ”
“ এসব খেলা খেললে আল্লাহ পাপ দেয়। ”
“ পাপ কেন দিবে আল্লাহ? মজনু ভাইয়ে কইসে এসব খেলা ভালো। টাকা পাওয়া যায়। ”
সিকান্দারের দৃষ্টি এবার গিয়ে থামল এক ছেলের দিকে।বয়স বড়জোর দশ। মুখে এখনো শিশুসুলভ সরলতা। কিন্তু তার হাতেও তাস। ঠিক তখনই দূর থেকে এক বৃদ্ধ ছুটে এলেন।

“করিম! ও করিম!”
ছেলেটা বিরক্ত মুখে তাকাল।
“কী?”
“তোর দাদি কয়ছিল, দুই বালতি পানি আনতে। ঘরে একফোঁটা পানি নাই।”
ছেলেটা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“পরে আনুম।”
“পরে আনতি মানে? রানবো না তোর দাদি? ”
” আমি এহন পারমু না৷ খেলা শেষ হইয়া নিক আগে। ”
বৃদ্ধ মানুষটা ধীরে ধীরে ফিরে গেলেন। লোকটা করিমের দাদা। ছেলে আর ছেলের বউ শহরে কাজ করে। নাতিটারে মানুষ করার জন্য রেখে গিয়েছে ছেলে আর ছেলের বউ। তাঁর কুঁজো পিঠটার দিকে তাকিয়ে সিকান্দারের বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। সে আর কিছু বলল না। শুধু একবার ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“আল্লাহ তোমাদের হেদায়েত দান করুন।”
এতটুকুই বলে সে হাঁটা ধরল। রশিদ আর জামালও তার সঙ্গে এগিয়ে গেল। আরও কিছুদূর যেতেই চারপাশের দৃশ্য আবার বদলে গেল। যেদিকে চোখ যায়, শুধু ফেটে যাওয়া জমি। কোথাও ধানের চারা শুকিয়ে মাটির সঙ্গে লুটিয়ে আছে, কোথাও কৃষকরা মাথায় হাত দিয়ে আইলের ওপর বসে আছেন। এক জায়গায় পাঁচ-ছয়জন কৃষক একটি গভীর নলকূপের পাশে দাঁড়িয়ে তর্ক করছেন। মোটর চলছে, কিন্তু পানি উঠছে খুব সামান্য। একজন দুই হাতে মাথা চেপে ধরে বললেন,
“এইডা দিয়া কী অইবো? দশ বিঘা জমির লাইগা এই একফোঁটা পানি!”
আরেকজন মাটিতে বসেই কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন,
“এইবারও ফসল না অইলে শেষ। মহাজনের ঋণ শোধ করুম কেমনে? ঘরডাও বেইচা দিতে অইবো।”
এক বৃদ্ধ কৃষক শুকিয়ে যাওয়া ধানের চারা হাতে নিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলেন,
“নিজের পোলার মতো কইরা লাগাইছিলাম। আল্লাহ… এইভাবে মরি যাইবো ভাবি নাই।”
সিকান্দার ধীরে ধীরে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কেউ প্রথমে তাকে খেয়ালই করল না। তাদের চোখে তখন শুধু হতাশা।
রশিদ বলল,

“চাচারা,কি পানি উডে না? ”
লোকগুলো ফিরে তাকাল।
“ না রে উডে না৷ তা লগে এইডা কেডা? ”
রশিদ পরিচয় করিয়ে দিল,
“এইডা সিকান্দার ভাই।”
একজন বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
” আল্লাহ এমন খরা আর কাওরে না দেখাক।”
সিকান্দার মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল,
” তা চাচারা, এতদিন কী কী চেষ্টা করেছেন?”
একজন কৃষক যেন অপেক্ষাতেই ছিলেন। বলতে শুরু করলেন,
“কী করি নাই বাবা? পাশের গেরামের ওই তান্ত্রিকের কাছে গেছি।”
আরেকজন বললেন, “আমাগো কইল, গেরামের উপর অশুভ ছায়া পড়ছে।”
তৃতীয়জন যোগ করলেন, “কইল সাতটা কালা মুরগি লাগবো,দিলাম।”
আরেকজন বললেন, “আমার থেইকা দশ হাজার টাকা নিছে।” “আমার এক বস্তা চাল।” “আমার দুইটা ছাগল।” “আমাগো বাড়ির মেয়েদের সোনার কানের দুলও নিছে। কইছে, এইগুলা নাকি দান না করলে বৃষ্টি নামবো না।”
একজন বৃদ্ধ চোখ মুছতে মুছতে বললেন,

“কত রাত জাগছি বাবা। ধূপ জ্বালাইছি। কত কী মন্ত্র পড়ছে। তবুও কিসু অইল না। শেষে কইল আরো কি কি নাকি করা লাগবো… না করলে বিপদ যাইবো না।”
সিকান্দার এতক্ষণ একবারও তাদের কথা কাটল না। সবাই যখন চুপ হয়ে গেল, তখন সে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আপনারা একটা প্রশ্নের উত্তর দিবেন?”
“কও।”
“বৃষ্টি কার হুকুমে আসে?”
সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। একজন বললেন,
“আল্লাহর হুকুমে।”
“রিজিক কার হাতে?”
“আল্লাহর।”
সিকান্দার ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
“তাহলে যেই কাজ শুধু আল্লাহর হাতে, সেই কাজের জন্য আপনারা কেন মানুষের দরজায় গিয়ে মাথা নুইয়ে দিলেন?”
“ তে কি করমু আমরা? ”
“ধৈর্য ধরেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঠিক রাখেন। আল্লাহর কাছে কাঁদেন। তওবা করেন। সবাই মিলে দোয়া করেন। মানুষের ওপর অন্ধ ভরসা না করে রবের ওপর তাওয়াক্কুল করেন। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ চাইলে খুব শিগগিরই এই কষ্ট দূর হবে।”

কথাটা শেষ হতেই একজন কৃষক একটু বিরক্ত হয়ে উঠলেন।
“পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তো মসজিদের মোল্লাও পড়ে। উনিও তো আল্লাহর কাছে দোয়া করে। তাইলে আল্লাহ শুনে না ক্যান?”
আরেকজন সায় দিল, “শুধু নামাজ পড়লেই যদি বৃষ্টি আইত, তাইলে এতদিনে আইয়া যাইত।”
কেউ আবার বলল, “পীর সাবেরে ছোট কইও না। উনারে দেইখা অনেকের কাম হইছে।”
“হ। আমার ছোট ছেলের জ্বর আছিল। তাবিজ দেওনের পরই ভালো অইছে।”
আরেকজন বলল, “বৃষ্টি না আইলে উনার কী দোষ? গুনাহ তো আমাগো।” একজন আবার একটু রেগেই বলল, “তুমি আইছো দুইদিন অয় নাই। আমাগো গেরামের কথা তুমি কতটুকু জানো?”
জামাল কিছু বলতে যাচ্ছিল। সিকান্দার হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। সে কারও কথার প্রতিবাদ করল না। শুধু শান্ত গলায় বলল,
“আপনাদের বিশ্বাস পরিবর্তন করানোর জন্য আমি আসিনি। তর্ক করতেও আসিনি। আমি শুধু একটা কথা মনে করিয়ে দিতে চেয়েছি বৃষ্টি একমাত্র আল্লাহর হুকুমেই আসে।”
লোকটা হেসে উঠল।
“এই কথা নতুন কী কইলা? এইডা তো সবাই জানে।”
সিকান্দার মাথা নেড়ে বলল,
“জানার আর মানার মধ্যে পার্থক্য আছে চাচা।”
কথাটা শুনে কয়েকজন একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল।কিন্তু কেউ কিছু বলল না। একজন বৃদ্ধ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,

“চলো রে। এইসব কথা কইয়া লাভ নাই। বৃষ্টি আইলে আইবো। না আইলে না আইবো।”
আরেকজন হাঁটতে হাঁটতে বলল, “আইজ আবার পীর সাব আইবো। এইবার কইছে বড় আমল হইবো। আল্লাহ চাইলে ওইবার ঠিকই বৃষ্টি নামবো।”
কৃষকরা একে একে চলে যেতে লাগল। রশিদ বিরক্ত হয়ে বলল,
“দেখলা? কেডা কার কথা শোনে!”
সিকান্দার তাদের চলে যাওয়া দেখেই শুধু মৃদু হাসল। তারপর বিরবির করে বলল,
‘হে আল্লাহ, এই মানুষগুলোকে আগে আপনার দিকে ফিরিয়ে আনুন। তারপর এই জমিনকে ফিরিয়ে দিন তার সবুজ রূপ।’
ঠিক তখনই দূর থেকে একজন কিশোর দৌড়ে এলো।হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“চাচারা! চাচারা! পীর সাব আইছে! আমনে গো ডাকে।”
কথাটা শুনেই কয়েকজন কৃষক দ্রুত উঠে দাঁড়াল। “আইছে?”
“হ, বাঁশঝাড়ের পাশের বটতলায় বসছে।”
এক মুহূর্তেই সবাই সেদিকে হাঁটা ধরল। রশিদ বিরক্ত হয়ে বলল,
“এইডা দেহেন ভাই! আবার শুরু হইবো।”
জামাল দাঁত চেপে বলল,

“এই লোকডার লাইগাই গেরামের সর্বনাশ।”
সিকান্দার কিছু না বলে তাদের সঙ্গে হাঁটতে লাগল।বটগাছের নিচে গিয়ে দেখা গেল, চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছরের এক লোক লালচে রঙের পাগড়ি পরে উঁচু পিঁড়ির ওপর বসে আছে। সামনে ধূপ জ্বলছে। কয়েকটা তাবিজ, রঙিন কাপড়, কাঁচের শিশি আর নানা রকম জিনিস সাজানো। গ্রামের মানুষ একজন একজন করে গিয়ে তার পা ছুঁয়ে সালাম করছে। লোকটা চোখ বন্ধ করে ভারী গলায় বলল,
“আমি আগেই কইছিলাম। অশুভ ছায়া এখনো কাটে নাই।”
একজন কৃষক কাঁপা গলায় বলল, “তয় এখন কী করুম হুজুর?”
লোকটা চোখ না খুলেই বলল, “আরও বড় আমল লাগবো।”
“কী আমল?”
“আগামী জুমার রাইতে সাতটা কালা মুরগি, একটা কালা ছাগল, একুশ কেজি চাল আর নগদ বিশ হাজার ট্যাহা লাগবো।”
লোকগুলোর মুখ আরও মলিন হয়ে গেল। তাদের নিজেরই জান বাঁচে না। টাকা পয়সা সেসব পাবে কই? ঠিক তখনই সিকান্দার সামনে এগিয়ে এলো। শান্ত গলায় বলল,
“একটা প্রশ্ন করতে পারি?”
তান্ত্রিক ধীরে ধীরে চোখ খুলল। অপরিচিত যুবককে দেখে কপাল কুঁচকে গেল।

“আপনে কেডা?”
“আমার নাম সিকান্দার শাহ্।”
“কী জানতে চান?”
সিকান্দার ভদ্রভাবেই বলল,
“আপনি বললেন, গ্রামের ওপর অশুভ ছায়া নেমেছে।”
“জি।”
“এটা আপনি কীভাবে জানলেন?”
লোকটা গলা খাঁকারি দিল। “আমার সাধনা আছে।”
“কোন সাধনা?”
“এইসব সাধারণ মানুষ বুঝবো না।”
সিকান্দার আবার বলল, “বুঝানোর চেষ্টা করেন। আফটার অল আমি শিক্ষিত মানুষ। অনেক দূর পড়াশোনা করেছি। বোঝালেই বুঝবো। ”
লোকটার মুখে বিরক্তি ফুটে উঠল।
“সব কথা সবাইরে কওন যায় না।”
সিকান্দার মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক আছে। আরেকটা প্রশ্ন করি?”

“করেন।”
“আপনি কি নিশ্চিত, এই আমল করলে বৃষ্টি নামবেই?”
লোকটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। তারপর বলল,
“আল্লাহ চাইলে নামবো।”
সিকান্দার শান্তভাবেই বলল, “যদি আল্লাহর চাওয়াই শেষ কথা হয়, তাহলে কালো মুরগি, ছাগল, টাকা আর চালের শর্ত কেন?”
চারপাশে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। পীর এবার একটু অস্বস্তিতে পড়ল। সে বলল, “এইডা নিয়ম।”
“কার নিয়ম?”
লোকটা উত্তর দিল না। সিকান্দার আবার বলল,
“কুরআনের কোন আয়াতে এই নিয়ম আছে? অথবা রাসূল ﷺ কোথায় শিখিয়েছেন, বৃষ্টি নামানোর জন্য কালো মুরগি বা টাকা দিতে হবে?”
এবার লোকটার মুখ শক্ত হয়ে গেল। “তুমি আমারে পরীক্ষা করতাছো?”
সিকান্দার শান্তভাবেই বলল,
“না। আমি শুধু জানতে চাইছি। কারণ মানুষ তাদের শেষ সম্বল আপনার হাতে তুলে দিচ্ছে। তাই জানার অধিকার তাদেরও আছে।”

এবার গ্রামের মানুষও চুপচাপ পীর সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটা সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিতে পারল না। কিন্তু গ্রামের মানুষও তখনও সিকান্দারের পক্ষ নিল না।
তাদের চোখে তখন শুধু বিস্ময়। এই প্রথম কেউ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে তান্ত্রিককে এমন প্রশ্ন করার সাহস দেখাল। পীর সাহেবের মুখের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠল। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল সে। গ্রামের মানুষদের সামনে কখনো কেউ তাকে এভাবে প্রশ্ন করেনি। কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে সে গম্ভীর গলায় বলল,
“সব জিনিস কিতাবে লেখা থাকে না। কিছু বিদ্যা সাধনায় আসে।”
সিকান্দার শান্তভাবেই জিজ্ঞেস করল,
“আপনি বললেন সাধনা। সেই সাধনা কি কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা?”
লোকটা এবার ভ্রু কুঁচকে তাকাল। একজন কৃষক তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন,
“পীর সাব, এই পোলাডার কথায় কিছু মনে কইরেন না। নতুন আইছে।”
তান্ত্রিক হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। তারপর সিকান্দারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি কি আলেম?”
“না।”
“হাফেজ?”
“না।”
“তাইলে ধর্মের কথা কইতে আইছো ক্যান?”
সিকান্দার মৃদু হাসল। “ধর্মের কথা বলার জন্য আলেম হওয়া লাগে না।”
ভিড়ের মধ্যে চাপা গুঞ্জন উঠল। পীর এবার কণ্ঠ আরও ভারী করল।
“আমি চল্লিশ বছর সাধনা করছি। আমারে পরীক্ষা করার তুমি কে?”
সিকান্দার এক পা এগিয়ে এল।

“আমি কেউ না। কিন্তু একটা উত্তর জানতে চাই।”
“কী?”
“আপনি এই গ্রামের মানুষের কাছ থেকে টাকা, চাল, গরু, ছাগল সব নিলেন।”
“হ।”
“বৃষ্টি কি নামছে?”
লোকটা চুপ।
“আপনি বলেছিলেন অশুভ ছায়া আছে।”
“হ।”
“সেই ছায়া কি কেটে গেছে?”
লোকটা আবারও চুপ। চারদিকে ফিসফাস শুরু হলো।সিকান্দার আবার বলল,
“আজ যদি আপনি বলেন, আরও টাকা লাগবে তাহলে মানুষ আবার দেবে। এরপরও যদি বৃষ্টি না আসে, তখন বলবেন আরও বড় আমল লাগবে। এর শেষ কোথায়?”
পীরের চোখে এবার রাগের আগুন জ্বলে উঠল। সে হঠাৎ লাঠি ঠুকে দাঁড়িয়ে বলল,
“চুপ! আমারে অপমান করার ফল ভালো অইবো না। এই গেরামের সর্বনাশ আরও বাড়বো।”
কথাটা শুনেই কয়েকজন মহিলা ভয় পেয়ে মুখে আঁচল চাপা দিলেন। একজন কৃষক কাঁপা গলায় বললেন,
“বাবা, আর কিছু কইও না। উনি রাগ করলে অমঙ্গল অইবো।”
জামাল দাঁত চেপে বলল, “দেখছেন ভাই? এই ভয় দেইখাই মানুষরে বশ কইরা রাখে।”
সিকান্দার একবারও উত্তেজিত হলো না। সে শুধু গ্রামের মানুষদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি কাউকে অপমান করতে আসিনি। যে মানুষ প্রশ্ন করতে ভয় পায়, সে সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। আর যে মানুষ সত্যের ওপর থাকে, সে প্রশ্নকে ভয় পায় না। অথচ উনি আমার প্রশ্ন গুলো কে ভয় পাচ্ছে। ”
একজন কৃষক বলল,

“ এ বাবা তুমি যাও তো যাও। ”
সিকান্দার তপ্ত শ্বাস ফেলে চলে যেতে উদ্যত হতেই পীর উচ্চস্বরে বলে উঠল,
“এই পোলা!”
সিকান্দার থামল। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। পীর তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
“তুমি কইলা, আমি মিথ্যা কই?”
” অবশ্যই। ”
লোকটা এবার পিঁড়ি থেকে নেমে এল।
“তুমি কি বিশ্বাস করো, এই গেরামের ওপর কোনো অশুভ ছায়া নাই?”
সিকান্দার চারপাশে একবার তাকাল। শুকিয়ে যাওয়া মাঠ,মলিন মুখের কৃষক,দূরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন শিশু,তারপর সে বলল,
“আমি বিশ্বাস করি, এই গ্রাম পরীক্ষার মধ্যে আছে। ”
তান্ত্রিক সঙ্গে সঙ্গে বলল,
” কিসের পরীক্ষা? তয় খরা আইলো ক্যান?”
“আমি জানি না।”
এই উত্তর শুনে অনেকেই অবাক হলো। পীর বিজয়ীর হাসি হাসল। “দেখলা? নিজেই জানে না।”
সিকান্দার শান্তভাবেই বলল, “আমি জানি না এই কথাটা বলতে লজ্জা নেই। কিন্তু না জেনে নিশ্চিত দাবি করা বিপজ্জনক।”

চারপাশে আবার ফিসফাস শুরু হলো। সিকান্দার আবার বলল, “আপনি নিশ্চিত করে বললেন অশুভ ছায়া। আমি জানতে চাইলাম কী প্রমাণে বললেন? আপনি কোনো উত্তর দিলেন না।”
লোকটা এবার গম্ভীর গলায় বলল, “আমার ইলম আছে।”
“আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে নিশ্চয়ই সেই ইলমের ভিত্তি দেখাতে পারবেন।”
লোকটা চুপ। সিকান্দার আরেকটি প্রশ্ন করল, “আপনি কি বলতে পারবেন কোন দিনে বৃষ্টি হবে?”
“এইডা আল্লাহ জানেন।”
“ঠিক বলেছেন। তাহলে যখন আল্লাহই জানেন, তখন নিশ্চিত করে কীভাবে বললেন অশুভ ছায়া না কাটলে বৃষ্টি হবে না?”
লোকটার মুখ শক্ত হয়ে গেল। ভিড়ের মধ্যে এবার কয়েকজন কৃষক একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগল।তাদের একজন আস্তে করে বলল, “এই কথাডাও তো ঠিক…”
কিন্তু পাশের লোকটি সঙ্গে সঙ্গে তার কনুই চেপে ধরল।
“চুপ! পীর সাব শুনলে রাগ করবো।”
পীর সাহেব বুঝতে পারল, ভিড়ের মন ধীরে ধীরে নড়ছে। একজন বৃদ্ধ কৃষক আস্তে করে বললেন,
“এই কথার জবাব তো দেওয়া দরকার…”
পীর সাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বৃদ্ধের দিকে তাকাতেই তিনি মাথা নিচু করে ফেললেন। সে বুঝতে পারল, প্রশ্নের উত্তর দিলে সে আরও জড়িয়ে যাবে। তাই সে হঠাৎ হাত তুলে উচ্চস্বরে বলল,
“আজ আর কোনো কথা না। আমি আজ রাইতে ইশারা পাইছি। এই গেরামে একজন অশুভ মানুষ ঢুকছে। সেই কারণেই রহমত আটকা আছে।”
লোকজন আতঙ্কিত হয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল।

“কেডা? কেডা সেই মানুষ?”
পীর ধীরে ধীরে আঙুল তুলে সিকান্দারের দিকে তাক করল। “এই লোকটা।”
মুহূর্তেই চারপাশে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। রশিদ অবিশ্বাসে বলে উঠল, “কী কন!”
জামাল এক পা এগিয়ে এল। “মুখ সামলাইয়া কথা কইবেন!”
কিন্তু সিকান্দার তাদের দুজনকেই থামিয়ে দিল। তার মুখে কোনো রাগ নেই। সে শুধু পীর সাহেবের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
” ভণ্ডামি বাদ দেন। সময় থাকতে ভালো হয়ে যান৷ মানুষ ঠকানো বন্ধ করেন। মানুষের মনে যেই কুসংস্কার ভয়ভীতি ঢুকিয়েছেন সেটা একবার কেটে গেলে তখন কিন্তু আপনার বাঁচার পথ থাকবে না। আজ আসি৷ আর গ্রামবাসী আপনারা এই ভণ্ড পীরের কথা না শুনে আল্লাহর উপর ভরসা করুন৷ তাকে ডাকুন। তিনিই একমাত্র সাহায্যকারী। ”
সিকান্দার চলে যেতেই পীর লাঠি ঠুকে উচ্চস্বরে বলল,
“শুনো সবাই!”
যারা হাঁটতে শুরু করেছিল, তারাও আবার থেমে গেল। পীর গম্ভীর গলায় বলল,
“আজ থেইকা ওই পোলার কথায় কেউ কান দিবা না। ও শহরের পোলা। গেরামের নিয়ম বোঝে না। যারা আমার আমল পূর্ণ করবা, আল্লাহ চাইলে রহমত তারাই আগে পাইবা।”
কৃষকেরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। একজন বৃদ্ধ বললেন,
“হুজুর, আমরা তো আপনার কথাই শুনমু। আমাগো দাদারাও আপনার বাপের কাছে যাইত।”
পীরের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।

” তোয় শুনো সবাই!”
মুহূর্তেই চারপাশ নিস্তব্ধ। সে ধীরে ধীরে সিকান্দারের যাওয়ার দিকে আঙুল তুলে বলল,
“এই পোলা এই গেরামে থাকা পর্যন্ত আমি আর একটাও আমল করুম না।”
গ্রামবাসীরা হতবাক। “হুজুর!”
পীর সাহেব কঠিন গলায় বলল,
“আমি আগেই কইছি, অশুভ মানুষ ঢুকছে গেরামে। আমার ইলমে বাধা পড়তাছে। এই পোলা থাকলে রহমতের দরজা খুলবো না। আমি এই গেরামের দায়িত্ব আর নিলাম না।”
একজন বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বললেন, “তয় আমাগো কী হইবো হুজুর?”
“যা হইবার হইবো। কিন্তু ওই পোলা গেরাম ছাড়ার আগে আমি আর কোনো সাহায্য করুম না। তিন দিনের মধ্যে যদি ওই পোলা গেরাম না ছাড়ে, তাইলে এই গেরামের সব দায় ওর। পরে কেউ আমার কাছে আইসো না। ওরেই কও বৃষ্টি আনতে।”
সবাই চলে গেলো। পীর সাহেব তার দুজন ঘনিষ্ঠ চেলাকে ইশারা করে পাশে ডাকল। চারপাশে কেউ নেই নিশ্চিত হয়ে নিচু গলায় বলল,
“পোলাডারে নজরে রাখবি।”
একজন চেলা জিজ্ঞেস করল, “হুজুর, কী করমু?”
পীর সাহেব চোখ সরু করে বলল,
“যে পোলা মানুষের মনে প্রশ্ন ঢুকাইতে পারে, সে একদিন আমারে না খাইয়া মারবো।”
আরেকজন বলল, “আজই শিক্ষা দিমু?”
পীর সাহেব মাথা নেড়ে না বলল। “না। গরম লোহায় হাত দিলে নিজের হাতও পুইড়া যায়। আগে মানুষরে ওর বিরুদ্ধে লাগাইতে হইবো।”

“কেমনে?”
পীর সাহেব ঠোঁটের কোণে হাসি টানল।
“শুক্রবারের আগে গেরামে খবর ছড়াইয়া দে,এই পোলা আইবার পরই রহমতের দরজা আরও বন্ধ হইছে।”
কথাটা যেন বিষের মতো ছড়িয়ে গেল মানুষের মনে। সন্ধ্যা নামার আগেই খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল পুরো মোহনগঞ্জে।
“শহর থেইকা আইছে এক পোলা। পীর সাবের সাথে তর্ক করছে। পীর সাব কইছে, এইডাই অশুভ ছায়া…”
যে যার মতো করে কথায় নতুন নতুন রং চড়াতে লাগল। আবার কেউ বলল,
“ও গেরামে পা দেওনের পর থেইকাই গরম আরও বাড়ছে। গত রাইতে এত জোনাকি আইছিল, অইডাও ভালো লক্ষণ আছিল না। যতদিন ওই পোলা গেরামে থাকবো, রহমতের দরজা খুলবো না।”
একটা গুজব আরেকটাকে জন্ম দিতে লাগল। পীর সাহেব সেসব শুনে হেসে কুটিকুটি হলেন।দূরে দাঁড়িয়ে সিকান্দার সবই দেখল। সে আর ফিরে তাকাল না। বাড়ি ফেরার পথে জামাল রাগে ফুঁসছিল। ঠিক তখনই পেছন থেকে কাঁপা গলায় কেউ ডাকল,

” বাবা…”
তিনজন ঘুরে দাঁড়াল। সেই বৃদ্ধ কৃষক, যিনি একটু আগে পীরের সামনে কিছু বলতে গিয়ে থেমে গিয়েছিলেন, ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। চারপাশে একবার তাকিয়ে নিচু স্বরে বললেন,
” তুমি তখন ভুল কিসু বলো নাই বাবা।”
সিকান্দার কিছু বলল না। বৃদ্ধ আবার বললেন,
“কিন্তু গেরামের মানুষ এখন তোমারে বিশ্বাস করবো না। ভয় পায়।”
“কিসের ভয়?”
“যদি সত্যি পীর সাহেব রাগ করে? যদি আরও অমঙ্গল হয়? এই ভয়টাই ওদের বাঁইধা রাখছে।”
সিকান্দার শান্ত কণ্ঠে বলল,
“মানুষ যখন ভয়কে সত্য ভেবে নেয়, তখন সেই ভয়ই তার শিকল হয়ে যায়।”
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “আল্লাহ জানে, কোনটা সত্য।”
“আল্লাহই জানেন। তাই তাঁর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে।”
বৃদ্ধ আর কিছু বললেন না। পরদিন সকালেই হাটে, চায়ের দোকানে, পুকুরঘাটে, ক্ষেতের আইলে সবখানেই একটাই আলোচনা। তার নাম সিকান্দার। রশিদ ক্ষুব্ধ হয়ে বাড়ি ফিরল।
“আব্বা! মানুষ যা-তা কইতাছে!”
রহিমুদ্দিন মিয়া বিস্মিত হয়ে বললেন, “কী কইতাছে?”

“কইতাছে, ভাই আইবার পরই নাকি অমঙ্গল বাড়ছে।”
জামাল রাগে লাঠিটা মাটিতে আছাড় মারল। ঠিক তখনই উঠোনের বাইরে দু-তিনজন গ্রামের লোক এসে দাঁড়াল।
একজন গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“রহিমুদ্দিন ভাই… কতা আছিল।”
“কও।”
লোকটা ইতস্তত করতে লাগল। “রাগ কইরেন না।”
“কও।”
“পীর সাব কইছে,ওই শহরের পোলাডা যদি গেরাম না ছাড়ে তাইলে রহমত নামবো না।”
কথাটা শুনে উঠোনে নীরবতা নেমে এলো। মমতাজ বেগম অবিশ্বাসে তাকিয়ে রইলেন। শফিক সাহেবও চমকালেন। মুনতাহা রুমের ভেতর থেকে সব শুনছে৷ শিফা দরজার কাছে দাঁড়ানো। জামাল তেড়ে আসতেই সিকান্দার তার কাঁধে হাত রাখল। লোকগুলো আবার বলল,
” হয় তুমি বৃষ্টি আইনা দাও আমাগো নইলে গেরাম ছাইড়া চইলা যাও। তুমি কইছিলা না, আল্লাহ সব পারেন? তাইলে বৃষ্টি আইনা দেহাও। আর যদি না পারো। তাইলে তুমি গেরাম ছাইড়া চলে যাও বাবা।”
জামাল ক্ষোভে ফেটে পড়ল। “আপনেগো লজ্জা করে না? বৃষ্টি আনা মানুষের কাম নাকি? এইটা আল্লাহর কাজ!”
কিন্তু ভিড় থেকে আরেকজন বলল, “আমরা এত কিসু জানি না। একজন কইতাছে পীর সাব ঠিক। আরেকজন কইতাছে আল্লাহর উপর ভরসা করো। আমরা কার কথা ধরি?”
সবাই এবার সিকান্দারের দিকেই তাকিয়ে রইল। সিকান্দার কিছুক্ষণ নীরব থাকল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,

“বৃষ্টি আনার ক্ষমতা আমার নাই। কোনো পীরেরও নাই। সেই ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। আমি অলৌকিক কিছু দেখাইতে পারবো এমন দাবী করছি না। তবে আল্লাহর কাছে চান,কেঁদে কেটে তওবা করে আল্লাহ কে ডেকে সমস্যার কথা বলুন৷ মসজিদে আসুন। দেখবেন আল্লাহ ফিরাবেন না না।
একজন লোক সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
” আচ্ছা আমরা আপনের কথা শুনমু। এরপরও যদি কিছু না হয়। তাইলে আপনি নিজেই গেরাম ছাইড়া যাইবেন।”
সিকান্দার বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে উত্তর দিল,
“যদি আমার চলে যাওয়াতেই আপনাদের মনে শান্তি আসে, আমি চলে যাব কথা দিচ্ছি। ”
মাগরিবের আগ দিয়ে গ্রামের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা বহু বছরের পুরোনো জরাজীর্ণ ছোট্ট মসজিদটিতে মানুষ জড়ো হতে শুরু করল। জায়গায় জায়গায় মাটি খসে গর্ত হয়ে গেছে। উপরে পুরোনো ঢেউটিনের ছাউনি, মরিচা পড়ে লালচে হয়ে আছে। কোথাও কোথাও টিনে ছোট ছোট ফুটোও দেখা যায়। বাঁশের খুঁটি দিয়ে কোনোমতে ছাদ ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। মেঝে কাঁচা মাটির, তার ওপর জমে আছে ধুলো, শুকনো পাতা আর বছরের পর বছর অবহেলার চিহ্ন। কোণায় কোণায় মাকড়সার জাল ঝুলছে।
চারদিকে একবার তাকিয়ে সিকান্দার নিচু হয়ে একটি ঝাড়ু হাতে তুলে নিল।
“আল্লাহর ঘরকে পরিষ্কার রাখাও ইবাদতের অংশ। ”

রশিদ, জামাল, বৃদ্ধ কৃষকসহ গ্রামের কয়েকজন যুবক আর কোনো কথা না বলে কাজে নেমে গেল। কেউ ঝাড়ু দিয়ে ধুলো সরাতে লাগল, কেউ লাঠি দিয়ে মাকড়সার জাল নামাল। কয়েকজন পুকুর থেকে কলসিতে পানি এনে মাটির মেঝে আলতো করে ভিজিয়ে পরিষ্কার করল, যাতে ধুলো আর না উড়ে। ভাঙা অজুখানাটাও যতটা সম্ভব ধুয়ে-মুছে ব্যবহার উপযোগী করে তোলা হলো। বহুদিনের অবহেলার ধুলো সরে যেতে যেতে ছোট্ট মসজিদটি যেন আবার প্রাণ ফিরে পেল। মসজিদের ভেতরে জায়গা কম হওয়ায় কয়েকজন যুবক নিজেদের ঘর থেকে পুরোনো চট, পাটি আর মাদুর এনে বাইরে খোলা উঠোনে বিছিয়ে দিল। কেউ বাঁশে হারিকেন ঝুলিয়ে দিল, কেউ অজুর জন্য বড় বড় কলসিতে পানি ভরে রাখল। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“কত বছর পর আল্লাহর ঘরটারে আবার এমন জাগতে দেখলাম…”
মাগরিবের আজান ভেসে উঠতেই একে একে সবাই কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সেদিন মাগরিব, এশা দুই নামাজই জামাতে আদায় করা হলো মসজিদে। বলাবাহুল্য গ্রামের সব লোক আসে নি। তবে অধিকাংশ লেকই এসেছে।
নামাজ শেষে কেউ আর বাড়ি ফিরল না। সিকান্দার উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“আজ রাতে আমরা কারও কাছে কিছু চাইব না। শুধু আমাদের রবের কাছে চাইব। নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা চাইব। এই গ্রামের জন্য দোয়া করব। মনে রাখবেন, আমরা আল্লাহকে পরীক্ষা করছি না। আমরা তাঁর দরজায় একজন অসহায় বান্দা হয়ে দাঁড়িয়েছি।”

এরপর দীর্ঘ সময় ধরে কুরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ, তওবা ও ইস্তিগফার চলতে লাগল। রাত গভীর হলে সবাই তাহাজ্জুদের নামাজে দাঁড়িয়ে গেল। এদিকে গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরেও একই দৃশ্য।
মমতাজ বেগম, মারিয়া, সুমি, মুনতাহাসহ গ্রামের নারীরা নিজ নিজ ঘরে জায়নামাজ বিছিয়ে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করলেন। দুই হাত তুলে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তারা আল্লাহর কাছে রহমত প্রার্থনা করতে লাগলেন।
সিকান্দার দীর্ঘ কিয়াম,দীর্ঘ রুকু,দীর্ঘ সিজদায় গিয়ে আর মাথা তুলতে পারল না। চোখের পানি ভিজিয়ে দিল মাটি।কাঁপা কণ্ঠে একটি দোয়া পড়লো,
” আল্লাহুম্মাস্‌কি ‘ইবাদাকা ওয়া বাহীমাতাকা, ওয়ানশুর রহমাতাকা, ওয়া আহই বালাদাকাল মাইয়্যিত। ”
অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনার বান্দাদের ও পশুদের পানি পান করান, আপনার রহমত ছড়িয়ে দিন এবং মৃতপ্রায় (শুকিয়ে যাওয়া) এই জনপদকে পুনর্জীবিত করুন।”
তারপর তিনবার আল্লাহুম্মা আগিসনা পড়তে শুরু করলো। যার অর্থ, “হে আল্লাহ! আমাদের বৃষ্টি দান করুন।”
সেজদা শেষে সিকান্দার মোনাজাতে গিয়ে রবের নিকট বলল,
“ইয়া রব… আপনি পারেন না এমন কিছুই নেই। আপনি চাইলে শুকিয়ে যাওয়া জমিনে আবার সবুজের প্রাণ ফিরে আসে। আপনি চাইলে মৃতপ্রায় হৃদয়ও ঈমানের আলোয় জেগে ওঠে। হে আমার রব, এই মানুষগুলো অজ্ঞতার কারণে ভুল করেছে। তারা না বুঝেই মানুষের দুয়ারে মাথা নত করেছে, অথচ সাহায্য চাওয়ার একমাত্র হকদার আপনি। ইয়া রব, তাদের ভুলগুলো ক্ষমা করে দিন। তাদের অন্তরকে আপনার দিকে ফিরিয়ে দিন। তাদের হৃদয় থেকে শিরক, কুসংস্কার ও মানুষের অন্ধ ভরসা দূর করে দিন। তাদের অন্তরকে তাওয়াক্কুলে পূর্ণ করে দিন।

হে আসমান-জমিনের মালিক, আপনি আপনার অসীম রহমতের এক ফোঁটা বৃষ্টি এই শুকিয়ে যাওয়া জমিনে নাজিল করুন। আপনার রহমতে মৃতপ্রায় ক্ষেতগুলোকে আবার জীবন্ত করে দিন। কৃষকদের মুখে হাসি ফিরিয়ে দিন। পশুপাখিদের তৃষ্ণা নিবারণ করুন। এই জনপদকে আপনার রহমতে সিক্ত করে দিন।
হে পরম দয়ালু, আপনি তো ক্ষমাশীল। বান্দা যখন আপনার দরজায় ফিরে আসে, কাঁদতে কাঁদতে ক্ষমা চায়, তখন আপনি তাকে ফিরিয়ে দেন না। ইয়া রব, আমরা আপনারই দরজায় এসেছি। আমাদের তওবা কবুল করুন, আমাদের গুনাহ ক্ষমা করুন এবং আমাদের ওপর আপনার রহমত বর্ষণ করুন। আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।”
শেষ রাত। তাহাজ্জুদের নামাজ শেষ করে তারা বাড়ি চলে গেলো। রাত কেটে গেল। ফজরের আজানেরও কিছু আগে।
হঠাৎ শোঁ শোঁ একটা ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল পুরো গ্রামজুড়ে।
ঘুমন্ত মানুষজন কাঁথা টেনে নিল। তারপর টুপ টুপ করে টিনের চালের ওপর কয়েক ফোঁটা পানি পড়ার শব্দ।রহিমুদ্দিন মিয়া চোখ মেলে উঠে বসলেন। “বৃষ্টি?”
তিনি কান পেতে রইলেন। পরের মুহূর্তেই ঝমঝমঝমঝম করে মুষলধারে বৃষ্টি নেমে এল। মাসের পর মাস তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকা জমিন যেন প্রথম ফোঁটাতেই প্রাণ ফিরে পেল। টিনের চাল কাঁপিয়ে বৃষ্টি ঝরতে লাগল। উঠোন ভিজে একাকার। শুকিয়ে যাওয়া গাছগুলো বাতাসে দুলে উঠল। রহিমুদ্দিন মিয়া ছুটে বাইরে বেরিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,

“আল্লাহু আকবার! বৃষ্টি! বৃষ্টি!”
চারদিক থেকে দরজা খুলে মানুষ বের হতে লাগল। বৃষ্টি দেখে কেউ কাঁদছে। কেউ সিজদায় লুটিয়ে পড়ছে। কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে দুই হাত তুলে দোয়া করছে।বাচ্চারা বৃষ্টিতে ভিজতে নেমে গেছে। কৃষকেরা দৌড়ে ক্ষেতের দিকে ছুটছে।
.ওদিকে নিজের আস্তানায় বসে পীরও টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ শুনে চমকে উঠল। সে দরজা খুলে বাইরে তাকাতেই স্তব্ধ।
“এত বৃষ্টি!”
তার মুখের রং ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে তো ভেবেছিল,বৃষ্টি হবে না। মানুষ তখন আরও বেশি করে তার পায়ের কাছে এসে পড়বে। সব হিসাব এক মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ঠিক তখনই তার এক চেলা দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩১

“হুজুর… সর্বনাশ অইয়া গেছে!”
“কী হইছে?”
“গেরামের মানুষ… সবাই কইতাছে… ওই শহরের পোলাডা রাইতভর নামাজ পইড়া আল্লাহর কাছে কাইন্দা কাইটা বৃষ্টি আনছে। সবাই এহন সিকান্দার সিকান্দার করতাছে।
পীরের বুক ধক করে উঠল। হাতে থাকা তসবিহ মাটিতে পড়ে গেল। তার বহু বছরের তৈরি করা ভয় আর কুসংস্কারের দুর্গে প্রথম বড় ফাটল ধরেছে। তবে কি এখান থেকেই শুরু হবে তার পতনের প্রকৃত গণনা? সবাই ঐ ভাঙাচোরা জরাজীর্ণ মসজিদের দোরগোড়ায় লুটে পড়বে?

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here