Home সোনাডিঙি নৌকো সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৯

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৯

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৯
মৃধা মৌনি

দীক্ষা অপ্রস্তুত গলায় বলল, ‘আসুন।’
অরুণিমাভ তবু ঢুকলেন না। তাঁর গভীর, চিন্তিত চোখ দুটো যেন দীক্ষার মনের গভীরে কিছু খুঁজছিল। ক্ষণকাল থেমে আবারও শুধালেন, ‘সমস্যা থাকলে পরে আসি।’
‘না আসুন।’ দীক্ষা বুক ভরে এক গভীর দম টেনে অসহায়তা ঢেকে দম ছাড়ল, ‘সমস্যা নেই।’
অরুণিমাভ ভেতরে প্রবেশ করলেন। দীক্ষা তড়িঘড়ি নিজেকে গুছিয়ে নিল, যেন এক অদৃশ্য অবসাদকে ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াতে চাইল। তারপর গিয়ে বিছানায় পিঠ হেলান দিয়ে বসল। তার নিজের শরীরটাও খুব একটা সুবিধার লাগছিল না, মনে হচ্ছে সামান্য চাপেই ভেঙে খান খান হবে।
অরুণিমাভ ডিভানে জায়গা করে বসলেন। হাতের মুঠো আলগা করে রেখে সামান্য ঝুঁকে এসে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন চিন্তিত ভঙ্গিতে, ‘তুমি ঠিক আছ?’

দীক্ষা মাথা কাত করল, চোখে শান্ত থাকার এক ব্যর্থ চেষ্টা, ‘হ্যাঁ আলহামদুলিল্লাহ ঠিক আছি।’
‘তোমার উপর দিয়ে যা যাচ্ছে.. আই ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড।’ তাঁর কণ্ঠে মিশে গভীর সহানুভূতি, যা দীক্ষার নীরব যন্ত্রণাকে স্বীকার করে নিচ্ছে।
‘উহুম, ঠিক আছি আমি।’ মাথা নিচু করে, প্রায় ফিসফিস করে আওড়ালো সে।
অরুণিমাভ একদণ্ড চুপ করে থাকলেন। সেই নীরবতাটুকু যেন দীক্ষার ক্ষ ত কে সম্মান জানাচ্ছিল। একটু সময় নিয়ে তিনি বললেন পরের কথাটা, ‘তৃণার থেকে আমি রাসেলের নাম্বার নিয়েছি।’
দীক্ষা সামান্য চমকালো, তার নিষ্প্রভ চোখে এক চিলতে আগ্রহ দেখা দিল। সঙ্গে সঙ্গে শুধালো, ‘তারপর?’
‘ফোন করেছি। কথা বলেছি। কিন্তু ছেলে তো সব অস্বীকার করল। কণ্ঠস্বর পাল্টে, একেবারে নির্লিপ্তভাবে সব দোষ চাপালো তৃণার ওপর।’

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

‘তাহলে কি তৃণা মিথ্যে বলছে?’
‘না, ও সত্যিই বলছে। রাসেল অস্বীকার করেই সঙ্গে সঙ্গে ফোন কেটে বন্ধ করে ফেলেছে। এতে বোঝা যায়, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়! ঘাপলা আছে।’
‘এখন আপনি কি করতে চাইছেন?’ দীক্ষার কণ্ঠে এবার এক ধরনের অস্থিরতা।
‘এই প্রশ্নটাই আমি তোমাকে করতে এসেছি দীক্ষা। আমি তোমার সিদ্ধান্ত জানতে চাই। তুমি আমায় বলো, তুমি কি করতে চাও? মনে রেখো, তুমি যেটা বলবে সেটাই হবে।’

দীক্ষা চুপ হয়ে গেল। তার দৃষ্টি শূন্যে নিবদ্ধ, যেন মস্তিষ্ক হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। তার প্রশ্নবোধক চাহনি দেখে অরুণিমাভ আবারও বললেন, ‘ওর জীবনের প্রতিটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার যদি এখন কারো থেকে থাকে তবে সেটা তুমি দীক্ষা। ওর কারণেই তো তোমার জীবনটা.. এত এলোমেলো হয়ে গেছে।’
দীক্ষা চোখ ফিরিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে জানালার বাইরে চাইলো। তার গলার স্বর হঠাৎ ভারি হয়ে ওঠে। দায়সারা কণ্ঠে বলল, ‘শুধু কি ওর একারই দায়? আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা তো করেছে শিশির। তারচেয়েও বড় দায় তো শিশিরের। সে তো কথা দিয়েছিল, আমাকে কোনোদিন আঘাত করবে না, অথচ আমার জীবনের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে তীব্র তীক্ষ্ণ যন্ত্রণাটার প্রধান কারণ যে সেই। তাকে আমি কিছু করতে পেরেছি? আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছি নীরবে। সেখানে ওকে আমি কি করব, কি বলব? ওর জীবনের সিদ্ধান্ত ও-ই নেক… আমি শুধু শান্তি চাই জানেন, একটু শান্তি… আমার আর ভালো লাগছে না। কিছুই ভালো লাগছে না। এই দমবন্ধ পরিবেশ ছেড়ে অনেক দূরে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করছে। যেখানে সব ভুলে নিজের মতো শ্বাস নেওয়া যাবে, একদণ্ড নিজের মতো বাঁচা যাবে। জানি না এমন দিন বিধাতা আমার ললাটে লিখেছেন কি না…’

অরুণিমাভ স্থির হয়ে শুনলেন। দীক্ষার বুক চিঁড়ে বেরিয়ে আসা সেই দীর্ঘশ্বাসের শব্দ, যা এক বিধ্বস্ত নারীর সবটুকু ক্লান্তি বহন করছিল, তিনিও শুনতে পেলেন। তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন, দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘ঠিক আছে। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। এই সমস্যার ভার আর আপনাকে নিতে হবে না। ওর সঙ্গ আপনাকে খুব বেশিক্ষণ পেতে হবে না। যা ব্যবস্থা করার আমি করছি। আপনি শুধু নিজেকে সামলে রাখুন। ওটা তো চাইলেও আমি পারব না..’
দীক্ষা তার দিকে মুখ তুলে তাকাল, অরুণিমাভ সপ্রতিভ গলায় বললেন, ‘নিজের যত্ন রাখুন। এত ভেঙে পড়লে চলবে না। কান্নাতে আপনাকে মানায় না। সত্যি বলছি।’

তারপর পরই আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত পদক্ষেপে বেরিয়ে গেলেন। দীক্ষা বসে রইল একা একা, চুপচাপ… বিছানায় হেলান দেওয়া তার শরীরটা যেন এক পলকা পালকের মতো হালকা লাগছে এই মুহূর্তে।
সূর্য তখনো পুরোপুরি ডোবেনি। ঠিক গোধূলির আবছা আলোয় শহরের এক নীরব অলিগলি থেকে রাসেলকে তার বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসলো একদল গুন্ডা মাস্তান জাতীয় লোক। তাদের হাতে ছিল লোহার দণ্ড এবং চোখে ছিল স্পষ্ট হুমকি। কোনো কথা বলার বা চিৎকার করার সুযোগ পেল না রাসেল। তার থেকে বিজয়ের ব্যাপারে সব খবর নিয়ে তার বাসাতেও তল্লাশি চালানো হলো। তবে বিজয়কে পাওয়া গেল না কেননা ইতিমধ্যেই সে এক মেয়েকে ধ র্ষ ণে র দায়ে জেলের ঘানি টানছে।

ফলে, সব আক্রোশ গিয়ে পড়ল রাসেলের উপর। শুধু রাসেলকেই বলির পাঠা করতে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসা হলো চৌধুরী নিবাসে। অরুণিমাভের কঠিন নির্দেশে যেন এক নির্মম নাটকের মঞ্চায়ন শুরু হলো সেখানে। মা র ধ রে র চিহ্ন, ছেঁড়া কাপড় আর চোখে তীব্র ভয় নিয়ে রাসেলকে আছড়ে ফেলা হলো সেই বিলাসবহুল বাড়ির সামনে…।
চৌধুরী নিবাসের সুবিশাল হলরুমের মাঝখানে, মেঝেতে এক অপরাধের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাসেল। তার পরনের পোশাক ছেঁড়া, গালে কালশিটে পড়ার উপক্রম, আর চোখ দুটোতে কেবল অসহায় ও তীব্র আতঙ্ক।
একপাশে রাখা দামি সোফার উপর রাজকীয় দাপটে হেলান দিয়ে বসে আছেন অরুণিমাভ চৌধুরী। তাঁর সারা অবয়বে এক অপ্রতিরোধ্য শীতলতা, যা হলরুমের উষ্ণতাকে যেন মুহূর্তে জমাট বাঁধিয়ে দিয়েছে। তাঁর দু’পাশে বসা আছে বকুল এবং খালেদা বেগম। বকুলের চোখে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ, আর খালেদা বেগমের মুখ পাথরের মতো কঠিন- তাঁর মেয়ের প্রতি হওয়া অন্যায়ের যন্ত্রণা যেন তাঁর নীরব ক্রোধে রূপান্তরিত হয়েছে।

অরুণিমাভ দীক্ষাকে এই দৃশ্যের বাইরে রাখতে চেয়েছেন, কারণ তিনি চান না দীক্ষা এই কদর্যতার সাক্ষী হয়ে তার মানসিক শান্তি আরও হারাক। তাই বকুল তাকে ডাকতে চাইলে তিনি তাকে সাফ মানা করে দিলেন। বকুল দেখল, দীক্ষার জন্য অরুণিমাভের গলায় অন্যরকম অধিকারবোধ। সে ব্যাপারটা চুপ করে গিলে নিলো। আগে এই মুসিবত দূর হোক, এরপর এটা নিয়ে ঘাটাঘাটি করা যাবে!
রাসেলের চোখ গেল ঘরের কোণায় দাঁড়ানো তৃণার দিকে। তার সারা শরীর কাঁপছে, কিন্তু চোখ দুটোতে স্পষ্ট জেদ। তৃণাকে দেখেই রাসেলের বুকের ভেতরের ভয় এক লহমায় ঘৃণা ও ক্রোধে পরিণত হলো।
এই মেয়েটা! এই মেয়েটার জন্য আজ আমার এই অবস্থা!

অরুণিমাভ চৌধুরীর সঙ্গে এই পরিবারের কী সম্পর্ক, তা বুঝতে না পেরেও তার মেজাজ চড়ল। এই মেয়েটা মুখ খুলে তাকে ফাঁসিয়েছে। তার মাথায় তখন কেবল একটিই চিন্তা- একবার এখান থেকে বের হোক! এরপর সে এই মেয়েকে বোঝাবে। তৃণার সব ন গ্ন ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে দেবে, যা হয় হোক। তার জীবন যদি ধ্বংস হয়, তবে সে এই মেয়েটার জীবনও শেষ করে দেবে। প্রতিশোধের এক উন্মত্ত বাসনা তার চোখের তারায় দপদপ করে জ্বলে উঠল।
অরুণিমাভ চৌধুরী তার শীতল চাহনি সরাসরি রাসেলের দিকে নিবদ্ধ করলেন। তাঁর গলার স্বর অস্বাভাবিক শান্ত, যা উল্টো আরও ভীতিজনক রাসেলের নিকট, ‘বসতে বলিনি, দাঁড়িয়ে থাকো।’

অরুণিমাভর এক হাত সোফার হাতলের উপর রাখা, আঙুলগুলো ধীরে ধীরে তাল দিচ্ছে। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, ‘তৃণার সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক ছিল? স্পষ্ট ভাষায় বলো।’
রাসেল দ্রুত মাথা নাড়ল, তার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু অস্বীকার করার চেষ্টা থামল না।
‘কোনো সম্পর্ক ছিল না, স্যার। আমি… আমি একে চিনিই না। ও মিথ্যা বলছে! আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে। বিশ্বাস করুন স্যার, আমি কোনো দোষ করিনি!’
আকাশ থেকে পড়ল তৃণা, এতবড় মিথ্যে কথা!

চোখের কোণ দিয়ে তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অরুণিমাভ আবারও রাসেলের দিকে তাকালেন, ‘কিন্তু সে তো বলছে, তুমি তার কলেজের বন্ধু হও। তুমি তাকে ডেকে নিয়ে… তুমি সবটা অস্বীকার করছ কেন তবে?’
‘উহুম না না, আমি অস্বীকার করছি না, সে মিথ্যে বলছে, আমি তাকে চিনিই না… কোনোদিন দেখিইনি আজ পর্যন্ত।’ রাসেল হড়বড় করে কথা বলছে। এই শীতেও তার কপাল জুড়ে ঘাম ফোঁটা,
আর ঠিক তখনই, এতক্ষণের অসহায়তা ও ভয় ঝেড়ে ফেলে তৃণা যেন এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। সে দ্রুত হেঁটে এগিয়ে গেল রাসেলের দিকে, তার চোখে এখন শুধু অপমান আর ঘৃণার আ গু ন দাউদাউ করে জ্বলছে।
কোনো দিকে কোনো কিছু পরোয়া না করে সে শরীরের সবটুকু শক্তিতে রাসেলের গালে ঠাটিয়ে এক চ ড় মারল। রাসেলের মাথা ঘুরে গেল, গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ স্পষ্ট হলো।

তৃণা হাঁপাচ্ছে, তার চোখে জল নেই, শুধু প্রতিশোধের তীব্র আ গু নের হলকা দেখা যাচ্ছে,’মিথ্যা বলছিস!’ চেঁচিয়ে ওঠে তৃণা,’তুই আর বিজয় মিলে আমাকে ডেকে এনেছিস। তুই জানিস না? তোদের জন্য আজ আমার জীবনটা শেষ! তুই…’
রাসেল এবার উন্মত্তের মতো চেঁচিয়ে উঠল, ‘চুপ কর! মিথ্যাবাদী কোথাকার! তোর জন্যই আজ আমার…’
‘থামো!’
অরুণিমাভের কণ্ঠস্বর এবার হলরুমের প্রতিটি কোণায় প্রতিধ্বনিত হলো। তিনি এক হাতে ইশারা করলেন বকুলকে, বকুল দ্রুত এসে তৃণাকে টেনে সরিয়ে নিয়ে গেল।
অরুণিমাভ সোফা থেকে সামান্য ঝুঁকে এলেন। তাঁর দৃষ্টি শিকারীর মতো তীক্ষ্ণ, যা রাসেলের মেরুদণ্ড অবধি কাঁপিয়ে দিল।

‘শোনো ছেলে, তোমাকে যেভাবে তুলে এনেছি, সেভাবে চিরতরে গুম করে দেওয়ার ক্ষমতাও রাখি। তোমার লা শে র হদিস কেউ কোনোদিন খুঁজে পাবে না। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো। যদি বাঁচতে চাও তো সত্যিটা স্বীকার করে ফেলো। একবার মুখ খুলবে, আর সব সত্যি বলবে। না হলে, এই হলরুম থেকে তোমার জীবিত ফেরা হবে না।’
রাসেল কাঁপতে কাঁপতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার মুখের রং ফ্যাকাশে, চোখের ভয় এখন মৃ ত্যু ভয়ে রূপান্তরিত। অরুণিমাভের এই শান্ত কিন্তু কঠিন হুমকি তার মস্তিষ্ককে সচল করে দিল- এই লোকের কাছে ক্ষমতা মানে শুধু অর্থ নয়, ক্ষমতা মানে সবকিছু। সে সত্যি সত্যিই তাকে শেষ করে দিতে পারে।
দীর্ঘ এক শ্বাস ফেলে, মাথা নিচু করে সে ভাঙা গলায় স্বীকার করল, ‘হ্যাঁ… হ্যাঁ স্যার। আমি… আমি করেছি। আমি আর বিজয়… আমরাই তৃণাকে ডেকে এনে এই সর্বনাশ করেছি। বিজয়ের প্ল্যান ছিল সব… আমি শুধু সাহায্য করেছি।’

কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গেই, ইরে থেকে আসা এক আর্তনাদ ও ধাক্কাধাক্কির শব্দে হলরুমের পরিবেশ মুহূর্তে আরও নাটকীয় হয়ে উঠল।
‘আমার ছেলে! আমার ছেলেকে আপনারা কোথায় রেখেছেন? ওকে ছেড়ে দিন!’
দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন রাসেলের মা ও বাবা, সঙ্গে তার বড় কাকা। তাদের চোখ ছলছল করছে, পোশাক এলোমেলো, সারা মুখে আতঙ্ক। গুন্ডা ধরনের লোকগুলো তাদের ভেতরে ঢুকতে বাধা দিতে পারেনি।
রাসেলের মা ছেলের এই বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে এক তীব্র চিৎকার করে উঠলেন।
‘রাসেল! আমার বাবা!’

তিনি ছুটে গিয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিতে চাইলেন। কিন্তু ততক্ষণে নাটকীয়তার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়ে গেছে।
রাসেলের মা এক তীব্র আর্তনাদ করে মেঝেতে বসা ছেলেকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সঙ্গে থাকা লোকগুলো তাদের সামনে দেওয়াল তুলে দিল।
রাসেলের বাবা, একজন মাঝারি মাপের ব্যবসায়ী, এত বড় বাড়িতে এমন অপমান সহ্য করতে পারলেন না। তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়লেন।

‘আপনারা এটা কী শুরু করেছেন! আমার ছেলেকে এভাবে গু ন্ডা দিয়ে তুলে এনেছেন! এভাবে হয়রানি করছেন কেন? আমরা কোনো অন্যায় করিনি! আপনারা কি জানেন, এভাবে কাউকে জোর করে তুলে আনা এবং মা র ধ র করা ক্রিমিনাল অফেন্স? আমি এখুনি পুলিশ ডাকছি! আপনাদের নামে অপহরণের মামলা হবে!’
রাসেলের বড় কাকাও সায় দিলেন, ‘ছেড়ে দিন ওকে! নয়তো এর ফল আপনাদের ভালো হবে না!’
অরুণিমাভ এতক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন। তিনি ধীরেসুস্থে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তার উচ্চতা এবং অমিত তেজ হলরুমের মধ্যখানে থাকা রাসেলের পরিবারকে যেন এক পলকে ক্ষুদ্র করে দিল।
‘পুলিশ ডাকবেন?’ অরুণিমাভ চৌধুরীর কণ্ঠে এক চিলতে শ্লেষ, ‘খুব ভালো কথা! কিন্তু পুলিশ আসার আগে আপনাদের আদরের ছেলে রাসেল কী কাণ্ড করেছে, সেটা আগে শুনুন।’

সব শুনে রাসেলের বাবা-মা বিশ্বাসই করলেন না। তাঁদের কাছে তাঁদের ছেলে নির্দোষ, এই অভিযোগ মিথ্যে।
‘তৃণা মিথ্যে কথা বলছে! আমার ছেলে এসব করতে পারে না!’ রাসেলের মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
অরুণিমাভ এবার কোনো কথা না বলে সোফায় ফিরে গেলেন এবং পাশের টি-টেবিল থেকে নিজের ল্যাপটপটি তুলে নিলেন। ল্যাপটপের স্ক্রিনটি তিনি রাসেলের পরিবারের দিকে ঘুরিয়ে ধরলেন।
‘একটু দেখুন।’

ল্যাপটপে দৃশ্যমান হলো মিনিটখানেক আগের ফুটেজ। হলরুমের কোণায় গোপনে বসানো একটি ক্যামেরা থেকে নেওয়া সেই দৃশ্য, যেখানে রাসেল ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নিজের মুখে পরিষ্কার স্বীকার করেছে- সে আর বিজয় মিলে তৃণাকে ডেকে এনে এই সর্বনাশ করেছে।
ভিডিওটি শেষ হতেই হলরুমে এক গভীর, শ্বাসরুদ্ধকর নীরবতা নেমে এল। রাসেলের বাবা, মা এবং কাকা- তিনজনই নিস্তব্ধ, স্তম্ভিত। তাঁদের মুখের রক্ত যেন নিমিষে উবে গেছে। পুলিশ ডাকার হুমকি বা আক্রোশ দেখানোর তেজ সম্পূর্ণ নিভে গেছে।
এইবার অরুণিমাভ চৌধুরী তার শীতলতা ত্যাগ করে এক রণমূর্তি রূপ ধারণ করলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর বাজখাঁই, প্রতিটি শব্দ যেন হলরুমের পাথরের দেয়ালে আঘাত করে ফিরে আসছিল।
‘বিশ্বাস হলো? নাকি এখনো মনে হচ্ছে এই মেয়ে মিথ্যা বলছে?’
তিনি ল্যাপটপটি সজোরে বন্ধ করলেন। এরপর তিনি এমন একটি বো মা ফাটালেন, যা রাসেলের পরিবারের ধারণার বাইরে ছিল,

‘আপনাদের ছেলের কুকীর্তির ফল, আপনার ছেলের সন্তান এখন এই মেয়ের গর্ভে।’
কথাটি শেষ হতেই যেন রাসেলের পরিবারের মাথার উপর আসমান ভেঙে পড়ল। রাসেলের মা প্রায় মূর্ছা যাওয়ার যোগাড় হলেন। বাবা আর কাকার চোখে এখন কেবল ভয়, অপমান আর গভীর অস্বস্তি।
অরুণিমাভ চোখ সরু করে রাসেলের বাবার দিকে তাকালেন, ‘এবার বলুন! পুলিশ আসলে কাকে ধরবে আর কাকে কী করবে? ধ র্ষ ণ, অপহরণের চেষ্টা, নাকি একটি মেয়েকে গর্ভবতী করে তার জীবন নষ্ট করার দায়ে?’
রাসেলের দিকে তাকানো গেল না। সে যেন পুরোই শক! তার গাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। এমন কিছু হতে পারে তার ধারণাতেও ছিল না। হঠাৎ তার মনে পড়ল, ওই দিন শারিরীক মিলনের সময় বিজয় যদিও প্রটেকশন ইউজ করেছিল, কিন্তু সে নিজে তো আবেগের বশে কোনো সুরক্ষাই নেয়নি।

‘তার মানে… তার মানে এই সন্তান আমার!’
এই চরম সত্যটা মুহূর্তে তার মস্তিষ্কে আঘাত করল। রাসেলের মনে হলো তার মাথা ঘুরছে। দেয়ালগুলো যেন তার দিকে এগিয়ে আসছে। সে মেঝেতে পড়ে যাওয়ার মতো টলমল করে উঠল।
অরুণিমাভ তা দেখলেন। একরাশ তীব্র কটাক্ষ তাঁর চোখে ফুটে উঠল।
‘প্রেগন্যান্ট তোমার ওয়াইফ আর মাথা ঘুরছে তোমার, ভালো তো! হার্ট টু হার্ট কানেকশন…’
সে অবিশ্বাসে, ভয়ার্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে শুধালো, ‘আমার ওয়াইফ মানে? এ কী বলছেন আপনারা!’
এই কথা শুনে অরুণিমাভের ঠোঁটের কোণের হাসি যেন আরও চওড়া হয়। সেই হাসিতে মিশে বিজয়ের আনন্দ, এক দুর্ভেদ্য ক্ষমতার প্রতীক, যার প্রতিটি পদক্ষেপ আগে থেকেই সুচিন্তিত, নিখুঁতভাবে সাজানো।
তিনি এবার সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

‘কোনো কাজ আমি অর্ধেক রাখতে পছন্দ করি না, বুঝেছ ছেলে?’ অরুণিমাভ শান্ত, অথচ বরফের মতো শীতল গলায় বললেন, ‘তোমার বেলায় তোমাকে কি শুধু শায়েস্তা দিতেই আমি ধরে এনেছি মনে করো? এই চৌধুরী নিবাসে তোমাদের ডেকে আনার উদ্দেশ্য কেবল মা র ধ র আর অপমান ছিল না। প্রতিশোধ নেওয়া আমার কাছে সামান্য মনোরঞ্জন মাত্র।’
অরুণিমাভ টেবিলের উপর রাখা গ্লাস থেকে এক চুমুক পানি পান করলেন। এই বিরতিটুকু যেন শ্রোতাদের স্নায়ুর উপর চাপ বাড়াতে থাকল। এরপর চরম নাটকীয়তা সৃষ্টি করে তিনি ঘোষণা করলেন,
‘তৃণাকে বিয়ে করতে হবে তোমাকে, রাসেল। আজ, এখুনি।’
কথাটা হলরুমের প্রতিটি কোণায় যেন তীব্রভাবে প্রতিধ্বনিত হলো। উপস্থিত সবাই যেন একযোগে দম আটকে ফেলল।
রাসেল হতভম্ব হয়ে গেল। মাথা নেড়ে সরাসরি মানা করে দিল, ‘না! এটা হতে পারে না! আমি একে বিয়ে করব না!’

রাসেলের পরিবার, বাবা-মা এবং কাকা সকলেই যেন মূর্ছা যাওয়ার জোগাড়। তারা ভাবতেও পারেননি পরিস্থিতি এতদূর গড়াবে। তাদের চোখে এখন ভয়, অপমান এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার মেঘ দেখা যাচ্ছে।
তৃণাও চমকে উঠল। তার চোখে তখন মিশ্র অনুভূতি- স্বস্তি নয় বরং একধরনের অসহায় বিস্ময়। নিজের জীবনের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ যে শূন্য, এই সত্যটা যেন আরও একবার প্রমাণিত হলো। উপর ওয়ালার সুতা কখন কোনদিকে টান খেয়ে মোড় পালটে যায়, বলা অনিশ্চিত!

রাসেলের সরাসরি না শুনে অরুণিমাভ চৌধুরী কঠিন মুখে তাকালেন। তাঁর চোখ দুটো বিদ্যুতের মতো জ্বলে উঠল। এটাই ছিল তাঁর চণ্ডীরূপ- যে রূপের সামনে সামান্য মানুষ দাঁড়ানোর সাহসও পায় না।
অরুণিমাভ স্থির কিন্তু ভয়ংকর গলায় বললেন, ‘এখানে না বলার কোনো সুযোগ নেই, রাসেল। এই মুহূর্তে তুমি যা করেছ, তার ফল তোমাকে ভোগ করতেই হবে। তুমি যদি মনে করো তোমার জীবনের সিদ্ধান্ত তুমি নিজে নেবে, তবে ভুল করছো। আমি যদি চাই, তুমি আগামী বিশ বছর সূর্যের আলো দেখতে পাবে না, তোমাকে মাটির দশ ফুট নিচে পুঁতে দেওয়া হবে, তোমার লা শে র হদিস কেউ পাবে না। বিয়েটা তোমার জন্য শাস্তি নয়, বাঁচার সুযোগ। বেঁচে থাকার বিনিময়ে একটি জীবনকে স্বীকৃতি দেওয়া। বেছে নাও।’
রাসেল আমতা আমতা করতে শুরু করল। অরুণিমাভর সেই দৃঢ়তা এবং চোখের কঠিন হুমকি দেখে তার ভেতরের সমস্ত তেজ নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। তার মস্তিষ্ক দ্রুত কাজ করতে শুরু করল, এই লোক মিথ্যে বলছেন না। তিনি সত্যিই পারেন।

অরুণিমাভ এবার তৃণার দিকে তাকালেন।
‘তোমার মতামত কী? এই ছেলেটিকে তুমি স্বামী হিসেবে গ্রহণ করবে?’
তৃণা শান্ত গলায়, মাথা নিচু করে বলল, ‘আমার জীবনের কোনো সিদ্ধান্ত আমি আর নিতে চাই না। আমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমিই ছিনিয়ে নিয়েছি। আমি আজ থেকে পুতুলের মতো করেই বাঁচতে চাই। আপনারা যা বলবেন, তাতেই রাজি আমি।’

রাসেলের মা ততক্ষণে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছেন, ‘না! কিছুতেই না! এমন মেয়েকে আমি আমার ছেলের বউ করব না! ছিঃ! ও আমাদের বংশের নাম ডোবাবে! ওর পেটের সন্তান আমরা কিছুতেই…’
কিন্তু তার স্বামী এবং কাকা তখন বাস্তবতার কঠিন হিসাব কষছেন। অরুণিমাভের ক্ষমতা এবং তার ছেলের অপরাধ, এই দুটির যোগফল তাদের সামনে পরিষ্কার।
রাসেলের বাবা কঠিন গলায় স্ত্রীকে ধমকে থামালেন, ‘চুপ করো! কী বলছো তুমি জ্ঞান আছে? কার দোষ সেটা দেখছো না? এই মেয়েকে বিয়ে না করলে তোমার ছেলেকে এরা পুলিশে দেবে! রাসেলকে জেলে পচতে হবে! তার ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে!’

ওর বড় কাকাও যুক্তির তীর ছুঁড়লেন, ‘দোষ তোমার ছেলের মিনারা, এইটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। মান বাঁচবে। আর তার সন্তানের দায়িত্ব নেওয়া ওর কর্তব্য। তোমার ছেলেকে বাঁচাতে গেলে এইটা করতেই হবে। বিয়েই একমাত্র পথ।’
চাপে পড়ে, নিজের জীবন বাঁচানোর শেষ সুযোগ পেয়ে, রাসেলও আর কোনো কথা বলল না। সে মাথা নেড়ে রাজি হলো। তার রাজি হওয়াতে কোনো প্রেম, শ্রদ্ধা বা অনুতাপ নেই, মিশে আছে কেবল ভয় এবং চরম বাধ্যতা।
অরুণিমাভ চৌধুরী এক ঝলক তৃপ্তির দৃষ্টি বিনিময় করলেন বকুলের সঙ্গে। বকুলের চোখ ভিজে এলো, এই মানুষটির উপর কেন যেন তার সম্মান এবং শ্রদ্ধার মাত্রা বেড়েই চলেছে।
অরুণিমাভ এরপর দৃঢ় স্বরে আদেশ দিলেন,
‘কাজী সাহেব!’

সঙ্গে সঙ্গে হলরুমের পেছনের একটি ছোট দরজা ঠেলে প্রবেশ করলেন একজন কাজী। তাঁকে দেখে পুরো হলরুমের শ্বাস যেন আরও একবার থমকে গেল। তিনি বসার ঘরেই এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন, হাতে ছিল কাবিননামা। অর্থাৎ, অরুণিমাভ চৌধুরী সবকিছু পরিকল্পনা করে, এই নাটকীয় মুহূর্তটির জন্য প্রস্তুত করেই রেখেছিলেন!
অতঃপর, সেই বিলাসবহুল হলরুমের মধ্যে, রাসেলের ছেঁড়া পোশাক, চোখে আতঙ্ক, আর তৃণাকে তার অবাধ্যতা, পাপের ফল স্বরুপ এবং অরুণিমাভর কঠিন নির্দেশ মেনে বিয়ে সম্পন্ন হলো।
‘কবুল? কবুল?’

ভয় আর চরম বাধ্যতা নিয়ে রাসেল মাথা নাড়ল। তৃণা নির্বাক, তার চোখ দিয়ে জল গড়ায়নি, যেন কান্নার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে সে। কেবল নিরবে মাথা নুইয়ে হ্যাঁ বলল।
বিয়ে সম্পন্ন হলো। ওই ভাবেই, ওই অবস্থাতেই… যা কেউ ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারেনি, তাই করে দেখিয়েছেন তিনি।
অরুণিমাভ চৌধুরী শান্ত দৃষ্টিতে পুরো দৃশ্যটি দেখলেন। ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিশোধ- দুই-ই সম্পন্ন হলো এক জবরদস্তির পরিণয়ের মাধ্যমে।

রাসেলের মা তখনো ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। অরুণিমাভ তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘অভিনন্দন। আপনার ছেলের ভুল এখন আপনার বাড়ির পুত্রবধূ। এবার থেকে এর সম্মান আপনার পরিবারের সম্মান। এইভাবেই থাকতে হবে।’
বকুল এগিয়ে এসে তৃণাকে ধরে নিয়ে গেল। তৃণা এক নতুন জীবন, এক নতুন পরিণতির দিকে এগিয়ে গেল। এমন এক পরিণয়, যা ভালোবাসা বা স্বপ্ন নয়, কেবল অরুণিমাভ চৌধুরীর ইস্পাত কঠিন ইচ্ছার ফল।
বকুল জোর করে রাসেলের হাতের সঙ্গে তৃণার হাত বেঁধে দিতে চাইলে রাসেল সরিয়ে নিলো ঝটকা দিয়ে। তৃণার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকালোও না। তৃণা অবাক হলো না। যা হলো, তাতে রাসেল তাকে ভালোবেসে স্ত্রীর মর্যাদা দেবে- এমন কিছু তৃণা আশাও করতে পারে না। জানে না, ভাগ্যে কি কি লিখিয়েছে, তবে যাই হোক, তৃণা চুপচাপ মেনে নিয়েছে, নিবে। আজ তার জীবনের এই দশা যে শুধুই তার একলার দায়ে…
দিনের বেলা ঘটে যাওয়া নাটকীয়তার রেশটুকু হিমেল হাওয়ার তোড়ে মিলিয়ে গেছে যেন। রাত এখন বেশ গভীর, কুয়াশার এক পাতলা চাদর নেমে এসেছে শহরের উপর।

দীক্ষা একটু আগেই ঘুম থেকে উঠে বসে আছে। তার ঘর সংলগ্ন বারান্দার কাঁচের দরজা সামান্য খোলা, ভেতর থেকে আবছা হলুদ আলো আর বাইরের হিম শীতল বাতাস মিলে এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
ঠিক তখনই দরজায় আলতো করে দুটো টোকা পড়ল। অরুণিমাভ চৌধুরী এসেছেন। দীক্ষা বুঝতে পারে। এজ ভদ্রলোক খুব সুন্দর করে দুটো টোকাই দিবেন সবসময়। তাঁর হাতে দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি। তাঁকে আসতে দেখে বকুল মিষ্টি করে হাসল দীক্ষার দিকে চেয়ে। সেই হাসিতে কি ইশারা বুঝতে পেরে লজ্জায় লাল হলো দীক্ষার মুখ। সঙ্গে সঙ্গে চোখ রাঙালো সে। বকুল দেখেও দেখল না।
‘আসুন বড় ভাইয়া, ভিতরে আসুন, আমি একটু ফুপির কাছে যাই। দেখে আসি উনার মন মেজাজ কেমন কি আছে.. আপনি বসুন।’

একপ্রকার বাহানায় ছুটে পালাল বকুল। বুঝতে পেরে রেগে বো মা হলো দীক্ষা। প্রকাশ করল না।
অরুণিমাভ মৃদু হেসে ভেতরে প্রবেশ করলেন। দীক্ষা দ্রুত নিজেকে গুছিয়ে নিল।
‘বারান্দায় আসবেন?’ প্রস্তাব দিতেই দীক্ষা রাজী হলো।

অরুণিমাভ তাকে নিয়ে বারান্দায় পাতা বেতের চেয়ারে বসলেন। নিঃশব্দে দীক্ষার হাতে এগিয়ে দিলেন কফির মগ।
রাতের কুয়াশা মেশানো আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে তার বড় ভালো লাগে। তার বুকটা হালকা হয় অনেক। সে দূরের নিয়ন আলোর দিকে তাকিয়ে রইল। বহুদিনের চেপে রাখা ভার যেন সত্যিই অনেকটা হালকা হয়েছে।
বকুল তাকে জানিয়েছে, কীভাবে অরুণিমাভ একাই পুরো পরিস্থিতি সামলেছেন, তৃণাকে বিয়ে দিয়ে রাসেলের সঙ্গে তার শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়েছেন। এই খবর শুনে দীক্ষার মনে এক গভীর মন ভালো লাগা অনুভূতি হয়। কেন, সে নিজেও জানে না ঠিক।

সে অরুণিমাভকে মন থেকে শুকরিয়া জানাতে চায়, কিন্তু পারছে না। কৃতজ্ঞতা তার গলায় এসে আটকে যাচ্ছে। কফির মগ হাতে সে কেবলই উশখুশ করছে, কী বলবে খুঁজে পাচ্ছে না।
অরুণিমাভ তার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে ছিলেন। দীক্ষার এই নীরব অস্থিরতা, তার চোখের গভীরে লুকানো কৃতজ্ঞতার ভাষা তিনি যেন অনায়াসে পাঠ করতে পারলেন। তিনি নিজে থেকেই মৃদু হেসে বললেন, ‘ওয়েলকাম।’
দীক্ষা অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকাল। তার কপালের ভাঁজ স্পষ্ট হলো, ‘কেন?’
‘এই যে আমাকে ধন্যবাদ জানালে, তাই ওয়েলকাম।’ অরুণিমাভর কণ্ঠে দুষ্টুমি মেশানো সহজ স্বীকারোক্তি।
দীক্ষা আরও অবাক। তার হৃদস্পন্দন হঠাৎ বেড়ে গেল।
‘আমি কখন ধন্যবাদ জানালাম?’

অরুণিমাভ আলতো করে নিজের কফিতে চুমুক দিলেন। রাতের নীরবতায় তাঁর কণ্ঠস্বর যেন আরও গভীর শোনাল।
‘মনে মনে জানাচ্ছ তো, আমি বুঝতে পারছি।’
লজ্জায় লাল হয়ে উঠল সে। তার চোখ দ্রুত কফির মগের দিকে নেমে এলো। এমন সরাসরি কথা সে আশা করেনি।
‘আমার মন বুঝি খুব বুঝতে পারেন?’
‘চেষ্টা করছি,’ অরুণিমাভ হাসলেন, ‘কতটুকু সফল হলাম?’
দীক্ষা এবার মগ থেকে চোখ তুলে তার দিকে তাকাল।
‘৭/১০ আপাতত।’
অরুণিমাভ ও হাসলেন।
দীক্ষা এবার সাহস পেল। সে কফির মগটি বারান্দার রেলিঙের উপর রেখে অরুণিমাভর দিকে পুরোটা মনোযোগ দিল।

‘সত্যিই থ্যাংকস। আপনি কীভাবে যে সব সামলালেন… আমাকে কিছুতেই জড়াতে অবধি দিলেন না। আমি কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।’
অরুণিমাভ আকাশের দিকে তাকালেন। সেখানে আবছা কুয়াশার আড়ালে চাঁদ ঢেকে আছে। তাঁর দৃষ্টি শান্ত, মনে মনে কিছু একটা ভেবে চলেছেন, তবে কি দীক্ষা ধরতে পারল না।
‘তোমার জীবনের কোনো কষ্ট বা অপমানের পুনরাবৃত্তি যেন আর না হয় দীক্ষা। আমি সেই চেষ্টাই করব। তোমার শান্তি আমার প্রায়োরিটি লিস্টে আমি লিখে নিয়েছি। তুমি আঘাত পাও, তেমন কিছু না হোক, এই চাওয়া আমার, তোমার নীরব কষ্ট আমাকেও যে পীড়া দেয়।’
কথাগুলো মনে মনেই আওড়ালো অরুণিমাভ। মুখে উচ্চারণের সাহস কিংবা ইচ্ছে হলো না। হোক না, কিছু সম্পর্কের শুরু ধীরস্থির ভাবে। ক্ষতি কি?
তাঁর হাসিহাসি মুখটা দেখে দীক্ষা তাকাল বাইরে, দূরে কোথাও। রাতের কুয়াশা আর দূরের নিয়ন আলো তার কাছে এক নতুন অর্থ নিয়ে এলো। সে আলতো করে কফিতে চুমুক দিল। এই তিতকুটে স্বাদের কফিটাও কেন যেন ভালো লাগছে খেতে। তার হঠাৎ করেই মনে হলো, জীবন সুন্দর! অন্ধকারের শেষে সত্যিই আলো থাকে। দীর্ঘদিন পর দীক্ষা স্বস্তি আর নিরাপত্তায় এক গভীর শ্বাস নিল।

রাতের ভেতরেই তৃণা ও রাসেলরা পৌঁছালো তাদের বাড়িতে। বিলাসবহুল চৌধুরী বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর রাসেলের ভেতর জমে থাকা রাগ আর অসহায়তা যেন একদম চূড়ান্তে পৌঁছেছে।
রাসেলদের বাড়িটি চৌধুরী নিবাসের মতো বিশাল না তবে বেশ ছিমছাম এবং ভদ্রলোকের বাসস্থান হিসেবে পরিচিত। তবে এই রাতে সেই ভদ্রতার কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট নেই।
তৃণা প্রবেশ করল এক নতুন, অনিশ্চিত জগতে। শরীর থরথর করে কাঁপছে যদিও বা উপর উপর দিয়ে সে যথেষ্ট স্থির ভাব দেখানোর চেষ্টায় নিমগ্ন।

ভেতরে ঢুকেই মুহূর্ত দেরি না করে রাসেল হিংস্র বাঘের মতো তৃণাকে লক্ষ করে তেড়ে গেল। তার চোখে চরম আক্রোশ, যেন সে এই মুহূর্তেই তৃণাকে শেষ করে দিতে চায়।
‘তোর জন্য আজ আমার এই হাল! তুই না থাকলে আজ আমার এত বড় সর্বনাশ হতো না! তোকে…’
রাসেল তার হাত উঠিয়েছে, তৃণাকে সজোরে আঘাত করতে উদ্যত হবে- ঠিক তখনই তার বড় কাকা দ্রুত এসে তাকে মাঝখানে আঁটকে ধরলেন।
‘রাসেল! কী করছিস তুই! পাগল হয়ে গেলি?’ কাকার কণ্ঠস্বর কঠিন।
‘ছেড়ে দিন কাকা, ওকে আমি মেরে ফেলব! এর জন্য আজ আমাদের এত অপমান!’ রাসেল দাঁতে দাঁত চেপে গোঙাতে লাগল।

বড় কাকা তাকে জোর করে দূরে সরিয়ে দিলেন।
‘দোষ কি তোমার কম? তোমার মাথায় বুদ্ধি নেই? একটা মেয়ের সর্বনাশ করেছো, তাকে গর্ভবতী করেছো- এসব কে করেছে? তোমার জন্যই আজ আমাদের পরিবারের মান সম্মান সব মাটিতে মিশিয়ে গেছে, ছি ছি ছি!’ কাকা হতাশায় মাথা নাড়লেন, ‘ওর ওপর হাত তুললে কী হবে? আমাদের সব অপমানের মূল কারণ তো তুমি নিজে।’
রাসেল আর কিছু বলতে পারল না। কাকার কথাগুলো যেন তার ভেতরের আত্মরতিকে আঘাত করল। সে মুখ ফিরিয়ে দেয়ালে জোরে ঘুষি মারল।

এই সময় রাসেলের মা এগিয়ে এলেন। চৌধুরী নিবাসে চুপ থাকার বাধ্যতা এখানে নেই। তিনি তৃণাকে লক্ষ করে এক নাগাড়ে গা লা গা ল এবং খারাপ কথা বলতে শুরু করলেন।
‘এই বে শ্যা বাজারের ন টি, কী ভেবেছিস, আমাদের ছেলেকে বিয়ে করে তুই রানী হয়ে যাবি? নষ্ট মেয়ে কোথাকার! পেটে সন্তান নিয়ে ঘরে ঢুকেছিস, লজ্জা করে না তোর? তুই তো আমাদের বংশে অপমান আর অভিশাপ নিয়ে এসেছিস!’

তিনি থামলেন না। জমে থাকা ক্ষোভে তিনি আজ দিগবিদিকশূন্য,
‘তোকে কেউ কোনোদিন বউয়ের সম্মান দেবে না। তুই একটা অপরাধের প্রমাণ মাত্র। তোর মতো মেয়েকে এই বাড়িতে ঠাঁই দিতে হলো, শুধু ওই শকুনের ভয়ে! নিজের জীবন নষ্ট করেছিস, আমাদেরও ডুবালি!’
রাসেলের মা একপাশে রাখা আলমারি থেকে নোংরা কাপড়ের মতো একটি চাদর বের করে ছুড়ে মারলেন তৃণার দিকে।

‘নে! ওই কোণে গিয়ে পড়ে থাক। ওইটা তোর জায়গা। কোনোদিন যেন ভুলেও আমাদের ঘরের কোনো কিছু স্পর্শ না করিস। তোকে আজ থেকেই এই বাড়ির কাজের মেয়ের থেকেও নিচে থাকতে হবে। মনে রাখিস, তুই আমাদের ছেলের বউ নোস, তুই একটা বাধ্যবাধকতা!’
তৃণা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। সে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। মাথায় টানা ওড়না দিয়ে ঘোমটার আড়াল থেকে তার চোখ দুটো দিয়ে শুধু নীরবে জল গড়িয়ে পড়ছে। তার কাঁধ কেঁপে উঠছে কিন্তু শব্দ করে কান্নার সাহস পাচ্ছে না।

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৮

অরুণিমাভ চৌধুরী তাকে তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছেন, কিন্তু সেই অধিকারের মূল্য তাকে প্রতি মুহূর্তে অপমান সয়ে মেটাতে হবে। তৃণার বুঝতে বাকি রইল না, তার নতুন জীবন কোনো স্বর্গ নয় বরং অপমান আর লাঞ্ছনার এক নতুন অধ্যায় মাত্র।
তৃণা কাঁপা হাতে সেই চাদরটি তুলে নিয়ে নীরবে ডাইনিংয়ের কোণে মাথা নিচু করে গিয়ে দাঁড়াল, যেন সে সত্যিই এই বাড়ির সবচেয়ে তুচ্ছ একটি প্রাণী।
এদিকে, ছাদে উঠে একের পর এক ম্যাসেজ করছে রাসেল তিয়াশাকে। বড় কাকার ছোট মেয়ে সে। কি গভীর দুঃখে দৌড়ে ঘরে ঢুকে দরজা দিয়েছিল মেয়েটা, দেখেছিল সে।

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ৩০