স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২৭
সানজিদা আক্তার মুন্নী
তৌসিরকে নিয়ে উপস্থিত সবাই এখন তাদের বাড়ির ভেতরের বসার ঘরে বসে আছেন। তৌসিরের শরীরে গুলি লাগেনি, কাঁধ ছুঁয়ে সেটা বেরিয়ে গেছে। তবে বেশ গাঢ় ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। সবাই তাকে হাসপাতালে নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু না, সে যাবে না। মরে ভূত হয়ে গেলেও সে হাসপাতালে গিয়ে টাকা খরচ করবে না! তার সাথে তর্কে না পেরে অগত্যা তাকে বাড়ির ভেতরই নিয়ে আসা হয়েছে।
বিয়ে উপলক্ষে ফুফুরা সবাই এসেছেন। তার মেজো ফুফুর মেয়ে মায়া ডাক্তারি পড়ছে, তাই সে-ই তৌসিরের ক্ষতে ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছে। মায়া আবার তৌসিরের প্রতি ভারী দুর্বল। তার তো স্বপ্ন ছিল তৌসিরের স্ত্রী হওয়ার, বিবিজানও তেমনই বলেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। মায়া এখন অতি যত্নে তৌসিরের কাঁধ থেকে রক্ত মুছে দিচ্ছে।
এরই মধ্যে নাজহা ধীরে ধীরে সবার সামনে এসে দাঁড়ায়। কিছু না জানার ভান করে জিজ্ঞেস করে, “কী… কী হয়েছে ওনার?”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
বিবিজান তার প্রশ্নের উত্তরে দিকে তাকিয়ে বলেন, “কিছু হয়নি, চিন্তা করিস না। গুলি শুধু ছুঁয়ে গেছে!”
নাজহা বিবিজানের উত্তর শোনে ঠিকই, কিন্তু ওনার দিকে তাকায় না। তার চোখ তৌসির আর মায়ার দিকে স্থির হয়ে আছে। তৌসিরের গায়ে পাঞ্জাবি নেই, শরীর খালি। তার বাবা চেয়েছিলেন পাঞ্জাবিটা ছিঁড়ে শরীর থেকে নামাতে, কিন্তু তৌসির তা হতে দেয়নি। অনেক কষ্টে শরীর থেকে খুলেছে, কারণ ছিঁড়লে তো লস! এত টাকার পাঞ্জাবি নষ্ট হয়ে যাবে।
তৌসিরের উদম শরীরটা বড্ড আকর্ষণীয়। তৌসিরের শরীরটা পরিশ্রমে গড়া এক নিখুঁত কাঠামো। চওড়া কাঁধের নিচে শক্ত বুকের পেশি দুটো টানটান হয়ে ওঠে আছে, মাঝখান দিয়ে নেমে আসা সরল রেখা তার শরীরকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। পেটের ওপর স্পষ্ট ছয়টি পেশির রেখা একটাও বাড়তি চর্বি নেই সেই রেখাগুলোর মাঝ বেয়ে লাল রক্ত চুইয়ে পড়তেছে। তার বাহু দুটো লম্বা ও শক্ত, শিরাগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, প্রতিটি শিরা ভেতরের শক্তির মানচিত্র। কবজি থেকে কনুই পর্যন্ত পেশির টান ভারী মন কাড়া। ধবধবে ফর্সা গা বেয়ে লাল রক্ত বেয়ে পড়তেছে।
নাজহার সারা শরীরে আগুন ধরে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ ওর রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষ ঢেলে দিচ্ছে। মায়া তৌসিরের শরীরে হাত দিচ্ছে কেন? এত আহ্লাদের কী আছে? গুলি তো তৌসিরের লাগেনি, মনে হচ্ছে যেন মায়ারই লেগেছে! নাজহা খেয়াল করল, মায়া আসার পর থেকেই ‘তৌসির তৌসির’ করে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে। অসভ্য একটা মেয়ে! রক্ত মুছছে, এতে ন্যাকামি করে ফুঁ দেওয়ার কী দরকার? ব্যান্ডেজ করে দিলেই তো হয়।
নাজহা এক কোণে দাঁড়িয়ে সব দেখতে থাকে। অন্যরা আলোচনা করছেন কে, কীভাবে, কেন এমন করল। রুদ্র আর নাজেম চাচা বাইরে গিয়েছেন পরিস্থিতি দেখতে। বাড়ির আর কাউকে, বিশেষ করে তৌসিরের মাকে জানানো হয়নি গুলি লাগার বিষয়ে। উনি এসব দেখলে হার্টফেল করবেন। তাই কোনোপ্রকার হইচই ছাড়াই বিষয়টা সামলানো হচ্ছে।
নাজহা রাগে দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়। তৌসিরের গলা আর বুক বেয়ে পড়া রক্তগুলো মায়া অতি যত্নে মুছে দিচ্ছে। নাজহা মনে মনে ভাবে, “আমাকে বলেছিল আমার নারীদোষ নাই, আর এখানে ফুফাতো বোনের সেবা নেওয়া হচ্ছে! বাহ, কী সাধু পুরুষ! কী ভালো মানুষ! শালা আস্ত একটা বদমাশ!”
মনে মনে আবারও রাগ উগড়ে দেয় সে, “গুলি ছুঁয়ে গেল কেন? তিন-চারটে একসাথে বুকে বিধল না কেন? কৈ মাছের প্রাণ, এত সহজে কি আর মরবে?”
নাজহা দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে থাকে, পায়ের আঙুলগুলো রাগে মাটিতে গেঁথে দিচ্ছে। তৌসির এতক্ষণ নাজহার দিকে তাকায়নি, কারণ দুপুরে নাজহাও তার দিকে তাকায়নি। এখন মুখ তুলে সে নাজহার দিকে তাকাল। দেখল, নাজহা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার মধ্যে কোনো আতঙ্ক বা ভয় নেই। স্বামীর গুলি লেগেছে, তাতেও যেন কোনো দরদ নেই। অবশ্য থাকার কথাও না, নাজহা হয়তো মনে মনে খুশিই হয়েছে।
হঠাৎ তৌসিরের চোখে পড়ে, নাজহার ডান হাতের আঙুলগুলো রাগে কাঁপছে আর বাঁ হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ধরা। নাজহার এই আচরণ দেখে তৌসির ভুরু কুঁচকায়। তারপর পাশ ফিরে মায়ার দিকে তাকায়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসল কাহিনী বুঝে যায়। মায়াকে তার এতটা কাছে আসতে দেওয়া উচিত হয়নি। নাজহার রাগের কারণ এটাই। নাজহা আত্মসম্মানের জন্য মুখে কিছু বলবে না, কিন্তু মনে মনে ভুল ধারণা ঠিকই পুষে রাখবে। তৌসির নাজহাকে রাগাতে চায়, কষ্ট দিতে চায় কিন্তু পরনারীকে ব্যবহার করে নয়। এটা কাপুরুষের কাজ।
তৌসির মায়ার কাছ থেকে একটু সরে গিয়ে বলে, “মায়া, তুই বাদ দে। বাকিটা আমি মুছে নেব।”
মায়া অবাক হয়ে বলে, “তুমি একা কীভাবে মুছবে? আমি দিচ্ছি তো! দেখো, নাভিতে গিয়ে রক্ত জমাট বেঁধেছে, পিঠেও লেগেছে।”
তৌসির মায়ার হাত থেকে মোছার তোয়ালেটা ছোঁ মেরে নিয়ে বলে, “আমার নাজহা মুছে দিবে, সমস্যা নেই। তুই যা, গিয়ে হাত ধুয়ে নে।”
দাদাজানও পরিস্থিতি বুঝে বলেন, “সবাই সবার ঘরে যাও।”
এরপর নাজহার দিকে তাকিয়ে বলেন, “নাজহা, তুমি ওরে নিয়া ঘরে যাও। গিয়া রক্ত-টক্ত মুইছা দাও।”
নাজহার ভেতরে তখন আগুন জ্বলছে, তবুও সে শান্তভাবে মাথা নাড়ায়, “আচ্ছা, দাদাজান।”
তৌসির উঠে দাঁড়ায়। বাবার সামনে গিয়ে ওনাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “আব্বা, আমার কিছু হয় নাই। তুমি অযথা চিন্তা কইরো না।”
ওর বাবা অনেক ভয় পেয়েছেন এসবে। তিনি তৌসিরের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন, “বাপ হলে বুঝবি বাপের মন। কিছু হয় নাই জানি, কিন্তু মন তো মানে না রে পুত্ত! আচ্ছা যা, গিয়ে গতর মোছ। আমিও গোসল করি, রক্ত লেগেছে গায়ে।”
তৌসির আর নাজহা ঘরের দিকে পা বাড়ায়। তারা যেতেই তৌসিরের বাবা নিজের ভাইদের দিকে তাকিয়ে ইশারা করেন বের হওয়ার জন্য আর
বলেন,
“চল, কোন হালা গুলি মারছে বের করি।”
তন্ময় চাচা সায় দিয়ে বলেন, “হ্যাঁ, চলো।”
বিবিজান এ দেখে বলেন, “নাযেমরা গেছে তো, তোরা ক্যান যাবি? তোরা গিয়া বরং ঘুমা। যা, রাইত কম হয় নাই।”
তৌসিরের বাবা না-বোধক মাথা নেড়ে দাঁত চেপে বলেন, “যে আমার পোলার শরীরে থাইকা রক্ত ঝরাইছে, তার সাউয়া ছিড়িয়া কাউয়ারে না খাওয়ানো পর্যন্ত আমার জন্য আমার ঘুম হালাল হইবো না।”
তুহিন সাহেবও বলেন, “হ, তাজা রক্ত ঝরছে আমার ভাতিজার শরীর থাইকা। তাজা টগবগে রক্ত। যে রক্ত দেখাইছে, তার রক্তও তো দেখতে হইবো। আম্মা-আব্বা তোমরা যাও, আমরা ওরে ধরিয়া আনিয়া ওর মাংস কুত্তারে খাওয়াইয়া একেবারে ঘুমামু।”
দাদাজান বিবিজানের হাত ধরে বলেন, “তুমি ঘরে আও, ওরা ওগো কাজ করুক।”
বিবিজান দাদাজানের সাথে পা বাড়িয়ে তাদের বলেন, “যা করবি সাবধানে, সামনে কিন্তু ইলেকশন।”
রাত বারো টা বাজতে চলল কিন্তু তারপরও গ্রামের সেই জীর্ণ টং দোকানে তালহা ভাই বসে আছেন যেখানে সবসময় বসে থাকেন। দোকানের ঝাঁপটা অর্ধেক খোলা, উপরে একটা হলদেটে বাল্ব জ্বলছে। চারপাশ থেকে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ আর ছোট-বড় ভাইদের অট্টহাসির রোল ওঠছে সাথে। কিন্তু এই কলরবের ঠিক মাঝখানে বসে থাকা তালহা ভাই এক মস্ত বড় মরুভূমির ন্যায়।
অতিরিক্ত হাসি-ঠাট্টা বরাবরই তাঁর অপছন্দ, কিন্তু আজ তা রীতিমতো বিস্বাদ ঠেকছে। তাঁর বুকের ভেতর এক বিষণ্ণ যুদ্ধের দামামা বাজছে। বাড়িতে ফেরারও কোনো তাগিদ নেই উনার সেখানে ইয়ারার জিনটা সারা বাড়ির মানুষের নাভিশ্বাস তুলে রেখেছে। এক গভীর আতঙ্ক আর অস্বস্তি পুরো বাড়িকে গ্রাস করে আছে যা এখন তালহা ভাইয়ের কাছে অসহ্য লাগছে। তাই ফেরেননি আর বাড়ি। স্টুডিও হতে সোজা আড্ডায় চলে এসেছেন।
উনি চুপচাপ বসে থাকলেও মস্তিষ্ক তাঁর স্থির নেই। আগামীকাল মুভি চ্যানেলে কোন সিনেমাটা এক্সপ্লেইন করবেন, সেটা নিয়ে ভাবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বারবার খেই হারিয়ে ফেলছেন। হারিয়ে ফেলার কারণও আছে এক নিদারুণ যুদ্ধে যে লিপ্ত তিনি। নিজের অস্তিত্ব থেকে কাউকে একজন কে উপড়ে ফেলার যুদ্ধে। যাকে তিনি এক সময় ‘প্রাণসঞ্চারিণী’ বলে জানতেন, আজ তাকে ভুলতে চাওয়ার প্রতিটি চেষ্টায় তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হচ্ছেন। স্মৃতিরা মনে হয় অবাধ্য জিনের মতো তাঁকে জাপ্টে ধরে আছে। নাজহা ভুলার চেষ্টায় যখন উনি নিজেকে বুঝাতে ব্যাস্ত ঠিক এই মুহূর্তে আড্ডার এক ছোট ভাই তালহা ভাইয়ের চেতনা ফিরিয়ে আনে হাতের কাছে রাখা গিটারটা তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আবদার করে বসে,
“তালহা ভাই, এই বিষণ্ণ রাতে একটা গান না হলে জমে না। একটা গান প্লিজ!”
তালহা ভাইয়ের গানের গলা চমৎকার, আর এই গুণটাই মাঝে মাঝে তাঁর জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। আড্ডায় বসলেই সবাই গানের জন্য জেঁকে ধরে। বরাবরই তিনি সবিনয়ে এড়িয়ে যান, কিন্তু আজ আর পারলেন না। বুকের ভেতর জমানো দহন যখন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়তে চাইছে, এখন সুরই সম্ভবত একমাত্র উপশম। মুচকি এক চিলতে হাসি দিয়ে গিটারটা হাতে নিয়ে তিনি তা পাশে রেখে দিলেন। তারপর তালহা ভাই সামনের একটা নড়বড়ে টুল টেনে নিয়ে তাতে আঙুল দিয়ে রিদম তুলে বুক চেরা আর্তনাদ নিয়ে স্বর বেঁধে গেয়ে ওঠলেন:
sochta hu..
sochta hu..
.aaa…”
পুরো আড্ডা মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায়। তালহা ভাইয়ের বিষণ্ণ কণ্ঠের সাথে আড্ডাতে থাকা সবাই এক অঘোষিত বিষাদে তাল মেলাতে শুরু করে:
sochta hu ki wo kitne masoom the
kya se kya ho gye dekhte dekhte
sochta hu ki wo kitne masoom the
kya se kya ho gye dekhte dekhte…
আকাশের ওই অসীম শূন্যতার দিকে তাকিয়ে তালহা ভাই গলার স্বর চড়ালেন। এবার তার সাথে বাকিরাও সমস্বরে গেয়ে ওঠে:
maine patthar se jinko banaya sanam
wo khuda ho gye dekhte dekhte…
Hashar hai wehshat-e-dil ki awargi
Hum se pucho mohabbat ki deewangi
Jo pata puchte the kisi ka kabhi
La pata ho gaye dekhte dekhte…
গানের শেষ দিকে এসে তালহা ভাইয়ের কণ্ঠটা কিছুটা বুজে আসে। প্রতিশ্রুতি ভাঙার এই দুনিয়ায় বিশ্বস্ততা যে কতটা দুর্লভ, তা সুরের প্রতিটি মূর্ছনায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে,
Ye he dunya yahan kitne ehal-e-wafa
Bewafa ho gaye dekhte dekhte
Ye he dunya yahan kitne ehal-e-wafa
Bewafa ho gaye dekhte dekhte…
গান শেষ হলো, কিন্তু রেশ রয়ে-ই গেল। টং দোকানের এই হইচই করা দলটা এখন একদম নিঝুম। তালহা ভাই আবারও একা হয়ে গেলেন তার নিজের যুদ্ধের ময়দানে।
সবার সাথে কথা শেষে তৌসির আর নাজহা নিজেদের ঘরে আসে। তৌসির ঘরের দরজা লাগিয়ে নাজহার দিকে তাকায় না, কিন্তু নাজহা ওর দিকে তাকায়। ওর সাথে হ্যাঁ-না কোনোপ্রকার কথাও বলে না। সে তার মতো বিছানা ঝাড়তে শুরু করে।তৌসির নাজহাকে উদ্দেশ্য করে বলে, “এরে নাজহা! হুনরায়নি?” { এই যে নাজহা শুনতাছো }
নাজহা তৌসিরের ডাকে পাত্তা দেয় না, শুনেও না শোনার ভান করে সে তার মতো কাজে হাত বাড়ায়। তৌসির নাজহার পিছনে এসে দাঁড়ায় আর বলে, “আমার দিকে তাকাও। কথা কও না ক্যান? কিছু তো কও!”
নাজহা এবারও কিছু বলে না। সে শপথ করেছে, তৌসিরের সাথে কোনোপ্রকার কথায় সে জড়াবেই না। নাজহাকে এমন করতে দেখে তৌসির নাজহার পিছনে একদম নিকটে এসে দাঁড়ায় আর আবারো বলে, “রাগ হইতাছে তোমার? মায়া ছুঁইছে বলে আমারে?”
নাজহা আগের মতো নিরুত্তর। তৌসির এবার রাগ নিয়ে বলে, “বালগিরি করিস না। নাজহা কথা ক আমার লগে। ভালো লাগতাছে না এসব। সারাটা দিনের মাঝে একটা কথা কস নাই আমার লগে, কিছু তো ক!”
নাজহা তো কথা বলবে না, সে তৌসিরকে এড়াতে নিজ জায়গা থেকে সরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে নেয়। তৌসির এটা দেখে আর তেল মারে না। পিছন থেকে নাজহার বাহু চেপে ধরে নাজহাকে ঘুরিয়ে এক টানে নিজের মুখোমুখি নিয়ে আসে। নাজহা এমন হঠাৎ টানে নিজেকে ব্যালেন্স করতে পারে না, থতমত খেয়ে যায়।তৌসির দাঁত পিষে নাজহার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করে,
“ছিনালের ছিনাল! তুই আমারে তোর সাউয়ার ঝল দেখাইতাছিস? কথা কস না ক্যান?”
নাজহার বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে, আর বরদাস্ত করা সম্ভব হচ্ছে না নাজহার পক্ষে। তৌসির তার সাথে কী জঘন্য কাজ করল, তারপরও বলতেছে কেন সে কথা বলছে না! নাজহা রাগ দেখায় না। সে ক্রোধ প্রকাশ না করে ঠান্ডা গলায় অন্যদিকে তাকিয়ে বলে, “আমার কিছু বলার নেই, ইচ্ছে নেই তাই বলছি না। আপনি আমার তেমন কেউ লাগেন না, যার সাথে আমি রাগ ঝাড়ার অধিকার রাখি।”
নাজহা কথাগুলো তৌসিরের দিকে না তাকিয়েই বলে। তৌসির হাত বাড়িয়ে ওর দুটো নরম গাল চেপে ধরে নিজের দিকে জোর করে ওর মুখ তাক করায় আর জিজ্ঞেস করে,
“আমার দিকে তাকা। তোর যা বলার আমার দিকে তাকিয়ে বল। মানুষ পশু কে যেমন এড়িয়ে চলে, তেমন তুইও আমারে এড়িয়ে চলতেছিস। এমন করতাছোস ক্যান? যা বলার, যা করার, আমার দিকে তাকিয়ে কর।”
নাজহার গাল ছিঁড়ে যাওয়ার মতো লাগছে। সে তৌসিরের হাত সরাতে চেষ্টা করে বলে, “হাত সরান।”
”সরাব, কিন্তু আগে আমার দিকে তাকা। কিছু বল আমার দিকে তাকিয়ে। ক্যান বলছিস না কিছু? কৈতরি, তাকা না আমার দিকে। তোর চোখের চাহনি আমার মেলা পছন্দ রে, তাকা আমার দিকে।”
তৌসিরের কথায় আর জোরাজোরিতে উপায় না পেয়ে অবশেষে ঘেন্না-ভরা দৃষ্টিতে নাজহা তার দিকে তাকায় আর বলে, “আপনার এই চেহারার দিকে তাকালে ঘেন্না লাগে, গা ঘিনঘিন করে, তাই তাকাচ্ছি না। আমার সাথে যা করেছেন, তারপরও আমি কিছু বলার শক্তি রাখি আপনাকে? আপনি নিজেই বলুন।”
নাজহার বলা কথাটা তৌসিরের কলিজায় বিঁধে। সে কিছু মুহূর্ত নাজহার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর নাজহার মাথায় হাত রাখে, তার চুলের মুঠি আঁকড়ে ধরে তার মুখটা নিজের উদোম বুকে চেপে ধরে আর বলে, “আমি পাপী, তুই গাদ্দার আর আমাদের সংসারটা হবে ছলনার। তাই এইগুলা স্বাভাবিক। এগুলোতে এত রাগ করার কিছু নাই।”
তৌসিরের বুকে থাকতে চায় না নাজহা। তৌসিরের বুকে তার নাক-মুখ চেপে গেছে। নাজহার নাকে বারবার আঘাত করছে তৌসিরের শরীরের ঘ্রাণ আর রক্তের তাজা গন্ধ। সে অনেক কষ্টে মুখ তুলে তৌসিরের দিকে তাকায় আর বিষমাখা গলায় বলে, “আপনার মতো কুকুরের সাথে কথা বলার ইচ্ছে নেই আমার। সরুন আমার কাছ হতে।”
এ শুনে তৌসির আলতো হেসে নাজহার চুলের মুঠি আরও শক্ত করে ধরে, তার মুখ উঁচু করে নিয়ে নাজহার ঠোঁটে আড়ষ্টভাবে চুমু খায়। নাজহা ধাক্কা দিয়ে তাকে সরাতে চায়, তথাপি সে প্রতিবারের মতো আজও ব্যর্থ হয়।
তৌসির নাজহার ঠোঁটে মুহূর্তে মুহূর্তে উন্মাদ হয়ে চুমু খাচ্ছে এই ঠোঁট তুলছে তো আবার বসাচ্ছে কখনো ঠোঁট বসাচ্ছে নাজহার দুই ওষ্ঠদ্বয়ের মধ্যখানে, কখনো তার ঠোঁটের কিনারায়, কখনো তার থুতনিতে। নাজহা তৌসিরের দেওয়া এই এলোপাতাড়ি চুমুর আঘাতে দিশেহারা হয়ে গেছে। সে যে তৌসিরকে বলবে ‘আমাকে ছাড়ুন,’ সেই সুযোগও নেই। তৌসির হঠাৎ এমন করছে কেন, নাজহা বুঝে উঠতে পারছে না। নাজহার শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে এখন। এক তো ওর চুলের গোড়ায় টান খাচ্ছে, তার উপর তৌসিরের এই অত্যাচার। তৌসির পাগলের মতো ওর ঠোঁটে চুমু খেয়ে যাচ্ছে। যদি একবারে ঠোঁট আঁকড়ে নিত, সেটাও মানা যেত, কিন্তু না সে তাও করতেছে না এই ঠোঁট বসাচ্ছে তো এই তুলছে। নাজহা না পেরে তৌসিরের বাঁ কাঁধে, যেখানে গুলি ছুঁয়েছে, সেখানে খাবলে ধরে।ব্যথা পাওয়ায় তৌসির থেমে যায়। নাজহা ছাড়া পেতেই জোরে জোরে দুইবার শ্বাস টেনে চিৎকার করে ওঠে,
“আপনি কি মানুষ? পশুর মতো আচরণ করছেন কেন?”
তৌসির নাজহার চুলের মুঠি একটু শক্ত করে ধরে তাকে ঝাঁকিয়ে তুলে বলে, “তুই নিজেই তো অমানুষ। তোর ভেতর কোনো মনুষ্যত্ব আছে? বল, আছে? না, নেই। আর এইটা পশুর মতো আচরণ হতে যাইব ক্যান? আমি তোর জামাই, তোরে মায়া করে দুইটা চুমু খাইতে পারি না?”
”না, পারেন না! এটা কী ধরনের চুমু খাওয়া? কই, আগেও তো শতবার আমার ঠোঁটে, আমার গালে আপনি নিজের ঠোঁট ছুঁয়েছেন, তখন তো এমন কষ্ট পাইনি! তাহলে আজ কষ্ট দিলেন কেন? নাকি প্রতিশোধ নিলেন?”
তৌসির নাজহার চুল ছেড়ে দিয়ে নাজহার ঠোঁট-মুখ মুছে দিতে দিতে বলে, “প্রতিশোধ! এটা প্রতিশোধ। বিকেলবেলা তুই যে আমার দিকে তাকাসনি, সেইটার প্রতিশোধ।”
নাজহা তৌসিরের কাছ থেকে সরে যেতে চায়, কিন্তু তৌসির সেটা হতে দেয় না। সে উল্টো নাজহার শক্ত হাতে কোমর জড়িয়ে নিজের কাছে টেনে নেয়। নাজহা হুংকার দিয়ে বলে, “আমার ঘেন্না লাগতেছে আপনার ছোঁয়ায়! ছাড়ুন আমাকে! কাছে টানবেন না আমায়।”
”টানবো! একশোবার টানবো। তুই আমার বউ। আমার বউরে নিয়ে আমি যা ইচ্ছা করমু টানমু, ছিঁড়মু, মারমু, কাটমু, যা ইচ্ছা করমু।”
”হ্যাঁ, করবেন তো! সেটা তো করাই উচিত। আমি তো কাঠের পুতুল, সাথে খারাপ একজন মানুষ, বিশ্বাসঘাতক, আবার খুনিও। অত্যাচারের যোগ্য আমি। আমার কার্য কী করবেন? মারবেন? আমাকে দিয়ে মানুষ খুন করাবেন? আমায় নিয়ে দেহ ব্যবসা করবেন? আমায় ভোগ করবেন, কাজ করাবেন, যখন-তখন যা ইচ্ছে করাবেন? ব্যাস, এতটুকুই করতে পারবেন আমায় দিয়ে। এর চেয়ে বেশি কিছু করতে পারবেন না। হয়তো আমায় দিয়ে করুন, আমি তো বাজারের পণ্যের মতো, তাই না?”
নাজহা কথাগুলো তৌসিরকে ইমোশনাল করার জন্যই বলে, ইচ্ছে করেই বলে। তৌসির ওর বলা কথাগুলো শুনে দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। মস্তিষ্ক চায় না বিশ্বাস করতে, কিন্তু মন বলে এই কথাগুলো নাজহা নিজ থেকেই বলছে। তৌসির হাঁসফাঁস করতে থাকে। নাজহা কী বলল? তৌসির তার দেহ নিয়ে ব্যবসা করবে এ বলতে পারলো সে? তৌসির স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলে, “তু… তুমি ভুল ধারণা রাখতাছো। আমি তেমন কিছুই করমু না।”
”আজ সকালে নিজের বিবিজানের সাথে মিলে যেটা করলেন, তারপর আর কিছু বাকি আছে করার?”
তৌসির নাজহার কথায় উত্তর দেয় না। এক দৃষ্টিতে তার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকে শুধু। নাজহা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, “জানেন তৌসির, সব মিথ্যা, সব ছলনার মধ্যেও আমি শুধু একটা কথা বারবার মন থেকে মেনেছি, আর তা হলো আর যাইহোক, আপনি আমার একটু হলেও ভালো চান। আপনি আমার ভীষণ অপ্রিয়, অথচ বড্ড আপন। সেই আপনি আমায় এত বড় ধোঁকা দিলেন! সকালে আপনার আসল রূপটা যখন কাছ থেকে দেখেছিলাম, বিশ্বাস করতে ভীষণ কষ্ট হয়েছিল আমার। বাস্তবতা মানতে খুব ব্যথা পেয়েছিলাম মনে। খুব আপন আপনি, এতটা নিষ্ঠুর কেন হলেন? সবাই আমার প্রতি নিষ্ঠুর যাকে ভালোবাসতাম সেও নিষ্ঠুর, যাকে আপন ভাবতাম সেও নিষ্ঠুর, যারা সত্যিই আপন তারাও নিষ্ঠুর, এমনকি আমার নিয়তিও আমার বেলায় নিঠুর।”
তৌসির নাজহার এই কলিজা ধরানো অভিযোগগুলো শুনে তাকে ছোট্ট করে, ম্লান গলায় প্রশ্ন করে, “ব্যথা হয়েছিল আমার নিকৃষ্টতা দেখে?”
নাজহা মাথা দুলিয়ে বলে, “হ্যাঁ, খুব।”
তৌসির নাজহার পানি-জমা অসহায় চোখে মলিন দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে খানিক্ষণ। অতঃপর এক পৈশাচিক হাসি ঠোঁটে টেনে ধরে বলে, “তাহলে বোঝ, আমার কতটুকু লেগেছিল যখন তুই আমার লগে নাগিন নাগিন খেলছিলি।”
”আমি তো কালসাপ, তাই না? তাহলে বাঁচিয়ে রেখেছেন কেন? মেরে ফেলুন। কী লোভে, কী স্বার্থে আমার মতো গাদ্দারের সাথে এখনো সংসার পাততে চান, এখনো?”
তৌসির নাজহার প্রশ্নে মুচকি হেসে ওর মাথার এক পাশে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, “স্বার্থ নিশ্চয়ই আছে। আর সেটা হলো দু-একটা সুন্দর বাচ্চার বাপ হওয়ার লালসা।”
”হবো না আমি আপনার বাচ্চার মা।”
”হইতে হইবো তোরে। তোর দাদায় চারটা বিয়া কইরা যতটা পোলাপান জন্ম দিছে, তুই একাই ততজনের জননী হবি। কম হলেও আমার আট-দশটা বাচ্চার মা তোরে হইতেই হইবো কৈতরি।”
নাজহা আক্রোশে ফেটে পড়ে বলে, “হবো না। আর যদিও হই, তাহলে ওদের বিষ খাইয়ে নয়তো নিজ হাতে গলা টিপে মেরে ফেলবো। যেই সন্তানের জনক তৌসির শিকদারের মতো জানোয়ার, সে বড় হয়ে নিশ্চয়ই তার জনকের মতোই পশু হবে। সেই সন্তান না থাকাই উত্তম।”
তৌসিরের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে যায় এই কথায়। কতটা নিষ্ঠুর এই নাজহা! কীভাবে, কত সহজে বলল এই কথা? তৌসির রাগ দেখায় না একটুও না, উল্টো নাজহার গালে আলতো হাতে হাত রেখে বলে,
“মারিস! যদি মারতে পারিস, তাহলে মারিস। এখন তো মা হসনি, মায়ের মন কী বুঝবি না। মা যখন হবি, তখন বুঝবি সন্তান মায়ের কাছে কী। নাজহা, তুই পারবি না মারতে।”
”পারব, আমি পারব! পৃথিবীর সব নিষ্ঠুরতার চরমে আমি। আমার মাও তো আমাকে একা রেখে চলে গেছে। সেও তো মা। সে যখন পেরেছে, তখন আমিও পারব।”
মায়ের কথা শুনে হঠাৎ তৌসির থমকে যায়। হাত বাড়িয়ে তৌসির নাজহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তাকে আবারও নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে। নাজহার পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। তৌসির নাজহাকে স্নেহ করে এত যত্ন রাখে এ ভেবে যে মেয়েটা ছোট্ট বেলায় মাকে হারিয়েছে, মায়ের আদর হতে সে বঞ্চিত। বাপ-চাচা হয়তো আদরে রেখেছে, তবে শেষমেশ স্বার্থেই বিলিয়েছে। এগুলো মাথায় রেখেই তৌসির এতটা দুর্বল নাজহার প্রতি। আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতার কারণ নাজহা তার বউ ওর একান্ত নারী। নাজহা যদি ওর তিন কবুলে পড়া আপন নারী না হতো, তাহলে এমন দশ-বারোটা নাজহাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে পিস পিস করে বিরিয়ানি বানিয়ে খেয়ে দেওয়ার শক্তি রাখে তৌসির। নাজহা তৌসিরের বুকে চুপ করে লেপ্টে থেকে হঠাৎ বিষাক্ত এক বাণী বুনে, “গুলি লাগল আপনার। মরলেন কেন আপনি? আপনি মরলে তো আমি বাঁচি।”
তৌসিরের হাতটা নাজহার পিঠ হতে ধপাস করে সরে যায়। হাত অবশ হয়ে আসে এ কথা শুনে। কলিজায় গিয়ে লাগে কথাটা, মস্তিষ্কে তীরের ন্যায় গিয়ে বিঁধে। কী ভয়াবহ কথা বলল নাজহা! সে তৌসিরকে ঘৃণা করে, তাই বলে এভাবে ওর বুকে থেকে ওর মৃত্যু এত আফসোসের সাথে কামনা করবে? কীভাবে বলল এ কথা নাজহা? গলায় বিঁধল না? বিবেকে ধরল না? নাজহা তৌসিরের অবস্থা অনুভব করতে পেরে নিঃশব্দে হেসে ওঠে। খুব শান্তি লাগতেছে এখন তার। একটু পর সে তৌসিরের বুক থেকে মাথা তুলে তার দিকে আড়চোখে চেয়ে প্রশ্ন ছোঁড়ে,
“একটা প্রশ্ন করব?”
তৌসির নাজহার চোখের দিকে চেয়ে, তার বলা কথাটা একটু ভুলার চেষ্টা করে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলে, “করো।”
অনুমতি পেয়েই নাজহার শান্ত মুখে লাল আভা ফুটে ওঠে। ও ঝাঁঝালো গলায় জিজ্ঞেস করে, “আপনার ঐ মায়ার সাথে কিছু ছিল নাকি? আপনার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল? তা সত্যি করে বলুন তো, আপনার আর তার সম্পর্ক ছিল, তাই না? আমি একজন কে ভালোবাসি সেটা আপনাকে বলেছি, আপনিও স্বীকার করুন।”
তৌসির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, “যদি বলি ছিল, তাহলে কী করবা?”
নাজহার উত্তেজিত চেহারাটা এই উত্তরে পানসে হয়ে যায়। সে গলার স্বর নিচে করে নিয়ে বলে, “আমার তো কিছু করার নেই, মেনে নিলাম। এখনো আছে তার সাথে?”
”যদি বলি আছে!?”
নাজহা এটা আশা করেনি। কেমন একটা লাগে। অন্তরের কোথাও না কোথাও ব্যথা ধরে। সে ম্লান গলায় বলে, “ওহ।”
”ওহ! শুধু ওহ? আর কিছু বলবে না? রাগ করবা না?”
”নাহ, রাগ করব কেন? রাগ আমি আপনার সাথে করি, তবে সেটা শত্রু হিসেবেই। স্ত্রী হিসেবে রাগ করার অধিকার আমার নেই।”
”ক্যান নাই? তুমি আমারে জামাই না মানলেও, আমি তোমারে বউ মানি। যদিও তুমি এক নাম্বারের ছিনাল, তারপরও বউ আমি তোমায় মানি। আমার উপর তোমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে, কিন্তু!”
তৌসিরের কথায় নাজহা মৃদু হাসতে হাসতে তার কাছ সরে গিয়ে বিছানায় দু পা তুলে বসতে বসতে বলে, “নাহ, রাগ করব কেন? রাগ করার কী? করুন প্রেম-পরকীয়া, আমি বাঁধা দিব না। মায়া আপনার প্রতি অনেক অবসেসিভ, খুব ভাবে আপনার কথা। গুলি লেগেছে আপনার, কিন্তু তার ইমোশনাল ব্যাকল্যাশ দেখে মনে হচ্ছিল তার কলিজায় লেগেছে গুলি। বেশ ভাগ্যবান তো আপনি! এমন একজন প্রেমিকা পেয়েছেন। বিয়ে করার পরও সে আপনার সাথে আছে, চালিয়ে যান। তাকে বিয়েও করতে পারেন, আমার আপত্তি নেই।”
তৌসির নাজহার কথাগুলো শুনে শত তিক্ততার মধ্যেও মুচকি হেসে দেয়। কী ঠেস মারা কথা বলে এই মেয়ে! তৌসির নাজহার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় আর বলে,
“কী আবার করতাম দ্বিতীয় বিয়া? তুমি এক নাগিনীর যন্ত্রণায় কাতর আমি। তোমার দাদা চার বউ কেমনে সামলায়! আর শোনো, আমার এসব প্রেম-টেম নাই, মজা করতেছিলাম। তুমি আবার সত্যি মনে কইরো না।”
নাজহা তৌসিরের শেষের কথায় একটু খুশি। বুকের উপর হতে একটা ভার নামে তার। সে নড়েচড়ে দুই হাঁটুর নিচে দুটো হাত নিয়ে বসতে বসতে বলে, “আমার দাদা জেন্টলম্যান, তাই পেরেছেন। আপনার সাপুড়ে নাকি?”
”আমি সাপুড়ে কেমনে হইলাম?”
”আমি নাগিন, সেটা চিনতে পেরেছেন মানেই আপনি সাপুড়ে, কারণ সাধারণ মানুষের পক্ষে তো নাগিন চেনা সম্ভব নয় মশাই।”
”বাহ বাহ! কথা তো ভালোই বলতে পারো, আমার ইচ্ছাধারী কাল নাগিন।”
কথাটা বলেই তৌসির নাজহার দিকে ঝুঁকে আসে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে নাজহার হাঁটুর ভাজে ও পিঠের নিচে হাত দিয়ে তাকে বসা থেকে একঝটকায় শূন্যে তুলে ফেলে। হঠাৎ নিজেকে এভাবে শূন্যে ভাসতে দেখে নাজহার তো জান যায় যায় অবস্থা! ভয়ে চোখ বড় বড় করে সে চিৎকার করে ওঠে, “আমি পড়ে যাব!”
তৌসির সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। জিমে ডাম্বেল দিয়ে যেভাবে ‘বাইসেপ কার্ল’ এক্সাসাইজ করা হয়, ঠিক তেমনি সে নাজহাকে অবলীলায় কোলে নিয়ে ধীরে ধীরে কনুই ভাঁজ করতে শুরু করে। নাজহার ওজনটা উপরে ওঠার সাথে সাথে তৌসিরের বাহুর পেশিগুলো শক্ত হয়ে ফুলে ওঠতে থাকে, হাতের রগগুলো স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠতে লাগে। নাজহার প্রাণপাখি তো এখন ভয়ে খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়। মনে মনে ভাবছে, তৌসির মানুষটা এতটা বজ্জাত কেন? তাকে আস্ত একটা জিমের যন্ত্র বানিয়ে ফেলল! তৌসির ধীরে ধীরে কনুই ভাঁজ করতেই নাজহা আতঙ্কে আঁতকে ওঠে, “তৌসির, আমি পড়ে যাব! নাআআ মরে যাব আমি!”
তৌসির নাজহার আর্তনাদে পাত্তাই দেয় না। ওকে ওভাবে কোলে নিয়ে এক্সারসাইজ করতে করতেই সে সারা ঘর চক্কর দিতে লাগে। এই ঝাঁকুনিতে নাজহার চুলের খোঁপা খুলে গিয়ে তার দীর্ঘ চুলগুলো এলিয়ে পড়ে মেঝের খুব কাছ দিয়ে দুলতে লাগে। নাজহা কিছুই করতে পারছে না, তার হাত তৌসিরের হাতে বন্দী। পা ছোঁড়াছুড়ি করলে নিজেই পড়ে যাবে। ছোটবেলায় বাপ-চাচারা তাকে নিয়ে এভাবে মজা করতেন, তাকে হাসাতেন। কিন্তু এখন এত বড় হয়ে যাওয়ার পর নিজের জামাইও যে তার সাথে এমন ছেলেমানুষি করবে, সেটা নাজহার কল্পনাতেও ছিল না। অবশেষে নাজহা কে সারা ঘর চক্কর কাটিয়ে এনে তৌসির তাকে বিছানায় শোয়ায়। তৌসির তাকে শোয়াতেই হাত-পা বিছানায় ছুঁড়ে নাজহা জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে রাগান্বিত গলায় বলে, “অতিরিক্ত করে ফেলেছেন আপনি! আমার নাড়িভুঁড়ি নিচে নামিয়ে দিয়েছেন।”
তৌসির ওর কথায় কান না দিয়ে কোনো এক অদৃশ্য মায়াবলে ধীরে ধীরে নাজহার ওপর ঝুঁকে আসে। নিজের বলিষ্ঠ দুই হাতের তালুতে নাজহার নমনীয় কবজিজোড়া বিছানার চাদরে চেপে ধরে। তৌসিরের মুগ্ধ দৃষ্টি আটকে যায় ঠিক তার নিচেই শুয়ে থাকা ওই অপার্থিব মানবী নাজহার দিকে।
কী সর্বনাশা তার এই সৌন্দর্য! কি মারাত্মক রুপ নিয়ে জন্ম নিয়েছে এই মেয়ে। নাজহার চোখের দিকে তাকিয়ে তৌসিরের মনে হলো সে বোধহয় পথ হারিয়েছে কোনো গহীন অরণ্যে। তার চোখের এই সবুজ মণি জোড়ায় মিশে আছে হাজারো বিমুগ্ধতা। হাড়কাঁপানো এই শীতেও নাজহার দুগ্ধশুভ্র ত্বক থেকে ঠিকরে পড়ছে এক স্নিগ্ধ আভা। এই কনকনে শীতে বেশিরভাগ মানুষের ঠোঁট ফেটে চরাচর অথচ নাজহার রক্তিম ঠোঁট জোড়া এই শীতেও ঠসঠসা হয়ে আছে। চারপাশের শুষ্কতায় যখন প্রকৃতি জৌলুসহীন, নাজহার পাতলা ওষ্ঠদ্বয় এখন শিশিরভেজা একজোড়া টকটকে লাল টিউলিপ। সজীব, আর্দ্র এবং মারাত্মক রকমের লোভনীয় এই অধর। তার এই রক্তিম ঠোঁটের দিকে তাকালে পৃথিবীর সমস্ত সংযম ধুলোয় মিশে যায়। তৌসিরের মনে হয়, এখনই এই প্রলয়ঙ্করী লালিমায় ডুবে গিয়ে, সময়ের হিসাব ভুলে এঁকে দিতে সহস্র বছরের জমানো ভালোবাসার এক গাঢ় চুম্বন। তৌসির ক্ষতের তীব্র জ্বালা ছাপিয়ে এক অদ্ভুত ঘোর অনুভব করতেছে।
তার দৃষ্টি গিয়ে থমকায় নাজহার ওপর। মনে মনে ভাবে সে, নাজহা শুধু নারী নয়, সে তো এক তিলোত্তমা। বিধাতা বিশ্বের সমস্ত সুষমা তিল তিল করে সঞ্চয় করে অতি সংগোপনে হয়তো তাকে নির্মাণ করেছেন।তার টানা চোখের একপলক চাউনি কিংবা তার এই রাগী মুখাবয়বের ভাঁজে যে কতটা মায়া আর মাদকতা লুকিয়ে আছে, তা লিখে শেষ করার মতো কোনো শব্দ বোধহয় নেই।নাজহা এক অসমাপ্ত মহাকাব্য। তার এই রূপের বিভা কোনো সাধারণ কবির কলমে ধরা দেওয়ার মতো নয়। তৌসিরের মনে হলো, নাজহার এই লাবণ্য কোনো পার্থিব বস্তু নয়, বরং এক অলৌকিক বিভ্রম যা দেখলে তৃষ্ণা মেটে না, বরং চাতকের মতো তৃষ্ণা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। নিজের অন্তরে হাজারো শব্দমালা গেঁথেও তৌসির নাজহার এই সৌন্দর্যের কূল খুঁজে পায় না সে শুধু মুগ্ধ হয়ে দেখে যায় এক অপার্থিব তিলোত্তমাকে। নাজহার সারা শরীর ঝিরিঝিরি করে কাঁপতেছে।
মনে মনে প্রশ্ন জাগতেছে আজ হঠাৎ তৌসির কেন এমন আজব ব্যবহার করছে? অন্যদিনের তুলনায় আজ তৌসির তাকে একটু বেশিই কাছে টানতেছে? নাজহা বেঘোরে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে। তৌসিরকে সরে যাওয়ার জন্য তাগিদ দেওয়ারও শক্তি তার নেই। তৌসির যে তার মাথার দু’পাশে তার দুই হাতে বিছানার সাথে চেপে ধরেছে! নাজহা বেআক্কেলের মতো তার দিকে শুধু দেখতে থাকে, এপাশ-ওপাশ মাথা ঘুরিয়ে। এসব সিন সে ড্রামায় দেখত আর নাক-মুখ ছিটকাত। আর এসব এখন তার সাথে হচ্ছে? তৌসির নাজহার বুকের দিকে এক পলক তাকায় জোরে জোরে শ্বাস নেওয়ায় তার বুক ওঠানামা করতেছে দ্রুত। তৌসির বুঝতে পারে নাজহা ভরকে গেছে। তবে সে বুঝতে পেরেও সে সবে ভ্রূক্ষেপ না করে নাজহার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে ভাবে, “ছিনালের সাপের মতো সবুজ চোখ দুইটা এক্কেরে মারাত্মক মাইরি।”
তৌসির মুচকি হেসে বলে, “তালুকদারের মাইয়া, একখানা হাছা কথা কই, শুনবা?”
নাজহা বিচলিত হয়ে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “কী?”
”আমারে ধ্বংস করার লাইগা তোমার আর ছলনার প্রয়োজন পড়ব না। তোমার এই সাপের মতো সবুজ নয়ানার ক্ষণিকের চাহনিই আমারে বরবাদ করার জন্য যথেষ্ট।”
এ কথাটুকু বলে তৌসির ধীরে ধীরে মুখ ঝুঁকিয়ে নেয় নাজহার দিকে। নাজহা জানে এখন কী হবে। নিশ্চিত তৌসির তার ঠোঁটে চুমু খাবে, দিনে একশোটা চুমু খেতে হয় লোকের তার ঠোঁটে তাই এখনও এমন কিছুই হবে নাজহা বিরক্তিতে চোখ বুঁজে নেয়। তথাপি নাজহার ভাবনাটা সঠিক হয় না। তৌসির তার বুজে নেওয়া চোখের পাতায় খুব আলতো স্পর্শে ঠোঁট ছোঁয়ায় তার ঠোঁটে নয়। নাজহার শরীরটা ঝিনঝিন করে কেঁপে ওঠে। এতটা আবেশ সে কখনোই আশা করেনি। তৌসির জুতা মেরে গরু দান করতেছে নাকি? সকালে কী খারাপ ভাষায় তার সাথে কথা বলেছে, তাকে দিয়ে খুন করিয়েছে, তার সামনে একটা জ্যান্ত মানুষ চার চারটে আঙুল উড়িয়ে দিয়েছে, আর রাতে এসেছে প্রেম-বিনয় করতে যাতে নাজহার মন একটু নরম হয়! কিন্তু নাহ, নাজহার মন গলানো অত সস্তা নয়। তৌসির মুখ তুলে নিয়ে আবারো নাজহার দিকে তাকায়। তখনই নাজহা ফট করে বলে দেয়, “জুতা মেরে গরু দান করতেছেন মেয়র সাব? আপনার করা নিকৃষ্ট ব্যবহার আমি ভুলব না। এসব টুনকো মিথ্যা নাটকে।
তৌসিরের মেজাজ একটু ভালো অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু এখন আবারো বিপর্যয়ে চলে গেল নাজহার এমন বিষমাখা বুলিতে। তৌসিরও শয়তানি হেসে জবাব দেয়, “আমি চাই মনে রাখো। আর শোনো, আর যদি আবার আমার সাথে গাদ্দারি করার পরিকল্পনা করার চেষ্টা করো, তাইলে এর পরিণাম আরও ভয়াবহ হইবো।”
”কী করবেন? কী করার আছে? কাপুরুষের মতো আমায় দিয়ে খুন করাবেন? আর কীইবা করবেন?”
”আমি কী করতে পারি আর না পারি তার ধারণা নিশ্চয়ই আছে? তাহলে মনে রেখো, এমন কিছু করব এমন কিছু, যেটা তোমার শত বছরের ঘুম হারাম কইরা দিমু।”
”আমি করব গাদ্দারি। ততক্ষণ পর্যন্ত করব, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি বরবাদ না হয়ে যান।”
”তোর যা ইচ্ছে করিস তুই। এসব করে আমার কিচ্ছু ছিঁড়তে পারবি না। তোর মতো তেলাপোকাকে আমি নিজের শত্রু লিস্টেও অ্যাড ধরি না। কার দৌড় কতখান তা আমার ভালো করেই জানা।”
নাজহা তৌসিরের কথাগুলোতে বড্ড অপমানিত হয়। সে ছটফট করতে করতে রাগে গর্জে ওঠে, “আমার হাত ছাড়ুন! এভাবে ধরেছেন কেন?”
তৌসির নাজহার এক হাত ছেড়ে দিয়ে নাজহার চুলের ফাঁকে হাত ঢুকিয়ে একগুচ্ছ চুল মুঠো করে নাজহার মাথাটা ঝাঁকিয়ে তুলে নিজের মুখের সামনে এনে হেসে বলে, “তোমার সাউয়ার ঝল আমি ছুটামু খালি থাপড়াইয়া থাপড়াইয়া। ছিনাল কোথাকার!”
এটা বলেই তৌসির বাঁ হাত দিয়ে আরও শক্ত করে বিছানার সাথে চেপে ধরে নাজহার বা হাত আর তার ঠোঁটে, গালে চুমু খেতে থাকে বারবার। নাজহা এক হাত দিয়ে তৌসিরকে সরাতে ধাক্কা দেয় অনেকবার কিন্তু তৌসির তো ছাড়বে না। নাজহা না পেরে তৌসিরের চুল মুঠো করে ধরে ওকে সরানোর চেষ্টা করে। তৌসির নাজহার অতিরিক্ত কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পেরে তাকে ছেড়ে দেয়।
তৌসির ছেড়ে দিতেই নাজহা টাশ করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয় তৌসিরের গালে আর চোখ থেকে জ্বলন্ত আগুনের মতো রাগ ঝেড়ে বলে ওঠে, “দম বন্ধ করে মেরে ফেলার শখ জেগেছে? তাহলে মেরে ফেলুন, বালিশ চাপা দিয়ে! ঠোঁট দিয়ে না চেপে। নষ্ট পুরুষ, লজ্জা করে না এভাবে আমায় টর্চার করতে!”
থাপ্পড় খেয়ে তৌসির শান্ত চোখে নাজহার দিকে তাকিয়ে রয়। মনে মনে ভাবে, নাহ, এই থাপ্পড়টার যোগ্য সে। নাজহা দোষী, সে মানলো। তাই বলে নিজের জোর দিয়ে তাকে কষ্ট দিবে? নাহ, এটা মোটেই ঠিক না। কারণ তৌসির মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, নারীদের শারীরিক নির্যাতন করা পুরুষরাই মূলত কাপুরুষ। তারা নিজেদের জোর, নিজেদের ক্ষমতা তাদের শিকার নিরীহ নারীর উপরে খাটায়। তৌসির নাজহাকে চুপচাপ ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। লুঙ্গির গিঁট টাইট করে লাগাতে লাগাতে নাজহার দিকে তাকিয়ে বলে,
“আজ ইচ্ছে হইতাছিল তোমার লাগি লুঙ্গির গিঁট খুলার, কিন্তু নাহ, আমি পারলাম না। আমি নিজের ভালো মানুষের কাছে ব্যর্থ।”
এটা বলেই তৌসির গোসল করার জন্য ওয়ারড্রোবের দিকে যেতে থাকে। নাজহা এক লাফে উঠে বসে নিজের ওড়নাটা ঠিক করতে করতে তৌসিরকে উদ্দেশ্য করে বলে, “নিজেকে আর যাই বলেন, দয়া করে ভালো মানুষ বলবেন না। গোলাম! আপনি একটা গোলাম।”
তৌসির নাজহার কথায় সায় দিয়ে বলে, “হ, গোলামি তো! এই দুনিয়ায় সবাই তো গোলাম আল্লাহর গোলাম।”
নাজহা নাক ছিটকিয়ে বলে, “আর হাদিস দৌড়াইয়েন না। নামাজ পড়তে তো দেখলাম না জুম্মাবার ছাড়া আর একটা ওয়াক্ত। আর বড় বড় কথা দৌড়াচ্ছেন। আছেন এক দুনিয়া-দুনিয়া করতে আর মানুষ কে মেরে খাইতে।”
তৌসির নাজহার কথায় ঠোঁট কেটে হেসে ওর দিকে তাকায়। ওকে পা থেকে মাথা অবধি দুষ্টু দৃষ্টিতে পরখ করে নিয়ে বলে, “মানুষ মেরে খেলেও তোমায় কিন্তু এখনো আস্তো রাখছি। দু-একের মধ্যে তোমায়ও…
এতটুকু বলেই তৌসির বাঁকা হেসে ওঠে। নাজহা তৌসিরের ইঙ্গিত করা কথা বুঝতে পেরে ধমক দেয়, “চুপ করুন।”
তৌসির আর কথা বাড়ায় না। আজ এমনি কথায় কথায় মেলা কথা হয়ে গেছে। তৌসির ওয়ারড্রোব থেকে একখানা লুঙ্গি হাতে নেয়, সাথে ছোট একটা স্পিকার নিয়ে সে ধীরে ধীরে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে একটা লম্বা গোসল দিতে। আজ একটা গান ঠোঁটে-গালে ঝুলছে, সেটা সে কয়েকবার শুনেওছে। তাই এখন সেটা বাজিয়ে গাইবে আর গোসল করবে সিদ্ধান্ত নেয়। স্পিকারটা ওয়াশরুমের একটা তা’কে রেখে বাজিয়ে সেটার সাথে আওয়াজ দিয়ে তৌসির গেয়ে ওঠে:
”Y qué fue? (¿Y qué fue?),
no hiciste na’ (No hiciste na’)
Con tanta chapa vo’a hacerle ran-kitikan-kinkan
¿Y qué fue? (¿Y qué fue?), no hiciste na’ (No hiciste na’)
Con tanta chapa vo’a hacerle ran-kitikan-kinkan
Mambo
Chapa
Doggystyle
Kan-kinkan-kinkan-kinkan Kan-kinkan-kinkan-kinkan
No te cansé’
Kan-kinkan-kinkan-kinkan Kan-kinkan-kinkan-kinkan
Tú di’que la liga la mata’ (La liga) Muñeca,
তৌসির এই অসুস্থ শরীর নিয়েও গানের তালে ডেম্বো ডান্স দিতে দিতে শান্তি মতো গোসল দিচ্ছে। মূলত তার কাজই জাউরামি করা, আর জাউরামিতেই সে শান্তি পায়। নাজহার মাথা ধরে যাচ্ছে তৌসিরের এই কাণ্ডে। যদিও গানটা তৌসিরের গলায় ভালোই লাগছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও নাজহা গিয়ে ওয়াশরুমের দরজায় ধুমধাড়াক্কা কিল-ঘুষি মারতে মারতে চিল্লিয়ে উচ্চারণ করে , “এই! আপনি এই মধ্যে রাতে কী শুরু করেছেন? কী? বন্ধ করুন আপনার গান! নয়তো খুব খারাপ হবে। খুলুন বলছি দরজা! বেরিয়ে আসুন, আমি ওয়াশরুমে যাব!”
তৌসির ওপাশ থেকে বলে ওঠে, “এখন যদি আমি গোসল না করে বেরিয়ে আসি, তাহলে তোমায় ফজরের আগে ফরজ গোসল করত হইবো কৈতরি! তাই ভেবেচিন্তে কথা কও।”
নাজহা তৌসিরের এমন অসভ্য কথা শুনে আর কিছু তাকে বলে না। তবে বিড়বিড়িয়ে বলে, “খবিস, গাঁজাখোর কোথাকার! গোলামের গোলাম! শালা বেইজ্জত!”
এগুলো বলে সে মুখ বাকিয়ে বিছানায় এসে বসে। কিন্তু বসেও শান্তি নাই। এক তো গানের আওয়াজ, তার ওপর এখন তৌসিরের ভাঙা-ফাটা ফোনে বেজে কেঁপে ওঠে একটা ওয়াজের অংশ। তা হলো ‘জাহান্নামী, জাহান্নামী, জাহান্নামী’। এটা তৌসিরের ফোনের রিংটোন! মানুষ! একটা মানুষ কতটা খারাপ হলে এমন রিংটোন রাখে? নাজহা খুঁজে পায় না এই অসভ্য, ইতর, ফাতরা লোককে মেয়র কারা বানিয়েছে! এই তৌসির মরার সময়ও মনে হয় ফাতরামি করতে করতে ওপারে পার হবে। এদিকে ফোনে একনাগাড়ে বেজেই যাচ্ছে, ‘জাহান্নামী, জাহান্নামী, জাহান্নামী’। নাজহা বিতৃষ্ণায় কপালে কয়েক ভাঁজ ফেলে তৌসিরের ফোনের দিকে তাকায়। যে ফোনটা দিচ্ছে, নিশ্চিত প্রয়োজনেই দিচ্ছে, নয়তো এত করে ফোন দিত না। নাজহা হাত বাড়িয়ে ফোনটা হাতে তুলে নেয় কৌতূহল নিয়ে এত রাতে কে ফোন দিল তৌসিরকে? আবার তার প্রেমিকা-টেমিকা নয়তো? এ কথা মাথায় আসতেই নাজহার দিলে ধড়াক করে বাড়ি দিয়ে ওঠে। নাজহা নিজের কৌতূহল আর সন্দেহ দমাতে না পেরে ফোনটা সামনে ধরে। অচেনয় নাম্বার থেকে কল এসেছে। নাজহা ফোনটা ধরে নিঃশব্দে কানের কাছে ধরে। কানের কাছে ধরতেই ওপাশ থেকে রুদ্রের হাঁপানো গলা ভেসে আসে। সে বলতেছে, “তৌসির ভাই, ঐ মাগির পুত্তরে ধইরা নিছি যে তোমারে গুলি মারছে। তাড়াতাড়ি কুঠিরে আও।”
এতটুকু শুনেই নাজহার হাত-পা অবশ হয়ে আসে। ভয়ে বুক ফেটে কলিজা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম। যদি তারা জেনে যায় এই লোক নাজহাদের কেউ, তাহলে শেষ! তৌসির ভয়ংকর কিছু ওর সাথে করবে। নাজহা বুঝে গেছে তৌসির ওকে মারবে না, কিন্তু এমন কিছু করবে যাতে নাজহা নিজেই তিলে তিলে মরে যায়। নাজহা ভয়ে এতটা আড়ষ্ট হয়ে যায় যে সে রুদ্রকে কী বলবে খুঁজে পায় না। এদিকে রুদ্র ‘হ্যালো, হ্যালো’ করতেছে। নাজহা কিছু বলবে রুদ্রকে, তার আগেই তৌসির গোসল সেরে বেরিয়ে আসে এসে নাজহার কানে নিজের ফোন ধরা দেখে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “কার লগে কথা কও?”
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২৬
নাজহা তৌসিরকে দেখেনি। হঠাৎ তার গলার স্বর শুনে ভয়ে আঁতকে উঠে নাজহা টাশ করে তৌসিরের ফোনটা হাত থেকে ফেলে দেয়। নাজহার কাঁপতে থাকা হাতটা সক্ষম হয় না ফোনটা ধরে রাখতে। নিজের ফোন মাটিতে পড়তেই তৌসিরের বুকে এসে তীর বিঁধার মতো কিছু একটা ছ্যাঁত করে ওঠে। তৌসির চোখ বড় বড় করে সেদিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে, “ও ছিনাল গো! এই ফোন আমি ছয় হাজার টাকা দিয়ে কিনছি! মাত্র নয় বছর চালাইছি! আমার এতটা টাকা তুই কইরা দিলি লস! শেষ, আমি শেষ!”
নাজহা ভয়ে ঢোক গিলে। মরণ আসলে চারদিক দিয়ে আসে। এখন তৌসির না নিজের ফোনের শোকে তাকে এবার কাফন ছাড়া দাফন করে দেয়!
