সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩৮
Raiha Zubair Ripti
সিকান্দার আজ বাজারে এসেছে। তার ছোট্ট সংসারে এই প্রথম কোনো অতিথি এসেছে। অতিথি এসেছে মানেই তো আর দায়সারা করা যায় না। ব্যাগ ভর্তি বাজার করলো। তবে মাছ মাংস কম কিনলো। ফ্রিজ নেই তাদের। ব্যাগ ভর্তি করে নিয়ে গেলে রাখবে কোথায়? সেজন্য অল্প অল্প করে নিলো। প্রতি দিনের টা প্রতিদিন কিনে নিয়ে যাবে। নাদিমও এসেছে। নাদিম কখনো বাজার করে নি। বাজারের দায়িত্ব টা সালমান মির্জার উপর ছিলো। নাদিম শুধু জব করতো আর বন্ধুবান্ধব নিয়ে ট্যুর দিত।
আজ বাজারে এসে এক নতুন অভিজ্ঞতা হলো। সিকান্দার দরদাম করে জিনিসপত্র কিনছে। সিকান্দার কখনো দরদাম করে জিনিসপত্র কিনতো না। তবে এখন করতে হয় সামান্য কিছু টাকা বাঁচানোর জন্য। যা দিয়ে সে অন্য চাহিদা মিটাতে পারবে। দু ব্যাগ সিকান্দারের হাতে। একটায় আমিষ আর আরেকটায় সবজি। নাদিম সবজির ব্যাগটা টেনে নিজের হাতে নিলো।
তারা বাজারের ভেতর থেকে বেরিয়ে সম্মুখে চলে আসলো। একটা টঙের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দু ভাই মিলে গরম ধোঁয়া ওঠা চা খেতে শুরু করলো।
সিকান্দার কফি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। বলা চলে চায়ের তুলনায় কফির মূল্য বেশি বলে। সেজন্য চায়ে অভ্যস্ত হচ্ছে ধীরে ধীরে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে নাদিম জিজ্ঞেস করলো,
” তা এ জীবন কেমন লাগছে? ”
সিকান্দার চায়ের কাপটা দু পায়ের মাঝখানে নামিয়ে স্মিত হেসে বলল, ” চমৎকার। ”
” কষ্ট হচ্ছে না? মানিয়ে নিতে সমস্যা হচ্ছে না? ”
” শুরুতেই হয় নি। এখন তো আমার সুখের দিন। এখন হবার তো প্রশ্নই আসে না। ”
” দাদিজান প্রতিদিন তোর কথা জিজ্ঞেস করে। কথা বলিস সময় করে। ”
সিকান্দারের মনে পরলো দাদিজানের কথা। কেমন আছেন উনি? ঠিকমতো খাবার দিচ্ছে তো রেণু? ”
” দাদিজান কেমন আছে? রেণুর কি খবর? ওর ভাইটা সুস্থ এখন? ”
নাদিম শেষ চুমুক টা বসিয়ে বলল, ” দাদিজান আছে ভালো। তবে রেণু তো নেই। ”
” নেই মানে? ”
” বের করে দিছে চাকরি থেকে। এখন কোথায় জানি না। ”
সিকান্দার ভারী এক শ্বাস ফেললো। দাদিজান তাহলে ভালো নেই। চায়ের বিল মিটিয়ে তারা বাড়ির পথে হাঁটা ধরলো। পথিমধ্যে রাশেদ আর রফিক সাহেবের সাথে দেখা হলো। অপরিচিত নাদিম কে দেখে রাশেদ বলল,
” কই গেসিলেন? বাজারে? তা এইডা কেডা? চিনলাম না তো। ”
” আমার চাচাতো ভাই। বেড়াতে এসেছে। ”
রাশেদ ত্যাছড়া চোখে নাদিমের দিকে একবার তাকিয়ে বলল,
” ওহ্ আমনের আবার আত্মীয়ও আছে? জানতাম না তো। ”
সিকান্দার জবাব দিলো না, প্রশ্ন পাল্টে বলল,
” তোমরা আজ আমার বাড়িতে এসো রাশেদ,চাচা আপনারাও। চাচি কে দুপুরে রান্না করতে মানা করো। বলো আজকের দুপুরের খানা আমার পক্ষ থেকে। না করবে না। তাহলে রাগ করবো। ”
” আইচ্ছা আম্মারে কমুনি। রইদ মেলা। আমনে বাড়ি যান দেখি। কালা হইয়া যাইবেন গা। আমনের গায়ের রং মেলা সুন্দর। ”
সিকান্দার শেষের কথা শুনে হাসলো। গ্রামের সহজ সরল রাশেদ। মনে কোনো প্যাঁচগোছ নেই। কি চমৎকার মানুষ। সিকান্দার আর দাঁড়ালো না। বাড়ির পথে হাঁটা ধরলো।
নাদিম বাড়ি ফিরেই আগে গোসল সেরেছে। তারপর রুমে চুপচাপ বসে আছে। সিকান্দার মুনতাহার কাছে ব্যাগপত্র টা রাখলো। মুনতাহা রান্নাঘরে ছিলো। আদা রসুন বাটছিলো।
সিকান্দারের খারাপ লাগলো। মনে মনে ভাবলো কারেন্ট আসলেই সিকান্দার সবকিছু কিনবে মুনতাহার জন্য। ব্লেন্ডার থেকে শুরু করে ফ্রিজ চুলা,ওয়াশিং মেশিন,প্রয়োজন হলে মাটির ঘরেই এসিও লাগাবে।
মুনতাহার আদা রসুন,জিরা মশলা বাটা শেষ। বাজারের থলি থেকে সব বের করে দেখলো,গরুর মাংস,একটা দেশি মোরগ,চিংড়ি মাছ,বড় মাছ আছে। সাথে সবজি,বাসমতি চাল আর দই মিষ্টি,দুধ,চিনি সেমাই,সালাদের জন্য লেবু,শশা। ইলার আম্মা মুরগী পরিষ্কার করতে বসলো। একা হাতে একটা এতকিছু কিভাবে করবে? ইলা অবশ্য এসব কিছু পারে না। তার মা করতে দেয় নি কখনো। নিজের এই অপারগতার জন্য আজ খুব খারাপ লাগছে। সিকান্দার রান্না ঘরে ঢুকলো। মাটির দুটো চুলা এখানে। দু চুলায় বসালে তাড়াতাড়ি হবে।
সে মুনতাহাকে রেস্ট নিতে বললো। তারপর চুলায় কড়াই বসিয়ে গরুর মাংস বসিয়ে দিলো। সিকান্দার রান্নাবান্না পারে। বিদেশে থাকা কালীন প্রায় সে রাঁধত। সবসময় তো আর বাহিরে খাবার খাওয়া যেত না। আর সেখানে বাঙালি রান্নার লোক পাওয়াটাও তো কঠিন ব্যপার ছিল। সেজন্য সে ইউটিউব বা দাদিজান কে ফোনে রেখে শিখতো। আরো একটা কারন ছিলো শেখার। সেটা হলো মুনতাহা। তার ইচ্ছে শুরু থেকেই যে সে মুনতাহাকে রানীর মতো করে রাখবে। অবশ্য সেটা কতটুকু রাখতে পারছে তা মহান আল্লাহ তায়ালাই ভালো বলতে পারবে। সে আরেক চুলায় দুধ বসালো। সেমাই রাঁধবে। সেমাই রাঁধা হলে গরম চুলায় বাসমতীর চাল বসালো।
মুনতাহা অবশ্য যায় নি। সে ইলার মায়ের সাথে এতক্ষণ মুরগী পরিষ্কার করলো। কেটে দিলে মুনতাহা কলপাড়ে গিয়ে ধুয়ে এনে দেখলো গরুর মাংস প্রায় হবার পথে। মুনতাহা কে দেখে সিকান্দার পিঁড়ি এগিয়ে দিলো। মুনতাহা বসলো। এবং মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো স্বামীর পানে। ধীর স্বরে কাচুমাচু হয়ে বলল,
” আমি কিন্তু রাঁধতে পারতাম। আপনি রাঁধছেন। লোকে শুনলে কি বলবে? ইলার আম্মু কি ভাবছে আল্লাহই জানে। ”
” যে যা ভাবার ভাবুক। লোকের ভাবাভাবির সময় রয়েছে আমার শোনার সময় নেই। আমি আপনাকে কথা দিয়েছিলাম,আপনাকে আমি রাঁধতে দিব না। বলেছিলাম লোক রাখবো। না হয় নিজে রেঁধে খাওয়াবো। আর সিকান্দার শাহ্ মুখ দিয়ে কোনো কথা বের করলে সেটা করেই ছাড়ে। ধৈর্য ধরুন আর্থিক ভাবে আরেকটু মজবুত হই। ইনশাআল্লাহ একটা লোক রাখবো আপনার খেদমত,কাজকর্ম করার জন্য। ”
” এমন প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট আর কত দিবেন? ”
” আজীবন দিব। কোনো সমস্যা? ”
” সমস্যা হলেও কি শুনবেন নাকি? ”
” অবশ্যই নয়। ”
তারপর তাদের মধ্যে আর কথাবার্তা হলো না। সিকান্দার রান্নায় মনোযোগ দিলো আর মুনতাহা সিকান্দার কে দেখায় মনোযোগ দিলো। ধীরে ধীরে প্রতিটি আইটেম সিকান্দার খুব চমৎকার ভাবে রাঁধল। গরুর মাংস,মোরগের মাংস,ডিম ভুনা,আলু ভাজি,সেমাই,আর বাসমতী চালের পোলাও।
বসার ঘরে নিচু টেবিলে সব গুলো সাজিয়ে সিকান্দার নাদিম আর বাকি পুরুষদে জন্য খাবার বেড়ে অতিথি ঘরে চলে গেলো। আর মহিলাগনদের তার বসার ঘরে খাওয়ার ব্যবস্থা করলো মুনতাহার সাথে।
রাশেদরা সবাই এসেছিল। দুপুরের খাবার টা তারা সকলে খেলো। খাওয়ার পর খাওয়ার বেশ প্রশংসা করলো। তারা ভেবেছে এসব সবই মুনতাহা রেঁধেছে। সিকান্দার বলে নি সত্য টা। তবে মহিলাগন যখন মুনতাহার প্রশংসা করলো ভেতরে তখন মুনতাহা বলে দিছে এসব সে রাঁধে নি। সিকান্দার রেঁধেছে। সবাই শুনে চমকালো। একটা ছেলের হাতের রান্না এত সুস্বাদু হতে পারে!
খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই চলে গেলে মুনতাহা আর সিকান্দার মিলে এঁটো থালাবাসন ধুয়ে ফেলে। ইলার ইচ্ছে করছে গ্রাম টা ঘুরে দেখতে। সেজন্য মা কে বললো। তার মা বললো কেবল খেয়েছি। এখন হাঁটতে পারবো না। মুনতাহাকে বলতে পারলো না। কারন মেয়েটা তো এখন আর আগের মতো নেই। প্রয়োজন ছাড়া বাহিরে যায় না। সেজন্য নাদিম কে মেসেজ করলো। বলল তার খুব বাহিরে যেতে ইচ্ছে করছে। বাহিরে শব্দ টা শুনে নাদিম রিপ্লাই দিলো,
” তো যান বাথরুমে। আমাকে কেন বলছেন। আমি কি নিয়ে যাব নাকি আপনাকে। ”
ইলা চমকালো,রাগে ফুঁসে উঠলো। সে কখন বললো সে বাথরুমে যাবে?
” মূর্খ ব্যাডা। আমি বাড়ির বাহিরে যাবার কথা বলছি। ”
” ওহ আচ্ছা তাই বলুন। তা কেন যাবেন বাহিরে? আর আমাকে কেন বলছেন? আমি আপনার গার্ডিয়ান? ”
” আম্মু কে প্রথমে বলছিলাম। তিনি যেতে পারবে না তাই আপনাকে বলছি। ”
ও সর্বপ্রথম মাকে বলেছে। মা পাত্তা দেয় নি বলে এখন নাদিমের কাছে এসেছ। নাদিমও বলে দিল,
” আমার সময় নেই। আমি সিকান্দারের সাথে বের হবো। ওর ক্ষেত দেখতে। আপনি উঠানে বসে ঘুরেন। নইলে আপনার আম্মু যখন যেতে পারবে তখন যাইয়েন। মাইনসের মেয়ের দায়িত্ব আমার না। ”
ইলা আর কিছু লিখলো না। অসভ্য বেয়াদব ছেলে। নাদিম সিকান্দারের সাথে পুরো গ্রাম টা ঘুরে চিনে রাখলো। শেষে গেলো ক্ষেতে। কাদায় নেমে সিকান্দার ক্ষেতটা একটু পরিষ্কার করলো। সামনের মাসেই হয়তো ধান কাটতে হবে। পাক ধরা শুরু করেছে।
সেই ক্ষেতের পাশে থাকা লম্বা পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল পীর। তবে সিকান্দার কে দেখেই ফের উল্টো ঘুরে দৌড় মারলো। না জানি চোখ পরলে আবার কোন সাজা দেয়। এমনিই আল্লাহ আল্লাহ করতে তার জীবন চলে যাচ্ছে। এখন যদি বলে, মিঞা আমার ক্ষেত টা পরিষ্কার করে দেন তখন? থাক বাবা এ ছেলে যেই পথ ধরে হাঁটবে সেই পথের আশেপাশেও যাবে না পীর।
তবে ঘাড় ঘুরাতে গিয়ে নজরে ঠিকই পড়েছিল পীর। সিকান্দার তার দৌড় দেখে হেঁসে ফেললো। তারপর ক্ষেতের পাশে থাকা ঢিপ মেশিং থেকে হাত পা ধুয়ে বাড়ির পথে হাঁটা ধরলো।
ইলা শুনেছে মুনতাহারা আর কখনো ঢাকা যাবে না। এখানেই একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে মেয়েটা। সব শুনে মন খারাপ হলেও ভালো লাগলো তারা সুখী আছে। সন্ধ্যার পরপর একটু বাহিরে আসলো। বাড়ির সামনে দিয়েই হাঁটাহাঁটি করলো। নেট নাই ফোনে। সিকান্দার আর নাদিম কে আসতে দেখে দরজার সামনে থেকে সরে গেলো। সিকান্দার ভেতরে ঢুকে গেলো। নাদিম যায় নি। সে এগিয়ে গিয়ে পাশে দাঁড়ালো। ইলা একবার পাশ ফিরে তাকিয়ে তারপর বাড়ির পাশে থাকা নদীটার সামনে গিয়ে বসলো। নাদিমও বসলো। কি চমৎকার এক জায়গায় ঘর বানিয়েছে সিকান্দার। নদীর কলকল ধ্বনি শোনা যায়। মন শরীর দুটোই জুড়িয়ে যায়। ইলা বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
” মুনতাহা ভীষণ সুখী একটা নারী। ”
” সিকান্দার আছে বলে। ”
” হু। জীবনে মানেই তো এটা তাই না? একটা সুন্দর লাইফপার্টনার পাওয়া। ”
নাদিম সুন্দর শব্দটা শুনে একটু চুল টা ঠিকঠাক করলো। ভাব নিয়ে বলল,
” তা আপনি কেমন জীবনসঙ্গী চান মিস ঢিলা? ”
” সিকান্দার শাহ্ এর মতো। ”
মুখটা চুপসে গেলো নাদিমের। ইলা ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,
” আপনি কেমন জীবনসঙ্গী চান? ”
নাদিম ভোঁতা মুখ নিয়ে বলল,
” তেলাপোকার মতো। যারে জুতা দিয়ে মারলেও উড়ে এসে জড়িয়ে ধরবে। ”
কথাটা শুনে ইলা হেঁসে ফেললো। নাদিম তাকালো না ঐ হাসি মুখের দিকে। বিরক্তির সহিত বলল,
” হাসি বন্ধ করুন তো। ভালো লাগছে না হাসির শব্দ। ”
ইলা জানতে চাইলো, ” হোয়াই? ”
নাদিম বলল, ” অসহ্য লাগছে। ”
” কেনো অসহ্য লাগছে? ”
” বলতে পারছি না। ”
” তাহলে বসে বসে মুড়ি খান। আমি চললাম। ”
ইলা চলে গেলো। নাদিম বিরবির করে উচ্চারণ করলো,” বেক্কল বেডি। ”
রাতে খাবারদাবার শেষ করে এশার নামাজ পড়ে তাদের শোবার ঘরে নারীরা শুলো। আর সিকান্দার নাদিমের সাথে অতিথি ঘরে। দু’দিন থাকলো তারা। তারপর চলে গেলো।
নাদিমরা চলে যাওয়ার পরপরই ধান কাটার মৌসুমে সিকান্দারের ব্যস্ততা যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ভোরের আজান শেষ হওয়ার আগেই মাঠে লোকজন জড়ো হয়ে যায়। কেউ ধান কাটে, কেউ আঁটি বাঁধে, কেউ আবার কাঁধে করে সেগুলো উঠানে এনে স্তূপ করে রাখে। এই শ্রমিকদের মধ্যেই ছিল বছর বাইশ-তেইশের এক যুবক,নাম রায়হান।
ছেলেটা পরিশ্রমী। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করে। সিকান্দার তাকে ধান উঠানোর কাজে রেখেছে। শক্ত-সমর্থ শরীর, কাজে কোনো ফাঁকি নেই। কিন্তু একটা ব্যাপার সিকান্দারের চোখে পড়ে গেল। তা হলো ছেলেটার নামাজের প্রতি অনেকটা অনিহা রয়েছে। যেমন আজান হলে সবাই যে যার মতো নামাজের জন্য চলে যায়,সবাই যায় না তবে অনেকাংশই যায়। তাদের মধ্যে রায়হান একজন। সে নামাজের সময়ও ধানের আঁটি কাঁধে নিয়ে ছুটে। সিকান্দার তাকে মসজিদে যাওয়ার আগ দিয়ে ডাক দেয়। রায়হান আসছি বলে আর আসে না।
প্রথম দিন সিকান্দার কিছু বলল না। দ্বিতীয় দিনও না। তৃতীয় দিন আসরের আজান হলো। রায়হান তখনও ধান টেনে নিয়ে আসছে। সিকান্দার দূর থেকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।তারপর কাছে গিয়ে বলল,
” রায়হান। ”
ছেলেটা ঘাম মুছতে মুছতে বলল, ” জি, ভাইজান?”
” তোমাকে প্রতিবার নামাজারের জন্য ডাকি। তুমি আসো না কেন? তুমি কি নামাজ পড় না?”
রায়হান একটু থমকে গেল। তারপর কাঁধের ধানের আঁটিটা নামিয়ে বলল, “পড়ি তো…”
” আমি তো একদিনও পড়তে দেখলাম না। ”
” সবসময় হয়ে ওঠে না পড়া। ”
” সব সময়? নাকি কোনো সময়ই হয়ে উঠে না তোমার? ”
ছেলেটা মাথা চুলকে বলল, “সময় হয় না, ভাইজান। অনেক কাজ করি। সকাল থেকে মাঠে থাকি। কাজ শেষ করতে করতে শরীর আর চলে না। ”
” তুমি বলছো সময় হয় না? অথচ আমি অন্য কিছু দেখতে পাচ্ছি। আসল কথাটা সময় না থাকা নয়। আসল কথা হলো নামাজটা তোমার কাছে এখনও জরুরি হয়ে ওঠেনি। আমি তোমাকে তেমন চাপই দেই না কাজে রায়হান। তাই সময় বা কাজের বাহানা দিবে না খবরদার। ”
” সত্যি কথা বলমু? ”
” মিথ্যা কেন বলবে? ”
” আমার আসলে পড়তে মন চায় না নামাজ। কাইল থেকে পড়মু। ”
” কেনো? কি সমস্যা নামাজে? তুমি খাওয়ার জন্য ঘুমানোর জন্য, কাজ করার জন্যও সময় বের করতে পারো তাহলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য কেন সময় বের করতে পারো না? নামাজটা পরে পড়ব,কাল থেকে পড়ব, কাজটা শেষ হোক, তারপর পড়ব। শরীরটা একটু ঠিক হোক, তারপর পড়ব। এসব কি? নামাজ পড়ার জন্য মন চায় বা না চায় এই অপেক্ষা কেনো করো? মন চাইলে নামাজ পড়ব এই কথাটা শয়তানের সবচেয়ে সুন্দর অজুহাতগুলোর একটা। নামাজ আগে শুরু করো। মনটা পরে আসবে। আজ একটা ওয়াক্ত দিয়ে শুরু করো। কাল দুটো। তারপর ধীরে ধীরে পাঁচ ওয়াক্তই চলে আসবে। কিন্তু শুরুটা তো করতে হবে। আমরা তো জানি না আমাদের জীবনের শেষ দিনটা কোনটা। তুমি জানো না, আগামীকাল ফজরের আজান শুনার জন্য তুমি বেঁচে থাকবে কি না। মৃত্যু বয়স দেখে আসে না রায়হান। শক্তি দেখেও আসে না। কাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষাও করে আসে না। দেখা যাবে তুমি নামাজের জন্য সময় বের করতে করতে একদিন মালাকুল মউত নিজেই এসে দাঁড়াবে তোমার সামনে। আর বলবে, “ Your time is over. Let’s go.” তখন তুমি তাকে বলার সুযোগ পাবে না,ভাই, একটু দাঁড়ান। নামাজটা পড়ে নিই। তখন তুমি বলতে পারবে না, আমার তো এখনও অনেক সময় বাকি। কারণ সময়টা তোমার ছিলই না। সময়টা ছিল আমানত। আর আমানত কখন ফেরত দিতে হবে, সেটা মালিক ছাড়া কেউ জানে না। আর মৃত্যু মানেই যে তুমি মুক্তি পেয়ে গেলে সেই ভুল ধারণাটাও মনের কোথাও রেখো না। মৃত্যু মানে সূচনা, এমন এক সূচনা যার পৃথিবীর মতো অন্তিম নেই। মৃত্যুর পর শুরু হয় বারযাখের জীবন। তারপর কিয়ামত। তারপর হিসাব।
একবার কল্পনা করো রায়হান,তোমার মৃত্যু হলো। আজ যে শরীর নিয়ে তুমি নামাজ না পড়ে নামাজের সময়েও ধান কাঁধে নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছো, কাল সেই শরীরটাই কয়েক গজ সাদা কাপড়ে জড়িয়ে মানুষ মাটির নিচে রেখে আসবে। তারপর সবাই ফিরে যাবে। তখন তোমার সঙ্গে তোমার জমি যাবে না, টাকা যাবে না, মোবাইল যাবে না, বন্ধু যাবে না, পরিবারের কেউ যাবে না। মানুষ যতক্ষণ তোমার জানাজা পড়বে, ততক্ষণ হয়তো তুমি তাদের দেখতে পাবে। তারপর তারা যখন কবরস্থান ছেড়ে চলে যাবে, তুমি শুনতে পাবে তাদের পায়ের শব্দও। এরপর? এরপর তুমি একা। তোমাকে প্রশ্ন করা হবে। তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কী? তোমার নবী কে? এখন তুমি এসবের উত্তর জানো। কিন্তু তখন এই জানা প্রশ্নের উত্তর গুলো দিতে পারবে না। কারণ জবান তখন সেই কথাই বলবে, যে বিশ্বাস নিয়ে তুমি জীবন কাটিয়েছো। তখন তোমার জন্য কবরের আজাব শুরু হবে। জাহান্নামের দিকে একটি দরজা খুলে দেওয়া হবে। সেখান থেকে তোমার কাছে উত্তাপ ও দহনকারী বাতাস আসতে থাকবে। তোমার কবরকে এমনভাবে সংকুচিত করা হবে যে তোমার পাঁজরের হাড়গুলো একে অপরের সঙ্গে মিশে যাবে।
তারপর তোমার জন্য এমন একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করা হবে যার হাতে থাকবে লোহার হাতুড়ি। সেই হাতুড়ি দিয়ে তোমার মাথায় আঘাত করা হবে। এমন আঘাত যার শব্দ মানুষ ও জিন ছাড়া পূর্ব-পশ্চিমের সব সৃষ্টি শুনতে পাবে। তারপর আবার তোমাকে উঠানো হবে। আবার শাস্তি। আবার আঘাত। আবার সেই ভয়াবহতা। যতক্ষণ না কিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হয়। কবরের আজাবের ভয় থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। নামাজের মধ্যে তিনি কবরের আজাব থেকে আশ্রয় চাইতেন। তাহলে আমরা কারা যে কবরকে ভয় করবো না? আমরা তো এমন মানুষ, যারা গুনাহ করি, ভুল করি, নামাজ ফেলে রাখি, তওবা পিছিয়ে দিই, তারপরও মনে করি আমাদের হাতে অনেক সময় আছে। কি নাদান মানুষ আমরা তাই না?
একসময় কবরের সেই জীবন শেষ হবে কিয়ামতের দিন। কিন্তু শাস্তি সেখানেই শেষ হয়ে যাবে না। কবরের পর অপেক্ষা করবে আরও ভয়াবহ এক দিন,হাশরের দিন। সেদিন মানুষ কবর থেকে উঠে দাঁড়াবে। সবাই এক জায়গায় জমা হবে। সূর্য অত্যন্ত কাছে চলে আসবে। মানুষ নিজের ঘামে ডুবে যাবে। কারও ঘাম পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত, কারও হাঁটু পর্যন্ত, কারও কোমর পর্যন্ত, আবার কারও ঘাম মুখ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। মানুষ তখন নিজের হিসাব নিয়ে আতঙ্কে থাকবে। তারপর আমলনামা খুলবে। জীবনের প্রতিটি কাজ সামনে আসবে। এমন কিছুই বাদ যাবে না, যা তুমি ভুলে গিয়েছিলে। তারপর যদি পরিণতি জাহান্নাম হয় তখন আর কবরের মতো অন্ধকার মাটির কয়েক হাত নিচে থাকা নয়। তখন আগুনের সামনে দাঁড়াতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, দুনিয়ার এই আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ। আমরা যে আগুনের তাপ পৃথিবীতে সহ্য করতে পারি না, সেই আগুন যদি জাহান্নামের আগুনের মাত্র এক অংশ হয়,তাহলে বাকি আগুনের ভয়াবহতা কেমন?
জাহান্নামে শরীর পুড়বে। চামড়া পুড়ে যাবে। আর চামড়া পুড়ে গেলে নতুন চামড়া দেওয়া হবে, যাতে শাস্তি অনুভব করা যায়। আগুন থেকে পালানোর চেষ্টা করবে, কিন্তু পালাতে পারবে না। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে যাবে। পানি চাইবে। কিন্তু সেখানে যে পানীয় দেওয়া হবে তা শান্তি দেবে না। কুরআনে এসেছে, এমন ফুটন্ত পানি দেওয়া হবে যা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্নভিন্ন করে দেবে। দুনিয়াতে এক ফোঁটা গরম পানি জিহ্বায় পড়লে আমরা চিৎকার করি। সেখানে ফুটন্ত পানি শরীরের ভেতর ঢুকবে। খাবার চাইবে। তখন এমন খাবার দেওয়া হবে যা গলায় আটকে যাবে, উপকার করবে না, ক্ষুধাও দূর করবে না। আবার খেতে হবে। আবার সেই কষ্ট। সেখানে মৃত্যুকে ডাকা হবে। কিন্তু মৃত্যু এসে মুক্তি দেবে না। মানুষ চাইবে, শেষ হয়ে যাক সবকিছু। কিন্তু শেষ হবে না। জাহান্নামে চিৎকার করেও মুক্তি পাবে না। সেখানে আফসোস থাকবে। এমন আফসোস যে আফসোসের কোনো মূল্য থাকবে না। তখন তুমি বলবে, আমাকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে দিন। আমি ভালো হয়ে যাব। নামাজ পড়ব। তওবা করব। মানুষের হক নষ্ট করব না। হারাম থেকে বাঁচব। কিন্তু সেই সময়ের অনুরোধ গ্রহণ করার সুযোগ থাকবে না। কারণ দুনিয়াই ছিল আমলের জায়গা। মৃত্যুর পর আর আমল করার জায়গা বা সুযোগ কোনোটিই নেই।
আমি এগুলো একটাও বানোয়াট বা মিথ্যা কথা বলছি না। এগুলো চিরন্তন সত্য কথা। আমাদের সাথে এগুলোই হবে। নামাজ জান্নাতের চাবিকাঠি। তাই নামাজকে ছোট করে দেখো না রায়হান। নামাজ শুধু একটা ইবাদত না যে মন চাইলে করলাম, মন না চাইলে করলাম না। এটা আল্লাহর ফরজ করা ইবাদত। প্রতিটি মুমিন তা পালন করতে বাধ্য।
তুমি জাস্ট কল্পনা করো রায়হান। দেখো কেমন অনুভব হয়। রূহ কেঁপে উঠবে না তোমার? মৃত্যুর ভয় তুমি পাও না? চোখ ভিজে আসে না? রবের নিকট ফিরতে ইচ্ছে হয় না? ফিরে এসো রবের পথে রায়হান। রবের জন্য সময় বের করো। এই জীবন টা রবেরই দেওয়া। তার ইবাদত করো। দেখবে জীবনে তোমার শান্তির অভাব নেই। রবের কাছে লুটিয়ে ভেঙেচুরে পড়ার যে আনন্দ সেই আনন্দ আর কোথাও নেই। ”
কথাগুলো বলার সময় সিকান্দারের চোখের কোনে পানি জমে উঠলো। রায়হান উপলব্ধি করলো কিছুটা। সেজন্য কোমর থেকে গামছা খুলে মসজিদের দিকে দৌড়ে ছুটে চললো। ইসলামে এমন একজন মানুষ অত্যন্ত সৌভাগ্যবান,যে কোনো নসিহত শুনে নিজের ভুল বুঝে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। আল্লাহ নিজেই বলেছেন, তিনি তওবাকারীদের ভালোবাসেন। (সূরা আল-বাকারা ২:২২২)
আর বিষয়টা আরও সুন্দর। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, বান্দা তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে এলে আল্লাহ তার তওবায় এমন আনন্দিত হন, যেমন মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া নিজের বাহন ও খাবার-পানীয় ফিরে পেয়ে একজন মানুষ আনন্দিত হয়।
তাই কেউ যদি তোমার বলা কথা শুনে নামাজে ফিরে যায়, গুনাহ ছেড়ে দেয়, কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর কাছে তওবা করে, তাহলে তোমার জন্যও এটা বিরাট কল্যাণের বিষয়। কারণ তুমি তার হিদায়াতের মালিক নও। তুমি হয়তো শুধু একটা কথার মাধ্যম হয়েছো। হিদায়াত দিয়েছেন আল্লাহ।
আর রাসূল ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের দিকে পথ দেখায়, সে ওই কাজটি যে করে তার সমপরিমাণ সওয়াব পায়। অর্থাৎ তোমার একটা নসিহত যদি কারও সিজদায় ফেরার কারণ হয়, সে যতবার নামাজ পড়বে, যতবার আল্লাহকে ডাকবে। আল্লাহ চাইলে সেই কল্যাণের অংশ তোমার আমলনামাতেও আসতে পারে।
এরপর থেকে রায়হান এক ওয়াক্তও নামাজ বাদ দিলো না। সিকান্দারের সাথে রোজ নামাজে যেতে শুরু করলো। একদিন এক কান্ড ঘটলো। সিকান্দার তখন ধান ক্ষেতে ধান কাটছে কাস্তে দিয়ে রায়হানের সাথে। সেদিন সেই পথ দিয়ে চেয়ারম্যানের মেয়ে বিনোদিনী আর হরিমতি। তীক্ষ্ণ অভিব্যক্তি মুখ জুড়ে। তাকে দেখে সবাই কাজ থামিয়ে দিলো। দৌড়ে এসে সালাম দিলো। বিনোদিনী প্রয়োজন বোধ করলো না জবাবের। তার দৃষ্টি আঁটকে গেলো দূরে। সবাই ছুটে আসলেও দুজন ব্যক্তি ছুটে এসে মাথা নত করলো না। সবাই তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিক পানে তাকালো। তারপর একজন দৌড়ে গিয়ে বলল,
” সিকান্দার ভাই একটু আহেন। ”
সিকান্দার ধান কাটতে কাটতে জবাব দিলো, ” কেনো? কোনো সমস্যা? ”
” চেয়ারম্যান সাবের মাইয়া আইছে। ”
” তো? আমি গিয়ে কি করবো? ”
” সবাই তারে মান্য করে চলে। আমনে একাই কাম করতাছেন। হের আবার এইসব পছন্দ না। হেয় চায় সবাই হেরে মান্য করে চলুক। ”
” আমার পক্ষ থেকে তাকে সালাম জানিয়ে দিও। আমি এখন কাজ করছি দুঃখিত যেতে পারবো না। ”
লোকটা বিরস মুখে চলে আসলো। ফিসফিস করে বাকি লোকদের বললো,আসবে না। বিনোদিনী লোকটার এতবড় স্পর্ধা দেখে হুংকার দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
” কে ঐ লোক? এত বড় সাহস,আমি আসার পরও কাজ করে যাচ্ছে। নাম কি তার? ”
একজন ভীড়ের ভেতর থেকে বিরবির করে বলে উঠলো,
” সিকান্দার। সিকান্দার শাহ্ উনার নাম। ”
সিকান্দার নাম টা শুনেই বিনোদিনীী শক্ত হয়ে আসা মুখটা নরম হলো। পিছু ফিরে আছে বলে সিকান্দারের মুখ দেখা যাচ্ছে না। তবে সে যেহেতু বিনোদিনী কে অজান্তেই সাহায্য করে বসেছিল। সেজন্য আজকের এই অপরাধ টা সে মাপ করে দিলো। হরিমতি কে নিয়ে এগিয়ে গেলো সিকান্দারের দিকে। আইলের কিছুটা দূরে দাঁড়ালো। হরিমতি ডেকে উঠলো,
” সিকান্দার সাব। দিদি মনি আসছে আপনের সাথে কথা বলতে। একটু কি আসবেন? ”
মেয়েলি গলার স্বর শুনে সিকান্দারের হাতের কাজ এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেলেও তারপর আবার কাজে মনোযোগ দিয়ে বলল,
” কিছু বলার আছে আমাকে? থেকে থাকলে বলুন শুনছি। সন্ধ্যার আগে সমস্ত ধান কেটে শেষ করতে হবে আমাকে। সময় অপচয় করার মতে সময় নেই এখন। ”
বিনোদিনীর কপালে সূক্ষ্ম দুটি ভাঁজ পড়ল। সিকান্দার তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে? বিষয়টা কিছুতেই হজম হলো না তার। তার মতো একজন নারীকে কোনো পুরুষ এড়িয়ে যেতে পারে,এই ধারণাটাই যেন বিনোদিনীর আত্মসম্মানে আঘাত করল। এতদিন যে পুরুষের চোখে নিজের উপস্থিতির প্রভাব দেখতে চেয়েছিল, আজ সেই পুরুষটিই তার অস্তিত্বকে যেন সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে চলে যাচ্ছে! কেন? কৌতূহলটা ধীরে ধীরে জেদে পরিণত হলো। সিকান্দার কোনোমতেই তার দিকে ফিরছে না দেখে বিনোদিনী আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। উদ্দেশ্য একটাই। লোকটার মুখটা একবার ভালো করে দেখা।
সিকান্দারের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তার দৃষ্টির সামনে হঠাৎ একজোড়া মেয়েলি পদযুগল এসে থামল। সিকান্দার সঙ্গে সঙ্গে এক পা পিছিয়ে গেল। মেরুদণ্ড সোজা হলো। দৃষ্টি নেমে গেল মাটির দিকে। এক মুহূর্ত আগেও যে মানুষটা নিজের কাজে নিমগ্ন ছিল, সে যেন আচমকা নিজের চারপাশে অদৃশ্য এক সীমারেখা টেনে নিল। আর ঠিক তখনই বিনোদিনীর চোখের সামনে সম্পূর্ণ উন্মোচিত হলো সেই মুখ।
যে মুখটা দেখার জন্য এতক্ষণ ধরে তার ভেতরটা কেমন যেন ছটফট করছিল। বিনোদিনী স্থির হয়ে গেল। এমন পুরুষ সে আগে কখনো দেখেনি। চেহারায় অদ্ভুত এক প্রশান্তি। মুখের রেখায় দৃঢ়তা, অথচ সেই দৃঢ়তার ভেতরেই এমন এক কোমলতা,যা চোখ সরিয়ে নেওয়া কঠিন করে দেয়। চমৎকার এক পুরুষালি অবয়ব, সুঠাম দেহ, টানটান মেরুদণ্ড আর মুখজুড়ে এমন এক নূর যা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।
বিনোদিনী অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক মুহূর্তের জন্য চোখ ফেরাতে পারল না। এই তবে সিকান্দার শাহ্! এই সেই পুরুষ, যে তাকে দেখেও দেখেনি। যে তার উপস্থিতির দিকে একবারও ফিরেও তাকায়নি। অথচ সামনে দাঁড়িয়ে তাকে দেখে বিনোদিনীর নিজেরই যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। একজন পুরুষ এতটা সুদর্শন হতে পারে!
তার বুকের ভেতর অচেনা এক অস্বস্তি হলো। যে পুরুষকে নিজের দিকে তাকাতে বাধ্য করার অভ্যাস তার ছিল, সেই পুরুষই আজ তার দিকে তাকাচ্ছে না। বরং বিনোদিনীর উপস্থিতি টের পেয়েই দূরত্ব তৈরি করছে। এটাই যেন তাকে আরও বেশি করে সিকান্দারের দিকে টেনে নিল। বিনোদিনীর চোখে তখন বিস্ময়ের সঙ্গে মিশে গেল একরাশ আগ্রহ। এই প্রথম কোনো পুরুষ তার সৌন্দর্যকে উপেক্ষা করল। আর সেই উপেক্ষাটাই কেন যেন তার কাছে সিকান্দারকে অন্য সব পুরুষের চেয়ে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলল।বিনোদিনীর দৃষ্টি যে তার ওপর স্থির হয়ে আছে, সেটা সিকান্দারের বুঝতে বাকি রইল না। কিন্তু বুঝেও সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। মেয়েটার দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধটুকুও করল না। সে দেখতে কেমন? কি জন্য সামনে এসে দাঁড়াল। কোনো কিছুর প্রতি সিকান্দার এক বিন্দু আগ্রাহও নেই। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় শুধু একবার নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে নিলো। তারপর কোনো কথা না বলেই কাস্তে হাতে নিয়ে হাঁটা ধরল বাড়ির দিকে। আর রায়হান কে বললো বাড়ি চলে যেতে কাল আসতে। আজকের কাজ এই অব্দিই।
বিনোদিনী পেছন থেকে তাকিয়ে রইল। একবারও ফিরল না সিকান্দার। যেন বিনোদিনী নামে কেউ তার সামনে দাঁড়িয়েই ছিল না। বিনোদিনীর বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩৭
এতটা উপেক্ষা? পুরুষেরা যেখানে তার একবার তাকানোর আশায় নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে ব্যস্ত থাকে, সেখানে এই লোকটা তাকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছে! আর সিকান্দার? সে ততক্ষণে বাড়ির উঠোনে পা রেখে দিয়েছে। পেছনে কে দাঁড়িয়ে রইল, কে তাকিয়ে রইল, কে কী ভাবল এসব নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। তার মাথায় এখন কেবল মুনতাহা। বাড়িতে ঢুকেই প্রথমে মুনতাহাকে খুঁজল সে।
