সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৬
মৃধা মৌনি
তৃণা সত্যি সত্যি ব/টি টা উঁচু করে ধরল।
হাসিব একটা চিৎকারই দিয়ে উঠলেন, ‘আরে করো কি, করো কি, এই মাইয়া.. পাগল নাকি…’
তৃণা র/ক্ত লাল চক্ষু করে বলল, ‘বাইর হ হারামজাদা, নাইলে এই ব/ টি দিয়া তোরে কো/পা/ই/য়া দুই টুকরা করবো।’
‘ধ্যার, এই মাইয়ার মাথা সত্যি খারাপ আছে। আচ্ছা তুমি বসো, আমার কথা শোনো।’
‘রাখ তোর কথা…এক্ষনি এই মুহূর্তে বাইর হ। কত্তবড় সাহস, আমার গায়ে হাত দিস!’
হাসিবের এমন মেজাজ খারাপ হলো, তবু তিনি দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে কটমট চোখে তৃণার দিকে তাকালেন। তৃণা ব/টি টা আরও উঁচু করে দেখালো। সেই সঙ্গে নিজেও দাঁত কিড়মিড় করে বোঝালো, আর কখনো এইরকম কিছু করতে আসলে, কপালে যথেষ্ট খারাপি আছে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
হাসিব নিজের ঘরে গিয়ে দরজা আঁটকালেন। তৃণাও দরজা আঁটকালো। হাসিব চলে যেতেই তার সব সাহস কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল সম্পূর্ণ শরীর। হাত থেকে ব/টিটা নামাতেই দুই চোখ বেয়ে উষ্ণ জলের ধারা গড়িয়ে পড়ল। খুব খুব একাকী বোধ করতে লাগল। হঠাৎ করেই মানসপটে ভেসে উঠল মায়ের মুখটা। একটা মেয়ের জন্য পরিবার থাকা কি রহমতের জিনিস, তৃণা হঠাৎ করেই টের পেল। আজ যদি কেউ থাকত, তবে কি এমন দুর্ভোগ আসত? আর এলেও… কাঁধে মাথা রেখে কাঁদবার সুযোগ ও থাকত। আজ কাঁদছে সে… কিন্তু মাথাটা কোথায়?
তৃণা হাউমাউ করে উঠল। মায়ের কাছে যেতে ইচ্ছে করছে তার। ভীষণ.. ভীষণ.. ভীষণ!
শিশির ফিরল তাড়াতাড়িই। বাজারের ব্যাগ নামিয়ে রেখে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল, ‘নাও, ব্যাগটা খোলো দেখি। এক কেজি গরুর গোশত আনছি৷ বসাও তো। আর কয়টা পোলাও রেঁধে ফেলো। পারবে? না পারলে ভাতই করো।’
তৃণা একটিও কথা বলল না। এমনকি অবাক ও হলো না এত বাজার দেখে। শিশির পর্দা টানালো, নিজেই বিছানার চাদর পাল্টালো, ঘর ঝাড়লো। তৃণা রান্নাবান্নার মাঝখানে একবার ঘরে এসে দেখল, গুনগুন করে গান ও গাইছে। কিন্তু তাকে কিছুই জিজ্ঞেস করল না তৃণা। বিষয়টা নজর এড়ালো না শিশিরের। খেতে বসেও তৃণা চুপচাপ। গরুর মাংসটা জব্বর রেঁধেছে। পোলাও নরম হয়ে গেছে, লবণটাও কটা- তবু শিশির এতোটা আশা করেনি। তৃণা শিশিরকে খাবার বেড়ে দিয়ে নিজে হাত গুটিয়ে বসে রইল। তাই দেখে শিশির বলল, ‘তুমি খাবে না?’
‘খাবো।’ এক কথায় জবাব দিয়ে নিজেও কয়টা নিয়ে বসল। তবে পুরোপুরি খেতে পারল না। নাড়াচাড়া করে গেল অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে। সবটাই নীরবে খেয়াল করল শিশির। অন্যান্য দিন শোয়ার পর এই সেই নানান কথার মেলা জুড়িয়ে বসা মেয়েটা আজ চুপ!
শিশির একহাতে ওকে কাছে টেনে নিলো। একেবারে নিজের বুকের মধ্যিখানে।
তৃণা না ও করল না। সরলো ও না।
শিশির বিস্মিত না হয়ে পারল না।
অবাক কণ্ঠে শুধালো, ‘কি হয়েছে তোমার?’
প্রায় পাথর কণ্ঠে জবাব দিলো তৃণা, ‘কই! কিছু না!’
‘তৃণা! লুকিয়ো না। স্পষ্ট বুঝতে পারছি, কিছু একটা হয়েছে। তোমার জন্য গোলাপ আনলাম। একটা কিচ্ছু বললে না। মুখে এক ছটাক হাসিও নেই। কেমন নির্জীব, চুপচাপ… শরীর ভালো তো?’
‘হুঁ।’
‘আরে বাবা বলো না কি হয়েছে। দেখো, আমি অত মেয়েদের মন টন পড়তে পারি না। আমার কাছ থেকে হেল্প চাইলে আমাকেই বলতে হবে। বুঝে নেবো, এই আশা করো না প্লিজ!’
তৃণা শিশিরের দিকে ফিরে তাকাল, হঠাৎ অদ্ভুত ভেজা কণ্ঠে বলল, ‘আমায় বাড়ি নিয়ে যাবেন?’
শিশির চমকালো, ‘কেন? সব ঠিক আছে তো? তোমার মা ফোন করেছিল? দীক্ষা… কিছু হয়েছে?’ সামান্য গলা কাঁপল ওর।
তৃণা নিজের দুঃখ ভুলে গেল মুহূর্তেই। সরে গেল শিশিরের কাছ থেকে। উঠে বসল চট করে। ঝাঁঝ মেশানো গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ল, ‘এখনো মন থেকে মুছতে পারেননি! বাহ!’
শিশিরও উঠে বসল, ‘না না, তুমি যা ভাবছ তা না..’ অপ্রস্তুত হলো ওর কণ্ঠস্বরও।
তৃণা মোটেই বুঝ মানলো না বরং গরম গলায় শুধাতে লাগল, ‘এইজন্যই বিয়ে করছেন না আমাকে, তাই না? মনের ভেতর এখনো ঘাপটি মে রে বসে আছে ও! তাই না? হুম? তা ফিরে যাচ্ছেন না কেন। যান, ফিরে যান, আমার সঙ্গে এই ভালো মানুষি নাটক করতে হবে না।’
‘এই যে এই যে, হুদাই এখন একটা ক্যাচাল হবে। থাক, কথা না বলি, তাই ভালো।’
‘হ্যাঁ তাই তো, এখন আমার সাথে কথাই বা বলবেন কেন! আপনার মনে তো শয়তানি। দু’দিকে দুইজনকেই ঠিক রাখতেছেন।’
শিশির অতি কষ্টে মেজাজটাকে সামাল দিলো, গম্ভীর স্বরে বলল, ‘আহাম্মকের মতো কথা বলো না। দু’জনকে রাখতেছি, মানে কি? আমি কি ক্যারেকটারলেস নাকি? আমি চিন্তা থেকে ওর কথা জিজ্ঞেস করছি এটা সত্য.. বাট সেই চিন্তার পেছনের কারণটা তো শুনবে। সেদিন কি হয়েছিল, তুমি তো সবটা জানোও না।’
তৃণা মুখ ফিরিয়ে নিলো, চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘জানতেও চাই না। শতহোক, আম দুধে মিলে যাবে, আর আঁটি গড়াগড়ি খাবে। আমি হচ্ছি সেই আঁটি.. আমার এখন গড়াগড়ি খাবার অপেক্ষায় থাকা উচিত।’
‘তৃণা!’ চেঁচিয়ে উঠল শিশির।
তৃণা লালচোখে তাকাল, ‘একদম চিৎকার করবেন না, একদম না। আপনি একটা ফালতু, অনেক বড় ফালতু, আপনার কারণে আমার লাইফটা শেষ।’
‘এই কথাটা আগেও বলেছ, এখনো বলছ, আমি তোমার লাইফের কি এমন করছি, জবাব দাও। জবাব না দিলে থাপড়ে দাঁত ফেলে দিবো..’
‘গায়ে হাত দিয়ে দেখুন না খালি… কি করি।’
‘কি করবি?’
শিশির তুই-তে নেমে এলো।
তৃণা খিটমিট করে বলল, ‘ছিঁড়ে ফেলব। অনেক নরম থেকে দেখেছি… ঠকানো ছাড়া পেলাম কি?’
‘আমি… আমি তোকে ঠকিয়েছি?’
‘হ্যাঁ ঠকিয়েছেন। বিয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে বিয়ে করেননি। পড়াশোনা বন্ধ, জীবন শেষ, আর এখন কিনা আপনার মনে তাকে নিয়েই চিন্তা-ভাবনা… ভালো না?’
‘আর তোর খপ্পরে পড়ে যে আমার ঘরবাড়ি ছাড়া লাগল, চাকরি গেল, মান-সম্মান সব..সেটা?’
‘সেটা আপনার মা কে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন। আমি তো আর বের করে দেইনি, আর না অফিস গিয়ে অভিযোগ করে এসেছি। অবশ্য যেমন বদমাইশ আপনি, তেমনই বদমাইশ আপনার ফ্যামিলি…’
‘তৃণা…!’
সজোরে গালে চড় বসিয়ে দিতেই পালটা হাত তুলল তৃণাও। শিশিরের এত রাগ লাগল, মেয়ে মানুষের হাতে কি না মা/র খেতে হচ্ছে। এতই খারাপ দিন আসলো? সহ্য হলো না তার। রাগটাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারল না কিছুতেই। হুশ জ্ঞান হারিয়ে সমানে চড়, ঘুষিতে নাজেহাল করতে লাগল তৃণাকে। শেষে লাথি বসালো বুক থেকে একটু নিচে… তৃণা চিৎকার করে শুয়ে পড়ল। মুখটা হা হয়ে গেছে। জিভ বেরিয়ে এসেছে। চোখ জোড়া উলটে যেতে চাইছে… শিশির ভয়ংকর ভয় পেল।
‘তৃণা.. এই তৃণা.. এই মেয়ে…’
জবাব নেই।
সকালের পেলোব রোদ্দুর দীক্ষার নরম গাল ছুঁতেই তার ঘুম ভেঙে গেল। কিন্তু উঠতে ইচ্ছে করছে না। শরীর জুড়ে রাজ্যের অলসতা। তবে উঠতে হবে, আজ একটা বিশেষ দিন। আজ বকুলের জন্মদিন!
দীক্ষার মনে আছে। ওরা যখন এবাড়িতে সব গুটিয়ে একেবারে চলে এসেছিল, তখন বকুল অনেক ছোট। স্কুলে যায় আসে। বুঝজ্ঞান কম, অল্পতেই কাঁদে, আবার মেজাজ দেখায়। আর জন্মদিনের কথা কেউ মনে না রাখলে চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তোলে। সেই বকুল আজ কত বড় হয়ে গেছে! কত হলো বয়স? সতেরো? আঠারো হতে এখনো এক বৎসর! অথচ দীক্ষার মাঝে মাঝে মনে হয়, বকুল বুঝি ওর চাইতেও বড়। এত বোঝে, এত জানে।
দীক্ষা বিছানা ছাড়ল। কম্বল ভাঁজ করে বালিশ কাঁথা গুছিয়ে রাখল। বাইরে বেরোতেই চোখে পড়ল বকুলকে, হালকা সবুজ রঙের সেলোয়ার-কামিজে কি দারুণই না লাগছে! মাথায় পরিপূর্ণ ভাবে ওড়না টানা.. এই মেয়েটার সবকিছুতেই একটা লক্ষী লক্ষী ভাব!
দীক্ষা মনে মনে মাশা আল্লাহ পড়ে। গুরুজনেরা বলে, পরের চেয়ে আপনজনেদের নজর লাগে বেশি। মনে মনে দোয়াও করল দীক্ষা… ‘ইয়া রাব্বুল আলামীন, আমার এই বোনটার হৃদয়কে অক্ষত রেখো সবসময়।’
বকুল দীক্ষার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল, ‘উঠে গেছ আপা?’
এগিয়ে এলো, ‘শুয়ে থাকতে। মাত্র আটটা বাজে।’
দীক্ষা ওর গাল ছুঁয়ে বলল, ‘জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা তোকে। দোয়া করি, তোর নামের মতোই জীবনটাও ফুলের সুবাসে সুবাসিত হোক..’
লজ্জায় কুঁকড়ে গেল সে, মাথানত করে বলল, ‘ধন্যবাদ আপা।’
‘ইশ, কেমন লজ্জাবতী গাছের মতো নুয়ে যাচ্ছিস।’ দীক্ষা হাসল। আর ঠিক তখনই জানালা দিয়ে হাত বাড়ালেন রমিলা। ডাকলেন, ‘এই এই…’
বকুলের মুখ পাংশু হয়ে গেল। দীক্ষাকে বলল, ‘তুমি যাও। আমি কাজ করছি।’
দীক্ষা ভ্রু কুঁচকাল, ‘দেখে তো মনে হচ্ছে তোকে ডাকছে। আমাকে না। আর এলে কি সমস্যা? আয়।’
‘না আপা, মা আমায় দেখলেই বেশি রাগারাগি করতে শুরু করেন। আমি চাচ্ছি না সাত সকালে একটা হাঙ্গামা হোক।’
‘কিচ্ছু হবে না। তুই আয়, আমি তো সাথে আছি। বোকা..’
একপ্রকার টেনেই নিয়ে গেল দীক্ষা।
বকুল কুঁকড়ে রইলো আড়ষ্টতায়। মনে মনে প্রার্থনা জপছে, আজ অন্তত কোনো চেঁচামেচি না হোক। বিধাতা বুঝি শুনলেন… রমিলা হাত বাড়িয়ে বকুলের একটা হাত খপ করে চেপে ধরলেন। তাঁর চোখমুখ শান্ত, বকুল ভড়কে গেল। অসহায় দৃষ্টিতে দীক্ষার দিকে তাকাতেই দীক্ষা ওকে আশ্বস্ত করল। বলল, ‘কি মামী? কিছু বলতে চাও?’
রমিলা বকুলকে কাছে টেনে নিলেন, জানালার ভেতর দিয়ে দু’হাত বাড়িয়ে বকুলের মাথা ছুঁয়ে দিয়ে বললেন, ‘আজকের পর থেকে তোর উপর আমার কোনো রাগ নাইরে মা, অভিমান ও নাই.. তোর কোনো দোষ ছিল না।’
অস্বস্তিতে কাঁটা হয়ে উঠল বকুলের গোটা শরীর-মন।
দীক্ষা বিস্ময়বোধ করছে। রমিলা পুনরায় বললেন, ‘এই ঘর বাড়ি দেখে শুনে রাখিস। আমি জানি, তুই পারবি। তোর মধ্যে সেই যোগ্যতা আছে৷ তোর মা যেমন ভালো মানুষ ছিল, তুই ও তার মতোই হইছোস। আমি জানি, সব জানি।’
দীক্ষার মনে হলো, তার চোখজোড়া বিস্ফোরিত হয়ে খুলে পড়বে। বকুল তার দিকে চাইতে পারছে না। মাথাটা এত নিচে নামিয়ে রেখেছে! আর রমিলা মামী এসব কি বলছেন? বকুলের মা তিনি নন?
রমিলা বকুলকে ছেড়ে দিলেন, মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন, ‘শুভ জন্মদিন। এই উপলক্ষে আজকের রান্নাবান্নাটা আমি করতে চাই। তোমার বাবারে বলো, অনুমতি দিতে। বড় চিংড়ি এনে দিতে। চিংড়ি দিয়ে বেগুন আলুর তরকারি রাঁধবো, এইটা খেতে তুমি বড় ভালোবাসো, নারে মা?’
বকুলের চোখে পানি চলে এসেছে। সে কিছুই বলতে পারল না। কেবল ছুটে গেল বাড়ির পেছন দিকে। বাবা ওখানেই আছেন…আজ কতবছর পর রমিলা তাকে আদর করেছেন.. মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়েছেন.. জন্মদিনের পাওয়া সবচেয়ে চমৎকার উপহার বোধহয় এইটিই…
দু’জনে বসে আছে ঘাট পাড়ে। বকুল পা ডুবিয়ে দিয়েছে অল্প পানিতে। সূর্যমামা মাথার উপর তীব্র কিরণ ছড়াচ্ছে। শীত কালে এই রোদে শরীর ভেজাতে দারুণ লাগে। বকুলেরও আজ দারুণ লাগছে। ভেতর বাড়িতে রমিলা রান্না চড়িয়েছেন। বাড়িতে কেমন একটা উৎসব উৎসব ভাব।
দীক্ষা একদৃষ্টে বকুলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তার মনে কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। সেগুলি জিজ্ঞেস করবে কিনা, ভেবে পাচ্ছে না। বকুলের মনটা ভালো, যদি এসবের উত্তর দিতে গিয়ে আবার খারাপ হয়ে যায়? থাক…দরকার কি! আজকের দিনটা থাকুক। পরেই নাহয় জিজ্ঞেস করা যাবে..
বকুল হঠাৎই বলল, ‘কি ভাবছ আপা?’
দীক্ষা অন্যমনস্ক ছিল, বকুলের কথায় তার ধ্যান ভাঙল, ‘উঁ না কিছু না।’
বকুল মৃদু হাসে, ‘আমি জানি তুমি কি ভাবছিলে। মায়ের কথাগুলো ভাবছিলে তাই তো?’
‘না মানে…’ অস্বস্তি ভরে ওঠে দীক্ষার চোখেমুখে।
বকুল সরাসরি ওর দিকে তাকাল, শান্ত সুরে বলল, ‘বাবা বিয়ের পর একটা ভুল করেছিল আপা। আমি সেই ভুলের মাশুল!’
কি বলবে দীক্ষা, ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। কেবল ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বকুলের শ্রান্ত মুখপানে…
বকুল বলে চলেছে, ‘আমি জানতে পারলাম নয় বছর বয়সে। মা খুব মারলেন। বিষয় সামান্য, হাত থেকে একটা গ্লাস ফেলে ভেঙে দিয়েছি। কিন্তু এমন মারলেন যে…আমার পুরো শরীর ফুলে ফুলে গেল। অসহ্য যন্ত্রণা। শুতে পারি না, ঘুমাতে পারি না, খালি চিৎকার করি। সবাই তাজ্জব, এত সামান্য কারণে কেউ তার পেটের সন্তানকে এভাবে মারে? তখন প্রথম জানতে পারি, মা চিৎকার করে বাবাকে বলছেন, এই সন্তান তো তার নয়, বরং এমন একজনের যে এই সংসার ভাঙতে চেয়েছিল। ভাঙতে পারেনি বলে আজ আমি তার মেয়ে হয় তার সংসার ভাঙতে চাচ্ছি।
শুরুটা একটা গ্লাস দিয়ে করেছি…! বিশ্বাস করো আপা, আমি এক ফোঁটা কাঁদিনি। বুঝতেও দেইনি। শুধু সবার থেকে একটা নীরব দূরত্ব বজায় করেছি। আগে মা মারলে খুব কষ্ট লাগত, এরপর থেকে আর লাগত না। ভাবতাম, সৎ মা এমনই করবে- স্বাভাবিক! তার উপর আমার মায়ের উপর ঝাল মেটাতে পারেনি বেচারি.. আমার উপর তুলবে, স্বাভাবিক না? বিয়ের পরেও দীর্ঘদিন যখন মায়ের বাচ্চা হচ্ছিল না, তখনই বাবা আমার মাকে.. তাদের বিবাহের সময় ছিল অল্প কয়েক মাস। আমি হওয়ার দেড় মাসের মাথায় আমার মা গলায় ফাঁস নিয়ে মরে যায়। কারণ একটাই, বাবা তাকে বিয়ে করলেও পরিচয় দেয়নি! ঘরে উঠায়নি। আসলে বাবা হয়তো চেয়েছিলেন দু’দিকেই দু’জনকে…’
বকুল থেমে মৃদু শ্বাস ফেলল।
দীক্ষার ভেতর নড়ে গিয়েছে কিছু একটা। এই ভয়ংকর সত্য শুনে.. অথচ বকুল কি স্বাভাবিক! এমনভাবে বলছে যেন কোনো গল্প বলছে।
দীক্ষা নিচু হয়ে বসল। বকুলের কাঁধে হাত রাখতেই এক ফোঁটা জল টুপ করে গড়িয়ে পড়ল তার বাম চোখ বেয়ে। সাথে সাথে মুছে নিলো বকুল, যেন কিছুই হয়নি, এমন ভঙ্গিতে বলে উঠল, ‘এ কারণেই মা আমাকে সহ্য করতে পারতেন না। এতকাল যাবত আমাকে পর ভেবেই এসেছেন। মাথা খারাপ হওয়ার পর থেকে তো আরও যা তা অবস্থা। আমায় জানে মে রে ফেলেন, এমন আর কি। আজ যখন আমায় ধরে বললেন না, আমার উপর কোনো রাগ-টাগ নেই, আমার এত শান্তি লাগল আপা… বিশ্বাস করো। মনে হলো, জীবনে আর কিছু না পেলেও হবে। কিন্তু আপা..’
বকুলের চোখে উদ্বিগ্নতার ঝলক। দীক্ষা ভাঙা স্বরে শুধালো, ‘কি?’
‘মনের ভেতর খামচে আছে কিছু একটা। মা কেন আমাকে মাফ করে দিলো? কেন বলল কোনো রাগ অভিমান কিছুই নেই। মানুষ কখন এরকম বলে? যখন তার…’
থমকে গেল বকুল, বাকিটুকু না বলতেই বুঝে নিলো দীক্ষাও। সে বকুলের মুখ চেপে ধরল। সহসা বলে উঠল, ‘উহুম…এসব কিচ্ছুই না।’
মৃদু শ্বাস ফেলে বকুল, ‘হুম। না হলেই ভালো। সবাই একসাথে মিলেমিশে থাকব, আমার কাছে এইটাই জীবনের বড় পাওয়া।’
রমিলা মা রা গেলেন সেদিনই। দুপুরে ভালো মানুষের মতো সবার সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করলেন, গল্প বললেন, তার গ্রামের কথা বললেন, গ্রামের বিচিত্র সব কাহিনি শোনালেন। এরপর ভাতঘুমের জন্য প্রস্তুতি নিতে নিজের ঘরে চলে গেলেন। বড় মামা ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, ‘তালা দিয়ে আসো।’
দীক্ষা মানা করল, ‘কেন? মামীর তো মাথা একদম সুস্থই লাগছে৷ থাকুক না..’
বড় মামা গম্ভীর স্বরে শুধালেন, ‘কোনো দরকার নাই। আমি পাগল ছাগল নিয়া আতংকে থাকতে চাই না। বকুল, তালা দিয়ে আয়।’
বকুল নিরুত্তর ভাবে উঠে গেল। মন থেকে সেও সায় পাচ্ছে না, আবারও তাকে তালাবন্দী করার- মানুষটা সবসময় এভাবে সুস্থ থাকলেই তো চমৎকার হয়! কিন্তু মন থেকে সেই ব’টি তুলে কো’প দিতে যাওয়ার ভঙ্গিটাও মুছে যায়নি। চোখ বুঁজলেই মনে পড়ে। বাবা সেদিন না থাকলে.. কি যে হতো!
বকুল ধীর পায়ে ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হাতে বিকট সাইজের তালা। কিন্তু তার আগেই একটা খুচখুচানি শুনতে পেয়ে উৎসুক ভঙ্গিতে জানালা দিয়ে তাকাতেই যা দেখতে পেল, তাতে তার মস্তিষ্ক বরফ জমাট বাঁধা শীতলতায় স্থির হয়ে গেল। রমিলা নিজের শাড়ি নিজে গলায় পেঁচিয়ে ঝুলছেন। অস্থির ভঙ্গিতে পা দাপাচ্ছেন। দু’হাতে গলার কাছটায় আঁকড়ে ধরে আছেন। মনে হচ্ছে, উনি বাঁচতে চাইছেন.. প্রাণপণে নিজের জীবন রক্ষা করতে চাইছেন।
সেকেন্ড দুই স্থির থেকেই বিকট আওয়াজে চিৎকার করে উঠল বকুল। দরজা ভেজানো ছিল। সে দৌড়ে ঘরের ভেতর ঢুকল। দু’হাতে জড়িয়ে ধরল রমিলার পা জোড়া। বুক ভেঙে বেরিয়ে এলো একটি শব্দই, ‘মা….মা গো…’
মুহূর্তে বাড়ির পরিবেশ বদলে গেল। রমিলাকে নামানো হলো ওই অবস্থা থেকে। এখনো প্রাণ আছে। তিনি চোখ খুলে এদিক ওদিকে দেখছেন, আর হাঁসফাঁস করছেন। যেন তার মরণ যন্ত্রণা হচ্ছে ভেতরে ভেতরে। বড় মামা আর কাজল দৌড়ে বেরিয়ে গেছে গাড়ির ব্যবস্থা করতে। হাসপাতালে নেওয়া ছাড়া গতি নেই। আশপাশের দশবাড়ি থেকে দল বেঁধে লোকজন ছুটে এসেছে। সবাই উৎসুক হয়ে দেখছে। কেউ বলছে, হাতে পায়ে গরম তেল মালিশ করে দিতে। কেউবা বলছে হাওয়া করতে। কেউবা দোয়া পড়ছে, কেউবা তওবা করাতে চাইছে- হুলুস্থুল কান্ডকারখানা!
এর ভেতর বকুল উন্মাদের মতো কেঁদে যাচ্ছে রমিলার কোলের কাছে উবু হয়ে পড়ে। আর শিয়রের কাছে বসে রয়েছে দীক্ষা, রমিলার একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরা। থরথর করে কাঁপছে তার হাতখানা।
হঠাৎই, রমিলার শ্বাস শান্ত হয়ে এলো। তিনি গভীর একটি নিঃশ্বাস নিলেন। হাত উঁচু করে দীক্ষার গাল ছুঁলেন। আরেক হাতে বকুলের চুলে আঙুল ডোবাতেই বকুল মাথা তুলল। রমিলা ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললেন, ‘বিদায় দাও গো আম্মা। এই ঘর সংসার সব তোমার। সবাইরে দেইখা রাইখো।’
‘মা… আপনার দুই পায়ে পড়ি, এমন কথা বলবেন না। আপনি কই যাবেন? আমার উপর আরও রাগ করে থাকেন, তাও আপনারে আমি যাইতে দেবো না।’
রমিলা রহস্য করে হাসলেন, ‘তোমার মায়ে আমারে নিতে আসছে। আমার যে যাওয়া লাগবো গো আম্মা..’
‘না, আমি আপনাকে কোথাও যাইতে দিবো না। কেউ নিতে আসে নাই। সব আপনার মনের ভুল। আপনি আমার মা, আপনি আমারে রেখে কোথাও যাইতে পারবেন না। আমি যাইতে দিবো না। দিবো না…’
বকুল পাগলের মতো কাঁদছে।
রমিলার চোখ দিয়ে এই প্রথম বকুলের জন্য এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল- এ যেন পৃথিবীর শেষ ফোঁটা মমতা! তিনি একটা গভীর নিঃশ্বাস ছাড়লেন এবং চলে গেলেন…
বকুল চিৎকার করে উঠল মা বলে। শব্দ শুনে দৌড়ে এলো শান্ত। দরজার কাছেই থেমে গেল। দেখল- বকুল তার মায়ের নিথর দেহে উবু হয়ে হাহাকার করছে।
দীক্ষার চোখ লাল, দু’হাত শক্ত করে চেপে ধরা রমিলার মুঠো। বাড়ির প্রতিটি মানুষ নীরব। বাতাসে কেবলই কান্না আর হাহাকারের শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে।
সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৫
শান্তর বুক ব্যথায় মোচড় দিল। তার চোখও টলমল।
কি করবে? কিভাবে সান্ত্বনা দেবে? শান্ত নাম হলেই তো কাউকে শান্ত করার প্রতিভা পাওয়া যায় না…
সে নিঃশব্দে পিছিয়ে দাঁড়াল। দুই চোখ নামিয়ে রাখল।
আজ রমিলা মামী চলে গেলেন, পিছনে রেখে গেলেন
কান্না, হাহাকার আর এক বাড়িভরা শূন্যতা।
